kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

হামলা-মামলার ভয়ে অনীহা

শফিক সাফি   

১৭ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



হামলা-মামলার ভয়ে অনীহা

উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি ও এর দুই জোটসঙ্গী ২০ দলীয় জোট এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অংশ নেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে এ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার পক্ষেই মত রয়েছে। আর ২০ দল ও ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের বেশির ভাগও অংশ না নেওয়ার মনোভাব পোষণ করছে। তবে জোটের একটি শরিক দল, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে না গেলে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারে বলেও দলটি জানিয়েছে।

বিএনপির তৃণমূলেও এ নির্বাচন নিয়ে খুব একটা আগ্রহ নেই। তাদের আশঙ্কা, নির্বাচনে গেলে নেতাকর্মীদের ওপর নতুন করে হামলা-মামলা বেড়ে যাবে। সংসদ নির্বাচন পুনরায় অনুষ্ঠানের যে দাবি তোলা হয়েছে, তা-ও দুর্বল হয়ে পড়বে।

বিএনপি ও এর জোট দুটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির সিনিয়র নেতারা শিগগিরই দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার  সঙ্গে কারাগারে দেখা করার চেষ্টা করছেন। সেখান থেকে একটি পরামর্শ আসতে পারে। সেই পরামর্শ নিয়ে ২০ দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। আর আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটি বসবে। বিকেলে ড. কামাল হোসেনের চেম্বার বা বাসায় এ বৈঠক হবে। সেখানে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেওয়া-না নেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে এখনই কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’ স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের পর ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশ্য তো পরিষ্কার। উপজেলা নির্বাচনে কী হবে, সেটা তো বোঝাই যায়। তাহলে সে নির্বাচনে অংশ নিলেই কী আর না নিলেই কী।

গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘আমরা আগের উপজেলা নির্বাচনগুলো তো দেখেছি। প্রথম দিকে যখন ক্ষমতাসীনরা হারতে ছিল তখন থেকেই সব কিছু জোর করে নিয়ে গেছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হবে, এতটুকু আশা এ সরকারের কাছ থেকে আমাদের করার কারণ নেই।’ উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকের পর জানা যাবে বলেও জানান তিনি।

সুব্রত আরো বলেন, ‘আমরা একটু আস্থা রেখেছিলাম বঙ্গবন্ধুকন্যার প্রতি। কিন্তু সে আস্থাটুকুও হারিয়ে গেছে। আমরা প্রতারণার শিকার হয়েছি। তিনি বলেছিলেন, এটা হবে, ওটা হবে, আমার অধীনে একটা নির্বাচন করে দেখেন, দেখিয়ে দেব। উনি এমন দেখান দেখিয়েছেন, আর কিছু বাকি নেই দেখানোর। তিনি বলেছিলেন, আমি বঙ্গবন্ধুর কন্যা, আমি ভোট চুরি করে নির্বাচিত হতে চাই না। তাঁর কথায় আমরা এতটুকু আস্থা রেখেছিলাম, সে আস্থাটুকু তো নষ্ট হয়ে গেল।’

সূত্রগুলো বলছে, গত মঙ্গলবার রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে উপজেলা নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষেই মত দিয়েছেন বেশির ভাগ নেতা। সে ক্ষেত্রে দলের কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে বিএনপির আপত্তি থাকবে না বলে নীতিনির্ধারকরা বৈঠকে জানান। তবে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের মতামত নেওয়ার কথা বলা হয়। পরে বৈঠকের বিষয়বস্তু নিয়ে কারাবন্দি চেয়ারপারসনের সঙ্গে আলোচনা করতে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দুজন সিনিয়র নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

বৈঠকে থাকা এক নেতা জানান, গত রবিবার পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে ৯ নম্বর বিশেষ জজ আদালতে নাইকো দুর্নীতি মামলার শুনানির সময় খালেদা জিয়ার সঙ্গে দলের মহাসচিব কিছুক্ষণ কথা বলেন। কী কথা হয়েছে, তা স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তুলে ধরেন মহাসচিব। তিনি জানান, চেয়ারপারসন দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে বলেছেন। পাশাপাশি যেকোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে বলেছেন।

সূত্রগুলো বলছে, ২০ দলীয় জোটের বেশির ভাগ নেতাও উপজেলা নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার পক্ষে। তাঁদের মতে, এই নির্বাচনে অংশ নেওয়া আর না নেওয়া একই কথা। বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জোটগতভাবে আমি এই নির্বাচনে অংশ গ্রহণের পক্ষে নই। কারণ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার অর্থই হচ্ছে প্রহসনে অংশ হওয়া। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে উপজেলাসহ স্থানীয় সব নির্বাচনে নাগরিক ব্যানারে বা স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনের পক্ষে।’

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পাটির (এলডিপি) সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমি এই সরকার বা নির্বাচন কমিশনের অধীনে উপজেলা কেন, কোনো নির্বাচনেই অংশগ্রহণ সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করি না। একাদশ জাতীয় সংসদের ২০ দিন পরও আমার নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলা আর নির্যাতন থামেনি। উপজেলা নির্বাচনে যাওয়া মানেই আবার নতুন করে হামলা-মামলা আর নির্যাতন। তাই আমি মনে করি, জোটগতভাবেও এই নির্বাচন আমাদের বয়কট করা উচিত।’

তবে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান বলেন, ‘আজ (গতকাল) আমাদের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে আমরা উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে ২০ দলীয় জোট যদি নির্বাচনে না যায়, সে ক্ষেত্রে আমরা বসে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করব।’

জাগপার সাধারণ সম্পাদক খন্দকার লুত্ফর রহমান বলেন, যে পদ্ধতিতে নির্বাচন এই সরকার করেছে সেটি বজায় থাকলে উপজেলা নির্বাচনে যাওয়া উচিত হবে না।

বিএনপির তৃণমূলে এই নির্বাচন নিয়ে খুব একটা আগ্রহ নেই। তাদেরও বক্তব্য, নির্বাচনে যাওয়া ঠিক হবে না। কারণ, নির্বাচনে গেলে নেতাকর্মীদের ওপর নতুন করে হামলা-মামলা বেড়ে যাবে। এ ছাড়া এই সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না গত কয়েকটি সিটি নির্বাচনসহ সদ্য শেষ হওয়া সংসদ নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে। ফলে নির্বাচনে গিয়ে যেমন জয়লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই, তেমনি সংসদ নির্বাচন পুনরায় অনুষ্ঠানের যে দাবি তোলা হয়েছে তা দুর্বল হয়ে পড়বে।

বিএনপির নির্বাহী কমিটির মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক ও কক্সবাজার জেলা সদর আসন থেকে এবারের সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া সাবেক সংসদ সদস্য লুত্ফর রহমান কাজল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো ধরনের নির্বাচনে যেতে আমি আগ্রহী নই।’ রাজবাড়ী জেলা বিএনপির সভাপতি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, ‘দলের হাইকমান্ড যে সিদ্ধান্ত দেবে আমরা তা বাস্তবায়ন করব। তবে একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাচনে কী ফলাফল হবে তা সবার কাছে অনুমেয়।’

মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহীদুল ইসলাম শহীদ মৃধা বলেন, ‘২০১৪ সালের আন্দোলনের আগে থেকেই স্থানীয় নেতাকর্মী মামলা-হামলায় নির্যাতিত; ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের আগে যা চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে। উপজেলার বেশির ভাগ নেতাকর্মীর নামেই মামলা আর মামলা। এলাকায় থাকতে পারছেন না তাঁরা। এই অবস্থায় উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা আসলে মাঠে থেকে প্রচার-প্রচারণা চালানো কষ্টকর হয়ে যাবে। এর পরও দল সিদ্ধান্ত নিলে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব মাঠে থেকে নির্বাচন করার জন্য।’

তবে বিএনপির উদারপন্থী একটি অংশের যুক্তি হচ্ছে, দলের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে যাওয়া উচিত। কারণ, সব জেলার অবস্থা এক নয়। কোনো কোনো জেলায় স্থানীয়ভাবে বিএনপি এত হামলা-মামলার পরও শক্তিশালী। গতবার পৌর নির্বাচনে এত জোরজবরদস্তির পরও হবিগঞ্জের পৌর নির্বাচনে জি কে গউছ জয়ী হয়ে এসেছেন। নির্বাচনে থাকলে সরকারের মুখোশ আরো বেশি করে উন্মোচিত হবে। নির্বাচনে না গেলে মাঠপর্যায়ে হতাশ হয়ে পড়া নেতাকর্মীরা অন্য দলে চলে যেতে পারে বলে অনেক নেতা শঙ্কা প্রকাশ করেন।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা