kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

১২ দেশে বিনা মূল্যে বাংলাদেশের ওষুধ

তৌফিক মারুফ   

১২ নভেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



১২ দেশে বিনা মূল্যে বাংলাদেশের ওষুধ

দেশের সব সরকারি হাসপাতালেই বিনা মূল্যে ওষুধ বিতরণ করা হয় রোগীদের জন্য। একসময় এসব ওষুধ আনতে হতো বিদেশ থেকে। আর এখন দেশীয় প্রতিষ্ঠানে তৈরি ওষুধই সরকারের মাধ্যমে বিনা মূল্যে পায় দেশের মানুষ। তবে কিছু ভ্যাকসিন ও টিকা এখনো বিদেশ থেকে আনতে হচ্ছে সরকারকে। যেমনটা ঘটে জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ দিবসে দেশের দুই কোটির বেশি শিশুকে খাওয়ানো ভিটামিন ক্যাপসুলের ক্ষেত্রে। গতবারও এই ক্যাপসুল আনা হয় ভারত থেকে। এর আগে আনা হতো যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এখন সেই ওষুধও তৈরি হচ্ছে দেশেই। এখন কেবল দেশের মানুষই এসব ওষুধ বিনা মূল্যে পায় না, বাংলাদেশে তৈরি এসব ওষুধ বিনা মূল্যে পাচ্ছে অন্তত ১২টি দেশের মানুষও।

আফ্রিকার দেশ বুরুন্ডিতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের পুষ্টিহীনতা দূর করতে সরকারিভাবেই বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয় ভিটামিন ও মিনারেলসমৃদ্ধ মাইক্রোনিউট্রেন্ট পাউডার ‘ইঙ্গাবুরু’। শিশুদের জীবন বাঁচাতে মায়ের বুকের দুধের পাশাপাশি সম্পূরক খাবার হিসেবে এটি সেখানে ঘরে ঘরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

নেপাল, শ্রীঙ্ককা কিংবা মিয়ানমারে বাংলাদেশে জনপ্রিয় খাবার স্যালাইনের মতোই জরুরি ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ওআরএস ও জিংক কো-প্যাক। এটা ছোট-বড় সবার জন্যই শরীরের পানিশূন্যতা দূর করে এবং জিংকের ঘাটতি পূরণ করে, পুষ্টিরও জোগান দেয়। ডায়রিয়া, পাতলা পায়খানা কিংবা শারীরিক দুর্বলতা টের পেলেই সবাই মুখে নেয় ওষুধটি।

এসব দেশের সরকার বিনা মূল্যে সব নাগরিকের জন্য এসব ওষুধ বিতরণ করছে। আর ভিনদেশে এমন জনপ্রিয় ওই দুই ওষুধও তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশে। ভিন্ন ভাষার কারণে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন নাম চালু থাকলেও তাতে ঠিকই আছে বাংলাদেশের নাম ও প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয়।

কেবল এমএনপি—ইঙ্গাবুরু বা ওআরএসই নয়, একইভাবে বাংলাদেশে উৎপাদিত হরমোনাল পিলও কোনো কোনো দেশের সরকার বিনা মূল্যে বিতরণ করে সে দেশের মানুষের মধ্যে।

১২ দেশে মানুষের মুখে মুখে : অন্তত ১২টি দেশ আছে যেখানে মানুষ সরকারের মাধ্যমে বিনা মূল্যে পায় বাংলাদেশের ওষুধ। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, জাম্বিয়া, ইয়েমেন, রুয়ান্ডা, উগান্ডা, বুরুন্ডি, আইভরি কোস্ট ও পূর্ব তিমুর।

কিভাবে যায় : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুসারে স্বাস্থ্যগত দুর্যোগ বা ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে বিনা মূল্যে বিভিন্ন ওষুধ সরবরাহ করে ইউনিসেফ। প্রক্রিয়া অনুসারে বিভিন্ন দেশের নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চুক্তির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনে নেয় ইউনিসেফ। ওই ওষুধ তারা হস্তান্তর করে নির্দিষ্ট দেশগুলোর সরকারের কাছে। আর শর্ত অনুসারে সে দেশের সরকার বিনা মূল্যে তা জনগণের মধ্যে বিতরণ করে। এ প্রক্রিয়ায় ইউনিসেফ বাংলাদেশের ওষুধ প্রস্তুত প্রতিষ্ঠান রেনাটা লিমিটেডের কাছ থেকে তিন বছর ধরে এ ওষুধ নিচ্ছে ১২টি দেশের জন্য। এর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওষুধ প্রস্তুতকারী সব নিয়মিনীতি পালন করা হয়। ওষুধের কাঁচামাল ও প্রস্তুতকারী স্যাম্পল পরীক্ষা করে আনা হয় ফ্রান্সের ল্যাবরেটরি থেকে। মানগত সনদ পাওয়ার পরই কেবল চুক্তি কার্যকর করে ইউনিসেফ। এ প্রক্রিয়ায় তিন বছরে মোট ১০ মিলিয়ন স্যাসেট ওআরএস ও জিংক কো-প্যাক এবং ২১৯ মিলিয়ন স্যাসেট এমএনপি গেছে ওই সব দেশে। এ ছাড়া গত বছর মালয়েশিয়া সরকার সরাসরি নিয়েছে ৪২ মিলিয়ন হরমোন ট্যাবলেট, যা ওই দেশের প্রদেশগুলোর ১৪১টি হাসপাতালের মাধ্যমে বিনা মূল্যে নারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

পাঁচ দেশের একটি বাংলাদেশ : ইউনিসেফের কেন্দ্রীয় দপ্তরের সরবরাহ বিভাগ থেকে গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুসারে, এমএনপি সংগ্রহ করার জন্য তিন বছরের জন্য এ সংস্থাটি বিশ্বের পাঁচটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে মনোনীত করেছে। এর অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশের রেনাটা। অন্য চারটি হচ্ছে সুইজারল্যান্ডের ডিএসএম (ইউরোপ), ডিএসএম দক্ষিণ আফ্রিকা, ডিএসএম মালয়েশিয়া ও ভারতের পিরমালি।

বড় অর্জন : ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আইউব হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশ আরো আগে থেকেই ওষুধে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় এখন বিশ্বের ১২৩টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুকারী প্রতিষ্ঠানের ওষুধ। এর পাশাপাশি ইউনিসেফের মতো একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের একটি কম্পানির কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিনা মূল্যে বিতরণ করছে—এটাই দেশের জন্য অনেক বড় আরেকটি অর্জন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ওষুধের মানের প্রতিও আস্থা আরো বেড়ে যাবে।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে বর্তমানে দেশে মোট ২৬৬টি অ্যালোপ্যাথিকসহ ইউনানি, আয়ুর্বেদিক, হারবাল ও হোমিওপ্যাথি মিলিয়ে মোট ৮১৩টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের ৩০ হাজারের বেশি ব্র্যান্ডের ওষুধ তৈরির অনুমোদন নেওয়া আছে। এর মধ্যে অনেকেই কয়েক বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে পর্যন্ত বাংলাদেশের একাধিক কম্পানি ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। তবে ইউনিসেফের মতো একটি সংস্থা বাংলাদেশ থেকে ওষুধ নেওয়ার বিষয়টি ভিন্ন গুরুত্ব বহন করে।

ওষুধের সঙ্গে বাংলাদেশের নাম : রেনেটা লিমিটেডের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিভাগের প্রধান এস এম আনিসুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা হিসেবে ইউনিসেফ তাদের পছন্দমতো বিভিন্ন দেশের ওষুধ কম্পানির কাছ থেকে ওষুধ কেনে। পরে তারা সেগুলো বিভিন্ন দেশের সরকারকে বিনা মূল্যে বিতরণ করে। ইউনিসেফ যাদের কাছ থেকে ওষুধ নেয় তাদের গুণতম মান ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জিএমপি শতভাগ অনুসরণের বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। এর সঙ্গে চলে কঠিন সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এসব কিছুর ভিত্তিতে ইউনিসেফ বাংলাদেশে ওই ওষুধের জন্য রেনেটাকে বেছে নিয়েছে। আমরা তাদের শর্ত অনুসারে ওষুধ সরবরাহ করেছি।’

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা যখন জানতে পারি—কোনো দেশে আমাদের প্রস্তুতকৃত ওষুধ মানুষের ঘরে ঘরে যাচ্ছে তখন খুব ভালো লাগে। কারণ এর মধ্য দিয়ে কেবল আমাদের ওষুধ নয়, বাংলাদেশের নামটিও ওই সব দেশের মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা