kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

খোকন রাজাকারের ফাঁসির দণ্ড

আশরাফ-উল-আলম ও রেজাউল করিম    

১৪ নভেম্বর, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



খোকন রাজাকারের ফাঁসির দণ্ড

মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা পৌরসভার মেয়র ও বিএনপি নেতা জাহিদ হোসেন খোকনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। জাহিদ হোসেন এলাকায় খোকন রাজাকার নামে পরিচিত। তাঁর বিরুদ্ধে আনা ১১টি অভিযোগের মধ্যে ১০টিই প্রমাণিত হয়েছে। এসবের মধ্যে ছয়টিতে মৃত্যুদণ্ড এবং চারটিতে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রায়ে খোকন রাজাকারকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি পলাতক থাকায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর বা ট্রাইব্যুনাল অথবা অন্য কোনো আদালতে আত্মসমর্পণের পর এই রায় কার্যকর হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে রায়ে। তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জাহিদ হোসেন খোকন ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জামায়াতের পক্ষে প্রচারে অংশ নেন। স্বাধীনতার পর তিনি যোগ দেন বিএনপিতে। একাত্তরে তিনি ছিলেন স্থানীয় রাজাকার কমান্ডার। দুটি ট্রাইব্যুনালে এ নিয়ে ১২টি রায় ঘোষণা করা হলো। এর আগে আবুল কালাম আযাদ, কাদের মোল্লা, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, গোলাম আযম, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, আবদুল আলীম, চৌধুরী মঈনুদ্দীন, আশরাফুজ্জামান খান, মতিউর রহমান নিজামী ও মীর কাসেম আলীর বিচারের রায় হয়েছে। রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে মোবারক আলী, এ টি এম আজহার ও সৈয়দ কায়সারের বিরুদ্ধে মামলা।
রায় উপলক্ষে গতকাল সকাল থেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এলাকায় কড়া নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয় পুলিশ।
সকাল ১১টায় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন বিচারক এজলাসে ওঠেন। প্রথমে বিচারপতি আনোয়ারুল হক আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো পড়ে শোনান। পরে বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন যেসব অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে সেগুলো পড়ে শোনান। শেষে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান পড়ে শোনান রায়ের মূল অংশ।
ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ : ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, আসামি জাহিদ হোসেনের বিরুদ্ধে আনা ১১টি অভিযোগের মধ্যে ১০টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল মামলার বর্ণনা, সাক্ষীদের জবানবন্দিসহ সব কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রমাণিত প্রতিটি অপরাধের দায়ে পৃথক শাস্তি দিয়েছেন। রায়ে আরো বলা হয়, যেকোনো একটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে বাকিগুলো কার্যকর করার প্রয়োজন নেই। এই শাস্তির বিরুদ্ধে আসামি ইচ্ছা করলে রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে পারবেন। তবে তাঁকে অবশ্যই এই সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার হতে বা আত্মসমর্পণ করতে হবে।
রায়ে বলা হয়, স্বাধীনতাযুদ্ধে মূল যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন সদস্য। তাদের ত্রিপক্ষীয় চুক্তির পর নির্বাহী আদেশে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের ছেড়ে দেওয়া হলেও তাদের সহযোগীদের বিচারে আইনগত কোনো বাধা নেই। এই সহযোগীদের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন করা হয়। সংবিধানের ৪৭(৩) অনুচ্ছেদে এ বিচারের কথা বলা আছে। এ জন্য জাতীয় সংসদে আইন পাস করা হয়। তাই রোমবিধি এখানে কোনো বাধা নয়।
রায়ে বলা হয়, জাহিদ হোসেন ওরফে খোকন রাজাকার ফরিদপুর শহর ও এর আশপাশের এলাকায় গণহত্যা, হত্যা, লুটপাট, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগে জড়িত ছিলেন বলে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি সেখানে রাজাকার কমান্ডার ছিলেন। তিনি এসব অপরাধ কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেন।
গত বছরের ১৯ নভেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ওই বছরের ৯ অক্টোবর খোকনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ১৬ নারী-শিশুসহ ৫০ জনকে হত্যা, তিনজনকে পুড়িয়ে হত্যা, দুজনকে ধর্ষণ, ৯ জনকে ধর্মান্তর করা, দুটি মন্দিরসহ ১০টি গ্রামের বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ, সাত গ্রামবাসীকে সপরিবারে দেশান্তরে বাধ্য করা এবং ২৫ জনকে নির্যাতনসহ ১১টি অভিযোগে খোকনকে অভিযুক্ত করেন ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় মোট ২৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন।
যেসব অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড : খোকনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে ৫, ৬, ৭, ৮, ৯ ও ১০ নম্বর অভিযোগে। এসব অভিযোগে বলা হয় :
নম্বর পাঁচ. ১৯৭১ সালের ৩০ মে খোকন তাঁর বাহিনী ও পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিয়ে কোদালিয়া শহীদনগর গ্রামে প্রবেশ করেন। ওই সময় পাকিস্তানি সেনারা গ্রামের অনেক বাড়িঘরে লুটপাট চালায়। ভেলুর ভিটা জঙ্গল থেকে ৫০-৬০ জনকে ধরে খোকন ও সেনারা লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করলে ১৬ নারী-শিশু নিহত হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আকরামুন নেছা (৪৫), রোকসানা আক্তার (১৮), রাবেয়া বেগম (৫০), হেলেনা আক্তার (১৫), হামেদা বেগম (২৫)। এ ছাড়া ওই দিন খোকন কোদালিয়া গ্রামের আফজাল হোসেনকে গুলি করে হত্যা করেন।
ছয়. গণহত্যা, হত্যা, গুরুতর জখম ও অগ্নিসংযোগের এই অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ৩০ মে দুপুরে সশস্ত্র খোকনের নেতৃত্বে রাজাকাররা ঈশ্বরদী গ্রামে ঢোকে। তাদের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনারাও ছিল। তারা অনেক বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। লোকজন প্রাণভয়ে ছোটাছুটি করতে থাকলে খোকন ও সেনারা পলায়নরত সালাম মাতুব্বর, শ্রীমতী খাতুন, লাল মিয়া ও আ. মাজেদকে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। তারা শিশু ফুলমতিকেও গুলি করে জখম করে।
সাত. ১৯৭১ সালের ৩১ মে খোকনের নেতৃত্বে রাজাকাররা পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে শহীদনগর কোদালিয়া গ্রামের পাশে দিঘলিয়া-ঘোড়ারনারা বিলে যায়। তখন গ্রামের নিরীহ লোকজন ভয়ে ছোটাছুটি করে। রাজাকাররা অসুস্থ পিজির উদ্দিনের বসতঘরসহ পার্শ্ববর্তী আফাজ ও সাদেকের বসতঘর পুড়িয়ে দেয়। ওই ঘর তিনটিতে পিজির, আফাজ ও সাদেক আগুনে পুড়ে মারা যান। আছির উদ্দিন মাতুব্বরকে গুলি করে হত্যা করেন খোকন। সফিজউদ্দিনকেও গুলি করে হত্যা করা হয়।
আট. একাত্তরের ৩১ মে খোকনের নেতৃত্বে রাজাকাররা পাকিস্তানি সেনাদের পথ দেখিয়ে গোয়ালদী গ্রামে নিয়ে যায়। ভয়ে নিরীহ জনগণ ছোটাছুটি করে। পলায়নরত বৃদ্ধ রাজেন্দ্রনাথ রায়কে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনা হান্নান মুন্সি আড়াল থেকে দেখতে পান। গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় দুই বছরের শিশু বুলু খাতুনকেও।
৯. ১৯৭১ সালের ৩১ মে খোকনের নেতৃত্বে রাজাকাররা একদল পাকিস্তানি সেনা নিয়ে পুড়াপাড়া গ্রামে ঢোকে। তারা রতন শেখ, বারেক মোল্লা, ছোট খাতুন ও সফিজউদ্দিন শেখসহ ছয়জনকে গুলি করে হত্যা করে। এদের মধ্যে রতন শেখ ও ছোট খাতুনকে রাজাকার খোকন নিজ হাতে গুলি করে হত্যা করেন। তারা গ্রামের অনেক বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়।
১০. একাত্তরের ১ জুন খোকনসহ রাজাকাররা বাগাট চুড়িয়ারচর গ্রামে ঢুকে ফজলুল হকের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। অনেকের বাড়িঘরে লুটপাট চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মালেক মাতুব্বর, মোশারফ মাতুব্বরসহ চারজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আমজাদ মুন্সিকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। ওই সময় মিনি বেগম ও তাঁর মা লুকানো অবস্থায় খোকনকে চিনতে পারেন। এ ছাড়া পলায়নরত রতন মাতুব্বর, আইয়ুব, মঞ্জু, রানীসহ ১০-১৫ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
বিভিন্ন মেয়াদে সাজা : খোকনকে ২ ও ১১ নম্বর অভিযোগে পাঁচ বছর কারাদণ্ড, ৩ নম্বর অভিযোগে ১০ বছর এবং ৪ নম্বর অভিযোগে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
নম্বর দুই. এ অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৮ এপ্রিল থেকে ৬ মের মধ্যে কোনো একদিন খোকন ও তাঁর বড় ভাই জাফরের নেতৃত্বে তাঁদের সহযোগীরা নগরকান্দা থানার জংগুরদী বাগুটিয়া গ্রামের কানাই লাল মণ্ডলসহ দুজনের ঘর পুড়িয়ে দেয়। পরে সবাইকে হুমকি দিয়ে বলে, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে হবে, না হলে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে। এ ধরনের ভয়-ভীতি দেখিয়ে কানাই লাল মণ্ডলের পরিবার থেকে পাঁচ হাজার টাকা এবং জীবন দাশের পরিবার থেকে ১০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। এই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় খোকনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
তিন. ১৯৭১ সালের ১৬ মে থেকে ২৮ মে যেকোনো দিন খোকন ও জাফরের নেতৃত্বে রাজাকাররা একজন মৌলভীসহ জীবন দাশের বাড়িতে গিয়ে জীবন দাশসহ তাঁর চার ভাইকে জোর করে ধর্মান্তরিত করে। এই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ১০ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে খোকনকে।
চার. ১৯৭১ সালের ২৭ মে খোকন ও জাফরের নেতৃত্বে রাজাকাররা চাঁদহাট গ্রামের হিন্দু এলাকা বণিকপাড়ায় গিয়ে জগন্নাথ দত্তের বাড়িতে ঢুকে তাঁর বাবা ভুবন মোহন দত্তসহ ১৬-১৭ জনকে ধরে ভয় দেখিয়ে জগন্নাথ দত্তের কাকি সুচিত্রার কাছ থেকে ৪২ ভরি স্বর্ণালংকার, ৩২৮ ভরি রুপার অলংকার, রেডিও ও ঘড়ি ছিনিয়ে নেয়। তারা জগন্নাথ দত্তের বসতঘর ও মন্দিরে লুটপাট চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ছাড়া ঠাকুর দাশের স্ত্রী রাধা রানীকে ধর্ষণ করেন খোকন। হলধরদের মেয়ে খুকুমনিকেও তিনি ধর্ষণ করেন। এই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় খোকনকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
১১. ১৯৭১ সালের ১ থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত খোকন রাজাকার দলবল নিয়ে জংগুরদী বাগুটিয়া গ্রামে গিয়ে কানাইলাল মণ্ডলদের বাড়িতে ঢুকে কানাইলালকে আটক করেন। রাজাকার খোকন নিজের হাতে থাকা রাইফেল দিয়ে কানাইয়ের বুকে গুলি করেন। কানাই কাত হয়ে রাস্তার ওপর মাটিতে পড়ে যাওয়ায় গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তাঁর ডান হাতে লাগে। এ অভিযোগে আসামিকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
যে অভিযোগ থেকে খালাস : খোকন রাজাকারের বিরুদ্ধে আনা ১ নম্বর অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন আসামি। ওই অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী খোকন ও তাঁর বড় ভাই নগরকান্দা শান্তি কমিটির সদস্য জাফরের নেতৃত্বে তাঁদের অন্য সহযোগীরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নগরকান্দা থানার বনগ্রামে প্রবেশ করে। তারা মুক্তিযোদ্ধা আ. হাই মোল্লা, নাজিম উদ্দিন মোল্লাসহ ছয়জনের ছয়টি বসতঘরে লুটপাট চালিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। ১৯ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে আটক করে। ছাত্তার মোল্লা ও আজিজ শেখকে মারধর করার পর ছেড়ে দেওয়া হয়। বাকি ১৭ জনকে নগরকান্দা থানায় নিয়ে দুই দিন নির্যাতন করার পর খোকন রাজাকার ১০ হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দেন। এই অভিযোগটি প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা