kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

উ প ন্যা স

বাল্যকাল

ইমদাদুল হক মিলন

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮৩ মিনিটে



বাল্যকাল

অঙ্কন : ধ্রুব এষ

খানবাড়ি থেকে বেরিয়ে দক্ষিণে চলে গেছে সড়ক। কিছুদূর এগোলে পুব দিক থেকে সরু আরেক হালট এসে মিশেছে। চলে গেছে গোরস্তানের দিকে, বিলের বাড়ির দিকে। বর্ষাকালে তখন কী যে বৃষ্টি হতো! দিনরাত শুধু বৃষ্টি, শুধু বৃষ্টি।

বিজ্ঞাপন

টিনের চালায় ঝমঝম শব্দ। আমি আর দাদা হয়তো আছি বুজির কাছে। বৃষ্টিতে কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে আছে সকালবেলাটা। রোদ ওঠেই না। ও রকম সকালে দুআনা পয়সা দিয়েছেন বুজি। ‘যাও মিয়া ভাই, ভেসাল থেইকা সাচরা মাছ লইয়া আসো। ’

বাগানে কোষানাও বান্ধা। আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ি। আট বছর বয়স। দাদা পড়ে ক্লাস ফাইভে। সে কোষানাওয়ের বাঁধন খুলল। ও রকম ঝুমবৃষ্টি ছাতায় মানে না। ছাতা একটা আমাদের আছে, তা-ও ছেঁড়া। হাফপ্যান্ট পরা খালি গা দুই ভাইয়ের। দাদা বইঠা চাব দিয়ে কোষানাও বেয়ে যায়। বৃষ্টিভেজা দুটি বালক যাচ্ছে দুআনার সাচরা মাছ কিনতে। বড়জন পাছার চারোটে বসে নৌকা বায়। ছোটজন ডুলা আঁকড়ে জবুথবু হয়ে বসে আছে নৌকার চটির পাটাতনে। মেঘ ডাকে না। খাড়াঝিলিকও (বিদ্যুচ্চমক) নেই। আকাশে নৌকার মতো ভাসে মেঘ। খানবাড়ি থেকে বেরোনো সড়কের যেখানটায় পুব দিক থেকে এসে হালট মিলেছে, গোরস্তান আর বিলের বাড়ির দিকে যাওয়ার মুখে ভেসাল পেতে বসে আছে আধবুড়ো নন্দ জেলে। আমাদের কোষানাও তার নাওয়ের কাছে যেতেই বৃষ্টিভেজা মানুষটি চোখ তুলে তাকাল। মাছরাঙার ভঙ্গিতে বসে ছিল ভেসালের পায়ের কাছে। সরু ভাঙাচোরা নৌকার ডরা ভর্তি মাছ খলবল খলবল করছে। আরেকটু বেলা হলেই মাছ নিয়ে নন্দ যাবে মাওয়ার বাজারে। নন্দর নৌকার ছই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে নরম হয়ে, পচে প্রায় খুলে পড়েছে। গত সন্ধ্যা থেকে আজ সকাল পর্যন্ত মাছ ধরেই যাচ্ছে নন্দ। সীতারামপুরের দিকে বাড়ি তার। কোন বাড়ি, জানি না।

দাদা বলল, দুই আনার মাছ দেন।

নন্দ জেলে কথা বলে না। পায়ের চাপ দিয়ে ভেসাল তোলে। তোলার আগেই পানির তলা থেকে ভেসালে আটকা পড়া মাছের ছটফটানি টের পাওয়া যায়। নন্দ গম্ভীর গলায় বলল, ‘এই খেওয়ে (ক্ষেপ) যত মাছ ওডে, বেবাক তগো দিয়া দিমু দুই আনায়। ’

সত্যি সত্যি তা-ই করল সে। গুঁড়াগাড়ি মাছকে আমরা বলি সাচরা মাছ। সেই সাচরা মাছই বেশ ভালো পরিমাণ উঠল এক খেওয়ে। ছোট ছোট টাটকিনি ফেউস্যা মাছ, ঘাওরা মাছের বাচ্চা, পুঁটি টেংরা বাইল্যা টাকি, দু-চারটা কই শিং শিলং মাছের বাচ্চা, বাতাসি পাবদা—এই রকম এক খেওয়ের মাছে ডুলা প্রায় ভরে গেল। দুআনা পয়সা কোঁচড়ে রাখতে রাখতে নন্দ বলল, ‘তগো ভাগ্যি ভালো রে। দুই আনায় মাছ পাইলি চাইর আনার। ’

বিলের দিকটা তখন বৃষ্টিতে ঘন কুয়াশার মতো আচ্ছন্ন। জলে ভাসা ধানক্ষেত বর্ষার পানিতে বুক ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গোরস্তানের বাঁশঝাড়টা আবছা দেখা যায়, কলাগাছ আর অন্য ঝোপঝাড়গুলো দেখা যায় না। বিলের বাড়ির শিমুলগাছটা একটুখানি দেখা যায়। গোরস্তান থেকে এক-দেড় কানি পশ্চিমেই সেই বাড়ি। আমার অনেক লেখায় এসেছে বিলের বাড়ির কথা, শিমুলগাছটির কথা। এই বিলের দৃশ্যপট মাথায় রেখে ধান-পাট চাষি বেলদারদের নিয়ে লিখেছিলাম ‘ভূমিপুত্র’। জোতদার-ব্যাপারীরা ছিল বাস্তব আর কল্পনার মিশেল দেওয়া চরিত্র।

সেই ছেলেবেলায় বড়শিতে একবার এমন একটা শিং মাছ ধরলাম, মাছটার পেটের নিচ থেকে লেজ পর্যন্ত জায়গাটা নেই। অর্থাৎ আধখানা মাছ। কিন্তু জীবন্ত। বড়শির আধার খেয়ে ধরা পড়েছে। বড়শিটা আমি ফেলেছিলাম নানা আর টগর মামার কবরের পশ্চিম দিককার ঝোপঝাড়ের ফাঁকে। বর্ষার পানি তখন নামতে শুরু করেছে। ও রকম আধখানা শিং মাছ দেখে আমি তো অবাকই, বুজি আর পুনু আম্মাও অবাক। বুজি বলল, এই মাছ খাওয়া যাবে না। এই মাছের শরীর ভরা বিষ। সাপে ছোবল দিয়ে অর্ধেকটা খেয়ে ফেলেছে। বিষভর্তি শরীর নিয়েও বেঁচে আছে শিং মাছটা। শিং মাছের নিজের কাঁটায়ও বিষ আছে। কাঁটা দিলে বিষকাঁটালি দিয়ে সেই বিষ নামাতে হয়। শিং মাছের কাঁটা দেওয়াকে আমরা বলি কাতা দেওয়া। শিং মাছে কাতা দিছে।

গোরস্তানের পুব দিকে একটা জংলা পুকুর। এখানটায় জমি ছিল। মাটি কেটে ভিটি (ভিত) বেঁধে গোরস্তান তৈরি করা হয়েছিল। মাটি কাটা জায়গা হয়ে গেছে পুকুর। গোরস্তানের পুব দিককার ভাঙন থেকে টোসখোলা ছিটকি কাশ—এসব ঝোপঝাড় এসে পুকুরের ওদিকটা একেবারেই জংলা করে ফেলেছে। পুকুরের পানি দেখাই যায় না। বড় বড় ঠাসবুনট কচুরি। কিছু জলজ ঘাসও আছে। একটা ঘাসের নাম দল। গরুরা খুবই স্বাদ করে খায়। এই পুকুরটায় সহজে কেউ মাছ ধরতে নামত না। শোনা যায়, পুকুরে অনেক রকমের মাছ আছে। সবই বিলের মাছ। কই শিং শোল গজার বাইং (বাইন) বোয়াল চিতল রুই কাতলাও আছে।

একবার শীতকালে গ্রামের যুবক পোলাপান ঝাঁকিজাল আর পলো নিয়ে গেল সেই পুকুরে। কচুরি সাফ করে মাছ ধরবে। সকালবেলা শুরু হলো সাফ করার কাজ। দুপুরের মুখে মুখে শুরু হলো মাছ ধরা। ভালোই মাছ ধরা পড়ল। অনেকে জাল পলো ছাড়াই হাতিয়ে হাতিয়ে মাছ ধরছে। হাজামবাড়ির রব হাফিজদ্দি ধরছে। আমাদের বাড়ির জাহাঙ্গীর আলমগীর ধরছে, মিন্টু ধরছে। আমার বড় ভাইও ছিল তাদের দলে। আমি পারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাছ ধরা দেখছি। কে যেন বলল, ‘মিলু, তুইও নাম। ’

নামলাম। অন্ধের মতো হাতাচ্ছি মাছ ধরার জন্য। একসময় কী একটা লাগল হাতে। মাছ ভেবে দুহাতে আঁকড়ে ধরে তুলেছি। কিন্তু জিনিসটার নড়াচড়া নেই। মাছ হলে তো ধরা পড়ার পর ছটফট করবে! ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করবে। তাহলে কী ধরেছি আমি! তুলে দেখি বিঘত পরিমাণ মোটা একটা হাড়। বোকার মতো ওটা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। হাজামবাড়ির মজিদ দেখে বলল, ‘হায় হায়, এইডা তর হাতে কিরে, মিলু? এইডা তো মরা মাইনসের হাড্ডি। ’

আমি ছটফট করে পারে লাফিয়ে উঠলাম। কোথায় ছুড়ে ফেললাম সেই হাড় কে জানে। খুব ভয় পেলাম। জ্বর আসার মতো অবস্থা। খাইগোবাড়ির (খানবাড়ি) মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছ থেকে পানিপড়া এনে খাওয়ানো হলো। গোরস্তানের পুকুর থেকে বড় বড় কয়েকটা কই ধরেছিল দাদা। বুক পেট গাঢ় হলুদ রঙের বিশাল কই। সেই মাছ আমাকে খেতেই দেওয়া হলো না।

জীবনে যতবার ওই গোরস্তানের দিকে তাকিয়েছি ততবারই এই ঘটনা মনে পড়েছে। এখনো মনে পড়লে গা কাঁটা দেয়।

আমাদের গ্রাম এলাকায় তখন প্রচুর শিয়াল ছিল। সন্ধ্যা হলেই গোরস্তানের দিক থেকে, বিলের বাড়ির দিক থেকে, ঠাকুরবাড়ির দিক থেকে, পুব দিকে কামারবাড়ির দিক থেকে হক্কাহুয়া রবে মুখর হতো দেশগ্রাম। গিরস্তবাড়ির হাঁস মুরগি দিনের বেলায়ও ধরে নিয়ে যেত শিয়ালে। এক জ্যোত্স্না রাতে হিসু করতে উঠেছি। কেবিনের দক্ষিণ দিককার জানালা খুলে শিকের ফাঁক দিয়ে কাজ সারতে গিয়ে দেখি বাগানের মাঝখানকার উঠানের মতো সাদা জায়গাটায় পাঁচ সাতটা শিয়াল হুটোপুটি করছে। কুকুরের দল একসঙ্গে হয়ে যেমন করে কখনো কখনো, একদম সে রকম। শিয়ালেরা খেলাধুলা করছে। আমি প্রথমে বুঝতে  পারিনি যে এগুলো শিয়াল। রাতের বেলা ও রকম কাজ সারার সময় হলে বুজিকে ডাকতাম। বুজিও সেই রাতে উঠে বসেছেন। কাজ সেরে আমি শুতে গেলে জানালা বন্ধ করবেন। তাঁকে বললাম, ‘ও বুজি, বাগানে এত কুত্তা আইল কই থিকা?’ বুজি একপলক দেখে বললেন, ‘ওইডি কুত্তা না মিয়াভাই, শিয়াল। ’

সেই রাতের আগে এত শিয়াল একসঙ্গে কোনো দিন দেখিনি। গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই একটা দুটো কুকুর থাকে। আমাদের বাড়িতেও হামেদ মামাদের দুটো কুকুর ছিল। বেশ মোটাতাজা তেল-চকচকে। শিয়াল-কুকুরে চিরকালের শত্রুতা। শিয়াল দেখলেই তেড়ে যায় কুকুর। কুকুরের ভয়ে গিরস্তবাড়িতে হানা দিতে পারে না শিয়াল। আজ রাতে দেখি আমাদের বাগানে পাঁচ সাতটা একসঙ্গে খেলা করছে। বাড়ির কুকুর দুটো কোথায়? বুজি বললেন, ‘এত শিয়াল দেইখা কুত্তা দুইটা ডরাইছে। ডরে রাও শব্দ করে না। খেউক্কায় (ঘেউ দেওয়া) না। ’

এলাকার শিয়ালগুলো বোধ হয় তখন খুব খাবারের কষ্টে ভুগত। গ্রামের গরু ছাগল মারা গেলে সেগুলো বিলের দিকে নিয়ে ফেলা হতো। শকুন শিয়ালে খাওয়ার একটা সুযোগ পেত। মানুষজন মারা গেলে রাতের অন্ধকারে কবর খুঁড়ে শিয়ালের দল অনেক সময় সেই লাশ তুলে খেত। কবরস্থান থেকে টেনে নামিয়ে বিলের দিকে নিয়ে আসত। বিলের বাড়ির পুকুরে হাতিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে যে হাড়টা আমি পেয়েছিলাম, ওটা নিশ্চয় শিয়ালেরা কবর থেকে যে লাশ তুলে খেয়েছিল, সে রকম কোনো লাশের হাড়। বর্ষার মুখে মুখে বৃষ্টি আর পদ্মা থেকে খাল উপচে মাঠঘাট ভেসে যাওয়ার সময় পানির চাপে পুকুরে গিয়ে পড়েছিল। বোধ হয় এ রকম মানুষের হাড় আর খুলি অনেকই ছিল পুকুরটায়, যে কারণে ওই পুকুরে সহজে মাছ ধরা হতো না।

বিলের বাড়িটা ছাড়াবাড়ি হয়ে যাওয়ার পর ঝোপ-জঙ্গলে ভরে গিয়েছিল। বিলে যাদের জমি ছিল, জমির মালিক ও কৃষকরা ধান পাট চাষ তো করতই, একটা সময়ে এই বিলে বাঙ্গি তরমুজের চাষও হতো। ফাল্গুন চৈত্র মাসে বিলে বড় বড় তরমুজ ফলে থাকত। বাঙ্গি থাকত। তখন বিলের কোনো কোনো জমিতে বাইল্লা (বেলে) মাটি ছিল। ও রকম মাটিতে বাঙ্গি তরমুজের ফলন ভালো হয়। একদিকে ধান পাট তিল কাউন বড় হচ্ছে, অন্যদিকে বাঙ্গি তরমুজ। আমার মায়ের এক ফুফাতো বোনের ছেলে দুলাল। দুলাল আর আমি একবার দুপুরের দিকে বিলে তরমুজ চুরি করতে গিয়েছিলাম। পাটক্ষেতের ভেতর দিয়ে চুপি চুপি গিয়ে তরমুজক্ষেতে নেমেছি। দুলাল তরমুজে টোকা দিয়ে দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল কোনটা পাকা, কোনটা পাকা না। আমি অত কিছু বুঝি না, দুলালের সঙ্গে আছি আর কি! মাঝারি সাইজের পাকা একটা তরমুজ আবিষ্কার করল দুলাল। আবিষ্কারের ফলে এতই মুগ্ধ সে, কোনো দিকে আর তাকিয়ে দেখছে না। তরমুজ ছিঁড়ে বুকের কাছে মাত্র ধরেছে, কয়েক কানি দূর থেকে কাঁচি (কাস্তে) হাতে খালি গায়ের লম্বা চওড়া একজন মানুষ পাটক্ষেত থেকে হৈহৈ করে বেরিয়ে এলো। তরমুজক্ষেতটা তার। বোধ হয় কান্দিপাড়ার লোক। পাটক্ষেতের আড়ালে বসে তরমুজক্ষেত পাহারা দিচ্ছিল। সে বেরিয়ে আসতেই আমি ভয়ে দৌড় দিলাম। দুলাল একমুহূর্ত কী ভাবল। লোকটার দিকে তাকাল, কিন্তু তরমুজ ছাড়ল না। বুকের কাছে দুহাতে তরমুজ ধরা। বোধ হয় জীবনের শ্রেষ্ঠ দৌড়টা সে দিল। লোকটা আমাদের ধরতে পারল না। ছেউল্লার বাড়ির পশ্চিম পাশ লাগোয়া একটা পাটক্ষেতে পলাইয়া (পালিয়ে) রইলাম। সেই লোক এদিক ওদিক আমাদের খুঁজল। না পেয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে ফিরে গেল। আমরা দুজন ছেউল্লার বাড়ির আমগাছতলায় বসে সেই তরমুজ ভেঙে ভেঙে খেলাম। দুলালের গায়ে বেশ শক্তি। আমগাছের গোড়ার সঙ্গে আছাড় দিয়ে তরমুজটা ভেঙেছিল। ভিতরটা লাল টকটকে, কী যে মিষ্টি আর রসালো তরমুজ!

দুই.

মনে পড়ল আমার বিড়ালটির কথা। ভারি আদুরে ধরনের তুলতুলে সাদা বিড়াল। ধীর পায়ে হেঁটে এদিক ওদিক যেত। কোনো জ্বালাতনই করত না। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যেত বাগানের দিকে। কাজ সেরে সামনের দুই থাবা দিয়ে ধুলোমাটি টেনে ঢেকে দিত। খেতে বসলে আমার পাশে এসে বসত। মাছের কাঁটাকুটা খেতে দিতাম। মাখা ভাতও দিতাম। টেংরা মাছটা আমি খেতে পারতাম না। আমার পাতে বুজি সেই মাছ দিলে একটা দুটো মাছ বিড়ালটাকে দিতাম। কুটকুট করে খেত। আমরা ঘুমাতাম কেবিনে। কারে ওঠার সিঁড়িটার কাছে টিমটিম করে সারা রাত জ্বলত হারিকেন। সিঁড়ির ছায়া পড়েছে কেবিনের একটা অংশে। গরমকালে বিড়ালটা গুটিসুটি হয়ে শুয়ে থাকত সেখানটায়। কত রাতে ঘুম ভেঙে তাকে দেখেছি। কোনো কোনো রাতে কেবিনে ঢুকে আমরা হয়তো দরজায় খিল লাগিয়ে দিয়েছি। বিড়াল রয়ে গেছে বাইরে। কেবিনের সিঁড়িতে উঠে দরজার কাছে বসে সে মিউমিউ করত। অর্থাৎ দরজা খোলো, আমি বাইরে রয়ে গেছি। বুজি জানেন বিড়ালের জন্য আমার খুব মায়া। তিনি দরজা খুলে দিতেন অথবা পারুকে বলতেন দরজা খুলতে। পারু বিরক্ত হয়ে দরজা খুলত। তার বোধ হয় সূক্ষ্ম একটা রাগ ছিল বিড়ালটার ওপর। কী কারণে কে জানে! ভোররাতের দিকে বিড়ালটা আমার বুকের কাছে এসে শুয়ে থাকত। শীতকালে ঢুকে যেত লেপের তলায়। বেশ একটা ওম তার শরীরে। কখনো কখনো আমার একটা হাত গিয়ে পড়ত তার ওপর। সে একটুও বিরক্ত হতো না। মৃদু ঘ্যারঘ্যার একটা শব্দ হতো তার শ্বাস-প্রশ্বাসের। নাকি নাক ডাকত বিড়ালটা!

আমার এই আদুরে বিড়ালটাকে হত্যা করল পারু। তার আগে প্রায়ই বিড়াল নিয়ে সে বুজির কাছে অভিযোগ করত। বিড়াল এই খেয়ে ফেলেছে, ওই খেয়ে ফেলেছে। আমার সামনে বলত না, বলত আড়ালে। শেষ পর্যন্ত বুজির সঙ্গে পারু বোধ হয় একটা মতলব এঁটেছিল। বিড়ালটাকে দূর কোনো গ্রামে ফেলে দিয়ে আসবে। হাজামবাড়ির মজিদ যাচ্ছিল মাওয়ার বাজারে। আমি গেছি স্কুলে। ছালার বস্তায় বিড়ালটা ভরা হলো। মজিদ খুবই আমুদে ধরনের লোক। বিড়াল ভরা ছালা চাদরের মতো কাঁধে ফেলে গান গাইতে গাইতে হাঁটা দিল। মাওয়ার বাজারের দিকে বিড়ালটাকে সে ছালা থেকে বের করে ছেড়ে দিয়ে এলো। স্কুল থেকে ফিরে আমি আর বিড়াল খুঁজে পাই না। বুজিকে জিজ্ঞেস করি, পারুকে জিজ্ঞেস করি। কেউ কিছুই বলে না। ব্যাপারটা বুঝতেই পারি না। কোথায় চলে গেল বিড়াল? মন খারাপ করে এদিক ওদিক বিড়াল খুঁজি। পুরানবাড়ির মাঠে সেদিন আর গেলামই না। শেষ বিকেলে দেখি আমিনুল মামাদের বাড়ির নামার দিক থেকে মিউমিউ করতে করতে আসছে বিড়াল। আমি আর খুশিতে বাঁচি না। পারুর দেখি মুখ কালো। বুজির মুখে মিটিমিটি হাসি। সন্ধ্যাবেলা বিড়াল কোলে নিয়ে বসে আছি। তখন ঘটনাটা বললেন বুজি। ‘এই বিলাইটার তোমার লেইগা খুব মায়া, মিয়াভাই। মজিদ বহুত দূরে নিয়া ফালাই দিয়া আইছিল। ওইখান থিকা ফিরত আইছে। এই বিলাই তোমারে ছাইড়া যাইব না। ’

মাওয়া তখন মেদিনীমণ্ডল থেকে দেড় দুই মাইল দূরে। পদ্মার ভাঙনে সেই মাওয়া বিলীন হয়ে গেছে। এখন দূরত্ব খুবই কম। ওই অতটা দূর থেকে ফেরত এসেছিল আমার বিড়াল। সেই বিড়ালটা পারু হত্যা করল।

সন্ধ্যাবেলায় সেদিন চাঁদ উঠেছে আকাশে। বুজি আমার জন্য দুধ জ্বাল দিয়ে রেখেছেন রান্নাঘরে। বেশ পুরো হালকা হলুদ রঙের সর পড়েছে দুধে। এই সর খেতে আমি খুব পছন্দ করি। রাতে দুধভাত খেতে পছন্দ করি। হঠাৎ পারু এসে বুজিকে বলল, দুধ খেতে গিয়ে কড়াই উল্টিয়ে ফেলেছে বিড়ালে। দুধ যতটা না খেয়েছে, তার চেয়ে ফেলে দিয়েছে বেশি। শুনে বিড়ালটাকে না, বুজি বকাঝকা শুরু করলেন পারুকে। কারণ সন্ধ্যার আগে আগেই পারু সব সময় দুধের কড়াই বড়ঘরে নিয়ে আসে। সেদিন আনেনি। কিশোরী মেয়ে। হয়তো বাড়ির ভানু খালার সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিল বা এদিক ওদিক কোথাও ঘুরতে গিয়েছিল। বুজির বকা খেয়ে ভিতরে ভিতরে খুব রাগল। বিড়ালটাকে খুঁজতে লাগল। দুধ খানিকটা খেয়েছিল বিড়াল। পেট বোধ হয় ভালো রকমই ভরেছিল তার। সন্ধ্যা হয়ে আসছে দেখে বড়ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিল। থাবা দিয়ে সেই বিড়াল ধরল পারু। জ্যোত্স্নায় ভেসে যাওয়া বাগানে নিয়ে শরীরের সর্বশক্তি একত্র করে দিল এক আছাড়।

বিড়াল খুব শক্ত ধরনের প্রাণী। সহজে কাবু হয় না, মরে না। আশ্চর্য ব্যাপার, এই বিড়ালটা সঙ্গে সঙ্গে মরে গেল। আছাড়ের ফলে পেট থেকে অনেকখানি দুধ বেরিয়ে গেছে। মুখ থেকে রক্ত বেরিয়েছে কিছুটা। দুধ রক্তে মাখামাখি হয়ে পড়ে আছে বাগানের মাটিতে। আছাড়ের সময় ম্যাও করে বড় রকমের একটা আর্তনাদ করেছিল। সেই শব্দে আমি আর বুজি ছুটে গেছি বাগানে। গিয়ে দেখি বিড়াল কাত হয়ে পড়ে আছে। পারু তার সামনে বসে ভয়ার্ত মুখে বিড়ালের মাথায় হাত বোলাচ্ছে। বিড়াল যে মরে গেছে সে বুঝতে পারেনি। বাগানে পড়ে থাকা বিড়াল দাঁড় করানোর চেষ্টা করছিল। মরা বিড়াল দাঁড়ায় কেমন করে! দৃশ্যটা দেখেই বুজি বুঝে গেলেন তার মিলুর আদরের বিড়াল শেষ হয়ে গেছে। পারুকে তিনি ‘পারি’ বলে ডাকতেন। দিশাহারা গলায় একবার শুধু বললেন, ‘হায় হায় পারি, করছস কী? বিলাইডা তো মইরা গেছে। ’

শোনার সঙ্গে সঙ্গে মৃত বিড়াল বুকে জড়িয়ে আমি কাঁদতে লাগলাম। বুজি বেদম বকাঝকা শুরু করলেন পারুকে। বাড়ির লোকজনও অনেকে বাগানে চলে এসেছে। প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে পারুকে বকাঝকা করছে। পারু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। বিড়াল মেরে ফেলেছে সেই দুঃখে সে কাঁদছে না, সে কাঁদছে বকা খেয়ে।

তখন শোনা গেল আরেক কথা। বুজিই বললেন। বিড়াল মেরে ফেললে সেই বিড়ালের সঙ্গে সোয়া সের লবণ দিয়ে দূরের ঝোপ-জঙ্গলে ফেলে আসতে হয়। রাত হয়ে গেছে। এখন সোয়া সের লবণ কোথায় পাওয়া যাবে? কে যেন বলল,

লবণ অল্প একটু হলেও হয়। এক-দু মুঠ লবণ বিড়ালের গায়ে মাখিয়ে দূরে নিয়ে ফেলে দিয়ে আসলেই হবে।

বড়ঘর থেকে লবণ রাখার চীনামাটির পাত্রটা নিয়ে আসা হলো। দুমুঠ লবণ নিয়ে বিড়ালের ওপর ছড়িয়ে দিলেন বুজি। ছানাদা সেন্টুদা গেলেন বিড়াল ফেলতে। কান্নায় ভেসে যাওয়া চোখে আমি দেখছি আমার অনেক দিনের সঙ্গী বিড়ালটির লেজ ধরে দোলাতে দোলাতে ফকফকে জ্যোত্স্না ভেঙে ছানাদা সেন্টুদা মিয়াবাড়ির ওপর দিয়ে গুহর বাড়ির দিকে যাচ্ছে। গুহদের ছাড়াবাড়ি ভর্তি গভীর জঙ্গল। সেই জঙ্গলবাড়ির কোথায় যে ফেলে দিয়ে এলো আমার প্রিয় বিড়ালটি! বাগানে পড়ে রইল তার পেট থেকে বেরোনো দুধের রেখা, মুখ থেকে বেরোনো রক্ত। তার সঙ্গে মিশে আছে কিছু বড় বড় রোয়ার লবণ।

এই বিড়ালের শোক কাটাতে বহুদিন সময় লেগেছে আমার। ফাল্গুন চৈত্র মাসের কোনো কোনো শেষ বিকেলে বাগানে পায়চারি করতে করতে হঠাৎই আমি যেন বিড়ালটির মিউ ডাক শুনতে পেতাম। হঠাৎই মনে হতো, দূরে মাওয়ার ওই দিকে ফেলে দিয়ে আসা হয়েছে আমার বিড়াল। এই বুঝি সে ফিরে এলো!

 

তিন.

আমি একটু বড় হয়ে ওঠার পর পারুরা গ্রাম ছেড়ে গেল। পারুর বাবা তার পরিবার নিয়ে রংপুর না দিনাজপুর কোথায় যেন চলে গেল। অন্যের বাড়ির আশ্রিত মানুষ। এক আশ্রয় ছেড়ে বহুদূরের কোনো আশ্রয়ে চলে গেল। এই জীবনে পারুর সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি। তবে সেই বালক বয়সেই আমার বিড়াল মেরে ফেলার ফলে পারুর হাতের কোনো খাবার আমি খেতাম না। বুজি আমার রেকাবি আর কাচের গ্লাস আলাদা করে দিয়েছিলেন। ওই রেকাবিতে শুধু আমিই ভাত খাব। ওই গ্লাসে শুধু আমিই পানি খাব। পারু ওই রেকাবি গ্লাস ধরলে নতুন করে ধুয়ে আমি ভাত পানি খেতাম। তীব্র এক ঘৃণা জন্মে গিয়েছিল পারুর ওপর।

ছেউল্লার বাড়িটা আসলে কার বাড়ি আমি তা জানতামই না। ছেউল্লা কার নাম জানতাম না। বাড়িটা ছিল ছাড়াবাড়ি। পুরান বাড়ির মাঠের উত্তর পাশে। বাড়ি ভর্তি আমগাছ। মাঝখানটা ফাঁকা। আমরা সেই ফাঁকা জায়গায় গুলি খেলতাম। পুব পাশে একটা পুকুর। পশ্চিম পাশে বাড়ির গা ঘেঁষে খানবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসা হালট। তারপর বিল। পুব পাশের পুকুরটা ছিল বাইল্লা মাটির পুকুর। পানির তলায় কাদা ছিল না। আমরা ওই পুকুরে গোসল করে খুব মজা পেতাম। বালি মাটির পুকুরের পানি স্বচ্ছ হয়। দল বেঁধে ঝাপাঝাপি করলেও সহজে ঘোলা হতো না।

এই বাড়িতে একবার এক পাগলিনী এসে উপস্থিত হলো। কোত্থেকে এলো কে জানে! এক সকালে গ্রামের লোকজন তাকে আবিষ্কার করল। একটু মোটা ধাঁচের শরীর। যুবতি বয়স। পাগলির গায়ে সুতোটি পর্যন্ত নেই। খরালিকাল। অনেকের সঙ্গে পুরান বাড়ির মাঠে গিয়ে পাগলিনীকে আমিও একপলক দেখে এলাম। নগ্ন নারীমূর্তিটি দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির মাঝখানে। দু-তিন দিন বোধ হয় ওই ছাড়াবাড়িতে সে ছিল। তারপর যেমন করে এসেছিল, তেমন করেই উধাও হয়ে গেল। তবে তারপর কয়েক দিন গ্রামের যুবকদের মধ্যে ওই পাগলিনীকে নিয়ে এক ধরনের রসালো কথাবার্তা আর হাসাহাসি হতো। সেসবের মর্ম আমি বুঝিনি।

শিয়ালের মতো অনেক বাগডাশাও ছিল গ্রামে। আমাদের বাড়ির দক্ষিণ দিকটায়, পায়খানাঘরের পুব পাশে কিছু ঝোপ-জঙ্গল আর একটা বইন্নাগাছ। এসবের দক্ষিণে ভাঙনের দিক ভরা কাশ টোসখোলা আর ছিটকির ঝোপ নিবিড় হয়ে আছে। তারপর মিয়াবাড়ির ঝোপ-জঙ্গল, গাছপালা। কতগুলো ঝাপড়ানো হিজলগাছ আছে ওখানটায়। বর্ষাকালে কানিবক এসে বাসা বাঁধে, বাচ্চা ফোটায়। আমার ধারণা ছিল, কানিবকের বাসা আর ছানাদের কথা মিয়াবাড়ির কেউ জানে না। কোষানাও নিয়ে এক নির্জন দুপুরে গিয়েছি কানিবকের ছানা ধরে আনতে। আমার সঙ্গে হাজামবাড়ির রব। ছানাদের পাহারা দিচ্ছিল দুটি কানিবক। আমাদের দেখেই ডানা ঝাপটিয়ে এমন ডাকাডাকি শুরু করল, মিয়াবাড়ির লোকজন টের পেয়ে গেল। তারাও কানিবকের ছানাদের লোভে আছে। উড়তে শেখার আগে ধরে নিয়ে জবাই করে খাবে। একদিকে কানিবকদের চিৎকার, অন্যদিকে মিয়াবাড়ির লোকজনের। আমি আর রব ভয়ে পালিয়ে এলাম।

আমগাছে ভর্তি ছিল মিয়াদের ছাড়াবাড়িটা। একটা গাবগাছ ছিল। গাবগুলো পেকে হলুদ হয়ে থাকত। মোমের মা জাঁদরেল মহিলা। তাঁর দাপটে ওই বাড়ির দিকে কেউ পা বাড়াতে পারত না। গাছের সব আম পাকলে তাঁর বাড়ির চউরা কাজের লোকটিকে দিয়ে, হাজামবাড়ির লোকজন নিয়ে এক দিনে সব গাছের আম পাড়িয়ে ফেলতেন। সে এক উৎসবের মতো ব্যাপার। আমরা বিভিন্ন বাড়ির ছোট পোলাপান দল বেঁধে সেই আম পাড়া দেখতে যেতাম। তিনি ছিলেন খুবই কৃপণ মানুষ। একটা আমও কাউকে দিতেন না। তিনি যতটা জাঁদরেল, তাঁর স্বামী আদিলউদ্দিন মিয়া বা আদিলউদ্দিন চৌধুরী ততটাই শান্ত নিরীহ ধরনের মানুষ। বাড়িতে দোনলা বন্দুক ছিল। আমিনুল মামাদের বাড়ির পুব দিককার নামায়, নাড়ার পালার সামনে একবার চৈত্র মাসের তীব্র গরমে বিশাল একটা খৈয়া জাতসাপ বেরল। গরমের হাত থেকে বাঁচতে হাত সাতেক লম্বা আর কাছির মতো মোটা সাপটা নাড়ার পালার ছায়ায় শরীর মেলে পড়ে রইল। সাপ দেখে আমিনুল মামাদের বাড়ির মানুষ, হাজামবাড়ির মানুষ সবাই অস্থির। আদিলউদ্দিন মিয়া সেই প্রথম দোনলা বন্দুক বের করলেন। নিপুণ হাতে গুলি করে সাপ মারলেন।

 

চার.

একদিন বিকেলের দিকে পিয়ার খাঁ নানার বাড়ির ওদিক থেকে ফিরছি। আমার তখন সাত আট বছর বয়স হবে। মোতালেব মামা আছেন সঙ্গে। গ্রামের নাম কুমারভোগ। পিয়ার খাঁ নানার বাড়িটা আমার মায়ের নানাবাড়ি। সম্ভবত বুজির চাচাতো ভাই হতেন পিয়ার খাঁ। ওই বাড়িতে বুজির কিছু অংশ ছিল। বাড়ি ভর্তি নানা রকমের গাছপালা। আমগাছ আর ঝোপ-জঙ্গল অনেক। দুটো জীর্ণ ধরনের টিনের ঘর। পিয়ার খাঁ নানার ছেলেদের নাম আমজাদ, খোকা। আমরা তাঁদের মামা ডাকতাম। খুবই আদর করতেন আমাদের। আম পাকার দিনে হাজামবাড়ির রব হাফিজদ্দিদের নিয়ে, মজিদদা ছানাদা সেন্টুদাকে নিয়ে বুজি তাঁর ভাগের আম পেড়ে আনতে যেতেন। পিয়ার খাঁ নানা অতি সজ্জন মানুষ। নানিও নরম নিরীহ ধরনের। বাড়িতে গেলেই গুড়-মুড়ি খাওয়াতেন। দক্ষিণমুখী বাড়িতে ঢোকার মুখে আম জাম কদম আর তেঁতুলগাছ ছিল। সামনে ছোট একটা পুকুর। পুকুরের অর্ধেকজুড়ে কচুরি আর বাকি অর্ধেক পরিষ্কার। পানিটা এত স্বচ্ছ, ভালো করে তাকালে তলার দু-একটা মাছও চোখে পড়ে।

বেশ মাছ পড়ত পুকুরটায়। ‘মাছ পড়া’ ব্যাপারটা হচ্ছে, বর্ষায় এই অঞ্চল একদম ডুবে যায়। পুকুরগুলো ভেসে যায় বর্ষার পানিতে। বাড়িগুলো হয়ে ওঠে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। আশ্বিন মাসের শুরুতে পানি নামতে লাগলে গৃহস্থলোক গাছের ঝাপড়ানো ডালপালা কেটে পুকুরে ফেলে রাখে। সেই ডালপালা হচ্ছে মাছের আশ্রয়। ফলে তখনকার দিনের পুকুরগুলোতে প্রচুর মাছ পড়ত। শোল গজার বোয়াল চিতল নলা সরপুুঁটি শিং মাগুর কই ফলি টাকি পাবদা ট্যাংরা পুুঁটি বেলে ভেদা—বহু রকমের মাছ। রুই কাতল মৃগেলও পড়ত। রুই আর নলার মাঝামাঝি সাইজের মাছটার নাম গরমা। গরমাও পড়ত অনেক। কালিবাউস পড়ত।

পিয়ার খাঁ নানার পুকুরে শীত-গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ে একদিন মাছ ধরা হতো। বুজিও সেই মাছের ভাগ পেতেন। তখনকার দিনের মানুষের মধ্যে এত লোভ-লালসা বা কাউকে ঠকানোর প্রবণতা ছিল না। যেদিন মাছ ধরা হবে, তার আগের দিন বিকেলবেলা খোকা মামারা বুজিকে এসে জানিয়ে যেতেন। পরদিন ডুলা নিয়ে আমি আর আজাদ, সঙ্গে হয়তো হাজামবাড়ির শফি হাফিজদ্দি রবদের নিয়ে যেতাম। মাছ নিয়ে আসতাম।

জেলে ডেকে মাছ ধরা হতো। পুকুর ফাঁকা করে সব মাছ তুলে ফেলত জেলেরা। বাড়ির উঠানে রাখা হতো মাছ। প্রথমে দুই ভাগ হতো সেই মাছ। এক ভাগ নিয়ে যেত জেলেরা। আরেক ভাগ আবার হতো দুই ভাগ। এক ভাগ পিয়ার খাঁ নানার, এক ভাগ আমার বুজির। বুজির ভাগের মাছ চার-পাঁচ ডুলায় আটত না। বড় মাছগুলো আমরা ছালার বস্তায় ভরে মাথায় করে আনতাম।

কুমারভোগের ওই দিকটায় পিয়ার খাঁ নানার বাড়ির দক্ষিণে আরেকটা বাড়ি। বাড়িটা পুবে-পশ্চিমে লম্বা। গাছপালা ঘরদুয়ারে জমজমাট বাড়ি। অনেক মানুষের বাস। ওই বাড়িটাও ছিল বুজির আরেক চাচার। তাঁর ছেলেমেয়েরা থাকতেন। তাঁদের কথা আমার পুরোপুরি মনে নেই। বুজির সঙ্গে মাঝে মাঝে যেতাম সেই বাড়িতে। বড় একটা টিনের ঘরে গিয়ে বসতাম। বাড়ির মাঝামাঝি ঘরটা। মাঝখানে উঠান আর চারদিকে চারটা ঘর। দক্ষিণমুখী বড় ঘরটায় গিয়ে বসতাম আমরা। সেই ঘরে উঁচু পুরনো পালঙ্কের ওপর বয়স্ক অহংকারী ধরনের একজন মানুষ শুয়ে থাকতেন। বুজির কোনো চাচাতো ভাই হয়তো। ভদ্রলোক অসুস্থ ছিলেন। অসুখবিসুখে কাতর। অন্যের সাহায্য ছাড়া বিছানা ছাড়তে পারতেন না। তবে তাঁর গলায় বেশ জোর ছিল। শুয়ে শুয়ে অহংকারী ভঙ্গিতে কথা বলতেন। মানুষকে খুবই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন। বুজি তাঁকে খুব একটা পছন্দ করতেন না। তবু অসুস্থ মানুষটাকে মাঝে মাঝে দেখতে যেতেন। সঙ্গে ছায়ার মতো যেতাম আমি।

পিয়ার খাঁ নানার বাড়ি থেকে পুব-দক্ষিণে হামিদ মামা মোতালেব মামাদের মামাবাড়ি। সেই বাড়িতে খুব সুন্দর একটা দোতলা ঘর ছাড়া আরো তিন-চারটা বড় বড় ঘর। বাড়ি দেখলে মনে হতো তারা বেশ অবস্থাপন্ন। হামিদ মামা মোতালেব মামাদের সঙ্গে সেই বাড়িতেও গেছি অনেকবার। ছোট নানির সঙ্গেও গেছি।

বাড়িতে আটকে থাকতে আমার ভালো লাগত না। বাড়ির কেউ কোথাও যাচ্ছে শুনলেই তার পিছু নিতাম। হামিদ মামা মোতালেব মামাদের মামাবাড়ির ওদিকটা ছাড়িয়ে পদ্মাতীর পর্যন্ত ক্ষেতখোলা মাঠ। বাড়িঘর নেই। পদ্মাতীরে বাঙ্গি তরমুজ ক্ষিরাইয়ের চাষ হতো। কোনো কোনো বিকেলে সেদিকটায় চলে গেছি। পদ্মা তখন সমুদ্রের মতো। এপার-ওপার দেখা যায় না। মাঝনদী দিয়ে বড় বড় পাল তোলা নৌকা পুবে-পশ্চিমে যায়। লঞ্চ যায় দু-একটা। সদরঘাট থেকে ছেড়ে মুন্সীগঞ্জ চাঁদপুর হয়ে লৌহজং মাওয়া ভাগ্যকূল ছুয়ে গোয়ালন্দ। পদ্মাতীরে দাঁড়িয়ে কোনো কোনো বিকেলে নৌকা আর লঞ্চ দেখতাম। একদিন হলুদ আর কালো রঙের মিশেল দেওয়া বিশাল একটা স্টিমার দেখেছিলাম। স্টিমারের সিটি শুনেছিলাম। সমুদ্রের মতো নদী থেকে আসত পাগল করা হাওয়া। ফুরফুর করে উড়ত মাথার চুল। কেমন এক উদাসীনতা যে ছিল সেই হাওয়ায়! মন চলে যেত কোন সুদূরে!

হামিদ মামা মোতালেব মামাদের সেই মামাবাড়ির একটি ঘটনার কথা মনে আছে। ওই বাড়ির একজনের সঙ্গে হামিদ মামার এক খালাতো বোনের বিয়ে হয়েছিল। বোনটি অপূর্ব সুন্দরী। গায়ের রং চাঁদের আলোর মতো। টানা টানা চোখ। মাথায় লম্বা ঘন কালো চুল অমাবস্যা রাতের কথা মনে করিয়ে দেয়। তাকিয়ে থাকার মতো মেয়ে। যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে, সে হামিদ মামার মামাতো ভাই। অর্থাৎ মামাতো-ফুফাতো ভাই-বোনে বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু ফুফাতো ভাইটির সম্ভবত কোনো শারীরিক সমস্যা ছিল। সুন্দরী মেয়েটি কিছুতেই এই স্বামীর ঘর করবে না। তুমুল ঝগড়াঝাঁটি চলছে। ছোট নানি গেছেন হামিদ মামা মোতালেব মামাকে নিয়ে ঝগড়া মেটাতে। আমিও গেছি সঙ্গে। মেয়েটি তুমুল চিৎকার করছে। স্বামী করছে হম্বিতম্বি। একপর্যায়ে মেয়েটিকে তার স্বামী দোতলা ঘরে ঢুকিয়ে দিল। দরজা টেনে বাইরে থেকে শিকল লাগিয়ে দিল, যেন মেয়েটি বেরিয়ে উঠানে নামতে না পারে।

বন্ধ ঘর থেকে মেয়েটি তুমুল চিৎকার আর কান্নাকাটি করতে লাগল। আমি অবাক বিস্ময়ে দেখছি, পরির মতো সুন্দরী একটি মেয়ে কী রকম হিংস্র হয়ে উঠতে পারে। পারলে দরজা-জানালা ভেঙে বেরিয়ে আসে। আর মুখে তুবড়ির মতো ছুটছে গালাগাল। খুবই অশ্লীল ভাষা। এমন কিছু শব্দ স্বামী সম্পর্কে সে ব্যবহার করছে, যা কানে তোলা যাচ্ছিল না। ছোট নানি কানে কম শুনতেন। তিনি বেশ নির্বিকার। হামিদ মামা মোতালেব মামা আমাকে নিয়ে একটু দূরে সরে গেলেন। বাড়ির মুরব্বি নারী-পুরুষ মাথা নিচু করে উঠানে দাঁড়িয়ে আছে কেউ, কেউ বসে আছে। ছেলেপুলেরা নির্বিকার ভঙ্গিতে বাড়ির নামার দিকে ছোটাছুটি করছে। বাইরে দাঁড়ানো মেয়েটির স্বামী, তার পরনে লুঙ্গি ও স্যান্ডোগেঞ্জি। মাথা তেল দিয়ে পরিপাটি করে আঁচড়ানো। উঠানে দাঁড়িয়ে সেও একসময় তার প্রবল পৌরুষ প্রকাশ করার চেষ্টা করল। সেই প্রথম আমি লক্ষ করলাম, শারীরিক ব্যাপারে অক্ষম স্বামীরা স্ত্রীর ব্যাপারে কী রকম অযথা অহংকারে নিমজ্জিত হয়। যেন স্ত্রীকে সুখী করতে তার চেয়ে সমর্থ পুরুষ জগত্সংসারে দ্বিতীয়টি আর নেই।

ওই বয়সে এসব বুঝিনি বা বোঝার কথাও না। বুঝেছি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর। যখন ঘটনাটা নিয়ে ভেবেছি।

শেষ পর্যন্ত মেয়েটি ওই স্বামীর ঘর করেনি। তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে হামিদ মামা তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে বিয়ে দিলেন। সেই ঘটনার অনেক বছর পরের কথা। হামিদ মামা তখন নিউ মার্কেটের এক কাপড়ের দোকানে কাজ করেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করে খুবই হাসিখুশি এবং আনন্দে ডুবে থাকা এক যুবক। লেখাপড়া হয়তো করেছে ক্লাস সেভেন এইট পর্যন্ত, কিন্তু ফুটফাট ইংরেজি বলতে পারত। বেশ স্মার্ট যুবক। তার নামটা আমার মনে নেই। বিক্রমপুরের বিখ্যাত এক গ্রামে তাদের বাড়ি। গ্রামের নাম বজ্রযোগিনী। এই গ্রামে এক হাজার বছর আগে জন্মেছিলেন শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর। সেই মহাজ্ঞানীর বাড়িটিকে সবাই বলত ‘পাগলা পণ্ডিতের ভিটা’।

হামিদ মামা তাঁর সেই বন্ধু কিংবা বোনজামাইয়ের বাড়িতে আমাকে একবার নিয়ে গিয়েছিলেন। দু-তিন দিন সেই বাড়িতে আমরা ছিলাম। হামিদ মামার বোন খুবই আদর আপ্যায়ন করেছিল। মেয়েটির সন্তানাদি হয়নি। আগের চেয়েও সুন্দর হয়েছে দেখতে। শরীর ফেটে পড়ছে যৌবন। মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, তার চেয়ে সুখী নারী এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই।

হায় রে মানুষের জীবন!

বজ্রযোগিনী গ্রামের সেই সুখী গৃহবধূটির দ্বিতীয় সংসারও টেকেনি। তার সন্তানাদি হয়েছিল কি না জানি না, কিন্তু হতদরিদ্র। একেবারে রাস্তার ভিখিরির চেহারায় সেই সুন্দরী মেয়েটিকে পঁচিশ তিরিশ বছর পর একদিন দেখলাম মৌছামান্দ্রা গ্রামে। আমার মিনু খালার শ্বশুরবাড়ি এই গ্রামে। স্বামীর নাম নজরুল ইসলাম খান। ডাকনাম বাদল। এলাকায় তিনি বাদল খাঁ নামে পরিচিত। বড় ব্যবসায়ী। আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন। এলাকার প্রভাবশালী লোক। তাঁর বাড়ির দক্ষিণে বিশাল মাঠ। জাকাতের কাপড় দিতে গেছেন তিনি। তাঁর বড় বোনের মেয়ে আমার স্ত্রী। আমার স্ত্রী আর আমিও গেছি। জাকাতের কাপড়ের আশায় গ্রামের দিনদরিদ্র অসহায় নারীরা সার ধরে বসে আছে। সেই রকম এক সারিতে দেখি হামিদ মামার সেই বোনটিও আছে। আমি তাকে চিনতে  পারলাম, সে আমাকে চেনেনি। তবে তাকে দেখে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল আমার। কোথায় তার সেই আগুনের মতো রূপ? কোথায় সেই তেজিয়াল ভাব? এ যেন শুকিয়ে যাওয়া লাল গোলাপ। জীবনস্রোত মানুষকে যে কোন দিকে টেনে নিয়ে যায়, কেউ তা জানে না!

যে বিকেলের কথা বলছিলাম, সেই বিকেলটা অত্যন্ত মনোরম ছিল। খরালিকাল। চৈত্র মাসের শুরুর দিক। পিয়ার খাঁ নানার বাড়ির লাগোয়া উত্তর-পশ্চিম দিকটায় হাতখানেক লম্বা এক ধরনের ঘাসে ভরা একটা জমি। জমির মাঝখান দিয়ে পায়ে চলা পথ। আমি আর মোতালেব মামা পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছি মেদিনীমণ্ডলের দিকে। হঠাৎ মোতালেব মামা আমার হাত ধরে থমকে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন, ‘মার মার মার। ’

আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। ‘কী হইছে, মামা?’

‘ওই যে দ্যাখ দাঁড়াইশ সাপ। ’

আমি ভয় পেয়ে তাকিয়েছি, কিন্তু সাপটা দেখতে পেলাম না। শুধু ঘাসবনের নড়াচড়া দেখে বুঝলাম সাপটা ছুটে পালাচ্ছে। ভয়ে অনেকক্ষণ বুক ধুকপুক করল।

মোতালেব মামা বললেন, ‘সাপ দেখলে তিনবার মার মার মার বলতে হয়। ’

তারপর সাপ নিয়ে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, সেই ঘটনা মনে পড়লে এখনো পিঠ শিরশির করে। শীতল অদ্ভুত এক অনুভূতি হয় পিঠে। গলা শুকিয়ে আসে।

ঘটনা ঘটেছিল ঠাকুরবাড়িতে।

দুপুরের দিকে আমরা তিনজন গেছি ঠাকুরবাড়িতে। মিন্টু, আলমগীর আর আমি। বৈশাখ গিয়ে জ্যৈষ্ঠ মাস পড়েছে। আম পাকার সময় হয়ে এলো। আমাদের বাড়িতে বৈশাখী আম পাকতে শুরু করেছে। অন্য গাছের আমে পাকন ধরেনি। জ্যৈষ্ঠ মাস শুরু হয়েছে, এখন নিশ্চয় পাকবে। ঠাকুরবাড়ি ভর্তি আমগাছ। সোয়া শ দেড় শ গাছ তো হবেই। অন্য গাছেরও অভাব নেই। লিচু জাম সফেদাগাছ আছে। পেয়ারা বরইগাছ আছে। কলাগাছের ঝোপ আছে। গাবগাছ তেঁতুলগাছ আছে, বাঁশঝাড় আছে অনেকগুলো। বাড়ির পশ্চিমের অংশটাকে আমরা বলতাম ‘চদরিবাড়ি’, অর্থাৎ চৌধুরীবাড়ি। সেই বাড়ির উত্তর কোণে বিশাল এক গাবগাছ আর কয়েকটা বাঁশঝাড়। এমন গা ছমছমে পরিবেশ, একা আমরা কেউ ওদিকটাতে যেতামই না। গাবগাছ বাঁশঝাড় আর তেঁতুলগাছ নিয়ে গ্রামে অনেক কুসংস্কার। ওই সব গাছে ভূত-পেতনি তো থাকবেই। নির্জন দুপুরে কিংবা ম্যাটমেটে জ্যোত্স্না রাতে কেউ কেউ নাকি চদরিবাড়ির গাবতলায় আর বাঁশঝাড়ের ওখানটায় সাদা শাড়ি পরা নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। কেউ কেউ দেখেছে ওই বাড়ির গাবগাছের মাথায় এক পা আর পুরান বাড়ির তোতা মামাদের তালগাছে আরেক পা দিয়ে কে একজন দাঁড়িয়ে আছে, যার মাথা গিয়ে ঠেকেছে আকাশে।

এসব শুনে ভয়ে জড়সড় হয়ে থাকতাম। আমাদের খুব ভূতের ভয় ছিল। আমার তো ছিলই, আজাদেরও ছিল। আমার কখনো কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না, হয়ওনি। তিনটা অভিজ্ঞতার কথা মনে আছে। এক রাতে সে বারান্দার টেবিলে বসে পড়ছে। বারান্দা মানে তো একটা কামরা। হারিকেনের ম্লান আলোয় সে পড়ছে। টিনের বেড়ার বাইরে থেকে কে তাকে ফিসফিস করে ডাকল। ‘আজাদ, ওই আজাদ। ’

শুনে দাদা এত ভয় পেল, পড়া ফেলে দৌড়ে এলো খাটালে। চোখমুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। আমি বসে আছি বুজির সঙ্গে। ভয়ার্ত গলায় সে বুজিকে বলল, ‘বুজি, কে জানি আমার নাম ধইরা ডাকল!’

শুনে আমি ভয়ে জড়সড় হয়ে বুজির কোলের কাছে চলে গেলাম। বুজিও চিন্তিত হলেন। আমাদের বাড়িতেও তো ওই সব জিনিসের আনাগোনা আছে। হাত-পা ধোয়ার জন্য পুরানা একটা বালতিতে এক বালতি পানি রাখা হতো দক্ষিণ দিককার দরজার বাইরে। এক গভীর রাতে বুজি বা আম্মা শুনতে পেলেন, ওই বালতির পানি গরুতে খাচ্ছে। গরুর পানি খাওয়ার শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। তাঁরা বুঝতেই পারলেন না এত রাতে কার গরু গোয়াল থেকে ছুটে এসে আমাদের বালতির পানি খাচ্ছে। অনেকক্ষণ ধরে পানি খেয়ে চলে গেল গরু। সকালবেলা দেখা গেল বালতির পানি এক ফোঁটাও কমেনি। যতটুকু ছিল ততটুকুই আছে। তাহলে গরুর পানি খাওয়ার শব্দটা এলো কোত্থেকে?

সেই রাতে দাদাকে ডাকার রহস্যটা কিছুক্ষণ পরই ভেঙে গেল। বারান্দার দিককার দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে সেন্টুদা বেশ জোরে জোরে দাদাকে ডাকলেন। ‘আজাদ, দরজা খোল। ’

সেন্টুদার গলা পরিষ্কার চিনি। প্রায়ই ছানাদা সেন্টুদা বা মিন্টু আমাদের ঘরে এসে থাকে। ওদের ঘরে এত ভাইবোনের জায়গা হয় না। আর আমাদের তো স্টিমারের মতো বিশাল ঘর। থাকার লোকই নেই।

হারিকেন হাতে দাদা গিয়ে দরজা খুলে দিল। সেন্টুদা ঢুকে বললেন, ‘কতক্ষণ আগে তরে না আমি ডাক দিলাম, আজাদ? তুই দিহি দরজা খুললি না?’

দাদার ভয় পাওয়ার রহস্য সঙ্গে সঙ্গে শেষ।

তবে তার অন্য দুটো অভিজ্ঞতা মারাত্মক। গোয়ালিমান্দ্রার হাট থেকে দুপুরবেলা দাদা ফিরছে। ওই হাট বসে মঙ্গলবার। করিম ডাক্তারদের বাড়ির ওখান থেকে অর্থাৎ কাজির পাগলা বাজার ছাড়িয়ে অনেকখানি পশ্চিমে এসে সড়কটা চলে গেছে তালুকদারবাড়ি পর্যন্ত। ওই রাস্তা দিয়েও মেদিনীমণ্ডলে ফেরা যায়। আবার করিম ডাক্তারদের বাড়ির দক্ষিণ দিক দিয়ে যে পায়ে চলা পথ চলে গেছে সোজা পদ্মাতীরের দিকে, মানে কুমারভোগ গ্রামের দিকে, ওই রাস্তার কিছুদূর এসে ধানি মাঠের ওপর দিয়ে আরেকটা পথ চলে গেছে মেদিনীমণ্ডলের দিকে। সেই পথে কিছুদূর এগোলে নির্জন কলাগাছে ভর্তি একটা ছাড়াবাড়ির পাশে, ধানি মাঠের ধারে বিশাল এক শিরীষগাছ। দাদা বড় একটা গজার মাছ কিনেছে হাট থেকে। সে বোধ হয় তখন ক্লাস ফোরে বা ফাইভে পড়ে। এক হাতে চিকন সুতলি দিয়ে আংটার মতো করে ঝোলানো গজার মাছ, অন্য হাতে হাট সদাইয়ের চটের ব্যাগ। দুপুর হয়ে গেছে। ধানি মাঠের দিকে খাঁ খাঁ নির্জনতা। ওই গাছটার তলা দিয়ে আসার সময় গাছের ওপর থেকে নাকিস্বরে কে বলতে লাগল, ‘মাঁছঁটাঁ দিঁয়াঁ যাঁ। ওঁইঁ ছ্যাঁমঁড়া, মাঁছঁটাঁ দিঁয়াঁ যাঁ। ’

কাউকে দেখা যাচ্ছে না, অথচ কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। দাদা প্রচণ্ড ভয় পেল। এক দৌড়ে চলে এলো আমিন মুন্সির বাড়ির কাছে। বয়স্ক এক গৃহস্থ কাজ করছিল তার ক্ষেতে। সেই লোক দাদাকে এসে জড়িয়ে ধরল। ‘কী হইছে, বাজান? এমনে দৌড় পারতাছ কেন?’

দাদা হাঁপাতে হাঁপাতে ঘটনা বলল। ভয়ে ঠিকমতো কথা বলতে পারছিল না। গলা শুকিয়ে খরালিকালের মাঠ হয়ে গেছে। সেই গৃহস্থ যা বোঝার বুঝলেন। দোয়া পড়ে দাদার মাথায় ফুঁ দিয়ে দিলেন।

বাড়িতে আসার পর সব শুনে বুজি খুব দিশাহারা হলেন। ভয় পাওয়া শিশু-কিশোরদের লবণপানি খাওয়াতে হয়। দোয়া পড়ে মাথায় ফুঁ দিতে হয়। সবই বুজি করলেন। তার পরও দাদার ভয় কমে না। রাতে জ্বর এলো। সেন্টুদাকে পাঠিয়ে খাইগোবাড়ির মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছ থেকে পড়া পানি এনে খাওয়ানো হলো। জ্বর আর এলো না দাদার।

পরের ঘটনা। আমিনুল মামাদের বাড়ির পুব দিককার নামায়, মিয়াদের ছাড়াবাড়ির সীমানায় গলাগলি করে দাঁড়িয়ে আছে দুটো হিজলগাছ। একটার ফুল হতো গোলাপি, আরেকটার সাদা। হিজলগাছ দুটোর তলা দিয়ে আমিনুল মামাদের বাড়ির দক্ষিণ দিককার ছোট পুকুর থেকে পানি বেরিয়ে যাওয়ার একটা নালা আছে। জষ্টি মাসের শেষ দিকে যখন শুরু হয় প্রবল বৃষ্টি, তখন বর্ষার আগমন ঘটে। মাওয়ার ওদিককার জেলেপাড়া ঘেঁষে যে খাল ঢুকেছে গ্রামের দিকে, পদ্মার পানি উপচে সেই খাল দিয়ে বিপুল স্রোতে ঢুকতে থাকে গ্রামে। একদিকে অবিরাম বৃষ্টি, অন্যদিকে খাল বেয়ে আসা পদ্মার পানি, পুকুর ডোবা উপচে পানি উঠে যায় ক্ষেতখোলা মাঠে। ছোট ছোট বহু মাছের তখন প্রজননকাল। আর তখন মাছও ছিল! খাল বিল পুকুর ভর্তি মাছ। ওই সময়টাকে আমরা বলতাম ‘জোয়াইরা দিন’, অর্থাৎ জোয়ারের দিন। পানিটা ‘জোয়াইরা পানি’। ওই সময়কার মাছ হলো ‘জোয়াইরা মাছ’। এই মাছের সঙ্গে কত কুসংস্কার! সিঁদুরপরা অতিকায় বোয়াল মাছ ম্যাটমেটে জ্যোত্স্না কিংবা অন্ধকার জোয়ারের রাতে মাছের নেশায় মত্ত হয়ে থাকা মানুষকে বিল-বাঁওড়ে নিয়ে ডুবিয়ে মারে। সিঁদুরপরা বোয়াল কিংবা গজার মাছ আসলে মাছ না। শকসো। ভূত।

মানুষের জীবনের বাঁকে বাঁকে কত ছোটবড় ঘটনা, কত দুঃখ-বেদনা, কত সুখের স্মৃতি, কত অভিমান আর বুকচাপা কষ্ট! কত কথা লেখা হয়, কত কথা লেখাই হয় না, বলাই হয় না। আমৃত্যু বহন করে চলে মানুষ। এই চলার নাম জীবন। মানুষের আসলে তিনটি জীবন। এ কথা বলেছেন গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, জনসমক্ষে প্রকাশ্য জীবন, পারিবারিক জীবন আর গোপন জীবন। গোপন জীবনে লুকিয়ে থাকে প্রকাশ্য জীবনের চেয়ে শতগুণ বেশি কিছু। মানুষটি নিজে ছাড়া কেউ তা জানে না। সেই জীবনের হদিস পায় না অন্য কেউ। এই তিন জীবনের পথে মানুষ হাঁটে। সঙ্গে হাঁটে তার ফেলে আসা দিনরাত্রি। কত বর্ষা বসন্ত, কত নিঝুম বৃষ্টির রাত, কত রৌদ্র-ঝলমল দিন! শীতের কুয়াশা-জড়ানো সকালবেলাটি, নির্জন দুপুরের উদাসীনতা। বিকেলবেলায় কমলা রঙের রোদ ছড়িয়ে মাঠের ওপারে অস্ত যায় সূর্য। গভীর গভীরতর অন্ধকার রাতে আকাশে জেগে থাকে কোটি নক্ষত্র। চাঁদের আলো শিউলি ফুলের মতো ফুটে থাকে ভুবনময়। হাওয়া বয় প্রেমিকার স্পর্শের মতো। এই মনোরম প্রকৃতিই নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে।

মিয়াদের ছাড়াবাড়ির সেই জোড়া হিজলগাছতলায় নালার মুখে জাল পেতে মাছ ধরত আমিনুল মামা ছানাদা সেন্টুদা আর আজাদ। অনেক সময় রাত দশটা এগারোটা পর্যন্তও ধরত। একটু বেশি রাতে জোয়ারের মাছ বেশি নামতে থাকে। এক রাতে ওই চারজন মাছ ধরছে। ভেসালের মতো ছোট্ট জালটি পাঁচ মিনিট পর পর তুলছে। প্রচুর মাছ ধরা পড়ছে। গুঁড়াগাড়ি মাছই বেশি। পুঁটি ট্যাংরা পাবদা টাকি কই শিং ফলি নলা সরপুঁটি সঙ্গে দু-একটা ছোট বোয়াল বা শোল গজার। ডুলা ভরতে সময় লাগছে না। একদিকে তুমুল বৃষ্টি, অন্যদিকে গভীর অন্ধকার রাত। সঙ্গে হারিকেন আছে। গা দিয়ে কেউ না কেউ বৃষ্টি থেকে হারিকেন বাঁচানোর চেষ্টা করছে। এ সময় প্রবল একটা দমকা হাওয়া এলো মিয়াদের ছাড়াবাড়ির ভিতর থেকে। বাড়িটা উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। ওরা মাছ ধরছে উত্তর দিকে বসে। হাওয়ার সঙ্গে দক্ষিণ দিক থেকে যেন বিশাল এক অশরীরী কেউ হা হা হা হা শব্দ করতে করতে ছুটে এলো। মুহূর্তে হারিকেন নিভে গেল। সেই হা হা শব্দ যেন নালার ওপারে এসে দাঁড়াল। চারজন ভয়ে মাছ জাল হারিকেন সব ফেলে চিৎকার করতে করতে আমিনুল মামাদের বাড়িতে এসে উঠল। তারপর আর রাতে ওখানটায় কেউ জোয়ারের মাছ ধরতে যেত না। মাছ ধরার বেজায় নেশা ছিল দাদার। কিন্তু বুজি তাকে আর রাতের বেলা বেরোতে দিতেন না।

 

পাঁচ.

তখন দেশগ্রামে বিস্তর সাপ ছিল। কত রকমের যে সাপ! দুই রকমের জাতসাপ। কালজাত, খৈয়াজাত। দাঁড়াশ সাপ, ঢোরাসাপ, মেটেসাপ। অনেক রকম ঢোরাসাপ ছিল। কালো রঙের ঢোরার নাম কালঢোরা। ঢোরা আর মেটে নিরীহ সাপ। পানিতে কচুরিপানার তলায় থাকে। মাছ খায়। ব্যাঙ খায়।

মানুষের বাড়িঘরে থাকত শঙ্খিনী নামে এক ধরনের সাপ। কালোর ওপর হলুদ ডোরাকাটা। শুনেছি এই সাপের নাকি দুটো মুখ। দুই মুখ একত্র করে কাউকে কামড় দিলে তার আর রক্ষা নেই। সাপটি আসলে বাস্তুসাপ। জীবনে একবার এই সাপ দেখেছিলাম। হাওলাদারবাড়ির দক্ষিণের অংশে দুই ভাগ। পুব দিককার ভাগ সেরুদাদের। অর্থাৎ আমার বড় খালার। মায়ের সেবান।

পশ্চিম দিককার অংশে উত্তরের ভিটি আর দক্ষিণের ভিটিতে দুটো বড় বড় ঘর ছিল। একটা আলাউদ্দিনদের, আরেকটা সুরুজদের। আলাউদ্দিনের তৃতীয় ভাইটা ছিল শারীরিক প্রতিবন্ধী। দ্বিতীয় ভাইটা ছিল রাজপুত্রের মতো দেখতে। তার নাম ছিল মিলন।

সেই ছোট বয়সের পর সুরুজদের আমি আর দেখিনি। বাড়িঘর বিক্রি করে ওরা বোধ হয় অন্যত্র চলে গিয়েছিল।

দুই ঘরের মাঝখানে সুন্দর উঠান। তার পশ্চিমে একটা ঘর ছিল। ঘর ভেঙে নেওয়ার পর জায়গাটা ফাঁকা। মাটির ভাঙাচোরা ভিটি পড়ে আছে। তার পিছনে একটা পুকুর। ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া পুকুরের দিকটায় আগাছার জঙ্গল গভীর হয়ে আছে। টোসখোলা নামের একটা আগাছা আমরা চিনতাম। টোসখোলা ছিল প্রচুর। আর ছিল ছিটকি ঝোপ। ছিটকি যে একটা আগাছার নাম, সেই ছেলেবেলায় শোনার পর একটি বিখ্যাত উপন্যাসে এই ছিটকি নামের আগাছাটির হদিস পেয়েছিলাম। উপন্যাসের নাম ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণ। উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। এই উপন্যাসের কোনো তুলনা হয় না। ঋত্বিক ঘটক ছবি করেছিলেন। ছবিটিও অতুলনীয়।

আলাউদ্দিনকে আমরা ডাকতাম ‘আলা’। বয়সে বড় বলে আলার সঙ্গে ‘দা’ যুক্ত করেছিলাম।

একদিন দুপুরের মুখে মুখে আমি মিন্টু আলমগীর জাহাঙ্গীর কী কারণে ওই বাড়িতে গেছি মনে নেই। ওই বাড়ির ছেলেরাও সব জুটেছে আমাদের সঙ্গে। আমার খালাতো ভাই তাজুল আমার বয়সী। টকটকে ফরসা সুন্দর ছেলে। আমার সঙ্গে খুব খাতির। ভেঙে নেওয়া ঘরটার ভিটির ওখানটায় দৌড়াদৌড়ি ছোটাছুটি করছি সবাই। মিন্টু নেমে গেছে পুকুরের ঢালে জন্মানো আগাছা বনের দিকে। হঠাৎই ছিটকে সরে এলো। ভয়ার্ত গলায় বলল, ‘জঙ্গলের মইদ্যে বিরাট সাপ। ’

শুনে আমরা ভয় পেয়ে গেলাম। তার পরও উঁকিঝুঁকি মেরে সাপটা দেখার চেষ্টা করলাম। কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে। কালোর ওপর হলুদ ডোরা। মিন্টু বলল, ‘আল্লায়ই জানে কী সাপ?’

ততক্ষণে বাড়ির বড়দের মধ্যে খবর হয়ে গেছে। বাড়ির আরেক শরিকের নাম ভাসান গাছি। তার ছেলের নাম নুরু। তিন-চারটা ঘর তার সীমানায়। আথালে অনেকগুলো গরু। তার বোধ হয় চার-পাঁচটি মেয়ে ছিল। আমার চেয়ে ছোট বয়সী মেয়েটি একটু মোটা ধাঁচের। ভাসান গাছি কী কাজে ওই দিকটায় আসছিল। সাপের কথা শুনে ঝোপের ভিতর উঁকি মেরে দেখল। দেখে বলল, ‘তরা এদিক থেইকা সইরা যা। এই মিহি আর আহিস না। এইটা সানকি সাপ। বাড়িতে সানকি সাপ থাকন ভালো। সাপটারে বিরক্ত করিচ না। ’

কত গিরগিটি আর ইঁদুর ছিল তখন। ব্যাঙ ছিল অনেক রকমের। সন্ধ্যা হলেই কুনোব্যাঙগুলো বাড়ির উঠানে নেমে লাফাত। বর্ষার শুরুতে মাঠে যখন গোড়ালি ডোবার মতো পানি, তখন দেখা যেত অজস্র কোলাব্যাঙ। কোলাব্যাঙেরও বোধ হয় তখন প্রজননকাল। তোকমা দানার মতো কালো কালো ডিম ছাড়ত পানিতে। আর দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা ঘ্যাঙর ঘ্যাং ঘ্যাঙর ঘ্যাং ডেকেই যাচ্ছে। পানিতে থাকা কাছির মতো ঢোরাসাপগুলো থাবা দিয়ে ব্যাঙ ধরত। গিরস্তবাড়ির উঠানেও কুনোব্যাঙ ধরতে আসত ম্যাটমেটে জ্যোত্স্না রাতের আততায়ী জাতসাপ। সাপে ব্যাঙ ধরার পর ব্যাঙের এক ধরনের করুণ আর্তনাদ শোনা যেত। ‘নূরজাহান’ উপন্যাসে মান্নান মাওলানার বাড়ির পুব দিককার অংশে এ রকম একটা সাপ এক রাতে দেখেছিল মুকসেদ চোর।

গুই ছিল অনেক। উদবিড়াল থাকত বড় পুকুরগুলোতে। কত কাছিম, কত কচ্ছপ পুকুরভরা।

একবার বুজির একটা কড়াই পড়ে গেছে ঘাটের কাছে। আমাদের বড় পুকুরে। বুজি আমাকে ডেকে বললেন, ‘মিয়াভাই, পাইনতে নাইমা কড়াইটা ওঠাইয়া দেও। ’

তখনকার দিনে বেশির ভাগ গিরস্তবাড়ির পুকুরঘাটগুলো ছিল পার থেকে পাঁচ ছয় হাত পুকুরের ভিতর পর্যন্ত লম্বা এবং হাত দেড়েক চওড়া কাঠ ফেলে অনেকটা কাঠের পুলের মতো একটা ব্যবস্থা। ও রকম ঘাটে বসে আমরা লোটা বদনায় পানি তুলেও মাঝে মাঝে গোসল করতাম।

বুজি বলার পর লাফ দিয়ে নামলাম পানিতে। কোমর সমান পানিতে নামার পরই পায়ের কাছে কড়াইটা ঠেকল। উপুড় হয়ে দুহাতে টেনে তুললাম। তুলে দেখি কিসের কড়াই! আমি ধরে আছি মাঝারি সাইজের একটা কাছিমের পিছন দিককার দুটো ঠ্যাং। ‘খাইছে আমারে’ বলে কাছিম ছেড়ে লাফিয়ে উঠলাম পুকুরপারে। বুজি এসে আমকে জড়িয়ে ধরলেন। ‘ডরাইছো মিয়াভাই? থাউক, তোমার কড়াই উঠান লাগবো না। আলফু আইসা ওঠাইবো নে। ’

দুই ধরনের গিরগিটির কথা মনে আছে। হালকা লালচে রঙের গিরগিটিটাকে আমরা খুব ভয় পেতাম। পুরনো গাছের কোমর বরাবর স্থির হয়ে থাকত। ঘন ঘন পেট ওঠানামা করছে। ওই গিরগিটিটাকে বলতাম রক্তচোষা। দূর থেকে নাকি মানুষের রক্ত চুষে নিতে পারে, এ রকম কুসংস্কার ছিল। রক্তচোষা দেখলে দৌড়ে পালাতাম। আরেকটা গিরগিটি ছিল একটু স্বাস্থ্যবান, তাগড়া ধরনের। ওটা নিরীহ গিরগিটি। নাম ‘আরজিনা’। মানুষ দেখলেই শুকনো পাতার ওপর দিয়ে সরসর করে দৌড়ে পালাত। আমার প্রথম উপন্যাস ‘যাবজ্জীবন’ শুরু হয়েছিল প্রকৃতির বর্ণনা দিয়ে। শুরুর কয়েক লাইনের মধ্যেই আরজিনার ছুটে যাওয়ার বর্ণনা আছে।

খাটাশ ছিল অনেক। শিয়াল তো ছিলই, বাগডাশাও ছিল। একদিন শেষ বিকেলে বহ্নিছাড়ার ওদিক দিয়ে তাজুলের সঙ্গে ফিরছি। গিয়েছিলাম বহ্নিছাড়া ছাড়িয়ে দক্ষিণ দিকে যে খাল, সেই খালের ওপারে মজনুদাদের বাড়িতে। মজনুদা হচ্ছে তাজুলের চাচাতো ভাই। সেই বাড়ি থেকে নেমে মাত্র হালটের মোড়ে এসেছি, হঠাৎ কালোমতো একটা বিড়াল সাইজের জীব পুব দিককার মাঠ থেকে পশ্চিম দিককার ধানক্ষেতে তীরের মতো ছুটে গেল। অবাক হয়ে তাজুলকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওইটা কী রে?’

তাজুল হেসে বলল, ‘তুই চিনস না? আরে ওইটা হইলো খাডাশ। ’

বুঝলাম এই হচ্ছে খাটাশ।

ঠাকুরবাড়ির দক্ষিণ দিককার অংশে একসময় একটা বড় দালান ছিল। আমার জন্মের বহু আগে সেই দালান ধসে পড়েছিল। উঁচু মাটির ভিতটা ছিল আর চারপাশে ছিল পুরনো ভাঙাচোরা ইটের ধসে যাওয়া গাঁথনি। চারপাশে আমগাছ। বাড়ির মাঝখানকার পুকুরটার দিকে বেতবন। ওই পুকুরটাই ভিতের পশ্চিম দিকে। পুব দিকে আরেকটা পুকুর। সেই পুকুরের ওপারে গুহদের বাড়ি। পুব দিককার ভিতে দাঁড়ালে অনেকখানি নিচে পুকুরপারটায় প্রচুর ঝোপঝাড় আগাছার জঙ্গল। হিজলগাছ আছে বেশ কয়েকটা। বইন্নাগাছ আছে অনেকগুলো। ভিতের ঠিক দক্ষিণ কোনায় বিশাল একটা লিচুগাছ। আমের দিনে ওই লিচুতলায় দুপুরের দিকে বেশ আড্ডা জমত। পাড়ার শিশু-কিশোররা তো থাকতই, অনেক সময় বড়রাও থাকত। জহুদা নজুদা আইয়ুবদা হামিদ মামা রফউ মামা মোতালেব মামা। আমার বড় ভাই আজাদ। তাদের দলটা আলাদা।

চদরিবাড়ির গাবতলায়ও দুপুরের দিকে এই রকম একটা আড্ডা জমত। পাশের বাঁশঝাড়গুলো উতল হাওয়ায় শনশন করছে। গাবের পাতায়ও হাওয়ার খেলা। অনেক পোলাপান একত্রে হওয়ায় গা-ছমছমে ভাবটা নেই। কাঁচা আম পেড়ে এনে কাসুন্দি দিয়ে মাখিয়ে খাওয়া হতো। গাবতলার পরিষ্কার মাটিতে গুলি খেলা হতো। গভীর আনন্দের সময়।

আমার ধু ধু মনে আছে, পশ্চিম দিক থেকে চদরিবাড়িতে ঢোকার পর কিছুটা জায়গা পেরিয়ে গেলে সবুজ ঘাসে ভরা একটা উঠান। তারপর পশ্চিমমুখী একটা টিনের ঘর। ঘরটা অতি পুরনো এবং জীর্ণ। মাঝারি সাইজের। পড়ো পড়ো অবস্থা। ভিতরটায় ঝুপসি অন্ধকার। দক্ষিণ দিকে একটা জানালা ছিল। জানালার পাশে চৌকি। চৌকিতে ধীরেন চৌধুরীকে মাঝে মাঝে বসে থাকতে দেখতাম। আরেকটা বুড়ি ছিল ঘরে। অথর্ব ধরনের। অতি কষ্টে ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটত। চদরির রান্নাবান্না করত। এই ঘরের পিছনেই বাড়ির মাঝখানকার পুকুরটা। চদরির অংশে আমাদের বাড়ির মতো পুরনো একটা কাঠের ঘাট ছিল। পুকুর ভর্তি কচুরি আর জলজ উদ্ভিদ। চারদিক থেকে পুকুর জলে নেমে গেছে বেতবন, ছিটকি আর টোসখোলার ঝোপ। ছায়া ফেলে রেখেছে বড় বড় গাছপালা। উত্তর দিকে বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে ছমেদ খাঁ নানার পুকুরের সঙ্গে একটা চওড়া নালাকাটা। বর্ষায় এই নালা দিয়ে পানি ঢুকত পুকুরে। সঙ্গে মাছও ঢুকত প্রচুর। ধোয়াপাকলার কাজে পুকুরঘাটে গিয়ে পানিতে পড়েছিল অথর্ব বুড়িটি। আর উঠতে পারেনি। পরে তার লাশ ভেসে উঠেছিল।

চদরির ঘরের পশ্চিম দিকে, উঠানের পর খেজুরপাতার মতো পাতাওয়ালা সুন্দর দুটো গাছ ছিল। কী গাছ জানি না। শৌখিন মানুষ বাড়িতে এসব গাছ বুনত। একটু বড় হওয়ার পর চদরির ঘরটা আর দেখিনি। হয়তো ভেঙে পড়া ঘর বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। সে এসে থাকত ঠাকুরের রান্নাঘরে। ঠাকুরের রান্নাবান্না করত। আর হাজামবাড়ির মজিদ ছিল ঠাকুরের নৌকা বাওয়ার লোক, বাড়ির অন্যান্য কাজ করার লোক।

ধীরেন চদরিকে নিয়ে আমার একটা মজার স্মৃতি আছে। ঠাকুর চদরির বাড়ির আমগুলো মাত্র ডাগর হতে শুরু করেছে। জহুদা নজুদা আইয়ুবদা ওরা এক দুপুরে চদরিবাড়িতে ঢোকার মুখের আমতলায় বসে আছে। কিছু আম পাড়া হয়েছে। টিনের একটা থালা আছে সঙ্গে। একটু কাসুন্দি আছে। একজন আম ছিলছে। কাসুন্দি দিয়ে মাখিয়ে খাওয়া হবে। আমি কেমন কেমন করে মিশেছি তাদের সঙ্গে। আইয়ুবদা আমাকে বললেন, ‘নুন আনতে ভুইল্লা গেছি রে মিলু। চদরি রানতে বইছে, যা তার কাছ থেকে নুন লইয়া আয়। ’

এ কথা শুনে জহুদা নজুদা দেখি মিটিমিটি হাসে। কী কারণ আমি তা বুঝতে  পারিনি! এক দৌড়ে গেলাম ঠাকুরের রান্নাঘরে। সরাসরি ঘরে ঢুকে চদরিকে বললাম, ‘একটু নুন দেন। ’

সঙ্গে সঙ্গে চদরি হইহই করে লাফিয়ে উঠল। ভয়ংকর মারমুখী ভঙ্গি। পারলে আমাকে মারে। তেড়ে এসে বলল, ‘যা যা, বাইর হ। ’

ভয় পেয়ে দৌড়ে ফিরে এলাম। মুখচোখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। দৌড়ে আসার ফলে হাঁপাচ্ছি। আইয়ুবদা হাসতে হাসতে বললেন, ‘নুন দেয় নাই?’

‘না। আমার ওপরে চেইত্তা গেছে। ’

তিনজন হা হা করে হাসতে লাগল। ব্যাপারটার আগামাথা কিছুই বুঝলাম না। থালার দিকে তাকিয়ে দেখি কাসুন্দি দিয়ে আম মাখা হয়ে গেছে। আইয়ুবদা লুঙ্গির কোঁচড় থেকে কাগজে জড়ানো লবণ বের করে মাখা আমের ওপর ছিটিয়ে দিচ্ছেন।

আরে লবণ তো ছিলই! তার পরও আমাকে আনতে পাঠাল কেন?

পরে শুনেছি, ব্রাহ্মণদের রান্নাঘরে মুসলমান ঢুকলে সেই রান্না তারা নাকি আর খায় না। এই জন্যই চদরি এমন তেড়ে উঠেছিল।

আম মাখা খেয়ে সেদিন আর স্বাদ পেলাম না। বুক ধুকপুক ধুকপুক করছে। নিশ্চয় চদরি বা ঠাকুর গিয়ে বুজির কাছে আমার নামে বিচার দেবে। আর বুজি নিশ্চয়ই আমাকে বকবে। দু-তিনটা দিন খুবই উৎকণ্ঠায় থাকলাম। কিন্তু ঠাকুর বা চদরি কেউ এসে কোনো বিচার দিল না।

 

ছয়.

একদিন দুপুরে লিচুতলায় আড্ডা জমেছে। পুব দিককার পুকুরপারের আমগাছে আম বড় হলো কি না কে যেন আমাকে দেখে আসতে বলল। গেছি ওদিকটায়। হ্যাঁ, গাছের আম বড় হয়েছে। গাছের দিকে তাকিয়ে থাকার সময়ই শুনি, অনেকখানি নিচে পুকুরপারের ঝোপঝাড়ে কী রকম যেন একটা হুটোপুটির শব্দ। চমকে তাকিয়েছি। তাকিয়ে বুকটা ধড়াস করে উঠল। তিনটি বাঘের বাচ্চা হুটোপুটি করছে ঝোপঝাড়ের মাঝখানকার ঘাসে ভরা একটুখানি খোলা জায়গায়। দেখে আমার দম প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। কয়েক পলক দেখলাম দৃশ্যটি। তারপর পা টিপে টিপে লিচুতলায় ফিরে এলাম। ঘটনা বললাম সবাইকে। সৈয়দ মামা নাকি দুলাল বা তাজুল কে যেন বলল, ‘বাঘের বাচ্চা দেখছস? এহেনে বাঘ আইবো কই থিকা? ল তো দেখি!’

সবাই দল বেঁধে পা টিপে টিপে গেলাম। গিয়ে দেখি তখনো একই দৃশ্য। তিনটি বাঘের ছানা হুটোপুটি করছে। আমাদের পায়ের শব্দ বোধ হয় বাচ্চাগুলো পেয়ে গেল। মুহূর্তে ঝোপের ভিতর উধাও।

দুলাল হাসতে হাসতে বলল, ‘এডি বাঘের বাচ্চা না। বাগডাশার বাচ্চা। ’

আরেকবার বাগডাশা দেখলাম আমাদের বাগানের ওদিকটায়। বুজি অনেক হাঁস-মুরগি পালতেন। প্রায়ই শিয়ালে কিংবা বাগডাশায় দিনের বেলায় হাঁস-মুরগি ধরে নিয়ে যেত বাগান থেকে। হাঁসগুলো হেলেদুলে যেত পুকুরের দিকে। পুকুরে চড়ে গুঁড়াগাড়ি মাছ খেয়ে পেট ফুলিয়ে আয়েশ করে বসে থাকত পুকুরপারের ঝোপঝাড়ের ছায়ায়। ওত পেতে থাকা শিয়াল কিংবা বাগডাশা অতর্কিত ঝাঁপিয়ে পড়ে হাঁস মুখে নিয়ে পালাত। অন্য হাঁসগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ত পানিতে। একটা হুড়োহুড়ি হইচই পড়ে যেত বাড়িতে। মুরগিও ধরে নিয়ে যেত একই কায়দায়। বাগানের তিন দিকেই তো কমবেশি ঝোপঝাড়। কাশ টোসখোলা ছিটকি হাগড়া আর কত নাম না জানা আগাছার ঝোপ! বাগানের পরিষ্কার মাটিতে চরত মোরগ-মুরগিগুলো। তাদের ধরতে ঝোপের আড়ালে ওত পাতত বাগডাশা শিয়াল খাটাশ।

বাড়িতে সব সময়ই বারান্দার বড় চৌকিটার তলায় চাঙ্গাড়িতে খড়নাড়া দিয়ে বা চুলার ছাই দিয়ে মুরগির ডিম পাড়ার ব্যবস্থা করা হতো। পেটভরা ডিম নিয়ে মুরগি ঠিক ওই চাঙ্গাড়িটায় গিয়ে বসত। দশ বারোটা পনেরোটা করে ডিম দিত। ওখানে বসেই ডিমে তা দিত, বাচ্চা ফোটাত। ওমে বসা মুরগিকে বলে ‘উমা মুরগি’। উমা মুরগি খুব খ্যাপাটে ধরনের হয়। সামনে গেলে ওমে বসা অবস্থাতেই ঠোকর দেয়। তারপর একসময় ডিম খুঁটে খুঁটে বাচ্চা ফোটায়। বাচ্চাগুলোর কুনকুন, কুনকুন এক ধরনের শব্দ পাওয়া যায়। পনেরোটা ডিমের মধ্যে হয়তো তিন-চারটা নষ্ট হয়ে যায়। বাকিগুলো থেকে ছানা বের হয়। হালকা হলুদ সাদা রঙের মিশেল দেওয়া তুলার পুতুলের মতো ছানাগুলো নিয়ে মুরগিটা একসময় উঠান পালানে চরতে বেরোয়। ছানাগুলোর তখন বড় শত্রু আকাশের চিল আর দাঁড়কাক। অনেক সময় পাতিকাকও। এই পাখিগুলো তক্কে তক্কে থাকে কখন ছোঁ মেরে মুরগিছানা তুলে নেবে। মা মুরগি ব্যাপারটা টের পেলে ও রকম আততায়ী চিল দাঁড়কাক কিংবা পাতিকাক দেখলে মাথা উঁচু করে সাবধানী ভঙ্গিতে এক ধরনের শব্দ করে। সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গে ছানাগুলো মায়ের পালকের নিচে এসে লুকায়। তার পরও সব ছানা রক্ষা করা যায় না। কোনো কোনোটা ছোঁ মেরে নিয়ে যায় কাক চিলে। কখনো কখনো এ রকম ধরে নেওয়া মুরগিছানা টুপ করে আবার পড়েও যায় কাক চিলের মুখ থেকে। সামান্য আহত হলেও সেগুলোর কোনো কোনোটা বেঁচে যায়।

একদিন দুপুরের দিকে আমাদের বাগানে চরা মোরগ মুরগিগুলোর মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা। কককক করে সাবধানী ডাক ডাকছে আর পালানোর চেষ্টা করছে। দাদা গেছে বাগানের দিকে। গিয়ে আবছামতো কিছু একটা ছুটে যেতে দেখল আমাদের বাড়ি আর   মিয়াবাড়ির মাঝখানকার ঝোপ-জঙ্গলে গভীর হয়ে থাকা জায়গাটার দিকে। সরু বাঁশের লম্বা একটা লাঠি নিয়ে সে গেল ওদিকটায়। সঙ্গে আমিও আছি। বুজি ফতির মা আম্মা সবাই এসেছে বাগানে। দাদা বলল, ‘কী জানি একটা ঢুকছে এই জঙ্গলে। শিয়াল খাডাশ, নাইলে বাগডাশা। এর লেইগা মোরগ-মুরগিগুলা ডরাইতাছে। ’ বলেই হাতের লম্বা লাঠিটা দিয়ে ঝোপের মধ্যে একটা বাড়ি দিল। সঙ্গে সঙ্গে একটা বড় সাইজের বাগডাশা মিয়াবাড়ির বাঁশঝাড় আর চালতাতলার দিকে দৌড় দিল। সেই প্রথম পরিষ্কার একটা বাগডাশা আমি দেখলাম।

কত রকমের পাখি ছিল তখন গ্রামে! সেসব পাখির কোনো কোনোটা হয়তো এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মিয়াবাড়ির চালতাতলা আর বাঁশঝাড়ের তলার দিককার কথা মনে পড়লে একটা পাখির কথা মনে হয়। সেই পাখির নাম কুক্কা। সন্ধ্যার দিকে বেরোত পাখিটা। ওড়ার চেয়ে পায়ে হাঁটত বেশি। বড় সাইজের পাতিকাকের সমান। পাখা দুটো জমাটবাঁধা রক্ত রঙের। তেমন ডাকাডাকি করত না। নিঃশব্দ ছিল তার চলাফেরা। এই পাখিটাকে গ্রামের লোকজন ‘হাইড়া কুক্কা’ বলেও ডাকত। জানি না সেই পাখি এখন আছে, না বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

কত ডাহুক ছিল! সারা রাত আর নির্জন দুপুরে ডাহুক-ডাহুকির ডাক শোনা যেত। বর্ষাকালে কালো তুলা দিয়ে তৈরি এমন দেখতে ছোট ছোট ডাহুকছানা মায়ের সঙ্গে ভেসে বেড়াত পানির ওপর। সামান্য শব্দ পেলেই কোথায় যে লুকাত, বোঝায়ই যেত না।

কার্তিক মাসে ধানের ছড়া খাঁচায় ঝুলিয়ে ডাহুক শিকার করত অনেকে। জবাই করে খেত। বকও শিকার করত কেউ কেউ। অনেক রকমের বক ছিল দেশগ্রামে। মজনু দাদাদের বাড়ির ওদিককার এক লোক ফাঁদ পেতে বক ধরেছে। সেই বক বাড়িতে এনে পলো দিয়ে আটকে রেখেছে। জবাই করে খাবে। বাড়ির একটি দুরন্ত ছেলে পলোর মুখে চোখ লাগিয়ে বক দেখছে। তার চোখের নড়াচড়া দেখে বক ভাবল, বোধ হয় পানির তলায় কোনো মাছ নড়াচড়া করছে। দিল এক ঠোকর। চোখ তুলে ছোট মাছ গিলার মতো গিলে ফেলল। সেই ছেলে জীবনের তরে কানা।

 

সাত.

ঢাকায় একবার আমি একটা সাপ মারলাম। গেণ্ডারিয়া দীননাথ সেন রোডে আমার বন্ধু মানবেন্দ্রদের বাড়ি। ওই বাড়ির দক্ষিণ দিককার বাড়ির ছেলে মুকুল আমার পরিচিত। বাড়িটায় গাছপালা আছে, ঘাস আছে, কিছু ঝোপঝাড় আছে। পুরনো ধরনের বড় একটা দালানে মুকুলরা থাকে। সেই দালানের দক্ষিণে একটু দূরে এক কামরার একতলা একটা দালান। আমার বন্ধু পান্নার কী রকম যেন আত্মীয় হয় মুকুলরা। আশির দশকের শুরুর দিকে নাকি আরো আগে, আমার ধারণা সাতাত্তর-আটাত্তর সাল হবে, পান্না মাঝে মাঝে এসে ওই ঘরটায় থাকত। বাড়ির মেয়েটির সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়েছে। পরবর্তীকালে সেই মেয়েই পান্নার স্ত্রী। পান্নার পুরো নাম মোকাদ্দেসুর রহমান। জীবন কাটিয়ে দিল ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করে। একসময় লেখালেখিও করত।

মুকুলদের বাসায় পান্না আছে জেনে এক বিকেলে আমি তার সঙ্গে দেখা করতে গেছি। গিয়ে দেখি, পান্না আর মুকুল খুবই উত্তেজিত। বাড়ির মহিলারা বড় দালানের বারান্দায় দাঁড়িয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে। পান্নার হাতে একটা চেলাকাঠ। কী ব্যাপার? পান্না উত্তেজিত গলায় বলল, ‘সাপ ঢুকছে ঘরে। বিরাট সাপ। ’

সাপের কথা শুনলেই আমার বুকটা ধক করে ওঠে, পিঠটা শিরশির করে ওঠে। তবু বললাম, কী সাপ?

‘চিনি না। তবে বড় সাপ। ওই যে দেখ। ’

ঘরের ভিতরে উঁকি মেরে দেখি খাটের উল্টো দিকে, দেয়ালের কোণে আধপ্যাঁচা হয়ে আছে একটা সাপ। মাঝারি ধরনের মোটা। পেটের দিকটা হলুদ রঙের। পিঠটা মাটির মতো। চিনলাম। মেটেসাপ। বেশ বীরত্বের ভঙ্গিতে পান্নার হাত থেকে চেলাকাঠটা নিলাম। কাছাকাছি গিয়ে প্রথমে মাথাটা থেঁতলে দিলাম। তারপর কোমরটা। সাপটা নির্জীব ধরনের ছিল। সহজেই মারা পড়ল।

এই সাপ মারতে মারতে আমি চলে গিয়েছিলাম স্মৃতির ভিতরে। ঠাকুরবাড়ির সেই ঘটনা মনে পড়েছিল।

আম পাকার দিন শুরু হলো কি না জানার জন্য আমি মিন্টু আর আলমগীর গিয়েছিলাম ঠাকুরবাড়িতে। জষ্টি মাসের দুপুরবেলা। আম পাকার খবর প্রথম পায় কাকেরা। কোন গাছের পাতার ফাঁকে পেকে হলুদ কিংবা লাল হয়েছে আম কাকপক্ষীর তা চোখে পড়বে। সে এসে ঠোকর দেবে পাকা আমে। কয়েক ঠোকর হয়তো খাবে, তার পরই আমটি খসে পড়বে গাছতলায়। আমরা জেনে যাব, আম পাকার দিন শুরু হয়েছে। একটার পর একটা গাছে আম পাকতে শুরু করবে এখন। বোঁটা আলগা হয়ে ঝরে পড়বে গাছতলায়। পাড়ার ছেলেমেয়েরা ভোরবেলায় আসবে আম কুড়াতে। আমিও আসব।

সেদিন আমরা তিনজন ঠাকুরবাড়িতে ঘুরছি। একটা কাক উড়ে গিয়ে বসল লিচুগাছটির ওদিককার একটা গাছে। কা কা করে পাকা আমে ঠোকর দিল। আধখাওয়া আমটা পড়ল নিচে। আমরা তিনজন ছুটে গেলাম। সেই আম দেখে বুঝলাম আম পাকার দিন এসে গেছে। দু-এক দিন পর থেকেই আম কুড়াতে আসা যাবে। দিন পনেরো বিশেক চলবে এই আম কুড়ানো। আম একবার পাকতে শুরু করলে শুধু পাকতেই থাকে। আর বোঁটা আলগা হয়ে টুপটাপ পড়তে থাকে গাছতলায়।

এক সকালে আমার ঘুম ভেঙেছে একটু বেলা করে। উঠেই ছুটে গেছি ঠাকুরবাড়িতে। হাফপ্যান্ট পরা, খালি গা। হাতে চটের একটা ছোট ব্যাগ। আজ হয়তো আম তেমন পাওয়া যাবে না। নিশ্চয়ই এতক্ষণে সব আম কুড়িয়ে নিয়ে গেছে পাড়ার ছেলেমেয়েরা। তবু গেছি। এদিক-ওদিক ঘুরে কোথাও কোনো আম পেলাম না। শেষ পর্যন্ত এলাম ঠাকুরের ঘরের পিছন দিকটায়। এখানে একটা বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড়ের সঙ্গে গলাগলি করে আছে দুটো আমগাছ। পায়ের তলায় ঘাসের সঙ্গে আছে শক্ত অচেনা ধরনের লতা গাছ। বাঁশঝাড়তলা একেবারে ছেয়ে আছে। হাঁটতে হাঁটতে গেছি ওদিকটায়। হঠাৎই স্বপ্নের মতো চোখে পড়ল দৃশ্যটা। হলুদ বেশ বড় সাইজের একটা আম পড়ে আছে গাছতলায়। ছুটে গিয়ে মাত্র ধরব তার আগে সাঁ করে ফণা তুলল কুচকুচে কালো এক সাপ। ফণাটা স্থির হয়েছে। চোখ দুটো খোসা ছাড়িয়ে নেওয়া বেতফলের মতো। সুতার মতো কালো রঙের দুখানা জিভ বারবার বেরোচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে আমার আর হিতাহিত জ্ঞান নেই। কোথায় পড়ে রইল আম আর কোথায় পড়ে রইল আমার হাতের ব্যাগ। দিলাম প্রাণপণে দৌড়। খানিক দৌড়ে যেতেই সেই শক্ত লতায় জড়িয়ে গেল পা। মুখ থুবড়ে উপুড় হয়ে পড়লাম। কয়েক সেকেন্ড মাত্র। তার পরই টের পেলাম আমার খোলা পিঠের ওপর দিয়ে বরফের একটা মালা যেন মুহূর্তেই পিছলে গেল। পড়া থাকা অবস্থায়ই মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি আমার পিঠ ছাড়িয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে কালো সাপ। অচেনা একটা ঝোপের ভিতর ছ্যালছ্যাল করে ঢুকে যাচ্ছে। আমি তখন বেঁচে আছি, না মরে গেছি বুঝতেই পারছি না। অদ্ভুত এক অনুভূতি।

পরে বুঝেছিলাম, আমাকে দৌড় দিতে দেখে সাপটাও ছুটেছিল আমার পিছু পিছু। আমি উপুড় হয়ে পড়েছি সেটা সে বোঝেনি। আমার পিঠের ওপর দিয়ে পার হয়ে গেছে।

বাড়িতে এসে কাঁপতে কাঁপতে বুজিকে বললাম ঘটনা। শুনে বুজি একেবারে আঁতকে উঠলেন। ‘সর্বনাশ! কও কী মিয়াভাই! তোমারে তো আমি আর আম টোকাতে যাইতে দিমু না। যদি সাপে ঠোকর দিত, তাইলে কী হইতো!’

আমাকে লবণপানি খাওয়ালেন। দোয়া পড়ে মাথায় বুকে ফুঁ দিলেন।

তারপর কত দিন কতভাবে যে সেই সাপে তাড়া করার ঘটনা আমার মনে পড়েছে! মনে পড়লেই পিঠ শিরশির করে উঠত। পিঠের ওপর দিয়ে সেই বরফমালা পিছলে যাওয়ার অনুভূতিটা ফিরে আসত। আর মনে হতো, সারা জীবন ধরেই কি একটা সাপ আমাকে তাড়া করছে!

মেদিনীমণ্ডলের জীবনটা ছিল নির্জনে বড় হয়ে ওঠা এক শিশুর জীবন। অত বড় একটা ঘরে বুজি কিংবা আম্মার বুকের কাছে শুয়ে থাকা। বর্ষাকালের বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। উঠান পালান ছাপিয়ে ঘরে ঢোকার জন্য উঁকিঝুঁকি মারছে বর্ষার জল। বৃষ্টি থামেই না। দিন ভরে আছে মেঘের ছায়ায়। মন খারাপের দিন। শেষ বিকেলের আগেই সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। ঘরের ভিতর ঝিঁঝি পোকার ডাক। টিনের চালায় আর বর্ষার জলে বৃষ্টি পতনের শব্দ। ঝুমঝুম ঝুমঝুম! পড়ছে তো পড়ছেই। দুপুরের রান্না করা ভাত তরকারি রাতেও খেতে হচ্ছে। আলগা চুলায় তরকারি একটু হয়তো গরম করেছেন বুজি বা আম্মা। সন্ধ্যা হতে না হতেই রাতের খাবার। সারা দিন ঘরবন্দি। রাতে তো বন্দিই। সময় কী করে কাটে? ঘুম আসতেই চায় না। কেবিনের দরজা জানালা বন্ধ। কারে ওঠার সিঁড়ির কাছে টিমটিম করে জ্বলছে হারিকেন। বুজি আর আম্মার মাঝখানে শুয়ে আছি। একবার  আম্মার দিকে ঘুরে যাই, একবার বুজির দিকে। ‘বুজি, একটা কিচ্ছা কন। ’

বুজি বললেন, ‘আমি পরে কমু নে। ওই পুনি, তুই আগে কিচ্ছা হোনা মিলু রে। ’

কিচ্ছা মানে গল্প। কিচ্ছা মানে কাহিনি।

আম্মা শুরু করলেন কিচ্ছা। রূপকথার বইতে পড়া কোনো গল্প হয়তো। তিনি ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছেন। হয়তো কোনো বই থেকেই গল্প শোনাচ্ছেন বোনপোকে। হয়তো ‘ঠাকুমার ঝুলি’ থেকে বলে যাচ্ছেন ডালিম কুমারের গল্প। শুনতে শুনতে আমি চলে যাচ্ছি রূপকথার রাজ্যে, কল্পনার রাজ্যে। নিজেই হয়ে উঠছি ডালিম কুমার। গল্প শুনি আর কল্পনার রাজ্যটা বড় হয়। কত নদী সমুদ্র পেরিয়ে মন চলে যায় তেপান্তরের মাঠে। সমুদ্রের চেয়েও বড় সেই মাঠ। দিনের পর দিন হাঁটলেও ফুরায় না। নিজেকে মনে হয় ছোট্ট রাজকুমার। রাজপোশাকে আর পাগড়িতে, পায়ের নাগরা জুতায় রাজকুমার মিলুকর্তা টগবগে ঘোড়া ছুটিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছেন তেপান্তরের মাঠ। কোমরে খাপের ভিতরে আছে ঝকঝকে তলোয়ার। সামনে যে দৈত্যরা পড়বে, তলোয়ারের কোপে তাদের বধ করবেন।

আম্মা কিচ্ছা বলে যাচ্ছেন আর আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছি। গভীর বৃষ্টির রাত মুছে গেছে চেতনা থেকে। মেদিনীমণ্ডল গ্রাম আর সারেংবাড়ির বড় ঘর মুছে গেছে। ঝিঁঝির ডাক কানে আসে না। কল্পনায় আমি পেরিয়ে যাচ্ছি সাত সমুদ্র তের নদী তেপান্তরের মাঠ। কত বন, কত পাহাড়। কত মরুভূমি!

আম্মার কিচ্ছা শেষ হলে ঘুরে যাই বুজির দিকে। বুজিও কিচ্ছা বলে। সেসব কিচ্ছা ঠিক বইয়ে পড়া গল্প নয়। লোকমুখে শোনা বিক্রমপুর অঞ্চলের নানা রকম প্রচলিত কাহিনি। লোককথা। ভূতের গল্প, চোর ডাকাতের গল্প, বুদ্ধিমান কিংবা বোকা গৃহস্থের গল্প। সেসব গল্পও আমাকে মুগ্ধ করে। মনের ভিতরে অনেকখানি জায়গা দখল করে নেয় গল্প কাহিনি। বানেছা পরির গল্প বলেছিলেন বুজি নাকি আম্মা! সেই গল্প এমন করে মনে দাগ কাটল, মন থেকে বানেছা পরিকে আর মুছতেই পারি না। কেমন করে পরিস্থান থেকে এসে মানুষের কাছে ধরা পড়ল বানেছা। প্রেম ভালোবাসা হলো তাদের। পরিস্থানে গিয়ে বানেছাকে উদ্ধার করে আনল সেই মানুষ বা রাজপুত্র। গভীর আবেগ আর ভালোবাসায় মাখামাখি বানেছা পরির কিচ্ছা।

মনে থেকে যায় সব গল্পকথা। একটুও ভুলি না কিছু। বাড়ির চারদিকে চার শরিকের ঘর। সাদা উঠান চলে গেছে জলের দখলে। বাগান ভেসে গেছে আগেই। এখন ধীরে ধীরে ভাসছে উঠান। বুজি আর আম্মা রান্নাঘরে। দুপুরের রান্নার আয়োজন চলছে। ফতির মা আছে তাঁদের সঙ্গে। সকাল হয়তো দশটা বা এগারোটা বাজে। একা অত বড় ঘরটায় আমি কী করি? দক্ষিণের দুয়ারে দাঁড়িয়ে কঞ্চির ডগায় বাঁধা ছোট্ট বড়শিতে একটা করে শক্ত ভাত গেঁথে পানিতে ফেললেই ছোট পুুঁটি বা ট্যাংরা মাছ ধরছে। সেই মাছ ধরলাম অনেকক্ষণ। মাছ রাখার মাটির পাত্রটাকে বলে ‘ঘোপা’। পুঁটি ট্যাংরা পড়ে আছে ঘোপার তলানিতে। বড়শি বাইতে আর ভাল্লাগে না। সেই দরজা থেকেই চিৎকার করে বুজিকে বলি, ‘ও বুজি, আমি একটু ছানাদাগ ঘরে গেলাম। ’

রান্নাঘর থেকে বুজি বললেন, ‘যাও মিয়াভাই। ’

বড়শি আর ঘোপা পড়ে রইল। বারান্দার দিককার দরজা দিয়ে উঠানের পানিতে নামলাম। পরনে ‘দোয়াল’ লাগানো বিস্কুট রঙের হাফপ্যান্ট আর সাদা পুরনো স্যান্ডোগেঞ্জি।

ছানাদাদের ঘর মানে হাফেজ মামার ঘর। ছানাদা আর সেন্টুদাকে নিয়ে হাফেজ মামা বিলে গেছেন গরুর জন্য ঘাস বা কচুরির ডগা কেটে আনতে। ঘরে মিন্টু আছে। মাখম আছে। মামার ছোট ছেলে দুটো মনে হয় তখনো হয়নি। একমাত্র মেয়েটি মাটিতে হামাগুড়ি দেয়। তাকে আমরা শিলি বলে ডাকি। কেউ কেউ শিলিমও বলে।

হাফেজ মামার রান্নাঘর বর্ষার পানিতে ডুবে গেছে। আলগা চুলায় থাকার ঘরের এক কোণে রান্নার আয়োজন করছেন মামি। হাঁটুপানি ভেঙে গেছি সেই ঘরে। মামি আদর করেন খুব। আমাকে দেখলেই মুখটা হাসি হাসি হয়। কথায় কথায় বানেছা পরির কথা বলি। মামি খুব আগ্রহ করে গল্পটা শুনতে চাইলেন। বাইরে রোদ নেই, বৃষ্টিও নেই। আকাশে পাতিকাকের মতো উড়ছে মেঘ। মেঘের ছায়ার চারদিকে আবছা অন্ধকার। গাছপালা জবুথবু। বাড়ির প্রতিটি ঘরেই চলছে রান্নার আয়োজন। ছোট নানি কী একটা ‘বাগাড়’ দিয়েছেন। তেল আর হলুদ মরিচের একটুখানি ঝাঁঝালো গন্ধ ভেসে এলো। খাবারের আশায় একটা কাক হাফেজ মামার ঘরের দুয়ারে নেমে এসেছে। মিন্টু দু-তিনবার হুসহুস করে তাড়াল। আলগা চুলায় ভাতের হাঁড়ি বসিয়ে ধুন্দল কুটতে বসেছেন মামি। সেই অবস্থায় বললেন, ‘বানেছা পরির কিচ্ছাটা ক মিলু। হুনতে হুনতে রান্নাবাড়ি করি। ’

চৌকির ওপর বসে বেশ বড়দের কায়দায় বানেছা পরির কিচ্ছা শুরু করি। বুজি বা আম্মার মুখে যতখানি শুনেছি, তার সঙ্গে নিজে যোগ করি বহু কিছু। অর্থাৎ গল্পের ভিতর গেঁথে দিচ্ছি নিজের চিন্তা আর কল্পনা। গল্পের শরীর লম্বা করছি। তরকারি কুটতে কুটতে মামি মুগ্ধ হয়ে শুনছেন। মিন্টু আর মাখমও শুনছে।

ওই যে ওই বয়সে বুজি আর আম্মার মুখে শোনা কিচ্ছা নিজের মতো করে অন্যদের শোনাতাম, এই ঘটনার ভিতর কি লেখক হওয়ার বীজমন্ত্র লুকিয়ে ছিল?

সেই বয়সে কিচ্ছা শোনার বেদম নেশা ছিল আমার। সন্ধ্যার পর যারাই আমাদের ঘরে আসত, তাদের কাছেই ঘ্যানঘ্যান করতাম কিচ্ছা শোনার জন্য। ছানাদা সেন্টুদা কিচ্ছা কইতেন। হাজামবাড়ির মজিদ আসত। সে এক কিচ্ছার ওস্তাদ। রব হাফিজদ্দিও ভালোই কিচ্ছা কয়। কিচ্ছা শোনা আমার নেশা হয়ে গিয়েছিল। সেসব বর্ষা কিংবা শীতের রাতে, খরালিকালের গরম রাতে আমার প্রধান আনন্দই ছিল কিচ্ছা শোনা। এই কিচ্ছাই বোধ হয় ধীরে ধীরে ঠেলে দিয়েছে লেখক জীবনের দিকে। আমি কল্পনাপ্রবণ হয়ে উঠি। কল্পনার এক অলৌকিক রাজ্য তৈরি হয় মনের ভিতরে।

বই জিনিসটার প্রতি গভীর মমতা তৈরি হয়েছিল সেই বয়সেই। কেবিনের ছোট আলমারিটায় কয়েকটা বই ছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কমলাকান্তের দপ্তর’, মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদসিন্ধু’, শরত্চন্দ্রের ‘বড়দিদি’, ‘রামের সুমতি’ আর ‘অরক্ষণীয়া’। নজীবুর রহমান সাহিত্যরত্ন নামে এক লেখকের তিনটা না চারটা বই যেন ছিল। ‘আনোয়ারা’, ‘মনোয়ারা’ আরেকটি বইয়ের নাম ‘প্রেমের সমাধি’। বর্ষাকালে বইগুলো স্যাঁতসেঁতে হতো। শীতকালে সেই সব বই বের করে বাগানে একটা ছালা বিছিয়ে রোদে দিতেন বুজি। আমি হয়তো বইগুলোর পাশে বসে আছি রোদে। একটা একটা করে বই নেড়েচেড়ে দেখছি। পুরনো বইয়ের পাতা থেকে অদ্ভুত একটা গন্ধ উঠে আসত। সেই গন্ধে মাথার ভিতরটা কেমন করে, মনের ভিতরটা কেমন করে! এখনো আমি যেন হঠাৎ হঠাৎ সেই গন্ধটা পাই। বহু বহুকাল অতিক্রম করে মনের কোনো অন্ধকার কোণে লুকিয়ে থাকা বইয়ের গন্ধটা যেন হঠাৎ হঠাৎ ভেসে আসে। নাকি মগজের কোনো কোষে লুকিয়ে আছে গন্ধটা! সেখান থেকে আসা। মানুষের মনও কি আসলে মগজের কোষেই থাকে? মন কিংবা মগজ যেখান থেকেই আসুক, কী অর্থ এই গন্ধ পাওয়ার? আজও আমি ঠিক বুঝতে পারি না।

 

আট.

জিন্দাবাহার থার্ড লেনের বাসায় আমরা থাকি। আমরা মানে আব্বা মা অন্য ভাইবোনরা। আমি আর দাদা মাঝে মাঝে এসে থাকি। মণিও কিছুদিন মেদিনীমণ্ডলে, কিছুদিন জিন্দাবাহারে থাকে। দাদা আর আমি কাজীর পাগলা এ টি ইনস্টিটিউশনে পড়ি। তেষট্টি সালের কথা। আমি পড়ি ক্লাস থ্রিতে। বয়স কাঁটায় কাঁটায় আট বছর। ঢাকায় এসেছি। কয়েক দিন থেকে ফিরে যাচ্ছি একা একা। সকালবেলা আব্বা আমাকে লঞ্চে চড়িয়ে দিতে গেছেন। আট বছরের ছেলেটি সদরঘাট থেকে লঞ্চে চড়ে শ্রীনগর গিয়ে নামবে। সেখান থেকে পাঁচ মাইল দূরের গ্রাম মেদিনীমণ্ডল। ওদিককার লোকজনের সঙ্গে হেঁটে চলে যাবে সেই গ্রামে। লঞ্চে সময় লাগবে চার সাড়ে চার ঘণ্টা। তখনো টার্মিনাল হয়নি সদরঘাটে। তবে সব সময়কার মতোই জমজমাট এলাকা। ওই অত ভোরেই সাগরকলা বিক্রি হচ্ছে, পাউরুটি বিক্রি হচ্ছে, বনরুটি কেক বিস্কুট বিক্রি হচ্ছে। রেস্টুরেন্টগুলোতে নাশতা খাওয়া চলছে। লঞ্চ যাত্রীদের ব্যস্ততা। হুড়োহুড়ি। ফলের দোকানে ভ্যানভ্যান করছে মাছি। ফুটপাতে বই সাজিয়ে বসেছে এক হকার। সেখান থেকে দুআনা দিয়ে আব্বা আমাকে একটা বই কিনে দিলেন। ‘সিন্দাবাদের সাত অভিযান’। জীবনের প্রথম ‘আউট বই’ মানে পাঠ্য বইয়ের বাইরের একটি বই আমি পেলাম। লঞ্চে সারাটাক্ষণ পড়ে গেলাম সেই বই। ‘সহস্র এক আরব্যরজনী’ থেকে শুধু সিন্দাবাদের সাতটি অভিযান আলাদা করে ছোটদের উপযোগী ভাষায় লেখা হয়েছে। কী যে উত্তেজনা সেই লেখার ছত্রে ছত্রে! গা শিউরে ওঠা, দমবন্ধ হয়ে আসা উত্তেজনা। সিন্দাবাদের কোনো অভিযানে তাদের বাণিজ্যতরী ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য পায়ের থাবায় পাথর নিয়ে উড়ে আসছে রকপাখি। ফেলছে ঠিক বাণিজ্যতরীর ওপর। কোথাও দৈত্যের কবলে পড়েছে সিন্দাবাদ। হাতির দাঁত সংগ্রহ করতে গিয়ে পড়েছে মহাবিপদে। সমুদ্রের মাঝখানে ভেসে থাকা দ্বীপ মনে করে নেমেছে তিমির পিঠে। রান্না চড়িয়েছে। পুড়ে লাল টকটকে হওয়া এক টুকরা কয়লা পড়েছে তিমির পিঠে। সেইটুকু আগুনে কেঁপে উঠল অতিকায় তিমি। ডুবে গেল। এ রকম বিস্ময়কর সাত অভিযান। সেই বই তার পর থেকে সারাক্ষণ আমার সঙ্গে। পড়তে পড়তে মুখস্থ করে ফেলেছি প্রতিটি গল্প। তার পরও আবার পড়ি। আবার পড়ি। এ রকম গল্প হতে পারে! বিস্ময়ের ঘোর কাটে না।

পুরান বাড়ি মানে নোয়াব আলী নানার বাড়ি। উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। বেশ কয়েক শরিক বাড়িতে। ঘরের পর ঘর। মানুষও অনেক। বাড়িতে গাছপালা কম। চোখে পড়ার মতো তোতা মামাদের তালগাছটি। বাবুই পাখির বাসায় বাসায় তালের ডগা আর পাতা যেন চোখেই পড়ে না। দিনমান বাবুই পাখির কিচিরমিচির। উত্তরের শরিকের ওদিকটায় একটা বকুলগাছ ছিল।

নোয়াব আলী নানার ঘরগুলো বাড়ির উত্তর-পশ্চিমে। বারবাড়ির দিকের ঘরটি বাংলাঘর। সেই ঘরে নানার ছেলেরা পড়াশোনা করে। তাদের বন্ধুবান্ধব এসে আড্ডা দেয়। নানার বড় ছেলে খবির মামা, তারপর দবির মামা। গায়ের রং টকটকে ফরসা একেকজনের। নানার রংটা পেয়েছে। খবির মামা একটু গম্ভীর ধরনের। দবির মামা খুবই প্রাণবন্ত। তারপর কালু মামা সৈয়দ মামা। নানার এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে জলিল মামার সঙ্গে। জলিল মামা আমার মায়ের ফুফাতো ভাই। নোয়াব আলী নানার ছোট মেয়েটির নাম সুরাইয়া। আমার চেয়ে বয়সে ছোট। খুবই প্রাণবন্ত আর চঞ্চল সুরাইয়া খালা। আমরা তাকে ‘সুরি’ বলে ডাকতাম।

সময় পেলেই চলে যাই খবির মামাদের বাংলাঘরে। খুবই আদর করেন তাঁরা আমাকে। ঘরের পশ্চিম পাশে একটা পুরনো বরইগাছ। এত ছোট ছোট বরই ধরে! অত ছোট বরই এই জীবনে আর দেখিনি। বেতফলের সমান হবে একেকটা। তারপর একটা লম্বা ধরনের ডোবা। এই ধরনের ডোবাকে বলে ‘গড়’। তার পশ্চিম পাশে খেলার মাঠ। খানবাড়ির দিক থেকে সড়ক এসে চলে গেছে কালীর খিলে। সড়কের ওপাশে বিল। নোয়াব আলী নানার বাড়ির দক্ষিণের পুকুরটি বড়। মাছ পড়ার জন্য বর্ষার শেষ দিকে ঝাঁকা ফেলা হতো পুকুরে। কিছু কচুরি আর ধঞ্চের মতো এক ধরনের জলজ উদ্ভিদ থাকত। সেই উদ্ভিদটাকে গ্রামের লোকে বলে ‘খাইল্লা’। কচুরিও থাকত অনেক। প্রচুর মাছ পড়ত পুকুরটায়। পুরান বাড়ির মানুষজন ছাড়া অন্য কেউ সেই মাছ ধরতে পারত না। জেলে ডাকিয়ে বছরে একবার মাছ ধরার নিয়মটা তো ছিলই। একবার আমরাও মাছ ধরার সুযোগ পেয়েছিলাম সেই পুকুরে। সকাল থেকেই অনেকে মাছ ধরছিল। আমি গিয়েছিলাম দুপুরের পর। মনে আছে, ঘন কচুরির তলায় ডুব দিয়ে সাদা সাদা গুলশা মাছ ধরেছিলাম বেশ কয়েকটা। মাছগুলো কেমন একটু নির্জীব ছিল। কারণটা জানা হয়নি।

পুকুরের দক্ষিণে পাশাপাশি দু-তিনটা জমি। দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের বাড়িটা হাওলাদারবাড়ি। পুবের বাড়িটা ইন্নত আলীর বাড়ি। তারপর চদরিবাড়ি। নোয়াব আলী নানার ছাড়াবাড়িটা পুকুরের পুব পারে। সেই বাড়ির পর ছমেদ খাঁ নানার বাড়ি। ছমেদ খাঁ নানার পুকুরের পুব পারের বাড়িটা আমার নানাবাড়ি।

হাওলাদারবাড়ি মানে মন্নাফ মামাদের বাড়ি। তারা তিন ভাই। মন্নাফ মামা, সাত্তার মামা আর জলিল মামা। একজন না দুজন বোনও আছে তাঁদের। এক বোন দুলালের মা। দুলালকে নিয়ে বিধবা হয়ে ভাইদের সংসারে থাকেন। মন্নাফ মামারা তিন ভাই দেখতে তিন রকম। মন্নাফ মামার গায়ের রং কালো। মাঝারি মাপের একজন মানুষ। গ্রামের মেম্বার। সাত্তার মামাও কালো, মোটাসোটা শরীরের। জলিল মামা টকটকে ফরসা লম্বা, রাজপুত্রের মতো।

এই বাড়িতে মেজবানি হচ্ছে। ‘মেজবানি’ আর ‘জিয়াফত’ এই দুটো শব্দ খুব শুনতাম তখনকার দিনে। বিভিন্ন কারণে সচ্ছল বাড়িতে মেজবানি হতো। গরু খাসি জবাই হতো। ডাল রান্না হতো অনেক। আর হতো ঘন দুধের ফিরনি। ফিরনিকে আমরা বলতাম ‘ফিন্নি’।

মন্নাফ মামাদের বাড়িতে মেজবানি হচ্ছে। কোন উপলক্ষে মনে নেই। অতিথিদের মেহমান বলি না আমরা। বলি ‘মেজবান’। মেজবান থেকে মেজবানি। সেই মেজবানিতে বড় বড় ডেগে ভাত রান্না হয়েছে। খাসির মাংস রান্না হয়েছে। ডাল আর ফিন্নি রান্না হয়েছে। ঠা ঠা রোদের মধ্যে উঠানে বসে খাওয়াদাওয়া হবে। রান্নার লোকগুলো গরমে ঘামে অস্থির। ফিন্নি রান্না হয়ে গেছে। ফিন্নির ডেগে ঢাকনা দেওয়া। ঢাকনা সরিয়ে দেওয়া হলো ঠাণ্ডা করার জন্য। অত গরম ফিন্নি মেজবানরা খেতে পারবে না। পশ্চিম ভিটির ঘরের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছি আমি। একটা মুরগি ছুটতে ছুটতে এলো। কে একজন হুসহুস করে মুরগিটাকে তাড়া করল। সেই মুরগি এমন ভয় পেল, এমন দিশেহারা হলো, প্রথমে দিল দৌড়, তারপর দিল উড়াল। উড়াল দিয়ে বেশিদূর যেতে পারল না। গিয়ে পড়ল ঢাকনা খোলা ফিন্নির ডেগে। মেজবানি বাড়িতে বিরাট কোলাহল শুরু হলো। তীব্র গরম ফিন্নিতে পড়ে সেই মুরগির পালকটালক মুহূর্তে মিশে গেল ফিন্নির সঙ্গে। পালককে আমরা বলি ‘ফইর’। ফইর ছাড়া মুরগিটা সিদ্ধ হয়ে গেল। সেই ফিন্নি পরে কী করা হয়েছিল জানি না।

হাওলাদারবাড়ির কথা ভাবলেই এই ঘটনা মনে পড়ে।

পাড়ার এবাড়ি ওবাড়ির প্রত্যেকেই প্রত্যেকের কোনো না কোনোভাবে আত্মীয়। লতাপাতায় প্রত্যেকে জড়িয়ে আছে প্রত্যেকের সঙ্গে।

মন্নাফ মামারা পরে এবাড়ি ছেড়ে চলে যান চন্দ্রের বাড়িতে। চন্দ্রের বাড়ির পশ্চিম পাশে বহ্নিছাড়া। বহ্নিছাড়া হয় সুরাইয়া খালার বাড়ি।

ছাড়াবাড়িগুলো ছিল হিন্দুবাড়ি। চন্দ্রের বাড়িতে বড় বড় ‘বাকসা’ ঘাস হতো বর্ষাকালে। বাড়ির উত্তর দিকে কতগুলো জংলি বরইগাছ ছিল। এত বিস্বাদ সেই বরই, মুখে দেওয়া যেত না। আলমগীর মামার সঙ্গে গিয়ে দু-একবার আমি খেয়ে দেখেছি।

বর্ষাকালে এই বাড়িতে হাডুডু খেলা হতো। আমরা দেখতে যেতাম। হাডুডু খেলাটির অন্য দুটো নাম এলাকায়। ‘কপাটি’ আর ‘ধরাছি’। ঠাকুরবাড়িতেও খেলাটা হতো। হাজামবাড়ির গাবতলায় হতো। বিভিন্ন গ্রাম থেকে ভালো প্লেয়ার হায়ার করে আনা হতো। দাদা একবার একটা দল করল। কান্দিপাড়ার ওদিক থেকে কিশোর বয়সী প্লেয়ার হায়ার করে আনল। দুপুরবেলা পোলাউ মোরগ রান্না করে বুজি আর আম্মা তাদের খাওয়ালেন। বিকেলবেলা খেলা হলো হাজামবাড়ির গাবতলায়। দাদার দল জিতে গেল। ছোট একটা কাপও পেল। সেই কাপ নিয়ে কী যে উচ্ছ্বাস আমাদের!

ইন্নত আলীও আমাদের মামা হন। ওই যে বললাম লতায়পাতায় সম্পর্ক। তিনি নিয়মিত কলকাতায় যাতায়াত করতেন। কলকাতা থেকে বর্ডার ক্রস করে মাল নিয়ে আসতেন এপারে, বিক্রি করতেন। এটাই ছিল তাঁর পেশা। গ্রামে দেখা যেত খুব কমই। আমি তাঁকে দু-চারবারের বেশি দেখিনি। লুঙ্গি আর ফুলহাতা শার্ট পরতেন। গ্রামের কারো সঙ্গে তেমন উঠবস ছিল কি না জানি না। নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা মানুষ। বাড়িতে বৃদ্ধা মা আর স্ত্রী। বড় ছেলের নাম মকবুল। বয়সে আমার চেয়ে ছোট। বাড়িতে অন্যান্য শরিকও ছিল। তাদের কথা আমার মনে নেই।

ইন্নত মামার মা ছিলেন রোগা-পাতলা মহিলা। তাঁর গলায় বেশ জোর ছিল। ইন্নত মামার বড়ঘরের পুব পাশটায় একটা নালা ছিল। খরালিকালে নালা আর ভরা বর্ষায় চল্লিশ-পঞ্চাশ হাত চওড়া একটা জায়গা। থইথই পানিতে খাল হয়ে যেত। এই নালার পুব পাশে চদরিবাড়ির গাবগাছ আর বাঁশঝাড়।

ইন্নত মামাদের বড়ঘরের লাগোয়া ঝাপড়ানো একটা পেয়ারাগাছ। পেয়ারাকে বলি ‘গয়া’। গয়াগাছটা ঝুঁকে আছে নালার দিকে। বর্ষাকালে প্রচুর গয়া ধরে। সাইজে ছোট। ওপর থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু ভিতরটা টকটকে লাল। পেকে নরম হয়ে থাকে। দারুণ মিষ্টি। ইন্নত মামার মায়ের জন্য গয়াগাছে কেউ হাত দিতে পারে না। পাড়ার ছেলেমেয়ে ওদিকটায় গেলে লম্বা কঞ্চি হাতে তেড়ে আসেন। বুড়ি যেন সারাক্ষণ গয়াগাছটাই পাহারা দিচ্ছেন।

আলমগীর মামা ওই অবস্থায়ই বুড়ির চোখ ফাঁকি দিয়ে দু-একবার গয়া চুরি করেছে। ধরা পড়ে বেদম গালাগাল খেয়েছে। তার পরও সাধ মেটেনি। বর্ষাকালের একদিন দুপুরের পর মেজো নানা খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে আছেন। সেদিন বৃষ্টি ছিল না। শ্রাবণ শেষের ঝকঝকে রোদ। আলমগীর মামা এসে বলল, ‘ল মামু, যাই এক জাগায়। ’

আমি অবাক! ‘কই?’

‘আরে বেডা, ল আমার লগে। ’

‘কেমনে যাবি?’

‘কোষা লইয়া যামু। ’

বুঝলাম নানার ঘুমের সুযোগটা আলমগীর নিচ্ছে। গেলাম তার সঙ্গে। কোষানাওয়ের আগা-পাছায় বসেছি দুজনে। হাতে বইঠা। চদরিবাড়ির গাবগাছের ওদিকটা দিয়ে অতি সাবধানে কোষানাও ইন্নত মামাদের গয়াগাছটার তলায় নিয়ে এলো আলমগীর। ফিসফিস করে বলল, ‘গয়া চুরি করুম। ’

ইন্নত মামার মাকে সে বলে কাকি। বলল, ‘হুনছি, কাকির জ্বর। ঘর থিকা বাইর অয় না। ’

এদিকটায় আসার পর থেকেই আমার বুক কাঁপছে। ধরা পড়লে নিশ্চয় বুজির কাছে বিচার যাবে। দুষ্টু ছেলে হিসেবে সেই বয়সেই আলমগীরের খুব নামডাক। কিন্তু আমি তো নিরীহ গোবেচারা। সাহস বলতে গেলে নেই। তার পরও এসে যখন পড়েছি, আর তো কিছু করার নেই। জবুথবু হয়ে বইঠা নিয়ে বসে রইলাম। গয়াগাছটা এত ঝাপড়ানো আর পানির দিকে এমনভাবে ঝুঁকে আছে, গাছটার ডালপালার তলায় গেলে ছোট কোষানাও সহজে কারো চোখে পড়বে না। আলমগীর মামা পটাপট গয়া ছিঁড়তে লাগল। পেকে সাদা হয়ে আছে কোনো কোনো গয়া। ছিঁড়ছে আর নৌকার ‘ডরায়’ রাখছে। কামড়ে কামড়ে খাচ্ছেও। আমাকেও ইশারায় খেতে বলছে। একটা গয়া নিয়ে মাত্র কামড় দেব, তখনই পাটাতন ঘর থেকে কঞ্চি নিয়ে লাফ দিয়ে নেমে এলো বুড়ি। ‘কোন গোলামের পোয় রে গয়া চুরি করে? খাড়া!’

বুড়িকে দেখে আমার আর গয়ায় কামড় দেওয়া হলো না। ওই বয়সে আলমগীর মামা বিরাট পাকনা। গয়াগাছের ডালে ধাক্কা দিয়ে কোষানাও বের করে আনল খোলা জায়গায়। আমরা দুজন নৌকাবাইচ দেওয়ার ভঙ্গিতে বইঠা চালাতে লাগলাম। বুড়ি আমাদের চিনতে পারল না। নৌকা নিয়ে চলে এলাম নোয়াব আলী নানার ছাড়াবাড়ির পুব দিকটায়। আলমগীর মামা তখন হাসছে। ‘ধরা পড়ি নাই, মামু। খা, গয়া খা। ’

‘তুই না কলি বুড়ির জ্বর!’

‘হুনছিলাম তো জ্বর। ’

‘তয়?’

‘তয় আর কী? জ্বর মনে অয় ভালো অইয়া গেছে। গয়া খা। ’

দুজনে বসে বসে মনের আনন্দে গয়া খেলাম। যেখানটায় বসেছিলাম তার পশ্চিম পাশে নোয়াব আলী নানার ছাড়াবাড়ি। পুব পাশে ছমেদ খাঁ নানার বাড়ির উত্তরের শরিকের সীমানা। বিধবা বয়স্কা মহিলার একটা মাত্র বড় টিনের ঘর। তার মেয়ের নাম বেগম। আমাদের বাড়ির লোকেরা তাকে ডাকে ‘বেগির মা’ বলে। তার ছেলের নাম হাশেম। হাশেমের মা বলে কেউ ডাকে না। তার উঠানের দক্ষিণ পাশে বড় একটা কতবেলগাছ ছিল। প্রচুর কতবেল ধরত গাছটায়। তবে সেই কতবেলে কেউ হাত দিতে পারত না। ইন্নত মামার মা যেভাবে আগলে রাখত তার গয়াগাছ, বেগির মাও ঠিক সেইভাবে আগলে রাখত তার কতবেলগাছ। এত কতবেল দিয়ে কী করত জানি না!

নোয়াব আলী নানার ছাড়াবাড়িটা আমাদের খুব প্রিয় ছিল। প্রচুর আমগাছ বাড়িটায়। এত মিষ্টি একেক গাছের আম, কী বলব। তবে ওই বাড়িতে আমরা আম কুড়াতে যেতে পারতাম না। কালু মামা, সৈয়দ মামা আর সুরাইয়া খালা আমরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই নিজেদের ছাড়াবাড়িতে গিয়ে গাছতলায় পড়ে থাকা আম কুড়িয়ে নিত। আমের দিনে সারা দিনই কেউ না কেউ বাড়িটা পাহারা দিত। বাড়ির পুব-দক্ষিণ কোণে ডিঙি নৌকার মতো বাঁকা হয়ে আছে একটা খেজুরগাছ। বহু পুরনো গাছ। খেজুর ধরত না, রসও হতো না। খরালিকালে দুপুরের দিকে ওই গাছটায় পা ঝুলিয়ে বসে আমরা আড্ডা দিতাম। একটা মান্দারগাছ ছিল পাশেই। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে টকটকে লাল মান্দার ফুলে গাছটা ঝলমল ঝলমল করত। ভারি সুন্দর লাগত দেখতে।

হাজামবাড়ির মজিদের কথা আমি অনেকবার লিখেছি। খুবই প্রাণবন্ত, উচ্ছল আর গল্পবাজ যুবক ছিল। মণীন্দ্র ঠাকুরের ‘গোমস্তা’ হিসেবে কাজ করত। গোমস্তা শব্দের অন্য অর্থ আছে। জমিদারদের কাছারি সংশ্লিষ্ট এক ধরনের কর্মচারীকে গোমস্তা বলা হতো। তারা মূলত জমিদারদের খাজনা আদায়ের কাজ করত। কিন্তু বিক্রমপুরে কোনো কোনো এলাকায় বাড়ির কাজের লোক বা চাকরকে গোমস্তা বলা হয়। বর্ষাকালে গ্রাম-গ্রামান্তরে ঠাকুরের ছইওয়ালা নৌকা বেয়ে যেত মজিদ। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরা মণীন্দ্র ঠাকুর নৌকার ভিতর দেবদূতের মতো বসে থাকতেন। ফিরতে সন্ধ্যা বা রাত্র হয়ে গেলে, রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হলে মজিদকে নিয়ে ঠাকুর সেসব বাড়িতে থেকেও যেতেন। হিন্দু মুসলমান বলে কথা নেই। চারপাশের সব গ্রামের, সব বাড়িতেই ঠাকুরের ছিল অবাধ যাতায়াত। তাঁকে খুবই সম্মান করত সবাই।

খরালিকালে মণীন্দ্র ঠাকুরের ডাক্তারি ব্যাগটা বহন করত মজিদ। বর্ষার শুরুতে পাথালি কোলে করে ঠাকুরকে কখনো কখনো অল্প পানির খালও পার করাত। হিন্দু ব্রাহ্মণ চড়ছে প্রায় অচ্ছুত হাজাম যুবকের কোলে। এই নিয়ে মণীন্দ্র ঠাকুরের কোনো মাথাব্যথা ছিল না।

সন্ধ্যার দিকে প্রায় রোজই মজিদ আমাদের বাড়িতে আসত। অন্য কোনো শরিকের ঘরে তেমন যাতায়াত নেই। এসে বসত আমাদের বড়ঘরের বারান্দায়। তারপর হাসি মজায় মাতিয়ে রাখত আর কিচ্ছা কইত। কত রকমের যে কিচ্ছা! গা-ছমছমে ভূতের গল্প। আব্বার দেওয়া সিন্দাবাদের সেই বইটি প্রায়ই আমাকে পড়তে দেখে মজিদ। ঠাকুরকে সে ডাকে কর্তা। একদিন আমাকে বলল, ‘কর্তার কাছে ম্যালা ভূতের গল্পের বই। কলে না গেলে দোফরবেলা কর্তায় শুইয়া শুইয়া অইসব বই পড়ে। তুই একদিন অই টাইমে আয় মিলু। গল্পের বই চাইলে কর্তায় তরে পড়তে দিব। ’

শুনে আমার আনন্দ আর ধরে না। দুদিন ওই সময় গেলাম ঠাকুরবাড়িতে। গিয়ে ঠাকুরকে পেলাম না। তাঁর ফিরতে ফিরতে বিকেল হবে। তৃতীয় দিন পেলাম। ‘মইজ্জাদা’ শিখিয়ে দিয়েছিল কিভাবে বই চাইতে হবে। পশ্চিম দিকে মাথা দিয়ে চৌকিতে শুয়ে আছেন ঠাকুর। সাদা ধুতি আর কোরা রঙের কনুই পর্যন্ত হাতাওয়ালা গেঞ্জি পরা। চিত হয়ে শুয়ে বই পড়ছেন। পইতা ঝুলে পড়েছে গলার একপাশে। আমি গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়ালাম। আদাব দেওয়ার নিয়ম শিখিয়েছিলেন বুজি। আদাব দিলাম। তিনি বই সরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। ‘কিরে মিলু, খবর কী?’

কথায় কথায় ‘নিকি’ শব্দটা বলতেন ঠাকুর। মূল শব্দটা হচ্ছে ‘তাই নাকি’। বললাম, ‘আমারে একটা গল্পের বই দেন, দাদা। ’

চমকে বিছানায় উঠে বসলেন ঠাকুর। ‘তুই এতডু পোলা, গল্পের বইয়ের বোজচ কী?’

‘হ, আমি গল্পের বই পড়ি। আব্বায় একটা সিন্দাবাদের বই কিন্না দিছে। ’

ঠাকুর অবাক! ‘নিকি?’

‘হ। পড়তে পড়তে বইটা আমি মুখস্থ কইরা ফালাইছি। ’

‘নিকি? এইডা তো খুব ভালো কথা। বই পড়ন খুব ভালো। খুশি হইলাম শুইন্না। ’

তার পরেই মজিদকে ডাকলেন তিনি। ‘ওই মইজ্জা, এই ঘরে আয়। ’

মইজ্জাদা ছিল রান্নাঘরে। সেখান থেকে ছুটে এলো। ঠাকুর উত্ফুল্ল গলায় বললেন, ‘মিলু তো গল্পের বই চায় রে। দিমু নিকি?’

মইজ্জাদা বলল, ‘দিতে পারেন। ’

‘বই নষ্ট করব না তো?’

মইজ্জাদা কথা বলার আগেই আমি বললাম, ‘না না, নষ্ট হইব না। আমার ইস্কুলের বইও কোনোটা নষ্ট হয় না। ’

‘নিকি? তুই পড়স কোন ক্লাসে?’

‘ক্লাস থ্রিতে। ’

ঠাকুর খুব খুশি। মইজ্জাদার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মিলুরে অই ভূতের বইডা দে। ’

মইজ্জাদা লেখাপড়া জানে না, কিন্তু ঠাকুরের বইগুলো চেনে। কোনটা ভূতের বই জানা আছে তার। বইগুলো থাক থাক করে রাখা থাকে ওষুধের আলমারির নিচের দিকে। সেখান থেকে চটপটে হাতে একটা বই বের করল। আমার হাতে দিল। ঠাকুর বললেন, ‘যা, এই বইডা পড় গা। ভালো বই। ’

সেই বইয়ের নাম এখনো আমার মনে আছে, ‘ভূতের মুখে রাম নাম’। বাচ্চাদের ছবির বইয়ের মতো বড় সাইজের বই। তেমন মোটা না। প্রচ্ছদে অদ্ভুত কিছু ছবি আঁকা। গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসে আছে নাক লম্বা ভূত। হাত-পা তেলাপোকার পায়ের মতো। তবে অনেক লম্বা। নখগুলো বাঁকা ও লম্বা লম্বা। এই ধরনের ছবি দিয়ে প্রচ্ছদ। বুকের কাছে ধরে সেই বই নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। তারপর আমার আর হুঁশজ্ঞান নাই কয়েক দিন। সারাক্ষণ ‘ভূতের মুখে রাম নাম’ পড়ছি। সন্ধ্যার দিকে মইজ্জাদা এসে খবর নেয় কয়টা গল্প পড়লাম। মইজ্জাদার সঙ্গে বুজি আর আম্মাও শুনতে চায় বইয়ের গল্পগুলো। পড়া গল্পগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে গুছিয়ে আমি ‘কিচ্ছা কওয়ার’ ভঙ্গিতে বলে যাই। খাটালে টিমটিম করে জ্বলছে হারিকেন। বারান্দার দিকটায় আবছা আলো-আঁধারি। ঘরের বাইরে তো ঝিঁঝি ডাকছেই, ঘরের ভিতরেও ডাকছে। সেসব গল্প বলার ফাঁকে ফাঁকে আমি লক্ষ করি, চারপাশে কী রকম একটা ভৌতিক পরিবেশ তৈরি হয়ে যাচ্ছে। গল্প বলতে বলতে নিজেই ভয় পাচ্ছি।

 

নয়.

হাজামবাড়িটা ছিল আমার খুব প্রিয় জায়গা। দক্ষিণমুখী বাড়িটায় ঢোকার মুখে একটা বরইগাছ। ছোট্ট উঠান পেরিয়ে বাঁশের বেড়ার বড়সড় করে একটা ঘর। টিনের চালা। পুব দিককার ছাইগাদার পাশে রান্নাচালা। একটা রোয়াইলগাছ। হলুদ-সবুজ ছোট ছোট রোয়াইল ফল গাছটার প্রায় গোড়া থেকে ধরত। অতি টক ফল। ওই ফলই আমরা কামড়ে কামড়ে খেতাম। এই ফলটার প্রকৃত নাম সম্ভবত ‘অরবরই’। সমরেশ বসুর ‘সুচাঁদের স্বদেশ যাত্রা’ উপন্যাসে রোয়াইলগাছের উল্লেখ পেয়েছিলাম। বিক্রমপুরের বিলডিহি গ্রামের পটভূমিতে দেশভাগের বেদনা নিয়ে লেখা।

হাজামবাড়ির কর্তার নাম সংসার আলী। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষ। বড়ঘরের ভিতর কিংবা উঠানের কোণে বসে তামাক টানত আর খকখক করে কাঁশত। দলা দলা কফ ফেলত যেখানে-সেখানে। কফের রং রোয়াইল ফলের মতো। পাঁচ ছেলে তার, আর চার মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছিল গোয়ালীমান্দ্রার ওই দিককার এক গ্রামে। সেই মেয়ে মাঝে মাঝে বাপের বাড়িতে নাইয়র আসত। মেজো মেয়ে অজুফা প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর। রবের মা। রবের বাবার নাম অখিলউদ্দিন। ভাঙাচোরা শরীরের অথর্ব ধরনের মানুষ। অজুফা যেমন স্বাস্থ্যবতী, অখিলউদ্দিন ঠিক তার উল্টো। এই ধরনের পুরুষকে গ্রামের লোকে বলে ‘ম্যাড়া’। মিশমিশে কালো গায়ের রং। তার রং পেয়েছে বড় ছেলে রব। শরীর পেয়েছে অজুফার মতো। অজুফার ছিল দুই ছেলে এক মেয়ে। অল্প বয়সে কয়েক দিনের জ্বরে মারা গেল সে। অখিলউদ্দিনকে সবাই ডাকে ‘অখিলা’। সে আবার বিয়ে করল। লোকটা আবাল গরু আর পাঁঠা তোলাবার কাজ করত। এই ‘তোলানো’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে তরুণ পুরুষ গরু আর পাঁঠার অণ্ডকোষ ফেলে দেওয়া।

সংসার আলীর বড় ছেলেটির নাম আবদুল। নরম নিরীহ মানুষ। মেজো ছেলে আজিজ মালটানা জাহাজে খালাসির কাজ করত। মজিদ মানে মইজ্জাদা মণীন্দ্র ঠাকুরের কাজের লোক। তারপর শফি আর হাফিজদ্দি। স্বামী নিয়ে বাপের বাড়িতেই থাকত অজুফা। আমাদের বাড়িতে ধানভানার কাজ করত। শফি, হাফিজদ্দি আর রব যখনই বুজি ডাকতেন, এসে বাড়ির কাজ করে দিয়ে যেত। সবই পেটেভাতে। অর্থাৎ নগদ টাকা-পয়সা কিচ্ছু নেই। কাজ করলেই দুপুরের ভাত। কোনো কোনো দিন তিন বেলার ভাত।

অভাব হাজামবাড়িতে লেগেই থাকত। অনেক দিন দুপুরের ভাত রান্না হতো না। মিষ্টি আলু সিদ্ধ করে পেট ভরাত বাড়ির লোক। যখন-তখন হাজামবাড়িতে যাই আমি। চৈত্র মাসের দুপুরের দিকে একদিন গিয়ে দেখি, রোয়াইলতলায় মাটির হাঁড়িতে মিষ্টি আলু সিদ্ধ হচ্ছে। মইজ্জাদার মাকে ডাকি আম্মা। ছোটখাটো রোগা-পাতলা মানুষ। মুখটা সব সময় বিষণ্ন। চুলার পাড়ে উদাস হয়ে বসে আছেন। উঁকি দিয়ে সিদ্ধ আলুর হাঁড়িটা দেখলাম। একগাদা সাদা আলুর মাঝখানে লাল রঙের একটা আলু। কিছু না ভেবে বললাম, লাল আলুডা আমি খামু। মহিলা দুঃখী মুখে হাসলেন, ‘খাইয়ো বাজান। ’ সত্যি সত্যি লাল আলুটা তিনি আমাকে দিলেন।

এই বাড়িতে গান-বাজনা হতো কোনো কোনো রাতে। জাহাজের কাজ থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছে আজিজ। আমি ছুটে গেছি। আইজ্জাদা হাসিমুখে ঘর থেকে বিস্কুট এনে দিল আমাকে, ‘খা মিলু। ’ বাড়ি আসার সময় তখনকার দিনে কিছু না কিছু খাবার সবাই নিয়ে আসত। সচ্ছল দিনে দক্ষিণের ভিটিতে একটা পাটাতন ঘর তোলা হয়েছিল এই বাড়িতে। পশ্চিম দিকটার কুঁড়েঘরটায় বউ নিয়ে থাকত আবদুল। এই ঘরের উত্তরে অনেকখানি খোলা জায়গা। তারপর বিশাল একটা বরইগাছ। কী যে বরই ধরত গাছটায়! বাড়ির সামনের গাছটায়ও ধরত অনেক। বরইয়ের দিনে হাজামবাড়িতেই দুপুরবেলাটা কেটে যেত আমার। লাল-হলুদ বরইয়ের ভারে গাছ দুটো নুয়ে পড়ত। তলার মাটিতে চাঙ্গাড়ি ভরা বরই শুকাতে দেওয়া হয়েছে। তার অদ্ভুত একটা গন্ধ ভাসছে বাতাসে। বরইতলায় মাটির অদ্ভুত একটা ঢিবি। ঢিবির মাঝখানটায় গর্ত। লেপেপুঁছে ঝকঝকে-তকতকে করে রাখা। হাজামবাড়ির লোকে বলত ওটা ‘মোকাম’। ‘মোকাম’ জিনিসটা কী এই জীবনে জানতে পারিনি।

সন্ধ্যাবেলা মোকামে কোনো কোনো দিন মোমবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হতো, আগরবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হতো। মোমের পোড়া সলতে আর পুড়ে শেষ হওয়া মোমের শেষ দিককার অংশ, আগরবাতির ছাই আর কাঠি পড়ে থাকত মোকামে। ভারি রহস্যময় ছিল মোকামটি।

এক নির্জন দুপুরে গেছি হাজামবাড়িতে। গিয়ে হাফিজদ্দি বা রবকে পেলাম না। ফাল্গুন মাস। শীতের দিন চলে গেছে। বইছে বসন্তকালের হাওয়া। হাজামবাড়ির উত্তর দিকটা রহার ছাড়াবাড়ি। নানা রকম গাছপালার সঙ্গে উত্তর-পুব দিককার নামার দিকে বিশাল একটা গাবগাছ। গাবতলায় গুলি খেলতাম আমরা। পুবে-পশ্চিমে পরিষ্কার আঙিনায় হাডুডু খেলা হতো বর্ষাকালে। ঘাসে ভরা ছোট্ট একটা মাঠ যেন ছাড়াবাড়ির আঙিনা। পশ্চিম দিকে আমাদের বড় পুকুর। পুকুরের দিকে ঝুঁকে আছে ছোটখাটো কিন্তু অনেক বয়স্ক একটা গয়াগাছ। কখনো কখনো দুপুরের দিকে সেই গয়াগাছতলায় একা একা গিয়ে দাঁড়াতাম। গভীর একাকিত্বে মনটা কেমন করত। পুকুরের কালো টলটলে জলে জট পাকিয়ে আছে কচুরিপানা। কচুরির নীল বেগুনি আর সাদা ফুল ভারি সুন্দর। কচুরিতলা থেকে ধীরে বেরিয়ে আসে অতিকায় এক গজার মাছ। যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে মাছটি। তারপর নিঃশব্দে শ্বাস ফেলে তলিয়ে যায়।

সেই দুপুরে ভারি মিহি আর সুন্দর স্বরে একটা পাখি ডাকছিল গাবের ঘন পাতার আড়ালে। অচিনপাখি। পাখির এ রকম ডাক সেদিনকার আগে কোনো দিন শুনিনি। উদাস আনমনা ভঙ্গিতে গাবতলায় গিয়ে দাঁড়াই। পায়ের কাছে পড়ে আছে শক্ত মাটির ঢেলা। কিছু না ভেবে তুলে নিয়েছি। আন্দাজেই ছুড়েছি পাখির ডাকের দিকে। কত অলৌকিক ঘটনা যে এই পৃথিবীতে ঘটে! কত বিস্ময়কর ঘটনা যে ঘটে! ঢিল মারার সঙ্গে সঙ্গে পাখির ডাক থেমে গেল। মৃদু খসখসে শব্দে কী যেন পড়ল পায়ের কাছে। তাকিয়ে দেখি অপূর্ব সুন্দর এক পাখি। বুকটা থ্যাঁতলানো। তার মানে কী? আমার ওই আন্দাজে মারা ঢিল গিয়ে ছোট্ট পাখির বুকে লেগেছে! পাখিটা আমি হত্যা করেছি! আমি হত্যাকারী! দুহাতে প্রার্থনার ভঙ্গিতে পাখি তুললাম। পাখির প্রাণ অনেক আগেই বেরিয়ে গেছে। মৃত পাখি দুহাতের তালুতে। আমি অপলক চোখে তাকিয়ে আছি পাখির দিকে। চোখের জল ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরছে পাখির গায়ে। সেই মৃত পাখি এখনো যেন কোনো কোনো নির্জন দুপুরে অচিন সুরে আমাকে ডাক দিয়ে যায়। কচুরিতলা থেকে গজার মাছটি বেরিয়েই যেন আমাকে ডাকে। বিলের বাড়ির শিমুলগাছটি ডাকে। মণীন্দ্র ঠাকুরের দক্ষিণ দিককার জানালায় ঝুঁকে ছিল আশ্চর্য রকমের এক গাছের চারা। সেই চারার সবুজ পাতারা আমাকে ডাকে। শরৎকালে পদ্মার তীর আচ্ছন্ন হয়ে যেত কাশফুলে। কোনো কোনো দিন গেছি সেদিকটায়। মাথার ওপর স্বচ্ছ নীল আকাশ। পদ্মা নদী বয়ে যায় আপন ছন্দে। কোথাকার কোন প্রান্ত থেকে আসে পাগল করা হাওয়া। সেই উতল হাওয়া এসে লাগে আমার জীবনতরণীতে। আলোছায়ার রহস্যময়তা থেকে মেদিনীমণ্ডল গ্রামটি পরম মমতায় আমাকে ডাকে। মিলু, ও মিলু, মিলুকর্তা...



সাতদিনের সেরা