kalerkantho

বুধবার । ২১ আগস্ট ২০১৯। ৬ ভাদ্র ১৪২৬। ১৯ জিলহজ ১৪৪০

অর্জনে ভরা দেশ

আরিফুর রহমান

১০ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অর্জনে ভরা দেশ

উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা বেশ কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ তাবৎ দুনিয়ায় জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের আরো কয়েকটি ভালো খবর নতুন বছরের শুরুতে জানিয়েছে তারা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ী হয়ে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগও এই সুখবর নিয়ে সরকারে যাত্রা শুরু করছে। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নিয়ে বরাবর রক্ষণশীল হলেও বলেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতাকে পাশ কাটিয়ে এ বছর বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরেই থাকবে। গতকাল বুধবার প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা’ প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনে এবার পাকিস্তান, মিসর, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোকে ছাড়িয়ে যাবে বাংলাদেশ। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে বিশ্বের সামনে বাংলাদেশ এখন এক অনুকরণীয় দেশ বলে বিশ্বব্যাংকের আলাদা একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ৪৬ লাখ সৌরবিদ্যুতের প্যানেল বসানো হয়েছে। সৌরবিদ্যুতের আওতায় এসেছে দুই কোটি মানুষ। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় এক লাখ মানুষের। বিশ্বের সামনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকে অনন্য রেকর্ড বলছে বহুজাতিক সংস্থাটি। এক দিন আগে যুক্তরাজ্যভিত্তিক এক গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে, বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দুই ধাপ এগিয়ে এখন ৪১তম। ২০৩৩ সালে বাংলাদেশ ২৪তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে তালিকায় উঠে আসবে বলেও জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর)।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ কাটিয়ে বিশ্বের সামনে বাংলাদেশ এখন এক উন্নয়ন-বিস্ময়। স্বাধীনতার ৪৮ বছরে অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদসহ অনেক সূচকে এরই মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশ। নতুন বছরের শুরুতেই বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০১৯’ বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার ভূয়সী প্রশংসা করে বিশ্বের অন্য দেশগুলোকে এখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিংকে অপার সম্ভাবনার কথাও বলেছে সংস্থাটি। দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী ফ্রিল্যান্সিং পেশার মাধ্যমে বিশ্বদরবারে অনন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে বলেও বলছে বিশ্বব্যাংক। ফ্রিল্যান্সিং হলো কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে চাকরি না করে চুক্তিভিত্তিক কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির জন্য কাজ করা। প্রাইসওয়াটার হাউসকুপারস (পিডাব্লিউসি), ব্লুমবার্গ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বলছে, ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে এক অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশ।

বাংলাদেশের মধ্যে কি এমন সম্ভাবনা দেখছে তাবৎ দুনিয়া? দেশের বেশ কয়েকজন অর্থনীতিবিদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বললে তাঁরা জানান, প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই দেশের শক্তির উৎস হলো কর্মক্ষম মানুষ। যেটিকে বলা হয়, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যার বোনাসকাল। দেশে এখন মোট জনগোষ্ঠীর ৬৮ শতাংশ (১০ কোটি) কর্মক্ষম। বিশাল এই কর্মক্ষম মানুষকে কাজে লাগাতে পারলে দেশের চেহারা আমূল বদলে যাবে। কর্মক্ষম মানুষের এ সংখ্যার কারণেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা দেখছে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো। ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, সীমিত সম্পদের মধ্যেও দেশের মূল শক্তি কর্মক্ষম মানুষ। তা ছাড়া সামাজিক সূচকগুলোতেও বাংলাদেশের অর্জন অসাধারণ। তবে কিছু চ্যালেঞ্জর কথাও বলেন তিনি। জাহিদ হোসেন বলেন, কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা রইল, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এ ছাড়া প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শুধু পাসের হারের দিকে মনোযোগী না হয়ে গুণগত শিক্ষার দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা প্রাইসওয়াটারহাউস কুপারস (পিডাব্লিউসি) বলছে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৮তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। আর ২০৫০ সালে হবে বিশ্বের ২৩তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। সম্প্রতি এক গবেষণায় পিডাব্লিউসি বলেছে, ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে (পিপিপি) ২০৫০ সালে মাহাথির মোহাম্মদের মালয়েশিয়াকে ছাড়িয়ে যাবে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের সব শেষ তথ্য বলছে, জিডিপির প্রবৃদ্ধির ভিত্তিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৪৬তম অর্থনীতির দেশ। আর পিপিপির ভিত্তিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৪তম অর্থনীতির দেশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সাধারণত একটা দেশের অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী তা নির্ধারণ করা হয় দুটি উপায়ে। একটি হলো মোট দেশজ উত্পাদন বা জিডিপির আকারে। অন্যটি ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে। দুইভাবেই বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাবশালী দেশ হয়ে উঠছে বাংলাদেশ।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন, সরকারের ধারাবাহিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমান সরকার টানা দশ বছর দেশ পরিচালনা করেছে। আরো পাঁচ বছর দেশ পরিচালনা করতে যাচ্ছে। গত দশ বছরে নীতি কৌশলের কোনো পরিবর্তন হয়নি। সে কারণে বাংলাদেশকে নিয়ে সম্ভাবনা দেখছে বিভিন্ন সংস্থা। তিনি বলেন, যেকোনো দেশে বড় বড় প্রকল্প প্রবৃদ্ধির হারকে বাড়ায়। বিনিয়োগকেও উৎসাহিত করে। বাংলাদেশেও গত দশ বছরে পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, রূপপুরের মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। বর্তমান সরকার মেগা প্রকল্পের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এসব প্রকল্প মানুষকে আশাবাদী করে তুলেছে। আশিকুর রহমান মনে করেন, বর্তমান সরকার গত দশ বছরে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের কোনো সমস্যা নেই।

অর্থনীতির বাইরে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সামাজিক বিভিন্ন সূচকে এরই মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সব শেষ প্রতিবেদন বলছে, মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৯টি দেশের মধ্যে এখন ১৩৬তম। আর পাকিস্তানের অবস্থান আরো পেছনে ১৫০তম। অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার টানা দশ বছর সামাজিক খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। সামাজিক সুরক্ষার আওতায় দেড় শর মতো কর্মসূচি চলমান আছে সারা দেশে। এর সুফল পেয়েছে সাধারণ মানুষ। এ কারণে সামাজিক সূচকে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির এক অন্তর্নিহিত শক্তি আছে। কয়েক বছর ধরে এখানে ধারাবাহিকভাবে ৭ শতাংশের ওপর জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে। এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারলে বিভিন্ন সংস্থা যেসব পুর্বাভাস দিচ্ছে; তা অর্জন সম্ভব। তবে লম্বা সময় ধরে প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখা খুবই কঠিন কাজ। আমাদের কাঠামোগত সংস্কার আনতে হবে। বাণিজ্যনীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। আর্থিক খাতের সংস্কার করা জরুরি। আমাদের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। সেসব কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ অবশ্যই এক শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হিসেবে আবির্ভূত হবে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদন বলছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে উঠছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ব্লুমবার্গ বলেছে, বর্তমান সরকারের শেষ বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ ২০টি দেশের তালিকায় ঢুকবে। ওই বছর বিশ্ব অর্থনীতিতে ১০০ ভাগের মধ্যে এক ভাগ অবদান থাকবে বাংলাদেশের অর্থনীতির। অন্যদিকে এইচএসবিসি বলেছে, উন্নত, উন্নয়নশীল ও উদীয়মান ৭৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি হারে বাড়বে। প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোকে ছাড়িয়ে যাবে বাংলাদেশ।

লিঙ্গ সমতায় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ এখন শীর্ষে। এমন খবর এসেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সব শেষ প্রতিবেদনে। দ্য গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের  ১৪৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৮তম। শ্রীলঙ্কার অবস্থান ১০০তম। ভারতের অবস্থান ১০৮তম। আর পাকিস্তানের অবস্থান সবার নিচে।

 

মন্তব্য