kalerkantho

বিশেষ লেখা

বিকল্প নেই কম্পানিভিত্তিক বাসের

ড. এস এম সালেহ উদ্দিন

১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিকল্প নেই কম্পানিভিত্তিক বাসের

ঢাকার সড়ক ও পরিবহনে যে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে এর প্রধান কারণ হলো বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এটি টিকিয়ে রাখা হয়েছে ও হচ্ছে। তা থেকে বের না হলে পরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আসবে না। এ বিষয়টিকেই সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে। এটা হতে হবে অগ্রাধিকার। উড়াল সড়ক ও উড়াল সেতু করতে হচ্ছে। অনেক অর্থ ব্যয় হচ্ছে। বাসসেবা উন্নত করতে সে তুলনায় বেশি অর্থ লাগবে না। কিন্তু অতীতের কোনো সরকারের কাছ থেকে এ বিষয়ে গুরুত্ব প্রদর্শন করতে দেখা যায়নি। পরিকল্পনা ঝুলছিল আর আমরা কথা বলে চলেছিলাম। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রী উভয়েই এ বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন। আমরা এ জন্য ভীষণ খুশি।

ঢাকার সড়ক অবকাঠামো পাল্টে যাচ্ছে। এবার বাস সার্ভিস উন্নত করে এটিকে ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা বা এসটিপির সুপারিশের আলোকে বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। আমি এবার আশাবাদী। 

আমি বারবার বলেছি এবং এখনো বলছি, প্রথমত ঢাকার বাসসেবাকে উন্নত করতে হবে। কারণ হলো, বাসেই কম টাকা খরচ করে যাতায়াত করা যায়। বাসে চলতে দেরি হয় বলেই বিপদে পড়ে মানুষ এখন উবারসহ বিভিন্ন কম্পানির গাড়ির সেবা নিচ্ছে। মানুষ বাধ্য হয়ে প্রাইভেট কার কিনছে ঋণ নিয়ে। এসবের কোনো প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু রাস্তায় চলতে গিয়ে যানজটে এখন দম আটকে যাচ্ছে। মানুষ এ থেকে রেহাই চায়।

বিশ্বের বিভিন্ন মহানগরীতে বাস উন্নত করে ছোট গাড়ি নিরুৎসাহ করা হয়েছে ও হচ্ছে। আমরা বাসসেবাকে শৃঙ্খলায় না এনে উল্টো পথে চলেছি। ছোট গাড়ি বাড়িয়েছি বা এমন পরিবেশ তৈরি করেছি, যাতে মানুষ ছোট পরিবহন ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। তাতে করে বিশৃঙ্খলা বেড়ে চলেছে। যানজটে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। বাসের রেষারেষিতে যাত্রী ও পথচারীদের প্রাণ যাচ্ছে। এই প্রাণগুলো অমূল্য সম্পদ। তরুণরা, মেধাবীরা ঝরে যাচ্ছে ঢাকার সড়কে। শিশুরা পথ চলতে পারছে না নিরাপদে। বাসের চাকায় পিষ্ট হচ্ছে মায়ের চোখের সামনে সন্তান বা সন্তানের চোখের সামনে মা—এ দৃশ্য কল্পনা করাও পাপ। কিন্তু আমাদের তা শুনতে হচ্ছে, দেখতে হচ্ছে। সড়কে বাসের রেষারেষিতে যে প্রাণ যাচ্ছে তার প্রমাণ বারবার মিলছে। দুর্ঘটনার পর চালকরাই তা বলছে। প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে, প্রতিযোগিতা করে রাস্তায় বাসস্ট্যান্ডে না দাঁড়িয়ে যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা হচ্ছে। এর নেপথ্যে অব্যবস্থাপনা ও মুনাফা লাভের হীন মানসিকতাই দায়ী। মুনাফা লাভের জন্য অসুস্থতা নয়, বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা থাকা দরকার। সেটা বাস মালিকদের, পরিবহন নেতাদের বুঝতে হবে। আমরা পরিবহন নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছি। তারা বুঝতে শুরু করেছেন।

বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতার দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা হয়রান হয়ে গেছি। এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার। মেট্রো রেল, বিআরটি চালুর পরও আমাদের ঢাকায় কিন্তু বাস চলবে, বাস চলাচল কমবে না। কারণ বাসেই বেশি যাত্রী নিজের ইচ্ছেমতো স্টপেজে চলতে পারবে। বাসে স্বল্প ব্যয়ে, কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছা সম্ভব। এ জন্য বাস সার্ভিস বৃদ্ধি করার কোনো বিকল্প নেই। এটাকে সবার আগে গুরুত্ব দিতেই হবে। এখন বাস সার্ভিসে নানা ধরনের অরাজকতা চলছে। ভিন্ন কম্পানির পাশাপাশি একই কম্পানির বাসগুলোও নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তৈরি হচ্ছে নানা রকমের অরাজকতা। ট্রাফিক পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে।

শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের আগে থেকেই আমরা বাস সার্ভিস উন্নত করে কম্পানি ও রংভিত্তিক বাস চলাচল প্রবর্তন করতে কাজ করছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ বিষয়ে অনুমোদন দিয়েছেন। গত সেপ্টেম্বরে এ জন্য একটি মূল কমিটি হয়েছে, সাব কমিটিও হয়েছে। আমরা কাজ করছি। আশা করি, দুই বছরের মধ্যে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। বাস টার্মিনাল স্থানান্তর করতে হবে। নতুন বাস নামাতে হবে। একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে। নিয়ন্ত্রণ এলে শৃঙ্খলা আসবে।

লেখক : পরিবহন বিশেষজ্ঞ, সাবেক নির্বাহী পরিচালক ডিটিসিএ

মন্তব্য