kalerkantho

শুক্রবার । ১১ আষাঢ় ১৪২৮। ২৫ জুন ২০২১। ১৩ জিলকদ ১৪৪২

এবার হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন

বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি   

৫ নভেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



এবার হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে দুষ্কৃতকারীদের ধরিয়ে দেওয়া আগুনে ভস্মীভূত একটি ঘর। ছবি : কালের কণ্ঠ

মন্দিরে ভাঙচুর, বসতবাড়িতে হামলা-লুটপাটের পর এবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে দুর্বৃত্তদের এ আগুনে মধ্যপাড়া ও পশ্চিমপাড়ায় অন্তত পাঁচটি ঘর পুড়ে গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একটি মন্দির। হামলা-ভাঙচুরের পাঁচ দিনের মাথায় এ ঘটনা ঘটল। অগ্নিকাণ্ডের পর স্থানীয়রা কয়েকজনকে পালিয়ে যেতে দেখে ধাওয়া করলেও তাদের ধরতে পারেনি, চিনতেও পারেনি।

রবিবারের হামলা-ভাঙচুরের ঘটনার পর এলাকায় পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যেই আগুনের ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে তারা।

নাসিরনগরে তাণ্ডবের ঘটনায় সারা দেশে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, প্রেস ক্লাব, শাহবাগ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়েছে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন কমিটি, বাংলাদেশ ছাত্র-যুব ঐক্য পরিষদ, জাতীয় হিন্দু ছাত্র মহাজোটসহ বিভিন্ন সংগঠন এতে অংশ নেয়। বক্তারা হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিকাণ্ড ঠেকাতে প্রশাসনের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছেন। ঘটনার পর নিষ্ক্রিয় ভূমিকা ও হিন্দু সম্প্রদায়কে উদ্দেশ করে আপত্তিকর মন্তব্য করায় নাসিরনগরের সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ছায়েদুল হকের পদত্যাগ দাবি করেছেন তাঁরা। একই সঙ্গে নাসিরনগরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোয়াজ্জেম হোসেনেরও অপসারণ দাবি করেছেন তাঁরা।

বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল গতকাল নাসিরনগরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে। তারা হামলা-ভাঙচুরের ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছে। একই দাবি করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি  (সিপিবি)। রাজধানীতে গারো সম্প্রদায়ের এক অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নাসিরনগরের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি পেতেই হবে।

হামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠায় গতকাল নাসিরনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের তিন নেতাকে সাময়িক বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা আওয়ামী লীগ। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার রসরাজকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

পাঁচটি ঘর, একটি মন্দির পুড়ে ছাই : গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আগুনে সরকারপাড়ার ফুল কিশোর সরকারের একটি গোয়ালঘর, মৃণাল কান্তি সরকারের একটি রান্নাঘর, একটি গোয়ালঘর, ঠাকুরপাড়ার বিশ্বদেব চক্রবর্তীর একটি গোয়ালঘর এবং মধ্যপাড়ার অমর দেবের একটি রান্নাঘর পুড়ে গেছে। ঠাকুরপাড়ার সাগর দাসের বাড়ির দুর্গা মন্দিরও পুড়ে গেছে। বাড়িগুলো পাড়ার গলির ভেতর। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা বলছে, তাদের চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা এসে আগুন নিভিয়েছে।  

ফুল কিশোর সরকার জানান, রাত ৩টার পর বাড়ির প্রবেশ মুখের ঘরটিতে আগুন দেখে তিনিসহ পরিবারের লোকজন চিৎকার করতে থাকে। পরে প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসে। ওই ঘরে দিনের বেলায় গরু রাখা হয়।

মৃণাল কান্তির বাড়ির ভাড়াটিয়া সমীর রঞ্জন ভূঁইয়া জানান, তাঁর ছোট ছেলে জয় ভূঁইয়া রাতে আগুন দেখে চিৎকার করতে থাকে। পরে পাশের পুকুর থেকে পানি এনে আগুন নেভানো হয়। সাগর দাসের বাড়ির গোবর্ধন দাস বলেন, ‘রাতে আমিসহ অনেকে এলাকা পাহারা দিয়ে বাড়ি ফিরি। ঘুমাতে যাওয়ার সময় হঠাৎ আগুন দেখে চিৎকার আমি শুরু করি। আগুনে দুর্গা মন্দির পুড়ে গেছে।’

স্থানীয়রা জানায়, শুরুতে অনেকে ‘চোর চোর’ বলে চিৎকার করতে থাকে। অনেকে বলতে থাকে, আগুন লেগেছে। তারা বিদ্যুতের মেইন সুইচ বন্ধ করতে বলে।

ঠাকুরপাড়ার বিশ্বদেব চক্রবর্তী জানান, তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। আশপাশের লোকজনের চিৎকারে ঘুম ভাঙে। ঘর থেকে বের হয়ে তিনি আগুন দেখতে পান। আগুনে একটি গোয়ালঘরে থাকা তাঁর প্রায় দুই লাখ টাকার কাঠ পুড়ে গেছে। 

আবদুল হালিম নামের স্থানীয় এক বেকারি মালিক বলেন, ‘চোর চোর বলে চিৎকার শুনে বাচ্চারা আমাকে জাগিয়ে তোলে। টর্চলাইট নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে দেখি একজন আমার সামনে দিয়ে এবং চারজন একটু দূর দিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে। আমি কিছু দূর পর্যন্ত ধাওয়া করেও তাদের ধরতে পারিনি। এ সময় মলয় রায় নামের এক যুবকের সঙ্গে আমার দেখা হয়, সেও দুর্বৃত্তদের ধাওয়া করেছে বলে জানায়।’

মলয় রায় বলেন, “চিৎকার শুনে ঘর থেকে বের হয়ে অপরিচিত কয়েকজনকে দেখতে পাই। একজনের পরনে ছিল লাল রঙের গেঞ্জি ও লুঙ্গি, অন্যজনের গা খালি ছিল, পরনে ছিল হাফ প্যান্ট। ‘আগুন, আগুন’, ‘চোর, চোর’ বলে চিৎকার করতে করতে তারা পালিয়ে যায়।” 

গতকাল ঘটনাস্থলে দেখা হলে সিআইডির ইন্সপেক্টর মো. আলমগীর বলেন, ‘কোনো দাহ্য পদার্থের মাধ্যমে এ আগুন লাগানো হলো কি না, তা জানার চেষ্টা চলছে। পুড়ে যাওয়া জিনিসপত্রের আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে।’

নাসিরনগর থানার ওসি শাখাওয়াত হোসেন জানান, রবিবারের ঘটনার পর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মন্দিরগুলোতে রাতেও পুলিশ মোতায়েন থাকে। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনা ঘটেছে ওই মন্দিরগুলো থেকে দূরের বাড়িতে।   

বিজিবি-১২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল শাহ আলী জানান, নাসিরনগরের আক্রান্ত এলাকায় এক প্লাটুন বিজিবি নিয়মিত টহল দিচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনা বিজিবি তাৎক্ষণিক টের পায়নি। এখন থেকে দুই প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন থাকবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক রেজওয়ানুর রহমান গতকাল সকালে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বলেন, বিষয়টি ষড়যন্ত্র বলেই মনে হচ্ছে। এর সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

শিশুদের ব্যবহার করা হয়েছে সেদিনের হামলায় : রবিবার নাসিরনগরে শ্রীশ্রী গৌড় মন্দিরে হামলার একটি ভিডিওচিত্র এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যায়, সেদিনের হামলা ভাঙচুরে কয়েকটি শিশুও অংশ নিয়েছিল। এক মিনিট ১৬ সেকেন্ডের ভিডিওচিত্রটিতে দেখা যায়, ওই শিশুরা লাঠি হাতে ছোটাছুটি করছে। স্কুল ড্রেস পরা (হাফ প্যান্ট ও সাদা শার্ট) একটি শিশুকে লাঠি হাতে অংশ নিতে দেখা যায়, অন্যদের হাতেও লাঠি ছিল। ভিডিওচিত্রটি দেখে মনে হচ্ছে, অন্তত অর্ধশত যুবক হামলায় অংশ নিয়েছে। তাদের মধ্যে দু-একজনের মাথায় টুপি ছিল। ভিডিওচিত্রটি পুলিশের কাছেও আছে বলে জানা গেছে।

নতুন ষড়যন্ত্র : গত বুধবার রাতে কে বা কারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের ভাদুঘর এলাকার একটি মাদ্রাসার ফটক ও মসজিদে এবং মোহাম্মদপুর এলাকার একটি মসজিদে তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। তালার সঙ্গে দুর্বৃত্তরা বিতর্কিত পোস্টারও রেখে যায়। বৃহস্পতিবার সকালে লোকজন তালা ভেঙে ফেলে। এ ঘটনাকে স্থানীয়রা ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছে, পরিস্থিতির ফায়দা তুলতে স্বার্থান্বেষী মহল এ কাজ করেছে। 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার ওসি মো. মঈনুর রহমান বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে একটি চক্র এ ধরনের জঘন্য কাজ করে যাচ্ছে। তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায়। দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার জন্যই এটা করা হয়েছে।’

গতকাল নাসিরনগরের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘মাদ্রাসা, মসজিদে তালা ও হিন্দুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলার ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা। অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আগুন লাগানো হয়েছে। অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি ও আতঙ্ক ছড়াতে এটি একটি চক্রান্ত বলে মনে হচ্ছে। আমরা মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি।’

মানববন্ধন নিয়েও দ্বন্দ্ব! : হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিকাণ্ডের প্রতিবাদে গতকাল নাসিরনগর উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সের সামনে মানববন্ধন করেছে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ও পূজা উদ্যাপন পরিষদের একাংশ। এ সময় বক্তব্য দেন ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা আনিসুর রহমান মল্লিক, মাহমুদুল হাসান মানিক, আয়োজক সংগঠনের স্থানীয় নেতা অসীম কুমার পাল প্রমুখ। তাঁরা ঘটনার বিচার দাবি করেন এবং হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

তবে মানববন্ধন ঘিরে স্থানীয় হিন্দু নেতাদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দেয়। স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি পক্ষ চাইছিল মন্ত্রী ছায়েদুল হক এলাকায় থাকা অবস্থায় যেন মানববন্ধন না করা হয়। এ অবস্থায় পূজা উদ্যাপন পরিষদের একটি অংশ মানববন্ধনে যোগ দেয়নি।

মন্ত্রীর পরিদর্শন : ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী অ্যাডভোকেট ছায়েদুল হক গত মঙ্গলবার রাতে নাসিরনগরে গেলেও বুধবার পর্যন্ত উপজেলা ডাকবাংলোতেই ছিলেন। বৃহস্পতিবার তিনি উপজেলা সদরের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। গতকাল সন্ধ্যার আগে তিনি হরিপুর এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর ও মন্দির পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি দোষীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের আশ্বাস দেন। নিরাপত্তার বিষয়েও ক্ষতিগ্রস্তদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। 

ঘটনাস্থলে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা : গতকাল দুপুরে কেন্দ্রীয় ও জেলা বিএনপির একটি দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে। এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘দেশে গণতান্ত্রিক সরকার নেই বলেই এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। এ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন।’ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের পর আগুনের ঘটনাটিকে ষড়যন্ত্র বলে ইঙ্গিত করেছেন ওয়ার্কার্স পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান পলিট ব্যুরোর সদস্য আনিসুর রহমান মল্লিক। 

তিন আওয়ামী লীগ নেতা সাময়িক বহিষ্কার : নাসিরনগরে হামলা-ভাঙচুরে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠায় নাসিরনগরের তিন নেতাকে সাময়িক বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগ। তিন নেতা হলেন নাসিরনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসম্পাদক ও সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল হাসেম, হরিপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. ফারুক মিয়া এবং চাপরতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সুরুজ আলী।

জেলা আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, শুক্রবার (গতকাল) দুপুরে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর সভাপতিত্বে দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সভায় ওই তিনজনকে সাময়িক বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়। গণমাধ্যমের খবরের ভিত্তিতে তাঁদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দলের আর কারো সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. হেলাল উদ্দিনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

রসরাজ রিমান্ডে : ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার যুবক রসরাজ দাসকে গত বৃহস্পতিবার পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। নাসিরনগর থানার এসআই মো. মহিউদ্দিন সুমন জানান, রসরাজকে শনিবার গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে এখন পর্যন্ত তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

রসরাজ ফেসবুকে একটি ছবি দিয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে—এমন অভিযোগ তুলে গত রবিবার নাসিরনগরে হিন্দুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা চালানো হয়। পুলিশ ইতিমধ্যে জড়িত অভিযোগে ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। একাধিক ভিডিওচিত্র সংগ্রহ করে অর্ধশত হামলাকারীকে চিহ্নিত করারও দাবি করেছে পুলিশ।

রাজধানীসহ দেশজুড়ে সমাবেশ, মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি : হিন্দুদের  বাড়িঘর, মন্দিরে  হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিকাণ্ডের প্রতিবাদে গতকাল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ব্যর্থতার অভিযোগ তোলা হয়েছে এসব কর্মসূচি থেকে। ঘটনার পর নিষ্ক্রিয় থাকায় এবং হিন্দু সম্প্রদায় নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করায় মন্ত্রী ছায়েদুল হকের পদত্যাগেরও দাবি উঠেছে। গতকাল ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ থেকে এ দাবি জানান বক্তারা। তাঁরা বলেছেন, এত বড় তাণ্ডবকেও মন্ত্রী ‘তেমন কিছু নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন। এরপর আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়ে তিনি তাচ্ছিল্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর এসব কর্মকাণ্ডে উসকানি পেয়েই বৃহস্পতিবার হিন্দুদের ঘরে আগুন দেওয়ার সাহস পেয়েছে দুর্বৃত্তরা।

শহীদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সমাবেশ : গতকাল বিকেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘রুখে দাঁড়াও সাম্প্রদায়িক হায়েনা’ শীর্ষক স্লোগানে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। সমাবেশে বক্তারা বলেছেন, ‘নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা শুধু সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ নয়, এটি মানুষের ধর্মবোধের ওপর আক্রমণ। এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সংবিধানের ওপর হামলা। আগের ঘটনাগুলোর বিচার না হওয়ায় একের পর এক এ ধরনের ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে।’

সমাবেশে অন্যদের মধ্যে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, বিশিষ্ট সাংবাদিক আবেদ খান, গবেষক মফিদুল হক বক্তব্য দেন। সমাবেশ থেকে সুধীসমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে এ ঘটনায় গণতদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানানো হয়। পরে সেখানে প্রতিবাদী আবৃত্তি পরিবেশন ও মঞ্চ নাটক হয়।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ : গতকাল সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে বিভিন্ন সংগঠন। তাদের মধ্যে ছিল বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ, মাইনরিটি সংগ্রাম পরিষদ, বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশন, সচেতন হিন্দু পরিষদ, জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতি, জগদ্বন্ধু মহাপ্রকাশ মঠ, জাগো হিন্দু পরিষদ, জাতীয় হিন্দু যুব মহাজোট, ছাত্র যুব ঐক্য পরিষদ, মহিলা ঐক্য পরিষদ, জাতীয় হিন্দু ছাত্র মহাজোট ও জাতীয় হিন্দু মহাজোট। মানববন্ধন শেষে সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রেস ক্লাব এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করে।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক নিম চন্দ্র ভৌমিক বলেন, ‘সারা দেশে বিভিন্ন জায়গায় হামলা হচ্ছে। হিন্দুদের মন্দির ভেঙে দেওয়া হচ্ছে, বাড়িঘরে হামলা হচ্ছে। এর আগে বিদেশিদের ওপর হামলা হয়েছে, খ্রিস্টানদের ওপর হামলা হয়েছে, মুসলমানদের ঈদের জামাতে হামলা হয়েছে। এসব হামলার মাধ্যমে বিভেদ, অনৈক্য সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে।’ তিনি অবিলম্বে হামলাকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান।

নাসিরনগরে ঘটনায় জাতীয় হিন্দু মহাজোট পাঁচ দফা দাবি ঘোষণা করেছে। সেগুলো হলো—ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত, ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির ও ঘরবাড়ি সরকারি খরচে নির্মাণ করে দেওয়া, হিন্দু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, মন্ত্রী ছায়েদুল হকের পদত্যাগ, ইউএনও ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এসপির অপসারণ এবং একটি সংখ্যালঘু কমিশন গঠন। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে কঠোর গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

শাহবাগে অবরোধ, বিক্ষোভের মুখে হানিফ : ‘সচেতন শিক্ষার্থীরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ ব্যানারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মিছিল দুপুরের আগে টিএসসি থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে মানববন্ধনে অংশ নেয়। সোয়া ১২টার দিকে শাহবাগে এসে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের একটি অংশ। এর আগে থেকেই জাতীয় জাদুঘরের সামনেও মানববন্ধন করছিল শিক্ষার্থীরা। অবরোধের কারণে প্রায় এক ঘণ্টা শাহবাগ মোড় হয়ে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ থাকে। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে বিক্ষোভের মুখে পড়েন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, হানিফের গাড়ি থেকে একজন নেমে এসে গাড়িটি ছেড়ে দিতে বললে শিক্ষার্থীরা আপত্তি তোলে। একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাগিবতণ্ডায় জড়ালে বিক্ষোভকারীরাও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এ সময় হানিফের গাড়িতে কয়েকজনকে লাথি মারতে দেখা যায়। পরে হানিফ বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল কালাম আজাদ জানান, শিক্ষার্থীরা প্রেস ক্লাবে মানববন্ধন শেষে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেছিল। সোয়া ১টার দিকে তারা চলে যাওয়ার পর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।

গতকাল ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ সমাবেশ মিছিল ও মানববন্ধন হয়েছে। বিস্তারিত আমাদের আঞ্চলিক অফিস, নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে— 

সকালে বরিশাল নগরীর অশ্বিনী কুমার হলের সামনে মানববন্ধন করে জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। সিলেটের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়েছে। দুপুরে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধন হয়। এতে হিন্দু সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন সংগঠন অংশ নেয়। বাগেরহাটে মানববন্ধনে আওয়ামী লীগসহ প্রগতিশীল বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাংস্কৃতিক সংগঠন অংশ নেয়। নড়াইলে মানববন্ধন করেছে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ।

ফেনীতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়েছে। ভোলায় শহরের কে জাহান শপিং কমপ্লেক্সের সামনে সমাবেশ করেছে জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদ। নওগাঁ শহরের ব্রিজের মোড় এলাকায়  মানববন্ধন করে জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদ। নীলফামারী শহরের চৌরঙ্গি মোড়ে মানববন্ধন হয়েছে। ময়মনসিংহ ও ভালুকায় সমাবেশ হয়েছে। পটুয়াখালী শহরের নতুন বাজার থেকে বিক্ষোভ মিছিল হয়। জামালপুরে দয়াময়ী চত্বরে মানববন্ধন হয়।

রাজবাড়ী শহরের রেলগেট চত্বরে মানববন্ধন করেছে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। মাদারীপুর প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। শেরপুরে শহরের রঘুনাথ বাজার টাউন হলের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। নাটোর প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ হয়। পঞ্চগড়ে শের-ই-বাংলা পার্কে বিক্ষোভ হয়েছে। নরসিংদী শহরের স্বাধীনতা চত্বরে মানববন্ধন করেছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সহস্রাধিক নারী-পুরুষ। এ ছাড়া গোপালগঞ্জ, গাইবান্ধা, চুয়াডাঙ্গা ঝালকাঠি ও লক্ষ্মীপুরে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে।