kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

শপথ নিলেন বিএনপির এমপি জাহিদুর

বিএনপি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে

দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা : ফখরুল

এনাম আবেদীন   

২৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিএনপি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে

মুকাব্বির খানের শপথগ্রহণকে কেন্দ্র করে গণফোরামের ভূমিকা নিয়ে সৃষ্ট সন্দেহের মধ্যেই গতকাল বৃহস্পতিবার বিএনপির সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান শপথ নিয়েছেন। এতে করে দলের ভেতরে ও বাইরে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে দলটি।

কারণ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে এরই মধ্যে দলটি শপথ গ্রহণ না করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। শুধু তাই নয়, সিলেট-২ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মুকাব্বির খান শপথ নেওয়ার পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক প্রতিক্রিয়ায় পরোক্ষভাবে তাঁকে ‘বেঈমান ও প্রতারক’ বলে অভিহিত করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ গতকাল ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুরের শপথের ঘটনা বিএনপিকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। কারণ দলটির সিনিয়র কোনো নেতার কাছে এ বিষয়ে আগাম কোনো তথ্য ছিল না। বিএনপির সিনিয়র বেশির ভাগ নেতা এ ঘটনা জানতে পেরেছেন শপথের কয়েক ঘণ্টা পর।

এদিকে জাহিদুর রহমানের শপথের পর বিএনপির বাকি পাঁচ সংসদ সদস্যকে নিয়েও দলের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। বিএনপির অনেকেই মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত তাঁরা শপথ নিতে পারেন। অবশ্য কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে তাঁদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, শপথ প্রশ্নে তাঁদের মধ্যে দ্বিধা-বিভক্তি রয়েছে।

বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশনার পাশাপাশি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে শপথ নেবেন না, এটি নিশ্চিত। তবে অন্য চারজনের ব্যাপারে গতকালই দলের মধ্যে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। স্থায়ী কমিটির অন্তত দুজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁদের জানা মতে, মির্জা ফখরুল ছাড়া বাকি পাঁচ সংসদ সদস্যই সংসদে যাবেন। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্যের অবশ্য দাবি, চারজন গেলে ফখরুলও যাবেন।

তবে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত বিএনপিতে এখনো বহাল আছে।’ তিনি বলেন, ‘দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা যাঁরাই করবেন তাঁদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জাহিদুরের বিষয়ে করণীয় এখনো ঠিক হয়নি। শিগগিরই স্থায়ী কমিটির বৈঠক করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জাহিদুরের শপথের বিষয়ে কালের কণ্ঠ’র প্রতিনিধির কাছ থেকেই প্রথম শোনেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘কিভাবে কী হলো বলতে পারব না। কারণ শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত এখনো বহাল আছে। তবে এটা খুবই বিব্রতকর ঘটনা।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তাঁকে (জাহিদুর রহমান) তো বহিষ্কার করা হবেই।’

কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের এমপি মো. হারুনুর রশীদ এবং বগুড়া-৪ আসনের মো. মোশারফ হোসেন জানিয়েছেন, তাঁরা দলের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন। আরো দুই দিন সময় রয়েছে। তবে তাঁরা দলের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেবেন না বলে জানান।

অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের মো. আমিনুল ইসলাম এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য উকিল আবদুস সাত্তার দলের সিদ্ধান্তের কথা বললেও চূড়ান্তভাবে কী করবেন সে সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলেননি। তবে তাঁরা আশায় আছেন, দল সিদ্ধান্ত বদলাবে এবং তাঁরা সংসদে যাবেন।

গতকাল আবদুস সাত্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শপথ নেব কি না এখনো ঠিক নেই। শপথ নিলে তো সবাই দেখবে। এটা তো গোপন রাখা যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘অপেক্ষা করেন, দেখা যাক কী হয়!’

আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি। দলের ওপর নির্ভর করে আছি। দেখি দল কী করে!’ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানালেও বিএনপি এখনো শপথ না নেওয়ার পক্ষেই আছে, এমনটি জানিয়ে তিনি বলেন, “আপনারা দোয়া করেন যাতে দলের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়ে ‘হ্যাঁ’ হয়ে যায়। আমিও আশা করছি হবে।”

দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য বলেন, এ ব্যাপারেও এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি।’

অন্যদিকে হারুনুর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অপেক্ষায় আছি দল কী করে। আরো দুই দিন সময় আছে। শেষ দিনে দেখব।’ তবে তিনি বলেন, ‘দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’

মো. মোশররফ হোসেন বলেন, ‘যাঁর ইচ্ছা হয়েছে গেছেন। তবে আমি বেঈমান হতে চাই না। তাই দলের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এভাবে বিচ্ছিন্নভাবে একেকজন সংসদে গিয়ে কী অর্জন করবে জানি না। বরং একসঙ্গে গেলে কিছু অর্জন হতো।’

উল্লেখ্য, উকিল আবদুস সাত্তার বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী। অন্যদিকে হারুনুর রশীদ বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব। আমিনুল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, মোশাররফ হোসেন বগুড়া জেলা বিএনপির সদস্য এবং জাহিদ ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি।

গণফোরামকে কেন্দ্র করে সন্দেহের মধ্যেই...

মোকাব্বির খানের বিরুদ্ধে কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরেই ঐক্যফ্রন্টভুক্ত দলগুলোর মধ্যে গণফোরামের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ছিল বলে জানা যায়। কারণ সুলতান মোহাম্মদ মনসুরকে গণফোরাম থেকে বহিষ্কার করা হয় তাঁর শপথের প্রথম দিনেই। অথচ সিলেট-২ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান গত ২ এপ্রিল শপথ নিলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় দলগুলোর মধ্যে সন্দেহ জাগে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, এ নিয়ে গণফোরামের মধ্যে সমালোচনা থাকলেও ড. কামাল হোসেন সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করছিলেন। অনেকের মতে, কামাল হোসেন নিজেই তাঁর দল ও বিএনপির সংসদ সদস্যের সংসদে যোগদানের পক্ষপাতী থাকায় তিনি ব্যবস্থা নেননি। যে কারণে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বিএনপি কী করে তার অপেক্ষায় ছিলেন। গত ২৪ এপ্রিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকে বিএনপির সংসদে যাওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে গণফোরামের পক্ষ থেকে জানতে চেয়ে বলা হয়; বিএনপি সংসদে না গেলে তবেই তারা মোকাব্বিরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। এরই মধ্যে বিএনপির জাহিদুর রহমান গতকাল শপথ নিলেন।

জানতে চাইলে গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএনপির একজনের শপথের পর গণফোরাম এখন অপেক্ষা করবে। এ ছাড়া আর করার কী আছে!

জাহিদুরের শপথের আগে সকালে তিনি বলেন, ‘মোকাব্বিরকে বহিষ্কারের দাবি দলের ভেতর থেকে উঠেছে। আমরা সময়মতো শোকজ করব।’

ড. কামাল হোসেন সংসদে যাওয়ার পক্ষে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা ঠিক নয়। যতবার বৈঠক হয়েছে তিনি না যাওয়ার কথাই বলেছেন।

শপথ নেওয়ায় জাহিদুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে মো. মোকাব্বির খান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাদের জন্য আড়াই মাস অপেক্ষা করে সংসদে যোগ দিয়েছি। আমি মনে করি, সংসদে না গিয়ে কোনো লাভ নেই।’

 

মন্তব্য