kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

মাতৃভাষায় নাম রাখার সংস্কৃতি

কাসেম শরীফ   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মাতৃভাষায় নাম রাখার সংস্কৃতি

নাম ব্যক্তি বা বস্তুর চিহ্ন। এটি ব্যক্তি বা বস্তুকে চেনা ও পৃথক করার উপায়। ব্যক্তি ও বস্তুর নাম রাখার ক্ষেত্রে পৃথিবীর সব ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ঐক্য রয়েছে। নাম রাখার এই সংস্কৃতি দেশ ও ভাষাভেদে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। কখনো সেখানে ধর্মীয় ছাপ থাকে, আবার কখনো ভাষাপ্রেম মুখ্য হয়ে ওঠে। যে ভাষা ও সংস্কৃতি অনুসরণ করে নাম রাখা হোক না কেন, প্রত্যেকে তা মাতৃভাষার অক্ষরে, মাতৃভাষার ব্যাকরণরীতি অনুসরণ করে লিখে থাকে।
বাংলাদেশের মানুষের নাম রাখার ক্ষেত্রে রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি। বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্বের সমন্বয়ে এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে মিশ্র সংস্কৃতি। বেশির ভাগ মুসলমান হওয়ায় এ দেশের অনেকে তাঁর সন্তানের নাম আরবি ভাষায় রাখে। যদিও এ বিষয়ে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই। তার পরও আরবি নাম রাখার কারণ হলো, আরবি ভাষায় নাম রাখা হলে মুসলমানদের ভাষাকেন্দ্রিক ঐক্য গড়ে ওঠে এবং মুসলিম হিসেবে পরিচয় সহজভাবে প্রকাশ করা যায়। এ ক্ষেত্রে অনেকে বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্বের মধ্যে সমন্বয় করার জন্য মাতৃভাষায় ডাক নাম ব্যবহার করে থাকে। যেমন—প্রখ্যাত সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার নাম। তাঁর নামে তফাজ্জল হোসেন আরবি নাম হলেও বাঙালিত্বের পরিচয় হিসেবে ‘মানিক’ নামও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বাঙালি মুসলমানের নামের সঙ্গে ডাক নাম রাখার প্রবণতা দেশপ্রেম থেকে উদ্গত। তাই আরবি ভাষায় নাম রাখা হলেও বাঙালি মুসলমানের নাম আরব দেশগুলোর নাম রাখার সংস্কৃতির সঙ্গে মিল নেই। আরব দেশগুলোতে একটি মাত্র নাম রাখার সংস্কৃতি চালু রয়েছে। তবে তাদের নামের সঙ্গে পিতার নাম যুক্ত হয়ে থাকে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মিসর, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, ইরান প্রভৃতি দেশে এক ব্যক্তির একাধিক নাম রাখার সংস্কৃতি চালু রয়েছে। এর পাশাপাশি অনেকের রয়েছে ডাক নাম। আর ডাক নাম সাধারণত মাতৃভাষায় রাখা হয়। ইসলামের একাধিক নাম রাখার অবকাশ আছে, যদিও তা আরব দেশগুলোর সংস্কৃতিতে নেই। কোরআনে মহান আল্লাহর একাধিক নামের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কোরআনে এসেছে, ‘আল্লাহর জন্য রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। সুতরাং তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাকবে...।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৮০)।
মহানবী (সা.)-এরও একাধিক নাম রয়েছে। মহানবী (সা.)-এর মূল ব্যবহারিক নাম দুটি—মুহাম্মাদ ও আহমাদ। এ ছাড়াও তাঁর বহু গুণবাচক নাম আছে।
বাঙালি মুসলমান একই সঙ্গে নিজেকে মুসলমান ও বাঙালি হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাই কখনো কখনো তারা আরবি নামকে মাতৃভাষার আদলে গড়ে তোলে। যেমন—আয়শা থেকে আশা, মায়মুনা থেকে ময়না, কুলসুম থেকে কুসুম, মালিহা থেকে মালা, লতিফা থেকে লতা, চেমন আরা থেকে চম্পা, মকবুল থেকে মুকুল ইত্যাদি নাম ব্যবহার করে থাকে।
আবার অনেকে মাতৃভাষায় নাম রাখতে পছন্দ করে। ইদানীং বাঙালি মুসলমানের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যে বাংলা ভাষায় নাম রাখার প্রবণতা বাড়ছে। দেশপ্রেম ও ভাষাপ্রেমের জায়গা থেকে এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এ বিষয়ে ইসলামের বিধি-নিষেধ নেই। নাম রাখার ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা হলো, অর্থবোধক সুন্দর নাম রাখতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কিয়ামতের দিন তোমাদের নিজ নাম ও পিতার নামে ডাকা হবে। সুতরাং তোমরা সুন্দর নাম রাখো।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৩০০)।
নাম রাখা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে এ বিষয় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে নাম অভিনব হওয়া চাই। জাকারিয়া (আ.)-এর পুত্র ইয়াহইয়া (আ.) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে জাকারিয়া, আমি (আল্লাহ) তোমাকে এক পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি। তার নাম হবে ইয়াহইয়া। এই নামে এর আগে আমি কারো নামকরণ করিনি’ (সুরা মারিয়াম, আয়াত : ৭)।
ইসলামে নাম রাখার কয়েকটি স্তর আছে। এক. ‘আবদুল্লাহ’ ও ‘আবদুর রহমান’—এ দুটি নাম রাখা সর্বোত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন,  ‘আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় নাম হলো আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমান’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৩৯৮)।
দুই. মহান আল্লাহর উবুদিয়্যাত তথা দাসত্বের অর্থজ্ঞাপক নাম রাখা উত্তম। যেমন—আবদুল আজিজ (আজিজ তথা মহাপরাক্রমশালীর বান্দা), আবদুর রহিম (পরম করুণাময়ের বান্দা), আবদুল মালিক (রাজাধিরাজের বান্দা) ইত্যাদি নামে আল্লাহর দাসত্বের অর্থ রয়েছে। এগুলো রাখা উত্তম। তবে বর্তমানে এমন নাম রাখা হলে বেশির ভাগ মানুষ পুরো নাম ব্যবহার করে না।
কেউ মাতৃভাষায় নাম রাখতে চাইলে ইসলাম তার ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করে না। তবে নামটি যেন সুন্দর ও অর্থবোধক হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। দেশপ্রেম ও ভাষাপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মাতৃভাষায় নাম রাখা যায়। তবে যে ভাষায়ই নাম রাখা হোক না কেন, সুন্দর, অর্থবোধক ও ব্যাকরণসিদ্ধ নাম রাখা উচিত।
অনেকে আরবি বহুবচনসূচক শব্দ নাম হিসেবে রেখে দেয়। যেমন—‘মুরসালীন’, ‘মুত্তাকীন’, ‘আজমাইন’। নাম হিসেবে এগুলোর কোনো অর্থ দাঁড়ায় না। কেননা ব্যক্তি কখনো সমষ্টি হয় না। অনেকে শ্রুতিমধুর বলে নাম রাখে ‘মিম’ কিংবা ‘আলিফ’। শব্দ দুটি আরবি দুটি বর্ণ। এগুলোর কোনো অর্থ নেই। আবার যারা বাংলা ভাষায় নাম রাখতে পছন্দ করে, তাদের মধ্যে এমন প্রবণতা আছে যে ভালো অর্থের প্রতি লক্ষ করা হয় না। যেমন—গেদা, টুনু, কালা, গেদি, পুটু ইত্যাদি নাম মানবমর্যাদার প্রতি অবজ্ঞা। তাই যে ভাষায়ই নাম রাখা হোক, বিশুদ্ধ ও অর্থবোধক নাম রাখতে হবে। আর মাতৃভাষায় নাম রাখা দেশপ্রেম ও ভাষাপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা