kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

খেলাপি ঋণ অবলোপন নয় আদায়ে জোর

টনক নড়ছে কর্তৃপক্ষের

রফিকুল ইসলাম   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




খেলাপি ঋণ অবলোপন নয় আদায়ে জোর

যেকোনো মূল্যে খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এই ঋণ আদায় এবং খেলাপি ঋণ আরো বেড়ে যাওয়া বন্ধ করতে ব্যাংকগুলোকে এরই মধ্যে বার্তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ঋণ আদায়ের কৌশল নিয়ে এখন আলোচনা চলছে। ফাঁকফোকর দিয়ে ঋণখেলাপিদের বেরিয়ে যাওয়ার যত পথ থাকে সেগুলো বন্ধ করতে এবং অবলোপন না করেই ঋণ উদ্ধার করতে চান তাঁরা। ব্যাংকারদের কাছ থেকে আইনের কিছু ধারা পরিবর্তনের প্রস্তাব পেয়ে সেগুলো সংস্কারের বিষয়েও ভাবছে ব্যাংক।

ব্যবসা সম্প্রসারণ বা চালানোর নাম করে ব্যাংকের ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়া অনেকের জন্য ‘নিয়মে’ পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের বড় অংশই ঋণ ফেরত দিলেও একটি অংশ নানা অজুহাতে এড়িয়ে যাচ্ছে না। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের বিতরণ করা ঋণের ১১ শতাংশের বেশি। বছরের পর বছর পড়ে থাকা খেলাপি ঋণ আদায়ে এবার নড়েচড়ে বসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের পরামর্শ নিয়ে কর্মকৌশল প্রণয়ন করতে যাচ্ছে তারা। খেলাপি ঋণ অবলোপনের চেয়ে বাধ্যতামূলকভাবে ঋণ আদায়কেই গুরুত্ব দেবে বলে সূত্র জানিয়েছে।

জানা যায়, গত ৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যালয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ আইন কমিশন, আদালতের বাইরে বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তিকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টার (বিয়াক) ও তফসিলি ব্যাংকের শীর্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে চতুর্পক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ব্যাংকাররা উদ্বেগ ব্যক্ত করে  বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে মামলা করা হলেও উচ্চ আদালতে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসে অনেক ঋণগ্রহীতা। ফলে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘসূত্রতার দিকে গড়ায়। ব্যাংক কর্মকর্তারা, মামলা কার্যক্রমে গতি আনা এবং ব্যাংক কম্পানি আইন, অর্থঋণ আদালত আইন ও দেউলিয়া আইনের কিছু ধারা সংস্কারের বিষয়ে প্রস্তাব করেন।

গত ৩০ জানুয়ারি মুদ্রানীতি ঘোষণার দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী খেলাপি ঋণের বিষয়ে কড়া নিদের্শ দিয়েছেন। বিদ্যমান খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি আর যেন খেলাপি না বাড়ে, সে বিষয়েও নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।’ গভর্নর জানান, খেলাপি ঋণ আদায় ও করণীয় নিয়ে কাজ চলছে এবং অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে পৃথক পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, ঋণ নিয়ে খেলাপিরা মূলধন খেয়ে ফেলায় তারল্য সংকটে পড়েছে ব্যাংক। গ্রাহকের ঋণের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংকগুলো। অনেক ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ টাকা নেই। ১২টি ব্যাংক এখনো নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) সমন্বয় করতে পারেনি। আগামী ৩১ মার্চের মধ্যেই ব্যাংকগুলোকে জমার শর্ত পূরণ হবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা রয়েছে। বাড়তি ঋণের চাহিদা মেটাতে ও সিআরআর সমন্বয় করতে বাড়তি সুদে আমানত সংগ্রহের দিকে ঝুঁকছে কোনো কোনো ব্যাংক। জানা যায়, অর্থের অভাবে কোনো কোনো ব্যাংক সরকারকে দেওয়া সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ বিতরণের আশ্বাসও রাখতে পারেনি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস শেষে ব্যাংক খাতের ঋণ বিতরণের পরিমাণ আট লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। যার মধ্যে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ এই সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১১. ৪৫ শতাংশ। একই বছরের জুনে বিতরণ করা আট লাখ ৫৮ হাজার ৫২১ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণ ছিল ৮৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা বা ১০.৪১ শতাংশ। অর্থাৎ তৃতীয় প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। বছর শেষ হলেও আর্থিক হিসাব প্রকাশিত না হওয়ায় ডিসেম্বর প্রান্তিকের ঋণ বিতরণের হিসাব পাওয়া যায়নি।

সম্প্রতি কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কমাতে তিন বছরের বেশি সময় খেলাপি ঋণ অবলোপনে নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ। এত দিন কোনো ঋণ মন্দ মানে শ্রেণীকৃত হওয়ার পা পাঁচ বছর পার না গেলে তা অবলোপন, অর্থাৎ নথি থেকে বাদ দেওয়া যেত না। এখন এ সময় তিন বছর করা হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষুদ্রঋণের মামলার খরচের চেয়ে বকেয়া ঋণের পরিমাণ অনেক কম হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মামলা না করেই ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ অবলোপনের সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৩ সালে। এখন টাকার অঙ্কটি দুই লাখ করা হয়েছে। এমন তথ্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় জামানতের সম্পদ নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে কিংবা যে জামানত রয়েছে সেটি থেকে মূলধন ফেরত পাওয়া যাবে না। অথবা ঋণ/মূলধন ফেরত পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, এমন ক্ষেত্রে ঋণ অবলোপন করা হয়।’  তিনি আরো বলেন, ‘খেলাপি ঋণ আদায়ের কোনো বিকল্প নেই।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা