kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

সাক্ষাৎকার : হোসেন আহমদ, কাস্টমস কমিশনার

৩৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় সম্ভব

ফারুক ইকবাল, চট্টগ্রাম   

৩ জুলাই, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



৩৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় সম্ভব

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করে রাজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নিয়েছে। সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে বড় ধরনের অর্জন বা সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে এসব পদক্ষেপের সুবাদে আরো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভরসা পাচ্ছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষ। নতুন অর্থবছরের (২০১৫-১৬) বাজেটে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের চেয়েও ২২ শতাংশ বেশি। এটাও সম্ভব হবে বলে আশাবাদী চট্টগ্রামের কাস্টমস কমিশনার হোসেন আহমদ।

কমিশনার হোসেন আহমদ একান্ত সাক্ষাৎকারে কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য ও দেশের রাজনীতি স্থিতিশীল থাকলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন খুবই সম্ভব। সমাপ্ত অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে দেওয়া রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পরবর্তী সময়ে দুইবার সংশোধনী আকারে বাড়ানো হয়। আমরা সেই বর্ধিত টার্গেটও অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছি। আর নতুন অর্থবছরের জন্য ধার্য করা লক্ষ্যমাত্রা অনেক উঁচু। তবে আমি আশাবাদী এটিও অর্জিত হবে।'

কাস্টম হাউসে গত মঙ্গলবার কালের কণ্ঠ'র সঙ্গে আলাপকালে কমিশনার হোসেন আহমদ উল্লেখ করেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর শুল্ক কর আদায়ে সুশাসন ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এতে করে কাস্টম হাউসে সেবার মান লক্ষণীয় পর্যায়ে উন্নতি সাধন করেছে।' প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সুশাসন ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, 'স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং পদ ধরে রাখতে হলে ভালো কর্মদক্ষতার প্রদর্শন ঘটাতে হবে। এটা এনবিআর চেয়ারম্যানের নির্দেশ।'

কমিশনার বলেন, আগে বন্দর থেকে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে কাস্টমের ছাড়পত্র পেতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেত। কোনো জটিলতা না থাকলে এখন তা এক দিনের মধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্বমানের সেবা দিতে ভবিষ্যতে তা কয়েক ঘণ্টায় নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে দাবিদারবিহীন পণ্য খালাস ও উচ্চ আদালতে দায়েরকৃত রিট পিটিশন নিষ্পত্তি করে বকেয়া রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

কয়েক বছর আগে ১৩ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে তেজস্ক্রিয় পণ্য শনাক্তকরণ ও তেজস্ক্রিয়ার পরিমাণ নিরূপণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিজ উদ্যোগে ও সহায়তায় চট্টগ্রাম বন্দরে চারটি জেটি গেটে স্থাপিত রেডিয়েশন পোর্টাল মনিটরসের (আরপিএম'এস) কার্যকারিতার উল্লেখ করে কমিশনার হোসেন আহমদ বলেন, 'এসব যন্ত্রপাতির ফলে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের তেজস্ক্রিয়া শনাক্ত করা সহায়ক হিসেবে কাজ করছে।'

কমিশনার হোসেন আহমদ কাস্টমে নিলাম প্রক্রিয়া, হাইকোর্টে মামলা জট, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানিসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে নানা প্রশ্নের জবাব দেন। শুল্কবিষয়ক জটিলতায় মামলা জট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'এ-সংক্রান্তে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার রিট পিটিশন হাইকোর্টে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এসব মামলা দেখাশোনার জন্য সহকারী কমিশনার ও ডেপুটি কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তথ্য গোপন করে কেউ যাতে রিট পিটিশন করতে না পারে তার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। গত জুনের প্রথম তিন সপ্তাহের মধ্যে পুরনো মামলার রায়ে সাত কোটি টাকা বকেয়া রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়েছে।'

এনবিআর চেয়ারম্যানের অনুরোধে সাড়া দিয়ে আট সদস্যবিশিষ্ট বিচারপতিদের একটি দল গত ৬ থেকে ৮ জুন চট্টগ্রামে কাস্টম হাউস, ভ্যাট ও আয়কর অফিস পরিদর্শন করেন। হাইকোর্টে দায়েরকৃত মামলার নিষ্পত্তিকরণ ও বকেয়া শুল্ক-কর আদায়ের বিষয়টি সহজ করার লক্ষ্যে বাস্তবভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে প্রতিনিধিদলটি এই সফর করে বলে জানান এই কাস্টমস কর্মকর্তা।

বিগত অর্থবছরে (২০১৪-২০১৫) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে প্রথমে ২৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে দেয়। পরে দুই দফা বাড়িয়ে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয় ২৬ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা। বিগত অর্থবছরের শেষ দিন গত ৩০ জুন এই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে প্রায় সাড়ে চার শ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আয় হয় বলে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়।

সাক্ষাৎকারে হোসেন আহমদ বলেন, 'চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে চাই। যাতে করে সরকারের রাজস্ব সুরক্ষা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বন্দর থেকে আমদানি পণ্য খালাস ও রপ্তানি পণ্যের জাহাজীকরণ নির্বিঘ্নে করা যায়। এতে করে ব্যবসায়ীদের খরচ কমবে।' তিনি বলেন, 'যারা কমপ্লায়েন্ট তাদেরকে আস্থায় নিচ্ছি। ভালো বা সুনামের অধিকারী ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাঁদের আমদানি পণ্য ছাড় করার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে মাত্র ৫ শতাংশ পণ্যের কায়িক পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।'

গাড়ির নিলাম প্রসঙ্গে এক প্রশ্নোত্তরে হোসেন আহমদ বলেন, 'নিলাম প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হয়েছে। গত দুই মাসে চার শ গাড়ি খালাস করা হয়েছে। পাঁচ বছরের অধিক পুরনো (রি-কন্ডিশনড্) গাড়ি নিলামে বিক্রির ক্ষেত্রে আইনি বাধা সরলীকরণ করা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে নিলামকারীকে নিজ উদ্যোগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র নিতে হবে। পাশাপাশি, জিপি শিট/বিপি শিটের ওজন পরিমাপ ও শুল্কায়ন জটিলতা কাটাতে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এতে বেশ সুফল পাওয়া যাচ্ছে।'

মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি প্রতিরোধ ও নিরুৎসাহিত করতে দায়ী প্রতিষ্ঠানকে ৪০ শতাংশ থেকে শতভাগ পর্যন্ত জরিমানা আরোপ করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণার বিষয়টি আগেভাগে স্বীকার করলে তাদের ওপর অপেক্ষাকৃত নমনীয় হারে জরিমানা আরোপ করা হচ্ছে।'

অবৈধ পন্থায় কাগজ আমদানির অভিযোগ নিয়ে এক প্রশ্নোত্তরে কমিশনার হোসেন আহমদ বলেন, 'এখন তেমন কোনো অভিযোগ নেই। তবে, বন্ডের আওতায় সন্দেহজনক কনটেইনার এলে তা বন্ড কমিশনারকে অবহিত করা হচ্ছে। যাতে এ ধরনের চালান এলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।'

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ব্যবস্থাপনাকে বিশ্বমানে উন্নীত করার বিষয়ে হোসেন আহমদ বলেন, 'তথ্য সংগ্রহ ও আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও সফটওয়্যারের উত্তরোত্তর উন্নয়ন সাধন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব আয় সুরক্ষা করে দ্রুত পণ্য চালান খালাসের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বন্দরে স্থাপিত আরপিএমের সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার আধুনিকায়নের জন্য চলতি জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে 'ইউএস মেগা-পোর্টস ইনিশিয়েটিভ'-এর একটি প্রতিনিধিদল চট্টগ্রাম আসছে। একই সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টমের একটি প্রতিনিধিদল আরপিএম বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দর পরিদর্শনে যাবে।



সাতদিনের সেরা