kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অক্টোবর ২০১৯। ৩০ আশ্বিন ১৪২৬। ১৫ সফর ১৪৪১       

বিনিয়োগে ১৩ বাধা বিদেশিদের চোখে

আবুল কাশেম    

১৬ এপ্রিল, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



বিনিয়োগে ১৩ বাধা বিদেশিদের চোখে

বিদেশি বিনিয়োগের জন্য বরাবরই হা-হুতাশ করছে বাংলাদেশ। বিপুল আগ্রহ নিয়ে বিনিয়োগ করতে এসে এ দেশের নানা আইনি ও বেআইনি ব্যবস্থার জটিলাবর্তে পড়ে ফিরে যেতে হচ্ছে বিদেশিদের। নিবন্ধনের জন্য বিনিয়োগ বোর্ড থেকে শুরু করে নানা আইনি বাধার পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক বেড়াজালই কেবল নয়, দেশি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও পদে পদে বাধা পেতে হয় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের। তাই সস্তা শ্রম ও ইউরোপসহ উন্নত দেশগুলোতে জিএসপি সুবিধার হাতছানিতে ছুটে আসা বিদেশি ব্যবসায়ীদের বিমুখ হতে সময় লাগে না। বিষয়টি নিয়ে তাঁরা রীতিমতো গবেষণা করেছেন। প্রতিবেদনও তৈরি করেছেন। এই গবেষণা প্রতিবেদন থেকে বিদেশিদের চোখে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ১৩টি বড় বাধার কথা জানা গেছে। তাঁরা এগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে বলেছেন, এসব বাধা দূর না করা হলে বাংলাদেশ থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিতেই থাকবেন।
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের বাধাসংক্রান্ত এই গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অরগানাইজেশন (জেট্রো), কেআরআই ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন, মিৎসুবিশি ইউএফজে রিসার্চ অ্যান্ড কনসালটিং এবং মুড়ি হামাদা অ্যান্ড মাৎসুমুটু। বাংলাদেশে থাকা জাপানি বিনিয়োগকারী এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী বিদেশি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে এ প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে তারা। জাপানের ট্রেড পলিসি ব্যুরোর দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়াবিষয়ক পরিচালক মিকিও এওকি ও জেট্রোর নয়াদিল্লি কার্যালয়ের ডিরেক্টর অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি রিসার্চার ইচিরো অ্যাবে গতকাল মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদের কাছে এ গবেষণা প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। এ সময় বাণিজ্যসচিবকে তাঁরা জানিয়েছেন, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা এবং বিজিএমইএর মৌখিক আপত্তির কারণে পোশাক খাতসহ অন্যান্য অনেক খাতে বিনিয়োগ করতে আসা জাপানি ব্যবসায়ীরা ফিরে গেছেন। বাংলাদেশে গাড়ি প্রস্তুতকারী শিল্প প্রতিষ্ঠার আগ্রহের কথাও জানান তাঁরা।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেবল সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে গিয়েই যে বিপর্যস্ত হচ্ছেন বিনিয়োগে আগ্রহীরা তা নয়, পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর হাতে থাকা সরকারি ক্ষমতার কাছে হার মেনেও ফিরে যেতে হচ্ছে তাঁদের। ১৩টি বড় বাধার মধ্যে দ্বিতীয় বাধা হিসেবেই বিজিএমইএর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা বাধাগুলো হলো- ১. শিল্প ও সেবাখাতে বিদেশি বিনিয়োগের আইন-কানুন ও অবস্থা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকা। ২. ইউডি না দেওয়ার মাধ্যমে বিজিএমইএ দ্বারা পোশাক খাতে বিনিয়োগে পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা আরোপ। ৩. কেন্দ্রীয়ভাবে সংশ্লিষ্ট আইন-কানুন ও বিধি-বিধান ইংরেজিতে রূপান্তর না করা। ৪. বিনিয়োগ বোর্ড শক্তিশালী করে ওয়ান স্টপ সার্ভিস ব্যবস্থা না থাকা। ৫. জমির ধরন ও মালিকানা নির্ণয়ে জটিলতা। ৬. বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদন পেতে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর জটিলতা। ৭. স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে রাজস্ব বোর্ডে ‘বিক্রয় মূল্য’র নিবন্ধন জটিলতা। ৮. চলতি মূলধন জোগাতে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা। ৯. বৈদেশিক মুদ্রায় অ-বাণিজ্যিক রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে বাধা। ১০. বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থায় স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা না থাকা। ১১. বাজার মূল্যের সঙ্গে তুলনা করে শুল্কারোপ করা, যা প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি। ১২. স্থানীয় জনবল নিয়োগের বাধ্যবাধকতা এবং ১৩. পিপিপি আইন কার্যকর না হওয়া। 
দেশের অর্থনীতির অগ্রযাত্রার স্বার্থে সরকারকে বিনিয়োগের বাধা দূর করে, ব্যবসার খরচ কমিয়ে অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করার জোর সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে।
জাপানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত থাকা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, সস্তা শ্রম আর জিএসপি সুবিধার কারণে বাংলাদেশকে বিদেশিরা বিনিয়োগের স্বর্গরাজ্য মনে করে ছুটে আসেন। কিন্তু দেশে আসার পরই তাঁদের বেশির ভাগ হতাশ হয়ে ফিরে যান। জাপানের অনেক বিনিয়োগকারীও বিনিয়োগের ইচ্ছা নিয়ে এসে ফেরত গেছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশিরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হন, এর বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে তাঁরা একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। বিদেশি বিনিয়োগ পেতে হলে দ্রুত সমস্যাগুলো সমাধান করতে বলেছেন তাঁরা।
এক নম্বর বাধা : গত ১০ ফেব্রুয়ারি তৈরি করা প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রথম বাধা হিসেবে বলা হয়েছে, জাতীয় শিল্পনীতি ২০১০ অনুযায়ী, ১৭টি খাতে বিদেশি বিনিয়োগে শর্তারোপ করা আছে, যদিও এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকার নিষ্ক্রিয়। এসব ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট এমন কোনো একটি গাইডলাইন নেই, যা নিয়ন্ত্রিত খাতগুলোতে বিনিয়োগের উপায় সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য দেয়। বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাক্ট বিনিয়োগকারীদের কী পরিমাণ দুর্ভোগ দেয়, এর বিবরণ তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৩৮ সালের এ আইনের পরিবর্তে ২০১০ সালে নতুন আইনের খসড়া করা হয়েছে। তাই ২০১০ সাল থেকেই আগের আইন অকার্যকর রয়েছে। এ জটিলতার কারণে সঠিক পরামর্শ পেতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে গেলেও কোনো সুফল পাওয়া যায় না। এমনকি বাংলাদেশে পাইকারি ও খুচরা শিল্প সম্পর্কেও কোনো ধরনের গাইডলাইন নেই।
প্রতিবেদনে ভারতের উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, দেশটির ডিপার্টমেন্ট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি অ্যান্ড প্রমোশন প্রতিবছর ‘সমন্বিত এফডিআই (সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ) নীতি’ প্রকাশ করে। কখনো ওই নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনার দরকার হলে তা নিয়ে প্রেসনোট প্রকাশ করে। কিন্তু বাংলাদেশে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই।
বিজিএমইএর বাগড়া : বিদেশি বিনিয়োগে বিজিএমইএর বাগড়া সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৈরি পোশাক রপ্তানি ও জিএসপি পেতে হলে ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি) সরবরাহ করার ক্ষমতা সরকারের কাছ থেকে বিজিএমইএকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী ইপিজেডের বাইরে পোশাক কারখানা করতে গেলে বিজিএমইএ সদস্য হওয়া ছাড়া ইউডি দেয় না। আর সদস্য হতে গেলেই ২৫ ধরনের কাগজপত্র চাওয়া হয়, যা সরবরাহ করা বিদেশিদের পক্ষে সম্ভব হয় না। আর সম্ভব হলেও বিজিএমইএ আদতে বিদেশিদের সদস্য পদ দেয় না। বন্ড লাইসেন্সের কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমদানি-রপ্তানি করার জন্য অফিশিয়ালি এ লাইসেন্সও বিজিএমইএ দিয়ে থাকে। বিজিএমইএর এ ধরনের ক্ষমতা ও এর অপব্যবহার বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরনের অশুল্ক বাধা বলে মনে করেন বিনিয়োগে আগ্রহীরা। বিজিএমইএর মৌখিক ওই নিষেধাজ্ঞায় ইউডি ছাড়া বিদেশি মালিকরা পোশাক রপ্তানি করতে পারবেন না, কাঁচামালও আমদানি করতে পারবেন না। দ্রুত এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তা না হলে পোশাক খাত থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেবেন। এ কারণে জাপানেরও অনেক বিনিয়োগ চলে গেছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইউডি সরবরাহ করার ক্ষমতা বিজিএমইএর হাত থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হাতে ফিরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার টাস্কফোর্সের বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জাপান সরকারের প্রস্তাব হলো, সব আইন ও নীতি প্রয়োগের ক্ষমতা বেসরকারি সমিতির হাত থেকে সরকারের হাতে নিয়ে প্রয়োগ করা উচিত।
তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ইউডি না দেওয়ার প্রসঙ্গে কোনো কিছু বলতে চাননি বিজিএমইএ নেতারা। তবে সংগঠনটির সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পোশাক খাতে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের ক্ষেত্রে আমরা বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করি, শুধু কাটা আর সেলাইয়ের কাজ বাংলাদেশিরাই ভালো পারে। এখানে বিদেশি বিনিয়োগের দরকার নেই। বরং উল্টো ঝামেলা তৈরি হয়।’
তিনি টেক্সটাইল মিলের মতো শিল্পে বিনিয়োগ করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘যেখানে অল্প টাকা বিনিয়োগ করলে প্রতিষ্ঠান গড়া যায়, সেখানে বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। এ সুযোগটা দেশিদের জন্য রাখা দরকার। বিদেশি বিনিয়োগ নিতে হলে যেখানে আমাদের দক্ষতা নেই, বেশি পুঁজির প্রয়োজন হয়- এমন ক্ষেত্রেই নেওয়া উচিত।’
আইন-বিধান ইংরেজীকরণের সুপারিশ : বিনিয়োগ ও ব্যবসাসংক্রান্ত বাংলাদেশের সব আইন ও বিধিবিধান বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতেও প্রকাশের সুপারিশ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন আইনের হালনাগাদ ও সংশোধনের তথ্য সম্পর্কে সব কিছু জানেন না। ফলে দেখা যায়, অনেক বিনিয়োগকারী আগ্রহ নিয়ে সময় ও অর্থ খরচ করে কাজ ঘনিয়ে আনছেন, তখনই নতুন কোনো আইন জারি করা হলো। তাই কোনো আইন সংশোধনের আগে সে বিষয়েও ঘোষণা থাকা উচিত বলে মনে করেন বিদেশি ব্যবসায়ীরা। তা না হলে ব্যবসার খরচ অনেক বেড়ে যাবে।
একই ছাদের নিচে আনা : বিনিয়োগ বোর্ডে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেবাকেন্দ্র চালুর পরামর্শ দিয়ে এতে বলা হয়েছে, বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের সময়ই ওয়ার্ক পারমিট, এন্ট্রি ভিসা ইত্যাদি সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য দেওয়া উচিত। এমন একটি ডাটাবেজ থাকতে হবে, যেখানে গিয়ে বিনিয়োগকারীরা সব ধরনের করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাবেন। এ জন্য বিনিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারের সব প্রতিষ্ঠানকে একই ছাদের নিচে নিয়ে আসা দরকার। এখন বিনিয়োগ করতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হয়, যা বিনিয়োগ বোর্ড একাই করতে পারে। কিন্তু দক্ষতার অভাব ও আমলাতন্ত্রের লাল ফিতার দৌরাত্ম্যরে কারণে বিনিয়োগ বোর্ড তা করতে পারছে না। এ ক্ষেত্রে বোর্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়ের অভাবও রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এক অফিস থেকে আরেক অফিসের করণীয় সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেন না। এতে সময়, অর্থ, হয়রানি ও ঘুষ- সবই ব্যয় হয়। এমনকি ব্যবসা শুরুর জন্য ট্রেড লাইসেন্স, আমদানি-রপ্তানি নিবন্ধন সার্টিফিকেট, পরিবেশ ছাড়পত্র, টিআইএন রেজিস্ট্রেশন, ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন, কারখানার নিবন্ধন ও অগ্নি নিরাপত্তা সনদ পেতেও বহু সময় লাগে। এ কারণে কেবল নতুন বিনিয়োগকারীই নন, পুরনো বিনিয়োগকারীরাও সব সময় ধাঁধার মধ্যে থাকেন। তাই বিনিয়োগ আকৃষ্টের জন্য বিনিয়োগ বোর্ডকে আরো সক্রিয় করা জরুরি।
বিক্রয়মূল্য সহজীকরণ : বাংলাদেশের কম্পানি আইনকেও যুগোপযোগী করার পক্ষে মত দিয়েছেন তাঁরা। এ ছাড়া স্থানীয় বাজারে বিক্রির ক্ষেত্রে ভ্যাট দেওয়ার জন্য পণ্যের বিক্রয়মূল্য রেজিস্ট্রেশনও খুব কঠিন কাজ। এর কারণে কোনো কম্পানি সহজেই কোনো কৌশলগত বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না। কিন্তু আশিয়ানভুক্ত দেশ থাইল্যান্ড প্রতি লেনদেনের ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ, ফিলিপাইনে মোট বিক্রয়মূল্যের ওপরে ১২ শতাংশ ও ভিয়েতনামে বিক্রয়মূল্যের ওপরে ১০ শতাংশ হারে ভ্যাট হিসাব করা হয়।
জমির জটিলতা : বাংলাদেশে জমির পরিচয় ও মালিকানা চিহ্নিতকরণ জটিল বলে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবহার উপযোগী জমির স্বল্পতাও বিনিয়োগের পথে বড় বাধা। ঢাকা ও চট্টগ্রামের কাছে ইপিজেডগুলোয় জমি প্রায় নেই। এমনকি কেউ উপযুক্ত জমি খুঁজে পেলেও তার মালিকানা ও অন্যান্য বিষয় নিশ্চিত হওয়া যায় না। উত্তরাধিকার সূত্রে জমি বণ্টন হওয়ায় তার মালিকানায় ভেজাল থাকে। ভূমি রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সব সময়ই জটিল পরিস্থিতিতে পড়েন বিনিয়োগকারীরা। ভূমি অফিসগুলোর সেবাও খুব নিম্নমানের, শ্লথগতির ও প্রায়ই দুর্নীতিতে ভরা। আর ভূমি অফিসগুলোও আইন মেনে চলে না। বাংলাদেশে ৬৩টি সাব-রেজিস্ট্রার অফিস রয়েছে, যার পাঁচটি ঢাকায়। এ ক্ষেত্রে জেলার সীমানা অনুযায়ী কোন অফিসে যেতে হবে, তাও পরিষ্কার নয়। এ অবস্থায় বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে যাঁরা জমি কিনতে চান, তাঁদের ভয়াবহ খারাপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়।
বিদেশি ঋণেও ঝামেলা : কোনো বিনিয়োগকারী কম্পানির চলতি মূলধনের চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে ঋণ নিতে চাইলে সে ক্ষেত্রেও নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। এ ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি বা যৌথ বিনিয়োগকারীদের আগে থেকেই অনুমোদন নিতে হয়। আর অনুমোদনের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে গঠিত নিরাপত্তা কমিটি ও প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে গঠিত আন্তমন্ত্রণালয় কমিটির অনুমোদন নিতে হয়, যা খুবই কঠিন। এ ক্ষেত্রে সুদের হার হওয়া উচিত লন্ডনের আন্তব্যাংক সুদহার (লাইবর) এর সঙ্গে অতিরিক্ত ৪ শতাংশ। আর কোনো জামানত দিতে হলে তা হওয়া উচিত মোট ঋণের ১০ শতাংশ।
পিপিপি কার্যকরের সুপারিশ : সরকার বছরের পর বছর ধরে বাজেট ঘাটতিতে ভুগছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও পানি খাতে বিনিয়োগের চেষ্টা করলেও অর্থায়ন করতে পারছে না সরকার। অন্যদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তলানিতে ঠেকেছে। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের অনেক এলাকাতেই এর সংকট রয়েছে। তা সত্ত্বেও পিপিপি আইন এখনো সক্রিয় করতে পারেনি সরকার। তবে ব্রিটিশ আইনের আদলে তা তৈরির কাজ চলছে। সরকার যেহেতু আরো ইপিজেড এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে আগ্রহী, তাই দ্রুত পিপিপি আইন কার্যকর করার সুপারিশ রয়েছে প্রতিবেদনটিতে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা