kalerkantho

বুধবার । ২১ আগস্ট ২০১৯। ৬ ভাদ্র ১৪২৬। ১৯ জিলহজ ১৪৪০

বেঁচে ফেরাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া

‘এ রায় মানি না, ফাঁসি চাই মাস্টারমাইন্ড তারেকের’

লায়েকুজ্জামান ও তৈমুর ফারুক তুষার   

১১ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



‘এ রায় মানি না, ফাঁসি চাই মাস্টারমাইন্ড তারেকের’

সকাল ৯টা থেকেই খণ্ড খণ্ড মিছিল আসতে থাকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগের মিছিলের পাশাপাশি আসছিলেন ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফেরা, এখনো শরীরে অসহ্য যন্ত্রণার স্প্লিন্টার বয়ে বেড়ানো আহতরাও। আহতরা এসে জড়ো হতে থাকেন যেখানে আইভি রহমান শহীদ হয়েছিলেন। মিছিলে তখন একটিই আওয়াজ—‘তারেক জিয়ার ফাঁসি চাই’। সকাল ১০টার মধ্যেই লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। তবে রায়ের খবর এসে পৌঁছানোর পর নীরব হয়ে যায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। যেন কারোর বিশ্বাস হচ্ছিল না। নীরবতা ভেঙে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এলাকা। সম্মিলিত স্লোগান ওঠে—‘এ রায় মানি না—মাস্টারমাইন্ড তারেক জিয়ার ফাঁসি চাই’। মুক্তাঙ্গন পর্যন্ত মিছিল শেষে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ফিরে সমাবেশে বক্তৃতায় যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক বলেন, ‘১৪ বছর পর রায় হয়েছে, বিচারে খুশি হলেও তারেক রহমানের ফাঁসি না হওয়ায় আমরা সন্তুষ্ট নই। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হবে।’

আওয়ামী লীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি আবুল হাসানাত, সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক হারুনার রশিদ, যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাওছার, ছাত্রলীগ দক্ষিণের সভাপতি মেহেদি হাসানের নেতৃত্বে মিছিল আসে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। সাবেক মন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এ বি তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা ও আয়েশা মোকাররমের নেতৃত্বে আসে মহিলা আওয়ামী লীগের মিছিল।

আয়েশা মোকাররম বর্তমানে ঢাকা মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। ২০০৪ সালে ছিলেন ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সভানেত্রী ও সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর। আয়েশা মোকাররম বলেন, ‘হাজারীবাগ এলাকা থেকে প্রায় ২০০ নারী কর্মী নিয়ে দুপুরের সময়ই বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আসি। মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল একটি খোলা ট্রাকে। আমি কর্মীদের নিয়ে বসেছিলাম ট্রাকের সামনে, আমাদের পাশেই ছিলেন আইভি রহমান। আমি যাঁদের নিয়ে জনসভায় গিয়েছিলাম তাঁদের মধ্যে আটজন শহীদ হন। সেদিন পুলিশ আমাদের কোনো সহযোগিতা করেনি; বরং উল্টো পুলিশ টিয়ারগ্যাস ছুড়েছিল, লাঠিপেটা করেছিল। এসবের পেছনে ছিল সে সময়ের ক্ষমতার সবচেয়ে বড় মালিক তারেক রহমান। তাঁর পরিকল্পনায় হামলা হয়েছে। তারেক রহমানের সর্বোচ্চ সাজা না হওয়ায় আমি অখুশি।’

শাহে আলম মুরাদ বর্তমানে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক। গ্রেনেড হামলায় আহত হন তিনি। শাহে আলম মুরাদ বলেন, ‘মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তিতে সুস্পষ্ট আছে এ হামলার পরিকল্পনাকারী ও হুকুমদাতা তারেক রহমান, অথচ রায়ে তাঁর ফাসির আদেশ হয়নি। অনেকটা ভগ্নহৃদয় নিয়ে বাড়ি ফিরছি।’

হেনা বেগম ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কর্মী। আয়েশা মোকাররমের নেতৃত্বে মিছিলে এসেছিলেন তিনি। তাঁর পাশে বসা আরেক কর্মী নিহত হলেও তিনি ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। হেনা বেগম বললেন, রায়ে তিনি হতাশ। তাঁর দাবি মামলায় সরকারের আপিল করা উচিত, যাতে তারেক রহমানের ফাঁসি হয়।

তাসলিমা বেগম সেদিন মিছিলে এসেছিলেন নবাবগঞ্জ থেকে। গ্রেনেডের স্প্লিন্টার নিয়ে বেঁচে আছেন তিনি। নাতিকে নিয়ে গতকাল এসেছিলেন রায় শুনে আনন্দ করতে করতে। তাসলিমা বলেন, ‘বিচার হয়েছে এটা খুশির খবর, কিন্তু আসল আসামি তারেকেরই তো ফাঁসি হলো না।’ একই প্রতিক্রিয়া জানালেন আরেক আহত মহিলা কর্মী জরিনা বেগম। তিনি বলেন, ‘তারেক রহমানকে ফাঁসি দিলে সঠিক বিচার পেতাম।’

বেবী হেনা মহিলা আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভানেত্রী। গ্রেনেড হামলায় আহত হয়েছিলেন। গতকালও মিছিল নিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে। বেবী হেনা বললেন, ‘মূল পরিকল্পনাকারী তারেক রহমানের ফাঁসি না হওয়ার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। সরকারকে আপিল করতে হবে।’ আওয়ামী যুবলীগের মহিলা সম্পাদিকা জাকিয়া সুলতানা শেফালী গ্রেনেড হামলায় আহত হয়েছিলেন। গতকাল বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে শেফালী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে বলছি, তারেক রহমানের ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল।’

২০০৪ সালে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন হারিস হাসান সাগর। বর্তমানে যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা সাগর ২১ আগস্ট জনসভায় স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্বে ছিলেন। হারিস বলেন, ‘হাত ও পায়ে স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে ছিলাম। কে কখন হাসপাতালে নিয়েছিল বলতে পারব না।’ তিনি বলেন, ‘১৪ বছর পর তবু বিচারটা হলো, একসময় তো বিচারের আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। তবে তারেক রহমানের ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল।’

সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী (অব.) এ বি এম তাজুল ইসলাম বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা ছিল মাস্টারমাইন্ড তারেক রহমানের ফাঁসি হবে। হয়নি। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাব রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে তারেক জিয়ার মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করতে।’

মুক্তিযোদ্ধা নাজিমউদ্দিন আহত হয়েছিলেন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায়। গতকাল তিনি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের পতাকা হাতে নিয়ে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে। তিনি বলেন, ‘এ রায়ে কিভাবে খুশি হব? যে তারেক জিয়া গ্রেনেড ছোড়ার হুকুম দিল, পরিকল্পনা করল, পাকিস্তান থেকে গ্রেনেড আনাল—তারই যদি বিচার না হয় তবে যে মাত্র গ্রেনেড ছুড়ল ওদের বিচার করে কী লাভ? আমরা তারেক রহমানের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’

সেদিন গ্রেনেড হামলায় মারাত্মক আহত হয়ে আংশিক পঙ্গুত্ব বরণ করে এক যন্ত্রণার জীবন পার করছেন বর্তমানে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য উম্মে রাজিয়া কাজল। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তারেক রহমানের অপরাধের যে মাত্রা তাতে অন্যদের আগে তারেকের ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল। যাদের ফাঁসি হয়েছে তারা তো তারেকের হাতের পুতুল ছিল। এই ঘটনার মাস্টারমাইন্ড তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরীদের সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়ায় আমরা হতাশ। আশা করছি, আপিলের মধ্য দিয়ে এই ঘটনার হোতাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। যাদের কারণে আমরা শরীরে অসংখ্য স্প্লিন্টার নিয়ে দুঃসহ যন্ত্রণার জীবন ভোগ করছি তাদের সকলের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আমরা পুরোপুরি খুশি হতে পারব না।’

সেদিন হামলায় আহত হয়েছিলেন তত্কালীন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হামলার মূল ব্যক্তি তারেক রহমানের সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়ায় আমরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারছি না। তবে এই বিচারের মধ্য দিয়ে এক কলঙ্কজনক হামলার কিছুটা দায় মুক্ত হলো রাষ্ট্র।’ গ্রেনেড হামলায় শরীরে অসংখ্য স্প্লিন্টার বহন করে চলেছেন ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আজিজুর রহমান বাচ্চু। তিনি বলেন, ‘আমরা আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এত দিন পর রায় হয়েছে বলে আমরা খুশি। তবে মূল নায়ক তারেক রহমানের ফাঁসি না হওয়ায় আমরা হতাশ।’

বনানী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মীর মোশাররফ হোসেন একুশে আগস্টের গ্রেনেডের স্প্লিন্টার বহন করে চলছেন আজও। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চোখের সামনে সহযোদ্ধাদের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখেছি। আজ রায়ের পর ১৪ বছরের পুরনো ভারী পাথরটা বুকের ওপর থেকে সরে গেছে। এখন এই রায় বাস্তবায়ন হোক।’

একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সেদিন হামলায় আহত হয়েছিলেন বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেসসচিব আশরাফুল আলম খোকন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একজন ভুক্তভোগী হিসেবে আইনের শাসনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, সাধারণত রায় হয় প্রসিকিউশনের ওপর। কিন্তু একজন ভিকটিম হিসেবে আমি এই রায়ে খুশি নই। নারায়ণগঞ্জের ৭ খুনের মাস্টারমাইন্ড নূর হোসেনের ফাঁসি হলে ২১ আগস্টের ২৪ খুনের মাস্টারমাইন্ড তারেক রহমানের ফাঁসি হবে না কেন?’

২১ আগস্ট গ্রেনেডের স্প্লিন্টারে মারাত্মক আহত হন ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি মাহবুবা পারভীন। তিনি বলেন, ‘শরীরে অসংখ্য স্প্লিন্টার নিয়ে ১৪ বছর অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু রায়ে হামলার মূল নায়ক তারেক রহমানের সর্বোচ্চ শাস্তি হলো না। আমরা এখন আশঙ্কায় আছি আবার এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।’

২১ আগস্ট হামলায় আহত হয়েছিলেন কেরানীগঞ্জের আলতাফ হোসেন বিপ্লব ও সম্রাট আকবর। বিপ্লব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনো আমার শরীরে স্প্লিন্টার আছে। মাঝে মাঝে অসহ্য ব্যথা হয়। আমি এ মামলার একজন সাক্ষীও ছিলাম। তবে এ রায়ে আমি সন্তুট হতে পারলাম না। আমি সেদিন মরে গেলেও বাঁচতাম। এই রায়ে অপরাধীরা হাসবে আর আমরা স্প্লিন্টারের যন্ত্রণা নিয়ে কাঁদব।’

সম্রাট আকবর বলেন, ‘তারেক রহমানকে লন্ডন থেকে এনে যাবজ্জীবন সাজার পরিবর্তে ফাঁসি দিতে হবে—এটা দেশের ১৬ কোটি মানুষের দাবি। তারেক রহমানকে ফাঁসি দিলে মানব অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হবে।’

সাভারের স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেত্রী মাহবুবা পারভীন ওই হামলায় দেড় সহস্রাধিক স্প্লিন্টার শরীরে নিয়ে বেঁচে আছেন। মাহবুবা পারভীন মামলার রায়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন উল্লেখ করে বলেন, তারেক রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে তিনি আরো বেশি সন্তুষ্ট হতেন।

 

ঢাকার সাভার থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) থেকে প্রতিনিধির দেওয়া তথ্য এ প্রতিবেদনে যুক্ত হয়েছে।

 

মন্তব্য