kalerkantho

ইংল্যান্ডের বিশ্বজয়ে ক্রিকেট রোমাঞ্চ

মোস্তফা মামুন, লন্ডন থেকে   

১৫ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইংল্যান্ডের বিশ্বজয়ে ক্রিকেট রোমাঞ্চ

অবশেষে শিরোপা ধরা দিল ইংল্যান্ডকে। নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বজয়ের আনন্দে মাতোয়ারা মরগানরা। ছবি : মীর ফরিদ

দেড় মাস আগে কেউ যদি বলত যে ইংল্যান্ড বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবে, লোকে তাকে আধুনিক ক্রিকেটের খবর রাখা বোধসম্পন্ন ক্রিকেট সমর্থক ভাবত।

কিন্তু যদি বলত, ফাইনালে ২৪১ রানের প্রথম ইনিংসের পরও ধুন্ধুমার উত্তেজনা হবে। টাই হয়ে ম্যাচ সুপার ওভারে যাবে, তাহলে তাকে পাগল ভাবত।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে এটা সম্ভাব্য রান স্রোতের বিশ্বকাপ। তার ফাইনালে কিনা ২৪১ হয়েও লড়াই! এবং তাও কিনা ইংল্যান্ডের দুর্ধর্ষ ব্যাটিং সেটা করতে পারবে না। তার জন্য সুপার ওভারের সাহায্য লাগবে!

ও হ্যাঁ, সুপার ওভারেও তো সেই সমতা। ১৫ রানের নাটকে এই অধ্যায় শেষ হওয়ার পর ইংল্যান্ড যে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন তাও আরেক নিয়মের সুবিধায়। সুপার ওভার সমান হলে দেখা হবে ৫০ ওভারে বাউন্ডারি-ওভার বাউন্ডারির সংখ্যা। তাতে এগিয়ে থাকার সুবাদে ইংল্যান্ডের শ্রেষ্ঠত্ব। ক্রিকেট ফিরল জন্মভূমিতে।

সত্যিই এমন ক্রিকেট পাগলামি হলো। ঘটনার আধঘণ্টা পরও ঠিক  বিশ্বাস হচ্ছে না। মনে হচ্ছে না যা দেখেছি তা বিকালের বিভ্রম। ঘোর কেটে গেলে দেখব যা দেখেছি আসলে তা ঘটেইনি। বাস্তবতা কখনো কখনো কল্পনাকে এমনভাবে ছাড়িয়ে যায়, সত্যের মধ্যে থেকেও মনে হয় অন্য রাজ্যে চলে গেছি।

লর্ডসের প্যাভিলিয়নে বসেন ক্রিকেট সম্ভ্রান্তরা। এঁরা স্যুট-কোট পরে আসেন। গাম্ভীর্য ধরে রাখতে উত্তেজনার কাছে নিজেদের সমর্পণ করেন না। কিন্তু কাল সুপার ওভারের আগে দেখি তাঁদের অনেকে দাঁড়িয়ে। কেউ কেউ লাফাচ্ছেন। মনে হলো, ক্রিকেটের আধুনিকতার সৌন্দর্য শেষ পর্যন্ত আভিজাত্যের দরজায় জায়গা পেল। এই এক দিনের চটকদার ক্রিকেট তো ঠিক লর্ডসের জিনিস নয়। তাই তাঁরা গ্রহণ করলেও ঠিক সমাদর করেন না। কাল করলেন। করতে বাধ্য হলেন।

ক্রিকেট ঘরে ফিরল। ফুটবলের সময়ই স্লোগানটা চালু হয়েছিল। ‘ইটস কামিং হোম’। আসেনি। হাতছানি দেখাতে দেখাতে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। সেটা ক্রিকেটে সত্য হলো। দুধের স্বাদ ইংল্যান্ডের তাতে মিটল কি না কিন্তু ক্রিকেট যেন ফেরার আগে নিজের সৌন্দর্যের সেরা চেহারাটা দেখাল। বিশ্বকাপ ফাইনাল ঐতিহাসিকভাবে একপেশে চরিত্রের। এর আগে যে একটা ফাইনালে খানিক উত্তেজনা মিলেছিল, সেটা ১৯৮৭ সালে। ৭ রানে হেরেছিল ইংল্যান্ড। কাল কেউ হারল না। কেউ জিতল না। আসলে জিতল ক্রিকেট। অনেক সময় কথাটা ব্যবহৃত হয়। উত্তেজনার আতিশয্যে। কিন্তু কালকেরটা চূড়ান্ত বাস্তবিক। সত্যিই তো কেউ জেতেনি। কেউ হারেনি। দুই দফা খেলা টাই—৫০ ওভারেও, সুপার ওভারেও। জয়ী তাহলে কে? ক্রিকেট। তবে কোনোভাবে এক দলকে আলাদা করতে হয় বলে সেটা ইংল্যান্ড। সুবাদে ওরা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। কিন্তু সত্যি বললে সিন্দুক থেকে রোমাঞ্চের রেণু বেরোতে বেরোতে ক্রিকেট এমন উচ্চতায় গেল যে ওদের বিশ্বজয়টা দ্বিতীয় বিষয়। এক নম্বর বিষয়, ক্রিকেট রোমান্সের অতিজাগতিক দৃশ্যায়ন।

কয়েক বছর আগে বেন স্টোকস টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে শেষ ওভারে কার্লোস ব্রাথওয়েটের কাছে চার ছয় খেয়ে চিরন্তন দুঃখ বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু ক্রিকেটের লেনদেনের নিজস্ব একটা হিসাব আছে। যারা হেরে না গিয়ে লড়ে যায় তাদের দুঃখ ক্রিকেটই দূর করে দেয়। মনে হচ্ছিল কাল ক্রিকেট ভাগ্যের সেই পাওনা মেটানোর দিন। দুঃখী রাজকুমারের উত্তরণ হবে সাফল্যের রাজত্বে। কী লড়াইটা করলেন। বিস্ফোরক কিউই বোলিংয়ের ভাষা পড়তে না পেরে ৮৬ রানে ফিরে গেছেন ইংল্যান্ডের প্রথম চারজন। ২৪২-কে তখন দেখাচ্ছে মাউন্ট এভারেস্ট। তিনি তেনজিং হতে শুরু করলেন। ঝড়-ঝাপটা এলো, দারুণ সঙ্গ দিয়ে ১১০ রানের পার্টনারশিপের পর বাটলার ফিরে গেলেন। ম্যাচ আবার সমতার পাল্লায়। একটু পর দুটি উইকেটের পতনে আবার হেলে পড়ে নিউজিল্যান্ডের দিকে। শেষ ওভারে চাই ১৫ রান। স্টোকস ভাগ্যের সহায়তা পেতে শুরু করলেন। বাউন্ডারিতে ক্যাচ হলো, কিন্তু দেখা যায় ফিল্ডারের পা লাইনের ওপর। আউটের বদলে ৬। তাহলে মঞ্চ তৈরি হচ্ছে। তারপর যা হলো সেটা আরো অবিশ্বাস্য। ডাবলস নিতে গিয়ে ওভার থ্রো তাঁর ব্যাটে লেগে বাউন্ডারিতে। দুই রানের সঙ্গে বাউন্ডারি মিলিয়ে ছয়। ভাগ্য উপুড় করে দিচ্ছে স্টোকস আর ইংল্যান্ডকে। কিন্তু কিউইরা যে হাল ছাড়ে না। সীমিত শক্তি দিয়ে বীরবিক্রমে লড়ে যাওয়ার যে অসামান্য ক্ষমতা তাতে ওদের হারতে দেখলে কেমন লাগে। ক্রিকেট দেবতা সিদ্ধান্তহীনতায়। এতটাই যে ম্যাচ টাই। দুই ছক্কার নাটকে শেষ বলে দরকার ২, তা নিতে গিয়ে মার্ক উড রান আউট। ম্যাচ সুপার ওভারে।

বিশ্বকাপ ফাইনাল সুপার ওভারে। এতেই তো হতো। বেশি হয়ে গেল এর চেয়ে। স্টোকসের রাজত্বের বদলে আবার দ্বিতীয় দফা ট্র্যাজেডিতে ডোবার শঙ্কা। কিন্তু সুপার ওভারে আবার তিনি। সঙ্গে বাটলার। আবার সেই ১৫ রান। যথেষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা। কারণ যিনি ইংল্যান্ডের সুপার ওভার করবেন সেই জোফরা আর্চার বিশ্বকাপে কোনো ওভারেই ১৫ রানের বেশি দেননি। ততক্ষণে জানা হয়ে গেছে নিউজিল্যান্ডকে ১৬ রান করতেই হবে, না হলে বাউন্ডারির হিসাবে ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন। বড় এক ছক্কায় নিশাম নিজেদের দিকে পাল্লাটা টেনে এনেছিলেন, শেষ বলে দরকার পড়ে ২। সেই ম্যাচের ২ আবার। পুরো যেন ‘দেজা ভু’ হচ্ছে। লর্ডসকে লৌকিক আলোচনায় ক্রিকেটের স্বর্গ বলা হয়। কাল সেই সময়টাতে সত্যিই স্বর্গ মনে হচ্ছিল। স্বর্গেই তো এমন স্বপ্নের ছবি সম্ভব। সেই ২ রান নিতে গিয়ে আবার রান আউট। এবং কাকতালীয় ব্যাপার এখানেই শেষ হচ্ছে না। হয়েছেন গাপটিল। যিনি এর আগে ওভার থ্রো করে ৬ রান দেওয়াজনিত কারণে ভিলেন। ভিলেন! সেমিফাইনালে মহেন্দ্র সিং ধোনিকে রান আউট করার থ্রোটিও ছিল তাঁর। ক্রিকেটে আসলে জীবনের মতো কোনো কিছুই চূড়ান্ত নয়। এক নিমেষে সব বদলায়। বদলায় বলেই স্টোকস ট্র্যাজিক নায়ক হতে হতে নায়ক হয়ে যান। যে গাপটিলের থ্রো আগের দিন গল্পগাথায় ঢুকে যায় তিনি আবার সেই থ্রোর অপকীর্তিতে কাঠগড়ায় দাঁড়ান।

লর্ডসের অভিজাতদের বেশির ভাগ এখনো বসে আছেন। হাততালি দিচ্ছেন। তাঁদের ঐতিহ্যের মুকুটে একটা কাঁটার দাগ ছিল। বিশ্বশ্রেষ্ঠত্ব যে কোনো দিন পাওয়া হয়নি। এতকালের দুঃখ ঘুচল। ইংল্যান্ডের বিশ্বজয়ের আরো অনেক তাৎপর্য আছে। তবু কালকের দিনে সেসব কিছুকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না।

ইংল্যান্ড দল ল্যাপ অব অনার দিচ্ছে। ঘোরের মধ্যে থাকা দর্শকরা সম্ভাষণ জানাচ্ছে। কিন্তু এই জয়োল্লাসটাকে সঠিক মনে হচ্ছে না। ওরা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন কিন্তু ওরা জেতেনি। নিউজিল্যান্ডও হারেনি। আসলে সামান্য অঙ্কের হার-জিতের স্তর পেরিয়ে গেছে এদিনের ক্রিকেট।

ক্রিকেট তাই কাল ঘরে ফিরল না। জয়ী-পরাজিত সবাইকে নিয়ে বেরোল এক ঊর্ধ্বমুখী অভিযানে। সর্বোচ্চ চূড়ায়ও কালকের ক্রিকেটের সুর আর সৌন্দর্যকে কুর্নিশ করতে তৈরি সবাই।

ফটো ফিচার

মন্তব্য