kalerkantho

শনিবার । ২৪ আগস্ট ২০১৯। ৯ ভাদ্র ১৪২৬। ২২ জিলহজ ১৪৪০

লাগবে তাঁর আরেকটি জাদু

সনৎ বাবলা, বেলো হরিজোন্তে থেকে    

৯ জুলাই, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



লাগবে তাঁর আরেকটি জাদু

ফুটবল ঈশ্বর বলে দিয়েছেন, এবার লিও-কে লাগবে। ডাচ দুর্গে হানা দিতে হলে তাঁর জাদুকরী ফুটবল লাগবে।
কোয়ার্টার ফাইনালের আগে আর্জেন্টাইন সমর্থকরা একটা ব্যানার নিয়ে এসেছিল-  ম্যারাডোনার হাতে বিশ্বকাপ আর মেসির হাতে আর্জেন্টিনার পাতাকা। সেই পতাকা হাতে জাদুকর ছুটছেন। আর লিও-তে বসে ‘ফুটবল ঈশ্বর’ হয়েছেন পর্যবেক্ষক, ভেনিজুয়েলার টিভি অনুষ্ঠানে তিনি যেন করণীয় ঠিক করে দিচ্ছেন। সাবেইয়া কোচ বটে, সেটা আনুষ্ঠানিক। এর বাইরে একটা অদৃশ্য ব্যাপার, টুর্নামেন্টের শুরু থেকে দুই গ্রেটের মধ্যে চলছে অন্য রকম টেলিপ্যাথি। বিশ্বকাপে সাত ম্যাচের লড়াই হলেও পথের কোন বাঁকে কী আছে, কোথায় কাঁটা বিছানো থাকে, সেটা ডিয়েগো বলে দিচ্ছেন আগেভাগে।
’ছিয়াশির নায়ক শুরুতে পরখ করে নিয়েছেন আর্জেন্টাইন যুদ্ধজাহাজের ক্যাপ্টেন ঠিক আছেন কি না। মেসির গোলে শুরু হয়েছে আর্জেন্টিনার যাত্রা। বিশ্বকাপে তাঁর গোলের গেরো যখন খুলে গেছে তখন দলের খেলার সামগ্রিক উন্নতি দেখতে চেয়েছেন ম্যারাডোনা। লিও কারিগরের ভূমিকায় নেমে সেটাও করে দিয়েছেন। বেলজিয়ামের ম্যাচ দেখে তিনি আশ্বস্ত হয়েছেন, দলের চেহারা পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু সেমিফাইনালে ওঠার পর ম্যারাডোনা দল বাদ দিয়ে ফিরে যাচ্ছেন মেসির কাছে, ‘দলগত খেলায় বেলজিয়ামের ম্যাচের ধারা থাকবে, তবে ম্যাচ জেতাতে হবে লিও-কে।’
এটা কি ফুটবল ঈশ্বরের একান্ত ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ! ২৮ বছর আগে তিনি এক হাতে কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনাল জিতিয়ে মহা আলোড়ন তুলে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে গিয়েছিলেন ফাইনালে। হতে পারে, ২৭ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডকে সে রকম পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন তিনি। আসলে তা নয়, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সেমিফাইনালকে ঘিরে সমর্থকদের মনেও বেশ দোলাচল আছে। ডাচদের দুরন্ত গতির সামনে আলবিসেলেস্তেরা না আত্মসমর্পণ করে বসে। এক এক করে তুলনা করলে কিন্তু ডাচরাই এগিয়ে থাকে। এগিয়ে তারা বিশ্বকাপের সেরা কোচ লুই ফন গালের তুখোড় ফুটবল বুদ্ধিতেও। সব কিছুতে এগিয়ে থেকেও ফন পার্সিরা আটকে যাচ্ছেন শুধু লিওনেল মেসিতে এসে। ছোট মানুষটি কখনো কখনো দশভূজার রূপ নিয়ে বাকি ১০ জনের কাজ করে দিতে পারেন একাই। গ্রুপে তিনি সেটা বারবার করে দেখিয়েছেন। মিডিয়া তাঁকে আরিয়েন রবেনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বাস্তবতা হলো, ডাচ ফরোয়ার্ড যখন ১৬টি শট পোস্টে রেখে তিন গোল করেন তখন মেসির ৯ শটে হয় ৪ গোল। ইরান ও বসনিয়া তাঁর পেছনে কয়েকজনকে লেলিয়ে দিয়েও রুখতে পারেনি। নাইজেরিয়ানরা ম্যাচ শেষে মার্কিংয়ের হিসাব মেলাতে পারেনি, তাদের জন্য যেন পুরোটাই মেসি-দর্শন, ‘তিনি অন্য গ্রহের ফুটবলার।’ সাবেইয়ার কাছে তিনি ‘আর্জেন্টিনার মরুভূমির জল সঞ্চালক।’ দলের বিপদে সব সময় অতিমানবীয় কীর্তি গড়ে উদ্ধার করেছেন।
সেমিফাইনালে ভালো বিপদেই পড়েছে আর্জেন্টিনা। নক আউট রাউন্ড থেকেই মেসি-নির্ভরতা কাটিয়ে উঠছিল তারা। নিজেকে ফিরে পাচ্ছিলেন আনহেল দি মারিয়া, সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে গোল করার পর কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের ম্যাচে গনসালো হিগুয়েইনের গোলের কারিগর হয়েছেন। কিন্তু ফাইনালে ওঠার ম্যাচে নেই এই রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড। টুর্নামেন্টের অন্যতম শক্তিশালী দলের বিপক্ষে এটা আর্জেন্টিনার বিশাল শূন্যতা। তাই বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে ‘মেসি ম্যাচ’ ছাড়া এ লড়াই উতরানো কঠিন আর্জেন্টিনার জন্য। বল পায়ে দৌড় এবং ড্রিবল করে যেকোনো ডিফেন্সকে মুহূর্তে ছত্রখান করার আবিশ্বাস্য ক্ষমতা বোধ হয় শুধু এই আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডকে দিয়েছেন ফুটবল ঈশ্বর। এ জন্য তাঁকে বল সরবরাহের ‘পাইপ-লাইন’গুলো কেটে দেওয়ার ছক কষছে নেদারল্যান্ডস। গত দুই ম্যাচ ধরে তিনি একটু নিচে প্লেমেকারের ভূমিকায় নেমেছেন, তাতে নিজের গোল না হলেও দলের খেলার গুণগত মান বেড়েছে, ধার বেড়েছে আক্রমণের। সহজ কৌশল হলো, তাঁর খেলা বন্ধ করে দিলে আর্জেন্টিনা থেমে যাবে। অতীতে অনেকে এই কৌশল নিয়েও সফল হয়নি। এবার বিশ্বকাপের সেরা কোচ লুই ফন হালের ট্যাকটিকসের সামনে পরীক্ষা দেবেন খুদে জাদুকর।
আসলে ফন গাল কিংবা নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে খেলছেন বটে; কিন্তু পরীক্ষা দিচ্ছেন আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বরের কাছে। শুরু থেকে ডিয়েগো যেভাবে বলছেন, সেভাবেই করছেন। তাঁর নতুন শর্ত হলো, ডাচ ফুটবলের জাত্যাভিমানে ঘা দিতে অধিনায়ককে জ্বলে উঠতে হবে। এ ছাড়া অন্য কোনো উপায়ও নেই। ডিয়েগোকে ছুঁতে হলে অ্যারোনা করিন্থিয়ানসকে আলোকিত করতে হবে। ’৮৬-র দলে অনেক প্রাচুর্য ছিল, তার মধ্যেই আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বরের জন্ম হয়েছে। এই দলে অত ঐশ্বর্য নেই, তাই যা কিছু করার সবই জাদুকরকে করতে হবে। সমর্থকদের ব্যনারের ওই ছবি পাল্টে দিতে হবে, দুই গ্রেটের হাতেই বিশ্বকাপ থাকবে। এ লক্ষ্যেই চলছে ম্যারাডোনা-মেসি টেলিপ্যাথি।

মন্তব্য