kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মোবাইল ফোন কম্পানির কাছে সরকারের পাওনা ৫ হাজার কোটি টাকা

ফারজানা লাবনী   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



মোবাইল ফোন কম্পানির কাছে সরকারের পাওনা ৫ হাজার কোটি টাকা

মোবাইল ফোন সেবা খাতের ছয় প্রতিষ্ঠানের কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে সরকারের পাওনা চার হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এ অর্থ পরিশোধের জন্য এনবিআর থেকে কম্পানিগুলোকে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। রাজস্ব আইন অনুসারে এই ছয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছে।

এনবিআরসংশ্লিষ্টরা জানান, রাজস্ব পরিশোধ না করলে কম্পানিগুলোর হিসাব জব্দের মতো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে মোবাইল কম্পানিগুলোর সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব) থেকে দাবি করা হয়, এনবিআরের হিসাব সঠিক নয়।  

এই ছয় প্রতিষ্ঠান হচ্ছে গ্রামীণফোন লিমিটেড, বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশন লিমিটেড, রবি আজিয়াটা লিমিটেড, এয়ারটেল বাংলাদেশ লিমিটেড, প্যাসিফিক টেলিকম বাংলাদেশ লি. (সিটিসেল) ও টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড। এই ছয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এনবিআরের করা বেশির ভাগ মামলায় আপিল ট্রাইব্যুনাল সরকারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। এখন সেসব মামলা উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। এ ছাড়া আপিল ট্রাইব্যুনালে শুনানি শেষে ২০টি মামলার রায়ে পাওনা রাজস্বের বিপরীতে এনবিআর প্রাথমিক দাবিনামা জারি করে চূড়ান্ত নোটিশ দিয়েছে।

চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে ২৭ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এনবিআর থেকে রাজস্ব ফাঁকিবাজ বড় মাপের ৮৭টি প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করে তা আদায়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এই তালিকায় ছয় মোবাইল কম্পানিও আছে।

রাজস্ব ফাঁকিবাজ প্রতিষ্ঠানের লেনদেন সম্পর্কে সম্প্রতি এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) থেকে  চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেনের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, বকেয়া আদায়ে এনবিআর রাজস্ব ফাঁকিবাজ বড় মাপের প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব জব্দের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এ কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই নিজস্ব তহবিলে সামান্য কিছু অর্থ রেখে বাকিটা ব্যাবসায়িক কারণ দেখিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এ প্রক্রিয়া চলতে থাকলে এনবিআর হিসাব জব্দ করলেও রাজস্বের অতি সামান্যই পাওয়া যাবে। এই চিঠির পর এনবিআর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, চলতি সপ্তাহে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠিয়ে ছয় মোবাইল কম্পানির লেনদেনের ওপর কঠোর নজর রাখতে বলবে।

এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে বড় মাপের ফাঁকিবাজ প্রতিষ্ঠানের তালিকা করে রাজস্ব আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অনেক রাজস্ব ফাঁকিবাজ প্রতিষ্ঠান নিজস্ব তহবিলে এনবিআরের পাওনার চেয়ে কম রেখে বিভিন্ন অজুহাতে বিদেশে অর্থ পাঠিয়ে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠান যাতে সরকারকে ঠকাতে না পারে সে জন্য সতর্ক থাকা হবে। বকেয়া পরিশোধে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। চিঠি দেওয়া হচ্ছে। এনবিআর কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে রাজস্ব পরিশোধে অনুরোধ করছেন। দেশের উন্নয়নের জন্য রাজস্ব পরিশোধের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হচ্ছে। এর পরও কেউ রাজস্ব পরিশোধ না করলে হিসাব জব্দের মতো কঠোর ব্যবস্থা নিতে এনবিআর বাধ্য হবে।’

গত ২৫ সেপ্টেম্বর এনবিআর থেকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে চিঠি পাঠিয়ে পুিঁজবাজারে তালিকাভুক্ত গ্রামীণফোনের কাছে এনবিআরের পাওনা রাজস্বের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংকে জমা রেখে বাকি অর্থ সরবরাহে আইনি পদক্ষেপ নিতে বলা হয়।  নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, “এনবিআরের রাজস্ব পাওনার সমপরিমাণ সঞ্চিতি হিসাবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত গ্রামীণফোনের অর্থ ব্যাংকে ধরে রেখে বাকিটা সরবরাহের কথা বলা হয়েছে। যাতে এনবিআর চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষে চাওয়া মাত্র বকেয়া পেতে পারে।” ছয় মোবাইল কম্পানির বকেয়া রাজস্ব হিসাবসম্পর্কিত এনবিআরের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে গ্রামীণফোনের কাছে পাওনা সিম রিপ্লেসমেন্ট খাতে এক হাজার ৪০২ কোটি ১৮ লাখ টাকা, স্থান ও স্থাপনা ভাড়া খাতে ২৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা এবং বিধিবহির্ভূতভাবে রেয়াত নেওয়ায় ৯৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। আইন বহির্ভূতভাবে রেয়াত সরকারের অনূকূলে সমন্বয় না করায় পাওনা ২৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা। প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়েছে, ২০০৬ সালের আগস্ট থেকে ২০০৭ সালের মার্চ পর্যন্ত সরবরাহকৃত  সিম কার্ডের ওপর প্রযোজ্য ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাবদ ৩৪৮ কোটি ৯ লাখ ৭১ হাজার ৬৯৪ টাকা প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারের কোষাগারে জমা না দেওয়ার মূসক আইন ১৯৯১-এর ৩৭ ধারার (৩) উপধারা অনুযায়ী মাসিক ২ শতাংশ হারে জরিমানাসহ পাওনা দাঁড়িয়েছে ৪৫২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে গ্রামীণফোনের কাছে রাজস্ব পাওনা দুই হাজার দুই কোটি ৭১ লাখ টাকা।

বাংলালিংকের কাছে পাওনা সিম রিপ্লেসমেন্ট খাতে ৭০১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা এবং বিধিবহির্ভূত রেয়াত নেওয়ায় ৭৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। কম্পিউটারে ধারণকৃত প্রকৃত সিম কার্ড ও ক্র্যাচ কার্ডের তথ্যের তুলনায় দাখিলপত্রে সরবরাহকৃত সিম কার্ড ও ক্র্যাচ কার্ড কম প্রদর্শন করায় পাওনা ৪৯ কোটি চার লাখ টাকা। ২০০৬ সালের আগস্ট থেকে ২০০৭ সালের মার্চ পর্যন্ত সরবরাহকৃত সিম কার্ডের ওপর প্রযোজ্য মূসক ও সম্পূরক শুল্ক ১৬৪ কোটি ৬৪ লাখ ৮৫ হাজার ৪৪৯ টাকা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় মাসিক ২ শতাংশ হারে অতিরিক্তসহ সরকার পাওনা হয়েছে ২২৮ কোটি ৪১ লাখ ৯৩ হাজার ৮৬৮ কোটি ১১ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে বাংলালিংকের কাছে পাওনা প্রায় এক হাজার ৫০ কোটি টাকা।

রবি আজিয়াটা লি. এবং এয়ারটেল বাংলাদেশকে পৃথক দুটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করে রাজস্ব পাওনার হিসাব করা হয়েছে। 

রবির কাছে রাজস্ব পাওনা সিম রিপ্লেসমেন্ট খাতে ৬৯৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং বিধিবহির্ভূতভাবে রেয়াত নেওয়ায় ২৩৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ২০০৬ সালের আগস্ট থেকে ২০০৭ সালের মার্চ পর্যন্ত সরবরাহকৃত সিম কার্ডের ওপর প্রযোজ্য ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাবদ ১৮১ কোটি ৭৯ লাখ ৯৮ হাজার ১৮৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা নির্ধারিত সময়ে সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় মাসিক ২ শতাংশ হারে জরিমানাসহ পাওনা দাঁড়িয়েছে ২৬৬ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাছে মোট রাজস্ব পাওনা হয়েছে প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা।

এয়ারটেলের কাছে পাওনা সিম রিপ্লেসমেন্ট খাতে ১২৯ কোটি চার লাখ টাকা এবং স্থান ও স্থাপনা খাতে ১৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এরিকসনের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী সম্পাদিত নির্মাণকাজে উেস মূসক কর্তন না করায় পাওনা দাঁড়িয়েছে ১১৭ কোটি পাঁচ লাখ টাকা। কম্পিউটারে ধারণকৃত প্রকৃত সরবরাহকৃত সিম কার্ড এবং ক্র্যাচ কার্ডের তথ্যের তুলনায় দাখিলপত্রে সরবরাহকৃত সিম কার্ড এবং ক্র্যাচ কার্ড কম প্রদর্শন করায় রাজস্ব পাওনা হয়েছে ৮৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। মটরোলার সঙ্গে সম্পদিত চুক্তিতে সেবামূল্যে মূসক পরিশোধ না করায় আরো পাওনা ৩১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে এয়ারটেলের কাছে পাওনা দাঁড়িয়েছে ৩৭৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।

এনবিআর সূত্র জানায়, সম্প্রতি এনবিআর থেকে প্যাসিফিক টেলিকম বাংলাদেশ লিমিটেডকে (সিটিসেল) পাঠানো চিঠিতে সরকারের রাজস্ব পাওনা ৮১ কোটি ২৬ লাখ টাকা পরিশোধ না করলে দায়িত্বরত ব্যক্তিদের সম্পদ ও হিসাব জব্দের কথা বলা হয়েছে। এর আগে প্রতিষ্ঠানটির আয়-ব্যয়সংক্রান্ত হিসাব জব্দ করা হয়।

প্যাসিফিকের কাছে রাজস্ব পাওনা বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূসক ও সম্পূরক শুল্ক যথাসময়ে পরিশোধ না করায় সুদ ও অর্থদণ্ড হিসেবে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৯৮২ কোটি টাকা, ২০১৫ সালের মে মাসে ৮৪ লাখ টাকা এবং আইন ও বিধিবহির্ভূতভাবে রেয়াত গ্রহণ করায় চার কোটি সাত লাখ টাকা পাওনা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০০৬ সালের আগস্ট থেকে ২০০৭ সালের মার্চ পর্যন্ত সরবরাহকৃত সিম কার্ডের ওপর প্রযোজ্য মূসক ও সম্পূরক শুল্ক আরোপ করায় ৪৭ কোটি ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৪১৪ টাকার রাজস্ব পাওনা হয়েছে।

তবে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের ব্যবস্থাপক (যোগাযোগ ও গবেষণা) আবদুল্লাহ আল মামুনের কাছে মোবাইল কম্পানিগুলোর বকেয়া রাজস্ব বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইনগতভাবে দাবি করা সব অর্থই মোবাইল অপারেটররা সরকারকে পরিশোধ করেছে। তবে যেসব দাবি আইনসংগত নয় এবং বিতর্কিত সেগুলো আদালতের বিবেচনায় আছে। আর বিচারাধীন কোনো বিষয়ে মন্তব্য করা সমীচীন নয়। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এনবিআরের এসব অযৌক্তিক দাবি বিনিয়োগকারীদের ওপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি করছে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা