kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

গ ল্প

ফেরেশতা

সিরাজউদ্দিন আহমেদ

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ২৩ মিনিটে



ফেরেশতা

অঙ্কন: শেখ আনোয়ার আমজাদ হোসেন

মিজানকে প্রথম দেখায় যেকোনো মানুষের মনে হবে তিনি মাওলানা। ইসলাম ধর্মে জ্ঞানীজন। ওয়াজ-মাহফিল করেন। তাঁর পোশাক-আশাক, চেহারার নুরানি সৌন্দর্য যেকোনো মানুষের মুগ্ধতা ও শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে।

বিজ্ঞাপন

ফরসা গায়ের রংকে আরো বিকশিত করেছে তাঁর কোঁকড়ানো ঘন কালো বাবরি চুল ও কালো দাড়ি-গোঁফ। দীপ্ত যৌবন যেন শত গুণে বিকশিত হয়ে কিসের প্রহর গুনছে।

মিজানের পূর্ণ নাম আলহাজ মীর মিজানুর রহমান আশরাফী। মেধাবী ছাত্র। সম্প্রতি বুয়েট থেকে ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের অপেক্ষায় আছেন। মিজানের চাকরি খোঁজার কোনো প্রয়োজন নেই। চাকরি দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে তাঁর সম্মতির অপেক্ষায়।

আশরাফ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের একমাত্র উত্তরাধিকার হলো আমার গল্পের নায়ক মিজান। ওদের পরিবারে মিজানকে নিয়ে তিনটি স্বপ্ন পাশাপাশি চলছে। মিজানের বাবা আশরাফ সাহেব দীর্ঘদিন ধরে আজকের দিনটির অপেক্ষায় ছিলেন। ছেলে পড়াশোনা শেষ করে ব্যবসার হাল ধরবে। ছেলের ব্যাবসায়িক বুদ্ধি যত বাড়বে, তিনি ব্যবসা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে আল্লাহর পথে তত সময় ব্যয় করবেন।

মিজানের স্বপ্ন, পড়ালেখার চাপে ইসলামী জ্ঞান অধ্যয়নে সে সময় দিতে পারেনি। ব্যবসায় জড়িয়ে পড়লে তার স্বপ্নপূরণ আরো কঠিন হয়ে পড়বে। সে চাচ্ছে, ইসলামী জ্ঞান আহরণ ও তুলনামূলক ধর্মচর্চায় এক বছর পৃথিবীর বিভিন্ন খ্যাতিমান জ্ঞানভাণ্ডারে পাঠ ও চর্চা করবে। তারপর কর্মজীবনে-সংসারজীবনে প্রবেশ করার প্রস্তুতি নেবে।

সবচেয়ে জোরালো ও তীব্র হচ্ছে মিজানের মা রহিমুন্নেসার বক্তব্য। তিনি বললেন, আমি অতশত বুঝি না। স্বপ্নে দেখেছি মিজানের শাদি মোবারক। আগে তুমি বিয়ে করবে। তারপর তুমি জ্ঞান চর্চা করতে বিদেশ যাবে, না তোমার বাবার ব্যবসায় ঢুকবে—সেটা তোমাদের বাপ-ব্যাটার ব্যাপার।

আশরাফ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের একটি শাখার ম্যানেজার তোফায়েল সাহেব। এই প্রতিষ্ঠানে তিনি যোগ দিয়েছিলেন অ্যাকাউন্টস ক্লার্ক হিসেবে। কর্মদক্ষতা, ব্যবহার ও বিশ্বাসযোগ্যতায় তিনি হয়ে উঠলেন আশরাফ সাহেবের পিএ। তাঁর কর্মস্থল ও বাসস্থান হলো আশরাফ সাহেবের বাড়িতে। বর্তমানে তিনি অ্যাকাউন্টস ডিভিশনের ডেপুটি ম্যানেজার। তাঁর একটি ষোড়শী সুন্দরী কন্যা আছে। মাদরাসা থেকে দাখিল পাস করে এখন ঘরে মায়ের কাছে ঘরকন্না, গৃহস্থালিকর্ম বিদ্যা শিখছে। পুত্রবধূ হিসেবে রহিমুন্নেসার পছন্দ এই মেয়েটিকে। ছোটবেলায় দেখেছেন যখন তাঁদের বাসায় থাকত। সুন্দরী কিন্তু খুব চঞ্চল। কথায় কথায় হাসে, গাছ বাওয়া মেয়ে। রহিমুন্নেসার অনেক বকা শুনেছে। তাঁকে দেখলেই ভয়ে পালাত। রহিমুন্নেসা সে স্মৃতি মনে করে হাসলেন। এখন দেখতে কেমন হয়েছে, কত বড় হয়েছে কে জানে!

পরদিন রহিমুন্নেসা তোফায়েল সাহেবের মেয়ে হামিদা বানুকে ডেকে পাঠালেন। বাড়ি থেকে গাড়ি গেল। সেই গাড়িতে বোরকা পরে হামিদা বানু এলো। রহিমুন্নেসাকে সালাম দিয়ে হামিদা বানু জড়সড় হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। রহিমুন্নেসা বিস্মিত হলেন, সেই পিচ্চি দেখছি এখন তালগাছ!

রহিমুন্নেসা বিরক্ত হয়ে বললেন, বোরকা খুলছিস না কেন? এখানে কি কোনো পুরুষ মানুষ আছে?

হামিদা বানু নিচু গলায় বলল, আপনি অনুমতি না দিলে কী করে খুলি, খালাম্মা।

বোরকা খোলার পর রহিমুন্নেসার দুই চোখ জুড়িয়ে গেল। আহা মরি মরি, সেই পিচ্চি মেয়েটি দেখছি যেমন লম্বা, তেমনি ফরসা, সারা অঙ্গে রূপের বান ডেকেছে। কালো চুলের ঢল নেমেছে কোমর ছাড়িয়ে। মনে মনে বললেন, আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তোমার অসীম দয়া। রহিমুন্নেসা তাঁর কঠোর ভাবমূর্তি বজায় রাখতে চাচ্ছেন, কিন্তু পারছেন না। হামিদা বানুকে দেখার পর থেকে তাঁর হৃদয় কোমল হতে শুরু করেছে। মৃদু গলায় বললেন, কোরআন শরিফ থেকে আয়াতুল কুরসি পড়ে শোনা তো।

কী কিন্নরকণ্ঠী! কী শুদ্ধ উচ্চারণ! যেন সে টিভিতে কোরআন তিলাওয়াত শুনছে। মেয়েটির প্রতি স্নেহে, আল্লাহর প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতায় রহিমুন্নেসার চোখে পানি এলো। শাড়ির আঁচলে চোখের পানি মুছে ভেজা গলায় বললেন—যা, কোরআন শরিফ রেখে আয়। আমার পাশে বস।

রহিমুন্নেসা হামিদা বানুকে তাঁর বুকে জড়িয়ে রাখলেন। কোনো কথা বলছেন না। দুজন দুজনের হৃদস্পন্দন শুনছে। হামিদার ভয় ভয় করছে। মৃদুস্বরে একবার জিজ্ঞেস করল, আপনাকে হাদিস পড়ে শোনাই? মন ভালো হবে।

রহিমুন্নেসা বললেন, সারা জীবন তুই আমার বুকের মাঝে এমনি করে থাকতে পারবি?

হামিদা ভেবে পাচ্ছে না খালাম্মা এসব কী বলছেন! এলোমেলো কথার সে কী উত্তর দেবে? আশঙ্কায় নাকি আনন্দে তার মন কেঁপে ওঠে।

আমার ছেলেকে তোর পছন্দ হয়?

থরথর করে কেঁপে ওঠে ঘরদোর বিশ্বচরাচর। কত স্কেলের ভূমিকম্প হচ্ছে? সে কি বেঁচে উঠে তার পরিচিত পৃথিবী আবার দেখতে পাবে? তার ছোটখাটো কোমল স্বপ্নগুলো আগের মতো থাকবে তো? বেঁচে থাকার জন্য সে অবলম্বন খোঁজে। রহিমুন্নেসাকে সজোরে আঁকড়ে ধরে তাঁর বুকে মুখ লুকায়। তার বাঁধভাঙা আনন্দ অশ্রু রহিমুন্নেসার বুক ভিজিয়ে হৃদয় স্পর্শ করে।

এই পাগলি কাঁদছিস কেন?

আমি কত সাধারণ তুচ্ছ একটি মেয়ে। ধনে-জ্ঞানে-শিক্ষায় আমি উনার নখেরও যোগ্য নই। উনি কেন আমাকে পছন্দ করবেন?

তুই এত সুন্দর। ধর্মে-কর্মে, বিনয়ে, সংসারের কাজে কোন দিক দিয়ে তুই কম? করবে রে করবে, আমার ছেলেকে আমি জানি। তোকে কেউ প্রত্যাখ্যান করতে পারে? বোকা মেয়ে।

মেয়েটাকে ছোটবেলা থেকে দেখছে। স্বভাবে-আচরণে কোনো অভিযোগ নেই। তা ছাড়া মিজানের মায়ের যখন এত পছন্দ কেউ আপত্তি করে না। রহিমুন্নেসা জানেন তাঁর ছেলের পছন্দ-অপছন্দ। তাই এত নির্ভাবনায় মত দিতে পারছেন। তবু এ যুগের ছেলে, এত পড়াশোনা করেছে, তার মতামতটাও জানা দরকার।

ছেলেবেলার কথা মিজানের কিছু মনে পড়ে না। তা ছাড়া মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে মিজান কথা বলতে পারে না। তার কথা আটকে আসে। বয়স যত বেড়েছে, এ অভ্যাস তত জটিল হয়েছে। বুয়েটে ওর সহপাঠীরা ওর এ আচরণ নিয়ে রঙ্গ-রসিকতা করত। মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে কথা না বলার কারণে কোনো মেয়েকে মিজান চিনে উঠতে পারত না। কে যে সহপাঠিনী, কে যে নয়, তা বুঝতে ও ঘেমে উঠত।

রহিমুন্নেসা ছেলের মতামত জানতে জিজ্ঞেস করলেন, মেয়ে দেখতে চাইলে বল, দেখার ব্যবস্থা করি। কথা বলতে চাইলে মেয়েটিকে একদিন বাড়িতে দাওয়াত করি। তোর জীবন তোরই বুঝে নেওয়া উচিত। পরে আমাকে দোষ দিতে পারবি না।

মিজান লজ্জায় লাল হয়ে বলল, আম্মা যে কী বলেন! আপনার পছন্দ, এখানে আমার বলার কী আছে? আপনার পছন্দ কখনো আমি অপছন্দ করেছি, বলেন? আমার দেখার দরকার নেই। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী বিয়ের আগে মেয়ে দেখা ঠিক নয়।

তুই চাইলে শরিয়াহ মেনেও কথা বলতে পারিস। মেয়েটি খুব পর্দানশিন। পর্দা মেনে কথা বলাতে দোষের কিছু নেই।

না আম্মা, আপনার পছন্দ হইছে। আলহামদুলিল্লাহ। আমার কথা বলার কোনো দরকার নেই।

কয়েক দিন পর মিজান তার ঘরে টেবিলে একটি খাম দেখতে পেল। খামের ভেতর একটি মেয়ের ছবি। ছবির দিকে না তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিতে চেষ্টা করল, যেমনটা সে এতকাল করে এসেছে। মিজান এই প্রথম ব্যর্থ হলো। এ ছবি কি পৃথিবীর কোনো মানবীর? এত সুন্দর! কে এই তরুণী?

আরেকটি খামে পেল একটি চিঠি।

 

জনাব,

দাসীকে ক্ষমা করিবেন। আমার অপরাধে আপনি পাপের ভাগী হইলেন। আমি যে কী লজ্জায় পড়িয়াছি, তাহা বুঝাইবার ভাষা আমার জানা নাই। আমার এক পাজি বান্ধবী আমার অজান্তে আমার একটি ফটো আপনার নিকট প্রেরণ করিয়াছে। আমি লজ্জায় মরিতেছি। ছিঃ ছিঃ ছিঃ, এ কেমন কাণ্ড করিল! এখন কিরূপে আমি আমার এই পাপমুখ দেখাইব? আল্লাহর নিকট ইহার কী জবাব দিব? মহান আল্লাহর নিকট অপরাধ স্বীকার করিয়া এবং আপনাকে যে পাপের ভাগী করিলাম তাহার জন্য ৩০ রাকাত নফল নামাজ পড়িয়া আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিব। আল্লাহ মেহেরবান। তিনি নিশ্চয়ই আমাদের ক্ষমা করিবেন। আপনিও আমাকে ক্ষমা করিবেন। আল্লাহ আপনার সহায় হইবেন। আমিন। ইতি—

 

কোনো নাম নেই। সহজে বোঝা যায় ছবির প্রিয়দর্শিনী চিঠির লেখিকা।

 

তরুণীর ছবি দেখে ও চিঠি পড়ে মিজানের সময়-জ্ঞান লুপ্ত হলো। ছবি দেখে আশ মেটে না, চোখের পলক পড়ে না। অল্প পড়াশোনা করা মেয়ে কী সুন্দর চিঠি লিখেছে। মিজানের অন্তর আনন্দে হাহাকার করে ওঠে। বারান্দায় পদশব্দ শোনা গেল। মিজান নার্ভাস হয়ে অতি দ্রুত ছবি ও চিঠি লুকিয়ে ফেলল। এর পর থেকে মিজানের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে যুক্ত হলো রাতে ঘুমানোর আগে নিয়মিত মেয়েটির ছবি দেখা ও চিঠিটি পড়া। এরূপে মিজান গোপনে হামিদার প্রেম পড়ল।

মিজানের মা-বাবা হীরার আংটি ও এক সেট সোনার গয়না দিয়ে মিজানের সঙ্গে হামিদার বিয়ে পাকা করে রাখলেন। মিজান ১০ মাস তার শিক্ষা সফর শেষ করে দেশে ফিরে এলে মিজান-হামিদার বিয়ে মহা ধুমধামে সম্পন্ন হবে।

 

দুই.

সামান্য হাঁচি-কাশিতে মা-বাবার বাড়াবাড়ি, বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে দৌড়াদৌড়ি; মিজান বিরক্ত হলেও মা-বাবা কষ্ট পাবেন ভেবে সে কখনো প্রতিবাদ করেনি। মা-বাবার কথা মেনে চলেছে। তার শিক্ষা সফরের আয়োজন যখন শেষ, সাত দিন পর ফ্লাইট, সেদিন রাতে মিজান সামান্য কাশি, জ্বর ও বুকে ব্যথা অনুভব করল। মিজান বিষয়টি গোপন করল এই আশঙ্কায়, মা-বাবার কানে গেলে তার ভ্রমণ স্থগিত হতে পারে। পরদিন কাশির শব্দ শুনে রহিমুন্নেসা মিজানকে পারিবারিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি কিছু টেস্ট করাতে দিলেন। টেস্টের রিপোর্ট পেয়ে ডাক্তারের মুখ গম্ভীর হলো। তিনি দেশের স্বনামধন্য ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে পাঠালেন। তিনি রিপোর্টগুলো দেখলেন, ফের টেস্ট করালেন। ফলাফল দেখে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বললেন, দুঃখিত। খুবই খারাপ সংবাদ, আপনাদের জানা প্রয়োজন। আপনাদের ছেলে মিজান লাং ক্যান্সারে আক্রান্ত। বিদেশে অনেক উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। দেরি না করে সেখানে নিয়ে যান।

প্রথমে সিঙ্গাপুর। সেখান থেকে আমেরিকায়। সব জায়গার ফলাফল এক। এমনভাবে ছড়িয়ে গেছে, কেউ অপারেশনের পক্ষে মত দিচ্ছে না। পেশেন্টের লাস্ট স্টেজ চলছে। তিন থেকে চার মাস হয়তো বাঁচবে। দেশে ফিরে পারিবারিক পরিবেশে থাকা ভালো। শেষ ভরসা আল্লাহ। যদি শেষ মুহূর্তে অলৌকিক কিছু ঘটে! এমন ঘটনার নজির মেডিক্যাল সায়েন্সে আছে। অলমাইটি আল্লাহর দয়ার রহস্য কতটুকুই বা আমার জানি!

দেশে ফিরে অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, ভেষজ, কবিরাজি ও শাস্ত্রীয় চিকিৎসা এবং বিধান মতে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন, দান-খয়রাত, মাদরাসা-মসজিদ, এতিমখানা নির্মাণ—এসব করতে করতে এক মাস কেটে গেল। প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে মৃত্যুকে সে দেখতে পেত। আজরাইল তার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দাঁত খুঁটে খুঁটে অধৈর্য হয়ে পড়েছে। আজরাইলের মন ভালো থাকলে মাঝেমধ্যে মিজানের সঙ্গে কথাবার্তা বলত।

কিরে, আজ শরীর কেমন? কী মনে হয়, কত দিন লাগবে? তুই আমাকে ভোগাবি।

একটু ভালো মনে হচ্ছে। যন্ত্রণাটা অন্য দিনের চেয়ে কম।

যতই তুই মৃত্যুর দিকে এগোবি, তোর যন্ত্রণা ততই কমতে থাকবে। যন্ত্রণাগুলো ধীরে ধীরে ভোঁতা অসাড় অনুভূতিহীন হয়ে আসে। মরে গেলে আর কোনো যন্ত্রণা থাকে না। চির প্রশান্তি।

তুমি সারাক্ষণ মৃত্যুর কথা বলো কেন? সব সময় ভয় দেখাও। তুমি তো জানো আমার জীবনযাপনে ধর্মীয় বিধানের প্রতিটি নির্দেশ আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। আমি কি তার কোনো পুরস্কার পাব না? আমার কেন অসহ্য যন্ত্রণা হয়?

পুণ্যবান কিংবা পাপী উভয়কে মৃত্যুর যন্ত্রণা গ্রহণ করতে হবে। আমি সত্য বলি, মানুষ মিথ্যা শুনতে পছন্দ করে। তাই আমাকে অপছন্দ করে। তোর আয়ু আরো এক মাস কমে গেল। তোর কোনো ইচ্ছা থাকলে বলতে পারিস। যদি আমার ক্ষমতার মধ্যে পড়ে পূরণ করে দেব।

হামিদার কথা মনে পড়ে। দেখতে ইচ্ছা করে। আমার এত কঠিন অসুখ, আমাকে দেখতে এলো না। জীবনের শেষ দেখা হয়ে যেত। আর তো সময় পাব না।

আমার ক্ষমতার বাইরে। ওকে ডেকে দেখতে পারিস, যদি দয়া হয়।

মিজান হামিদাকে এক গোপন আর্তি পাঠাল, ‘আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে আমি কখনো কিছু চাইনি। আজ তোমার কাছে চাইছি। তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছা করছে। জীবনের শেষ ইচ্ছা। জীবনে আর কিছু চাইবার নেই। ’

হামিদা উত্তর পাঠিয়েছে, ‘আমাকে ক্ষমা করিবেন। এই ঘটনা জানাজানি হইলে আমার বিবাহ হইবে না। আপনার আংটি ফেরত পাঠাইলাম। আমার সহিত আর কোনো যোগাযোগ করিবেন না। আল্লাহর দোহাই। ’

পরদিন সকালে মিজানের মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ করা গেল। শান্ত, নিরীহ, বাধ্য মিজান বহু বছর শীতঘুমের পর অকস্মাৎ জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো লাভা উদগিরণ শুরু করল। দরজায় দাঁড়িয়ে আজরাইল যথারীতি দাঁত খুঁটছিল। মিজান ক্রোধে আজরাইলের দিকে গ্লাস ছুড়ে মারল, একের পর এক দশটা গ্লাস। হঠাৎ আক্রান্ত হয়ে আজরাইল হতভম্ব, আরে হচ্ছেটা কী?

মিজান লাভা উদগিরণ করে বলল, তোর কোনো কাজ নেই? দিনরাত আমার ঘরে শুয়ে-বসে-গল্পে মহা আরামে দিন কাটাচ্ছিস। ভাগ এখান থেকে। আর যেন না দেখি। যেদিন সময় হবে সেদিন আসবি। যে কয় দিন বেঁচে আছি, আমাকে আমার মতো করে বাঁচতে দে। আজ থেকে আমি আমার। আমি স্বাধীন।

বাড়ির সব লোক ভয়ে, আতঙ্কে, উত্তেজনায় মিজানের ঘরের দরজায় এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। ভেতরে ঢোকার সাহস কারো নেই। একজন ছুটছে মিজানের মা-বাবাকে খবর দিতে। মিজান সুস্থ মানুষের মতো রোগীর শয্যা ছেড়ে সদর্পে বেরিয়ে এলো। রহিমুন্নেসা ছুটতে ছুটতে এসে মিজানকে জড়িয়ে ধরলেন—বাবা, আমার সোনা, কী হয়েছে? চাকরবাকরদের নির্দেশ দিলেন, তোমরা এখান থেকে যাও।

মিজান মৃদু গলায় বলল—মা, ঘরে থাকতে থাকতে আমার ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে, আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। রহিমুন্নেসা মাথায়-পিঠে আদর বুলিয়ে বললেন—বাবা, তুমি অসুস্থ। ডাক্তারের নির্দেশ তোমাকে মানতে হবে। তোমার এখন বিশ্রাম প্রয়োজন।

মিজানের বাবাও চলে এসেছেন। তিনিও বললেন, তোমার মা ঠিকই বলেছেন। তুমি দুর্বল। তোমার রেস্টে থাকা দরকার।

মিজান ক্রোধে চিৎকার করে বলল, স্টপ! যে কয় দিন বাঁচব আমার মতো করে বাঁচতে দাও। কোনো কথা বলবে না। কোনো উপদেশ দেবে না। তোমাদের পছন্দ হোক বা না হোক, আজ থেকে আমি আমার মতো চলব।

নিচতলায় বাইরের ড্রয়িংরুমের সব ফার্নিচার সরিয়ে মসজিদ বানানো হয়েছে। সেখানে ২০-২৫ জন বালক হুজুর কোরআন তিলাওয়াত করছে।

মিজান বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, কে মারা গেছে?

বাড়ির ম্যানেজার ছুটে এসে বললেন, আপনার রোগমুক্তি চেয়ে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া চলছে। আল্লাহ মহান, আমাদের এত মানুষের দোয়া ব্যর্থ হবে না। ইনশাআল্লাহ, আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।

এখনই ঘর খালি করেন। আমি ফিরে এসে ঘর আগের মতো দেখতে চাই। মিজান তার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

মিজানের ক্ষুধা পেয়েছে। সে একটা শপিং মলে গিয়ে গাড়ি পার্ক করল। টপফ্লোর রেস্তোরাঁয় ব্রেকফাস্ট সেরে কফি খেতে খেতে ঢাকা শহরের শোভা উপভোগ করতে লাগল। সে লক্ষ করল, অন্য কাস্টমার ও রেস্তোরাঁর লোকজন বারবার আড়চোখে তাকে লক্ষ করেছে। সে স্লিপিং ড্রেসে চলে এসেছে। নিচে নেমে সে একটা হেয়ারড্রেসারের দোকানে ঢুকল। তার বাবরি চুল ছোট হয়ে সময়ের স্টাইলে পাল্টে গেল। মুখের লম্বা চাপদাড়ি চুলের সঙ্গে মিল রেখে ফ্রেঞ্চকাট হলো। পোশাকের দোকানে ঢুকে ক্যাটালগ ঘেঁটে এক সেট গায়ে দিল, অন্য সেট সঙ্গে নিল।

কয়েক বছর আগে ছাত্রজীবনে সে সার্ভে স্টাডিতে সাভারে একটি মানসিক প্রতিবন্ধী স্কুল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে গিয়েছিল। শ্যামল-বরণ একজন শিক্ষিকাকে দেখেছিল—কী গভীর ভালোবাসায় অসীম ধৈর্যে হাসিমুখে প্রতিবন্ধী শিশুদের শেখানোর চেষ্টা করছে। মেয়েটিকে দেখে কেন যেন সেদিন মাদার তেরেসার কথা মনে পড়েছিল। সেই মেয়েটির কথা আজ হঠাৎ মনে পড়ল।

মিজান সাভারে এসে মানসিক প্রতিবন্ধী ও পুনর্বাসন কেন্দ্রটি খুঁজে পেল। মিজান আশা করেছে, সে আগের মতো আজও দেখতে পাবে মেয়েটি ক্লাস নিচ্ছে। মেয়েটিকে সে খুঁজে পেল না। মেয়েটির নাম-ঠিকানা কিছুই সে জানে না। মেয়েটির বর্ণনা ও সময় জেনে এক সিনিয়র শিক্ষিকা বললেন, আপনি মেঘার কথা বলছেন। ওর বিয়ে হয়েছে। ও চাকরি ছেড়ে স্বামীর সঙ্গে চলে গেছে।

নদীর পারে কাশবনে অনেক যুগলবন্দি তরুণ-তরুণী বেড়াতে এসেছে। ছবি তুলছে। মিজান তার সারা জীবন রিউইন্ড করে দেখে নিল। তারপর ঢাকায় ফিরে এলো।

রাতের খাবার খেতে এসে মিজানের শরীর ও মন দুই-ই খারাপ হলো। তার মনে হলো এবার ঘরে ফিরে যাওয়া উচিত। তার বিশ্রাম দরকার। আবার এই ভেবে খুশি হলো, তার ২৫ বছরের জীবনে আজ তার প্রথম স্বাধীনতা।

গুলশানের এক নিরিবিলি রাস্তায় মিজান দেখতে পেল দুটি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, সেই গাড়ি দুটি ঘিরে চার-পাঁচজন সুন্দরী মেয়ে। একটি গাড়িতে উঠে দুজন তরুণী চলে গেল। মিজান কৌতূহলে তার গাড়ি অন্য গাড়ির পেছনে দাঁড় করাল। সঙ্গে সঙ্গে তিনজন তরুণী তার কাছে দৌড়ে এলো। মেয়েগুলো ফরসা সুন্দরী সুসজ্জিত। কেউ পরেছে স্কার্ট, নগ্ন পায়ের সৌন্দর্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। কেউ সালোয়ার-কামিজ, কেউ বা জিন্স, টি-শার্ট পরনে। সবার পোশাক, হেয়ারস্টাইল, সাজসজ্জা ভিন্ন। একটা বিষয়ে সবার মিল আছে, দুই স্তনের সন্ধিক্ষণে কমবেশি উন্মুক্ত। একটা মেয়ে লাস্যময়ী ভঙ্গিতে বলল, আমাদের সবার রেট পাঁচ হাজার। কাকে পছন্দ বলেন, উঠে পড়ি। এর চেয়ে কম রেটে চান তো ওই মেয়েটাকে দেখুন। নতুন এসেছে। দুই হাজার পেলেই রাজি হয়ে যাবে। আরেকটা গাড়ি এসে দাঁড়াতে সব মেয়ে ওই গাড়ির দিকে ছুটে গেল। মিজান দেখল, কিছুটা দূরে আলো-আঁধারে শাড়ি পরা একটি লম্বা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুঃখী মুখে ডাগর আঁখি মেলে সকরুণ নয়নে বড় আশায় তার দিকে তাকিয়ে আছে। মিজান মেয়েটিকে হাতের ইশারায় ডাকল।

মেয়েটি খুশিতে ছুটে এলো। শ্যামল-বরণ দীর্ঘাঙ্গী অভাবী শরীর, শাড়ি পরনে, জলে ভাসা ডাগর আঁখিতে কাজলের টান, কপালে ছোট লাল টিপ। আর কোনো সাজসজ্জা নেই, কিংবা সাজসজ্জা ক্রয়ের সামর্থ্য নেই।

মেয়েটি সকরুণ কণ্ঠে বলল—‘স্যার, দয়া করে আমাকে যা দেবেন, তা-ই নেব। তিন দিন ধরে খালি হাতে ঘরে ফিরছি। আজ কিছু না পেলে আগামীকাল না খেয়ে থাকতে হবে। আমাকে দয়া করুন। ’

মিজান মেয়েটিকে গাড়িতে তুলল। মেয়েটি সামনের সিটে বসার জন্য দরজা খুলছে। মিজান বলল, তুমি পেছনের সিটে বসো।

একটি অভিজাত রেস্তোরাঁয় মিজান গাড়ি দাঁড় করাল। বলল—‘চলো, রাতের খাবার খেয়ে নিই। ’

একটা নিরিবিলি কোণ বেছে নিয়ে মিজান জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কী খেতে পছন্দ করো?’

মেয়েটি উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, ‘বড় চিংড়ি মাছের ভুনা, আর রূপচাঁদার ফ্রাই। কবে যে শেষবার খেয়েছি, মনে করতে পারি না’—বলেই মেয়েটি অপ্রস্তুত ও নিষ্প্রভ হয়ে পড়ল। মৃদু গলায় বলল—‘স্যার, এক টুকরা ইলিশ মাছের তরকারি আর ডাল দিয়ে পেট ভরে ভাত খেতে পারলে আজ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। ’

চিংড়ি মাছ আর রূপচাঁদার সাইজ দেখে মেয়েটির অজ্ঞান হওয়ার অবস্থা। আরো নানা পদে টেবিল ভরে গেল। মিজানের সামনে শুধু এক কাপ কফি।

মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, আপনে খাবেন না?’

মিজান বলল, ‘আমার অসুখ, খেতে পারি না। তাই অন্যের খাওয়া দেখতে আমার ভালো লাগে। তুমি মন ভরে খাও, পেট ভরে খাও। আমি মন ভরে দেখি। তুমি যখন খাবে মনে হবে আমি খাচ্ছি। ’

মেয়েটি চিংড়ি খেল স্বপ্নের মতো করে। রূপচাঁদা শেষ করল তৃপ্তির সঙ্গে। এরপর সে কাচ্চি রোস্ট খেল। সে খাওয়ায় আনন্দ ছিল না, লোভ ছিল। তার পরের খাবার বিতৃষ্ণায় ভরে গেল। সে আর খেতে পারছে না।

মেয়েটি বলল, ‘পেট ভরে এমন সুস্বাদু খাবার জীবনেও খাই নাই। স্যার, বাকি খাবার প্যাকেটে দিতে বলবেন। আমার দুই দিনের খাওয়ার চিন্তা করতে হবে না। ’

মিজান মৃদু হেসে বলল, ‘আচ্ছা। তুমি আইসক্রিম খাবে?’

ছেলেমানুষের মতো খুশিতে মেয়েটি হেসে উঠল, ‘আইসক্রিম আমার খুব পছন্দের খাবার। স্যার প্লিজ, আমার সঙ্গে আপনিও আইসক্রিম খাবেন। ’

‘আইসক্রিম আমারও খুব প্রিয়। এখন খেতে পারি না। ডাক্তারের নিষেধ। ঠাণ্ডা খেলে শরীর খারাপ করে। ’

আইসক্রিম খেতে খেতে মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, আপনার কী অসুখ? কিছুই খেতে পারেন না। খেতে না পারলে দুনিয়ায় বেঁচে থেকে লাভ কী?’

মিজান বিষণ্ন গলায় বলল, ‘আমার ক্যান্সার হয়েছে। পৃথিবীতে আর দুই-তিন মাস হয়তো বেঁচে থাকব। ডাক্তার তাই বলেছেন। ’

মুহূর্তে সব কথা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-আনন্দ-কোলাহল থেমে গেল। নিঃশব্দ এক পৃথিবীতে ওরা দুজন মুখোমুখি বসে আছে। মেয়েটির চোখের জল গড়িয়ে পড়ার আগে জমে যাচ্ছে। যে কারণে কারো দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।

অস্বস্তিকর নৈঃশব্দ ভাঙতে মিজান শব্দ করে হেসে উঠল, ‘এতক্ষণ ধরে কথা বলছি, এখন পর্যন্ত তোমার নাম জানা হয়নি। ’

মেয়েটি বলল, ‘আমি সঠিক নাম কাউকে বলি না। নিরাপত্তার কারণে। আপনাকে কোনো মিথ্যা বলব না। আমার নাম মেঘা। ’

তুমি সাভারে প্রতিবন্ধী শিশুদের একটি পুনর্বাসনকেন্দ্রে চাকরি করতে। তোমার বিয়ে হয়েছে। এ পথে এলে কী করে?

মেঘা অবাক হয়ে বলল, ‘আপনি আমার এত খবর জানেন কী করে?’

সে পরে বলছি। তুমি কী করে এ পথে এলে, সেটা বলো।

বিয়ের পর আমার স্বামী বলল, সাভার পুনর্বাসন কেন্দ্রের বেতন খুব কম। প্রাইভেট প্র্যাকটিস করলে অনেক বেশি টাকা পাওয়া যাবে। আমি চাকরি ছেড়ে দিলাম। ধানমণ্ডির এক ধনী ব্যবসায়ীর স্ত্রী প্যারালিসিস পেশেন্ট। প্রতিদিন বিকেলে পেশেন্টের ফিজিওথেরাপি করাতে তাঁর বাসায় যেতাম। টাকা ভালোই পেতাম। দুই মাস পার হয়েছে, কাজে-ব্যবহারে আমি সন্তুষ্ট। একদিন কাজ শেষ করে বাসায় ফেরার আয়োজন করছি, বাড়ির মালিক আমাকে ডেকে পাঠালেন। মৃদুস্বরে বললেন, বাড়ি ফিরতে আজ হয়তো আপনার একটু সমস্যা হবে।

আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন?

আপনার হাজবেন্ডের সঙ্গে কথা বলেন।

আমার স্বামীকে ফোন করলাম। সে জানাল, গ্রামের জমিজমার ব্যাপারে তাকে হঠাৎ করে বগুড়ায় যেতে হচ্ছে। দুই দিন পর ফিরে আসবে। এ দুই দিন সাভারে না ফিরে আমি যেন পেশেন্টের বাসায় থেকে যাই।

সাভারে আমি যে এলাকায় থাকতাম, এলাকাটার নানা দুর্নাম ছিল। একা থাকতে আমার ভয় করত। আমি পেশেন্টের বাসায় থেকে গেলাম। ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে বাড়ির মালিক গভীর রাতে আমার ঘরে এলো। হাত-মুখ বেঁধে আমাকে রেপ করল। আমাকে জানাল, দুই লক্ষ টাকা দিয়ে সে আমার স্বামীর কাছ থেকে কিনে নিয়েছে। তার সঙ্গে সহযোগিতা করলে তিন মাস পর আমাকে ছেড়ে দেবে। নইলে আমার লাশ গুম হয়ে যাবে। এরই মধ্যে তার স্ত্রীর জন্য নতুন একজন নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিন মাস পর নার্স আমার জায়গায় আসবে। আমার তখন মুক্তি মিলবে।

তুমি থানায় যাওনি কিংবা তোমার মা-বাবার কাছে ফিরে গেলে না কেন?

আমার মা-বাবা নেই। আমি এতিমখানায় বড় হয়েছি। ১০ বছর বয়স থেকে হোস্টেল সুপার, শিক্ষক-শিক্ষিকার কাছে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছি। আমি যতবার পেছনের নোংরা ভুলে স্বাভাবিক সুন্দর জীবনের ছবি দেখেছি, ততবার যৌন নির্যাতন আমার জীবন, স্বপ্ন তছনছ করে দিয়েছে।

একটি লেডিস ফ্যাশন হাউসে মিজান গাড়ি থামাল। বলল, আমার স্ত্রী তোমার মতো সাদাসিধা, বেশি সাজগোজ পছন্দ করে না। তার জন্য কিছু শাড়ি, জামাকাপড় পছন্দ করে দাও। কেনাকাটা করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় ১০টা হলো।

মিজানকে দেখে সারা বাড়িতে হুলুস্থুল পড়ে গেল। মিজান বলল, গাড়ির ব্যাগগুলো আমার ঘরে রেখে আয়। গাড়ি থেকে নেমে মেঘার হাত ধরে মিজান তার ঘরে এলো। মেঘা হকচকিয়ে গেছে, ভয়ও পাচ্ছে। মেঘা বলল, আপনারা এত বড়লোক!

যে মানুষের আয়ু তিন মাস তার বড়লোক হলেই বা কী, গরিব থাকলেই বা কী? দুই-ই সমান।

আমি একটা খারাপ মেয়ে মানুষ। সবার সামনে আমার হাত ধরে নিয়ে এলেন। তাদের কাছে আমার কী পরিচয় দেবেন?

তুমি যদি অনুমতি দাও তোমার সম্মানজনক পরিচয় দিতে চাই।

কিসের অনুমতি?

তোমাকে একটা মিথ্যা কথা বলেছি। আমি বিয়ে করিনি। সব জামাকাপড়, কসমেটিকস তোমার জন্য কিনেছি। তুমি আমাকে বিয়ে করবে? আমার আয়ু তিন মাস। এই তিন মাস আমি বিবাহিত জীবনের স্বাদ গ্রহণ করতে চাই। সন্তানের পিতা হওয়ার সংবাদ শুনতে চাই।

আপনি কি পাগল হয়েছেন? আমি রাস্তার মেয়ে মানুষ। বেশ্যা। আপনি আমাকে বিয়ে করবেন? তা হয় না। আপনি ফেরেশতা, আমি বেশ্যা। আপনার মতো এত ভালো ব্যবহার এ জীবনে আমার সঙ্গে কেউ করেনি। সমাজের কাছে আমি মেয়ে মানুষ, নয়তো বেশ্যা—এই আমার পরিচয়। আপনি আমাকে মানুষ হিসেবে সম্মান করেছেন। অনন্ত নরকবাস বেশ্যাদের কপালের লিখন। আপনার মতো পুণ্য মানুষের পদধূলি নিই, সেই আমার বেহেশত।

মেঘা পদধূলি নেওয়ার জন্য নত হয়েছে, মিজান দুই হাত বাড়িয়ে তাকে আঁকড়ে ধরল। ফিসফিস করে বলল—মেঘা, আমার স্ত্রী হিসেবে তোমাকে স্পর্শ করতে চাই। তুমি না কোরো না। আমার জীবনের শেষ ইচ্ছা তুমি পূর্ণ করো।

মেঘা বলল, আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারব না।

যারা তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করল, তোমাকে বিক্রি করল, যতবার ময়লা ঝেড়ে তুমি ভালো হতে চেয়েছ, সৎ জীবন যাপন করতে চেয়েছ; তারা তোমাকে ততবার রাস্তায় টেনে এনেছে। তোমাকে জোর করে বেশ্যাবৃত্তিতে বাধ্য করেছে, বেশ্যা বানিয়েছে। তারা বেশ্যা হলো না, বেশ্যা হলে তুমি? এটা কোন যুক্তি, কেমন বিচার? আল্লাহর বিচারে তুমি বেহেশতের হুর। স্ত্রী হিসেবে তোমাকে পাওয়া আমার সৌভাগ্য। স্বামী হিসেবে আমাকে গ্রহণ করো। আমার সন্তানের মা হও। সন্তান আমি দেখতে পাব না। তার আগমনবার্তা জেনে যাই। এর চেয়ে বড় পাওয়া পৃথিবীতে আমার কাছে আর কিছু নেই। আমার সারা জীবনের পুণ্য দিয়ে আমি বেহেশতের হুর পেয়েছি। তোমার মাধ্যমে পৃথিবীতে আমাদের স্বাক্ষর রেখে যেতে চাই।

দরজায় নক হচ্ছে। মিজান দরজা খুলে দেখল মা-বাবা গভীর উদ্বেগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মিজান বলল—মেঘা, আমার আম্মা, আমার আব্বা।

মেঘা মাথায় শাড়ির আঁচল টেনে সালাম দিল।

আমার আয়ু আর তিন মাস জেনেও মেঘা আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। আমি মেঘার কাছে তোমাদের বংশধর রেখে যেতে চাই। তোমরা বিয়ের আয়োজন করো।

মিজান জীবনে এই প্রথম নারীদেহ স্পর্শ করল। নারীর স্পর্শে এত আনন্দ, এত মোহ, তীব্র মাতাল আকর্ষণযাতনায় ভরা। একি সুখ, একি অমৃত বাসনা! বিয়ে না করলে মিজানের কোনো দিন তা জানা হতো না।



সাতদিনের সেরা