kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ১৭ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৭ সফর ১৪৪১       

মশার যন্ত্রণা থেকে রেহাই মিলছে না

মাসুদুল আলম তুষার ও শাখাওয়াত হোসেন   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মশার যন্ত্রণা থেকে রেহাই মিলছে না

কম আলোয় বিশেষ করে সূর্য ডোবার পর রাজধানীর যেকোনো খোলা স্থানে দাঁড়ালেই মাথার ওপর ঝাঁক বেঁধে উড়তে থাকে মশা। সন্ধ্যার পর আরো ভয়ানক রূপ নেয় মশার মিছিল। দিনেও খুব কম থাকে না মশার উৎপাত। ঘরে, বাইরে, কর্মস্থলে সবখানেই মশায় অতিষ্ঠ নগরবাসী। মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য অর্থ ও জনবল আছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনেরই। চলতি বছরেও এ খাতে ৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে তাদের। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বরাদ্দ ২১ কোটি, আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বরাদ্দ ২৩ কোটি টাকা। আগের বছরেও বরাদ্দ ছিল প্রায় সমপরিমাণ। কিন্তু ফল প্রায় শূন্য। নগরবাসীর মুক্তি মিলছে না মশার যন্ত্রণা থেকে। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ মশাবাহিত রোগ নিয়ে। ডেঙ্গু জ্বর, চিকুনগুনিয়াসহ জটিল রোগে প্রাণহানি কমলেও বিস্তার কমছে না।

বেশ কিছু এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকায় এমন কোনো জায়গা নেই যেটিকে মশকমুক্ত এলাকা বলা যায়। বেশির ভাগ এলাকায়ই ডোবা, নালা ও নির্মাণাধীন ভবনের রিজার্ভারে দেখা যায় ঝাঁকে ঝাঁকে মশা উড়তে। বহুতল ভবনগুলোর মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় আর বিভিন্ন স্থানে আবর্জনার স্তূূপে মশার বংশ বৃদ্ধির চিত্র স্পষ্ট। সংশ্লিষ্ট সব এলাকার বাসিন্দারা জানায়, সিটি করপোরেশনের মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ও উদ্যোগের কথা বিভিন্ন সময় শোনা গেলেও বাস্তবে কর্মীদের দেখা মেলে না। অনেক স্থানেই দেখা গেছে মশার অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে বহুতল ভবনের তিন-চারতলা পর্যন্ত ফ্ল্যাটে জানালা ও বারান্দায় নেট লাগানো।

মগবাজার নয়াটোলার বাসিন্দা সাদিয়া আফরিন বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের লোকজন কয়েক দিন আগে মশা মারার ওষুধ দিয়ে গেছে গলিতে। তার দুই দিন পর থেকে দিনেও মশারি টানিয়ে রাখতে হচ্ছে বাসায়। বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীসহ কয়েকজন চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। তাই বাচ্চাদের নিয়ে ভয়ে থাকতে হচ্ছে।’

মধুবাগের বাসিন্দা ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বদ্ধ জলাশয়সহ মশা জন্মানোর আদর্শ অনেক জায়গা রয়েছে এলাকায়। সেগুলোর দিকে নজর দিচ্ছে না সিটি করপোরেশন। মশক নিধন অভিযান কবে কোথায় তারা করে সেটি বোঝা দায়।’

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জুলফিকার আলী বলেন, ‘ঋণের সুদের মতো মশার বিস্তার ঘটছে চক্রবৃদ্ধি হারে। সে ক্ষেত্রে অল্পস্বল্প ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এখন কর্মস্থল থেকে শুরু করে চলন্ত গাড়িতেও মশার কামড় বাড়ছে। আর বাসাবাড়িতে তো অস্থির অবস্থা। মশারি, কয়েল কিংবা ইলেকট্রিক ব্যাট দিয়েও মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।’

আদাবরের বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, ‘রাতের কথা কী বলব, দিনেও মশার যন্ত্রণায় থাকা যায় না। স্প্রে করার পরও ঘরে দুদণ্ড বসা যায় না। কয়েল জ্বালালে তার ওপরে দেখা যায় মশা বসে আছে। একেবারে অসহায় অবস্থা।’

প্রকোপ বাড়ার কথা স্বীকার করলেন কাউন্সিলর : মশার প্রকোপ বাড়ার কথা স্বীকার করেছেন ডিএনসিসির একজন কাউন্সিলরও। ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং ডিএনসিসির মশক নিয়ন্ত্রণ পর্যবেক্ষণ কমিটির সদস্য ডা. জিন্নাত আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মশার প্রকোপ বেড়েছে ব্যাপকভাবে। ওষুধের ঘাটতি এখন আর নেই। তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের খাল প্রবাহমান রাখতে ব্যর্থ হলে মশার প্রকোপ কমবে না।’ খাল ও লেকের পানি প্রবাহমান রাখতে এরই মধ্যে তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান। ডা. জিন্নাত আলী বলেন, মশক নিয়ন্ত্রণকাজও চলমান রয়েছে।

ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকন অবশ্য দাবি করেছেন, তাঁর এলাকায় মশার কোনো প্রকোপ নেই। গত বৃহস্পতিবার তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মশক নিধন কার্যক্রম গুরুত্বের সঙ্গে করা হয়। এ এলাকায় মশার প্রকোপ নেই।’

ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি সূত্রে জানা যায়, ডিএসসিসিতে মশার ওষুধ ছিটানোর ৯৪০টি মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে আছে হস্তচালিত স্প্রেয়ার, ফগার ও হুইল ব্যারো মেশিন। কিন্তু অর্ধেক মেশিনই প্রায় অচল। অন্যদিকে ডিএনসিসিতে মশা নিধনের মেশিন আছে ৬৫৩টি। সেখানেও নষ্ট প্রায় অর্ধেক। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতিদিন মশার ওষুধ ছিটানোর জন্য পাঁচ-ছয়জন করে কর্মী নিযুক্ত আছে। তাদের দিনে দুবার ওষুধ ছিটানোর কথা। নগরবাসী ওই কর্মীদের দেখতে পায় কালেভদ্রে।

ওষুধ সরবরাহকারী এক প্রতিষ্ঠান কালো তালিকায় : সিটি করপোরেশন কর্মকর্তাদের দাবি, বাসাবাড়ির আঙিনা, ফুলের টব, ছাদের বাগান, ভবনের চৌবাচ্চা, এসি-ফ্রিজ থেকে জমা পানিতে মশার বংশ বিস্তার ঘটছে বেশি। ওই সব স্থানে মশক কর্মীরা যেতে পারে না। কর্মীরা নিয়মিত ও সঠিকভাবে মশক নিয়ন্ত্রণের কাজ করছে। নগরবাসী সচেতন হলে এ কাজ অনেক সহজ হবে বলে কর্মকর্তারা মনে করে। ডিএনসিসিকে ওষুধ সরবরাহকারী একটি প্রতিষ্ঠানের ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষায় সন্তোষজনক না হওয়ায় ওই প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এখন চীনের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে মানসম্মত ওষুধ আনা হচ্ছে।

ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাকির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অ্যাগ্রো লিমিট নামে একটি প্রতিষ্ঠান মশার ওষুধ দিত ডিএনসিসিকে। কিন্তু ফিল্ড টেস্টে প্রতিষ্ঠানটির ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট হতে পারিনি। তাই এই প্রতিষ্ঠানটিকে ব্ল্যাকলিস্টেড করা হয়েছে। তবে আমাদের কাছে যে ওষুধ রয়েছে তা দিয়ে মশক নিয়ন্ত্রণকাজ পরিচালনা ভালোভাবেই করা হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘চীন থেকে আমরা চার লাখ লিটার ওষুধ আনছি। দুই ধাপে দুই লাখ লিটার করে আসবে এসব ওষুধ। তবে মশক নিয়ন্ত্রণকাজ অব্যাহত রাখতে জরুরি ভিত্তিতে ১৮ হাজার লিটার ওষুধ আনা হয়েছে।’

হটলাইনে সাড়া মেলে, স্বস্তি মেলে না : ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা জানান, মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় জনসাধারণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছাতে একটি হটলাইন চালু করেছেন তাঁরা। ওই নম্বরে ফোন করলেই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মশককর্মী পৌঁছে যাবে সংশ্লিষ্ট এলাকায়। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা প্রধানত জলাশয় ও অলিগলিতে ওষুধ দিয়ে থাকি। কাউন্সিলররা সুপারভাইজরের দায়িত্বে আছেন। তাঁদের কাছে ওষুধ পাঠানো হয়। প্রতিদিন এক হাজার ৮০০ লিটার মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় মশার উৎপাত কিছুটা বেড়েছে, বৃষ্টি হলে কমে আসবে।’

তবে কয়েকটি এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হটলাইনে ফোন করে সাড়া মিললেও ওষুধ ছিটানোর পর স্বস্তির স্থায়িত্ব হয় খুব কম সময়।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা