kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

ক্রী ড়া

ক্রিকেটের সঙ্গে বিদেশে...

সাইদুজ্জামান

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৬ মিনিটে



ক্রিকেটের সঙ্গে বিদেশে...

প্রিয় শহর কাশ্মীরে সপরিবারে মাশরাফি বিন মর্তুজা

কয়েক সেকেন্ড অপলক তাকিয়ে ছিলাম তরুণ ক্রিকেটারটির দিকে। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফেরার পথে মধ্য বিশের বাংলাদেশি ব্যাটার বলছেন, ‘আমি আর... (নামটা গোপন থাকুক) সুযোগ পেলেই ঘুরেছি। এত সুন্দর দেশ! ঘোরাঘুরি করা আমার শখ। ’

প্রথমেই বলে নেওয়া দরকার এমন নির্দোষ শখের দুই ক্রিকেটারের নাম কেন গোপন করা হলো।

বিজ্ঞাপন

কারণটা হলো, এ লেখার বিষয়বস্তুই না আবার ভবিষ্যতে এই দুই তরুণকে ট্রলিংয়ের হাতিয়ার বানানো হয়! মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য জয়ের পর ঘরের মাঠে আফগানিস্তান এবং এরপর দক্ষিণ আফ্রিকায় অত্যাশ্চর্য ওয়ানডে সিরিজ জয়ের পরও টেস্ট সিরিজে বাজে হারের পর নিন্দার যে ঝড় বয়েছে মিডিয়া আউটলেটে, তাতে ভ্রমণপিপাসু কোনো ক্রিকেটারের নাম প্রকাশ করা নিরাপদ মনে করছি না। ভবিষ্যতে যদি বিদেশ সফরে ব্যর্থ হলে এই ঘোরাঘুরিকেই ট্রলিংয়ের বিষয়বস্তু বানিয়ে ফেলে কেউ!

যাক, অবসরে দুই তরুণের জোহানেসবার্গ, ডারবান আর পোর্ট এলিজাবেথের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগের কথা শুনে বিস্ময়ের কারণটা এবার বলে নিচ্ছি। একুশ শতকের ক্রিকেটারদের কাছে ভ্রমণবিষয়ক গল্প অপ্রত্যাশিত। বিশেষ করে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে। মাঠ ও হোটেল রুমের বৃত্তে বন্দি থাকেন তাঁরা। টিম ডিনার না থাকলে সদলবলে তাঁদের কোথাও ঘুরতে দেখা যায় না। এর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা অবশ্যই আছে। প্রসঙ্গক্রমে সেটি উপস্থাপনও করা হবে।

আগে টাইমমেশিনে চড়ে ২০০১ সালের মার্চে ফিরে যাই। টেস্ট মর্যাদাপ্রাপ্তির পর প্রথম কোনো পূর্ণাঙ্গ সফরে বিদেশে যাচ্ছে বাংলাদেশ দল। গন্তব্য জিম্বাবুয়ে। একরাশ রোমাঞ্চ বললে কম বলা হবে। মনে আছে, এমিরেটসের উড়োজাহাজের জানালা দিয়ে মেঘখণ্ডের ভেসে বেড়ানো নিয়েও একটা ট্যুর ডায়েরি লিখে ফেলেছিলাম! একই ফ্লাইটে সহযাত্রী নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের বাংলাদেশ দল। তাঁরা বিজনেস ক্লাসের যাত্রী। তবে ইকোনমি ক্লাসে বসা বাংলাদেশের ছোট্ট মিডিয়া বহরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলেন না তাঁরা। বারবার উঠে এসে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে গেছেন অনেকে, দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি এড়াতে।

খেলোয়াড়, কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাংবাদিকদের সম্পর্কের রসায়নটা তখন একেবারেই ভিন্ন ছিল। প্রশংসা করে লিখলে মুচকি হাসতেন, সম্পর্কের গভীরতা বাড়ত। আর সমালোচনা করলে সোজা মুখের ওপর এসে অনুযোগ করতেন, ‘এটা কী লিখেছেন?’ ব্যস, এটুকুই। এই অনুযোগ তিক্ততায় গড়ায়নি, নতুন আড্ডার স্রোতে খড়কুটোর মতো হারিয়ে গেছে। আর বিদেশ সফরগুলো ছিল সেই সম্পর্ককে আরো দৃঢ় করে নেওয়ার সুযোগও। তবে এর পরও মতপার্থক্য হতো এবং সেসব আরো দ্রুততার সঙ্গে মিটে যেত। পুরনো সেসব তিক্ততা নিয়ে এখন হাসাহাসিও হয় অলস আড্ডায়।

যাক, এমিরেটসের ফ্লাইট জোহানেসবার্গে নামিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ দলকে। সেখান থেকে হারারে নিয়ে যাবে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ। নাক উঁচু ইংরেজদের গর্বের এয়ারলাইনটি যে ফ্লাইট বরাদ্দ রেখেছিল জোহানেসবার্গ টু হারারে ফ্লাইট—সেটির লক্কড়ঝক্কড় শব্দ এখনো কানে বাজে! এবার দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফেরার পথে পোর্ট এলিজাবেথ টু জোহানেসবার্গ রুটে একই এয়ারলাইনের টিকিট কেটে একটু চিন্তিতই ছিলাম। কিন্তু উঠে দেখি, নাহ, বেশ ঝকঝকে ফ্লাইট। বেশির ভাগ দেশে অভ্যন্তরীণ রুটে খাবার কিনে খেতে হয়। কভিডের পর পরিস্থিতি আরো শোচনীয়, বিনা পয়সার পানির বোতলটি মুঠোয় পুরে রাখা যায়। সেখানে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ খাবারও দিয়েছে এবার!

তারিখটা ঠিক মনে নেই, মার্চের মাঝামাঝি কোনো এক দুপুরে হারারে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নেমেছি। ভিসা নেই, তবে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট বোর্ড এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠি আছে। সেসব দেখিয়ে পোর্ট এন্ট্রি ভিসা নিয়ে বাইরে বেরোনোর পর ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা হাওয়া জড়িয়ে ধরেছিল। সব প্রথমেরই একটা বিশেষত্ব থাকে। হারারের সেই হাওয়ার শীতলতা এখনো আঁচ করতে পারি।

টিম বাস সবার আগে ইমিগ্রেশনের ঝামেলা চুকিয়ে হোটেলে চলে গেছে। এর কিছু পরে ট্যাক্সি নিয়ে হারারের ক্রাউন প্লাজা হোটেলে পৌঁছনোর পথে যা দেখেছি, সেটুকুই আফ্রিকার প্রেমে পড়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। আফ্রিকা মানেই জঙ্গল বলে জানতাম। কিন্তু এ তো দেখি ঝোপঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে ছবির মতো সুন্দর সব কটেজ টাইপ ঘরবাড়ি। বিমানবন্দর থেকে বেরোতেই পর্যটকের চোখ আটকাবে বিশাল বিলবোর্ডে—ডোন্ট ব্রিং ইওর এয়ারকন্ডিশনার টু জিম্বাবুয়ে। সারা বছর দিনের তাপমাত্রা ১৬ থেকে ২০ ডিগ্রিতে ওঠানামা করে। শুধু স্বল্পমেয়াদি শীতকালের রাতের তাপমাত্রা ৬ থেকে ৭ ডিগ্রিতে নামে। জিম্বাবুয়ের খনিজ সম্পদ ব্রিটিশদের প্রধান আকর্ষণ হলেও আফ্রিকার এই প্রান্তের আবহাওয়া তাদের দ্বিতীয় সেরা আকর্ষণ না হয়ে যায় না। রবার্ট মুগাবের শাসনামলে পৈতৃক সম্পত্তির পাশাপাশি দুর্দান্ত আবহাওয়াও জিম্বাবুয়েতে ফিরিয়ে আনত ইংরেজদের।

কিন্তু ক্রাউন প্লাজার ফ্রন্ট ডেস্কের টচপটে কর্মী মনে ভয় ধরিয়ে দিলেন, ‘সন্ধ্যার পর তোমরা একা একা এদিক-ওদিক ঘুরতে যেও না প্লিজ। ’ ক্রাউন প্লাজা ২৬ তলা একটি ভবন। সেটির ১৪ তলা থেকে হারারের প্রধান প্লাজা চোখে পড়ে। যেখানে একসময় বিকেল ৫টার পর কুকুর ও কালো মানুষের পা রাখা নিষিদ্ধ ছিল! ১৯৮০ সালে জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতার পর সেই নিষেধাজ্ঞা উঠেছে বটে, তবে জারি হয়েছে সতর্কতা। আগে যাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল হারারের সবচেয়ে জমজমাট চত্বর, স্বাধীনতার পর তারাই ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল সাধারণ পথচারীর জন্য। ২০১১ ও ২০১৩—পরের দুই সফরে অতটা অনিরাপদ মনে হয়নি জিম্বাবুয়েকে। তবে অর্থনীতির অবিশ্বাস্য পতনের সঙ্গে সঙ্গে বাহ্যিক সৌন্দর্যও যেন হারিয়ে ফেলেছে জিম্বাবুয়ে। এবারের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে দেশটিকে ঘিরে একই অশনিসংকেত শুনেছি প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে—নেলসন ম্যান্ডেলার রংধনুর দেশও রং হারাতে বসেছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার ইমিগ্রেশন পুলিশ এবারও হাসিমুখে দাবি করেছেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকা আফ্রিকার আমেরিকা। ’ তাহলে ২০০১ সালের জিম্বাবুয়েকে অনায়াসে আফ্রিকার ইউরোপ বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। তীব্র মুদ্রাস্ফীতির ওই সময়টাতেও জিম্বাবুইয়ান ডলার যথেষ্ট দামি, এক ইউএস ডলারের দাম ৫২ জিম ডলার। যদিও কালোবাজারে দ্বিগুণেরও বেশিতে বিকোচ্ছিল মার্কিন ডলার। ২০১১ সালে গিয়ে দেখি ট্রিলিয়ন ডলারের জিম ডলার ফুটপাতে বিক্রি হচ্ছে, স্যুভেনির হিসেবে। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ধাক্কায় জিম্বাবুয়ের নিজেদের মুদ্রা অচল হয়ে গেছে। মার্কিন ডলারেই লেনদেন হয়, এখনো তা-ই হচ্ছে। সঙ্গে প্রতিবেশী দক্ষিণ আফ্রিকার মুদ্রা র‌্যান্ডও চলে।

যাক, আসল প্রসঙ্গে আসি। সে সময়কার জিম্বাবুয়ে দল তারকায় ঠাসা। হিথ স্ট্রিক অধিনায়ক, অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, গ্রান্ট ফ্লাওয়ার, পল স্ট্র্যাংরা বাংলাদেশ দলের তুলনায় সুপারস্টার। দুই টেস্ট আর তিন ওয়ানডের কোনোটিতেই জয়ের আশা করেনি বাংলাদেশ। একটু লড়াই করার চাহিদাপত্র নিয়েই দেশ ছেড়েছিলেন নাঈমুর রহমানরা। বুলাওয়েতে একটি ওয়ানডেতে সামান্য লড়াই ছাড়া বাংলাদেশের প্রাপ্তি ব্যক্তি সাফল্যনির্ভর—জাভেদ ওমরের ক্যারিং ব্যাট থ্রু দ্য ইনিংস আর বাঁহাতি পেসার মঞ্জুরুল ইসলামের ইনিংসে ছয় উইকেট নেওয়া।

তবে এত দিন পর সেদিনে ফিরে গিয়ে মনে হচ্ছে, ওটা একটা সফর ছিল বটে। মাঠে প্রতিপক্ষের কাছে ক্রিকেট শেখার সেশন শেষে জিম্বাবুয়েকে আবিষ্কারের চেষ্টাও করেছিলেন ক্রিকেটাররা। হারারেতে বেশ কয়েকটা গেম রিজার্ভ আছে। এর মধ্যে একটিতে গিয়ে ভারতের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন সিংহশাবক কোলে নিয়ে ছবিও তুলেছিলেন। বাংলাদেশ দলও গিয়েছিল সেখানে। নামটা মনে নেই, তবে মাইক্রোবাসের বন্ধ জানালায় এক জোড়া সিংহের আঁচড় কাটার রোমাঞ্চ মনে আছে। পাশেই স্নেক অ্যান্ড বার্ডস ওয়ার্ল্ড। রাতের আড্ডায় হাবিবুল বাশার কৌতুক করছিলেন, ‘ব্যাটার কথা শুনতে শুনতে সত্যি সত্যি মাথা ধরে গিয়েছিল!’ সত্যিই তাই। সাপের খাঁচা ঘুরিয়ে দেখানোর সময় আফ্রিকান মাম্বা থেকে শুরু করে যে প্রজাতির সাপের বিশেষত্ব বর্ণনা করছিলেন এক বৃদ্ধ, তার শেষটা ছিল এমন, ‘ইফ শি বাইটস, হেডেক স্টার্টস অ্যান্ড ইউ ডাই!’ বিকারহীন এই বর্ণনা শুনতে শুনতে আমাদেরও মাথা ধরেছিল বৈকি।

 

তবে বুলাওয়েতে এর চেয়েও আকর্ষক বুনো উদ্যান আছে, মাতোবো ন্যাশনাল পার্ক। হারারেতে বসেই খবর নেওয়া হয়ে গেছে। তার চেয়েও বড় আকর্ষণ ভিক্টোরিয়া ফলস। বুলাওয়েতে যাওয়ার পর এক ট্যাক্সি ড্রাইভারের সঙ্গে বেশ খাতির হয়ে গেল। বলে রাখা ভালো, সে দেশের প্রতিটি নামের একটি অংশের সহজ মানে আছে। যেমন—আমাদের সঙ্গে বুলাওয়ে সফরের পুরোটা সময় থাকা ট্যাক্সিচালকের নাম ছিল ফায়ার, আগুন। তবে জলের মতো নরম মনের মানুষ তিনি। বাংলাদেশ দল আগে ঘুরে এসেছে যথারীতি। কাজ সেরে ফায়ারের ট্যাক্সিতে আমরা সেখানে পৌঁছি পড়ন্ত বিকেলে। ততক্ষণে বুলাওয়ের বিখ্যাত গেম রিজার্ভ দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। ফায়ার কাকুতি-মিনতি করে আমাদের জন্য কিছুক্ষণ ভেতরে থাকার অনুমতি আদায় করেছিল। তবে একপাল জেব্রা আর জিরাফ ছাড়া আর কোনো প্রাণী নজরে পড়েনি। অবশ্য বুলাওয়ের হলিডে ইন হোটেল থেকে মাতোবো ন্যাশনাল পার্ক যাওয়া-আসার পথে পাহাড়ের গায়ে যে রকম ফরমেশন দেখেছি, তা বিস্ময়কর। পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে আরো বিশাল পাথরখণ্ড অবিচল দাঁড়িয়ে আছে। মনে হবে এই পড়ল বলে! কিন্তু ঠিক এভাবেই পাহাড়ের গায়ে সারি সারি পাথরখণ্ড দাঁড়িয়ে আছে অনাদিকাল ধরে।

তবে সফরের হাইলাইট ছিল ভিক্টোরিয়ার ফলস। বুলাওয়ে থেকে ট্রেনে গিয়েছিলাম ভিক্টোরিয়া ফলসে। স্টেশনে পা রাখতেই মিহি বৃষ্টির ছাট লাগে গায়ে। খোঁজ নিয়ে জানি যে এটা বৃষ্টি নয়, দূরের জলপ্রপাতে উঁচু থেকে আছড়ে পড়া জলরাশির ছাট এই বৃষ্টি। ভোরে নেমেছি স্টেশনে। আবার সন্ধ্যায় বুলাওয়ে ফেরার ট্রেন ধরতে হবে। তাই হাতে বেশি সময় নেই। ট্যাক্সি ধরে সোজা চলে যাই ভিক্টোরিয়া ফলসে। প্রবেশমূল্য আছে। বিদেশি পর্যটকদের জন্য যথারীতি কিছু বেশি। প্রবেশপথের সামনে সারি সারি দোকান। হ্যান্ডিক্রাফটসের সঙ্গে রেইনকোট ও ছাতা ভাড়া দেওয়া হয়। এমন ঝকঝকে আকাশ, বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা নেই। তাহলে অযথা রেইনকোট কিংবা ছাতা ভাড়া নেওয়ার দরকার কী? দু-একজন নেননি বলে পরে অনুশোচনা করেছেন। কারণ বুনো ভিক্টোরিয়া ফলসের পুরোটা ঘুরলে কয়েক দফা স্নান করা হয়ে যায় যে! জলপ্রপাতের শেষ প্রান্তে ঝুলন্ত ব্রিজ গিয়ে মিলেছে ওপারের মোজাম্বিক সীমান্তে। বাঞ্জি জাম্পের আয়োজন আছে ব্রিজের মধ্যখানে। ১০০ ডলার তখন অনেক টাকা। রোমাঞ্চের জন্য এতটা বিলাসিতার দরকার মনে করেননি কেউ।

তবে দল বেঁধে জাম্বেজি নদীতে রিভার ক্রুইজ ও হ্যালোজেন বেলুনে চড়ে ভিক্টোরিয়া ফলসের পুরোটা দেখার অভিজ্ঞতা থেকে আকরাম খানের রায় ছিল, ‘এটা নায়াগ্রা ফলসের চেয়েও সুন্দর। ’ নায়াগ্রা ফলসকে বাড়তি সৌন্দর্য দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার পর্যটন বিভাগ। ভিক্টোরিয়া ফলসে ইট-বাঁধানো পথ আর খাদের কিনারে তারের বেষ্টনী ছাড়া হাত লাগায়নি জিম্বাবুয়ের পর্যটন বিভাগ। তাই বুনো চেহারাটা রয়ে গেছে। আড়াই শ মিটার ওপর থেকে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় এক লাখ লিটার পানির আছড়ে পড়ার শব্দে পাশের মানুষটির সঙ্গেও চিৎকার করে কথা বলতে হয়। কোথাও কোথাও বৃষ্টির ছাট সুইয়ের মতো বেঁধে শরীরে। এর মধ্যে ইট-বাঁধানো সরু হাঁটা পথে ভেসে ওঠে রংধনু। পা জড়িয়ে ধরে সাত রং। রেগে গানের দল ইনার সার্কেল তাহলে মিছে গায়নি ‘ওয়াকিং অন আ রেইনবো’ গানটি!

ভিক্টোরিয়া ফলস থেকে ফেরার পরের দিনটি ছিল পহেলা বৈশাখ। হোটেল হলিডে ইনের রেস্টুরেন্টের কিচেন সেদিন জাভেদ ওমরের দখলে। খিচুড়ি রান্না হচ্ছে। পুরো দলের সঙ্গে সাংবাদিকদেরও নিমন্ত্রণ। তবে এ উপলক্ষে যতটুকু হল্লাগোল্লা হওয়ার কথা, ততটুকু হয়নি। ভোররাতেই যে খবর পৌঁছে গেছে বুলাওয়েতে, রমনা বটমূলে বোমা হামলা হয়েছে।

জিম্বাবুয়ে সফরে আরেকটি জাতীয় দুর্ঘটনার খবরও শুনেছিল বাংলাদেশ দল। ২০১৩ সালের ৫ মে বুলাওয়েতে ছিল বাংলাদেশ দল। শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে উদ্বেগ ছুঁয়ে গিয়েছিল ক্রিকেটারদের। দুটি ঘটনায় একটা বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে গেছি। রাজনীতি থেকে দূরে থাকাই নিরাপদ মনে করেন খেলোয়াড়রা। অন্তত সাবেক হওয়ার আগে পর্যন্ত। ব্যতিক্রম বলতে মাশরাফি বিন মর্তুজা, ২০১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অধিনায়কত্ব করার সময় সংসদ সদস্য তিনি।

২০০৮ সালের জানুয়ারিতে মাশরাফির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার অষ্টম বছরে। যথেষ্টই সিনিয়র। কিন্তু আচরণে তখনো তিনি ক্যারিয়ার শুরুর ‘পাগলা’। নিউজিল্যান্ড সফরে একটি ওয়ানডে খেলার জন্য কুইন্স টাউনে গেছে বাংলাদেশ দল। ৩১ ডিসেম্বর ছবির মতো সুন্দর শহরটিতে খেলা। থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপনের জন্য শহরটি এতই জনপ্রিয় যে গলফ কোর্স আছে, এমন একটি পাঁচতারা হোটেল রিজার্ভ করে নিয়েছেন মাইক্রোসফটের বিল গেটস। স্থানীয় পত্রিকার পাতায় জনি ডেপের ছবি, তিনিও নববর্ষ এই শহরেই উদযাপন করবেন। এমন শহরে বাংলাদেশ দলের বর্ষবরণ উপভোগ্য হয়নি মোটেও, বাংলাদেশের ৯৩ রানের ইনিংস মাত্র ছয় ওভারে টপকে গিয়েছিল নিউজিল্যান্ড। ইনিংস বিরতির সময় মাঠের ঢালে শিঙাড়া খেতে গিয়েছিলাম। খেয়ে ঢাল বেয়ে উঠে দেখি ম্যাচ শেষ, ২৮ বলে ৮০ রান একাই করেছেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম।

দল হেরেছে বড় ব্যবধানে, তার ওপর শিঙাড়া খাওয়ার জন্য এমন অপেশাদারি আচরণে চরম বিব্রত হয়েছিলাম। তবু প্রথমবার কুইন্স টাউনের ট্যুর ডায়েরি বাংলাদেশ থেকে যাওয়া সবার জন্যই চমকপ্রদ ছিল।

একেবারে শহরের বুকে কেবল কার চূড়ায় যেখানে নামায়, সেখান থেকে পাখির চোখে কুইন্স টাউনকে দেখা যায়। অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর বলেই না এখানে বিল গেটস, ডেপদের মতো খ্যাতিমানরা নববর্ষ উদযাপনে আসেন। পর্যটকবান্ধব শহরটির অন্যতম আকর্ষণ শটওভার জেট রাইড। শহর থেকে বেশ দূরে। আমরাও যেতে চাই। কিন্তু বড়সড় গ্রুপ না হলে ট্যুর অপারেটর পর্যটককে আনা-নেওয়ার ব্যবস্থা করে না, ব্যক্তিগত উদ্যোগে যেতে হবে সেই ঝরনার কাছে। তৎকালীন কোচ জেমি সিডন্স উদিত হলেন ত্রাণকর্তা হিসেবে। তাঁর পরিবার যেতে অনাগ্রহী, চাইলে আমরা দুই সাংবাদিক দুটি টিকিট কিনতে পারি। কিনলামও, কিন্তু দলের সঙ্গে একই বাসে এত দূর যাওয়া-আসা কি ঠিক হবে?

ড্রেসিংরুমে বসে ম্যাচ দেখে ক্যারিয়ার শুরু করা আমার তত দিনে অভ্যাস হয়ে গেছে দূর থেকে ক্রিকেটারদের দেখার। খুবই বিব্রত লাগছিল। জেমি এই জড়তার কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছেন না। সেই জড়তা কাটিয়ে বাসে তুলে নিয়েছিলেন ওই সফরে বাংলাদেশ দলের টিম লিডার আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববিকে। মিনিবাসে একেবারে পেছনের সারিতে মাথা গুঁজে বসে ছিলাম পুরোটা সময়। একসময় বাধ্য হয়েছিলাম মাশরাফি ও মোহাম্মদ আশরাফুলকে বলতে, ‘প্লিজ, আমরা আছি। এখন এসব না করলে হয় না!’ দুষ্টুমি করছিলেন তাঁরা। সব সময় যা করতেন আর কি।

শটওভার জেট রাইড হলো পাওয়ার বোটে লেকের জলের ওপর উদ্দাম ছোটাছুটি করা। গভীরতা খুবই কম, নিচের পাথর দেখা যায়। তার ওপর ক্লিফের ধারালো পাথরের কোণ ঘেঁষে ৮০ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে ছোট পাওয়ার বোটের চালকের সামান্য ভুলে ভয়ানক ুদুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু সে রকম কোনো ইতিহাস নেই। উল্টো দ্বিগুণ রোমাঞ্চ উপহার দেন তিনি আচমকা বোটটাকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে। ক্রিকেটারদের ফেসবুক পেজে দেখেছি, এবারের নিউজিল্যান্ড সফরে একই রোমাঞ্চ উপভোগ করেছেন ক্রিকেটাররা।

তবে বিদেশ সফরে দল বেঁধে এমন ঘোরাঘুরি আজকাল কমই হয়। এর অনেক কারণ আছে। যেমন—এখন খুব বেশি সফরে যায় বাংলাদেশ দল। একই দেশ তো বটেই, পূর্বপরিচয় থাকায় অনেক শহরও সেভাবে আর টানে না ক্রিকেটারদের। আগে প্রতিটি সিরিজের আগে একাধিক ট্যুর ম্যাচ থাকত। লম্বা সেই সফরে ঘোরাঘুরির সময়ও পাওয়া যেত। এখন সেসবের বালাই নেই। ‘ওঠ ছুড়ি তোর বিয়ে’র মতো ঝটপট সফর শেষ হয়ে যায়। টানা খেলার ক্লান্তি হোটেল রুমেই বন্দি রাখে খেলোয়াড়দের। এর মধ্যে ব্যতিক্রম দলে নবাগতরা।

সাকিব আল হাসানের মতো সিনিয়ররা ঘোরেন, তবে ক্রিকেট সিরিজ চলার সময় নয়। পরিবার সঙ্গে থাকলে অবশ্য ভিন্ন কথা। ২০১৯ বিশ্বকাপের সময় ইংল্যান্ডে বসে ইউরোপের ভিসা করিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভিসার তারিখে গোলমাল থাকায় বিশ্বকাপের মাঝপথে প্যারিসের টিকিট কেটেও যেতে পারেননি। তবে সপরিবারে প্রায় সব মহাদেশই ঘোরা হয়ে গেছে সাকিবের। তামিমেরও। তবে সে রকম ঘোরাঘুরি দলের সঙ্গে কোনো বিদেশ সফরে খুব বেশি নয়। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে টি-টোয়েন্টি খেলতে গিয়ে একদিন কয়েকজন টিমমেটকে নিয়ে মিয়ামি বিচে গিয়েছিলেন মধ্যাহ্নভোজে। এর ঠিক একটু আগেই একই সড়কে দেখা গিয়েছিল ফরাসি ফুটবল তারকা আন্তোয়ান গ্রিয়েজমানকে। এ নিয়ে খুব বেশি আফসোস করতে দেখা যায়নি টিম হোটেল থেকে শেভ্রলের বিশাল এসইউভিতে চড়ে সমুদ্রসৈকতে আসা ক্রিকেটারদের। এঁদের সবাই যে হয় ব্রাজিল নয়তো আর্জেন্টিনার সমর্থক, সদ্যই বিশ্বকাপ জেতা ফ্রান্সের কোনো তারকাকে নিয়ে আগ্রহ থাকবে কেন?

তামিম অবশ্য খেলার সময় পরিবারকে সঙ্গে রাখেনই না। ছুটিতে ঘোরেন সপরিবারে। তাঁর ফেসবুক টাইমলাইন বলে, ঝাঁ-চকচকে দুবাই তামিমের পরিবারের ভীষণ পছন্দের গন্তব্য। মাশরাফির যেমন পছন্দ কাশ্মীর। মুশফিক-মাহমুদ উল্লাহরা প্রায় সফরেই পরিবারের জন্য নির্দিষ্ট কিছু সময় বরাদ্দ রাখেন। তবে পর্যটনে যান খেলার বাইরের সময়টায়। মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া তাঁদের পছন্দের তালিকায় আছে।

খেয়াল করে দেখেছি, সাবেক ক্রিকেটারদের মতো দস্যিপনায় বিশেষ আগ্রহ নেই বর্তমান প্রজন্মের। একবার আমাজনের জঙ্গল ঘুরে এসেছি শুনে সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলটের সে কী আগ্রহ, তিনি যাবেনই। কিভাবে যেতে হবে, কোন সময়টা ভালো—তাঁর জানার আগ্রহের কোনো শেষ নেই। সঙ্গীর অভাবে মাসুদের এখনো আমাজনে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। তবে খেলোয়াড়ি জীবন থেকেই আফ্রিকান সাফারির রোমাঞ্চ তাঁকে এবং সমসাময়িক আরো অনেক ক্রিকেটারকে টানত।

অনেক দিন হলো বাংলাদেশ দলের ভেতর থেকে পর্যটনের শখ হারিয়ে গেছে। পেশাদারি ব্যস্ততা এর অন্যতম কারণ। খালেদ মাসুদদের চেয়ে এখন বহুগুণ বেশি উপার্জন করেন সাকিবরা। তাই অর্থের কারণে নতুন দেশ দেখাকে তাঁরা অনর্থ মনে করেন, এভাবে ভাবার কোনো কারণ নেই। শোনা যায়, টিম বাসেও আগের মতো হল্লাগোল্লা হয় না। ঘড়ি ধরে বাসে ওঠেন সবাই। মৌনব্রত নিয়ে মাঠে এবং খেলা শেষে একই মেজাজে হোটেলে যার যার রুমে। খেতে অবশ্য বের হন। শপিংও করেন। তবে টিম লিয়াজোঁর সঙ্গে অবশ্য দর্শনীয় স্থান নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয় না কারো।

অভ্যস্ত এই রুটিনে সম্ভবত পর্যটনের পুরনো অভ্যাস নতুন করে সংযোজিত হতে যাচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে দুই ক্রিকেটারের ঘুরে বেড়ানোর উচ্ছ্বাস তেমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

ঠাসা ক্রিকেটসূচির ক্লান্তি ঝরাতে মুক্ত বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার আনন্দ টনিকের কাজ করে বলে প্রচার মনোবিদদের। গত এক দশকে দলের সঙ্গে যাওয়া বিসিবির একাধিক পরিচালককে আক্ষেপ করতে দেখেছি ক্রিকেটারদের ঘরবন্দি জীবন নিয়ে। জোহানেসবার্গ, ডারবান থেকে পোর্ট এলিজাবেথ ঘুরে বেড়ানো দুই ক্রিকেটার তাঁদের স্বস্তির কারণ হতেই পারেন।

তবু নাম বলছি না দুজনের। আবার কবে এটাকে উপলক্ষ বানিয়ে নির্দয়ভাবে সমালোচিত হন তাঁরা, কে জানে!



সাতদিনের সেরা