kalerkantho

রবিবার । ২৬ জুন ২০২২ । ১২ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৫ জিলকদ ১৪৪৩

সেবায় নেমে বিপাকে

সেই স্বপ্নবাজদের মুক্তি মেলেনি

নিজস্ব ও আদালত প্রতিবেদক    

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সেই স্বপ্নবাজদের মুক্তি মেলেনি

শিশুদের মুখে হাসি ফোটানো জাকিয়া সুলতানা। অন্য তিন সহকর্মীর সঙ্গে এখন তিনি কারাগারে। ছবি : সংগৃহীত

ফেসবুকের কাভার ফটোতে জাতীয় পতাকা, তার জমিনে জ্বলজ্বল করছে বাংলাদেশের সোনালি মানচিত্র। তাতে লেখা, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি। ’ অ্যাকাউন্টটির মালিকের নাম আরিফুর রহমান (২৪)। সবার কাছে তিনি পরিচিত আরিয়ান আরিফ নামে।

বিজ্ঞাপন

শিশুদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন তিনি। চেয়েছিলেন প্রতিটি শিশু মানুষ হোক আলোর ঝরনাধারায়। কিন্তু সেই চাওয়াই আজ কাল হয়েছে। কারণ, পথেঘাটে ঘুরে বেড়ানো সুবিধাবঞ্চিত, অসহায় শিশুদের জন্য কাজ করতে গিয়ে স্বপ্নবাজ এ তরুণ আজ জেলে বন্দি। একই কারণে তাঁর সঙ্গে জেলে যেতে হয়েছে আরো তিন তরুণ-তরুণীকেও। ছিন্নমূল শিশুদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আচমকা তাঁরা আইনের মারপ্যাঁচে পড়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে মানবপাচারের মামলা হয়েছে। যদিও পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী, পরিচিত লোকজন এ অভিযোগ মানতে নারাজ। রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে ও নিজস্ব তদন্তে পুলিশও এখন পর্যন্ত অভিযোগের পক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ পায়নি। তবু তাঁদের মুক্তি মেলেনি।
স্বপ্নবাজ বাকি তিনজন হলেন- জাকিয়া সুলতানা (২২), হাসিবুল হাসান সবুজ (১৯) ও ফিরোজ আলম খান শুভ (২১)। ‘অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন তাঁরা। যথাযথ দপ্তর থেকে এর নিবন্ধনও নেওয়া হয়েছে। আরিফুর ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান। জাকিয়া সাধারণ সম্পাদক, সবুজ ও শুভ কর্মকর্তা।  
নিজেদের টিউশনি ও পকেট খরচের টাকা জমিয়ে, নানাজনের কাছ থেকে অনুদান নিয়ে তাঁরা শিশুদের পেছনে খরচ করতেন। ফেসবুকভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবীরাও তাঁদের সাহায্য করত। সবাই মিলে রাজধানীর শাহবাগ, কমলাপুর, সদরঘাট ও আগারগাঁওয়ে পথশিশুদের জন্য ভ্রাম্যমাণ স্কুলের ব্যবস্থা করেছেন। সেখানে শিশুদের হাতেকলমে শিক্ষা দেওয়া হতো। সেই স্কুলের নামটাও মজার- ‘মজার ইশকুল’।
শুধু শিক্ষা নয়, খাবারের ব্যবস্থাও করা হতো স্কুলে। পাউরুটি, কলা, আইসক্রিম, বিস্কুট দেওয়া হতো। এ ছাড়া ছিল বিশেষ সময়ে বিশেষ আয়োজন। গ্রীষ্মের বাজার যখন মৌসুমি ফলে সয়লাব থাকে, তখন শহরের পথশিশুরা অন্যদের খেয়ে ফেলে দেওয়া ফলের খোসা চেটে খায়। নয়তো ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া পচা ফল তুলে মুখে দেয়। ফল কেনার সামর্থ্য থাকে না তাদের। আম-জামের শাখায়ও চড়া হয় না। সেই শিশুদের মৌসুমি ফল খাওয়াতে গত ১০ জুন আরিফুররা মিলে আয়োজন করেছিলেন ‘মজার ইশকুল : ফল উৎসব’। সেদিন পাকা ফলের মধুর রসে মুখ রঙিন করেছিল প্রায় ৯০০ পথশিশু। গত বছরের অক্টোবরে ৩৬৫ শিশুকে এক বেলা মাংস-পোলাও খাইয়েছিলেন তাঁরা। প্রতি ঈদে এই শিশুদের জন্য নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা করা হতো। শীতে দেওয়া হতো গরম কাপড়। শিশুদের স্কুলের পোশাকের রংও লাল-সবুজ।
কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দীর্ঘদিন ধরে যক্ষ্মায় ধুঁকছিলেন পারভিন নামের এক অসহায় নারী। মজার ইশকুলের উদ্যোক্তারাই তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। তাঁদের আপ্রাণ চেষ্টায় সেই পারভিন আজ সুস্থ হওয়ার পথে।
আরিফুরদের স্বপ্নের পথে চলা শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে। এর পর থেকে চলছে নিরলস কাজ। ইতিমধ্যে অনেক স্বেচ্ছাসেবী জুটেছে, যারা নিজেদের পয়সা ও সময় বাঁচিয়ে আরিফুরদের সঙ্গী হয়েছে। রাজধানীর পাঁচ হাজার পথশিশু নিয়ে কাজ করেন তাঁরা। ফাউন্ডেশনের সদস্যসংখ্যা ৪০০। তাঁদের মধ্যে ২০০ জন সরাসরি শিশুদের সেবায় নিয়োজিত।  
তবে সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখা এই তরুণ-তরুণীরাই আজ পড়েছেন মহা বিপাকে। শিশুদের জন্য ‘খাদ্য, প্রযুক্তি ও শিক্ষা’- এ চিন্তা থেকে গত জানুয়ারিতে তাঁরা রামপুরার বনশ্রী এলাকায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন। সেটাকে বানানো হয়েছিল আশ্রয়কেন্দ্র। সেখানে থাকা-খাওয়ার পাশাপাশি সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল ১০ শিশুর, যারা রাজধানীর এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াত। কেউ অভাবী মা-বাবার পিটুনি খেয়ে বাড়ি ছেড়েছে, কেউ রাগ করে বাড়ি ছাড়ার পর ঠিকানা ভুলে গেছে, কারো মা-বাবাই নেই। সব ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু গোল বাধে সম্প্রতি। ১০ শিশুর মধ্যে একজন ছিল মোবারক হোসেন (১৪)। তার চাচা মনির হোসেন গত শনিবার রামপুরা থানায় মামলা করেন। তাঁর অভিযোগ, মোবারককে জোর করে আটকে রেখেছেন আরিফুররা। সেখানে আরো শিশু আছে। আরিফুররা শিশু পাচারের সঙ্গে জড়িত। মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে করা এ মামলায় পুলিশ আরিফুর, জাকিয়া, শুভ ও সবুজকে গ্রেপ্তার করে। ১০ শিশুকে উদ্ধার করে আদালতের মাধ্যমে টঙ্গীতে শিশু-কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হয় ৯ শিশুকে। মোবারককে হস্তান্তর করা হয় তার পরিবারের কাছে। আর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরিফুরদের আদালতের মাধ্যমে গত রবিবার দুই দিন করে রিমান্ডে নেওয়া হয়।
রিমান্ড শেষে গতকাল বুধবার চারজনকে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় তাঁদের পক্ষে জামিন চেয়ে আবেদন করা হয়। আর তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ তাঁদের আটক রাখার আবেদন করে। শুনানি শেষে ঢাকার মহানগর হাকিম অমিত কুমার দে আদেশের জন্য আগামী রবিবার দিন ধার্য করেন। তবে গতকাল শুনানির সময় চারজনকে আদালতের এজলাসে আনা হয়নি।
চারজনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মলয় সাহা বলেন, ‘আমরা এখন এমন এক সময়ে উপস্থিত হয়েছি যে নিঃস্বার্থ সেবা করলেও জেলে যেতে হয়। বিচারক কী আদেশ দেবেন জানি না। তবে বর্তমান মানবতাবিহীন সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ওই চার স্বেচ্ছাসেবীকে বিনা কারণে তিন দিন কারাগারে থাকতেই হবে। ’
গতকাল সারা দেশ থেকে আসা আরিফুর-জাকিয়াদের অসংখ্য শুভাকাক্সক্ষী, স্বেচ্ছাসেবী আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছিল। পরিবারের সদস্য-স্বজনরাও ছিল। তারা অবিলম্বে চারজনের মুক্তি দাবি করে। তাদের মুক্তির দাবিতে ফেসবুকে ব্যাপক জনমত গড়ে উঠেছে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনেরও আয়োজন করা হয়েছে।    
অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের কার্যকরী কমিটির সদস্য আমানুল্লাহ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফাউন্ডেশনের মূল অফিস মালিবাগে। মাস ছয়েক আগে একদিন মোবারক তাদের কমলাপুরের স্কুলে আসে। সে তার নাম বলেছিল মিজান। তখন সে জানিয়েছিল, তার বাবা নেই, মা-ও তাকে ফেলে চলে গেছেন। সে আমাদের আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে চায়, মানুষ হতে চায়। আমরা তাকে তিন মাস পর্যবেক্ষণে রাখি। তারপর নিয়ে আসি ওই ফ্ল্যাটে। সে আমাদের কাছে কখনো কোনো অভিযোগ করেনি। কিন্তু হঠাৎ তার চাচা কেন মামলা করল বুঝতে পারছি না। আমার ধারণা, কেউ ষড়যন্ত্র করছে। আরিফুররা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে। ’
গতকাল আদালত প্রাঙ্গণে আরিফুরের ছোট বোন জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভাইয়া (আরিফুর) সব সময় শিশুদের নিয়েই মেতে থাকত। ফেসবুকে ওদের পেজে গেলেই তার প্রমাণ মিলবে। শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য কাজ করত সে। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। আমরা ভাইয়াসহ অন্যদের মুক্তি চাই। ’
মগবাজারের বাসায় গেলে জাকিয়ার বাবা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমার মেয়ে পথশিশুদের মানুষ করার স্বপ্ন দেখত। নিজের কাজ ভুলে সে শিশুদের পেছনে সময় দিত। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা। অন্যায়ভাবে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অবিলম্বে তার মুক্তি চাই। ’
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রামপুরা থানার এসআই জিয়ারত হোসেন গতকাল বলেন, ‘মামলার পরিপ্রেক্ষিতেই চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রিমান্ড শেষ হয়েছে। তবে তদন্ত এখনো চলছে। আজ (বুধবার) আদালতে দিন ধার্য ছিল। শুনানি শেষে আদালত তাদের জেলহাজতে পাঠিয়েছেন। তবে এখনো তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ মেলেনি। ’
গতকাল সন্ধ্যায় মামলার বাদী মনির হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ভাতিজাকে (মোবারক) আটকে রাখায় তাৎক্ষণিকভাবে আমার মনে হয়েছিল ওই চারজন মানবপাচারে জড়িত। কিন্তু পরে খোঁজ নিয়ে দেখেছি তারা সৎ ও মানবিক। পুলিশের তদন্তেও বিষয়টি প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা চালানোর কোনো ইচ্ছা আমার নেই। ’
কেমন আছে সেই শিশুরা : গাজীপুর থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ‘মজার ইশকুল’ থেকে পুলিশের মাধ্যমে ‘উদ্ধার’ ও আদালতের মাধ্যমে টঙ্গীর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে স্থান পাওয়া ৯ পথশিশু এখন অনেকটাই আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি লেখাপড়া ও নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা চিন্তিত। গতকাল সরেজমিনে উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে এসব শিশুর বক্তব্য পাওয়া যায়। শিশুরা জানায়, তারা মজার ইশকুলেই ভালো ছিল। আবারও তারা সেই ইশকুলেই ফিরতে চায়। অবিলম্বে গ্রেপ্তার হওয়া তাদের চার ‘অভিভাবক’কে মুক্তির দাবি জানায় তারা।
ওই ৯ শিশু হলো আবদুল্লাহ আল মামুন (১১), মো. বাবলু (১০), মো. আব্বাস (১০), মো. স্বপন (১১), মো. আকাশ (৯), মান্না ইব্রাহিম আলী (১০), মো. রাসেল (১৪), মো. রফিক (১৪) ও মো. ফরহাদ (৯)।
টঙ্গীর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক মো. রবিউল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানান, আদালতের মাধ্যমে ওই ৯ শিশু গত সোমবার বিকেলে এখানে এসেছে। কেন্দ্রে যেসব শিশুকে পাঠানো হয় তাদের ৯৫ ভাগই কোনো না কোনো অপরাধ বা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে আসে। তাদের আচার-আচরণও হয়ে থাকে বেপরোয়া ও উচ্ছৃঙ্খল। কিন্তু মজার ইশকুলের ৯ শিশু অন্যদের থেকে আলাদা। এদের আচরণ, কথাবার্তা, চলাফেরার ধরন সবই চোখে পড়ার মতো। শিশুরা জানিয়েছে, মজার ইশকুলের শিক্ষকরা তাদের এভাবে গড়ে তুলেছেন। তাই তাদের অপরাধী শিশুদের সঙ্গে না রেখে আলাদা কক্ষে রাখা হয়েছে।


সাতদিনের সেরা