kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

খালেদাকে অভ্যর্থনায় বিএনপির শোডাউন

যানজটে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



খালেদাকে অভ্যর্থনায় বিএনপির শোডাউন

খালেদা জিয়াকে অভ্যর্থনা জানাতে আসা নেতাকর্মীর ভিড়ে সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়। ছবি : লুৎফর রহমান

যুক্তরাজ্যে তিন মাস কাটিয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে গতকাল বুধবার বিকেলে দেশে ফিরেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দর থেকে গুলশানের পথে ব্যাপক শোডাউন করে দীর্ঘদিন ধরে ঝিমিয়ে থাকা দলটির নেতাকর্মীরা। এর ফলে ওই সড়ক দিয়ে চলাচলকারী শত শত যানবাহন অনেকক্ষণ ধরে যানজটে আটকা পড়ে থাকে, চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় হাজার হাজার যাত্রীকে।

গুলশানের বাসায় পৌঁছার পর নেতাকর্মীদের সঙ্গে কুশল বিনিময়কালে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমি এখন আগের চেয়ে অনেকটা সুস্থ। আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন, দেশবাসীকেও দোয়া করতে বলবেন।’

বিএনপি চেয়ারপারসন আজ বৃহস্পতিবার জিয়া ট্রাস্টের দুটি মামলায় বিশেষ আদালতে হাজিরা দেবেন বলে জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া।

খালেদা জিয়া গতকাল বিকেল পৌনে ৫টায় এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে নামেন এবং মিনিট বিশেক পর বিমানবন্দরের বাইরে বেরিয়ে আসেন। তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। আর বিমানবন্দর থেকে গুলশানের পথে সড়কের বিভিন্ন স্থানে জড়ো হয়েছিল দলের নেতাকর্মীরা। তাদের ঢল ঠেলে গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় পৌঁছতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে যায় তাঁর। অর্থাৎ আড়াই ঘণ্টায় নেতাকর্মীদের ভিড় ডিঙিয়ে খালেদা জিয়া যখন গুলশানের বাসভবনে পৌঁছেন তখন রাত ৮টা বেজে যায়। একই ফ্লাইটে তাঁর সঙ্গে ফিরেছেন একান্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার ও গৃহকর্মী ফাতেমা আখতার।

চোখ ও হাঁটুর চিকিৎসা নিতে গত ১৫ জুলাই লন্ডন যান খালেদা জিয়া। বড় ছেলে তারেক রহমানের বাসায় ছিলেন তিনি। লন্ডনে বড় ছেলের পরিবার অর্থাৎ তারেকের স্ত্রী জোবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, প্রয়াত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি, দুই মেয়ে জাহিয়া রহমান ও জাফিয়া রহমানকে নিয়ে ঈদুল আজহা উদ্যাপন করেন খালেদা জিয়া। ৮ সেপ্টেম্বর পূর্ব লন্ডনের মুরফিল্ড হসপিটালে তাঁর ডান চোখে অস্ত্রোপচার হয়। হাঁটুর আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসাও করিয়েছেন তিনি।

গতকাল বিমানবন্দর থেকে গুলশানের বাসভবন পর্যন্ত সড়কে অবস্থানকারীদের মধ্যে কিছুটা উৎকণ্ঠা থাকলেও খালেদা জিয়াকে একেবারেই নির্ভার দেখাচ্ছিল। তিনি হাসি মুখে হাত নেড়ে নেতাকর্মীদের অভ্যর্থনার জবাব দিয়েছেন। বাসভবনে পৌঁছার পর বিএনপিপ্রধানকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন দলীয় নেতারা। তাঁর গাড়ি বাসভবনে ঢোকার পর তাঁকে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানান ছোট ভাই শামীম এস্কান্দারের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা। এ সময় নেতারা কুশল বিনিময় করে চেয়ারপারসনের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর জানতে চান। চেয়ারপারসনের উপদেষ্ট কাউন্সিলের সদস্য সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, আবদুল কাইয়ুম, বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, কেন্দ্রীয় নেতা শামা ওবায়েদ, জেবা খানসহ অনেকেই এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছলে ভিআইপি লাউঞ্জে বিএনপি চেয়ারপারসনকে অভ্যর্থনা জানান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুল কাইয়ূম। ভিআইপি লাউঞ্জে সিনিয়র নেতাদের প্রবেশের জন্য আবেদন করা হয়েছিল যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু তাঁদের না যেতে দেওয়ায় বিমানবন্দর মসজিদের কাছে সড়কের এক পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান তাঁরা এবং খালেদা জিয়াকে বহনকারী গাড়ি এলে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এ সময় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রমুখ নেতা উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া দলের নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, আবদুল মান্নান, মীর নাছির, খন্দকার মাহবুব হোসেন, বরকতউল্লা বুলু, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, নিতাই রায় চৌধুরী, গিয়াস কাদের চৌধুরী, শামসুজ্জামান দুদু, আহমেদ আজম খান, রুহুল আলম চৌধুরী, আমানউল্লাহ আমান, মিজানুর রহমান মিনু, আবদুস সালাম, লুত্ফর রহমান খান আজাদ, রুহুল কবীর রিজভী, মাহবুব উদ্দিন খোকন, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবীর খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, ফজলুল হক মিলন, নজরুল ইসলাম মঞ্জু, বিলকিস জাহান শিরিন, সানাউল্লাহ মিয়া, হাবিবুল ইসলাম হাবিব, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, তাইফুল ইসলাম টিপু, বেলাল আহমেদ, আফরোজা আব্বাস, হেলেন জেরিন খান, সাইফুল ইসলাম নিরব, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, শফিউল বারী বাবু, আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল, রাজীব আহসান, আকরামুল হাসানসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

খালেদা জিয়ার আগমন উপলক্ষে বিমানবন্দর মোড় থেকে বনানীর কাকলী পর্যন্ত সড়কের এক পাশে হাজার হাজার নেতাকর্মী সমবেত হয়। মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, জহিরউদ্দিন স্বপন, দিলদার হোসেন সেলিম, তানভীর আহমেদ রবিন, মুন্সীগঞ্জ শ্রীনগরের সভাপতি শহীদুল ইসলাম শহীদসহ নেতারা তাঁদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার ঢাকায় বসবাসকারী নেতাকর্মীদের নিয়ে অবস্থান করেন এবং খালেদা জিয়াকে শুভেচ্ছা জানান। তাঁদের কারো কারো হাতে ছিল ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’সহ বিভিন্ন ব্যানার। ছাত্রদল ঢাকা মহানগর (পশ্চিম) শাখার নেতাকর্মীদের মিছিলে অংশ নেওয়া সবার পরনে ছিল সাদা রঙের টি-শার্ট। টি-শার্টের পেছনে লেখা ‘দুর্নীতি-দুঃশাসন হবে শেষ, গণতন্ত্রের বাংলাদেশ’।

খালেদা জিয়া বিমানবন্দরে পৌঁছার আগে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ ও মির্জা আব্বাস সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, তাঁদের নেতাকর্মীদের শান্তিপূর্ণভাবে দাঁড়িতে পুলিশ বাধার সৃষ্টি করেছে। মওদুদ আহমদ বলেন, ‘আমাদের নেত্রী দেশে ফিরবেন বলে দলের নেতাকর্মীরা তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছে। অথচ আপনারা দেখবেন পুলিশ কতভাবে তাদের বাধা দিচ্ছে। বিমানবন্দর সড়কে গণপরিবহন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে যাতে লোক সমাগম না হয়। তার পরও ব্যাপক মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে—জনগণ দেশনেত্রীর আগমনে শুভেচ্ছা জানাতে প্রস্তুত।’ মওদুদ আরো বলেন, ‘আমাদের নেত্রীর বিরুদ্ধে সরকার রাজনৈতিক মনোভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানাকে তিনি ভয় পান না। আমাদের নেত্রী আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তিনি আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে ওই সব মামলায় জামিন নেবেন।’

এদিকে খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানাতে রাজধানীর বিমানবন্দর থেকে বনানীর কাকলী পর্যন্ত সড়কে হাজার হাজার বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা জড়ো হওয়ার ফলে ওই সড়কে যান চলাচলের গতি একেবারেই কমে যায়। সৃষ্টি হয় ব্যাপক যানজটের। একপর্যায়ে যান চলাচল থমকে যায়। ফলে দুর্ভোগে পড়ে পথচলা মানুষ ও বিমানবন্দরে আগত যাত্রীরা।

পুলিশ সদস্যদের হ্যান্ড মাইক ব্যবহার করে নেতাকর্মীদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য বারবার অনুরোধ করতে দেখা যায়। বিমানবন্দরের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। জলকামানের দুটি গাড়ি, প্রিজন ভ্যানসহ পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। বিমানবন্দরের ভেতরে পুলিশ ছাড়াও সোয়াত, ব্যাটালিয়ন পুলিশের বেশ কয়েকটি দলের সদস্যরা ছিলেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিকেল আড়াইটা থেকে নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকে। বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে বিমানবন্দরের উল্টো পাশের রাস্তা থেকে খিলক্ষেত, নিকুঞ্জ, বনানীর কাকলী মোড় পর্যন্ত নেতাকর্মীরা রাস্তার ডান পাশে দাঁড়িয়ে অবস্থান নেয়। তাদের হাতে ছিল বিভিন্ন ধরনের ব্যানার, ফেস্টুন, ছোট ছোট পতাকা। কয়েকটি জায়গায় দেখা গেছে ব্যান্ড পার্টিও। রাস্তার অর্ধেকজুড়ে দাঁড়ানোর ফলে সড়কে যানবাহন চলাচল একেবারেই থমকে যায়। ফলে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। গাড়ি চলতে না পারায় বিমানবন্দরের এই সড়কের যান চলাচলের ধীরগতির চাপ গিয়ে পড়ে টঙ্গী পর্যন্ত। দূরপাল্লার গাড়িগুলোর গতি কমে যায়।

বিকেল পৌনে ৩টার দিকে ঢাকার তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী রবিনের সঙ্গে কথা হয় বনানী এলাকায়। তিনি বলেন, ১২টায় পরীক্ষা শেষ হয়েছে। ফার্মগেট থেকে এ পর্যন্ত আসতে আড়াই ঘণ্টা লেগেছে। উত্তরায় যেতে কতক্ষণ লাগে বোঝা যাচ্ছে না। হাসান নামের এক সিএনজি অটোরিকশাচালক বনানী লেভেলক্রসিংয়ে সাড়ে ৩টার দিকে জানান, কলকাতাগামী ৫টার ফ্লাইটের যাত্রী নিয়ে যাচ্ছেন। গাড়ি চলছেই না।

হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হওয়া দুই নারীর কথোপকথনেও ক্ষোভ ঝাড়তে দেখা যায়। তাঁরা একে অন্যকে বলছেন, ‘কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে সংবর্ধনা নিয়েছেন। আর আজ নিচ্ছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। ওনাদের সংবর্ধনায় সাধারণ মানুষের কী পরিমাণ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সেটা কি ওনারা বোঝেন?’ এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে বিমানবন্দর মোড় পার হওয়ার সময় উত্তরা থেকে উল্টো রাস্তায় আসা দুটি অ্যাম্বুল্যান্সকেও আটকে থাকতে দেখা যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরা সদস্যরা এ সময় খালেদার গাড়িবহরকে দ্রুত পার করতে সক্রিয় ছিলেন।

পরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজকে বিমানবন্দরের বাইরে লাখ লাখ মানুষ তাদের প্রিয় নেত্রীকে প্রাণের অন্তস্তল থেকে সংবর্ধনা জানিয়েছে। এই সংবর্ধনা নজিরবিহীন। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা এবং সর্বস্তরের জনগণ দেশনেত্রীকে সংবর্ধনা জানিয়েছে। এই সংবর্ধনা প্রমাণিত হয়েছে—খালেদা জিয়া দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। দেশের মানুষ যেভাবে তাঁকে ভালোবাসে, গণতন্ত্রের জন্য তিনি যেভাবে সংগ্রাম করছেন, সেই সংগ্রামকে আমরা যেন অব্যাহত রাখতে পারি এবং বিজয় অর্জন করতে পারি—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা