kalerkantho

শনিবার । ৩ আশ্বিন ১৪২৮। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১০ সফর ১৪৪৩

বঙ্গোপসাগরে বিপুল গ্যাসের আধার

আরিফুজ্জামান তুহিন    

২৬ জুন, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বঙ্গোপসাগরে বিপুল গ্যাসের আধার

বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে মীমাংসিত দুটি ব্লকে বিশাল গ্যাসের আধার পাওয়া গেছে। টুডি বা দ্বিমাত্রিক জরিপে পাওয়া এ দুটি ব্লকে গ্যাসের প্রাথমিক মজুদ মনে করা হচ্ছে পাঁচ থেকে সাত ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। তবে ভবিষ্যতে উচ্চ প্রযুক্তির মাধ্যমে থ্রি-ডি বা ত্রিমাত্রিক জরিপে এ মজুদ আরো বেশি হতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ২৮০ কিলোমিটার পাইপলাইন দিয়ে এ গ্যাস স্থলভাগে আনতে হবে। জানা গেছে, এ ব্লক দুটির ইজারা পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক কম্পানি কনোকো-ফিলিপস তিন বছর আগের করা চুক্তির ধারা পাল্টে গ্যাসের দাম বাড়াতে সরকারকে কৌশলে চাপ প্রয়োগ করছে। বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে পাওয়া এই গ্যাস দিয়ে বাংলাদেশ কমপক্ষে আট বছর চলতে পারবে। ২০২৩ সাল থেকে এই গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ কালের কণ্ঠকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
নসরুল হামিদ বলেন, ‘গভীর সমুদ্রের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে পাঁচ থেকে সাত টিসিএফ গ্যাস প্রাপ্তির কথা আমাদের জানিয়েছে ব্লক দুটির ইজারা পাওয়া বহুজাতিক কম্পানি কনোকো-ফিলিপস।’
এদিকে বিপুল গ্যাস প্রাপ্তির পরই কনোকো-ফিলিপস উঠে পড়ে লেগেছে পেট্রোবাংলার সঙ্গে প্রডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট (পিএসসি) বা উৎপাদন অংশীদারি চুক্তিটির গুরুত্বপূর্ণ ধারা পরিবর্তনের। এর মধ্যে রয়েছে গ্যাসের মূল্য ৪ দশমিক ২ ডলার থেকে ৭ ডলার করা, গ্যাসক্ষেত্র থেকে স্থলভাগ পর্যন্ত ২৮০ কিলোমিটার যে পাইপলাইন নির্মাণ করার কথা, সেটা তারা নয়, বাংলাদেশ করবে- এমন সব গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। এসব শর্তে বাংলাদেশ রাজি না হলে কনোকো-ফিলিপসের সঙ্গে সম্পাদিত পিএসসির আলোকে বিদেশে গ্যাস রপ্তানির যে সুযোগ রয়েছে তা তারা ব্যবহার করতে পারে বলে জানা গেছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, ২০১১ সালের ১৬ জুন গভীর সাগরের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে কনোকো-ফিলিপসের সঙ্গে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস ৪ দশমিক ২ ডলারে কেনার চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। যদি পেট্রোবাংলা এই দামে কিনতে অস্বীকার করে তখন দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস বিক্রি করার চেষ্টা করবে কনোকো-ফিলিপস। যদি দেশের কোনো কম্পানি বা প্রতিষ্ঠান গ্যাস কিনতে আগ্রহ না দেখায়, তখন বিদেশে রপ্তানি করার সুযোগ পাবে তারা।
জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সাগর বক্ষের গ্যাস স্থলভাগে আনতে গেলে হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। যদি পেট্রোবাংলা এ দামে গ্যাস কিনতে রাজি না হয় তাহলে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে তা স্থলভাগে এনে ব্যবহার করার সুযোগ নেই। তখন বিদেশে রপ্তানি করতে পারবে কনোকো-ফিলিপস। আর এ কারণেই সরকারের ওপর তারা কৌশলে চাপ প্রয়োগ করছে। কিন্তু একবার পিএসসি হয়ে গেলে নতুন করে আর চুক্তির কোনো ধারা পরিবর্তন করার ক্ষমতা জ্বালানি মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা বা অন্য কারোর নেই বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।
জানা গেছে, কনোকো-ফিলিপসের একটি প্রতিনিধিদল এসে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সঙ্গে দেখা করে বেশ কয়েকটি দাবি উত্থান করেছে গত মঙ্গলবার। এর মধ্যে রয়েছে- মিয়ানমারের যে পিএসসি রয়েছে সে আলোকে কনোকো-ফিলিপস নতুন করে চুক্তির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারা পরিবর্তন করতে চায়। এর মধ্যে রয়েছে বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের মূল্য ৪ দশমিক ২ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৭ ডলার করা। প্রতিবছর আবার এ থেকে ২ শতাংশ হারে দাম বৃদ্ধির সুযোগ রাখা। গভীর সমুদ্র থেকে এ গ্যাস স্থলভাগে আনতে হলে ২৮০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে বাংলাদেশকেই। এসব সুযোগ দেওয়া হলে ২০১১ সালে করা চুক্তিতে যে ‘বিদেশে গ্যাস রপ্তানির সুযোগ’ রয়েছে, তা প্রত্যাহার করবে কনোকো-ফিলিপস।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিয়ানমারের পিএসসি অনুযায়ী গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ এবং গ্যাস স্থলভাগে আনার খরচ বাংলাদেশকে বহনের কথা বলেছে তারা। বিষয়গুলো আমরা খতিয়ে দেখছি।’
কনোকো-ফিলিপসের দাবি মানতে গেলে বাংলাদেশ অনেক বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে কি না জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘এখন থেকে ৯ বছর পর ওই দুই ব্লক থেকে গ্যাস পাওয়া যাবে। এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম অনেক বেড়ে যাবে। তখন সাত ডলারেও গ্যাস কিনলে সমস্যা হবে না।’ আর কনোকো-ফিলিপসের কাছ থেকে যে পরিমাণ ভ্যাট-ট্যাক্স পাওয়া যাবে তাতে গ্যাসের দাম গড়ে পাঁচ ডলারের বেশি হবে না বলেও তিনি দাবি করেন। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা ১৪ থেকে ১৬ ডলারে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস বিদেশ থেকে কিনছি, যা এলএনজি নামে পরিচিত।’ এ দামের চেয়ে নিশ্চয় পাঁচ ডলার কমই হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এলএনজি টার্মিনাল চুক্তি সই যেকোনো দিন : তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল নির্মাণে মার্কিন কম্পানি ইউএস অ্যাস্ট্রা অয়েল অ্যান্ড এক্সিলারেট এনার্জির টার্মশিট পর্যালোচনা শেষ হয়েছে। চলতি মাসের যেকোনো দিন এ চুক্তি হতে পারে। এরপর সেটি আইন মন্ত্রণালয়ে যাবে ভেটিংয়ের জন্য; অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত করলে আগামী ডিসেম্বরে চূড়ান্ত চুক্তি হতে পারে বলে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানিয়েছেন।
তবে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, চুক্তিটি আজ বৃহস্পতিবারই হতে পারে।
জানা যায়, মার্কিন কম্পানিটি টার্মশিটে এমন কিছু বিষয় নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা দরপত্রে ছিল না। কম্পানিটি তাদের টার্মশিটে বলেছে, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের অবকাঠামো ব্যয় যদি ১৩০ মিলিয়ন ডলারের ১০ শতাংশ কম বা ১০ শতাংশ বেশি হয় তাহলে প্রতি ইউনিটের গ্যাসে রূপান্তর ব্যয় ৩৯ সেন্টই থাকবে। তবে অবকাঠামো ব্যয় এ হারের চেয়ে বৃদ্ধি পেলে আনুপাতিক হারে ইউনিটপ্রতি গ্যাসে রূপান্তর খরচ বাড়িয়ে দিতে হবে। কম্পানিটি দুই মিলিয়ন ডলার পারফরম্যান্স গ্যারান্টি (পিজি) দেয়ার বিষয়ে সম্মত হলেও নতুন শর্ত হিসেবে তারা দাবি করছে, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশকেও এই প্রকল্পে পিজি জমা রাখতে হবে। এ ছাড়া সম্ভাব্যতা জরিপের ব্যয় পেট্রোবাংলাকেই বহনের কথা বলছে তারা। জানা গেছে, এসব শর্তেই রাজি হতে যাচ্ছে সরকার।
এলএনজির প্রতি ইউনিট আমদানিতে খরচ পড়বে ১৪ থেকে ১৬ ডলার। আর রিগ্যাসিফিকেশনের জন্য মার্কিন কম্পানির আগের দেওয়া দর অনুয়ায়ী ৩৯ সেন্ট খরচ হওয়ার কথা। কিন্তু এখন কম্পানিটি দাবি করছে, এ খরচ প্রতি ইউনিটে পড়বে ৪৪ সেন্ট। তবে এটা ৪০ সেন্ট হতে পারে বলে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন।
জানা গেছে, চলতি বছরের মধ্যে টার্মিনাল নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া গেলে ১৮ মাসের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হবে। এলএনজিকে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর বা রিগ্যাসিফিকেশন করে সরাসরি গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। শর্ত অনুযায়ী এভাবে ১৫ বছর ধরে মার্কিন কম্পানিকে রিগ্যাসিফিকেশনের জন্য অর্থ প্রদান করতে হবে।