kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

এবার শ্রীলঙ্কায় গির্জা ও হোটেলে সিরিজ বোমায় নিহত ২৯০

ঝুঁকির বাইরে নয় কোনো দেশই

মেহেদী হাসান   

২৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঝুঁকির বাইরে নয় কোনো দেশই

ছবি: ইন্টারনেট

ইস্টার সানডেতে নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছে প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা। ভয়ংকর ওই হামলায় তিন শর মতো লোক নিহত এবং পাঁচ শতাধিক আহত হয়েছে। নিহত ও আহত মানুষের মধ্যে আছে বাংলাদেশিও। শ্রীলঙ্কার ওই হামলা সন্ত্রাসী তৎপরতার মানচিত্রে নতুন করে তুলে এনেছে দক্ষিণ এশিয়াকে। বিশ্বকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, ২০১৭ সালে বিশ্বের মোট সন্ত্রাসী হামলার ৩১ শতাংশই ছিল দক্ষিণ এশিয়ায়। ওই বছর সন্ত্রাসে নিহত ২৯ শতাংশই এ অঞ্চলের।

যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সন্ত্রাসবিষয়ক প্রতিবেদনগুলোতে বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখানো হয়েছে দক্ষিণ এশিয়াকে। এ কারণে পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের এই অঞ্চলে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্ক করে আসছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর শ্রীলঙ্কা ভ্রমণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের যে মাত্রার সতর্কতা অবলম্বন করার তাগিদ দেয়, ঠিক একই মাত্রার সতর্কতা জারি আছে বাংলাদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রেও।

শ্রীলঙ্কায় গত রবিবারের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সন্ত্রাসীদের কোনো বর্ণ, ধর্ম ও দেশ নেই।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কার মতো কোনো হামলার আশঙ্কা নেই বলে জানালেও নিরাপত্তা নিয়ে আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ নেই বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। সন্ত্রাসবিরোধী জোরালো অবস্থান সত্ত্বেও বাংলাদেশ প্রায় তিন বছর আগে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ এখনো এ দেশে হামলার উচ্চ মাত্রার ঝুঁকির কথা বলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শ্রীলঙ্কার হামলা থেকে বাংলাদেশসহ সবার জন্য শিক্ষণীয় বিষয়টি হলো সন্ত্রাসী হামলা যেকোনো দেশে, যেকোনো জায়গায়, যেকোনো কারণে হতে পারে। তাই আমাদের গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডের ওপর দৃষ্টি দেওয়া দরকার। একইভাবে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে গিয়ে বাংলাদেশ যেন আবার ভাবমূর্তি সংকটে না পড়ে তাও দেখতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই যে শ্রীলঙ্কায় গোয়েন্দা কার্যক্রম ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। অতীতে আমরা নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চেও এমনটি দেখেছি। তাই এ থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আছে।’

রাষ্ট্রের স্বার্থে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করে ড. ইমতিয়াজ বলেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই যে নজর রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে যাতে কোনো বিভাজন না থাকে। বিভিন্ন দল, উপদল যেন না থাকে। কারণ শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, যত বেশি দল-উপদল হবে ততই কিন্তু আমরা নিজেরা সমস্যা তৈরি করতে থাকব। সেই জায়গায় আমাদের বড় ধরনের নজর দেওয়া উচিত।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, শ্রীলঙ্কায় হামলার ব্যাপারে এ যাবৎ যে ধরনের তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে তা থেকে বাংলাদেশের ওপর এখনই বড় ধরনের কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ার বা শঙ্কিত হওয়ার কোনো আশঙ্কা তিনি দেখছেন না। তবে নিরাপত্তা নিয়ে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি এ দেশকেও সতর্ক হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, শ্রীলঙ্কায় হামলার সঙ্গে যদি আইএসের মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি বা সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর যোগসাজশ প্রমাণিত হয় তবে তা নতুন মাত্রা পাবে।

এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা নিত্যদিনের ঘটনা। সন্ত্রাসে মদদ দেওয়ার জন্য আঙুল তোলা হয় পাকিস্তানের দিকে। সন্ত্রাসী হামলা থেকে পরিত্রাণ পায়নি পাকিস্তানও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতেও বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা ঘটেছে। এই অঞ্চলে কাশ্মীর সংকট ও রোহিঙ্গা সংকট সন্ত্রাসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে সতর্ক করে আসছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

গত বছর সিডনিভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস প্রকাশিত বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ প্রতিবেদনে সন্ত্রাসের শিকার হওয়া অঞ্চলগুলোর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া ছিল দ্বিতীয় শীর্ষস্থানে। ওই সূচকের প্রথম ১০টি দেশের মধ্যে আফগানিস্তান দ্বিতীয়, পাকিস্তান পঞ্চম ও ভারত সপ্তম স্থানে আছে। বাংলাদেশ আছে ২৫তম অবস্থানে। তবে গত রবিবার আক্রান্ত হওয়া শ্রীলঙ্কা ওই তালিকায় ৪৯তম স্থানে ছিল।

শ্রীলঙ্কায় রবিবারের সন্ত্রাসী হামলা গত ১৫ বছরে এ অঞ্চলে সবচেয়ে বড় হামলা। ২০০৮ সালে ভারতের মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলায় প্রায় ১৫০ জন নিহত হয়েছিল। ২০১৪ সালে পাকিস্তানের পেশোয়ারে সেনা পরিচালিত স্কুলে সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় ১৫০ জন।

২০১৬ সালে ঢাকায় হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার আগে ও পরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ এ দেশে আইএসের মতো জঙ্গিগোষ্ঠীর মতাদর্শী বা স্বপ্রণোদিত অনুসারীর উপস্থিতি থাকার দাবি করেছিল। বাংলাদেশ তা অস্বীকার করলেও পশ্চিমা দেশগুলো তাদের অবস্থানে অনড় আছে।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘২০১৭ সালে বাংলাদেশ এমন তিনটি সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছে যেগুলোর দায় স্বীকার করেছে আইএস। তবে ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে বাংলাদেশে আইএসের হামলা কমেছে। আইএস এবং ভারতীয় উপমহাদেশের আল-কায়েদাসহ (একিউআইএস) আন্তর্দেশীয় গোষ্ঠীগুলো এখনো বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি হয়ে আছে। বাংলাদেশ সরকার সম্ভবত আইএসের বেশ কিছু পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছে। তবে বাংলাদেশ বরাবরই দাবি করছে যে এগুলো স্থানীয় গোষ্ঠী।’

দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসী তৎপরতা নজরদারি প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়া টেররিজম পোর্টালের গত সপ্তাহে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, গত বছর এ দেশে জামা’আতুল মুজাহিদীনের ৯ জন এবং নব্য জেএমবির দুজন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। এ ছাড়া গ্রেপ্তার হয়েছে ইসলামের নামধারী অন্তত ৫০৪ জন সন্ত্রাসী। ওই সন্ত্রাসীদের মধ্যে আছে জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, আনসার আল ইসলাম, নব্য জেএমবি, হিযবুত তাহ্রীর, আল্লাহর দল ও জামায়াতুল মুসলেমিনের সদস্যরাও। এর আগে ২০১৭ সালে এ দেশে ইসলামের নামধারী ৫২ সন্ত্রাসী নিহত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসের কথিত খিলাফতের পতনের পর আইএস জঙ্গিরা নিজ নিজ দেশে ফিরে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে কয়েক বছর আগেই সতর্ক করেছিলেন পশ্চিমা বিশ্লেষকরা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়াকেই তাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কেননা এ অঞ্চল থেকে লোকজন আইএসে যোগ দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নেতৃত্বও দিয়েছে।

মন্তব্য