kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন

রোহিঙ্গা সমস্যা সহজে মিটবে না

রোহিঙ্গা সংকট

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১৫ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রোহিঙ্গা সমস্যা সহজে মিটবে না

ফাইল ছবি

রোহিঙ্গা সংকট সহজে সমাধান হবে না বলে মনে করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। গতকাল সোমবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ মনোভাব প্রকাশ করেন। কিছুটা হতাশার সুরে তিনি বলেন, ‘সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী ২০১৭ সালে জাতিসংঘে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আলোচনায় সেই প্রস্তাবের প্রতিফলন ঘটেনি।’

গত সপ্তাহে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া ড. মোমেন বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে।’ এই সংকট সমাধান না হলে পুরো অঞ্চলসহ বড় শক্তিগুলোর ক্ষতির আশঙ্কা করে তিনি ভারত, চীনসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করেন।

নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, পশ্চিমা শক্তিগুলোর সবাই আমাদের সমর্থন দিয়েছে এবং জানিয়েছে, তারা আমাদের সঙ্গে কাজ করবে।’

ড. মোমেন গত ৩০ ডিসেম্বর ভোটের দিন সন্ধ্যায় সিলেটে তাঁর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলারের সাক্ষাৎ ও আলাপচারিতার কথা উল্লেখ করে সাংবাদিকদের

বলেন, রাষ্ট্রদূত কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শন করেছিলেন। রাষ্ট্রদূতকে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কেমন লাগল?’ রাষ্ট্রদূত প্রথম কেন্দ্রটিতে দেখেছেন, অনেক পুরুষ ও মহিলা দাঁড়িয়ে শৃঙ্খলার সঙ্গে ভোট দিচ্ছে। এরপর বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে পৌনে ৪টার দিকে তিনি একটি কেন্দ্রে গিয়েছিলেন। তখন কোনো লোক ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত অত্যন্ত খুশি।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাপানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনবিষয়ক মন্ত্রী তোসিতমো মোতেগির চলমান ঢাকা সফর প্রসঙ্গে বলেন, ‘জাপানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনবিষয়ক মন্ত্রী ১০ সদস্যের দল নিয়ে এসেছেন। তাঁরা কিভাবে কাজ করবেন আমাদের বলবেন।’

বাংলাদেশের নতুন জয়যাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতেই জাপান একটি বড় দল পাঠিয়েছে বলে মন্ত্রী জানান। জাপানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনবিষয়ক মন্ত্রী আজ মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করবেন।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি অত্যন্ত জটিল একটি ইস্যু। এটি নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা করতে হবে এবং আমরা তা করব। প্রধানমন্ত্রী ২০১৭ সালে জাতিসংঘে পাঁচটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রস্তাবগুলো অত্যন্ত উত্তম। পরবর্তী সময়ে আমাদের আলোচনায় সেই প্রস্তাবগুলোর প্রতিফলন ঘটেনি।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চায়। নতুন কৌশল নিলে হয়তো সফল হওয়া যাবে। এটি আমাদের অগ্রাধিকারমূলক ইস্যু।’

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কি মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি অনুসরণ করেই হবে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমি এ মুহূর্তে বলতে পারব না। আমাকে আরো দেখতে হবে। আমি তো বাইরে ছিলাম। পুরোটা আমার দেখার সুযোগ হয়নি। ব্রিফিংও নেওয়ার সুযোগ হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, এ সমস্যা সহজে সমাধান হবে না। সে জন্য আমাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। তবে সুখের বিষয় যে মিয়ানমার সব সময় আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র এবং তারা বন্ধুত্বের প্রতিফলন যদি দেয়, তাহলে খুব খুশি হব।’

পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব আলোচনায় প্রতিফলন না হওয়া গাফিলতি, না ভুল—জানতে চাইলে ড. মোমেন বলেন, “না, বিভিন্ন লোক বিভিন্নভাবে চিন্তাভাবনা করে থাকে। আমি তখন একভাবে চিন্তাভাবনা করেছি। আমারটা খুব ‘স্ট্রেট ফরোয়ার্ড’ চিন্তাভাবনা। দেখা যাক।”

রোহিঙ্গা ইস্যুতে ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যে হতাশার সুর ছিল উল্লেখ করে সাংবাদিকরা জানতে চান, ওই হতাশা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, না পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়ে?

জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমার তো ধারণা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও তাদের দায়দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেনি। আমরা মানবতার জয়গান গেয়েছি, মহানুভবতা দেখিয়েছি। কিন্তু তাদের ‘রিহ্যাবিলিটেশন’ (পুনর্বাসন), দেশে ফেরত নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি গুরুদায়িত্ব আছে। আমার মনে হয়, এখনো সে রকম দায়িত্ব পালন করেনি। সুতরাং সেখানে হতাশার কিছুটা পরিচয় থাকতে পারে।”

ভারত থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে উল্লেখ করে সাংবাদিকরা এই সংকটে চীন ও ভারত ফ্যাক্টরের কথা তুলে ধরে প্রশ্ন করেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমরা কি একা হয়ে পড়ছি?’

জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুটি যদি জিইয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, এমনকি চীনেরও স্বার্থ বিঘ্নিত হবে।’ তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা যদি এখানে অনেক দিন পড়ে থাকে, তাহলে এখানে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে। অনিশ্চয়তা দেখা দিলে বিভিন্ন মহল এখানে প্রবেশের চেষ্টা করবে। তখন এই জায়গাটা সবার জন্য অমঙ্গল হয়ে পড়বে।

মন্ত্রী বলেন, ‘স্থিতিশীলতা থাকলে সবার উন্নয়ন হবে। কিন্তু বড় যারা আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদেরও উন্নয়ন হবে। তাই এটি বোধ হয় সবারই দায় হওয়া উচিত, এ অঞ্চলে যাতে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি না হয়।’

ড. মোমেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের রোহিঙ্গাসংকটের অর্থনৈতিক, সামাজিক, নিরাপত্তা প্রভাব সম্পর্কে সমীক্ষা চালাতে নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও সাংবাদিকদের জানান। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, জাতিসংঘের মহাসচিব এ বিষয়ে সরব হলেও নিজে কিছু করতে পারেন না। শক্তি আছে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর, বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের। তারা যদি কিছু না করে, তবে জাতিসংঘ মহাসচিবের তেমন কিছু করার শক্তি নেই। তিনি বিষয়টি যথার্থই তুলে ধরেছেন। কিন্তু সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আরো অগ্রসর হওয়া উচিত ছিল।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে চীনের যে অবস্থান ছিল, তা থেকে চীন অনেক দূর সরে এসেছে। রাশিয়ারও একই অবস্থা। ইতিবাচক হয়েছে। আমরা আলোচনা চালিয়ে গেলে ওদের আমাদের দলে আনতে পারব।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক বৈঠকের জন্য পররাষ্ট্রসচিবের আসন্ন ওয়াশিংটন সফর প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘সচিবের সফর সম্পর্কে আমি খুব একটা অবগত নই। শুনেছি, তিনি যাচ্ছেন আমাদের নির্বাচন সম্পর্কে ব্রিফিং দেওয়ার জন্য। এটি ঠিক, আমেরিকানরা আমাদের নির্বাচন গ্রহণ করেছে। সুতরাং এ নিয়ে বলা ঠিক কি না, আমি...।’

নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, “দুনিয়ার সব দেশেই নির্বাচনে ‘গ্যাপ’ থাকে, ‘উইকনেস’ থাকে। আমাদের নির্বাচন অনেক স্বচ্ছ। আমেরিকাতে, ২৩০ বছর হয়েছে, নির্বাচন হচ্ছে, তাতেও হয়। ভারতেও দেখেন। কোথাও যদি অনিয়ম হয়, তবে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, তারা এগুলো তদন্ত করে দেখবে।”

পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে প্রথমে কোন দেশে সফর করবেন জানতে চাইলে ড. মোমেন ভারতের আমন্ত্রণের কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রতিবেশী ভারতেই তাঁর প্রথম সফর হতে পারে। তবে তারিখ এখনো ঠিক হয়নি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সম্পৃক্ত করারও আগ্রহ প্রকাশ করেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা