kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

মা দিবস

মাকে মাথায় রাখেন বীরেন

শিরিনা আফরোজ, পিরোজপুর    

১১ মে, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মাকে মাথায় রাখেন বীরেন

প্রায় সাত মাইল পথ হেঁটে সাঁকো পেরিয়ে মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন বীরেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ নমস্তসৈঃ নমস্তসৈঃ নমস্তসৈঃ’ (হে দেবী তুমি মায়ের রূপ ধারণ করে আমাকে রক্ষা করো, আমাকে রক্ষা করো, আমাকে রক্ষা করো)। বীরেনের দিন শুরু হয় এই মন্ত্রে, দিন শেষও এই বুলিতেই। ধর্মকর্ম, ধ্যান-জ্ঞানের এ মন্ত্র তিনি নিবেদন করেন তাঁর মাকে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা। প্রায় ৫০ বছর এভাবেই চলে আসছে। বীরেনের ‘মা, মাগো, কী লাগবে তোমার’?- এ কথাটা যেন তাঁর বাড়ির আশপাশে ধ্বনিত হতে থাকে সারাক্ষণ।
‘ও মা, তোমার কি কষ্ট অয়? কষ্ট অইলে ডালাটা শক্ত কইরা ধরো।’ প্রায় শতবর্ষী মাকে বাঁশের ডালায় তুলে মাথায় করে নিয়ে যেতে যেতে প্রশ্ন করছিলেন বীরেন। প্রায় সাত মাইল পথ হেঁটে ডাক্তারের কাছে পৌঁছানোর সময় থেমে থেমে এ কথাগুলোই জিজ্ঞেস করেন বীরেন্দ্রনাথ মজুমদার। মাকে মাথায় করে সাঁকো, ভাঙা রাস্তা মাড়িয়ে যেতে হয় দীর্ঘ পথ। উপায় নেই, সড়কে যে যানবাহন চলে না।
পিরোজপুর জেলার জিয়ানগর উপজেলার পূর্ব চণ্ডিপুর গ্রামের দিনমজুর বীরেন মজুমদারের জীবনের খণ্ডচিত্র এটি। ৫০ পেরিয়ে গেলেও বিয়ে করেননি। মাকে নিয়েই তাঁর সংসার। দিনমজুরি করে যা আয় হয় তা দিয়েই চলেন। বড় ভাই শ্যামলাল মজুমদার বলেন, ‘অনেকেই জিজ্ঞাসা করে বীরেনের কথা। আমরা বলি মায়ের সেবা করে। আমার বাবা মারা গেছেন ১৮ বছর আগে। তখন থেকেই মা অচল। আমারও মা। কিন্তু বীরেনই সব করে। বীরেনের জন্মের সময় মা যা যা করেছিল মাকে বীরেন এখন তাই করছে।’
সরেজমিনে বীরেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় মাকে জিয়ানগর হাসপাতালে নেওয়ার জন্য গোসল করিয়ে খাবার খাইয়ে প্রস্তুত হচ্ছেন বীরেন। মাকে এতটা পথ ডালায় (ঝুড়ি) করে বয়ে নিতে কষ্ট হয় না? এমন প্রশ্নের উত্তরে বীরেন বলেন, মাতৃসেবা আমার বহুদিনের সাধনা। মাকে যখন মাথায় তুলি তখন আমার শরীরে প্রশান্তি অনুভব করি। মাকে আমি আমার খুশি মতো বহন করি। প্রশ্ন করি- মা তুমি কি কষ্ট পাও?’ মা উত্তর দেয়, ‘না বাবা’। মায়ের যত্ন করলে বিয়ে সংসার করতে অসুবিধা কী? এ প্রশ্নের জবাবে বীরেন বলেন, ‘আমি ভাবি বিয়ে করলে মায়ের এমন সেবা কি করতে পারব? চারপাশে যারা আছে তারা তো পারে না। আমার কাছে আমার মা পরম ধর্ম। এই ধর্মের মধ্য দিয়েই স্বর্গের পথে হাঁটতে চাই।’
বড় ভাইয়ের স্ত্রী আরতি রানী বলেন, ‘আমার শাশুড়ির সব কাজ দেবর বীরেন করে। গোসল করানো, কাপড় ধোয়া, খাওয়ানো, ডাক্তার দেখানো, চিরুনি দিয়ে মাথা আঁচড়ানো। দেখলে মনে হয় বাবার কোলে ছোট্ট শিশু। এলাকাবাসী জানায়, ‘মায়ের প্রতি বীরেনের শ্রদ্ধার তুলনা হয় না। কোথাও কাজে গেলে বাড়িতে এসে দেখে যাবে সে। মাকে না খাইয়ে মুখে খাবার তুলেছে বীরেন- এ দৃশ্য কেউ কখনো দেখেনি।’ মায়ের কষ্টের কথা ভেবে কোথাও বেড়াতে যান না তিনি। ভাঙা ঘর বৃষ্টির জলে ভেসে গেলেও মায়ের শরীরে ফোঁটা পড়তে দেন না বীরেন। পলিথিন দিয়ে মোড়ে মায়ের পাশে বসে নির্ঘুম রাত কাটানোর উদাহরণ ভূরি ভূরি।
প্রতিবেশী সুবাস চন্দ্র মণ্ডল (৬০) বলেন, ‘আমাদের আশপাশে এমন দৃষ্টান্ত কোথাও দেখা যায় না। ওর সততা এবং মাতৃভক্তির জন্য ওকে আমরা ব্রাহ্মণের আসনে বসিয়েছি। আমাদের পূজা-পার্বণে ও-ই প্রধান ভূমিকা রাখে। এলাকার স্কুলশিক্ষক উত্তম কুমার বলেন. বায়েজিদ বোস্তামি আর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা বইয়ে পড়েছি। বাস্তবে বীরেনকে দেখে আরেক নতুন অভিজ্ঞতা হলো।’
বীরেনের মা ঊষা রানী আধো আধো কণ্ঠে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বীরেনরে আমি অনেক বলছি, তুই বিয়া কর বাবা। কিন্তু বীরেন শোনে না। আমি চাই বিশ্বের সব ঘরে বীরেনের মতো সন্তান যেন জন্মায়। যে সন্তান মায়েরে কোনো দিন কষ্ট দেয় না। আমার তো ওরে দেওয়ার কিছু নেই। ঠাকুর ওরে দেখবে।’
এ বিষয়ে জিয়ানগরের চিকিৎসক মিজানুর রহমান জানান, ‘প্রায়ই বীরেন্দ্রনাথ মজুমদার তাঁর অসুস্থ মাকে মাথায় করে নিয়ে আসেন আমার কাছে। তিনি বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছেন। বীরেনের মাতৃভক্তি দেখে অবাক হই। আজকাল এমনটা তো দেখাই যায় না।’
মা দিবসের কথা জানেন না বীরেন। বিষয়টি খুলে বললে তিনি এ প্রতিবেদকের কাছে জানতে চান- ‘এই দিনে মানুষ কী করে?’ তাঁর ভাষায়, ‘জানলে আমিও করতাম। মা আরেকটু খুশি হইতো।’

মন্তব্য