kalerkantho

সোমবার। ১৯ আগস্ট ২০১৯। ৪ ভাদ্র ১৪২৬। ১৭ জিলহজ ১৪৪০

আইনি এখতিয়ার বাড়ানোর তাগিদ দিলেন ডিসিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক    

৯ জুলাই, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আইনি এখতিয়ার বাড়ানোর তাগিদ দিলেন ডিসিরা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল তাঁর কার্যালয়ে তিন দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক সম্মেলন ২০১৪-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। ছবি : বাসস

জেলা প্রশাসকরা তাঁদের আইনগত এখতিয়ার বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে তাঁরা বলেছেন, মাঠ প্রশাসনে সরকারের নির্বাহী প্রতিনিধি হিসেবে ডিসিরা নেতৃত্ব দেবেন, সমন্বয় করবেন এবং সরকারের প্রতিনিধিত্ব করবেন, এটাই স্বাভাবিক। সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সমন্বয়, দারিদ্র্য বিমোচন, ভূমি ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আদায় ইত্যাদি দায়িত্ব ডিসিরাই পালন করেন। এসব কাজ ও সুশাসনের স্বার্থে ডিসিদের কিছু আইনগত এখতিয়ার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন রাঙামাটির ডিসি মো. মোস্তফা কামাল।
জানা যায়, একসময় ডিসিদের অনেক ক্ষমতা ছিল। তাঁরা আদালত বসিয়ে বিচার করতে পারতেন। কিন্তু ২০০৭ সালের শেষের দিকে তাঁদের সেই বিচারিক কর্তৃত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করার কারণে ডিসিদের কাজ কমে গেছে। এ ছাড়া ডিসিই ছিলেন জেলার সর্বময় কর্তা। আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে সব কাজের জন্য ডিসিকেই জবাবদিহি করতে হতো। জেলা পুলিশ সুপারের সব কিছুই তদারকি করতেন ডিসি। কালের পরিক্রমায় সেই কর্তৃত্বও গেছে ডিসিদের। এখন এসপিরা আর ডিসিকে মানেন না। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির প্রধান হিসেবে ডিসিরা বৈঠক ডাকলে সেই বৈঠকে উপস্থিত হন না এসপিরা- এমন অভিযোগও ওঠে।
গতকাল প্রথম দিনের সম্মেলনে আইনগত এখতিয়ার বাড়ানো ছাড়াও জমি নিয়ে সাধারণ মানুষের হয়রানি কমাতে জমি রেজিস্ট্রেশন, জরিপ, কর্মকর্তা নিয়োগ- এসব বিষয় এক মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা এবং এসব ক্ষেত্রে অটোমেশন চালুর কথা বলেছেন ডিসিরা। ভ্রাম্যমাণ আদালতের এখতিয়ার বাড়িয়ে পাহাড় কাটা বন্ধ করার কথা বলেছেন তাঁরা।
গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ডিসি সম্মেলন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর বিকেলে সচিবালয়ে ডিসি সম্মেলনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এসব অধিবেশন শেষে ডিসিরা সাক্ষাৎ করেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে।
সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে ডিসিরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুক্ত আলোচনায় বসেন। এ সময় ঢাকার ডিসি ভূমি ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন চালুর প্রস্তাব করলে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে সমর্থন করে দ্রুত এ প্রস্তাব কার্যকরের নির্দেশ দেন। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক বলেন, প্রশাসনের চোখের সামনে পাহাড় কাটা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে কিছু করার থাকে না। পাহাড় কাটার বিষয়টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অন্তর্ভুক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। তিনি ভ্রাম্যমাণ আদালতে পাহাড় কাটা প্রতিরোধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানান। রাজশাহীর ডিসি তাঁদের স্বাস্থ্য ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব করে বলেন, বর্তমানে ৭০০ টাকার স্বাস্থ্য ভাতা পর্যাপ্ত নয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে খাসজমির পাশাপাশি প্রয়োজন হলে জমি কিনে গৃহহারা ও ভূমিহীনদের ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মাদক প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া, শিক্ষার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখা, ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত নাগরিক সুবিধার আওতায় আবাসন ব্যবস্থা পৌঁছাতে এখন থেকে পরিকল্পনা নেওয়াসহ জেলা প্রশাসকদের ২৪টি নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশে বলেন, ‘যারা গৃহহারা, ভূমিহীন থাকবে, তাদের প্রত্যেককে আমরা ঘর বানিয়ে দেব। লক্ষ রাখবেন, আপনাদের এলাকায় একজন লোকও যেন গৃহহীন না থাকে- এটা আমার নির্দেশ হিসেবে নেবেন।’ ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আশ্রয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। গৃহহারা ও ভূমিহীনদের পুনর্বাসনে প্রধানমন্ত্রী সেই প্রকল্প বিস্তৃত করার তাগিদ দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকায় ফ্ল্যাট করা হচ্ছে, এটা গ্রাম পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাই। রাজধানীর মানুষ আরাম-আয়েশে জীপনযাপন করবে, গ্রামের মানুষ কী অপরাধ করেছে? ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প যেন ভালোভাবে চলতে পারে সে বিষয়েও নজর রাখতে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
মাদককে নিয়ন্ত্রণ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী স্কুল থেকেই শিক্ষার্থীদের সচেতন করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘আপনারা বাবা-মা ও শিক্ষকদের সঙ্গেও কথা বলবেন। মাদক প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিচ্ছি। তৃণমূল পযায়ে টেকসই কর্মসংস্থান ও শিক্ষা প্রসারে ভূমিকা নেওয়ার নির্দেশও দেন তিনি। শতভাগ মানুষের কাছে বিদ্যুৎসেবা পৌঁছানোর লক্ষ্যে যেসব প্রত্যন্ত গ্রামে সরবরাহ লাইন পৌঁছেনি, সেখানে সৌরবিদ্যুৎ জনপ্রিয় করার জন্য ভূমিকা রাখতেও ডিসিদের নির্দেশ দেন তিনি।
একজন ডিসি বলেন, বাড়ি বানানো বা গাড়ি কেনার জন্য যে ঋণ দেওয়া হয় তা পর্যাপ্ত নয়। ডিসিরা এসব ঋণ বাড়ানোর কথা বলেছেন। জেলা পর্যায়ে বিএসটিআই অফিস স্থাপন করে ফলমূল ও খাদ্যদ্রব্যে বিষাক্ত ফরমালিন ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশ্রণ রোধকল্পে এসব অফিসে এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পর্যাপ্তসংখ্যক ফরমালিন শনাক্তকরণ যন্ত্র সরবরাহ করার প্রস্তাব দিয়েছেন মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক। তিনি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কার্যপরিধি বিস্তৃত হওয়ায় এবং জনগুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ঝুঁকিভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফরমালিনবিরোধী অভিযান চলছে। জেলা থেকে উপজেলা পর্যন্ত ফরমালিন নিয়ন্ত্রণের দরকার। কী পরিমাণের বেশি থাকলে ফরমালিন শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর সেই নির্দেশনাও থাকা দরকার। এ জন্য আইন পাস করতে যাচ্ছি। শত প্রতিকূলতার মধ্যে গত ৫ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে ভূমিকা রাখায় জেলা প্রশাসকদের ধন্যবাদ জানান তিনি।  
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইসমত আরা সাদেক ও মন্ত্রিপরিষদসচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।
জেলা বাজেট দাবি : সম্মেলনে গতকাল অর্থ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে ‘জেলা বাজেট’ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জেলা প্রশাসকরা। দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে  প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান  পর্যায়ক্রমে সব জেলায় ‘জেলা বাজেট’ প্রণয়নের কথা জানান। বৈঠক শেষে বিকেলে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এ বিষয়ে অবহিত করেন প্রতিমন্ত্রী। বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে সরকারিভাবে যে খরচ দেওয়া হয়, এর পরিমাণ বাড়ানো এবং সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়ি নির্মাণের বরাদ্দ (বর্তমানে এক লাখ ২০ হাজার) বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন ডিসিরা।
আজ দ্বিতীয় দিন : আজ বুধবার সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে আটটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম অধিবেশনে পরিবেশ ও বন এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে।

মন্তব্য