kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অক্টোবর ২০১৯। ৩০ আশ্বিন ১৪২৬। ১৫ সফর ১৪৪১       

২৪ লাখ বই বাতিল গচ্চা ১০ কোটি টাকা

শরীফুল আলম সুমন   

২৯ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



২৪ লাখ বই বাতিল গচ্চা ১০ কোটি টাকা

জঙ্গিবাদ উসকে দেওয়ার অভিযোগ, হাদিসের ভুল ব্যাখ্যাসহ নানা অভিযোগে ২০১৫ সালে মাদরাসা বোর্ডের বেশ কিছু পাঠ্য বই সংশোধনের কথা ছিল। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়েরও নির্দেশনা ছিল এ ব্যাপারে। কিন্তু তিন বছরেও তা হয়নি। অসংগতিতে ভরা এসব বই ২০১৮ শিক্ষাবর্ষের জন্যও ছাপা শেষ হয়েছে। এ অবস্থায়ই গত রবিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২৪ লাখ বই প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। এখন আবার নতুন করে এসব বই ছাপানোর প্রস্তুতি চলছে। গত রবিবার সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির আকাঈদ ফিকহ এবং নবম-দশম শ্রেণির কুরআন মাজিদ ও তাজভিদ এবং হাদিস শরিফ—এই চারটি পাঠ্য বই বাতিলের নির্দেশ দিয়ে এনসিটিবিকে চিঠি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অসংগতি সংশোধন করে নতুন করে এসব বই ছাপানোর সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাদরাসা ও কারিগরি বিভাগের সচিব মো. আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদরাসার কিছু বইয়ের ব্যাপারে অবজারভেশন এসেছে। আসলে এ বয়সের ছেলে-মেয়েদের যা পড়ানো উচিত নয়—এমন কিছু বিষয় বইতে রয়েছে। এ ছাড়া কিছু অংসগতিও রয়েছে। তাই চারটি বই প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে এসব বই ছাপিয়ে মাদরাসায় পৌঁছে দেওয়া হবে। নতুন করে ছাপতে হলেও আগামী বছরের প্রথম দিনই শিক্ষার্থীরা বই পাবে।’

সপ্তম শ্রেণির আললুগাতুল অ্যারাবিয়্যাতুল ইত্তেসালিয়্যাহ বইয়ের ১২২ পৃষ্ঠার একটি কবিতায় বলা হয়েছে, ‘আমাদের দেশের যুবক, আমরা প্রত্যাশার প্রতীক, সম্মানের তরে এবং জিহাদের জন্য...।’ অষ্টম শ্রেণির একই বইতেও জিহাদের নামে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে উসকে দেওয়া হয়েছে। সপ্তম শ্রেণির হাদিস শরিফ বইয়ের ১৩৭ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর দীন কায়েমের সকল প্রকার প্রচেষ্টা, আল্লাহর বিধান প্রচার ও প্রসার, দীনি শিক্ষা ও তত্পরতার কাজে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে।’ এভাবে বিভিন্ন বইতে জঙ্গিবাদ এবং কোমলমতি শিশুদের মনে বিষ্পপাপ ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন শিক্ষকরা। আরো কিছু পাঠ্য বইয়ে সমস্যা ধরা পড়েছে।

জানা যায়, ২০১৫ সালে মাদরাসার পাঠ্য বই ছাপা হওয়ার পর কিছু বই নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন মাদরাসার সব বই পর্যালোচনা করে হাদিসের ভুল ব্যাখ্যাসহ নানা বিষয় চিহ্নিত করে। তখন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে এ নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অসংগতিগুলো দূর করে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। কিন্তু তিন বছরেও তা সংশোধন হয়নি। অসংগতিতে ভরা এসব বই পড়ছে শিক্ষার্থীরা। কোনো কোনো বইয়ে জঙ্গিবাদ উসকে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা।

জানা যায়, চলতি মাসে মাদরাসার বইয়ের অসংগতির বিষয়টি আবারও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নজরে আসে। কার্যালয় থেকে আগামী শিক্ষাবর্ষের মাদরাসার বইগুলো খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর গত ১৫ নভেম্বর জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের কাছে মন্ত্রণালয় সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির কুরআন মাজিদ ও তাজভিদ, আকাঈদ ও ফিকহ, আরবি প্রথম পত্র এবং নবম-দশম শ্রেণির কুরআন মাজিদ ও তাজভিদ এবং হাদিস শরিফ বইয়ের পাণ্ডুলিপি চায়। পাঠ্য বইগুলো বিশ্লেষণ করে মন্ত্রণালয় দেখতে পায়, ২০১৫ সালে যেসব অসংগতি সংশোধনের জন্য দেওয়া হয়েছিল তা করা হয়নি। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে জানানো হলে আগামী শিক্ষাবর্ষের ছাপানো বইও বাতিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত রবিবার চারটি পাঠ্য বই বাতিলের নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চারটি বইয়ের প্রায় ২৩ লাখ ৮৯ হাজার কপি বাতিল করতে হবে। এতে সরকারের গচ্চা যাবে প্রায় ১০ কোটি টাকা।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির আরো অনেক পাঠ্য বইয়ে অসংগতি রয়েছে। রয়েছে হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা। কিন্তু সব বই বাতিল করে নতুন করে ছাপাতে গেলে জানুয়ারি মাসে সব বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। করতে গেলে গচ্চা যাবে প্রায় ৩০ কোটি টাকা। তাই আপাতত যে চারটি বইয়ে বেশি অসংগতি রয়েছে, সেগুলোই বাতিল করা হয়েছে।

জানা যায়, এরই মধ্যে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারদের চিঠি দেওয়া হয়েছে, এসব বই ফেরত দেওয়ার জন্য। এ ছাড়া যেসব প্রেস মালিক এসব বই ছেপেছিলেন, তাঁদেরও চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে নতুন করে চারটি বই ছাপাতে হবে। এ ব্যাপারে সব প্রস্তুতি রাখতে অনুরোধ করা হয়েছে।

জানা যায়, নবম-দশম শ্রেণির  কুরআন মাজিদ ও তাজভিদ বইয়ের ৪২৪ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘একজন নেতা হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো পুরুষ হওয়া।’ একই শ্রেণির হাদিস শরিফ পাঠ্য বইয়ের ২২ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘ইহুদি খ্রিস্টানদেরকে আগে সালাম দিবে না। যখন তাদের কারো সাথে তোমাদের সাক্ষাৎ হয়, তখন তোমরা তাদেরকে রাস্তার এক পার্শ্ব দিয়ে যেতে বাধ্য করো।’ ৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘আল কুরআন সরকার ও সরকারপ্রধানকে জনগণের সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য মসলিসে সুরা ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা দান করেছে।’

নবম-দশম শ্রেণির কুরআন মাজিদ ও তাজভিদ বইয়ের ১৫৬ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে, ‘কাফির মুশরিকদের সাথে প্রকাশ্যে যুদ্ধের নির্দেশ রয়েছে।’ একই শ্রেণির হাদিস শরিফ বইয়ের ২৯ পৃষ্ঠায় আহকামে সালাম অংশে বলা হয়েছে, ‘কাফির মুশরিক ও বিধর্মীকে সালাম দেওয়া হারাম।’

ইসলামে নিষিদ্ধ ঘোষিত মদকে নবম-দশম শ্রেণির বইতে একটি নিয়ামত ও আকর্ষণীয় পানীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই শ্রেণির হাদিস শরিফ বইয়ের ৩২৮ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘প্রথমত মদকে একটি নিয়মিত ও আকর্ষণীয় পানীয় হিসেবে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে।’ একই শ্রেণির কুরআন মাজিদ ও তাজভিদ বইতে সুরা বাকারার ২২৩ নম্বর আয়াতের বাহ্যিক অর্থ যথার্থভাবে করা হয়নি।

সূত্র জানায়, সব বই প্রণয়নের দায়িত্ব এনসিটিবির হলেও মাদরাসার বই করার মতো কোনো বিশেষজ্ঞ তাদের নেই। তাই মাদরাসার বইয়ের পুরো কারিকুলামই ঠিক করে দেয় মাদরাসা বোর্ড, যা সিডি আকারে এনসিটিবিতে পাঠানো হয়। এনসিটিবি তা মুদ্রণ করে দেয়।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করি। মাদরাসার কারিকুলাম সম্পূর্ণই মাদরাসা বোর্ড তৈরি করে দেয়। তারা পাণ্ডুলিপির সিডি পাঠায়, আমরা ছাপাই। গত রবিবার মন্ত্রণালয় থেকে আমাদর চিঠি দিয়েছে, চারটি বই পরিমার্জিত হবে। আমরা সে অনুযায়ীই কাজ করছি।’

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বেশ আগেই কিছু ভুল-ত্রুটি চিহ্নিত করে দিয়েছিলাম। জানতে পেরেছি, এবার তা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী শিক্ষাবর্ষের যেসব বই ছাপানো হয়েছে, সেগুলোও তুলে নিয়ে নতুন করে ছাপানো হবে।’

অভিযোগ রয়েছে, মাদরাসা বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা ও মাদরাসা শিক্ষকদের একটি সংগঠনের নেতাদের নিয়ে বড় সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। যারা বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগসহ মাদরাসার নানা বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে। তারা চায়নি বলেই এত দিন জেনেশুনেও বইগুলো সংশোধন করা হয়নি।

মাদরাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান দেশের বাইরে থাকায় এ ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি। আর মাদরাসা বোর্ডের অন্য কর্মকর্তারাও এ ব্যাপারে কিছু বলতে রাজি হননি।

এসব বিষয়ে স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের (স্বাশিপ) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান আলম সাজু বলেন, ‘সপ্তম থেকে নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্য বইয়ে বিতর্কিত বিষয় সংযোজনের সঙ্গে যুক্ত ৩২ জন লেখক, সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে মাদরাসা বোর্ড এবং ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে প্রত্যাহার করতে হবে। নয়তো এ ধরনের সমস্যা থেকেই যাবে। আসলে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক একটি চক্র অত্যন্ত সুকৌশলে মাদরাসার পাঠ্য বইয়ে অপ্রাসঙ্গিক বিভিন্ন অপব্যাখ্যা দিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত করছে। পাশাপাশি কোমলমতি শিশুদের জঙ্গিবাদের আকৃষ্ট করারও চেষ্টাও করে যাচ্ছে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা