kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

৫৭-র চেয়ে ৩২ বড়

আশরাফুল হক   

৩০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



৫৭-র চেয়ে ৩২ বড়

‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বিলুপ্ত করা হলেও নতুন আদলে ধারাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে নতুন আইনে। এ ছাড়া নতুন কয়েকটি ধারার কারণে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়াটি আরো কঠোর রূপ ধারণ করেছে। আইনটিতে ১৪টি ধারায় উল্লেখ করা বিভিন্ন অপরাধকে জামিন অযোগ্য করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ কোনো সংস্থার গোপনীয় বা অতিগোপনীয় তথ্য-উপাত্ত ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কেউ ধারণ করলে তা হবে ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির শামিল। শাস্তি প্রথমবার অপরাধে ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা জরিমানা, দ্বিতীয়বার অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা। এ অপরাধে গ্রেপ্তার হলে জামিনও মিলবে না। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে তাঁর তেজগাঁওয়ের কার্যালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদসচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বৈঠকে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কথা সাংবাদিকদের জানান।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যেসব ধারার অপরাধকে আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে ১৭, ১৯, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৬, ২৭, ২৮, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪।

খসড়া আইনটিতে ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক প্রতারণার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অনুমতি ছাড়া কম্পিউটার প্রগ্রাম, কম্পিউটার সিস্টেম, নেটওয়ার্ক ডিজিটাল ডিভাইস, ডিজিটাল সিস্টেম, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কোনো তথ্য পরিবর্তন, মুছে ফেলা বা বিকৃতি ঘটালে তা হবে ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক প্রতারণা।

২৭ নম্বর ধারা সাইবার সন্ত্রাস নিয়ে। রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করা বা জনগণের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি করা এর মধ্যে পড়বে। ইলেকট্রনিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ ও সেবা ক্ষতিগ্রস্ত করাও এ অপরাধে পড়বে। প্রথম দফায় এ ধরনের অপরাধের শাস্তি ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। দ্বিতীয়বার করলে এ অপরাধের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।

ধারা ২৮-এ বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় অনুভূতি বা মূল্যবোধে আঘাত করার জন্য ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ করে তাহলে সাত বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড, ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

৩১ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করে, যা বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় তাহলে তা অপরাধ হবে। এ অপরাধের জন্য সাত বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। দ্বিতীয়বার বা বারবার এ অপরাধ করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

৩২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ কোনো সংস্থার কোনো ধরনের গোপনীয় বা অতিগোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ করে তাহলে তা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির পর্যায়ে পড়বে। প্রথম দফা এ অপরাধ করলে ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড প্রয়োগ করা যাবে। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।

আইনের ১৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে বেআইনি প্রবেশ করে তাহলে অনধিক সাত বছরের কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে ক্ষতিসাধন করলে অনধিক ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

১৯ নম্বর ধারাটি কম্পিউটার ও কম্পিউটার সিস্টেমের ক্ষতিসাধন-সংক্রান্ত। এতে বলা হয়, কোনো কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম বা কম্পিউটার নেটওয়ার্ক হতে কোনো উপাত্ত, তথ্য বা উদ্ধৃতাংশ সংগ্রহ করে তাহলে তা হবে অপরাধ। ধারায় আরো বলা হয়েছে, উল্লিখিত নেটওয়ার্কে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোনো ধরনের সংক্রামক বা ক্ষতিকর সফটওয়্যার প্রবেশ করানোর চেষ্টাও অপরাধ। এ ছাড়া উপাত্ত ভাণ্ডারের ক্ষতি করা, কম্পিউটারের অন্য কোনো প্রগ্রামের ক্ষতি করা, কম্পিউটারের বৈধ বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে প্রবেশে বাধার সৃষ্টি করা, প্রেরক বা গ্রাহকের অনুমতি ছাড়া বিপণনের উদ্দেশ্যে স্পাম উৎপাদন করা, অযাচিত ই-মেইল প্রেরণ করা বা নেটওয়ার্কে অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ বা কারসাজি করে ব্যক্তির সেবা গ্রহণ বা চার্জ অন্যের নামে জমা করাও অপরাধ। এ অপরাধের শাস্তি সাত বছরের কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।

২৩ নম্বর ধারাটি ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক প্রতারণাসংক্রান্ত। কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণা করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড আরোপ করা হবে। কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বা বারবার এ অপরাধ করলে শাস্তি হবে সাত বছরের কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।

২৪ নম্বর ধারাটি ছদ্মবেশ ধারণসংক্রান্ত। সেখানে বলা হয়েছে, কম্পিউটার সিস্টেম ব্যবহার করে প্রতারণা, কাউকে ঠকানোর জন্য অপর কোনো ব্যক্তির পরিচয় ধারণ করা, জীবিত বা মৃত অপরের তথ্য নিজের বলে প্রচার করা অপরাধ। প্রথম দফায় এ অপরাধের শাস্তি পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। দ্বিতীয়বার বা বারবার এ অপরাধ করলে সাত বছরের কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।

২৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, আইনগত কর্তৃত্ব ছাড়া অন্য কারোর পরিচিতি তথ্য সংগ্রহ, বিক্রি, সরবরাহ বা ব্যবহার করা হবে অপরাধ। প্রথম দফায় এ অপরাধের শাস্তি পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। দ্বিতীয় দফায় এ অপরাধের শাস্তি সাত বছরের কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।

৩০ নম্বর ধারাটি ই-ট্রানজেকশন-সংক্রান্ত। কোনো ব্যাংক বীমা বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে অবৈধভাবে ই-ট্রানজেকশন করলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। শাস্তি প্রথম দফায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। দ্বিতীয় দফায় এ অপরাধের শাস্তি সাত বছর কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।

৩৩ নম্বর ধারাটি বেআইনি তথ্য-উপাত্ত ধারণ ও স্থানান্তর-সংক্রান্ত। কোনো ব্যক্তি কম্পিউটার সিস্টেমে বেআইনি প্রবেশ করে সরকারি বা আধাসরকারি আর্থিক সংস্থার তথ্য-উপাত্তে সংযোজন, বিয়োজন বা স্থানান্তর ঘটানোর অপরাধ করলে তার শাস্তি পাঁচ বছর কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। দ্বিতীয় দফায় এ অপরাধের শাস্তি সাত বছরের কারাদণ্ড, ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।

৩৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, হ্যাকিংয়ের শাস্তি ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। দ্বিতীয় দফায় এ অপরাধের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। হ্যাকিংয়ের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, কম্পিউটার তথ্যভাণ্ডার বিনাশ, বাতিল, পরিবর্তন বা কোনো ধরনের ক্ষতিসাধন। মালিকানা বা দখলবিহীন কোনো কম্পিউটারের মাধ্যমে কোনো ইলেকট্রনিক সিস্টেমে অবৈধ প্রবেশ করে ক্ষতিসাধন করা।

মন্ত্রিপরিষদসচিব সাংবাদিকদের বলেছেন, নতুন আইন পাস হলে তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭ ও ৬৬ ধারা বিলুপ্ত হবে। এর বদলে এসব ধারার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী শাস্তির বিধান রাখা হচ্ছে নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারাটিই ডিজিটাল আইনের ৩২ ধারা হিসেবে ফিরে এলো কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না।’ মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, ‘এ আইনে কোথাও কোনো ধারায় সাংবাদিকদের টার্গেট করা হয়নি।’

এ সময় সাংবাদিকরা মন্ত্রিপরিষদসচিবকে জানান, আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায়ও সাংবাদিকদের কথা বলা হয়নি। কিন্তু তাঁরাই আইনটির শিকার হচ্ছেন।

এরই মধ্যে ৫৭ ধারায় করা চলমান মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে—জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘অতীতের মামলাগুলো যথারীতি চলবে।’ ধর্মীয় অনুভূতির সংজ্ঞা কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, ‘পেনাল কোডে ধর্মীয় অনুভূতির যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে সেটা এখানে প্রযোজ্য হবে।’

কেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করতে হলো—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, ‘সাইবার ক্রাইমের আধিক্য এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মতো ঘটনা ঘটেছে। ফলে এ আইন করার প্রয়োজন হয়েছে। আগে সাইবার ক্রাইমের জন্য কোনো আইন ছিল না। এখন এজাতীয় সব অপরাধের বিচার এই আইনের আওতাভুক্ত করা হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আইনে ডিজিটালের সংজ্ঞা, ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব করা, ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম গঠন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হয়েছে। নতুন আইনের ১৭ থেকে ৩৮ ধারায় বিভিন্ন অপরাধ ও শাস্তির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।’ তিনি আরো জানান, কেউ যদি ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোনো ধরনের প্রপাগান্ডা চালায়, তাহলে ১৪ বছরের জেল ও এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে আইনটিতে।

মন্তব্য