kalerkantho

শনিবার । ২০ আগস্ট ২০২২ । ৫ ভাদ্র ১৪২৯ । ২১ মহররম ১৪৪৪

অ নু বা দ

‘দ্য রিভার’ নির্মাণকথা অথবা রেনোয়া ভারতস্মৃতি

♦ মূল : জ্যঁ রেনোয়া
♦ ভূমিকা ও অনুবাদ : রুদ্র আরিফ

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ২১ মিনিটে



‘দ্য রিভার’ নির্মাণকথা অথবা রেনোয়া ভারতস্মৃতি

জ্যঁ রেনোয়া [১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪—১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯]। ফরাসি মাস্টার ফিল্মমেকার। সিনেমার ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাববিস্তারী ফিল্মমেকারদের অন্যতম। নিজস্ব সিনে-ভাষার অধিকারী।

বিজ্ঞাপন

‘দ্য গ্র্যান্ড ইল্যুশন’, ‘দ্য রুলস অব দ্য গেম’, ‘নাইটস অ্যাট দ্য ক্রসরোডস’, ‘টনি’, ‘দ্য গোল্ডেন কোচ’, ‘পিকনিক অন দ্য গ্র্যাস’, ‘ইলেনা অ্যান্ড হার মেন’সহ বানিয়েছেন ৪০টিরও বেশি সিনেমা। ভারতে এসে, ভারতীয় প্রেক্ষাপটে বানানো ‘দ্য রিভার’ সিনেমা এই উপমহাদেশে ছড়িয়েছে তার নির্মাণদ্যুতির অন্যতর আলো। বলা বাহুল্য, ১৯৫১ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমার শুটিং খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন সত্যজিৎ রায়। ফিল্মমেকার হয়ে ওঠার পেছনে সত্যজিেক সেই অভিজ্ঞতা জুগিয়েছিল অপরিমেয় প্রেরণা, সে কথা নিজেই বলে গেছেন বারবার। যাহোক, ‘দ্য রিভার’ ঘিরে রেনোয়ার এই স্মৃতিগদ্য ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত তার ‘মাই লাইফ অ্যান্ড মাই ফিল্মস’ বই থেকে নেওয়া...

 

দ্য রিভার

একদিন একেবারেই ঘটনাচক্রে ‘নিউ ইয়র্কার’-এ একটা রিভিউ পড়ে বেশ কৌতূহল জাগল। ব্রিটিশ সাহিত্যিক রুমার গডেনের ‘দ্য রিভার’-এর রিভিউ। বিশ্বযুদ্ধ কাল থেকে প্রকাশিত সেরা উপন্যাসগুলোর একটি হিসেবে একে অভিহিত করেছিলেন রিভিউয়ার। বইটি পড়লাম। দারুণ লাগল। তা শুধু লেখার জাদুমন্ত্রের জন্যই নয়; বরং কাহিনিটি আমার কাছে এমন এক উঁচু মানের সিনেমার ভিত্তি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা জাহির করল, যে সিনেমা অন্তত হলিউডের ফিল্ম ম্যাগনেটদের কাছে সমাদর পাবে। কেননা, এই উপন্যাসে একটি রোমান্টিক প্রেক্ষাপটে দেখানো হয়েছে শিশুদের : বাচ্চা মেয়েগুলোর কাছে ভালোবাসার ধরা দেওয়া; সাপের প্রতি ভীষণ অনুরাগী এক ছোট্ট বালকের মৃত্যু; পিচ ফলের গাছে ঝুলে থাকা ফলের মতো নির্বোধ মর্যাদা নিয়ে ভারতে এক ইংরেজ পরিবারের জীবনযাপন; সবচেয়ে বড় কথা ভারতের স্বয়ং নিজ ইগজোটিক নৃত্যকলা ও পোশাক-পরিচ্ছদ—এই সব কিছু আমার কাছে একটি ভরসাজাগানিয়া নিরপেক্ষতার জায়গা হিসেবে ধরা দিল।

বুঝে গেলাম, আমার জন্য হলিউডের দরজা আবারও খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে—এমন এক কাহিনির খোঁজ পেয়ে গেছি। তাই আমার এজেন্টকে বলে দিলাম, যেন সিনেমার স্বত্ব কিনে নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘দ্য রিভার’কে বিকল্প হিসেবে ভাবেন। তিনি আমাকে নিরস্ত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেন। বললেন, ‘ভারত মানেই শুধু হাতি আর বাঘ শিকার; এর বাইরে তো কিছুই দেখি না। এই গল্পে কি বাঘ শিকারের প্লট আছে?’ এই তুরুপের তাসের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তাঁকে বললাম, যেন তিনি বেশ কয়েকটি স্টুডিওতে ‘দ্য রিভার’-এর প্রস্তাব নিয়ে ধরনা দেন এবং যেকোনো মূল্যে একটি অপশন নিশ্চিত করেন। আগ্রহ দেখাবেন—এমন সম্ভাব্য সব প্রডিউসারের কাছেই আমাকে ধরনা দেওয়ালেন তিনি; কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে একই জবাব : হাতি আর বাঘ শিকার ছাড়া ভারত তো আসলে ভারতই না! প্রায় হাল ছেড়ে দিয়ে আমি একদিন বেভারলি হিলসের এক দোকানদারের কাছে হাজির হলাম। কেননা, তিনি সিনেমাটি প্রযোজনা করার আগ্রহ দেখিয়েছেন।

অভাব ছিল শুধু মনের মতো একটা কাহিনি পাওয়ার। হাতি শিকারের কাহিনির প্রতি ম্যাকএলডাউনির ভীষণ আগ্রহ ছিল ঠিকই, কিন্তু সেটিই যথেষ্ট ছিল না। এক সন্ধ্যায় নিউ ইয়র্কের এক পার্টিতে এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে আলাপ হয় তাঁর। ওই নারী ছিলেন নেহরুর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। ওই নারীকে নিজের সমস্যার কথা জানালেন ম্যাকএলডাউনি। নারীটি তাঁকে পরামর্শ দিলেন, ভারত নিয়ে কোনো সিনেমা বানানোর ঘটনা নেহরুসহ ভারতের অন্য বিশিষ্ট নাগরিকদের ভীষণ খুশি করবে ঠিকই, তবে এটিকে একেবারে নিখাদ কোনো ভারতীয় কাহিনি হিসেবে বানিয়ে তোলার চেষ্টা না করাই বরং ভালো। কেননা, তাঁদের দেশের সমস্যা নিয়ে বোঝাপড়া করা বিদেশিদের পক্ষে সম্ভব—ভারতীয়রা তা বিশ্বাস করেন না। ওই নারী ম্যাকএলডাউনিকে প্রস্তাব দিলেন, যেন তিনি ‘দ্য রিভার’ উপন্যাসটি পড়েন। কেননা, কাহিনি ভারতের হলেও সেখানে একটি ইংরেজ পরিবারকে নিয়ে বোঝাপড়া করা হয়েছে।

ম্যাকএলডাউনি বইটা পড়লেন। যদিও সেখানে হাতি শিকারে যাওয়ার কোনো গল্প নেই, তবু তাঁর আশা ছিল, এই চমৎকার ধারণা নিশ্চয়ই কোনো না কোনোভাবে রুমার গডেনের লেখা ওই কোমল ও সহজসরল কাহিনির সঙ্গে মানিয়ে যাবে। তিনি একটা অপশন বা স্বত্ব কেনার চেষ্টা করতেই জানতে পারলেন, কোনো এক জ্যঁ রেনোয়া ইতিমধ্যেই সেটা কিনে রেখেছে! আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন তিনি। সিনেমাটি ডিরেকশন দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন আমাকে। জবাবে আমি শর্ত জুড়ে দিলাম চারটা : প্রথমত, দেশটা যেন নিজ চোখে দেখতে পারি, সে জন্য তিনি একটা ভারত ভ্রমণের সব খরচ আমাকে দেবেন; দ্বিতীয়ত, এই সিনেমার স্ক্রিপ্ট আমি উৎস উপন্যাসের লেখিকার সহযোগিতা নিয়ে লিখব; তৃতীয়ত, হাতি শিকারের কোনো বালাই থাকবে না এখানে; চতুর্থত, এডিটিংয়ের ক্ষেত্রে আমার কথাই হবে শেষ কথা। ম্যাকএলডাউনি মেনে নিলেন। আমরা যখন ‘দ্য রিভার’ বানাচ্ছিলাম, নিজের অনেক পছন্দের হাতি শিকারের শুটিং করার সর্বোচ্চ চেষ্টা তিনি করেছিলেন। সেই প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে এর বদলে তাজমহলের একটা মনোরম দৃশ্য দেখানোর চেষ্টা করলেন।

আমি আর দিনো [রেনোয়ার স্ত্রী] মিলে রুমার গডেনের সঙ্গে বসে সব কিছু ঠিকঠাক করতে চাইলাম, যেন কোনোমতেই ভারতীয়ের চেয়ে কম কিছু মনে না হয়। টেমস নদী লাগোয়া সরাইখানা ‘দ্য পারফেক্ট অ্যাঙ্গলারে’ আমাদের বসার ব্যবস্থা করে দিলেন সিনেমাটির সব কিছুর ব্যাপারে দারুণ উদ্যমী ম্যাকএলডাউনি। সেদিন থেকেই রুমার, দিদো ও আমার মধ্যে দ্রুত বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। যেন একসঙ্গে স্ক্রিপ্টের প্রাথমিক খসড়ার কাজ করতে পারি, সে জন্য রুমার চলে এলেন হলিউডে, আমাদের সঙ্গে থাকবেন বলে। তারপর, ভারতের আমাদের প্রথম সফরের পর সেই অভিজ্ঞতার আলোকে দ্বিতীয় খসড়া সাজিয়ে তোলার জন্য দিদো আর আমি গেলাম ইংল্যান্ডে। রুমার গডেনের শৈশব কেটেছে যেখানে, সেখানে ঘুরলাম আমরা।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার, প্রথম সফর থেকে আমি জানতে পেরেছিলাম, ব্রিটিশদের প্রতি ভারতীয়দের এমন বিরক্তির কারণ। ব্রিটিশরা তাদের দেশ দখল করে নিয়েছিল বলেই নয়, বরং ব্রিটিশরা তাদের উপেক্ষা করেছিল বলেও। ব্রিটিশরা তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করত, যেন ভারতীয়দের কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ মানুষে মানুষে যোগাযোগের প্রতি, আন্তরিকতার ভেতর জীবন কাটানোর প্রতি কামনা রয়েছে ভারতীয়দের।

আমি প্রেমে পড়ে গেলাম নদীর পারে গড়ে ওঠা মন্দিরের সিঁড়িগুলোর, শাড়ি পরিহিত প্রাণবন্ত নারীদের। ভারতীয়দের সংগীত ও নৃত্য সম্পর্কে জেনে, এবং অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের প্রতি তাদের একান্ত আকুলতা টের পেয়ে আমি বিমোহিত হয়ে গেলাম। তবে একজন ফিল্মমেকার হিসেবে আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করল ভারতীয় রঙের বাহার। মনে হলো, কালার ফটোগ্রাফির ব্যবহার সম্পর্কে আমার যা তত্ত্ব, সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ ঘটানোর এ এক সুবর্ণ সুযোগ। রঙিন সিনেমা বানানোর আকাঙ্ক্ষা আমার বহুকালের; যদিও মনে করি, সাদাকালোর রয়েছে সিনেমাকে বিমূর্ত বৈশিষ্ট্য এনে দেওয়ার নিজস্ব সম্ভাবনা। এর এমনই এক সুবিধা রয়েছে, যার ফলে এটি কখনোই বাস্তবধর্মী হয়ে উঠবে না : তা আমাদের বাহ্যিক পৃথিবী রঙিন—এ আমরা পছন্দ করি কিংবা না করি। রং ব্যবহারে আমার ক্ষেত্রে যে মূল সূত্র কাজ করে, তা হলো—ল্যাবরেটরি ইফেক্ট এড়িয়ে চলা। যা দেখানো হচ্ছে, সেই দৃশের সঙ্গে সবচেয়ে ভালো মানানসই কোনো ল্যান্ডস্কেপ কিংবা সেটে ক্যামেরা বসানোটাই সমস্যা। অন্যভাবে বললে, কোনো স্পেশাল ফিল্টার ব্যবহার না করা কিংবা রি-টাচিং না দেওয়া। আমার দ্বিতীয় নিয়মটি ছিল—আউটডোরে শুটিংয়ের সময় কালারিংয়ের অনেক বেশি সূক্ষ্ম সেট পড়ে—এমন ল্যান্ডস্কেপ এড়িয়ে যাওয়া। যদিও সবচেয়ে নিখুঁতভাবে তৈরি লেন্সের চেয়েও মনুষ্য চোখ অনেক বেশি শ্রেয়, তবু আমাদের সামনে প্রকৃতির জাহির করা শেডগুলোকে আলাদাভাবে শনাক্ত করতে গিয়ে এখনো আমরা হিমশিম খাই। অন্যদিকে কৃত্রিম চোখটি, অর্থাৎ ক্যামেরা শুধুই স্বস্তিদায়ক ফল এনে দিতে পারে, যদি আমরা একে সাদামাটা সমস্যার সামনে ঠেলে দিই। যেমন ধরুন, ইলে-দু—ফ্রান্সের [ফ্রান্সের একটি অঞ্চল] গ্রামাঞ্চলে দেখা মেলে রক্ত-আভার অগুণতি রঙের মিশ্রণ, যা থেকে ক্যামেরা আমাদের জন্য শুধু একটি বিকৃত উপস্থাপনাই তুলে আনতে পারে। কিন্তু অন্যদিকে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বৃক্ষরাজি আমাদের সামনে রঙের একটি সীমিত ভাণ্ডার হাজির করে : সেখানে সবুজ মানে আসলেই সবুজ, লাল মানে আসলেই লাল। এ কারণেই গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অনেক দেশের মতো বাংলাও কালার ফটোগ্রাফির জন্য বেশ উপযুক্ত জায়গা। এখানকার রং না অতি বিবিধ, না মিশ্রিত। এ ক্ষেত্রে মেরি লরেনসিন, কিংবা দুফি, কিংবা আরো যদি বলি মাতিসের পেইন্টিংয়ে রঙের লঘু ব্যবহারের কথা ভাবতে পারেন কেউ। ভারতীয় (তৎকালীন) পতাকার সবুজ ও লাল রং অন্যান্য দেশের লাল-সবুজ পতাকার রঙের চেয়ে আলাদা।

‘দ্য রিভার’-এর শুটিং করার সময় আমরা আধা-আভার খেয়াল রেখেছিলাম। আমাদের একটি দৃশ্যের রি-পেইন্টেড সবুজ রঙের বনভূমিতে লরিকে [প্রডাকশন ডিজাইনার ইউজেন লরি] প্রচুর খাটতে হয়েছিল। বাড়িঘর, পর্দা, আসবাবপত্র, পোশাক— কোনো কিছুই আমাদের নজর এড়ায়নি। শেষেরটির প্রশ্নে, কাজটা বরং সহজ ছিল : সাদার, আদর্শভাবে সাদামাটা রঙের প্রতি সহজাত অনুরাগ আছে ভারতীয়দের। তবে স্বয়ং নদীটি নিঃসন্দেহে ছিল আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে; তাই ব্যাকগ্রাউন্ডের সঙ্গে মানানসই ক্লোজআপ শট নিতে হয়েছে।

‘দ্য রিভার’ হলো বাংলায় কাটানো এক ইংরেজ পরিবারের জীবনের গল্প—যে গল্পের কোনো শুরু কিংবা শেষ নেই; বরং এ যেন কোনো ধরনের গল্প তৈরি করে তোলার প্রচেষ্টা ছাড়াই একদল লোকের জীবন থেকে নেওয়া টুকরা টুকরা অংশের সন্নিবেশ। আর এই ফ্রেমওয়ার্ক বস্তুত বিষয়বস্তুটির পরিধিকে করে দিয়েছে সীমাবদ্ধ। আমি একে বিশ্বাসযোগ্যরূপে বানিয়ে তুলতে চেয়েছি। আর সেটাই ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা। ভারত সম্পর্কে আমি জেনেছিলাম দারুণ কিছু বই, বিশেষ করে ফর্স্টারের ‘অ্যা প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’ থেকে; কিন্তু ভারতীয় মানুষদের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না। এ ক্ষেত্রে আরো একবার আমার কাছে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিল দূরদর্শিতা। আমরা ভারত গিয়ে পৌঁছতেই আমার ভাতিজা ক্লুদ [ফিল্মমেকার ক্লুদ রেনোয়া] প্রডিউসারকে জ্বালাতন করতে শুরু করল মোবাইল ইলেকট্রিক্যাল ইকুইপমেন্টের ব্যাপারে, যেন জেনারেটর ও আর্ক-লাইট-প্রটেক্টর দিয়ে কাজ শুরু করা হয়। এগুলো লন্ডন থেকে কেনার সিদ্ধান্ত নিলেন ম্যাকএলডাউনি। আশা করলেন, সিনেমার কাজ শেষ হওয়ামাত্রই আবার বেচে দিতে পারবেন। কিন্তু যে জাহাজে যন্ত্রপাতি লোড করা হয়েছিল, সেগুলো আনলোড করার নির্দেশ দেওয়া হলো, ইন্দোচীনের জন্য অস্ত্রবাহী একটি কার্গো নেওয়ার জন্য। তখন ফ্রাঙ্কো-ইন্দোচীনা যুদ্ধ চলছে। ফলে লন্ডন থেকে কলকাতায় অস্ত্র নেওয়ার চলছিল হুল্লোড়। আমি ছুটে গেলাম আমার নিজের গ্রাম কাইন্যের দুই তরুণের কাছে—যাঁরা একটা বিমান কিনে এই অবৈধ বাণিজ্য থেকে টাকা কামিয়ে নিচ্ছিলেন। লং-ডিসটেন্স নেভিগেশনাল ইকুইপমেন্টের জন্য তাঁদের বিমানটি উপযুক্ত ছিল না। ‘তবে একটা কাজ করতে পারেন,’ বললেন তাঁরা। ‘গঙ্গা ব-দ্বীপে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত আপনাকে শুধু হিমালয় অনুসরণ করে আগাতে হবে; তাহলেই পৌঁছে যেতে পারবেন। ’ তাঁদের অস্ত্রগুলো ফরাসি নাকি ইন্দোচীনাদের উদ্দেশ্যে যাচ্ছে, সেটা আমি কখনোই জানতে পারিনি।

মেশিনগানের বাইরে অন্য কোনো কিছু পরিবহন করতে রাজি—এমন জাহাজের সন্ধান পেতে দীর্ঘ দুই মাস লেগে গেল মাকএলডাউনির। এই ফাঁকে আমি একটা জরিপ চালানোর সময় পেলাম, রুমার গডেনকে সঙ্গে নিয়ে, ‘দ্য রিভার’ প্রেক্ষাপটের গ্রামাঞ্চলে। আমাদের দলের আরেক সদস্য ছিলেন রুমারের ছোট বোন ন্যান্সি। ম্যালেরিয়ার একটি প্রতিষেধকের উৎপাদনকারী এক ইংরেজের স্ত্রী তিনি। ন্যান্সি ছিলেন দারুণ অশ্বারোহী। তবে উঁচু থেকে আরো উঁচুতে লাফানোর লোভ সামলাতে না পারার কারণে তাঁকে প্রচুর সময় হাত-পা ভেঙে, প্লাস্টার-ব্যান্ডেজে মোড়ানো অবস্থায় কাটাতে হয়েছে জীবন। অবশ্য বাংলা ভাষাটা নিখুঁত জানতেন তিনি। অশ্বপালদের কাছে শোনা গল্প আমাদের এসে শোনাতেন। হিন্দু আত্মা সম্পর্কে একটা গল্প শোনালেন একদিন : নির্দিষ্ট করে ‘হিন্দু’ বলার কারণ, মুসলমানদের ক্ষেত্রে এ গল্প প্রযোজ্য বলে মনে হয় না আমার। একবার সোয়েটার চুরির অভিযোগ তোলা হয় এক হিন্দু চাকরের বিরুদ্ধে। সেই সোয়েটার পাওয়া গিয়েছিল তার কুঁড়েঘরে। চুরির অভিযোগ অস্বীকার করেন অভিযুক্ত। তার মেমসাহেব তাকে বিশ্বাস করতে রাজি না হওয়ায় বলেন, ‘আপনি আমাকে অবিশ্বাস করলে ১৪ দিনের মধ্যে আমার মরণ ঘটবে। ’ ঠিকই তিনিই মারা গিয়েছিলেন। তার সেই মৃত্যুর কোনো বস্তুগত কারণ উদঘাটন করা যায়নি।

হিন্দুদের ওপর আলাদা আলো ফেলার মতো আরো আনন্দদায়ক একটি গল্পও রয়েছে। কলকাতার অনেকটা উপশহর হিসেবে, হুগলি নদীর পাশে গড়ে ওঠা ছোট্ট শহর চন্দননগর তখনো ফরাসিদের দখলে। এমনকি সেখানকার নিজস্ব গভর্নরও ছিল। গভর্নর বলতে, ক্যারিয়ারের যাত্রা শুরু করা এক তরুণ কূটনীতিক। তিনি আমাকে বলেছেন, মাস কয়েক আগে তাকে ‘অচ্ছুত’ কেন্দ্রিক একটা বিদ্রোহ সামাল দিতে হয়েছে। গভর্নরের প্রাসাদে একটি আধুনিক জলাধার গড়ে তোলা নিয়ে এর সূত্রপাত। তখনো ‘অচ্ছুত’ বলা হতো যাদের, তাদের কাজ ছিল মূত্রধানী সাফ করা। এটি একচেটিয়াভাবে এই ‘জাতে’র মানুষের জন্য নির্ধারিত কাজ। বিদ্রোহের ঘটনার পর সেই একচেটিয়া প্রথার বিলুপ্তি ঘটেছে। প্রাসাদটিকে ঘিরে ফেলেছিল সহিংসতার হুমকি দেওয়া একদল ক্রুদ্ধ মানুষ। তবে গভর্নর একটা প্রণোদনা দিয়েছিলেন : তিনি কথা দিয়েছিলেন, শুধুমাত্র ‘অচ্ছুত’ই পারবে ওই জলাধারের ছিপি টানার অধিকার।

অবশ্য আমার টিমে থাকা ভারতীয় সদস্যরাই আমাকে ভারত সম্পর্কে জানতে-বুঝতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছেন; বিশেষ করে আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট হরি দাশ গুপ্ত। তিনি আমাকে তাঁর পরিবারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। শিক্ষিত ভারতীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটা নমুনা ছিল; তাঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন অধ্যাপক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সরকারি কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন স্বাধীন পেশাজীবী। মেয়েদের অনেকেই শান্তিনিকেতন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঠাকুরের গড়া। সেখানে ভারতীয় আচারনিষ্ঠতার পাশাপাশি পশ্চিমা সংস্কৃতি বিষয়েও পড়ানো হতো। আর সে প্রচেষ্টা দারুণভাবে সফল হয়েছে। বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম চিরকাল জড়িয়ে থাকবে। কেননা, বাংলাকে ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে তার অবধান অনস্বীকার্য।

সে সময়ে ভারতে গুপ্ত ছিল খুবই কমন নাম; বিশেষ করে কলকাতার উত্তর দিকের রাজ্য বিহারে। সম্রাটদের একটি রাজবংশের অংশ এটি—যারা পৃথিবীকে দুটি অমূল্য সম্পদ দান করেছে : ভাস্কর্যের এক গুরুত্ববহ সংগ্রহ—আমার মতে সেরা সব ভারতীয় ভাস্কর্য; দ্বিতীয়ত, লর্ড সিদ্ধার্থ গৌতম, যিনি বুদ্ধ নামে পরিচিত। এ কারণেই আমার টিমে আরো একজন গুপ্ত ছিলেন, রাম সেন গুপ্ত, আমাদের অপারেটর। না, তিনি হরির আত্মীয় নন। সিনেমাটির জন্য উপযুক্ত কি না—শিশুদের পরখ করে দেখছিলাম আমরা। মেশিনিস্ট অপারেটিং ক্ল্যাপার নিজে থেকেই আমাদের দেখালেন, কী অসাধারণ রকমের দ্রুততায় আপটেক পাওয়া সম্ভব; ক্লুদ কী ভাবছে—তা আন্দাজ করে, ক্লুদের সিগনাল পাওয়ার আগেই লাইট পজিশন ঠিক করে ফেললেন। এ কাজ করার দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন, সেই ইলেকট্রিশিয়ানরা সাধারণত ক্লুদের সিগনালের অপেক্ষায় থাকতেন।

নৃত্যশিল্পী রাধার দেখা আমরা পেয়েছিলাম পবিত্র বেনারস শহরে। তার ভবিষ্যৎ স্বামী রেমন্ড বার্নিয়ারের সঙ্গে আমাদের দেখা হয় কলকাতার তখনকার ফ্রেঞ্চ কালচারাল অ্যাটাচি ক্রিস্টিন বোজেনানেকের বাসায়। এখানকার ইকোল ফ্রঁসেজে আমাকে একটা লেকচার দিতে বলেছিলেন তিনি। দেখা হতেই রেমন্ড আমাদের ক্রিসমাসের দাওয়াত দিলেন তাঁর বেনারসের প্রাসাদতুল্য বাসায়। ভারতের প্রতি তাঁর রয়েছে অপার অনুরাগ। হিন্দু ধর্ম গ্রহণের কথাও ভেবেছিলেন। হিন্দু ফ্যাশন মেনে টিকলি রেখেছেন মাথায়। তাঁর দ্বিধা ছিল একটি ব্যাপারেই—উঁচু জাতে না জন্মানো; ফলে তাঁকে হয়তো ‘অচ্ছুত’ হিসেবেই গণ্য করা হবে। তাঁর বাড়িতেই অ্যালাঁ দানিয়েলুর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। ভারত সম্পর্কে দারুণ জ্ঞান ছিল ওই সংগীততাত্ত্বিকের।

রাধা আমাকে ‘কথাকলি’ নাচ, এবং মাদ্রাজ অঞ্চলের সংগীত সম্পর্কে সার্বিকভাবে জানালেন। তিনি সেখানকারই মানুষ। তাঁর বাবা ছিলেন থিওসফিক্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট। রাধার ব্যক্তিত্ব আমাকে ও ক্লুদকে ভীষণ উত্ফুল্ল করল। তাঁর সঙ্গে তিন-চার দিন কাটানোর পর আমরা ঠিক করলাম, মেলানি চরিত্রে তাঁকেই অভিনয় করতে বলব। কথাটা শুনে ম্যাকএলডাউনি প্রথমে আঁতকে উঠলেন। ভাবলেন, এ একেবারেই খ্যাপাটে আইডিয়া : রাধার যে সৌন্দর্য্য, সেটা পশ্চিমা চোখে সহজে ধরা পড়ার নয়। ম্যাকএলডাউনিকে আমরা নিয়ে গেলাম রাধার নাচ দেখাতে। তিনি আর আপত্তি তুললেন না। এসব প্রাথমিক কাজ রেমন্ড বার্নিয়ারের বাড়িটিতেই ঘটেছে।

যার ওপর পুরো সিনেমাটি নির্ভর করবে— সেই হ্যারিয়েট চরিত্রটির জন্য ছোট্ট এক বালিকার দরকার ছিল আমাদের। হলিউডের যেকোনো তারকাই যেহেতু ম্যাকএলডাউনির আর্থিক সাধ্যের বাইরে, তাই তিনি আমাকে স্থানীয় স্কুলছাত্রীদের মধ্য থেকে কাউকে খুঁজে নিতে বললেন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলেন। শতাধিক আবেদনকারী এলো। বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আমি আমার অভ্যস্ত পদ্ধতি অনুসরণ করলাম : কোনো ধরনের অভিনয়ের চেষ্টা না করে লিখিত কয়েকটা বাক্য পড়তে দিলাম তাদের। এ ক্ষেত্রে শেকসপিয়ারের কোনো সনেটের চেয়ে বরং সংবাদপত্রের আর্টিক্যালই ভালো কাজে দেয়। বেশ কয়েকটি এলিমিনেটিং রাউন্ড শেষে বিজয়ী হলো প্যাট্রিসিয়া ওয়াল্টারস। স্থানীয় ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর নিয়ে কাজ করা এক কর্মীর মেয়ে।

মেয়েটির সার্বিক চেহারা, আচরণ ও কথা বলার ধরন ভারতে জন্মানো ও বেড়ে ওঠা কোনো ছোট্ট ইংরেজ বালিকার মতোই। শারীরিক গড়নেও সে ঠিকঠাক। চরিত্রটির জন্য অ্যামেচার অভিনেত্রী বেছে নেওয়াটা ছিল আমি যাকে বাহ্যিক সত্য বলে ডাকি, সেটার বিকল্পকে বিসর্জন দেওয়ার নামান্তর। আর এ কারণেই ক্যাপ্টেন জনের চরিত্রে টম ব্রিনকে বেছে নিয়েছি। উপন্যাসে আছে, চরিত্রটি যুদ্ধে তার এক পা হারিয়েছে, এবং পরিণামে আসা শারীরিক অক্ষমতাকে মেনে নিতে পারছে না। বেশ কয়েকজন হলিউড অভিনেতাকে নিয়ে আমি চেষ্টা চালিয়েছিলাম। কিন্তু তাদের ভেতর পেয়েছিলাম নিরস রকমের অতিরঞ্জনের দেখা। এমনকি মারলন ব্র্যান্ডোর সঙ্গেও কথা বলেছিলাম। কিন্তু ব্র্যান্ডো তখন তার ক্ষমতার উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত এবং তার উপস্থিতি এই সিনেমাকে এলোমেলো করে দিতে পারত। সেই তুখোড় অভিনেতাকে নিতে না পারার অনুতাপ নিয়ে আমি টম ব্রিনকেই চূড়ান্ত করলাম, যিনি বাস্তব জীবনেও যুদ্ধে হারিয়েছেন এক পা।

‘দ্য রিভার’কে দেখতে আমার সবচেয়ে সুনির্মিত সিনেমাগুলোর একটি বলে মনে হওয়ার কারণ, এটি প্রকৃতির ভীষণ নিকটবর্তী। আরেকটি কারণ, ওই লোকগুলোর কাজ সম্ভবত অপ্রত্যাশিত ফলাফল এনে দিয়েছিল। শৈশব, প্রেম ও মৃত্যু—এসব স্মরণাতীত থিমের ওপর ভিত্তি করে যদি আমরা কাহিনিটি দাঁড় না করাতাম, তাহলে এই সিনেমাকে দেখতে ডকুমেন্টারির মতো লাগত।

আমরা নদীর কাছের একটা বাগানবাড়িতে বাড়ি বানিয়ে নিয়েছিলাম, যেখানে সিনেমার প্রায় সব অংশেরই শুটিং করেছি। ওই জায়গার মালিকানা ছিল এক মহারাজ পরিবারের। রানি ভিক্টোরিয়া তাঁর ভারতীয় সাম্রাজ্যের মসনদ কলকাতা থেকে নয়াদিল্লিতে বদলি করেছিলেন, ওই পরিবার সে সময়ে জায়গাটি খালি করে দিয়েছিল। এর একটা রুমে বসে রুমার গডেন তার সামনে হাজির করা নতুন উপাদানগুলো একেক করে হজম করছিলেন এবং নিজস্ব মার্জিত ভাষায় কাহিনিতে সেগুলো জুড়ে দিয়েছিলেন। শিশুদের চরিত্রে অভিনয় করা বালক-বালিকাদের প্রশিক্ষণও দিয়েছিলেন তিনি। ওদের নাচিয়েছেন, ওদের দিয়ে করিয়েছেন কবিতা আবৃত্তি। এর ফল দাঁড়িয়েছিল দুর্দান্ত; ওদের কখনোই বিরাগ মনে হয়নি। অ্যামেচার অভিনেতাদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমার মেথডটি এভাবে পেয়েছে সুনিশ্চয়তা। কোনো ফিল্মমেকার যদি অ্যামেচার অভিনেতাদের নিয়ে সফল হতে চান, তাহলে তাদের রিহার্সল করাতে হবেই; তবে সেটি তারা সিনেমাটিতে যে চরিত্রে অভিনয় করতে যাচ্ছেন, সেই চরিত্রে নয়। একদিকে তাকে যেমন কঠিনত্বের ফাঁদ এড়িয়ে যেতে হবে, অন্যদিকে চাকচিক্যও। কাজটা স্রেফ সোজা : কোনো রকম তোতলামি ছাড়াই সংলাপ বলতে পারার অভ্যস্ততা তৈরি করতে হবে তাদের মধ্যে। এই স্তরে উন্নীত হওয়ার পরই তাদের স্ক্রিপ্টের ওপর কাজ করতে দিতে হবে; তবে সেটা ইতালিয়ান পন্থায়— অভিনয়হীন অভিনয়ে।

ভারত নিয়ে আরেকটি স্মৃতি মনে পড়ছে। লন্ডন থেকে যে আর্ক-লাইটগুলো পাঠানো হয়েছিল, সেগুলো হাতের ওপর বাজে ধরনের জখমে যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ ধরনের অতিভারী যন্ত্রপাতির সঙ্গে অভ্যস্ত ছিলেন না ভারতীয় ইলেকট্রিশিয়ানরা। স্ক্রু ঠিকমতো টাইট না করেই ওগুলো তাঁরা সরাতেন বলে স্ক্রুগুলো জমাট বেঁধে গিয়েছিল। টিমের কয়েকজন সদস্য, যাঁদের মধ্যে একজন ব্রাহ্মণও ছিলেন, পরামর্শ দিলেন—দেবী কালীকে আমরা উপেক্ষা করেছি বলেই এ রকম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছি। হিন্দুদের জীবনের কালীর গুরুত্ব প্রবল, বিশেষ করে কলকাতায়। বলা হয়ে থাকে, এ শহর নাকি তারই গড়া। তিনি হিন্দু ত্রিভুবনের দ্বিতীয় সদস্য, হিন্দুদের বিশ্বাসমতে একে অন্যকে ছাড়া অস্তিত্বহীন যা—সেই সৃষ্টি ও বিনাশ— উভয়ের রূপায়ণকারী শিবের স্ত্রী। কালীকে একেবারেই কৃষ্ণাঙ্গ সত্তা হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। তার বেরিয়ে আসা দীর্ঘ টকটকে লাল জিহ্বার বিস্তার তার হাঁটু পর্যন্ত। তার চাহনির মধ্যে রয়েছে অনুশোচনা : নিজের স্বামীকে হত্যা করার কারণে তিনি ক্ষমা চাচ্ছেন। ছোট পরিসরে একটা পূজার, অর্থাৎ দেবীর তুষ্টির জন্য আরাধনার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিলেন টিমের সদস্যরা। যেখানে আমরা সিনেমাটির শুটিং করেছি, সেই বাগানবাড়ির মূল ড্রয়িংরুমে পূজার আয়োজন করা হলো।

দেবীর একটি পোড়ামাটির মূর্তি ঘিরে চলল পূজা, যে মূর্তি কিছু মুহূর্তের জন্য স্বয়ং দেবীতে পরিণত হয়। পূজায় মন্ত্রপাঠের পাশাপাশি চলল নৃত্য; পোড়ানো হলো ধূপ। সন্ধ্যাবেলা মূর্তিটি বিসর্জন দেওয়া হলো নদীতে : মাটি ফিরে গেল মাটির কাছে। এই আয়োজনে দেবী নিঃসন্দেহে তুষ্ট হয়েছিলেন; কেননা, এরপর আর আমাদের টিমের কারো হাত জখম হয়নি।

‘দ্য রিভার’-এর শুটিং শেষ হয়ে যাওয়ার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আমাকে আর দিদোকে বেশ ভুগতে হয়েছে। রাধা আমাদের দারুণ সাহায্য করেছেন এ ক্ষেত্রে। আমাদের শ্রেষ্ঠ বন্ধুদের একজন হয়ে উঠেছেন তিনি। আধিয়ারে থিওসোফিক্যাল সোসাইটির হেডকোয়ার্টারে তাঁর সঙ্গে আমরা থেকেছি। সেখানে কাটিয়েছি ব্রাহ্মণের জীবন : খাইনি কোনো মাংস, তামাক কিংবা অ্যালকোহল। সেই দিনগুলো আমাদের জীবনে দারুণ কাজে দিয়েছে; যদিও দিদো বিশ্রীভাবে প্রতারণা করেছে— সিগারেট খাওয়ার জন্য শৌচাগারের আশ্রয় নিয়ে! ধর্মীয় প্রশান্তির এক চমৎকার ছবি আমাদের মনে এঁকে দিয়েছে আধিয়ার।

ঐতিহ্যগত দৃশ্যের কম নির্জন ছবিও আমরা নিজেদের সঙ্গে নিয়ে ফিরেছিলাম ভারত থেকে। মাদ্রাজে একজন প্রখ্যাত গায়ক ও কম্পোজারের পারফরম্যান্স দেখেছিলাম। দর্শকভর্তি থিয়েটার দেখে মনে হয়েছিল যেন কোনো শহরতলির সিনেমা হল; আকাশ ভেঙে পড়া হাততালিতে উঠেছিল মঞ্চের মূল পর্দা। ভার্সাইয়ের [ফরাসি শহর] মতো দেখতে একটা পার্কের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যাকক্লথ পেছনে রাখা মঞ্চের মাঝখানে আড়াআড়ি পায়ে বসেছিলেন গায়ক। তাঁর মাথার সামনের দিকটা কামানো। পেছনে বেড়ে উঠেছে দীর্ঘ চুল। পশ্চিমা চোখে ভীষণ আজব ধরনের দেখতে এই হেয়ারস্টাইল সত্ত্বেও আমরা ওই গায়কের সৌন্দর্য ও আভিজাত্যে বিমুগ্ধ হয়ে গেলাম। তাঁকে ঘিরে সাপোর্ট দিচ্ছিলেন ছয়জন মিউজিশিয়ান; তাঁরাও আড়াআড়ি পায়ে বসা। তাঁদের কেউ একজন একটা নোট বাজান তো, অন্যরা সেটা নিজ নিজ বাদ্যযন্ত্রে বাজিয়ে চলেন।

হাততালির শব্দ যখন মিলিয়ে গেল, ওই গায়ক কিছু নোট গুনগুন করলেন। কিন্তু তারপর তা থামিয়ে দিয়ে, দর্শকের উদ্দেশ্যে সহজভাবে, যেন চার্লস লাফটনের মতো করে বললেন, ‘আজকে আমি মুডে নাই। ’ মুহূর্তেই হতাশার গুঞ্জরণ ছড়িয়ে পড়ল। দর্শকরা ফিরে গেলেন সেখানে কিনতে পাওয়া যাওয়া ছোট কেক খেতে। গায়ক তিন-চারবার চেষ্টা চালালেন। কিন্তু ঠিকঠাক হলো না। তিনি ক্ষমা চাইলেন; চায়ে চুমুক দিলেন; নিজ অর্কেস্ট্রার সদস্যদের সঙ্গে খেলেন সামান্য কেক। আমাকে বলা হলো, অনুপ্রেরণার এই অনুসন্ধান হয়তো দিনের পর দিন ধরে চলবে। পার্টির জন্য মিউজিশিয়ানদের ভাড়া করে এনেছিলেন যেসব ধনবান কাস্টমার, তাঁরা ভালো ব্যবহার পেলেন না। গায়কের মন-মেজাজ যদি সায় না দেয়, দুনিয়ার কোনো শক্তির পক্ষেই তাকে দিয়ে পারফর্ম করানো সম্ভব নয়। সৌভাগ্যক্রমে এ বেলা প্রেরণা পাওয়ার জন্য এক সপ্তাহ সময় লাগেনি; একটু পরেই তিনি গাইতে শুরু করলেন। চমৎকার! যদিও তামিল ভাষার একটা শব্দও দিদো কিংবা আমি বুঝতে পারছিলাম না; তবু আমাদের অন্তরের অন্তস্তল ছুঁয়ে গেল।



সাতদিনের সেরা