kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১       

নদীর বিষপানিতে তরতাজা সবজি!

তৌফিক মারুফ, বুড়িগঙ্গাপার ঘুরে   

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নদীর বিষপানিতে তরতাজা সবজি!

রাজধানীর পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে কলাতিয়ার সবজির কদর কতটা তা মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ধানমণ্ডি, এমনকি কারওয়ান বাজারে গেলে সহজেই টের পাওয়া যায়। এ ছাড়া ওই সব এলাকার অলিগলিতে রিকশাভ্যানে শত শত ভ্রাম্যমাণ দোকানের মূল পণ্য কলাতিয়ার সবজি। টাটকা-সতেজ ওই সবজি সুস্বাদু হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। দেখলেই চোখ আটকে যায়। কোথাও কোথাও প্রাতর্ভ্রমণকারী অনেক মানুষের নিত্যদিনের শখ কলাতিয়ার সবজি হাতে নিয়ে বাসায় ফেরা।

মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে সবজিপট্টির পাশের সড়কে প্রতিদিন সকালে আলাদা করে ঝাঁপিতে সবজি সাজিয়ে বসে অনেক দোকানি। অনেক ক্রেতা সবজিপট্টি রেখে ছোটে সেদিকে। চকচকে বেগুন হাতে তুলে বিক্রেতা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘কলাতিয়ার বেগুন, কোনো ভেজাল নাই।’ পাশের বিক্রেতা সোলায়মান গলা বাড়িয়ে নিজের সাজি থেকে লাউ তুলে ধরে বলেন, ‘এই এহনও বোঁটা দিয়া কষ পড়তাছে। একটু আগেই কাইট্যা আনছি, এমন জিনিস আর পাইবেন কই?’

আসলেও এত টাটকা সবজি পাওয়া এখন অনেকটা কঠিন। তবে ওই টাটকা সবজির উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, মোহাম্মদপুরের পাশ ঘেঁষে বয়ে চলা বুড়িগঙ্গার প্রায় মরা অংশে বসিলা ব্রিজ পার হয়ে ওপারে ডানে কেরানীগঞ্জের শ্যামলাশী-কলাতিয়া। ছোট-বড় নতুন ভবনের সারি পেরিয়ে সামনের দিকে এগোলে চোখে পড়ে নানা ধরনের সবজি ও ধানের ক্ষেত। আলাউদ্দিন

মার্কেটের আশপাশে বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে একই রকম সবজির বাগান। আছে ধানক্ষেতও। সবজির মধ্যে আছে লাউ, লালশাক, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ঢেঁড়স, বেগুন, করলা ইত্যাদি। বুড়িগঙ্গার ওপারেই চোখে পড়ে মোহাম্মদপুরের বড় বড় ভবন, সঙ্গে নদীর তীর ঘেঁষা কলকারখানা। পানির দুর্গন্ধে নাক চেপে নৌকা নিয়ে বুড়িগঙ্গায় নেমে দেখা যায় পানির রং যেমন কালো, তেমনি ঘন। নানা ধরনের ময়লা ভাসছে পানিতে। অবিরাম উঠছে বুদবুদ। কলকারখানার পাশ থেকে পাইপের ভেতর দিয়ে তরল বর্জ্যের স্রোত মিশছে বুড়িগঙ্গায়। কলাতিয়ার সীমানায় কালো পানির পাশে মাচায় লকলকিয়ে মাথা বাড়িয়ে আছে লাউয়ের ডগা। টাটকা তরতাজা লাউ, যেমনটা মেলে ঢাকায় ভোরের বাজারে।

এখানকার শাকসবজি এত তরতাজা কী করে হয়? সার-কীটনাশক দেওয়া হয় কি না জানতে বাগানের মালিককে খুঁজে না পাওয়া গেলেও পাশের ইটভাটার শ্রমিক রুহুল বলেন, ‘এই সব সবজিতে কোনো সার-কীটনাশক দেওয়া লাগে না। এমনিতেই টাটকা আর তরতাজা থাকে।’

তবে নদী থেকে কলাতিয়াপাড়ার জনবসতিতে উঠতেই ওই টাটকা সবজির রহস্য জানা গেল স্থানীয় কৃষক মো. ছানাউল্লাহর কাছ থেকে। তিনি বলেন, ‘এই নদীর পাশে যেসব ফসল চাষ হয় সেগুলো বুড়িগঙ্গার পানির গুণেই এত তরতরিয়ে বড় হয় আর তরতাজাও থাকে। কারণ ওই পানির মধ্যে যে পরিমাণ ক্ষার-বিষ আছে তা যেমন সারের কাজ করে, তেমনি কীটনাশকের কাজও করে। ফলে কোনো পোকামাকড়ও সবজিতে লাগে না। দেখেন নাই পানিতে ময়লা আছে, কিন্তু কোনো পোকামাকড় নাই!’

তাহলে এখানকার যে সবজি ঢাকায় টাটকা অবস্থায় পাওয়া যায় তা রীতিমতো বিষ কি না জানতে চাইলে কিছুটা ইতস্তত বোধ করেন ছানাউল্লাহ। পরে তিনি বলেন, ‘বিষ ছাড়া আর কী! বিষই তো। বুড়িগঙ্গা আর তুরাগের আশপাশে থাকা কলকারখানার বিষাক্ত পানির সব উপাদানই আছে এই সবজির ভেতর।’

এর পরই ওই কৃষক হাঁটতে হাঁটতে নিয়ে যান সড়কের অপর পাশে নিজের সবজিক্ষেতে। জমিতে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘আগে আমাদেরও ধান-সবজি হইত নদীর দিকে। কিন্তু ওই সব জায়গায় নানা ঝামেলা, চাষাবাদের জমি কম, জমি বেচাকেনা হয়, নতুন নতুন আবাসন প্রকল্প হয়। সে জন্য আমরা নদীর দিকে চাষাবাদ বন্ধ করে এখন এই দিকে চাষাবাদ করি।’

সেচের পানি কোথায় পান জানতে চাইলে ছানাউল্লাহ বলেন, ‘এই দিকে এখন আর বুড়িগঙ্গার পানি আসতে পারে না। যে কয়টা খাল ছিল সব রাস্তা হয়ে গেছে। ডিপটিউবওয়েল আর কিছু পুকুরের ব্যবস্থা আছে। সেই পানি দেই।’ সবজিতে পোকামাকড় ধরে কি না জানতে চাইলে পাশ থেকে মনিরুল নামের আরেকজন বলেন, ‘আমগো এইহানতে রাস্তার এই ধারের ফসল সবই নিরাপদ। আমরা বুড়িগঙ্গার পানি দেই না। বাজার থেইক্যা সার আর পোকা দমনের ওষুধ দেই।’ ছানাউল্লাহ বলেন, ‘বিষ না দিলে তো সবজি রাখা যায় না, পোকায় খেয়ে ফেলে। তাই বিষ দিতে হয়, আর ভিটামিনও দেই। সার তো দিতেই হবে।’

বিশেষজ্ঞরা জানান, বুড়িগঙ্গা, তুরাগসহ ঢাকার চারপাশের নদ-নদীতে এখন যে কালো পানি তা মূলত ভয়ংকর ‘বিষ’। এসব নদীর পানি তীরবর্তী অসংখ্য কারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্যে ভরা। এখন ধলেশ্বরী নিয়েও বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ওই বিষাক্ত পানিতেই তীরবর্তী এলাকায় চাষ হয় ধান ও শাকসবজি। রাজধানীর মানুষ প্রতিদিন বাজারে পায় ওই সব তাজা শাকসবজি।

পানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. এম আশ্রাফ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরানোর পর বুড়িগঙ্গার পানির মান কী অবস্থায় এসেছে তা দেখার জন্য আমরা একটি পর্যবেক্ষণ করেছি। তাতে দেখা গেছে, সামান্য ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তবু এখনো তা মারাত্মক বিপজ্জনক অবস্থায়ই আছে। বিশেষ করে পানির ডিও লেভেল (দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা) ১.০০ মি.গ্রাম/লিটারের চেয়ে এখনো কম। আর জীববৈচিত্র্যের নিরাপদ জীবনের জন্য ন্যূনতম উপযুক্ত মাত্রা প্রয়োজন ৪.৫০ মি.গ্রাম/লিটার।’

কেরানীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফকরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, নদীর বিষাক্ত পানি চাষাবাদের কাজে ব্যবহার না করার জন্য কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে। কারণ এই পানিতে বিষাক্ত সব উপাদান রয়েছে, যা ফসল হয়ে মানুষের শরীরে ঢুকে পড়ার ঝুঁকি আছে। যদিও এখন বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে চাষাবাদ আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে।

বুড়িগঙ্গার বিষপানিতে তরতাজা ঘাসও চাষ হয় গরুর খাবারের জন্য। কয়েকটি এলাকায় দেখা গেছে ‘উর্বর’ জমিতে জাম্বো ঘাসের খুবই ভালো ফলন। গরু-মহিষ জমিতে দেদার ঘাস খাচ্ছিল।

জাম্বো ঘাস দেখিয়ে কলাতিয়ার খবির উদ্দিন বলেন, এই ঘাস যেমন বিক্রি হয় বিভিন্ন খামারের গরু-মহিষের জন্য, তেমনি স্থানীয় খামারের গরু-মহিষ জমিতে চড়িয়ে ঘাস খাওয়ায় খামারিরা। এই জাম্বো ঘাসে গরুর দুধ বেশি হয়, গরুর শক্তিও বাড়ে।

কয়েক দিন আগেই জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, গরুর এমন খাবার থেকে দুধে ঢুকছে মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান, যা মানুষের জন্য ক্ষতি বয়ে আনছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগে আশপাশের কলকারখানা থেকে মারাত্মক সব হেভিমেটাল (ভারি ধাতু) কেমিক্যাল উপাদান নির্গত হওয়া খুবই স্বাভাবিক। এসব বর্জ্যে আছে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ক্রমিয়াম, মার্কারি (পারদ), সিসাসহ অন্যান্য ধাতু। ফসলের মাধ্যমে এসব বিষাক্ত দ্রব্য মানবদেহে গিয়ে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। তিনি জানান, এমন অনেক রাসায়নিক উপাদান রয়েছে যা ফসলের জন্য প্রয়োজন না থাকলেও গাছগুলো মাটি থেকে তা শুষে নেয়। এমন শাকসবজি বা ফসল কেবল মানুষের জন্যই নয়, গবাদি পশুর জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক ড. মাহমুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, পানির সূত্রে মাটির মাধ্যমে কোনো ভারি ধাতু বা বিষাক্ত রাসায়নিক কোনো ফসলে ঢুকে গেলে তার বেশির ভাগই রান্নায়ও নষ্ট হয় না। বরং এসব ক্ষতিকর উপাদান থেকে মানবদেহে মারাত্মক জটিল রোগের উদ্ভব হতে পারে। বিশেষ করে এমন খাদ্য গ্রহণের ফলে মানুষের ক্যান্সার হওয়া সহজ। এ ছাড়া কিডনি ও মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা