kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

এবার বৃষ্টি বেড়েছে ৪৯%

সচিবালয়ে এত পানি কর্মকর্তারা আগে দেখেননি

আরিফুর রহমান   

২৭ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সচিবালয়ে এত পানি কর্মকর্তারা আগে দেখেননি

ছবি: কালের কণ্ঠ

রাজধানীর তোপখানা রোডে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে চলছে তিন দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক সম্মেলন। টানা চার দিনের ভারি বর্ষণে রাজধানী ঢাকার প্রধান প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিলেও এত দিন সুরক্ষার মধ্যেই ছিল সচিবালয়। কিন্তু গতকাল বুধবার জেলা প্রশাসক সম্মেলনে যোগ দিতে এসে হাঁটুসমান পানিতে চরম দুর্ভোগ আর ভোগান্তিতে পড়েন মন্ত্রী, সচিবসহ ৬৪ জেলার ডিসিরা। সচিবালয়ের ভেতরের চত্বরে শেষ কবে জলাবদ্ধতা দেখেছেন, অনেক কর্মকর্তাই তা মনে করতে পারলেন না। এক কর্মকর্তা মিনিট দুয়েক সময় নিয়ে স্মৃতিচারণা করে কালের কণ্ঠকে জানান, এক যুগেরও বেশি সময় আগে ২০০৪ সালে একবার অতিবৃষ্টিতে সচিবালয়ের ভেতরে পানি জমা হয়ে জলাবদ্ধতার দেখা মিলেছিল। ১৩ বছর পর ২০১৭ সালে এসে আবার জলাবদ্ধতার দেখা মিলল। সর্বোচ্চ বিচারালয় সুপ্রিম কোর্টের আঙিনায়ও গতকাল পানি ঢুকেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ১ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে ৪৯ শতাংশ। অথচ গত বছর একই সময়ে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছিল মাত্র ৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের (আইডাব্লিউএফএম) সিনিয়র গবেষণা পরিচালক ড. মোহন কুমার দাসের বাড়ি কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলায়। তাঁর তিন প্রজন্ম কখনো দেখেনি বর্ষার বৃষ্টিতে বাড়ি পর্যন্ত পানি উঠতে। কিন্তু গত কয়েক দিনের টানা ভারি বর্ষণে প্রথমবারের মতো তাঁদের বাড়িতে পানি উঠেছে। ড. মোহন কুমার দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার তিন প্রজন্ম যেটা দেখেনি, সেটা আমি দেখলাম, বাড়িতে পানি ওঠা’। এর জন্য তিনি অবশ্য দায়ী করলেন বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী ভরাট হয়ে যাওয়াকে। এর পাশাপাশি অন্যবারের তুলনায় এ বছর বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি।

এই গবেষকের মতের পক্ষের প্রমাণ মিলল আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যে। তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগে রেকর্ড ৯৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অথচ আগের বছর একই সময়ে বৃষ্টি হয়েছিল ৭৪৬ মিলিমিটার। অর্থাৎ এ বছর এখন পর্যন্ত ২৩৯ মিলিমিটার বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। আবহাওয়া কর্মকর্তা আবদুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, চট্টগ্রামে ১৮ জুলাই থেকে টানা সাত দিন বৃষ্টিপাত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন বৃষ্টিপাত দেখা যায়নি চট্টগ্রাম বিভাগে। সে কারণে এ বছর সেখানে জলাবদ্ধতা বেশি দেখা যাচ্ছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আইনুন নিশাত বলেন, বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের কারণে প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সাধারণত ঘূর্ণিঝড় থাকলে জোয়ারের উচ্চতা বাড়ে। আর তখন জোয়ারের চাপে পানি এসে শহরের প্রধান প্রধান সড়কের পাশাপাশি অলিগলিতে পর্যন্ত পৌঁছে। এই পানি নামতে পারে না। কারণ চট্টগ্রামের খালগুলোর আয়তন ও গভীরতা দুটিই কমে গেছে। এ কারণে পানি ধারণক্ষমতাও কমেছে। জোয়ারের পানিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে।

ঢাকা বিভাগেও চিত্র অনেকটা একই। ১ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে বৃষ্টিপাত হয়েছে ৫২১ মিলিমিটার। গত বছর একই সময়ে বৃষ্টিপাত হয়েছিল ৩৮৭ মিলিমিটার। গত বছরের জুলাইয়ের সঙ্গে এ বছরের জুলাই মাসের বৃষ্টিপাতের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিটি বিভাগেই এ বছর স্বাভাবিকের চেয়ে বৃষ্টিপাত বেশি হয়েছে। গত বছর বরিশাল বিভাগে যেখানে বৃষ্টিপাত হয়েছিল ৫৫৯ মিলিমিটার, এবার তা বেড়ে হয়েছে ৬৪৯ মিলিমিটার। খুলনা বিভাগে গত ২৫ দিনে গড় বৃষ্টিপাত হয়েছে ৫৮৬ মিলিমিটার। গত বছর একই সময়ে হয়েছিল ৩৬৯ মিলিমিটার।

এদিকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ায় গতকাল রাজধানী ঢাকা ছিল একপ্রকার অচল। জলজটের সঙ্গে যানজট একাকার হওয়ায় চরম দুর্ভোগ আর ভোগান্তিতে পড়ে রাজধানীবাসী। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম অবশ্য জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী করেন নদী ও খাল ভরাট হয়ে যাওয়াকে। তিনি বলেন, রাজধানীতে ৪৮টি খাল ছিল। ঢাকার চারপাশে চারটি নদী আছে। সবই দখল-দূষণ আর ভরাটে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। এ কারণে পানি নামতে পারে না। তিনি বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে গেছে। ময়লা-আবর্জনা ফেলা, নির্মাণসামগ্রীর উপকরণ, নগরায়ণ, জলাশয় ভরাটসহ নানা কারণে পানি জমা হলে আর বের হওয়ার পথ থাকে না। সব পথই বন্ধ হয়ে গেছে। একই মত ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আইনুন নিশাতেরও। তিনি বলেন, এ বছর বৃষ্টিপাত একটু বেশি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ঢাকা শহরের সব খাল ভরাট হয়েছে। সে কারণে পানি নামতে পারছে না। অবশ্য গতকাল এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন আশ্বস্ত করেন, ঢাকার ১৮টি নদী সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে আগামী বছর জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসী মুক্তি পাবে বলেও আশা দেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী।

আবহাওয়া কর্মকর্তা আবদুল মান্নান বলেন, গত ১ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে গড়ে ৬০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। আগের বছর একই সময়ে সারা দেশে বৃষ্টিপাত হয়েছিল ৫৩৮ মিলিমিটার। এ ছাড়া বুধবার ঢাকায় ৫৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবারও দেশের বিভিন্ন স্থানে হালকা থেকে ভারি বর্ষণ হতে পারে বলে জানান তিনি। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় এই বৃষ্টিপাত হচ্ছে বলেও ব্যাখ্যা দেন তিনি।

এদিকে গতকাল এক অনুষ্ঠানে পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, আগামী আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে বন্যা দেখা দিতে পারে দেশের বিভিন্ন জেলায়। এ বছর ভারি বৃষ্টিপাতে চট্টগ্রামে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এ ছাড়া বরিশাল, ভোলা, ফেনী, যশোর ও খুলনায়ও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বাড়ছে। অ্যান্টার্কটিকায় প্রতিনিয়ত বরফ গলছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে উপকূলীয় এলাকায় নতুন এলাকা পানিতে প্লাবিত হচ্ছে। প্রকৃতির আচরণ বদলে যাওয়ায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামে জোয়ারের পানির উচ্চতা বাড়ছে। এতে জোয়ারের পানির পাশাপাশি বৃষ্টির পানি যোগ হয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। আগে একটানা এত বৃষ্টি দেখা যেত না। যেটা সাম্প্রতিক সময়ে চোখে পড়ছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত কালের কণ্ঠকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এখন যেভাবে উপকূলীয় এলাকায় পানি উঠছে, এটি অব্যাহত থাকলে আগামী ৫০ বছরে তিন ফুট পানি উঠবে।  তখন উপকূলীয় এলাকা আরো বেশি প্লাবিত হবে। এ ছাড়া বৃষ্টিপাতের ধরন পাল্টাচ্ছে বলেও মত দেন তিনি।

আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে আবহাওয়ার বেশ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এ বছর চৈত্র মাসে দেখা মেলেনি চিরায়ত সেই কাঠ ফাটা রোদের। মাঠ-ঘাট, খাল-বিল-প্রান্তর ফেটে চৌচির হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। তেমন শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে দেখেনি বাংলাদেশের মানুষ।

আবহাওয়া কর্মকর্তারা আরো বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বৃষ্টিপাতে বেশ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গতবারের সঙ্গে তুলনা করলে এ বছর বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বর্ষায় বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে জুলাই থেকে। জুন মাসে যতটা তাপপ্রবাহ দেখা যায়, এ বছর দেখা গেছে তার উল্টো চিত্র। এক সপ্তাহ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা হওয়ায় জনজীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ।

বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্স স্টাডিজ (বিসিএএস) কয়েক বছর আগে একটি গবেষণা করেছিল বৃষ্টিপাত নিয়ে। তাতে দেখা গেছে, ২০ বছর আগেও বর্ষার সময় যতটুকু বৃষ্টি হতো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক কম সময়ে বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বৃষ্টিপাতের ধরনেও বেশ পরিবর্তন এসেছে। ২০ বছর আগে ১৫ দিনে যে পরিমাণ বৃষ্টি হতো, সাম্প্রতিক সময়ে এক সপ্তাহে সমপরিমাণ বৃষ্টি হচ্ছে। বিসিএএসের ফেলো গোলাম রাব্বানী কালের কণ্ঠকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জোয়ারের পানির উচ্চতা বাড়ছে। জোয়ারের পানির সঙ্গে যখন বৃষ্টির পানি যোগ হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই পানির প্রবাহ বাড়ে। এতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হয় বেশি।

সম্প্রতি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা চার ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে। এ ছাড়া রোদের তীব্রতা বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মৎস্য ও জীববৈচিত্র্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। একই সঙ্গে বাস্তুচ্যুতি ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়বে বলেও মনে করে এডিবি।

মন্তব্য