kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

গ ল্প

টয়লেট পরিষ্কারের পরে

অদিতি ফাল্গুনী

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



টয়লেট পরিষ্কারের পরে

অঙ্কন: নাজমুল আলম মাসুম

অনেক বলে-কয়ে ডিসি সাহেবের বাসায় চাকরিটা পাওয়া গেছে। বাড়ির কাজের ছেলের কাজ। ঘর ঝাড়ু-মোছা, তিনটা টয়লেট পরিষ্কার, বাসন ধোয়া, বাড়ির সাহেব ও বাচ্চাদের কাপড়চোপড় ধোয়া, আনাজ-সবজি-মাছ-মাংস কাটা, মসলা বাটা...এই সব। কখনো কখনো রান্নাও করতে হয়।

বিজ্ঞাপন

দাদা মুক্তিযোদ্ধা বলে স্থানীয় বয়স্করা এই জেলা শহরে নতুন আসা ডিসিকে অনেক অনুরোধ করে কাজটা দিয়েছেন।

‘কামে যাবি না, বাপ?’

মা ভাত বাড়তে বাড়তে ব্যাকুল গলায় জিজ্ঞাসা করে উঠান থেকে।

দাদা বিছানায় পড়ে আছে আজ কত কত বছর! শুরুতে নাকি যুদ্ধের সময় কোমরে, ঊরুতে আর মেরুদণ্ডে গুলি খেলেও ওই রক্তের জোরে যুদ্ধের পরও বছরপাঁচেক প্রাইমারি স্কুলে বাচ্চা পড়িয়েছে। তারপর দেখতে দেখতে বয়স পঁচিশ হতে না হতেই শরীরের তাকদ ফুরিয়ে আসতে দেখে আত্মীয়রা সবাই মিলে দাদাকে বিয়ে করিয়েছিল। আর বাবার জন্ম হতে না হতে দাদা বিছানায়। সেই ছিয়াত্তর সাল থেকে দাদা বিছানায়। তাতে না বাবার কাঁধে ছোটবেলাতেই চাপল সংসারের জোয়াল—চৌদ্দ বছর বয়স থেকে রিকশা চালাতে চালাতে চৌত্রিশে একবার এক ট্রাক মেরে দিল সাইড দিয়ে। তারপর ওই সবাই মিলে জানাজা আর ফাতেহা পাঠ। সবুজের বয়স তখন আট বছর। তারও বাবার জীবন হলো। চায়ের দোকানে বয়ের কাজ। অনেক কাপ-প্লেট একত্রে জড়ো করে এই টেবিল থেকে ওই টেবিল যেতে ভালোই লাগত। আবার কখনো কখনো মন খারাপ লাগত—ভুলেও একটি কি দুটি কাপ-পিরিচ হাত থেকে পড়ে গেলেই গালাগালি, বকাবকি! বাড়িতে ফিরে বুড়ো দাদার ব্যথার জায়গাগুলোতে রসুন পোড়া তেল মালিশ করতে গেলে বুড়ো একেকটা দাগ দেখিয়ে একেকটা অপারেশনের গল্প শোনাত। তাতে কী আর হলো? সেই তো সারা জীবন হয় হোটেলে আর এখন ডিসি সাহেবের বাড়ির কাজের ছেলে সে।

‘তাড়াতাড়ি পা লাগিয়ে যা, বাপ! ফিরতে ফিরতে আর সেই সন্ধ্যা!’

মা ভাতের সঙ্গে সরিষার তেল, আলু সিদ্ধ আর কাঁচা মরিচ দেয়। নাকে-মুখে খেয়েই বাসা থেকে বের হয়ে ডিসি সাহেবের বাড়ির দিকে পা চালাতে গিয়ে সবুজ দেখে ঝেঁপে বৃষ্টি আসছে। আর সেই বৃষ্টির ভেতরেই নিউ মার্কেটের চত্বরের সামনে অত অত ছাত্র-ছাত্রী কী মিছিল করছে? কোটাবিরোধী মিছিল!

 

‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতি কোটা চলবে না—চলবে না! ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন—এই মুহূর্তে বন্ধ করো! মুক্তিযোদ্ধার দুই গালে—জুতা মারো তালে তালে!’

‘প্রিয় ভাই-বোনেরা,

সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধারা কেন দেশকে সেবার বদলে কিছু চাইবে? সত্যিই দেশপ্রেম থেকে যুদ্ধ করলে কেন এসব কোটা, চাকরিবাকরির পার্সেন্টেজ তাদের দরকার?’

একটি ছেলে সামনে মঞ্চ থেকে বত্তৃদ্ধতা দিচ্ছে। আর তার কথায় জোরসে তালি দিচ্ছে আরো অসংখ্য ছেলেমেয়ে।

কেমন আচানক ভয় ভয় লাগে সবুজের। আরো জোরে পা চালিয়ে সে একরকম দৌড়াতেই থাকে ডিসির বাংলোর দিকে।

‘কয়টা বাজে?’

ডিসি সাহেবের বউ খুব তিরিক্ষি মেজাজে দরজা খুলে দিলেন। একটি আকাশি নীল ম্যাক্সি পরনে। কপালে মিহিন ভ্রু পাখির ডানার মতো টানা। দুই হাতে কপালের কাটা চুল সরাতে সরাতে মেমসাহেব বললেন, ‘তোমাকে না বলি ঠিক দশটার ভেতর আসতে? এখন বাজে পৌনে এগারোটা। ’

‘বৃষ্টির জন্য দেরি হইল, ম্যাডাম—নিউ মার্কেটের সামনে লম্বা মিছিলের সামনে পড়ছিলাম। ’

ভেজা চোখ-মুখ হাতের তেলোয় ঘষতে ঘষতে সবুজ বলে।

‘কিসের মিছিল?’

‘ওই কোটাবিরোধী’, বলতে গিয়ে গলা মিইয়ে যায় সবুজের।

‘ঠিকই তো আছে। এই সরকার যা শুরু করেছে। শোনো, আমাদের বেডরুমে দ্যাখো ছোট বাবু হাগু করেছে মেঝেতে। একটু ফিনাইল ঘষে পরিষ্কার করে ওর ডায়াপার চেঞ্জ করে দাও। বাগানে ড্রেনের পাইপটার সামনে বৃষ্টিতে গাছের পাতা পড়েছে। ওগুলো পরিষ্কার করো। বাথরুমে তোমার সাহেবের কয়েকটা শার্ট-প্যান্ট বালতিতে ভেজানো। সেগুলো ধুয়ে দাও। দুই বুয়াই ছুটি নিয়ে যে বাড়ি গেছে, আর আসার নাম নাই। যা ফাঁকিবাজ একেকটা!’

‘ঠিক আছে, ম্যাডাম। ’

‘আরে—কিসের ঠিক আছে? সব কয়টা ঘর ঝাড়ু দিতে হবে, মুছতেও হবে। তারপর তিনটা টয়লেটই ধুয়ে ফেলো। সবার আগে তাহলে বাবুর হাগু পরিষ্কার করে, ওর ডায়াপার বদলে দাও। তারপর কিচেনে গিয়ে কিছু মসলা বাটতে হবে। আজ সন্ধ্যায় কিছু গেস্ট আসবে। প্যাকেটের মসলায় গোশতে ভালো স্বাদ হয় না। যাও—তাড়াতাড়ি হাত লাগাও। ’

‘জি ম্যাডাম!’

‘দাঁড়াও—একবার বলো তো কী কী করতে বলেছি?’

খুব ছোটবেলায় যে চার-পাঁচ ক্লাস পর্যন্ত পড়েছিল সবুজ, তখন শিক্ষকদের সামনে যেমন পড়া মুখস্থ বলতে হতো, তেমন বলে সে।

‘আচ্ছা, যাও। ’

২.

ডিসি সাহেবের দুই ছেলের ভেতর প্রায় বারো বছরের ব্যবধান। বড় ছেলেটি স্কুলে গেছে বোধ করি। ছোট ছেলেটি বেডরুমে হামাগুড়ি দিচ্ছিল। তার ময়লা প্যান্ট ছাড়িয়ে নিয়ে, মলত্যাগের জায়গাটুকু ভেজা টিস্যুতে মুছিয়ে আর ফ্লোর থেকে গু পরিষ্কার করে লাগোয়া বেডরুমের কমোডে ফ্লাশ করে বাচ্চাটিকে নতুন জামা-প্যান্ট পরাতে হয়। সে অবশ্য এই শুদ্ধিকরণ অভিযান পছন্দ করছিল না। তারস্বরে কান্নার পাশাপাশি দুবার সে সবুজের হাত কামড়ে দিল। তারপর ওই প্রতিদিনই যেমন কাজের লিস্ট দেখতে দেখতে বাড়তে থাকে, তেমনি বাড়তে থাকল। ম্যাডাম টিভির রিমোট হাতে ‘স্টার জলসা’র সামনে বসলেন আর সবুজকেই বাচ্চাটিকে ফ্রিজ থেকে দুধ বের করে গরম করে খাওয়াতে হলো। বছর আড়াই বয়স হবে বাচ্চাটার। তারপর তাকে ঘুম পাড়িয়ে রান্নাঘরে গিয়ে অনেকটা পেঁয়াজ-রসুন-আদা-শুকনা মরিচ-জায়ফল-জিরা-ধনিয়া বেটে ফ্রিজে রেখে দিল সবুজ। বাথরুমে ডিসি সাহেবের পাঁচটা ট্রাউজার আর তিনটা শার্ট কাচতে হলো। এর ফাঁকেই দৌড়ে দোকানে গিয়ে টুকটাক এটা-ওটা কিনে আনতে হলো।

‘কই? বাগানের ড্রেনের পাইপের সামনে পাতা জমেছে ঝড়-বৃষ্টিতে। সেগুলোতে এখনো হাত লাগাওনি যে? তুমি এত্ত ধীরজ!’

‘যাইতাছি, ম্যাডাম!’

বৃষ্টিতে বাগান ভিজে গেছে। ড্রেনের পাইপে ঝোড়ো হাওয়ায় চারদিকের গাছের পাতা, ডালসহ আটকে বিচ্ছিরি কাণ্ড। সেগুলো পরিষ্কার করতে গিয়ে হাতে অনেক কাদা ছিটকে এলো। প্রায় দুটো বাজে না এখন? এখন ছয়টা ঘর ঝাড়ু দিয়ে, মুছে আর তিনটা টয়লেট পরিষ্কার করতে পারলেই ছুটি।

বাগানের ড্রেন পরিষ্কার করে আবার ঘরের ভেতর আসতে আসতে সবুজ দেখে মেমসাহেব খানিকক্ষণের জন্য ‘জি বাংলা’ ও ‘স্টার জলসা’ থেকে বিরতি নিয়ে রিমোটে বাংলাদেশি চ্যানেল টিপছেন।

‘তোমার স্যারকে নাকি গতকালকের নিউজে দেখিয়েছে,’ এই মুহূর্তে ম্যাডামের মেজাজ বেশ ফুরফুরে দেখায়। সামনে কাজুবাদামের প্লেট থেকে দু-একটি কাজুবাদাম মুখে পুরতে পুরতে ম্যাডাম বলেন, ‘গতকাল রাতের খবর নাকি আবার দু-তিনবার রিপিট করে আজকে। যাও—এখন ঘর ঝাড়ামোছা শুরু করো। ’

সবুজ এক মুহূর্তের জন্য ম্যাডামের সামনে রাখা টিভি স্ক্রিনে চোখ রাখে। খবর হচ্ছে। খবরের মাঝখানে কুইজ : ‘দেশের সাত বীরশ্রেষ্ঠর নাম বলুন। বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ কোন অপারেশনে শহীদ হয়েছিলেন?’ সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের গানের মিউজিক বাজছে।

ঘর ঝাড়ু দিতে শুরু করে সবুজ বোঝে, পেটের ভেতরটা খিদেয় মোচড়াচ্ছে। সেই কোন সকালের একটু আলুভর্তা আর ভাত! এরা দুপুরে ভাত দেয় অবশ্য চার হাজার টাকা বেতনের সঙ্গে। তবে সেই দুপুরের খাবার খেতে প্রায়ই বিকেল হয়ে যায়। তাতে দুপুরে মেমসাহেব প্রায়ই তেমন কোনো রান্না করেন না। বড় ছেলে স্কুল থেকে আসতে বিকেল চারটা। সাহেব আসেন বিকেলের পরে। মেমসাহেব ফ্রিজ থেকে কোনোমতে এক পদ ডাল বা তরকারি আর সামান্য একটু ভাত মাইক্রোওয়েভ ওভেনে গরম করে, সিরিয়াল দেখতে দেখতেই খান। কখনো গাড়িতে করে শপিং মলে যান। কখনো আবার স্থানীয় নানা প্রগ্রামে বিশেষত মহিলাদের নানা প্রগ্রামে তাঁকে যেতে হয়। আজ অবশ্য ম্যাডাম বাসাতেই। ম্যাডাম প্লেটে আগের দিনের বাসি রুই মাছের ঝোল আর খানিকটা ভাতে জলপাইয়ের আচার মেখে মুখে পুরতে পুরতে বলেন, ‘খিদে পেয়েছে? একসঙ্গে ঘরগুলো সব ঝেড়ে-মুছে, টয়লেটগুলো ধুয়েই না হয় গোসল করে খেয়ে ফেলো। তোমার সঙ্গে তো এক সেট জামাকাপড় থাকেই, থাকে না? বাসা থেকে তো আনো। ’

এমন লোহা হজম হওয়া খিদেয় অতটা সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে মন না চাইলেও সবুজ ছয়টা ঘরই একে একে ঝাড়ু দেয়। ছয়টা ঘরই ব্রাশ দিয়ে টেনে মোছে। এরপর বাথরুম। প্রথম দুটি টয়লেট দ্রুত পরিষ্কার হলেও তিন নম্বর টয়লেট বা গেস্টরুমের টয়লেটে ফ্ল্যাট প্যানে কে হেগে গেছে? কঠিন গুয়ের দাগ—দু-তিনবার বালতি দিয়ে পানি ঢেলে, হ্যান্ড শাওয়ার দিয়ে প্যানে বসে যাওয়া গুয়ের কালচে দাগের ওপর বারবার পানি ছিটিয়ে, কয়েকবার ফ্লাশ করেও যাচ্ছে না। পরে হারপিক আর ব্রাশ দিয়ে ঘষতে শুরু করলে সব ঠিক হলো। যাক...সব কাজই যখন হয়ে গেছে, এখন শাওয়ারটা ছেড়ে গোসল করে ফেলা যাক। তারপর খানিকটা ভাত খাবে সে।

‘ও আল্লা—তুমি গোসল করে ফেলেছো?’

‘হ্যাঁ—আপনি না বললেন ঘর ঝাড়ামোছা আর টয়লেট ধোয়ার পর গোসল করতে পারি?’

‘দুর—কী যে করো! শোনো—সন্ধ্যায় বলেছি না কয়েকজন গেস্ট আসবে? দুটি মুরগি বেঁধে রেখেছি স্টোররুমের সামনে। একটু কেটে দিয়ে যাও। ’

‘ম্যাডাম—আমি গোসল করছি। আইজ থাক। অফিসের কোনো পিয়নরে ডাইকা করান। ’

‘অফিসের পিয়ন ঘরের কাজ করবে কেন? ভারি বেয়াদব তো তুমি! মুখে মুখে তর্ক করো। তোমাকে মাসে চার হাজার টাকা বেতন দেওয়া হয়। যাও—যা বলছি, তাই করো। ’

‘না—’

‘না মানে? আমি বলছি—তবু না?’

‘হ্যাঁ। আসছি সেই সকাল পৌনে এগারোটায়। আর এখন বাজে পৌনে পাঁচটা। ছয় ঘণ্টায় এক দানা মুড়িও দাঁতে কাটতে দেন নাই। আমি টয়লেট পরিষ্কার করার পর গোসল করমু না তো কী করমু?’

‘বেয়াদব—ফের মুখে মুখে তর্ক? যা বলছি করো!’

‘আমি আইজ আর পারব না। আমার খুব খিদা লাগছে। তাতে চাকরি আমার থাকলে থাকবে, না থাকলে না থাকবে!’

এটুকু বলে মেমসাহেবের বিস্মিত মুখের সামনেই দরজা ঠেলে সবুজ বের হয়ে আসে।

 

৩.

‘সবুজ—দাদা—আইলি? বেবাক খাটতে হয়, না? আইজ খাইছিস? মুখটা অত শুকনা লাগতেছে ক্যান?’

দাদাজানের ঘরে চল্লিশ ওয়াটের বাল্ব জ্বলে। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার আলো-আঁধারিতে জানালা থেকে মশারা ঢুকছে।

‘সাহেবের বাড়ি থেকে খাইয়া আসছিস? খাইয়া আসলে আমার পাশে একটু ব। আইজ তোরে ভৈরব নদীতে একটা অপারেশনের গল্প শুনামু। ’

‘থোন—আপনার অপারেশনের খ্যাতা পুড়ি। কী যুদ্ধ করছেন যে আমি মাইনসের বাড়ি কাম করি? তাগো বাচ্চার গু সাফ করি, পায়খানার প্যানে গুয়ের দাগ ঘইষা ঘইষা উঠাই? ঘর ঝাড়ু দিই, মুছি, ড্রেনের কাদামাখা পাইপ সাফ করি, মেথর-মুদ্দাফরাসের কাম করি? কী যুদ্ধ করছেন যে আমার বাপের স্কুলে যাওয়া হইলো না? রিকশা টানতে টানতে অয় মরলো আর আমি ছোটকাল থেকে এই হোটেলের বয় আবার এই মাইনসের বাসায় চাকরের কাম করি?’

‘সবুজ—দাদা—শোন!’

সবুজ ঘর থেকেও বের হয়ে যায়।

‘সবুজ—বাপ আমার—দাদাজানের সঙ্গে এইভাবে কথা কইলি? ডিসির বাড়িতে ভাত না খাইলে আমি দুইটা মুড়ি ভাইজা দিই? তারপর ভাত উঠাচ্ছি!’

‘ছাড়ো—যত তামশা!’ এককথায় মাকে ঝটকা দিয়ে সরিয়ে সবুজ ছুটে বের হয়।

কোনোমতে শোয়া থেকে উঠে বসে আনোয়ার মিঞা। আর তখনি মাথার কাছে রাখা দুই হাজার টাকার মোবাইল সেটে কল আসে তার।

‘এটা আনোয়ার মিঞার নম্বর?’

‘জি—বলছি! আপনি কেডা বলছিলেন?’

‘আমি ডিসি সাহেব বলছিলাম। ’

‘স্যার, আপনি? হুজুর—কেমন আছেন?’

‘আমি যেমন আছি আছি! তোমার নাতি যে আজ আমার ওয়াইফের সঙ্গে সব কাজে হেল্প না করে উল্টো বেয়াদবি করে চলে এসেছে—ছুটি না নিয়ে চলে এসেছে, তার কী হবে?’

‘স্যার—সবুজের কথা কইলেন? অয় কোনো বেয়াদবি করছে নাকি?’

‘বেয়াদবি মানে বেয়াদবি? স্কাউন্ড্রেল কোথাকার! এই শিখিয়েছো নাতিকে? এই কিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? দায়িত্ব-কর্তব্য না করা আর বেয়াদবি করা। ’

‘হুজুর—অয় তো এইমাত্র বাসা দিয়া বাইর হইলো। আইলে আমি দেখতাছি। ’

‘আর কিছু দেখার নাই। বাসায় ফিরলে নাতিকে বোলো কাল থেকে ওর আর কাজে আসতে হবে না। ’

‘হুজুর—এইটা কী কইলেন? বাপ মরা ছেলেটা যদি একটা ভুল কইরাও থাকে...’

‘দুর—এত কথা বলার আর সময় নাই!’

 

৪.

প্রতিটি মফস্বল জেলা শহরে যেমন একটা হলদে হয়ে আসা ঘাসের আর ছাল ওঠা বেঞ্চের পার্ক থাকে আর পাশ থেকে বয়ে যায় কোনো মৃত নদী, তেমন পার্কের বেঞ্চিতে বসে সবুজ খানিকক্ষণ বাদামওয়ালার কাছ থেকে দশ টাকার বাদাম কিনে ফেলে-ছড়িয়ে খায়। তারপর পায়ে ঘুঙুর বাঁধা, লাল পোশাকের ঘটিগরম চানাচুরওয়ালা এলে তার কাছ থেকে চানাচুর কিনে খায়। সে ফ্লাস্কে করে চা-কফি বিক্রি করা একজনের কাছ থেকে খানিকটা লেবু চা খায়। তারপর যখন তার পেটের খিদে ও মনের রাগে আপাত একটি প্রলেপ পড়তে শুরু করে, তখনই সে দেখতে পায় তাদের পাড়ার মিজান তাকে খুঁজতেই যেন পার্কে এসেছে।

‘তুই এইখানে? তোরে খুঁজতাছি!’

‘কী হইছে?’

‘তোর দাদাজানের শরীরটা কেমন যেন একটু—। ’

এই ভয়টাই পাচ্ছিল সবুজ। আজ অনেক কড়া কথা শোনানো হয়েছে বুড়োকে।

‘হায় আল্লাহ! বেশি খারাপ কিছু না তো?’

‘চল—পা চালায় গেলে দ্যাখ—বাকি আল্লাহ ভরসা!’

বাড়ির গলিতে ঢুকতে দেখে পাড়ার ছেলেরা দাদাজানকে রিকশায় তুলে হাসপাতালের দিকে ছুটছে। এই বস্তি যে ওয়ার্ড কমিশনার সামলায়, তাঁকে বলে-কয়ে হাসপাতালে দ্রুতই একটা সিটও পাওয়া গেল। কিন্তু দাদাজানের শ্বাসকষ্ট উঠেছে।

‘দুনিয়ার সব বাতাস শ্যাষ হইয়া আসতেছে। ভৈরব নদের ওপর আমার হাতেই মাথা রাইখা মরলো নির্মল, সিরাজুল, বাদশা। পঁচিশ বছর বয়স হইতে বিছনা নিলাম। আর আমার নাতির চাকরের কাজও থাহে না। আমি মরলে—আমি মরলে—য্যান কেউ জাতীয় পতাকা না উঠায়। কোনো ‘গার্ড অব অনার’ না দ্যায়। আমি থুথু ফিক্কা মারলাম—থুথু ফিক্কা মারলাম এই ‘গার্ড অব অনারে। ’



সাতদিনের সেরা