kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

ক্যাসিনোর টাকা বিদেশে পাচার তিনভাবে

লায়েকুজ্জামান   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ক্যাসিনোর টাকা বিদেশে পাচার তিনভাবে

বাঁ থেকে— প্রদীপ ওরফে সুরেশ, রাজকুমার, অজয় পারকেল ও কৃষ্ণা থাপা। এঁরা সবাই নেপালের নাগরিক। ছবি : সংগৃহীত

ঢাকার ক্যাসিনোগুলোর আয়ের অর্থ তিনভাবে পাচার হচ্ছিল বিদেশে। প্রথমত, ক্যাসিনোগুলোয় কর্মরত বিদেশি নাগরিকরা তাঁদের বেতন ও অংশীদারি থেকে পাওয়া অর্থ নিজ দেশে পাচার করতেন। দ্বিতীয়ত, ক্যাসিনোগুলোর একাধিক মালিক নিয়মিত সিঙ্গাপুর, দুবাই, ব্যাংককে গিয়ে জুয়া খেলে ওড়াতেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। তৃতীয়ত, ক্যাসিনোর আয়ের টাকা পাচার করা হতো বিদেশে অবস্থানকারী সরকারের তালিকাভুক্ত একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীর কাছে। এসব তথ্য পাওয়া গেছে ঢাকার ক্যাসিনো মালিকদের রাজনৈতিক সহযোগীদের কাছ থেকে।

পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ ও ক্যাসিনোসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার ক্যাসিনোগুলোয় অংশীদারির ভিত্তিতে কাজ করেন ৯ জন নেপালি নাগরিক। ক্যাসিনো পরিচালনায় অভিজ্ঞ এসব নেপালি নাগরিকের বিভিন্ন দেশে ক্যাসিনোর ব্যবসা রয়েছে। ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশে এসে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়ে ক্যাসিনো ব্যবসা পরিচালনা করছেন তাঁরা। অনুসন্ধানে অংশীদারির ভিত্তিতে ক্যাসিনো পরিচালনাকারী ৯ নেপালি নাগরিকের নাম পাওয়া গেছে। ২০১৫ সাল থেকে এঁরা ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করছেন। এই ৯ নেপালি নাগরিক হচ্ছেন বিনোদ মানালী, অজয় পাকরেল, দীনেশ, রাজকুমার, প্রদীপ ওরফে সুরেশ, হেলমি, কৃষ্ণা থাপা, মালকি ও ছোট রাজকুমার। এঁরা সবাই ঢাকায় ক্যাসিনোর অংশীদার। এ ছাড়া নেপালের আরো প্রায় ২০ জন নাগরিক ঢাকার ক্যাসিনোগুলোতে কাজ করেন। এঁদের প্রত্যেকের মাসিক বেতন এক হাজার ডলার বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ দক্ষিণের এক শীর্ষস্থানীয় নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যুবলীগ যে পরিমাণ ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছে তাতে শেখ হাসিনা ছাড়া কারো পক্ষেই তাদের সামলানো কঠিন। সম্রাটের অফিসের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখলেই প্রমাণ মিলবে কী পরিমাণ নেপালি নাগরিক যাতায়াত করত।’

সিঙ্গাপুর, দুবাই, ব্যাংকক ও মালয়েশিয়ায় গিয়ে জুয়া খেলেন ঢাকার একাধিক যুবনেতা। বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন সূত্র জানায়, বেশ কয়েকজন যুবনেতার প্রতি দুই মাসে অন্তত একবার বিদেশ গমনের রেকর্ড রয়েছে। ওই সব নেতার পাসপোর্ট তল্লাশি করলে এই সত্যতা পাওয়া যাবে। এঁদের বেশির ভাগের গন্তব্য সিঙ্গাপুর, দুবাই, ব্যাংকক ও মালয়েশিয়া। এঁদের অনেকের ব্যাবসায়িক কম্পানি আছে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায়। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোমিনুল হক সাঈদ, সহসভাপতি আরমানুল হক আরমান, সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুইয়া, জামাল, সাবেক এক প্রতিমন্ত্রীর এপিএস মিজানুর রহমান মিজান, সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম প্রমুখ। যুবলীগের আরো কয়েকজন আছেন যাঁরা মাঝেমধ্যেই বিদেশ যান।

ক্যাসিনোসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ঢাকার মতিঝিলপাড়ার স্পোর্টিং ক্লাবগুলোয় জুয়ার আসর বসানো দীর্ঘদিনের পুরনো ঘটনা। বিএনপি সরকারের আমলে ক্লাবগুলোতে দেশীয় জুয়ার ব্যাপক প্রসার ঘটে। তবে আধুনিক জুয়ার আসর ক্যাসিনোর বিপ্লব ঘটে ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের হাত ধরে ২০১৫ সাল থেকে। সূত্রগুলো জানায়, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম করে ঢাকার যুবনেতাদের হাতে বিপুল অর্থ জমলে তাঁরা জুয়া খেলতে সিঙ্গাপুর যাওয়া শুরু করেন। ওই সময় ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও মোমিনুল হক সাঈদের পরিচয় হয় ক্যাসিনো পরিচালনায় অভিজ্ঞ কয়েকজন নেপালি নাগরিকের সঙ্গে। এর পরই সম্রাট দেশে ক্যাসিনো আনার উদ্যোগ নেন। তবে একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়, সম্রাট ক্যাসিনো আনার কয়েক মাস আগেই ঢাকার ভিক্টোরিয়া ক্লাবে ক্যাসিনো নিয়ে আসেন ওই ক্লাবের সভাপতি কাজল এবং সাধারণ সম্পাদক তুহিন। নেপালি নাগরিক রাজকুমার ও বিনোদ মানালী ওই ক্লাবের ক্যাসিনো পরিচালনার দায়িত্ব নেন। কয়েক মাস পরে ক্লাব কর্তৃপক্ষ রাজকুমার ও বিনোদ মানালীর কাছে দিনপ্রতি এক লাখ ৫০ হাজার টাকা চুক্তিতে ক্যাসিনোটি ভাড়া দিয়ে দেয়। এ ঘটনার পরই সম্রাট তার দলবল নিয়ে ভিক্টোরিয়া ক্লাবে হানা দেন। ওই সময় কিছুদিন ক্যাসিনোটি বন্ধ থাকে। পরে সম্রাটকে প্রতিদিন চার লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে আবার ক্যাসিনোটি চালু হয়। যুবলীগ দক্ষিণের নেতা আরমান ও খোরশেদ প্রতিদিন ওই টাকা সংগ্রহ করে সম্রাটকে দিতেন। ভিক্টোরিয়া ক্লাবে ক্যাসিনো চালুর কয়েক মাস পরই মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবে সংযোজন হয় ক্যাসিনোর। মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবে ক্যাসিনোর মূল মালিক ইসমাইল হোসেন সম্রাট হলেও কাগজপত্রে আলী হোসেন নামে একজনের নাম রয়েছে। জানা যায়, এই আলী হোসেন একজন বস্ত্র ব্যবসায়ী। সূত্র জানায়, আয়ের অংশ থেকে প্রতিদিন সম্রাটকে দেওয়া হতো পাঁচ লাখ টাকা। মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবও অংশীদারির ভিত্তিতে পরিচালনা করতেন নেপালি নাগরিক দীনেশ ও রাজকুমার। তাঁদের অংশীদারি ছিল ৩৫ শতাংশ।

বনানীর গোল্ডেন ক্লাবে ক্যাসিনোর সূচনা করেন দুজন ব্যবসায়ী। আবদুল আওয়াল ও আবুল কাশেম। এই ক্যাসিনো চালুর খবর সম্রাটের কাছে পৌঁছালে তিনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে ক্লাবটি সিলগালা করিয়ে দেন। দুই মাস বন্ধ থাকার পর সম্রাটের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আবার চালু করা হয় ক্যাসিনোটি। চুক্তি হয় প্রতিদিন সম্রাটকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হবে। এরপর ক্লাবটির সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নিতে সম্রাট দক্ষিণ যুবলীগের সহসভাপতি আরমানকে ক্লাবটির মালিকানায় ঢুকিয়ে দেন। ক্লাবটি থেকে প্রতিদিন পাঁচ লাখ টাকা সম্রাটের কাছে পৌঁছে দিতেন আরমান। ক্লাবটির ক্যাসিনো পরিচালনা করতেন নেপালি নাগরিক অজয় পারকেল।

স্বেছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওছার ও দক্ষিণ যুব লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোমিনুল হক সাঈদের ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের ক্যাসিনো পরিচালনা করতেন নেপালি নাগরিক হেলিমি। ওই ক্লাব থেকে সম্রাটকে কোনো টাকা দিতে হতো না।

রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার ফুওয়াং ক্লাবে ক্যাসিনো চালু করেন নুরুল ইসলাম নামের একজন ব্যবসায়ী। তেজগাঁও জোনের একজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে বিরোধের জের ধরে ক্যাসিনোটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ইসমাইল হোসেন সম্রাটের মধ্যস্থতায় আবারও চালু করা হয় ক্লাবটি। এই ক্লাব থেকে সম্রাটকে প্রতিদিন দুই লাখ টাকা করে চাঁদা দেওয়া হতো। নুরুল ইসলাম পুরস্কারঘোষিত এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর আত্মীয়।

আরামবাগ ক্লাবে ক্যাসিনো চালু করেন সম্রাটের ঘনিষ্ঠ দক্ষিণ যুবলীগের নেতা জামাল ও দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোমিনুল হক সাঈদ। তবে এঁদের মূল হোতা হচ্ছেন খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। আয়ের বড় অংশ নিয়ে নিতেন তিনি। 

সূত্র জানায়, আরামবাগ ক্লাব থেকে দিনপ্রতি সম্রাটের সেলামি ছিল দুই লাখ টাকা। সম্রাটের ঘনিষ্ঠ ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের নেতা ইমরান ক্যাসিনো চালু করেন মোহামেডান ক্লাবে। ওই ক্লাবে ৪০ শতাংশ অংশীদারিতে ক্যাসিনো পরিচালনা করতেন নেপালি নারী কৃষ্ণা থাপা। এই ক্লাব থেকে সম্রাটের হয়ে প্রতিদিন পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা সংগ্রহ করতেন তাঁর ক্যাশিয়ার আরমান।

শতকরা ৪০ ভাগ অংশীদারিতে দিলকুশা ক্লাবে ক্যাসিনো পরিচালনা করতেন নেপালি নাগরিক দীনেশ, সুরেশ ও ছোট রাজকুমার। ওই ক্লাব থেকে প্রতিদিন ছয় লাখ টাকা নিতেন সম্রাট।

খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার ইয়ংমেনস ক্লাবের সঙ্গে কোনো নেপালি নাগরিকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া একসঙ্গে আরো দুটি ক্লাবের ক্যাসিনো চালাতেন। আরামবাগ ক্লাবে তাঁর অংশীদার ছিলেন যুবলীগ নেতা জামাল ও মোমিনুল হক সাঈদ। অন্যদিকে মেরিনার্স ক্লাবে খালেদের অংশীদার ছিলেন নেপালি নাগরিক প্রদীপ ওরফে সুরেশ। এলিফ্যান্ট রোডের এজাক্স ক্লাবে ক্যাসিনো শুরু করেন সম্রাটের ক্যাশিয়ার যুবলীগ দক্ষিণের নেতা আরমান, তছলিম ও খোরশেদ। নেপালি নাগরিক ছোট রাজকুমার ওই ক্লাবের ৪০ শতাংশের অংশীদার। এই ক্লাব থেকে সম্রাটকে প্রতিদিন দেওয়া হতো তিন লাখ টাকা করে। নেপালি নাগরিক ছোট রাজকুমার ও মালকিকে ৩০ শতাংশ অংশীদারি দিয়ে রাজধানীর উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরে ক্যাসিনো চালু করেন স্থানীয় যুবলীগ নেতা তছলিম।

ক্যাসিনোসংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতি রাতে ঢাকায় ক্যাসিনোগুলোতে ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকার জুয়া খেলা হতো। এর মধ্যে মালিকদের লাভ থাকত গড়ে ৫০ কোটি টাকা। ওই লভ্যাংশ থেকে পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের চাঁদা দেওয়ার পরও নেপালি নাগরিকদের কাছে চলে যেত প্রায় ৪০ শতাংশ টাকা।’ নেপালি নাগরিকদের ক্যাসিনোর অংশীদারি এবং নেপাল থেকে ক্যাসিনোতে চাকরি করতে আসাদের বেতন বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রতি মাসে দেশের বাইরে চলে যেত।

গোয়েন্দা সূত্র থেকে জানা যায়, র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া জিজ্ঞাসাবাদে গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন, ক্যাসিনোর আয়ের বড় একটি অংশ তিনি বিদেশে অবস্থানকারী একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীর কাছে পাঠাতেন। ওই সব শীর্ষ সন্ত্রাসীর মধ্যে ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়ে বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করা জিসানের নাম বলেছেন খালেদ।

এ ছাড়া ক্যাসিনোসংশ্লিষ্ট একাধিক যুবলীগ নেতা নিয়মিত সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক ও দুবাই গিয়ে জুয়া খেলে বিপুল পরিমাণ অর্থ উড়িয়ে আসতেন। দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটের চীনা বান্ধবী মিন্ডি লির জন্মদিন পালনের বিষয়টি বহুল আলোচিত ঘটনা। শুধু সম্রাট নন, যুবলীগের একাধিক নেতা সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় তাঁদের দ্বিতীয় আবাস গড়তে বাড়ি-ফ্ল্যাট কিনেছেন। কেউ কেউ কম্পানিও খুলেছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা