kalerkantho

সোমবার। ১৯ আগস্ট ২০১৯। ৪ ভাদ্র ১৪২৬। ১৭ জিলহজ ১৪৪০

► বাংলাদেশি শ্রমিকদের ক্রীতদাস বানিয়ে শোষণ ► বিমানবন্দরেই পাসপোর্ট হরণ ► ইচ্ছামতো মজুরি কর্তন

মালয়েশিয়ায় কম্পানি খুলে দাস ব্যবসা

আপনার আদরের ছেলেটি, স্নেহের ভাইটি অথবা জীবনসঙ্গীর মতো দুই লাখ ৭৫ হাজার ৭১৪ জন তরুণ-যুবক মালয়েশিয়ায় গেছে জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে। তারাসহ মালয়েশিয়ায় এখন বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক। একটু সুখের আশায় পরিবার-পরিজন ফেলে সর্বস্ব ব্যয় করে তারা খেটে মরছে বিদেশ-বিভুঁইয়ে। সুখের দেখা অনেকের মিলেছে, অনেকের মেলেনি। তারা পড়েছে অসাধুদের পাল্লায়। কালের কণ্ঠ দৃষ্টি দিয়েছে সেই বিপন্ন শ্রমিকদের দিকে, মালয়েশিয়ায় যারা আজ স্বপ্নহত্যার শিকার। দুই দেশে গভীর অনুসন্ধান চালিয়ে বের করে আনা হয়েছে দেশের ছেলেদের করুণ পরিণতির নেপথ্য নিয়ামক। এই আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানে কালের কণ্ঠ’র সহযোগী হয়েছে ওই দেশের স্বনামধন্য সংবাদমাধ্যম মালয়েশিয়াকিনি

হায়দার আলী, মালয়েশিয়া থেকে ফিরে   

২৩ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৯ মিনিটে



মালয়েশিয়ায় কম্পানি খুলে দাস ব্যবসা

ধারাবাহিক প্রতিবেদন ১

যে শ্রমিকের শ্রমে-ঘামে পুষ্ট রেমিট্যান্সে সমৃদ্ধ হচ্ছে দেশের অর্থনীতি, সেই প্রবাসী কর্মীদের জীবন-জীবিকা স্বচক্ষে দেখতে যেতে হবে মালয়েশিয়ায়। গত বছরের ৩ অক্টোবর বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে চড়ে বসতেই নজর কাড়ল পাশের সিটে বসা টগবগে যুবকটি। চেহারায় চঞ্চলতা। চোখে-মুখে বিস্ময় আর রোমাঞ্চ। জানা গেল, নাম তার সোহেল। বাড়ি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার গোপালদি গ্রামে। আত্মীয়-স্বজন আর এনজিও থেকে ধারদেনা করে সাড়ে তিন লাখ টাকা দালালের হাতে তুলে দিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে মালয়েশিয়ায়; দরিদ্র মা-বাবার সংসারে সচ্ছলতা আনার আশায়। সোহেলের মতো আরো অন্তত ৪০ জন তরুণ-যুবকের দেখা মিলল ওই ফ্লাইটে। অনেকের পরনে একই রঙের টি-শার্ট; অনেকের মাথায় ক্যাপ—সবই শ্রমিকের চিহ্ন। সবার চোখে-মুখে দারিদ্র্যজয়ের স্বপ্নাঞ্জন।

ঘণ্টা চারেক পর মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে নামতেই অলক্ষুণে সূচনা—যার যার কম্পানির লোক এসে কাগজপত্রের সঙ্গে নিয়ে নিল পাসপোর্টও। আর সেই সঙ্গে শ্রমিকবেশী স্বপ্নবিভোর এই বঙ্গসন্তানদের ললাটে যে অদৃশ্য সিল পড়ল ক্রীতদাসের, তা টের পেল না কেউ।

টের পাওয়া গেল মালয়েশিয়ায় ১০ দিনের সরেজমিন অনুসন্ধানে। প্রায় দুই হাজার ১০০ কিলোমিটার ঘুরে, ১৫টি কম্পানি-ফ্যাক্টরি পরিদর্শন করে এবং আরো ৩৪টির নথিপত্র ঘেঁটে অন্তত ৭৮ জন শ্রমিকসহ ১৪১ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে প্রথম যে সত্য উদ্ঘাটন করা গেল তা হলো—জীবিকার সন্ধানে মালয়েশিয়ায় আসা বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রায় সবাই আজ ‘আধুনিক ক্রীতদাস’। দেশে থাকতে তারা ছিল মা-বাবার আদরে-শাসনে বেড়ে ওঠা, অভাবে-অনটনে পথহারা, ভাই-বোন-পরিজনের ‘আশার গুড়ে বালি’ দেওয়া একেকটা দিশাহারা সন্তান; আজ তারা মালয়েশিয়ার স্বপ্নরথে ভেসে আসা শ্রমিকরূপী এক একজন ক্রীতদাস। আর মালয়েশিয়ায় এই দাস ব্যবসা চলছে রীতিমতো কম্পানি খুলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে।

বিমানে দেখা হওয়া সোহেল বা অন্য শ্রমিকরা কে কোথায় গেছে, খোঁজ রাখা সম্ভব হয়নি। তবে তাদের মতোই হতভাগা একদল বাংলাদেশি শ্রমিকের সন্ধান মিলল ১০ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টায় কুয়ালালামপুরে এক দালালের অফিসে গিয়ে। ১১৫/৩ কামপং পান্ডান এলাকায় এসএনটি গ্রুপের চারতলা ভবনের নিচতলায় কাচের দরজা তালাবদ্ধ। পকেট গেট খুলে অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই দেখা গেল, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার দরজাও তালাবদ্ধ। চতুর্থ তলায় একটি খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে, একদল লোক মেঝেতে শুয়ে-বসে আছে। তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে একটু আগেই। ওই তলায় চারটি ঘর, একটি রান্নাঘর আছে। অন্য তিনটি ঘরেও একই দৃশ্য। কুমিল্লা ও নরসিংদীর দুজন শ্রমিক সাইফুল ইসলাম ও মোবারক হোসেন বললেন, ‘আমাদের মালয়েশিয়ায় আনা হয়েছে কম্পানির চাকরির জন্য। কিন্তু কোথাও না নিয়ে বাবুলের এই অফিসে আটকে রাখা হয়েছে। কিছু টাকা পাওনা আছে, সেটা পরিশোধ না করলে নাকি আমাদের ছাড়া হবে না।’ বিল্লাল নামের এক শ্রমিক বলেন, ‘গত রাতেই আমরা ১৬ জন একসঙ্গে বাংলাদেশ থেকে এসেছি। এয়ারপোর্টেই পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে কোনো কারখানায় না নিয়ে এখানে আটকে রাখা হয়েছে।’ কোন কারখানায় কী কাজের জন্য এসেছেন—জানতে চাইলে কেউ কিছুই বলতে পারেন না; শুধু বলেন, ‘সব জানে বাবুল ভাই।’

জানা গেল, এই অফিসের ‘বস’ শহীদুল ইসলাম বাবুল, মালয়েশিয়ায় যিনি ‘চিটার বাবুল’ নামে পরিচিত। এক মালয়েশীয়র সঙ্গে অংশীদারির ভিত্তিতে আদম ব্যবসা চালিয়ে আসছেন তিনি। ভবনের নিচের দুটি ফ্লোরে অফিস, ওপরের দুটিতে অস্থায়ী আবাসন। বিদেশ থেকে কর্মী এনে এখানেই রাখা হয়। পরে সুবিধামতো একেকজনকে একেক কারখানায় বিক্রি করে বা ভাড়া দিয়ে ইচ্ছামতো কাজ করানো হয়।

দেশে ফিরে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সি আর আবরারকে বিষয়টি জানালে তিনি একবাক্যে বললেন, ‘এটা তো দাসত্ব; আধুনিক দাসত্ব। আগে ক্রীতদাসকে যেভাবে আটকে রাখা হতো, প্রায় সে রকমই আটকে রাখা হচ্ছে তাদের।’

মালয়েশিয়ায় ঘুরে যেসব বাংলাদেশি ক্রীতদাসের দেখা মেলে, তাদের অবস্থা প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক হাওয়ার্ড ফাস্টের স্পার্টাকাস-ক্রীতদাসদের চেয়েও করুণ। স্পার্টাকাস চলচ্চিত্রটি যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা এই প্রতিবেদকের চোখ দিয়ে মালয়েশিয়ায় দেখা আধুনিক দাসত্বের চিত্রটা দেখে নিলেই বুঝবেন, কতটা করুণ সেই জীবন। ৩ অক্টোবর কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে নেমেই শ্রমিকদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়ার ঘটনায় দাসত্বের যে অদৃশ্য শৃঙ্খল চোখে ভেসে ওঠে, পরের ১০ দিনের ভ্রমণে সে দেশের সাতটি রাজ্য-জেলা-শহরের পরতে পরতে দেখা গেছে, কিভাবে সেই শৃঙ্খলে আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে গেছে শ্রমিকজীবন। দুই হাজার ১০০ কিলোমিটার ঘুরে বোঝা গেছে, এখানে পদে পদে পাতা রয়েছে শ্রমিক শোষণের বিচিত্র ফাঁদ।

৪ অক্টোবর স্থানীয়  সময় দুপুর আড়াইটায় সেলেঙ্গার শহরের টিয়ং টট প্রিন্টিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের শ্রমিক ডরমিটরিতে গিয়ে দেখা গেল, আনুমানিক ১৬x১২ ফুট আকারের একেকটি ঘরে ২০ জন শ্রমিক গাদাগাদি করে বসবাস করছে। এ রকম প্রায় ৪০টি ঘরে ৮০০ শ্রমিকের বসবাস। প্রতিটি ঘরের ২০ জন বাসিন্দার জন্য একটি করে বাথরুম। ৫ অক্টোবর কুয়ালালামপুরের পুত্রাজায়ায় পুলম্যান হোটেলের শ্রমিক ডরমিটরিতে গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকদের একটি গাড়িতে তুলে কয়েদির মতো করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কর্মস্থলে। গাড়িতে পাহারায় আছে তামিল নিরাপত্তারক্ষী। জানা গেল, ডিউটি শেষে ওভাবেই আবার তাদের দিয়ে যাওয়া হয় বাসস্থানে। আর এই কড়া পাহারার উদ্দেশ্য—দাসরূপী শ্রমিকরা যাতে পালাতে না পারে। ৬ অক্টোবর সকাল ১১টার দিকে পাহাং রাজ্যের ক্যামরুন হাইল্যান্ডে একদল বাংলাদেশি কৃষি শ্রমিকের দেখা মেলে ঢাকার বস্তির মতো বস্তিঘরে। ছেঁড়া পলিথিন দিয়ে বানানো একেকটা ঘরে মাটিতে ভাঙা চৌকি পেতে ঘুমানোর ব্যবস্থা, তার নিচেই ছেঁড়া কাগজ বিছিয়ে খাবারের আয়োজন, সেখানেই বাচ্চাসহ বিড়ালের ঘোরাঘুরি, স্যাঁতসেঁতে ঘরের এক কোণে কাপড় দিয়ে ঘিরে ‘মিনি মসজিদ’ বানিয়ে নামাজ পড়ার চেষ্টা চলছে। ১৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ৯টার দিকে জহুর বারু প্রদেশের বাতু কেলান এলাকায় বাংলাদেশি দালালদের নামসর্বস্ব কম্পানি গোল্ডমাইন এন্টারপ্রাইজের একটি গুদামে দেখা মেলে, মিষ্টি কুমড়া আর ডালের বস্তার স্তূপের পাশে ২৪ জন শ্রমিককে দুই সারিতে বসে কাঙালিভোজের মতো করে খাওয়ানো হচ্ছে। খাবারের মেনু—সাদা ভাত, কুমড়াঘণ্ট আর পাতলা ডাল। শ্রমিকরা খেয়েদেয়ে ওই গুদামের মধ্যে বস্তার স্তূপের পাশেই পলিথিন বিছিয়ে শুয়ে পড়লেন। এরপর ৮ অক্টোবর রাতে মালয়েশিয়ার কাজাং শহরের পাশে একটি জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায় 

 গিয়ে পড়ি এক মর্মন্তুদ দৃশ্যের সামনে। এখানে জঙ্গলের ভেতর ডেরা গেড়েছে নানাভাবে অবৈধ হয়ে পড়া একদল শ্রমিক। বাংলাদেশের বেদেপল্লীর মতো জরাজীর্ণ ছাউনিঘরে তারা রাতের আঁধারে কোনো মতে লুকিয়ে থেকে দিনে কর্মস্থলে চলে যায়। তাদের চোখে-মুখে ভয়, চেহারায় উদ্বেগ। এই ডেরায় ১০-১২ জন শ্রমিক একজনকে পাহারায় রেখে তিন-চার ঘণ্টার জন্য পালা করে ঘুমিয়ে নেয়।

১০ দিনের মালয়েশিয়া ভ্রমণের সময় পদে পদে চোখে পড়ে এ রকম শ্রমিকবেশী আধুনিক ক্রীতদাসদের মানবেতর জীবন।

গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় কুয়ালালামপুরে দেখা হয় জিদান হাওলাদার জনির সঙ্গে। বাগেরহাটের হুমায়ুন কবির হাওলাদারের ছেলে জনি মালয়েশিয়ায় পা রাখেন ২০১৭ সালের ১৭ এপ্রিল। ক্লিনারের চাকরি দেওয়ার কথা বলে তাঁকে কুয়ালালামপুরে নিয়ে যায় স্থানীয় প্রতিষ্ঠান পিএসএল রিসোর্সেস। কিন্তু কথা রাখেনি নিয়োগদাতা। দুই বছরে সাতটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করানো হয় তাঁকে। বিভিন্ন খাত দেখিয়ে তাঁর বেতন-ভাতা থেকে প্রায় অর্ধেকটা কেটে রাখা হয়।

২০ বছরের এই যুবক বলেন, ‘এখানে আসার পর একের পর এক প্রতিষ্ঠানে দাসের মতো ব্যবহার করল আমাদের, কিন্তু ঠিকমতো বেতন পেলাম না। পৌনে দুই বছরের মাথায় ভিসা নবায়নের জন্য চার হাজার রিঙ্গিত দাবি করে; দিইনি বলে পাসপোর্ট ফেরত না দিয়েই আমাকে কম্পানি থেকে বের করে দেয়।’

জনির কাছে থাকা কাগজপত্র ঘেঁটে এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মালয়েশিয়ায় আসার পর একটা ঘরে ১০-১২ জনের সঙ্গে গাদাগাদি করে থাকতে দিয়ে চার দিন পর তাঁকে প্রথমে কাজ দেওয়া হয় পুত্রাজায়ার পাঁচতারা হোটেল পুলম্যান কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টারে। ক্লিনারের পরিবর্তে দেওয়া হয় কিচেনের কাজে। কিছুদিন করে সেটা বদলে দেওয়ার আবেদন করলে ওরা বলে, তিন মাসের বেতনের টাকা কম্পানিকে বিনা শর্তে দিতে হবে। নিরুপায় হয়ে তা-ই করেন জনি। পরে তাঁকে আরেক পাঁচতারা হোটেল ইকুয়েটোরিয়াল পেনাংয়ে ক্লিনারের কাজ দেওয়া হয়। এখানেও তাঁর পারিশ্রমিক থেকে অর্ধেক টাকা কেটে রাখে পিএসএল। এই কম্পানি জিদান জনিকে সর্বশেষ ভাড়ায় খাটায় কুয়ালালামপুর শহরের সিলকা চিরাস হোটেলে। এ বছর জানুয়ারি মাসে পিএসএল থেকে দেওয়া জিদানের বেতন রসিদে দেখা যায়, চিরাস হোটেলে ১৫ দিন কাজের বেতন ধরা হয়েছে ৯০১.৩৫ রিঙ্গিত; কিন্তু দেওয়া হয়েছে ২৫০.৫১ রিঙ্গিত। বেতন কাটার খাতগুলো দেখানো হয়েছে—মেইনটেন্যান্স ৪৬, পেনাল্টি ৫০০, অ্যাডভান্স ১০০ রিঙ্গিত—মোট ৬৫০.৪৪ রিঙ্গিত।

জিদা ন জনি বলেন, ‘ওই মাসে আমি ২৪ দিন কাজ করেছি; কিন্তু বেতন ধরা হয়েছে ১৫ দিনের, সেখান থেকেও কেটেকুটে শেষ। এই টাকায় নিজে খাব নাকি দেশে পাঠাব? ঋণই বা কিভাবে শোধ করব!’

একই কম্পানির আরো ছয়জন শ্রমিক একই ধরনের অভিযোগ করেছেন এই প্রতিবেদকের কাছে। তবে তাঁরা চাকরি হারানো ও দেশে ফেরত যাওয়ার ভয় থেকে তাঁদের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান। তাঁদের একজন বলেন, তিনি কাজ করতেন পুত্রাজায়ার পাঁচতারা মানের পুলম্যান হোটেলে। পরে এক হাজার ৫০০ রিঙ্গিত বাড়তি দিয়ে কাজ পেয়েছেন তামু হোটেলে। এই হোটেলে তাঁর সহকর্মীদের বেতন মাসে আড়াই হাজার রিঙ্গিত হলেও পিএসএল তাঁকে দিচ্ছে দেড় হাজার করে। সেটা থেকেও নানা খাত দেখিয়ে প্রতি মাসে কেটে নেওয়া হচ্ছে ৫০০ রিঙ্গিত করে। অন্য পাঁচজন জানান, তাঁদের কাজ করানো হচ্ছে পেনাংয়ের ইকুটোরিয়া হোটেলে। অথচ চুক্তি অনুযায়ী জিদান জনিসহ তাঁদের সবারই কাজ পাওয়ার কথা পিএসএল কম্পানিতে। কিন্তু মালয়েশিয়ায় এসে স্বচক্ষেই দেখা গেল, পিএসএলের নেই কোনো শিল্প-কারখানা বা নিজস্ব কোনো কর্মস্থল। তারা শ্রমিক এনে বিভিন্ন কারখানায় কাজে দিয়ে কমিশন আদায় করে। ১৬ জন শ্রমিকের বিভিন্ন স্থানে কাজ করার ছবিসহ নথিপত্র এই প্রতিবেদকের সংগ্রহে আছে।

মালয়েশিয়ায় প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন ক্যারাম এশিয়ার সাবেক সমন্বয়কারী হারুন-উর রশিদ। তাঁরও ভাষ্য, কম্পানিরূপী দালালদের প্রতারণার কারণে অনেক কারখানায়ই বাংলাদেশি শ্রমিকরা ক্রীতদাসের মতো ব্যবহৃত হচ্ছে। দালাল কম্পানিগুলো অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বেশি বেতনে চুক্তি করে শ্রমিকদের কম বেতন ধরিয়ে দিয়ে বাকিটা আত্মসাৎ করে; আবার সেই কম বেতন থেকেও নানা ছুতায় টাকা কেটে নেয়।

পিএসএল রিসোর্সেসের ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা গেল, স্যামসাং ইলেকট্রনিকস, পুলম্যান হোটেল, লাফার্জ সিমেন্টসহ বেশ কিছু বহুজাতিক কম্পানি তাদের গ্রাহক। তাদের কম্পানি প্রফাইলে ‘বিদেশি জনশক্তি সরবরাহকারী’ পরিচয় থাকলেও কালের কণ্ঠ’র মালয়েশীয় সহযোগী সংবাদমা ধ্যম ‘মালয়েশিয়াকিনি’র কাছে পিএসএলের পরিচালক লগেসরন দাবি করে ন, তাঁদের কম্পানি ‘সার্ভিস প্রভাইডার’ হিসেবে কাজ করে থাকে। অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগগুলো তিনি বেমালুম অস্বীকার করেছেন।

এই পিএসএল কী করে স্বনামধন্য এসব প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক সরবরাহের নামে দাস ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, কারা তাদের দোসর হিসেবে কাজ করছে, জানার জন্য দেশে ফিরে অনুসন্ধানে নামি। জানা যায়, বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অনুমোদন পেয়েই ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ১৩৯ শ্রমিক পাঠানো হয়েছে পিএসএলে। হিসাব ঘেঁটে দেখা যায়, ওই দুই বছরে জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে পিএসএল পাঁচটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে কর্মী পেয়েছে ১৩৯ জন। ২০১৭ সালের ৬ মার্চ ২০ জন এবং ২৮ জুন আরো ২০ কর্মী পিএসএলে পাঠানোর জন্য অনুমোদন দেওয়া হয় ইউনিক ট্রাভেলসকে। ওই বছর ৯ এপ্রিল রাব্বি ইন্টারন্যা শনাল ২৫ জন এবং ৫ জুন ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল পাঠায় ২৯ জন; ২০১৮ সালের ২৮ জুন ও ২২ নভেম্বর সঞ্জুরি ইন্টারন্যাশনাল পাঠায় ২৫ জন এবং ২৯ নভেম্বর প্যাসেজ অ্যাসোসিয়েটস পাঠায় ১৫ জন। আরো জানা গেছে, এই শ্রমিকরা পিএসএলে চাকরি নিয়ে গেলেও কেউ সেখানে কাজ করছে না; তাদের বিভিন্ন কম্পানিতে বেচাকেনা করে ও ভাড়া খাটিয়ে দাস ব্যবসা চালানো হচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে দেওয়া ‘জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগানুমতিপত্রে শর্ত জুড়ে দিয়ে বলা হয়েছে, ‘কর্মীদের চাকরির শর্তাবলি মালয়েশিয়ার শ্রম আইনের বিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে।’

মালয়েশিয়ার ‘এমপ্লয়মেন্ট (রেসট্রিক শন) অ্যাক্ট ১৯৬৮, যেটি ১৯৮৮ সালে সংশোধিত হয়েছে, তাতে বলা আছে, ‘বৈধ এমপ্লয়মেন্ট পারমিট ছাড়া মালয়েশিয়ায় কোনো বিদেশি শ্রমিক কাজ করতে পারবে না। পারমিট ছাড়া নিয়োগও দিতে পারবে না কোনো মালিক। পারমিটে যে কাজের উল্লেখ রয়েছে, তার বাইরে কোনো কাজে ওই শ্রমিককে নিয়োজিত করা যাবে না।’

ওই আইনে মজুরি কর্তনের ব্যাপারে বলা আছে, ‘ভুলে কাউকে বেশি টাকা দেওয়া হলে সেটি ফেরত নেওয়া যাবে। তবে নিবন্ধিত কোনো শ্রমিক সংগঠনের চাঁদা, ঋণের কিস্তি বা সুদ পরিশোধ বাবদ মজুরি কাটতে হলে শ্রমিকের লিখিত অনুমতি লাগবে।’ অগ্রিম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সুদসহ কর্তন, অন্য কোনো ব্যক্তির পাওনা বাবদ 

কম্পানির কোনো পণ্য কেনার জন্য মজুরি কাটা যাবে না।’

মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন ইয়াসিন মালয়েশিয়াকিনির কাছে বলেছেন, আউটসোর্সিং কম্পানিগুলো গত বছর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব ড. রৌনক জাহানও জানালেন, কোনো কর্মীকে এক কম্পানিতে চাকরি দিয়ে অন্য কোথাও কাজে দেওয়া জিটুজি প্লাস চুক্তি অনুযায়ী কোনোভাবেই কেউ পারে না।

মালয়েশিয়ায় এভাবে শ্রমিকদের নিয়ে দাস ব্যবসা চালাচ্ছে মূলত দুই ধরনের কম্পানি। পিএসএলের মতো শ্রমিক আমদানির কম্পানি আর শ্রমিক বৈধকরণ-নবায়নের কম্পানি। এ রকম হাজারখানেক কম্পানি আছে মালয়েশিয়ায়। এগুলোর মধ্যে কিছু মালয়েশীয় নাগরিকের মালিকানাধীন, পরিচালনা করে তারাই। কিছুর আবার মালিকানা মালয়েশীয়দের নামে হলেও ব্যবসা চালায় দালাল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশিরা। আবার অনেক বাংলাদেশি নিজেরাই কম্পানি খুলে এই ব্যবসা করছে। এ রকম প্রায় ৫০০ বাংলাদেশির খোঁজ পাওয়া গেছে অনুসন্ধানে। তাদের বেশির ভাগই মালয়েশীয় মেয়ে বিয়ে করে নাগরিকত্ব নিয়ে বৈধভাবেই অবৈধ কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।

কোনো শ্রমিক অবৈধ হয়ে পড়লে তাকে বৈধ করার লাইসেন্স নিয়ে বসেছে এই কম্পানিগুলো। অনুসন্ধান বলে, এই লাইসেন্সের আড়ালে আসলে ওত পেতে আছে দাসত্বের ফাঁদ। চাকচিক্যময় অফিসসর্বস্ব কম্পানিগুলো নিজেদের কর্মী হিসেবে বৈধ করে নিলেও শ্রমিককে ক্রীতদাসের মতো কাজ করায় অন্য কোথাও। কারণ নিজেদের কোনো শিল্প-কারখানাই নেই। থাকলেও খুব নগণ্য। চাহিদা বেশি দেখিয়ে তারা অতিরিক্ত শ্রমিক বৈধকরণের লাইসেন্স নিয়েছে। অথচ মালয়েশিয়ার আইনে এক কম্পানির শ্রমিককে অন্য কোথাও কাজ করানো সম্পূর্ণ বেআইনি। এ ধরনের কম্পানিতে বৈধ হয়েও শ্রমিকটি জড়িয়ে যায় দাসত্বের শৃঙ্খলে।

গত ১০ অক্টোবর কুয়ালালামপুরের আমাপাং পয়েন্টে কেএফসির সামনে দেখা হয় আরেক প্রবাসী শ্রমিকের সঙ্গে। দালাল নুরুল ইসলামের সোর্স ট্রেড কম্পানির নিয়োগপত্র নিয়ে মাই-ইজির মাধ্যমে ফিঙ্গারও করেন তিনি। ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি নিবন্ধন করে ভিসাসহ পাসপোর্ট হাতে পান ১০ অক্টোবর। নাম না লেখার অনুরোধ জানিয়ে এই শ্রমিক ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘সাড়ে আট হাজার রিঙ্গিত দিয়ে ভিসাসহ পাসপোর্ট পেলাম; কিন্তু ভিসার মেয়াদ আছে দুই মাস। আবারও চার থেকে পাঁচ হাজার রিঙ্গিত দিয়ে ভিসা নবায়ন করতে হবে। সোর্স ট্রেড কম্পানির নামে বৈধ হলেও কাজ করছি অন্য প্রতিষ্ঠানে।’

কুমিল্লার রহিম মিয়া, টাঙ্গাইলের কালিহাতীর মিজানুর রহমান ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইকবাল হোসেন—এই তিন শ্রমিকও নুরুল ইসলাম ও তাঁর ভাই আবুল হোসেনের সোর্স ট্রেড ও তামা ফার্মের নামে সাত হাজার রিঙ্গিত করে দিয়ে বৈধ হয়েছেন। তাঁদের কণ্ঠেও ক্ষোভের সুর—‘নুরুল ইসলাম-আবুল হোসেনরা আমাদের মতো হাজার হাজার শ্রমিকের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাচ্ছে; বিলাসবহুল গাড়ি-বাড়িতে থাকছে আর আমরা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছি।’

ওই দিনই একটু দূরেই নূরুল ইসলামের অফিসে গিয়ে বেশি টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অস্বীকার করেন। অভিযোগকারী শ্রমিকের পাসপোর্টের ছবি দেখালে নূরুল ইসলাম হাঁক ছেড়ে বলেন, ‘আমি তো বেশি টাকা নিইনি; এই তোমরা কেউ নিয়েছ নাকি?’ অফিসের লোকজন নিরুত্তর থাকলে তিনি বলেন, ‘আচ্ছা, আমি খুঁজে দেখব কে বেশি নিয়েছে।’

শ্রমিক অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ক্যারাম এশিয়ার সাবেক সমন্বয়ক হারুন-উর রশিদ বলেন, ‘নামসর্বস্ব এসব কম্পানিতে দুই লক্ষাধিক বাংলাদেশি শ্রমিক বৈধ হয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে।

মালয়েশিয়ায় শ্রমিক আমদানির সাতটি আর বৈধকরণ-নবায়নের ৩০টি কম্পানি ও তাদের ডরমিটরিতে অনুসন্ধানকালে বাংলাদেশের ১৩ জন তরুণ-যুবকের ক্রীতদাস-জীবনের করুণ কাহিনি সরাসরি শোনা সম্ভব হয়েছে।

ওই ৩০টি কম্পানির রেকর্ড ঘেঁটে প্রতারণার নানা তথ্য পাওয়া যায়। ৩০টির মধ্যে ১০টি কম্পানির কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। যে ২০টির নামমাত্র অস্তিত্ব রয়েছে, তার মধ্যে ৯টি স্থাপিত হয়েছে ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে, যে সময়ে মালয়েশিয়া সরকার অবৈধ বিদেশি শ্রমিকদের বৈধকরণের উদ্যোগ নেয়। অস্তিত্বমান ২০টি কম্পানির কাগজপত্রে দেখা যায়, ১১টিতেই শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বাংলাদেশি রয়েছে ১৮ জন আর মালয়েশীয় ও চীনা ৭৫ জন। বাকি ৯টিতে মালিকানা না থাকলেও চালাচ্ছে বাংলাদেশিরা।

গত বছরের অক্টোবরে ৯৪ জন যুবক মালয়েশিয়ায় এসেছিল প্যাসেজ অ্যাসোসিয়েটস রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে। তাদের ভিসা হয়েছিল পেমবিনান এনকেজেডের নামে। কিন্তু সেই কম্পানিতে তাদের চাকরি হয়নি। তারা বিক্রি হয়ে যায় গোল্ডমাইন ট্রেডিংয়ের কাছে। এই কম্পানি জহুর বারুতে একটি গুদামের মতো ঘরে রেখে তাদের কাজ করায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। তাদেরই একজন কুষ্টিয়ার ছেলে রানা। দেশে ফিরে ফোনে যোগাযোগ করলে কান্নার সুরে কিছু একটা করার আকুতি জানিয়ে রানা বলেন, ‘আমরা ৯৪ জন শ্রমিক ভয়ংকর বিপদে আছি। আমাদের এখন কুয়ালালামপুরের একটি মেট্রো রেল কম্পানিতে কাজ করানো হচ্ছে। জুন মাসের বেতন থেকে বেশির ভাগ টাকাই কেটে নিয়ে গেছে দালাল রবিউল ও সাব্বির।’

গোল্ডমাইন থেকে দেওয়া রানার গত মাসের বেতনের রসিদে দেখা যায়, তাঁকে কাজ করানো হচ্ছে এনএসকে পান্ডান নামের কম্পানিতে। দৈনিক ১১ ঘণ্টা হিসেবে ২৫ দিনের মজুরি দেখানো হয়েছে এক হাজার ৫০০ রিঙ্গিত। এক ঘণ্টা ওভারটাইমের বিল চার রিঙ্গিত এবং এনসিএইচ ১০ ঘণ্টায় ৫০ রিঙ্গিত। এভাবে ওই মাসে সর্বমোট মজুরি এসেছে এক হাজার ৫৫৪ রিঙ্গিত। সেখান থেকে হোস্টেল খরচ ৫০ রিঙ্গিত, অ্যাডভান্স ২০০, অ্যাডভান্স ইটু ২৫০, হোল্ড ৪০০—এভাবে ৯০০ রিঙ্গিত কেটে তাঁকে দেওয়া হয় মাত্র ৬৫৪ রিঙ্গিত। আবার আইনত দৈনিক আট ঘণ্টার বেশি কাজ করানো হলে ওভারটাইমের হিসাব মূল বেতনের দেড় গুণ করে ধরার কথা থাকলেও রানার দৈনিক কর্মঘণ্টার মধ্যেই সেটা গোঁজামিল দেওয়া হয়েছে।

রানার বেতন রসিদই বলে দিচ্ছে, তাঁর মতো শ্রমিকদের কিভাবে বেচাকেনা করে, শ্রম-মজুরি শোষণ করে ‘এ যুগের ক্রীতদাস’ বানিয়ে রেখেছে।

গোল্ডমাইন ট্রেডিংয়ের ব্যবস্থাপকের সঙ্গে দেখা করলে মালয়েশিয়কিনিকে তিনি নিশ্চিত করেন, পেমবিনান এনকেজেডের মাধ্যমে গোল্ডমাইন কর্মী সরবরাহ করে থাকে। পেমবিনানে অতিরিক্ত শ্রমিক আছে এবং তাদের হাতে বর্তমানে খুব বেশি কাজ নেই। এ কারণেই তারা আউটসোর্সিং করছে। তিনি এই প্রক্রিয়াকে বৈধ দাবি করেন।

কিন্তু মালয়েশিয়ার অভিবাসন দপ্তরের মহাপরিচালক জাইমি দাউদের সাক্ষাৎকার থেকে জানা গেছে, এই প্রক্রিয়া অবৈধ। ‘কোনো ভুক্তভোগী শ্রমিক পুলিশ বা ইমিগ্রেশন বিভাগে অভিযোগ করলে আমরা ব্যবস্থা নেব’—বলেন তিনি।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের এই দুরবস্থার কথা তুলে ধরলে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, ‘এটাই তো দাসত্ব। একজন শ্রমিকের শ্রমের ফসলের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ না থাকাকেই দাসত্ব বোঝায়।

মালয়েশিয়ায় ক্রীতদাসে রূপান্তরিত শ্রমিকদের স্বজনরা দেশের মাটিতে কে কেমন আছেন জানার জন্য যখন এই প্রতিবেদক জেলায় জেলায় ঘুরছেন, তখনই বজ পাতের মতো খবরটি এলো—পিএসএলের সেই কর্মী জিদান জনি দেশে ফিরে এসেছেন। আছেন আশুলিয়ার জিরাবোতে এক আত্মীয়র কাছে। কেন, কিভাবে এলেন—জানার জন্য আবার ছুটলাম জিরাবো। গিয়ে দেখি, একটি চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন জিদান। দেখা হতেই জড়িয়ে ধরে কান্না। বললেন, ‘আজ ১৭ এপ্রিল। দুই বছর আগে এই ১৭ এপ্রিলেই পা রেখেছিলাম মালয়েশিয়ায়। কত স্বপ্ন ছিল—নিজের পায়ে দাঁড়াব; মা-বাবা-বোনের মুখে হাসি ফোটাব। কিন্তু কোথায় ওসব! আরেক দফা বাড়ির জমি বেচে দালালের হাতে চার হাজার রিঙ্গিত ঘুষ তুলে দিয়ে পাসপোর্ট ফিরে পেয়ে কোনো রকমে পালিয়ে বাঁচি।’

অনেক রাত পর্যন্ত কথা হলো জিদানের সঙ্গে। বোঝা গেল, মালয়েশিয়ার স্বপ্ন তাঁর ছিন্নভিন্ন। এবার জিদানের সামনে আরেক দুঃস্বপ্ন—ঋণের বোঝা। স্বপ্নের মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য তিন লাখ টাকা ঋণ করতে হয়েছিল। এখন সেই টাকা শোধ করবেন কিভাবে?

পিএসএল পরিচালকের ভাষ্য, জিদানের জবাব

 

 

মন্তব্য