kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

স্বাধীনতার শত্রুদের উচিত জবাব নৌকায় ভোট

প্রথম নির্বাচনী জনসভায় শেখ হাসিনা

তৈমুর ফারুক তুষার, প্রসূন মণ্ডল ও মিজানুর রহমান বুলু কোটালীপাড়া থেকে   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



স্বাধীনতার শত্রুদের উচিত জবাব নৌকায় ভোট

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় গতকাল জনসভা মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ছবি : বাসস

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচন আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছি। জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচার করেছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাদের সাজা হয়েছে তাদের দোসরদের নির্বাচনে প্রার্থী করেছে, তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী, স্বাধীনতার শত্রু,

গণহত্যা পরিচালনাকারী, অগ্নিসন্ত্রাসকারী, মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করে যারা নির্বাচনের মাঠে নেমেছে, তাদের উপযুক্ত জবাব দিতে হবে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে।’

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গতকাল বুধবার বিকেলে তাঁর নির্বাচনী এলাকা গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় এক জনসভায় এসব কথা বলেন। কোটালীপাড়া শেখ লুত্ফর রহমান আদর্শ কলেজ মাঠে জনসভা হয়।

আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনা গতকাল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে দলের আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম শুরু করেন। বিকেল সোয়া ৪টার দিকে তিনি কোটালীপাড়ায় জনসভাস্থলে যান।

প্রায় আধাঘণ্টার বক্তৃতায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বিগত ১০ বছরে তাঁর সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরেন। সারা দেশে যেখানে যাকে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী করা হয়েছে তাদের বিজয়ী করে আবারও আওয়ামী লীগকে জনগণের সেবা করার সুযোগ দিতে অনুরোধ জানান তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজকে জাতির পিতার মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে কোটালীপাড়া থেকে নির্বাচনী যাত্রা শুরু করলাম। কারণ আপনারাই আমাদের আশ্রয় দিয়েছেন, আমার দায়িত্ব নিয়েছেন। মা-বাবা হারিয়ে আমি আপনাদের মাধ্যমেই আমার আপনজন খুঁজে পেয়েছি। বারবার আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন। আমি দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছি। দেশ সেবার সুযোগ পেয়েছি। আমি আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ। সব প্রার্থীই নিজ নিজ এলাকায় থেকে কাজ করে। আমি আপনাদের সময় দিতে পারিনি। সমস্ত বাংলাদেশের ৩০০ আসন আমাকে দেখতে হয়। আমি আপনাদের কাছে দায়িত্ব দিয়ে গেলাম। আপনারা আমার আপনজন হিসেবে ঘরে ঘরে গিয়ে নৌকায় ভোট চাইবেন। আবারও নির্বাচিত করবেন।’

জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় কোটালীপাড়ায় তাঁকে হত্যার জন্য পুঁতে রাখা ৭৬ কেজি ওজনের বোমার কথাও স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এ কোটালীপাড়ার মানুষই বোমা পুঁতেছিল, আর যেই কিশোর চা দোকানদার এ বোমা আবিষ্কার করেছিল, সে-ও কোটালীপাড়ার। আমি নিশ্চিত এ জনসভার কোথাও না কোথাও সে উপস্থিত আছে। আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘কোটালীপাড়ার মাধ্যমে সারা দেশের মানুষকে আমরা আহ্বান জানাব—২০২১ সালে আমরা যখন স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করব সেই সময় যেন ওই স্বাধীনতাবিরোধী, অগ্নিসন্ত্রাসকারী, খুনি, রাজাকার তারা যেন ক্ষমতায় না থাকে। তাহলে তারা দেশকে ধ্বংস করে দেবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে দেবে। আবার এ দেশ ক্ষুধার্ত হবে, অশিক্ষিত হবে, মানুষের ভাগ্য বিপর্যয় ঘটবে। এ দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে যেন আর তারা ছিনিমিনি খেলতে না পারে সে জন্য নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে মানুষের সেবা করার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘যেহেতু এটা আমাদের প্রথম নির্বাচনী সভা, সুতরাং এই সভা থেকে আমি সমগ্র দেশবাসীর প্রতি এই আবেদন জানাই যে আমি নৌকা মার্কায় ভোট চাই, জনগণের সেবা করতে চাই। দেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চাই। কাজেই আমি সকলের সাহায্য চাই, দোয়া চাই।’

আগামী দিনে সরকার গঠন করলে নিজের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার গ্রাম আমার শহর হিসেবে গড়ে উঠবে। প্রতিটি ঘর হবে আলোকিত। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হবে। প্রতিটি জেলায় একটি স্কুল ও একটি করে কলেজ সরকারি করা হয়েছে। অবহেলিত কওমি মাদরাসার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণে রেখেছি।’

কারো কাছে মাথা নত না করার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। মর্যাদাপূর্ণ দেশ নিয়ে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী, জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালন করব। একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না, কেউ না খেয়ে থাকবে না। এটাই আমার লক্ষ্য। আমার চাওয়া জাতির জনকের সোনার বাংলা গড়ে তোলা।’

জনসভায় বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানাকে উপস্থিত জনগণের উদ্দেশে কিছু বলার জন্য স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বারবার অনুরোধ জানালেও তিনি বক্তব্য দেননি।

জনসভায় সভাপতিত্ব করেন কোটালীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুভাষ চন্দ্র জয়ধর। বক্তব্য দেন দলের কেন্দ্রীয় নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মুহম্মদ ফারুক খান, কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি চৌধুরী এমদাদুল হক, সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলী খান, কোটালীপাড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার, কোটালীপাড়ার পৌর মেয়র কামাল হোসেন শেখ, কোটালীপাড়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বিমল কৃষ্ণ বিশ্বাস, সাবেক পৌর মেয়র অহিদুল ইসলাম হাজরা প্রমুখ।

বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরুর আগে টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারত এবং তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনায় মোনাজাত ও দোয়ায় শামিল হন। বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা, বঙ্গবন্ধুর ভাইয়ের ছেলে শেখ হেলাল, শেখ জুয়েল, ভাগিনা শেখ ফজলুল করিম সেলিমসহ পরিবারের সদস্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। আরো উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আবদুর রহমান, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, সুজিত রায় নন্দী, আফজাল হোসেন, শাম্মী আহমেদ প্রমুখ।

এর আগে সকাল ৮টার কিছু পরে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে সড়কপথে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশে রওনা হন শেখ হাসিনা। দুপুর ২টা ৫ মিনিটের দিকে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধে পৌঁছেন তিনি। সেখানে মধ্যাহ্নভোজ সেরে কোটালীপাড়ায় নিজ নির্বাচনী এলাকায় জনসভায় অংশ নিতে রওনা হন শেখ হাসিনা।

নৌকায় ভোট চাইলেন রিয়াজ ও ফেরদৌস

কোটালীপাড়ার জনসভায় জনপ্রিয় দুই চলচ্চিত্র অভিনেতা রিয়াজ ও ফেরদৌস নৌকার পক্ষে ভোট চেয়েছেন। এ সময়ে তাঁদের পরনে ছিল সাদা পাঞ্জাবি ও মুজিব কোট।

রিয়াজ বলেন, ‘আমার অভিনয় দিয়ে যদি আপনাদের বিন্দুমাত্র আনন্দ দিয়ে থাকি তবে ৩০ তারিখ নৌকা প্রতীকে ভোট দেবেন।’

ফেরদৌস বলেন, ‘গত ২০ বছরে আমাকে যদি ভালোবেসে থাকেন তবে নৌকায় ভোট দেবেন। এবারের নির্বাচন আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার নির্বাচন।’

কোটালীপাড়ায় মানুষের ঢল

কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার নির্বাচনী জনসভায় বিপুল মানুষের ঢল নামে। জনসভা শুরুর নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই জনসভাস্থল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। শেখ লুৎফর রহমান আদর্শ কলেজ মাঠ পরিপূর্ণ হয়ে আশপাশের রাস্তাগুলোতেও মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। মাঠে উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে একটি বড় অংশই ছিল নারী।

পথে পথে নেতাকর্মীদের ঢল

মাওয়া হয়ে সড়কপথে টুঙ্গিপাড়ায় শেখ হাসিনার যাত্রাপথে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঢল নামে। তারা দলীয় প্রধানকে দেখার জন্য রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের হাতে ছিল নৌকা ও দলীয় সভাপতির ছবি। আওয়ামী লীগপ্রধান এ সময় গাড়ির ভেতর থেকে নেতাকর্মীদের হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। আমাদের শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি জানান, কাঁঠালবাড়ী ঘাট এলাকায় দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানিয়েছে।

আজ ফরিদপুর ও ধামরাইয়ে নির্বাচনী জনসভা

আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর জানান, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আজ বৃহস্পতিবার ফরিদপুর-৩ আসনে নির্বাচনী জনসভা করবেন। এ আসনে দলের মনোনীত প্রার্থী হলেন ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন। সকাল ১১টায় ফরিদপুর সদর উপজেলার কোমরপুরে আব্দুল আজিজ ইনস্টিটিউশন মাঠে এই জনসভা হবে।

ধামরাই (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, আজ দুপুর ২টায় উপজেলার হার্ডিঞ্জ সরকারি স্কুল ও কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভা করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এ আসনে দলের প্রার্থী হলেন বেনজীর আহমদ।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি জানান, ঢাকায় ফেরার পথে আজ গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ফেরিঘাট টার্মিনালে আওয়ামী লীগের পথসভায় বক্তব্য দেবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। রাজবাড়ী-১ (সদর ও গোয়ালন্দ) আসনে দলের প্রার্থী কাজী কেরামত আলী।

 

 

মন্তব্য