kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সম্ভাবনা শেষ সেই হারেই

১৯ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সম্ভাবনা শেষ সেই হারেই

ম্যাচের অর্ধেকটাও শেষ হয়নি তখনো। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার রানের দিকে ভুলেও কেউ তাকাচ্ছে না আর। সবার দৃষ্টি বরং এবি ডি ভিলিয়ার্সের রান এবং বাকি থাকা ওভারের দিকে। পাঁচ ওভার বাকি, তাঁর রান ১৪৪... চার ওভার বাকি, রান ১৬২... তিন ওভার বাকি, রান ১৭৩। ডি ভিলিয়ার্সের ডাবল সেঞ্চুরিটি কি হবে?

হয়নি শেষ পর্যন্ত। আর সেটিই হয়তো কালকের বাংলাদেশের ‘বড়’ সাফল্য। নইলে ম্যাচ ও সিরিজে হারা সারা সেই কখনই! শেষ পর্যন্ত ১০৪ রানের পরাজয়ে আনুষ্ঠানিকতা পূরণ কেবল।

ছোট্ট এক স্টেডিয়াম। লোহা-লক্কড়ের আওয়াজ আর কাদামাটিতে বাংলাদেশের বগুড়া-খুলনার মতো মনে হতে পারে, কিন্তু প্রকৃতি যে অপার্থিব সৌন্দর্য বিছিয়ে রেখেছে চারপাশে! বোল্যান্ড পার্কের সঙ্গে লাগোয়া পাহাড়টিই যেমন সগৌরবে দাঁড়িয়ে। কচ্ছপের পিঠের মতো ন্যাড়ামাথার পাহাড়ের ভাঁজে-খাঁজে মেঘের ছোটাছুটি। যেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার সেই লাইনটির মতো, ‘এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে’।

বাংলাদেশ দলের অবশ্য এসব সৌন্দর্য উপভোগের মানসিক অবস্থা নেই। দক্ষিণ আফ্রিকায় এসে একের পর এক ম্যাচ হারছে যে! আর কাল তো ডি ভিলিয়ার্স-ঝড়ের সামনে উড়ে গেল একেবারে খড়কুটোর মতো। ১০৪ বলে ১৭৬ রানের দানবীয় ইনিংসেই তো ম্যাচের গতিপথ এঁকে দেন ওই প্রোটিয়া ব্যাটসম্যান।

তবে ম্যাচ জিততে না পারলে কী হবে, টস জেতায় কোনো ভুল নেই বাংলাদেশ অধিনায়কের। ডন ব্র্যাডম্যানের সেই ‘অজেয়’ অস্ট্রেলিয়া দল ১৯৪৮ সালের ইংল্যান্ড সফরে যেমন টেস্ট কিংবা সাইড ম্যাচের কোনোটিতে হারেনি, এবারের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বাংলাদেশও তেমনি টস হারেনি কোনো খেলায়। কাল টস জিতে অবশ্য মাশরাফি বিন মর্তুজার উল্টো সিদ্ধান্ত। প্রথম ওয়ানডেতে ২৭৮ করেও ১০ উইকেটে হারের কারণেই কিনা এবার আগে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত। তাতেও তো ঠেকানো যায়নি বিশাল পরাজয়।

ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ পেয়ে ১৭.৩ ওভারে ৯০ রানের ওপেনিং জুটি দুই প্রোটিয়া ওপেনার হাশিম আমলা ও কুইন্টন ডি ককের। পরেরজনকে আউট করে সাকিব অবশেষে ভাঙেন জুটি। সিরিজে ৬০.২ ওভার বোলিং করে ৩৭২ রানে দেওয়ার পর প্রথম উইকেট পায় বাংলাদেশ। ওই ওভারের শেষ বলে ফাফ দু প্লেসিসকেও বোল্ড করেন সাকিব। তখন কি কেউ ভাবতে পেরেছিলেন, ক্রিজে আসা ডি ভিলিয়ার্সের ব্যাটে কেমন সাইক্লোন লুকিয়ে!

৩৪ বলে ফিফটি করেন তিনি। ৬৮ বলে সেঞ্চুরি। আর শেষ ৩৬ বলে যোগ করেন আরো ৭৬ রান। দক্ষিণ আফ্রিকার রানের গতিও এগোয় একই সমান্তরালে। প্রথম ১০ ওভারে ৫০। পরের ১০ ওভারেও ৫০। ২০ থেকে ৩০ ওভারে ৭৯। পরের ১০ ওভারে ৭৬। আর শেষ ১০ ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ করে ৯৮ রান। ৪৮তম ওভারে রুবেল হোসেন অবশেষে ডি ভিলিয়ার্সকে আউট করেন বলে বাড়তি আরো কিছু রান হয়নি। তবু তিনি আউট হওয়ার সময় ফিরে ফিরে আসে ইনিংস শুরুর ওই দুটো হাফ চান্স। যখন এক রানে থাকা ডি ভিলিয়ার্সকে রানআউটের সুযোগ নিতে পারেন না মাহমুদ উল্লাহ। আর দুই রানে থাকার সময় ব্যাটের কানায় লেগে বল স্লিপের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় নাসির হোসেন দাঁড়িয়ে থাকেন স্থাণুর মতো।

তাতে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটি খেলে ফেলেন ডি ভিলিয়ার্স। ১৭৬ রানের। ২০০৯ সালে বুলাওয়েতে চার্লস কভেন্ট্রির অপরাজিত ১৯৪ আর ২০১১ সালে মিরপুরে শেন ওয়াটসনের অপরাজিত ১৮৫-র পর বাংলাদেশের বিপক্ষে এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর। আর এবি-হারিকেনের সামনে পড়ে একেবারে হতশ্রী চেহারা বাংলাদেশের বোলারদের। ১০ ওভারে ৮২ রান দিয়ে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে খরুচে বোলিং মাশরাফির। তাসকিন আহমেদের ৯ ওভারে ৭১ রান খরচের দিক দিয়ে দ্বিতীয়তে। শেষ দিকের তিন শিকারে রুবেলের চার উইকেট হলেও সেটি নিয়ে উল্লাসের উপায় কী বাংলাদেশের!

দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংস ৩৫৩ রানের পাহাড়ে চড়ে বসার পরই তো খেলা একরকম শেষ!

তবু দেখার ছিল অনেক কিছু। দেখানোর ছিল ব্যাটসম্যানদের সামর্থ্য। সাড়ে তিন শ তাড়া করে হয়তো জেতা যাবে না, কিন্তু লড়াইটা তো অনেক দূর টেনে নিতে পারত বাংলাদেশ। পারেনি তারা। ইনজুরি থেকে ফেরা তামিম ইকবাল একবার জীবন পেয়েও ২৩ রানের বেশি করতে পারেন না। বড় স্কোর নেই লিটন দাশ (১৪), সাকিব (৫), মাহমুদ (৩৫), সাব্বির রহমানদের (১৭) ব্যাটেও। কেবল ইমরুল কায়েস ও মুশফিকুর রহিমের ব্যাটে ছিল লড়াইয়ের প্রত্যয়। প্রথমজন ৭৭ বলে করেন ৬৮। ফিল্ডিংয়ে মাশরাফির বলে জেপি দুমিনির ক্যাচ ছাড়েন ইমরুল, এর প্রতিদানে ৪৯ রানে বাংলাদেশের বাঁহাতির ক্যাচও যেন ছাড়েন প্রোটিয়া ফিল্ডার। আর মুশফিকের লড়াই থেমে যায় ৭০ বলে ৬০ রান করে। ২৪৯ রানে অলআউট হয়ে ১০৪ রানে হেরে যায় বাংলাদেশ।

ততক্ষণে পুরো আকাশ ভ্রমণ শেষে ডুবে যাওয়ার পথে পার্লের সূর্য। মেঘের আবরণ জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ার পথে বোল্যান্ড পার্কসংলগ্ন ওই পাহাড়। বাংলাদেশ দলেরও তো দক্ষিণ আফ্রিকায় দীর্ঘ ভ্রমণ শেষ হওয়ার পথে; জয়ের জিয়নকাঠিতে তাদের ঘুম আর ভাঙবে কবে!

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা