kalerkantho

শনিবার । ২৪ আগস্ট ২০১৯। ৯ ভাদ্র ১৪২৬। ২২ জিলহজ ১৪৪০

অপার সম্ভাবনা কাজে লাগানোর প্রস্তুতি নেই

আরিফুর রহমান ও রফিকুল ইসলাম    

৯ জুলাই, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অপার সম্ভাবনা কাজে লাগানোর প্রস্তুতি নেই

ভারতের কাছ থেকে সমুদ্রের ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গ কিলোমিটার পাওয়ার আগে ২০১২ সালে মিয়ানমারের কাছ থেকে পাওয়া গেছে আরো ৭০ হাজার বর্গ কিলোমিটার। প্রতিবেশী দুই দেশের সঙ্গে এই বিজয়ের ফলে বাংলাদেশের জন্য সমুদ্রে অপার সম্ভাবনার দুয়ার আরো প্রশস্ত হয়েছে। দুই দেশের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের ফলে ব্লকগুলোতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সব ধরনের বাধা দূর হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বঙ্গোপসাগরের তলদেশে অফুরন্ত খনিজসম্পদ আহরণের অধিকার। এ ছাড়া সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি জাহাজের নিরাপদ চলাচলের সুযোগও তৈরি হয়েছে। মৎস্যসম্পদ আহরণ ও বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করা যেতে পারে। পর্যটনশিল্পে যে স্থবিরতা বিরাজ করছে, এই বিজয়ের মাধ্যমে তাও কাটিয়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এসব অমিত সম্ভাবনা কাজে লাগানোর প্রস্তুতি নেই বাংলাদেশের। সম্পদ আহরণে যে ধরনের দক্ষ জনবল থাকা দরকার, তাও নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাছ আহরণের জন্য উন্নত প্রযুক্তি ও উপকরণ সরকারের কাছে নেই। খনিজ সম্পদ উত্তোলনের মতো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিও নেই। তাই সমুদ্রের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দক্ষ জনবল তৈরি এবং উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহের পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে সমুদ্রে কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, তা নির্ণয়ের জন্য জরিপের পাশাপাশি সক্ষমতা বাড়ানোরও পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাউসার আহমেদ বলেন, সমুদ্রসীমা জয় করাই সমাধান নয়। সমুদ্রসম্পদ ব্যবহারে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ ও দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি। সমুদ্রসীমায় কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আজও কোনো জরিপ হয়নি। অতি শিগগির এ ধরনের জরিপ করার পরামর্শ দেন তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের সমুদ্রসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে নীল সমুদ্র অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি গড়ে তুলতে চায় সরকার। এটাই পারে টেকসই অর্থনীতি নিশ্চিত করতে। মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিজয়ের পর এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি ঢাকায় একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়। সমুদ্রের মধ্যে কী কী সম্ভাবনা থাকতে পারে তা নিয়ে ওই সেমিনারে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে মতামতও নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা একটি বিভাগ চালু করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় এক বিলিয়ন মানুষ সামুদ্রিক খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল। প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন মানুষ সামুদ্রিক মাছ আহরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে ৯০ শতাংশই উন্নয়নশীল দেশে বসবাসকারী। শুধু উন্নয়নশীল দেশেই ২৫ বিলিয়ন ডলার মাছ কেনাবেচা হয়। সমুদ্রের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বৈশ্বিক জিডিপিতে ৯ শতাংশ অবদান রাখছে পর্যটন খাত। এ ছাড়া জ্বালানি খাতও রাখছে ব্যাপক অবদান। এসব কারণে নীল সমুদ্র অর্থনীতির দিকে ঝুঁকছে সরকার।
কিন্তু এই অর্থনীতি গড়ে তুলতে যে ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া দরকার, সরকার তা নিতে পারেনি অভিযোগ করে অধ্যাপক কাউসার আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের সীমানায় থাকা সমুদ্র এলাকায় কী পরিমাণ সম্পদ আছে, ২৫-৩০ বছর আগে নরওয়ের একটি জাহাজ বিনা মূল্যে তার একটি সার্ভে করেছিল। এটি ছিল সমুদ্রের তলদেশে প্রাণী ও মৎস্যসম্পদের ওপর। তবে তিন-চার বছর আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জার্মানির যৌথভাবে সমুদ্রের তলদেশে পলিমাটির উৎপত্তি বা কোন এলাকা থেকে এই পলি এসেছে তার ওপর একটি সার্ভে হয়েছে। এ ছাড়া বাপেক্স ত্রিমাত্রিক অনুসন্ধান চালিয়েছে। বড় কোনো অনুসন্ধান আজও হয়নি।
এই আইনি বিজয় গ্যাসক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য আনবে উল্লেখ করে অধ্যাপক কাউসার বলেন, ‘বাংলাদেশে খুব কম পরিমাণ গ্যাস মজুদ রয়েছে। এই গ্যাস আগামী ১২-১৩ বছর পর্যন্ত চলতে পারে। অর্জিত সমুদ্রসীমায় আরো গ্যাস পাওয়া যাবে। কাজেই সরকারের উচিত ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো।’
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধের কারণে এত দিন সাগর ও স্থলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কম্পানিগুলোর আগ্রহ ছিল না। পেট্রোবাংলাও দরপত্র আহ্বান করা নিয়ে বিপাকে ছিল। কারণ গভীর সমুদ্রের তিনটি ব্লক মিয়ানমার নিজেদের দাবি করে। আর ভারত অগভীর সাগরের ১ ও ৫ এবং গভীর সাগরের বেশ কয়েকটি ব্লক দাবি করে। আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতের রায়ের পর ওই সব ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশের আর কোনো বাধা নেই। কেননা ওই সব ব্লক বাংলাদেশের অংশে পড়েছে। এর ফলে বিদেশি কম্পানিগুলোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের কয়েকটি কম্পানি এরই মধ্যে দরপত্রে অংশগ্রহণ করেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সমুদ্রে পরিবহন প্রতিনিয়তই বাড়ছে। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর দিয়ে বার্ষিক বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশই হয় জাহাজের মাধ্যমে। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে গড়ে আড়াই হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আসে। এ ছাড়া ২০০৮ সালে যেখানে বেসরকারি মালিকানায় বাংলাদেশি সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা ছিল ২৬, সমুদ্র পরিবহন চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এখন এর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০। সমুদ্রে আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং বাংলাদেশি জাহাজ সমুদ্র পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় দেশে অনেক শিপিং এজেন্সি গড়ে উঠেছে। এর ফলে মানুষের কর্মসংস্থান ছাড়াও বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হচ্ছে। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির ফলে সমুুদ্রে আরো নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দে জাহাজ চলাচল করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। পাশাপাশি সমুদ্রপথে ব্যবসা আরো সম্প্রসারণ হবে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, মিয়ানমার ও ভারতের কাছ থেকে পাওয়া সমুদ্রসীমার মধ্যে যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, তা দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে পরিবর্তন করা যেতে পারে। কারণ সামুদ্রিক জলসীমায় রয়েছে মৎস্যসম্পদ ও জলজ প্রাণীর এক বিশাল ভাণ্ডার। সমুদ্রে জিরকন, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, রিউটাইলসহ বিভিন্ন মূল্যবান খনিজ সম্পদ রয়েছে। কিন্তু এসব উত্তোলনের কোনো যন্ত্রপাতি নেই। সমুদ্রে আরো আছে কাঁকড়া, কচ্ছপ, কুমির, হাঙর, সি-আরসিন, সি-কিউকাম্বার, জেলি ফিশ, শামুক, ঝিনুক। বিদেশে এগুলোর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। রয়েছে নানা পুষ্টিগুণসম্পন্ন আগাছা। এগুলোর ব্যবহার হতে পারে মানুষের খাদ্য হিসেবে, কিংবা প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা যেতে পারে নানা ধরনের ওষুধ। বিদেশে এই আগাছার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সামুদ্রিক কচ্ছপ উচ্চ প্রোটিনসম্পন্ন। এ ছাড়া তেল ও ওষুধের কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহার করা হয় কচ্ছপ, কুমির ও হাঙর। সামুদ্রিক সম্পদের মধ্যে হাঙর উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এগুলো আহরণ ও রক্ষণাবেক্ষণে সরকারি কোনো উদ্যোগ নেই। এসব মূল্যবান সম্পদ আহরণ ও সংরক্ষণে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

মন্তব্য