kalerkantho

শনিবার । ১৮ জানুয়ারি ২০২০। ৪ মাঘ ১৪২৬। ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

নয়াপল্টন রণক্ষেত্র

তিন মামলা আটক ৬০ রিমান্ডে ২৯

হামলাকারীরা বিএনপির নেতাকর্মী : ডিএমপি কমিশনার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



তিন মামলা আটক ৬০ রিমান্ডে ২৯

রাজধানীর নয়াপল্টনে পুলিশের সঙ্গে বিএনপির কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনায় পল্টন মডেল থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। আসামির সংখ্যা ৪৮৮। এর মধ্যে আছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহম্মেদ, সিনিয়র যুগ্ম সচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, যাত্রাবাড়ী থানা বিএনপির সভাপতি মো. নবী উল্লাহ নবী, ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কফিল উদ্দিন প্রমুখ।

ঘটনার সময় ৬০ জনকে আটক করে পুলিশ। গতকাল সন্ধ্যায় ৫৬ জনকে তিন মামলায় ভিন্ন ভিন্ন দিনের রিমান্ডের আবেদন করে আদালতে পাঠানো হয়। শুনানি শেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সরাফুজ্জামান আনসারী ২৯ আসামির পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ২৭ জনকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন নামঞ্জুর করে কারাফটকে (জেলগেট) জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন।

গতকাল দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘নয়াপল্টনে সংঘর্ষের মধ্যে পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগে জড়িত বেশির ভাগকেই শনাক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন সোর্সের মাধ্যমে আমরা অনেকের পরিচয় পেয়েছি এবং তাদের শনাক্ত করতে পেরেছি। তারা সবাই বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী।’

ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘যিনি আগুন দিয়েছেন তাঁকে ফুটেজে পরিষ্কার দেখা গেছে। গাড়ির ওপরে দাঁড়িয়ে তাণ্ডব যারা করেছে তাদের দেখা যাচ্ছে। বুকের কাপড় খুলে লম্বা লাঠি দিয়ে যে তাণ্ডবনৃত্য আমরা দেখেছি, সেটাও মিডিয়ার সুবাদে দেশবাসী দেখেছে। এই হামলা পূর্বপরিকল্পিত বলে মনে করি আমরা। হামলায় পাঁচজন অফিসারসহ মোট ২৩ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। যাঁরা এই মুহূর্তে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। লাঠি দিয়ে, বাঁশ দিয়ে পেটানো হয়েছে। ইট-পাটকেল ছুড়ে পেটানো হয়েছে।’ ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি যারা আছে তাদের শনাক্ত করার কাজ অব্যাহত রেখেছি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বল প্রয়োগে যাইনি। বল প্রয়োগে গেলে নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট হবে। পুলিশকে শুধু মারা না, হামলা বড় ধরনের অঘটন ঘটানোর একট পূর্বপরিকল্পনা ছিল বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে।’

পুলিশ সূত্র জানায়, তাদের গাড়িতে হামলার ভিডিও ফুটেজ থেকে গতকাল পর্যন্ত একজনকে শনাক্ত করতে পেরেছে পুলিশ। তার নাম খন্দকার শাহ জালাল কবির। তিনি পল্টন থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক। ভিডিওতে দেখা যায়, কবির দিয়াশলাই দিয়ে গাড়িতে আগুন দিচ্ছেন। পুলিশের মতিঝিল জোনের সহকারী কমিশনার মিশু বিশ্বাস সাংবাদিকদের বলেন, ‘কবিরকে গ্রেপ্তার করতে পল্টন এলাকায় তার বাসায় অভিযান চালানো হয়েছে। পাওয়া যায়নি।’ তিনি আরো বলেন, ‘হেলমেট পরা যে গাড়িতে লাফাচ্ছে তার পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি। তবে গাড়ি ঘিরে যারা উল্লাস করেছে তাদের অধিকাংশের পরিচয় মিলেছে। অন্তত ১০ জনের পরিচয় সম্পর্কে আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছি। গোয়েন্দা পুলিশ ছাড়াও থানার পুলিশ তাদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশের কর্তব্য কাজে বাধা, গাড়ি ভাঙচুর, গাড়ি পোড়ানো, পুলিশকে হত্যাচেষ্টা, ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নাশকতা সৃষ্টি করার অভিযোগে তিনটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলার বাদী হয়েছেন যথাক্রমে পল্টন থানার সাব-ইন্সপেক্টর মো. আল আমিন, সাব-ইন্সপেক্টর শাহীন বাদশা ও সোমেন কুমার বড়ুয়া। গতকালই মামলা তিনটি ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে লেখা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশন কর্তৃক জারি করা নির্বাচনী আচরণবিধিতে ব্যান্ড পার্টি, ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে শোডাউন করায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রথমে বিএনপি নেত্রী আফরোজা আব্বাসের  নেতৃত্বে একটি মিছিল ফকিরাপুলের দিক থেকে ব্যান্ড পার্টি, ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে শোডাউন করে নয়াপল্টনের বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসে। এরপর নবী উল্লাহ নবী ও কফিল উদ্দিনের নেতৃত্বে দুটি মিছিল শোডাউন করে ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে একই দিক থেকে আসতে থাকে। সর্বশেষ মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে আট হাজার থেকে ১০ হাজার জনের একটি মিছিল ব্যান্ড পার্টিসহ ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে শোডাউন করে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসে।’

এজাহারে বলা হয়, ভিআইপি রোড বন্ধ করে মিছিল ও শোডাউন করা হচ্ছিল। পুলিশ রাস্তার এক লেন ছেড়ে দিতে বললে তারা পুলিশের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়। তখন তাদের নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি বিএনপি অফিসে অবস্থানরত রুহুল কবীর রিজভীসহ সিনিয়র নেতাদের জানানো হয় এবং পুলিশকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সহযোগিতা করার জন্য অনুরোধ করা হয়। এরই মধ্যে মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে আসামিরা বিএনপি অফিস থেকে লাঠিসোঁটা নিয়ে নয়াপল্টনের ভিআইপি রোডে হকস বে গাড়ির শোরুমের উত্তর পাশে রাস্তায় পুলিশের ৬০ লাখ টাকা দামের ডাবল কেবিন পিকআপ এল-২০০ মিতসুবিশি গাড়িটি পুড়িয়ে দেয়। তারা পুলিশকে হত্যার উদ্দেশ্যে সরকারি কাজে বাধা দিয়ে অতর্কিত পুলিশের ওপর আক্রমণ করে।

এজাহারে আরো বলা হয়, আসামিরা রাস্তার পাশে ডিউটিরত পুলিশের সহকারী কমিশনারের (প্যাট্রল-মতিঝিল) প্রাইভেট কারও পুড়িয়ে দিয়েছে। গাড়িটির আনুমানিক মূল্য ৩৫ লাখ টাকা। আসামিদের ছোড়া ইটের আঘাতে সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. ইলিয়াস হোসেন, ড্রাইভার কনস্টেবল তপন আচার্য, পিএসআই কামরুল হোসেন,  কনস্টেবল আব্দুল মান্নান ও আনসার সোহেল রানা মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হন। এজাহারে ১৩৭ থেকে ১৫৯ নম্বরে উল্লিখিত আসামিদের ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয় বলেও জানানো হয় মামলায়।

এজাহারে বলা হয়, ‘ক্রমিক নং ১ থেকে ক্রমিক নং ৬ পর্যন্ত আসামিসহ (মির্জা আব্বাস, রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ, আফরোজা আব্বাস, মো. নবী উল্লাহ নবী, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, কফিল উদ্দিন) পার্টি অফিসে অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতার প্রত্যক্ষ মদদ, নির্দেশ ও অর্থায়নে জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল ও দেশে অস্থিতিশীল, নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করার অসৎ ও অভিন্ন উদ্দেশ্যে বেআইনি জনতাবদ্ধে মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রাস্তায় দাঙ্গা করে পুলিশকে হত্যার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে পুলিশের সরকারি কাজে বাধা দিয়ে পুলিশকে আক্রমণ করে। পেনাল কোডের ১৪৩, ১৮৭, ১৪৮, ১৪৯, ৩০৭, ১৮৬, ৩৫৩, ৩৩২, ৩৩৩, ৪৩৫, ৪২৭, ১০৯, ১১৪সহ ১৯৭৪ সালের স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্টের ১৫(৩/২৫-ঘ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ স্থানীয়ভাবে আসামিদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করা হয়েছে।

‘ড্রোন উড়ছিল’ : সংঘর্ষ চলাকালে দুইবার একটি ড্রোন উড়তে দেখার দাবি করেছে কিছু প্রত্যক্ষদর্শী। তাদের বক্তব্য, বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কাকরাইলের নাইটিঙ্গেল মোড়ে একটি ড্রোন উড়তে দেখেছে তারা। নাইটিঙ্গেল মোড়ের স্কাউট ভবনের ছাদ থেকে ড্রোনটি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল বলেও দেখেছে অনেকেই। এ বিষয়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা বলেছে, তারাও ড্রোন উড়তে দেখেছে। এতে তারা কিছুটা আতঙ্কের মধ্যেও ছিল। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের কোনো কর্মকর্তা এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

নিপুণ রায় গ্রেপ্তার : পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি পোড়ানোর মামলায় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল রাত ৮টার দিকে রাজধানীর নাইটিঙ্গেল মোড় থেকে নিপুণ রায় ও দলের সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীনকে পুলিশ আটক করে। পরে বেবী নাজনীনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। জানা গেছে, পল্টন থানায় দায়ের করা তিন মামলার একটিতে এজাহারভুক্ত ১২ নম্বর আসামি নিপুণ রায় চৌধুরী। তিনি বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের পুত্রবধূ ও বিএনপির সাবেক প্রতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর মেয়ে।

বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু বলেন, নিপুণ রায় চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন ডিবি পূর্ব বিভাগের সহকারী কমিশনার (এসি) আতিকুল ইসলাম। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বিএনপির নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে গতকাল রাতে বেরিয়ে দুজন একই গাড়িতে করে যাচ্ছিলেন।

বহিষ্কারের গুজব : নয়াপল্টনে সহিংসতাকালে হেলমেটধারী এক যুবক পুলিশের গাড়ির ওপর উঠে উল্লাস করছিল অগ্নিসংযোগের মুহূর্তে। জানা যায়, যুবকটি রাজধানীর শাহাজানপুর থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. সোহাগ ভুঁইয়া। পরে ভাইরাল হয় একটি গুজব—সোহাগকে বৃহস্পতিবার ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রাজিব আহসান ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আকরামুল আহসান স্বাক্ষরিত নোটিশে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে গতকাল রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মো. আবদুস সাত্তার পাটোয়ারী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বহিষ্কারাদেশের তথ্যটি ভিত্তিহীন, বানোয়াট। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘শাহজাহানপুর থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হোগ ভূঁইয়াকে বহিষ্কারসংক্রান্ত একটি চিঠি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও বানোয়াট। মূলত আজ ১৫ নভেম্বর ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদে এ ধরনের কোনো মিটিং হয়নি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা