kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

গণপরিবহনের সংকট ভয়াবহ

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

১৯ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গণপরিবহনের সংকট ভয়াবহ

সকাল সাড়ে ৬টা। নগরের ১০ নম্বর সড়কের টাইগারপাস মোড়ে রাস্তার দুই পাশে শতাধিক যাত্রী অপেক্ষা করছে গাড়ির জন্য। তাদের বেশির ভাগই কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য বাস-মিনিবাসের অপেক্ষায় রয়েছে। সেখানে ২০ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে দেখা গেল, সাতটি বাস ও তিনটি হিউম্যান হলার টাইগারপাস হয়ে আগ্রাবাদের দিকে চলে গেছে। এর মধ্যে চারটি বাস ও একটি হিউম্যান হলার সড়কের বাঁ পাশে স্টপেজে দাঁড়ায়নি। ওই গাড়িগুলো কানায় কানায় পূর্ণ। অন্য তিনটি বাস ও দুটি হিউম্যান হলার দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলেছে। এর মধ্যে একটি বাস ছিল রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) একটি পোশাক কারখানার। বাসটি নিজেদের পাঁচ-সাতজন যাত্রী তুলে চলে যায়। বাকি দুটি বাসে ওঠার জন্য যাত্রীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ঠেলাঠেলি-ধাক্কাধাক্কি করে হাতে গোনা কয়েকজন উঠতে পারলেও অনেকেই ব্যর্থ হয়। হিউম্যান হলার দুটিতে ওঠে ১২ জন। গতকাল বুধবার এ ছিল নগরের একটি স্থানের গণপরিবহনের জন্য মানুষের অসহনীয় অপেক্ষার চিত্র। এমন চিত্র শহরের প্রায় সবখানেই দেখা যায় এবং সেটা প্রতিদিনের সকাল-বিকেল-সন্ধ্যার।

কর্মস্থলের পরিচয় না জানিয়ে রফিকুল আলম নামের এক গার্মেন্টকর্মী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এইগুলো বলে কোনো লাভ আছে। আমি ইপিজেডে একটি গার্মেন্টে চাকরি করছি পাঁচ বছর ধরে। প্রতিদিন অফিসে যাওয়া-আসার সময় অনেক কষ্ট হয় গাড়ির জন্য। এমন কোনো দিন নেই ঠিক সময়ে এখানে (টাইগারপাস) এসে গাড়ি পেয়েছি। অফিস ৮টা থেকে। গাড়ি পেতে সমস্যা হয়, এ কারণে প্রায় দুই ঘণ্টা আগে বাসা থেকে বের হয়ে এখানে আসি। কিন্তু এখন সময় ৭টার বেশি হয়ে গেছে। গাড়ি পাচ্ছি না।’  রহিমা খাতুন নামের এক নারী বলেন, ‘আমার বাসা আমবাগান। যাচ্ছি বন্দরটিলা এলাকায় বোনের বাসায়। দেখছেন তো গাড়ি এলে আগে পুরুষরা উঠে যায়। আমরা কিভাবে উঠব। গাড়ি কম।’

আগ্রাবাদ বাদামতল এলাকা থেকে বহদ্দারহাট যাওয়ার জন্য আধাঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে গাড়ি না পাওয়ার কথা জানিয়ে সাইফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘রাস্তায় সকাল ও সন্ধ্যার পর আমরা গাড়ি পাই না। সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা বেশি ভাড়া দাবি করে। সব সময় তো অটোরিকশায় যেতে পারি না।’ গত তিন দিন নগরের কর্নেলহাট, অলংকার, এ কে খান, জিইসি মোড়, মুরাদপুর, অক্সিজেন, চকবাজার, নিউ মার্কেট, পাঁচলাইশ, আগ্রাবাদ চৌমুহনী, বাদামতল, নিমতলা, কোতোয়ালি, লালখানবাজার, দেওয়ানহাটসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে গণপরিবহনের অপ্রতুলতার কারণে মানুষের এমন দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে।

গত মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে অক্সিজেন এলাকায় নন্দীরহাট, ফতেয়াবাদ, ছড়ারকুল, বালুছড়া, আমান বাজার যাওয়ার জন্য বহু মানুষ অপেক্ষা করছিল। এ সময় রহিম উদ্দিন নামের একজন বলেন, ‘আমরা তিন নম্বর রুটের যাত্রী। নিউ মার্কেট থেকে বাস-মিনিবাস ও হিউম্যান হলার অক্সিজেন হয়ে ওই দিকে যায়। কিন্তু সন্ধ্যার পর অক্সিজেন এসে নন্দীরহাটের দিকে না গিয়ে অনেক গাড়িই ঘুরিয়ে ফেলে এবং যাত্রী নিয়ে আবার নিউ মার্কেট চলে যায়। অনেক সময় মুরাদপুর থেকে অক্সিজেনও আসে না গাড়ি, নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাচ্ছে না। আমরা যাঁরা এই রুট দিয়ে যাতায়াত করি, প্রায় সব সময় গাড়ির অভাবে কষ্ট পাই।’

গতকাল বিকেল ৪টা থেকে সোয়া ৫টা পর্যন্ত নগরের কাজীর দেউড়ি, লালখান বাজার, টাইগারপাস, আগ্রাবাদ বাদামতলা, ওয়াসা মোড়, জিইসি, মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট, বহদ্দারহাট এলাকায় অনেক লোককে যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়। জানা যায়, গণপরিবহন সংকটের পাশাপাশি নগরজুড়ে যত্রতত্র (নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া) গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করা হচ্ছে। যে যেভাবে পারছে সেভাবে সড়কের ওপর গাড়ি রাখছে। এতে করে যানজটের পাশাপাশি বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। সর্বশেষ দুই সপ্তাহ আগের তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরে বাস-মিনিবাসের জন্য ১৩টি রুট এবং ইপিজেড রুটের জন্য আলাদা একটি বাস সার্ভিস রয়েছে। এসব রুটে এক হাজার ১৩৪টি বাস-মিনিবাসের অনুমোদন আছে। ১৬টি রুটে চলাচলের জন্য হিউম্যান হলার (হালকা যান) এক হাজার ২৫০টি, ১৭টি রুটে এক হাজার ৬৬২টি অটো টেম্পোর অনুমোদন রয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, আরটিসি (আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি) থেকে এক হাজার ১৩৪টি বাস-মিনিবাসের অনুমোদন রয়েছে। এর মধ্যে ইপিজেড সার্ভিসে ১৪৫টি গাড়ি রয়েছে। ইপিজেড সার্ভিসের বাইরে অন্য গাড়ি গণপরিবহন হিসেবে যাত্রীসেবায় নিয়োজিত থাকার কথা থাকলেও তার বেশির ভাগই সকাল ও সন্ধ্যায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভাড়ায় চলছে। এমনিতেই নগরে গণপরিবহন সংকট সারা বছর লেগেই আছে। তার ওপর সড়কে অনুমোদিত গণপরিবহন প্রতিষ্ঠানে ভাড়া দেওয়ায় সাধারণ যাত্রীরা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। এ ছাড়া নগরের ৩, ৬, ৭, ৮ সহ বিভিন্ন রুটের সব পয়েন্টে বাস-মিনিবাস ও হিউম্যান হলার চলে না। চালকদের ইচ্ছেমতো গন্তব্যে আসা-যাওয়া করছে। এতে যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়ছে। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব বেলায়েত হোসেন বেলাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সড়কে পারমিট পাওয়া যানবাহন সাধারণ যাত্রী বহন না করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভাড়ায় চলছে তা ঠিক। এসব অভিযোগের কারণে সর্বশেষ প্রায় তিন বছর আগে হওয়া জরিপে ১৮০টি বাস-মিনিবাসের পারমিট বাতিল করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, বাতিলকৃত গাড়িগুলো আবার অন্যান্য রুটে চলাচল করছে। যাত্রীরা সকাল ও সন্ধ্যার পর বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে। ওই সময় সাধারণ যাত্রীদের চাহিদা বেশি থাকলেও দেখা যায় প্রায় অর্ধেক গাড়ি যাত্রী পরিবহন করছে না।’

এক প্রশ্নের জবাবে বেলায়েত হোসেন আরো বলেন, ‘সকাল ও সন্ধ্যা মিলিয়ে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ গাড়ি সাধারণ যাত্রী পরিবহনে ব্যবহার হচ্ছে না। আমরা বিষয়গুলো বারবার সংশ্লিষ্টদের কাছে জানানোর পরও কোনো সুরাহা হচ্ছে না। মানুষের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে একমাত্র আমাদের সমিতির অধীনে নগরের একটি রুটে প্রায় ১০০ গাড়ি কাউন্টার ভিত্তিতে চালানো হচ্ছে। আর অন্য কোনো রুটে কাউন্টার সার্ভিস নেই। কাউন্টার সার্ভিস না থাকার কারণে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পরিবহন নেতা জানান, চট্টগ্রাম ইপিজেডের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অন্তত ৪০০ থেকে ৫০০ গাড়ি প্রয়োজন। সেখানে গাড়ির অনুমোদন আছে ১৪৫টি। এ ছাড়া নগরের অন্যান্য বাণিজ্যিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্যও পর্যাপ্ত গাড়ি নেই। সেখানেও অনেক গণপরিবহন ভাড়ায় চলাচল করছে।

পরিবহন সমিতিগুলো সূত্রে জানা গেছে, নগরে প্রতিদিন অন্তত পাঁচ লাখ থেকে সাত লাখ মানুষ গণপরিবহন ব্যবহার করে। কিন্তু যথাসময়ে গাড়ির অভাবে বেশির ভাগ মানুষ অবর্ণনীয় দুভোগের শিকার হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মালিক-শ্রমিক অভিযোগ করে বলেন, নগরে বিভিন্ন রুটে আরো ২০০-৩০০ বাস-মিনিবাস অনুমোদন না নিয়েই চলছে। এগুলো বিভিন্ন স্থানে চাঁদা দিয়ে চলছে। অবৈধ গাড়িগুলোর বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না প্রশাসন। নগরের নিউমার্কেট, কোতোয়ালি, বহদ্দারহাট, ইপিজেড, মুরাদপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকা থেকে জেলার বাস-মিনিবাস চলছে। দিনের বেলায় জেলার বাস নগরে চলাচলের কথা না থাকলেও অবাধে সেসব গাড়ি চলছে। অনেক রুটে গাড়ি চালানোর অনুমোদন নেই প্রশাসনের। কিন্তু নিজেদের ইচ্ছেমতো রুট বানিয়ে চলাচল করছে হিউম্যান হলার, অটোটেম্পো ও পিকআপ ভ্যান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা