kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

বিশেষ লেখা

গুরুত্ব দিতে হবে ঢাকার নৌপথে

ড. আইনুন নিশাত

১২ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গুরুত্ব দিতে হবে ঢাকার নৌপথে

জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে বাংলাদেশ যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, বিশ্বজুড়ে তা স্বীকৃত। জলবায়ু বিপর্যয়ের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) ও গ্লোবাল এনভায়রনমেন্টাল ফ্যাসিলিটিসহ (জিইএফ) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে অর্থ সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। ভবিষ্যতে আমরা একটু সজাগ হলে অর্থায়নপ্রক্রিয়া থেকে উপকৃত হতে পারব। সরকার সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে। আমার মতে, এ মন্ত্রণালয় বৈশ্বিক পর্যায়ে আলোচনায় বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করবে। কিন্তু পরিবেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সব মন্ত্রণালয়ের কাজের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ফেলবে। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে অর্থায়নে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দক্ষতার কিছু প্রশ্ন আছে। জলবায়ু বিপর্যয়ের প্রতিরোধ মোকাবেলায় প্রকল্প প্রণয়ন করতে হবে দক্ষতার সঙ্গে, যাতে কেউ কোনো প্রশ্ন তুলতে না পারে। এমন প্রত্যাশা রইল নতুন সরকারের প্রতি।

২০০৯ সালে সরকার বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় যে কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছিল তা সমগ্র বিশ্বে নন্দিত হয়েছিল। আমার আশা থাকবে, নতুন সরকার ওই কৌশলপত্রটিকে সঠিকভাবে বাস্তবায়নে জোর পদক্ষেপ নেবে।

ঢাকা শহর বায়ুদূষণের দিক থেকে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম শহরগুলোর একটি। বায়ুদূষণের এই মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। বায়ুদূষণ বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে জনজীবনে। এ জন্য দায়ী চারটি উৎস। প্রথমত ইটভাটা। সরকারের কাছে চাওয়া, ইটভাটাগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ধারণ করে দিয়ে তার ব্যবহার যেন নিশ্চিত করা হয়।

বায়ুদূষণের দ্বিতীয় কারণ হলো, পুরনো যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া। বাসে ওভারলোডিং বন্ধ হলে এর কিছুটা সমাধান হতে পারে।

তৃতীয় কারণ হলো, রাস্তার ধুলা। সকালবেলায় রাস্তা ঝাড়ু দেওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় বাতাসে ধূলিকণা ছড়ায়। যদি ঝাড়ু দেওয়ার আগে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা যেত তাহলে ধুলা কমে আসত।

বাতাসে ধূলিকণার আরেকটি উৎস নির্মাণকাজ। নির্মাণ সামগ্রী, বিশেষ করে বালু ঢেকে রাখতে হবে। শহরের বাতাস নির্মল করার জন্য বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় সরকার এরই মধ্যে যে প্রকল্প হাতে নিয়েছে তার বাস্তবায়ন দরকার।

আগামী পাঁচ বছর সরকার নৌপথে বিশেষ গুরুত্ব দেবে বলে আশা করি। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর মাধ্যমে বৃত্তাকার নৌপথ চালু করা যেতে পারে। টঙ্গী থেকে কোনো পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে নিতে চাইলে নৌপথে পানগাঁও অথবা চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে যেতে পারে। এটি বাস্তবায়ন করতে পারলে সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হবে।

আগামী দিনগুলোতে দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়বে। এটি হবে জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে। তাই জলবায়ু বিপর্যয়ে সরকার বিশেষ নজর দেবে বলে আশা রাখি। ২০০৯ সালে প্রণীত কৌশলপত্রের কথা আগেই বলেছি। বাংলাদেশের পক্ষে জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণ দূর করা সম্ভব নয়। এ দায়িত্ব উন্নত বিশ্বের। আমাদের প্রয়োজন বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঠেকানোর দিকে নজর দেওয়া। এ জন্য প্রয়োজন দুর্যোগ মোকাবেলায় নির্মিত সব অবকাঠামোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ।

বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, নদী দখল ও দূষণে যেসব আইন আছে সেসব আইনের বাস্তবায়ন চাই। এসব আইন বাস্তবায়নে সরকার যাতে কঠোর হয়, সে প্রত্যাশা থাকবে। ইশতেহার কতটুকু বাস্তবায়ন হলো, প্রতিবছর তার ওপর একটা প্রতিবেদন তৈরি করে তা প্রকাশ করতে পারে সরকার। এতে করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার একজন সিনিয়র সচিবকে পর্যালোচনার দায়িত্ব দিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে বলেছে। এখানে আনন্দের সঙ্গে বলতে চাই, এসডিজির ছয় নম্বর অভীষ্ট অর্জনের জন্য বৈশ্বিক কৌশলপত্র প্রণয়নে আমাদের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের কাছ থেকে বিশেষ দায়িত্ব পেয়েছেন। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ছয় নম্বর অভীষ্ট পানির সহজলভ্যতা ও পয়োনিষ্কাশনের ওপর বাড়তি নজর দিতে হবে। নিরাপদ খাবার পানির বিষয়টি দিনে দিনে আরো জটিল হবে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রকৃতি, জলাভূমি, বনভূমি রক্ষা করা। আমার বিশ্বাস, আওয়ামী লীগ সরকার সেটা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হবে। আমি মনে করি, প্রকৃতি সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরস্পরের সম্পূরক হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যক্ত করেছেন। কাজেই আমাদের উন্নয়নের পথ অতিক্রমন যেমন জোরালো হবে, তেমনি পরিবেশ সংরক্ষণ, মানোন্নয়ন, দূষণ রোধে ঘোষিত অঙ্গীকার সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হবে, এমনটা প্রত্যাশা করি।

 

লেখক : ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা