kalerkantho

সোমবার । ২৬ আগস্ট ২০১৯। ১১ ভাদ্র ১৪২৬। ২৪ জিলহজ ১৪৪০

সাক্ষী মিন্নি রিমান্ডে গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন

প্রভাবশালী কারো প্ররোচনা রয়েছে কি না : সংসদীয় কমিটি

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল   

১৮ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



সাক্ষী মিন্নি রিমান্ডে গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন

রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রত্যক্ষদর্শী প্রধান সাক্ষী থেকে গতকাল বুধবার আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ান তাঁর স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশের করা আবেদনের শুনানির পর আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আদালতে দাঁড়িয়ে মিন্নি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে স্বামী হত্যার বিচার চান। রিমান্ড শুনানির সময় মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। স্থানীয় এমপির পুত্র অ্যাডভোকেট সুনাম দেবনাথের হুমকির কারণে কেউ তাঁর পক্ষে দাঁড়াতে সাহস পায়নি বলে জানা গেছে।

এদিকে রিফাত হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্ত নিশ্চিতের তাগিদ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। মামলার প্রধান সাক্ষী মিন্নিকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত হিসেবে গ্রেপ্তারের পেছনে প্রভাবশালী কারো প্ররোচনা রয়েছে কি না, গতকাল বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির বৈঠকে সেই প্রশ্ন তোলেন একজন সংসদ সদস্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, চাঞ্চল্যকর ওই ঘটনার তদন্ত সঠিক পথেই চলছে।

মিন্নিকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় প্রভাবশালীরা যাতে আড়ালে চলে না যায় সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।

গতকাল বিকেল সোয়া ৩টার দিকে পুলিশ মিন্নিকে বরগুনার বিচারিক হাকিম মো. সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে হাজির করে। এ সময় আদালতের চারপাশে কড়া পুলিশ প্রহরা ছিল। আদালতের বাইরে মিন্নির মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজন উপস্থিত থাকলেও কারো সঙ্গে তাঁকে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। আদালতের কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর বিকেল পৌনে ৪টার দিকে মিন্নিকে আদালত থেকে বের করে কড়া পাহারায় পুলিশ লাইনসে নেওয়া হয়।

স্বামী হত্যার বিচার চাইলেন মিন্নি

পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের কঠোর নজরদারির মধ্য দিয়ে মিন্নিকে আদালতে হাজির করার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সনজিব দাস তদন্তকারীর পক্ষে মিন্নির সাত দিনের রিমান্ড চান। তখন মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। এমপিপুত্র সুনাম দেবনাথ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আগেই স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছিলেন, খুনিদের পক্ষে আইনজীবীরা মামলা চালাবেন না।

বিচারক সিরাজুল ইসলাম গাজী কাঠগড়ায় দাঁড়ানো মিন্নির কিছু বলার আছে কি না জানতে চান। তখন মিন্নি আদালতের কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। একই সঙ্গে বলেন, ‘আমি আমার স্বামী রিফাত হত্যার বিচার চাই।’ এ সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির মামলার ১২ নম্বর আসামি হৃদয়ের জবানবন্দি পেশ করেন। এতে জানা যায়, আসামি হৃদয় রিফাত হত্যার ঘটনায় মিন্নি জড়িত মর্মে জবানবন্দি দিয়েছিল। তদন্ত কর্মকর্তা এ ছাড়া ঘটনার আগে নয়ন বন্ড, রিফাতসহ অন্য আসামিদের সঙ্গে মুঠোফোনে মিন্নির কথোপকথনের ‘কল ডিটেইলস’ পেশ করেন। এসব ব্যাপারে মিন্নির কাছে আদালত জানতে চাইলে তিনি তখন নীরব ছিলেন। পরে বিচারক তাঁকে পাঁচ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।

রিমান্ড শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সনজিব দাস উপস্থিত ছিলেন। তিনি শুনানির বিষয়টি সাংবাদিকদের কাছে বর্ণনা করেন। রিমান্ড শুনানির সময় বিচারক মিন্নিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়েছেন। মিন্নির বক্তব্যে আদালত সন্তুষ্ট ছিলেন না বলেই মামলায় তাঁর পাঁচ দিনের পুলিশি রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

আগের দিন মঙ্গলবার সকালে মিন্নিকে তাঁর বাড়ি থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ লাইনে ডেকে আনা হয়। প্রায় ১২ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর রাত ৯টায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। মিন্নি রিফাত শরীফ হত্যা মামলার ১ নম্বর সাক্ষী। ঘটনার দিন স্বামীর সঙ্গে তিনি কলেজে গিয়েছিলেন। কলেজ থেকে ফেরার পথে নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজী রামদা দিয়ে কুপিয়ে রিফাত শরীফকে আহত করে। পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।

মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, ‘আমার মেয়ে নির্দোষ। রিফাতকে বাঁচাতে সে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিল। যেটা দেশবাসী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছেন। তারপরও আমার মেয়েকে ফাঁসানো হয়েছে। কারণ আসামিরা প্রভাবশালীদের আত্মীয়-স্বজন। তাদের সঙ্গে প্রভাবশালীদের যোগসূত্রও রয়েছে। মূলত আসামিদের বাঁচানোর জন্য আমার মেয়েকে ফাঁসানো হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, রিফাত ফরাজী অন্যতম খুনি। তার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। তাকে পুলিশ রিমান্ডে নিয়েছে; কিন্তু এখন পর্যন্ত সে কোনো তথ্য দেয়নি। এদের বাঁচানোর জন্যই মামলার প্রত্যক্ষদর্শীকে আসামি হিসেবে দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

মিন্নির জন্য আইনজীবী নিয়োগ দিতে না পারা প্রসঙ্গে বাবা বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে পুলিশের পক্ষ থেকে মিন্নিকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি আমাকে জানানো হয়। সাক্ষী থেকে আসামি হওয়ার পরই আমি মিন্নির পক্ষে আইনজীবী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করি। রাতেই পরিচিত তিনজন আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি। তাঁরা তিনজনই মিন্নির পক্ষে আদালতে দাঁড়াতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তাঁরা জানিয়েছেন, আইনজীবী সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁরা মিন্নির পক্ষে আইনি লড়াইয়ে থাকবেন না।’

মিন্নির বাবা বলেন, ‘বরগুনা আইনজীবী সমিতির একাধিক সদস্যের সঙ্গে বুধবার সকালেই যোগাযোগ করি। তাঁদের বলেছি, আমার মেয়ে নির্দোষ। ওর পক্ষে আপনারা একটু আইনি লড়াইয়ে নামেন। আপনাদের পারশ্রমিক দেব। তাঁরাও আইনি সহায়তা দিতে অপারগতার বিষয়টি সাফ সাফ জানিয়ে দেন। আইনজীবীর আশা ছেড়ে দিয়েই আমি সকাল থেকে আদালত চত্বরে অবস্থান করি। বিকেল ৩টার পর মেয়েকে আদালতে নিয়ে আসা হলে আমি ওকে নিজের বক্তব্য আদালতে উপস্থাপনের জন্য বলি।’ 

মিন্নির বাবা আরো বলেন, ‘বিচারকের উপস্থিতিতে আমার মেয়ের পক্ষে আইনজীবী গোলাম সরোয়ার নাসির, জিয়া উদ্দিন ও আব্দুল কাদের বক্তব্য উপস্থাপনের চেষ্টা করেন, কিন্তু বিধি অনুযায়ী আইনজীবীরা ওকালতনামায় স্বাক্ষর না দেওয়ায় বিচারক তাঁদের বক্তব্য শুনতে অপারগতা প্রকাশ করেন।’

এমপিপুত্র সুনাম দেবনাথ গত ২৭ জুন তাঁর ফেসবুক ওয়ালে দেওয়া স্ট্যাটাসে  বলেন, ‘আমরা বরগুনার আইনজীবীরা রিফাত শরীফ হত্যাকারীদের কোনো আইনি সহায়তা দিব না, একজনকেও না। আশা করি, আমার এই প্রস্তাবের সাথে সব আইনজীবী একমত হবেন।’ সুনামের সেই পোস্ট ১১১ জনে শেয়ার করেছে। ১৮৪ জন মন্তব্য করেছে। এক হাজার ৩০০ জন লাইক দিয়েছে।   

পুলিশ সুপার যা বললেন

নিজের স্বামীর হত্যাকাণ্ডে মিন্নি জড়িত—এ সন্দেহ কেন পুলিশের মধ্যে তৈরি হলো? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেন, ‘আমরা তাকে মঙ্গলবার সারা দিন জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। পাশাপাশি যেসব আসামিকে রিমান্ডে আনা হয়েছিল তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা যেসব তথ্য-প্রমাণ পেয়েছি সব কিছু মিলিয়ে তার সংশ্লিষ্টতা প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে।’

গত শনিবার নিহত রিফাত শরীফের বাবা একটি সংবাদ সম্মেলন করে পুত্রবধূ মিন্নির গ্রেপ্তার দাবি করেন। সেখানে তিনি ওই হত্যাকাণ্ডে তাঁর পুত্রবধূ জড়িত বলে অভিযোগ করেছিলেন। পরদিন একই দাবিতে বরগুনায় একটি মানববন্ধনও হয়। সেদিন দুপুরে মিন্নি একটি সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, যারা বরগুনায় ‘০০৭’ নামে সন্ত্রাসী গ্রুপ সৃষ্টি করেছিল, তারাই মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য তাঁর শ্বশুরকে চাপ দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করিয়েছে।

পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন আর মানববন্ধন প্রসঙ্গে মারুফ হোসেন বলেন, ‘দেখুন, সংবাদ সম্মেলন, স্মারকলিপি, মিডিয়া যা-ই হোক না কেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে যতটুকু করা দরকার, আমরা সেই বিষয়টা নিয়ে আমাদের পর্যালোচনা করে, বিচার-বিশ্লেষণ করে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ মিন্নি সংবাদ সম্মেলনে প্রভাবশালী মহলের উল্লেখ করেছিলেন, যারা তাকে দোষী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। পুলিশ সুপার বলছেন, ‘সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করে, আসামিদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তদন্ত স্বাধীন নিরপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া, এখানে কে কী বলল সেটা কোনো বিষয় নয়।’

মিন্নিকে গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন সংসদীয় কমিটিতে

মিন্নিকে গ্রেপ্তার করা নিয়ে আলোচনা উঠেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে। এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তের মোড় পরিবর্তন নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যে গতকাল সংসদ ভবনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। কমিটির সদস্য জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান প্রসঙ্গটি তোলেন। বৈঠক শেষে পীর ফজলুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘হঠাৎ করে মিন্নিকে গ্রেপ্তার করায় বিভিন্ন আলোচনা উঠেছে। আমি বৈঠকে বলেছি, মিন্নিকে কারো প্ররোচনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, সেই আলোচনাও বিভিন্ন মহলে উঠেছে। এ বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য জানতে চেয়েছি আমি।’

কমিটির সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রিফাত হত্যার ঘটনায় তদন্ত চলছে। এখনো এ বিষয়ে মতামত দেওয়ার সময় আসেনি। ভালোভাবে তদন্ত চলছে। অপরাধী যেই হোক তার পরিচয় জনসাধারণের সামনে উন্মুক্ত করা হবে, আইনের মুখোমুখি করা হবে।

প্রসঙ্গত, রিফাত হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি যে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়, তাকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ ছিল বরগুনার আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে সুনাম দেবনাথের বিরুদ্ধে। এই হত্যাকাণ্ডের অন্য দুই প্রধান আসামি দুই ভাই রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজী স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে।

প্রভাবশালীরা যেন আড়ালে চলে না যায় : আসক

রিফাত শরীফ হত্যা মামলার এক নম্বর সাক্ষী ও নিহতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় প্রভাবশালীরা যাতে আড়ালে চলে না যায় সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। পাশাপাশি আয়েশাকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁর প্রতি সর্বোচ্চ সংবেদনশীল আচরণ করার এবং তাঁকে যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হতে না হয় তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে আসক। আসকের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়।

মন্তব্য