kalerkantho

রংপুর-৩

এরশাদকে ছাপিয়ে ইভিএম

নওশাদ জামিল ও স্বপন চৌধুরী, রংপুর থেকে   

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এরশাদকে ছাপিয়ে ইভিএম

রংপুর শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে লাহিড়ীর হাট। সাধারণত গ্রাম-গঞ্জের হাট যেমন হয়, লাহিড়ীর হাটের আবহও তেমন। চারদিকে ধানি জমি আর মৌসুমি সবজির ক্ষেত। মাঝে চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে এ হাট। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে এ হাটে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কথা হয় বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে। চন্দনপাট ইউনিয়নের ঈশ্বরপুর গ্রামের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব আবদুর রহমান বললেন, ‘শুননো এবার বোলে মেশিনোত (ইভিএম) ভোট দেওয়া নাগবে। হামরা কেমন করি ভোট দেমো, কিছুই জানি না।’

কাশিপাড়া গ্রামের গৃহিণী লতা বেগম আট বছরের ছেলে সবুজকে নিয়ে এসেছিলেন বাজার করতে। তিনি বললেন, ‘এইবারও ভোটত খাড়া হইচে এরশাদ। উয়াকেই (এরশাদ) ভোট দেমো।’ ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এইটা ফির কী বাহে!’

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ধীরে ধীরে সরগরম হচ্ছে উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র রংপুর-৩ নির্বাচনী এলাকা।

রংপুর সিটি করপোরেশনের একাংশ ও সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসন। টানা চারবার এ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এবারও তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট থেকে লাঙল প্রতীকে প্রার্থী হয়েছেন। তবে এবার এরশাদকে ছাপিয়ে ভোটারদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ইভিএম। সারা দেশে যে ছয়টি আসনে ইভিএমে ভোট নেওয়া হবে তার মধ্যে রংপুর-৩ একটি। আসনটির ১৭৫টি কেন্দ্রের সবগুলোতেই ইভিএমে ভোটগ্রহণ হবে।

চন্দনপাট, মমিনপুর, হরিদেবপুর, সদ্যপুষ্করিণী, খলেয়া ইউনিয়ন ও সিটি করপোরেশন এলাকার নানা শ্রেণির মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইভিএম সম্পর্কে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া, রয়েছে ইতিবাচক-নেতিবাচক আলোচনা। কেউ কেউ অভিযোগের সুরে বলেছেন, নতুন পদ্ধতিতে ভোটদান সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়নি স্থানীয় নির্বাচন কমিশন।

রংপুর শহরে ঢুকতেই পড়ে মডার্ন মোড়। আশপাশে দাঁড়িয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল কলেজ, রংপুর ক্যাডেট কলেজসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মডার্ন মোড়ে কথা হয় কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থী সানোয়ার হোসেনের সঙ্গে। জাতীয় নির্বাচন ও রংপুরের রাজনীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বছর দশ আগেও রংপুর ছিল জাতীয় পার্টির দুর্গ। কিন্তু সেই দুর্গে ফাটল ধরেছে। লাঙল নিয়ে, এরশাদ নিয়ে মানুষের আগ্রহ এখন তলানিতে। গত দুই দশকে রংপুরের ভাগ্যোন্নয়নে তেমন কাজ করেননি এরশাদ। তার পরও রংপুর-৩ আসনে মানুষ নিরুপায় হয়েই এরশাদকে ভোট দেবে।’ ইভিএমে ভোটদান প্রসঙ্গে এ তরুণ বললেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে মনে করি ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটদান ইতিবাচক দিক। ভোট চুরি ও জালিয়াতির সম্ভাবনা কমে যাবে।’

রংপুর সদরের অনেকেই ইভিএমকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও কেউ কেউ আবার এ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। তাঁরা বলছেন, এখানকার অধিকাংশ ভোটারই গ্রামের বাসিন্দা। অনেকটা পিছিয়ে পড়া এ এলাকার ভোটাররা ব্যালটেই ঠিকমতো ভোট দিতে পারেন না। আর ইভিএমের ব্যবহার সম্পর্কে মোটেও ধারণা নেই তাঁদের।

রংপুরের নাট্যকর্মী রাজ্জাক মুরাদ বলেন, ‘ইভিএম প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় ভালো। তবে আসনের অধিকাংশ ভোটারই গ্রামের বাসিন্দা। তারা এখনো অনেকে ইভিএম পদ্ধতি সম্পর্কে কিছুই জানে না। সে কারণে এখানে ইভিএম পদ্ধতির নেতিবাচক দিকই বেশি। তাই এ আসনে ইভিএম পদ্ধতি কতটা কার্যকর হবে তা এখনো বোঝা যাচ্ছে না।’

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রংপুর-৩ আসনে মোট ভোটার চার লাখ ৪২ হাজার ১৪৯ জন। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি মানুষের অক্ষরজ্ঞান নেই। পিছিয়ে পড়া এ অঞ্চলের মানুষকে ইভিএম সম্পর্কে জানাতে তেমন কোনো কর্মসূচি নেই নির্বাচন কমিশনের। শহরাঞ্চলের মানুষ এ সম্পর্কে জানলেও অধিকাংশ মানুষ রয়েছে অন্ধকারে। ফলে ইভিএম সম্পর্কে তাদের যেমন রয়েছে কৌতূহল, তেমনই আছে তর্ক-বিতর্ক।

রংপুর সদরের নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার হয়েছে। সে ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও এ পদ্ধতি সম্পর্কে ভোটারদের ধারণা জন্মেছে। সাধারণ ভোটাররা এর ব্যবহারে অভ্যস্ত নয় তা স্বীকার করি। কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি এ পদ্ধতি সম্পর্কে মানুষকে জানাতে। নির্বাচনের আগেই বিভিন্ন ওয়ার্ডে ও ভোটকেন্দ্রে ইভিএম প্রদর্শনী করছি, মানুষকে জানাচ্ছি।’

রংপুর-৩ আসনে এরশাদ দীর্ঘদিন ধরে সংসদ সদস্য থাকলেও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা না থাকায় এবং মানুষের খোঁজখবর না নেওয়ায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। তবুও নির্বাচনে নিরুপায় হয়ে তাঁকে ভোট দেবে রংপুরবাসী। কেননা এরশাদের বিপরীতে এ আসনে তেমন শক্তিশালী কোনো প্রার্থী নেই। আওয়ামী লীগের অবস্থান শক্ত হলেও, এখানে বিএনপি-জামায়াতের তেমন অবস্থান নেই। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট রংপুর-৩ আসনে প্রার্থী দিয়েছে রিটা রহমানকে। কিন্তু তাঁর নামই জানে না অনেক ভোটার। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ২০০১ সালের পর থেকে মহাজোটের খাতিরে কোনো প্রার্থী দেয়নি। ফলে একচেটিয়াভাবে আসনটি রয়েছে এরশাদেরই দখলে। এবারও তাঁর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

রংপুর সদর উপজেলা মহিলা লীগের সভাপতি আরজিনা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান সরকারের আমলে সারা দেশের সঙ্গে রংপুরেও উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু সরকারদলীয় নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় অন্যান্য এলাকার তুলনায় রংপুর অনেকদূর পিছিয়ে আছে।’

চন্দনপাট ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মো. আজাহারুল ইসলাম বলেন, ‘রংপুর সদর আসনে এরশাদের শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলে তাঁর আসন নড়ে যেত। প্রত্যাশা করেছিলাম আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী দেওয়া হবে। কিন্তু এবারও তা হয়নি। ফলে বাধ্য হয়েই আমরা এরশাদকে ভোট দেব।’

রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসির বলেন, ‘রংপুরে মহাজোটের সব নেতাকর্মী এরশাদের জন্য কাজ করছেন। অসুস্থ থাকায় এরশাদ সাহেব রংপুর আসতে পারছেন না, তার পরও রংপুরবাসীর হৃদয়ে তিনি আছেন। আশা করি, তিনি টানা পঞ্চমবারের মতো জয়ী হবেন।’

মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিউর রহমান সফি বলেন, ‘এরশাদ যেহেতু মহাজোটের প্রার্থী, দলের সিদ্ধান্তে আমরা তাঁর জন্যই প্রচারণা চালাচ্ছি। কিন্তু আমরা খুব আশা করেছিলাম, এবার মহাজোট থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দেওয়া হবে।’

এই আসনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ন্যাশনাল পিপলস পার্টি অব বাংলাদেশের (এনপিপি) চেয়ারম্যান রিটা রহমান। তাঁর মনোনয়ন নিয়ে স্থানীয় বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর মাঝে দেখা গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। নির্বাচনী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রিটা রহমানের পক্ষে তেমন কোনো প্রচার-প্রচারণাও নেই।

কিন্তু রিটা রহমান সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার মনোনয়ন প্রাপ্তিতে রংপুরবাসী অত্যন্ত আনন্দিত। আমার বাবা মশিউর রহমান যাদু মিয়া রংপুরবাসীর জন্য অনেক কাজ করেছেন, আমিও মানুষের সেবা করতে চাই।’

 

মন্তব্য