kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

মনের বাঘে না খেলে ফেভারিট বাংলাদেশই

নোমান মোহাম্মদ   

৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মনের বাঘে না খেলে ফেভারিট বাংলাদেশই

‘ফরম্যাট যত ছোট, ওয়েস্ট ইন্ডিজ তত ভয়ংকর দল।’

‘ওদের কয়েকজন ক্রিকেটার আছে, যারা নিজেদের দিনে একাই ম্যাচ জেতাতে পারে।’

‘টেস্টের ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ওয়ানডের ওয়েস্ট ইন্ডিজকে মেলানোটা বোকামি।’

‘সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ক্যারিবিয়ানদের গোনায় ধরে না, বিশ্বের এমন কোনো দেশ নেই।’

এসব শোনার জন্য কান পাততে হয় না। হাওয়ার এ ফিসফিসানি তো কোলাহলে রূপ নিয়েছে টেস্ট সিরিজ শেষের পর থেকে। আজ থেকে শুরু হওয়া বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের আবহেও ভীষণ চড়া সে স্লোগান। কাল সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার কথায়ও ঘুরেফিরে আসে তা। কিন্তু সত্যি কি ওয়ানডেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অমন প্রবল প্রতিপক্ষ? নাকি তাতে মিশে আছে অতিশয়োক্তি?

রেকর্ডের ভোট কিন্তু পরের বাক্সেই।

২০১৪ সালের আগস্টে নিজে দেশের ওয়ানডে সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩-০ ব্যবধানে হারায় বাংলাদেশকে। পরের চার বছরে ১২টি দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলে দুই দলই। যেখানে একটিতেও সিরিজ জেতেনি ক্যারিবিয়ানরা। আর ১২-র মধ্যে আট সিরিজেই বিজয়ের হাসি বাংলাদেশের। জিম্বাবুয়েকে হারায় তিন সিরিজে; একবার করে পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, আফগানিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। গত বছর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ থাকে অমীমাংসিত। এ সময়কালে বাংলাদেশের ওয়ানডে সিরিজ হার শুধু ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে। অন্যদিকে নিজেদের দ্বাদশের একাদশেই পরাজয়ের কলঙ্ক ওয়েস্ট ইন্ডিজের। গেল বছর আফগানিস্তানের সঙ্গে সিরিজটি হারেনি শুধু; দুদল একটি করে ম্যাচ জেতার পর তৃতীয় খেলাটি বৃষ্টিতে যায় ভেসে বলেই হয়তো রক্ষা। বাদবাকি ১১ দ্বিপক্ষীয় ওয়ানডে সিরিজেই ক্যারিবিয়ানদের হার। ভারতের কাছে তিনবার, পাকিস্তান ও ইংল্যান্ডের কাছে দুইবার করে এবং একবার করে দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, নিউজিল্যান্ড, বাংলাদেশের কাছে। আর মাস কয়েক আগে বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজের সর্বশেষ মুখোমুখিতেও ওয়ানডে সিরিজ জয় লাল-সবুজের।

তাহলে? ওয়েস্ট ইন্ডিজের সীমিত ওভারের সামর্থ্যের আগুনে অহেতুক বাতাসই কি দেওয়া হচ্ছে না!

তবু নিজেদের ফেভারিট মানতে রাজি নন মাশরাফি বিন মর্তুজা। ওয়ানডে সিরিজে সম্ভাবনার নিক্তিতে বরং দুই দলকে একই সমতায় রাখেন বাংলাদেশ অধিনায়ক, ‘আমার কাছে দুই দল সমান ফেভারিট। কারণ ওদের কিছু ব্যাপার আছে। দুর্দান্ত একজন ফাস্ট বোলার আছে, তার সামনে পড়ে ইনিংসের শুরুতে হুটহাট উইকেট পড়ে যাওয়া নিয়ে ভাবতে হবে। ওদের ব্যাটসম্যানদের শক্তির কথা মাথায় রাখতে হবে, এ ধরনের ফরম্যাটে যা খুব কার্যকর। আসলে এমনি এমনি তো জেতা সম্ভব না। প্রস্তুতি থাকতে হবে পুরোপুরি, সঙ্গে মাঠে শতভাগ বাস্তবায়ন। আমি মোটেই আশা করছি না, টেস্ট সিরিজের মতো কিংবা আগের কিছু সিরিজের মতো খুব সহজে আমরা এ সিরিজ জিতব।’ প্রতিপক্ষের প্রতি যখন এত সমীহ, তখন তো আর সিরিজ শুরুর আগে ওঠা হোয়াইটওয়াশ রবে সায় দিতে পারেন না মাশরাফি, ‘প্রথম ম্যাচ শুরুর আগেই হোয়াইটওয়াশের চিন্তা মাথায় আনার সুযোগ নেই। এখন তিন ম্যাচ নিয়ে ভাবলে অনেক চাপ আসে। প্রথম ম্যাচই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দেখা যাক, তাতে কেমন করতে পারি। পরেরটা পরে ভাবা যাবে।’ সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ভয়ংকর দল বলে যে ‘প্রচারণা’, তাতে অবশ্য অনুমোদন আছে তাঁর, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানদের শক্তির দিক অনেক বেশি। এই ফরম্যাটে এক-দুজন ম্যাচের ফল পরিবর্তন করে দেওয়ার ঘটনা দেখেছি। ওদের কয়েকজন ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে। এসব দিকে খেয়াল রাখা দরকার।’

এমনিতে টেস্টের চেয়ে ওয়ানডেতে বাংলাদেশ ভালো দল। দীর্ঘ পরিসরের ফরম্যাটে যখন ক্যারিবিয়ানদের হারাতে পেরেছে স্বাগতিকরা, ৫০ ওভারের ক্রিকেটে তাহলে আশার প্রজাপতি উড়বে না কেন? তার ওপর এ সিরিজ দিয়ে ওয়ানডেতে প্রত্যাবর্তন হচ্ছে দুই মহাতারকা তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসানের। তাতে আত্মবিশ্বাসের প্রখর তেজময়তা মাশরাফির কণ্ঠে, ‘অবশ্যই সাকিব-তামিমের ফেরা আমাদের জন্য বিরাট ব্যাপার। আড়াই মাস পর ইনজুরি থেকে ফিরে প্রস্তুতি ম্যাচে তামিম ভালো খেলেছে। এটি ওর জন্য স্বস্তি, আমাদের জন্যও। তবু ওর মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় হয়তো লাগবে। দুটি টেস্ট খেলায় এদিক দিয়ে সাকিব ভালো অবস্থানে। এ দুজনের ফেরা আমাদের জন্য সত্যি খুব দারুণ।’

কম দারুণ নয় টপ অর্ডারের ব্যাটসম্যানদের স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা। তামিমের ইনজুরি থেকে ফেরা মানেই তো একাদশে ফেরা। সঙ্গে ইমরুল কায়েস, লিটন দাশ, সৌম্য সরকারের প্রত্যেকে নিজেদের দাবি জানিয়ে রেখেছেন। এ বছরের শুরু থেকে তিনে খেলা সাকিবও ওই পজিশনে সফল। টিম ম্যানেজমেন্টকে তাই ‘মধুর সমস্যা’য় ফেলেছেন তাঁরা। অধিনায়ক মাশরাফি দলের প্রয়োজনকে রাখতে চান সবার আগে, ‘আমরা ১৬ সদস্যের স্কোয়াড করেছি যেন কারো আত্মবিশ্বাসে প্রভাব না পড়ে। বিশ্বকাপ পর্যন্ত মাথায় রেখেই এটি করা হয়েছে। তবু একাদশ নিয়ে একটা সিদ্ধান্ত তো নিতেই হবে। তা কাজে লেগে গেলে মনে হবে, এটাই ঠিক আছে। নইলে মনে হবে, রান করেও যে বাদ পড়েছে, হয়তো ওকে খেলালে ভালো হতো। একাদশ থেকে যে বাদ পড়বে, তার সঙ্গে আলাদা করে বসার কিছু নেই। ওপেনিংয়ে লিটনকে খেলালে ইমরুলের বুঝতে হবে, ডানহাতি-বাঁহাতি কম্বিনেশনের ব্যাপার। ইমরুলকে খেলালে লিটনের বুঝতে হবে ফর্মের ব্যাপার। তার মানে এই না, যে বাদ পড়বে তাকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে।’

বাংলাদেশের ‘মধুর সমস্যা’র বিপরীতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের শুধুই ‘সমস্যা’। দল যে ভালো করতে পারছে না অনেক দিন। তবু ক্যারিবিয়ান অধিনায়ক রোভম্যান পাওয়েল ওয়ানডে সিরিজের আগে আশায় বুক বাঁধেন, ‘ভারতেও তো আমরা কিছু ম্যাচ খেলেছি। দলের সমন্বয় গড়ে উঠছে তাই। এখন নিশ্চিত করতে হবে, যেন সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে প্রথম ওয়ানডেতে মাঠে নামতে পারি। যদি নিজেদের সেরা ক্রিকেট খেলতে পারি তাহলে জানি যে, আমরাই জিতব।’ তাঁর আশায় কিছুটা বাড়াবাড়ি কি নেই? যদি বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ নিজেদের সেরা ক্রিকেট খেলে, তাহলে? জয়ের পাল্লা কিন্তু হেলে থাকবে মাশরাফির দলের দিকেই।

বরাবরের মতো মিরপুরের উইকেটের কুহেলিকা থাকছে, এ সময়ের সন্ধ্যার ‘ডিউ ফ্যাক্টরের’ প্রহেলিকাও। কিন্তু এসব ছাপিয়ে আজ থেকে শুরু হওয়া সিরিজের আগে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসই থাকার কথা বেশি। আর ওয়ানডের ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নিয়ে ‘মনের বাঘ’ দূর করার জন্য গেল চার বছরের পরিসংখ্যানে চোখ বোলালেই তো হয়!

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা