kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

গ ল্প

জোছনায় পাওয়া পোলা

জিয়া হাশান

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ২০ মিনিটে



জোছনায় পাওয়া পোলা

অঙ্কন : সারা টিউন

সন্ধ্যার আগে আগে দেলু বাড়ি থেকে বার হয়।

এখন চারদিকে পানির হাত-পা ছড়ানো। তার তরল আঁচলতলে জমিজিরাত, কান্দিকাচা সব মুখ লুকানো। তাই নৌকা চালানোর জন্য এখন আর খাল-নালার ওপর ভরসা করতে হয় না।

বিজ্ঞাপন

বরং জমিজিরাতের গা-গতরের ওপর দিয়াই তারে বয়ে নিয়া যাওয়া যায়। দেলু তাই বাড়ি থেকে বার হয়ে তার নৌকার গলুই উত্তর দিক পানে ফেরায়। তারপর লগি মারা শুরু করে। শক্ত-সবল হাতের লগির ঘায়ে তার হাত সাতেক লম্বা নাওখান জোর কদম ফেলে। তরতর করে আগায়। কেননা সন্ধ্যার আঁধার গুছগাছ হয়ে বসার আগেই তার গন্তব্য—ধরখালী বিলে পৌঁছার নিয়ত। তারপর বড়শিতে মাছেগো কবজায় পোরার খায়েশ।

বাড়ির গাছপালার আড়াল থেকে বার হতেই পায় খোলা জায়গা। চারদিক উন্মুক্ত মাঠ। তার পূর্ব দিকে তাকাতেই চোখে পড়ে পূর্ণ চাঁদের অবয়ব—ওহো! আজ তাহলে পূর্ণিমা। বাছুর জন্মানোর সময় তার গা-গতরজুড়ে যেমন সাদা লালা জড়ায়ে থাকে, সদ্য জন্মানো চাঁদের গা-গতরজুড়েও এখন তেমন লালিমা। তাই পুব আকাশটা তার এমাথা-ওমাথায় লালের সমারোহ। তবে দেলু জানে, তা বেশিক্ষণ থাকবে না। বরং কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই সে রূপ পাল্টাবে, খোলস বদল করে ধবধবে সাদা হয়ে উঠবে। তখন তার আলোয় বড়শি বাওয়া, তাতে আবার কেঁচোর টুকরা গাঁথা, ধরা মাছ নৌকার ডরায় রাখা সহজ হবে। দেলুর তাই মাছের সঙ্গে বোঝাপড়া করার উৎসাহে আরেক দফা জোয়ার দেখা দেয়। সে আরো জোরছে, সর্বশক্তিতেই যেন বা লগি চালায়।

দেলুদের বাড়ি থেকে ধরখালী বিল মাইল দেড়েকের পথ। সোজাসাপ্টা গেলে ঘণ্টাখানেক লাগার কথা, কিন্তু কচুরিপানার ঝোপঝাড়ের ফাঁকি দিয়া, তাগো বগলের এপাশ-ওপাশের পথ বেয়ে পৌঁছতে পৌঁছতে দেলুর ঘণ্টা দেড়েক খরচ হয়ে যায়।

ততক্ষণে চান্দের চারপাশের লালিমাদের পাততাড়ি গুটায়ে বিদায় নেওয়া সারা। ফলে সে তাই আদি ও অকৃত্রিম পূর্ণিমার রূপ নিয়ে হাজির। আর মাসটা বর্ষার মেঘেদের দল বেঁধে আনাগোনার মৌসুম হলেও আজ আকাশে কেন যেন তাদের তেমন দাপট নেই। শুধু এখানে-সেখানে ছেঁড়া ছেঁড়া রূপ ধরে, টুকরা টুকরা গতর দিয়ে উপস্থিত। তাই চাঁদ মামাজি তার পুরো রূপ-যৌবন মেলে ধরা। তার সাদা মোমের মতো ফকফকা আলোয় চারদিক প্রায় দিনের রূপ নিয়ে হাজির হওয়া।

দেলু এদিক-ওদিক তাকায়ে দ্যাখে—যত দূর চোখ যায় তার মধ্যে কোনো বাড়িঘর, গাছপালার চিহ্ন নেই।   একেবারে দিগন্ত অবধি যেন সব কিছু খোলা। আর তাতে শুধু চাঁদের আলো তার রুপালি জোছনার হুটোপুটি।

ধরখালী বিল, আড়ে-দিঘে মাইল দেড়েক তার অবয়ব। তা যেন এলাকার মাছের খনি—শোল-গজার-ট্যাংরা-টাকিজাতীয় জলপোকাদের অবাধ আবাস। তাই অনেকেই দিনে কিংবা রাতে, যখন যার যেমন সুযোগ হয়, এখানে আসে বড়শি বাইতে, তার আংটায় মাছদের কবজা করে দুই পয়সা কামাতে। দেলু তাই চারদিকে তাকায় দ্যাখে তার মতো রাতভর মাছের সঙ্গে বোঝাপড়া করার উৎসাহে মাতা আর কেউ আছে কি না। কিন্তু দৃষ্টি যত দূর যায় তার সীমানার মধ্যে কাউকে চোখে পড়ে না। তাহলে কি বিলজুড়ে সে একা? মাছদের সঙ্গে লড়াইয়ে সে একক সৈনিক আজ?

তাতে ভয়ের কিছু নেই। কেননা বিলের আপাদমস্তক দেলুর চেনা। তার আদি খাদ, যারে সবাই বিলের নাভি বলে, তাতে এখন দেলুর সাতহাতি চৌড় বা লগি তল পাবে না। ডাবায়ে দিলে মাঝপথ থেকেই হয়তো ফেরত আসবে। তাই তাতে এখন গভীর জলের দিঘি বা পুকুরের মতো টলটলে পানি।

তবে আদি খাদের চারপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা, শীত-গ্রীষ্মে যা ধান-পাটের ভুঁই-ক্ষেত। সেটাই দেলুদের মাছের সঙ্গে বোঝাপড়া করার ক্ষেত্র, তাদের সঙ্গে লড়াই করে তাদের আটক করার ময়দান। তাতে এখন হাত দেড়-দুই পানি। আর শ্যাওলাপানার সঘন আনাগোনা। ফলে তা যেন এখন জলের নিচে জায়-জঙ্গলি ভাবধরা। তাতেই বিলের মাছেরা অবাধে আসে, পর্যটন করে, মনের সুখে ঘুরে বেড়ায়। দেলুরা তখন তাদের সামনে মুলা, বড়শিতে আধার গেঁথে ঝুলায়ে দেয়। তার প্রলোভনে যারা পড়ে তাদের নাওয়ের ডরায় তোলে। বাজারে নিয়া গিয়া দুই পয়সা কামায়।

চারদিক খোলা জায়গা। সবটারই চেহারা-সুরত এক রকম। কোথা দিয়ে শুরু, কোথায় শেষ তার ঠিকঠিকানা রাখা মুশকিল। দেলু তাই এক ঝোপ কচুরিপানার ওপর হামলা চালায়ে লগি দিয়ে দুই-চারটা বাড়ি দিয়ে তারে সীমানা বানায়। তারে শুরুর চিহ্ন হিসেবে থির করে। তারপর বড়শি পাতার পথে পা দেয়। তার এতটুকু লোহার সরু আংটায় সাইজ করা কেঁচো গাঁথে। মাছদের জন্য তা সঙ্গে সঙ্গে লোভনীয় টোপ হয়ে যায়। ব্যস, তারপর বড়শির লম্বা দেহের কঞ্চির লাঠি, যারে অনেকে ছিপ বলে, তা হেলান দিয়ে এমনভাবে পানির তলার মাটিতে গাঁথে, যাতে টোপটা দেড়-দুই বিঘত পানিতে ডুবে থাকে। মাছদের জন্য মুলা হয়ে ঝোলে।

শ্যাওলাপানার ফাঁকে ফাঁকে দশ-বারো হাত দূরে দূরে একটার পর একটা বড়শি এভাবে জুতসই মতো করে পাতে। সব, শখানেক পাতা শেষ হলে দেলু উঠে দাঁড়ায়। আবছা আলোতেও অনুমান করতে পারে—তার সব বড়শি সার হয়ে আছে।

ব্যস, প্রথমে খেপের কাজ শেষ। এখন কিছুক্ষণ জিরোন্তি। অপেক্ষা মাছদের টোপের ঘ্রাণ পাওয়া, ছুটে আসা, তারপর গপ করে গেলা পর্যন্ত। তাদের সে সুযোগ দেওয়ার জন্যই দেলু যেন তার বড়শির সারি থেকে সরে যায়। দূরে গিয়ে অপেক্ষার কাল কাটায় আর বাড়ি থেকে গামছার কোনায় বেঁধে আনা শুকনা চিড়া চিবায়।

প্রথম খেপের টাইম শেষ হলে দেলু আস্তে ধীরে তার বড়শির সারির শুরুতে আসে। একটার পর একটা পরখ করে, কিন্তু কই! মাছের টানাহেঁচড়া, টোপ গিলে আটকা পড়ার পর তা থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য তাদের জান কোরবান করা ছটফটানি, জলের ভেতরে বড়শির সঙ্গে কোস্তাকুস্তি কোথায়? তার কিছুই তো নেই। কোনো বড়শিতে কবজা করা মাছের দেখা-সাক্ষাৎ না পেয়ে দেলু আরো কাছে আগায়। দু-একটা বড়শি হাতে তুলে দ্যাখে। গাঁথা আধার আছে কি না, পরীক্ষা করে। কেননা মাছদের মধ্যে অনেক আছে কলেজ-ভার্সিটির ক্যান্টিনে ছাত্রনেতাদের মতো ফাও খাওয়ার ওস্তাদ। বিশেষ করে টাকি মাছগুলো। তারা টোপ দেখলেই গপ করে মুখে পোরে না। বরং ঠুকরে ঠুকরে তাদের আলগা করে। তাতে করে একসময় বড়শি থেকে আধার, কেঁচোর টুকরাটা আলাদা হয়ে যায়। তখন তারে মুখে পুরে অনায়াসে পেটে চালান করে দেয়। আর বড়শির আংটাটা এতিমের মতো একলা হয়ে ঝুলে থাকে। কিন্তু কই! সে রকম কাহিনি তো নয়। কেননা দেলু কাছে গিয়ে কোনো কোনোটা জল থেকে তুলে নিয়ে দ্যাখে তাদের আধারগুলা যেভাবে গেঁথে দিয়েছিল, সেভাবে আছে। শুধু অনেকক্ষণ ধরে জলের তলে থাকায় একটু ফরসার রূপ নিছে।

তাহলে কি মাছেরা সবাই আজ অনশনে আছে, উপবাস করছে? নাকি সংযমে পা দিছে, রোজা রাখছে? তাই কারো কোনো খাবারের চাহিদা নেই। টোপ গেলার ধারেকাছেও আসছে না কেউ। দেলু তার হিসাব মেলানোর চেষ্টায় একবার বড়শির সারির এমাথায় একবার ওমাথায় ছুটে বেড়ায়। তার পরও কোনো আশার আলো দেখতে পায় না। একটা বড়শিতেও মাছ গাঁথার আলামত নেই। তাদের যেমন রেখেছিল তেমন তারা বকের মতো গলা বাড়িয়ে দিয়ে থির হয়ে আছে।

তাহলে কি বড় কোনো মাছ, দুই-আড়াই মণি রুই-কাতলা কিংবা বোয়াল বিলের গভীর খাদ থেকে উঠে এসে এ এলাকায় চড়ে বেড়াচ্ছে? বন-জঙ্গলে যেমন বাঘ এলে আর সব ছোটখাটো প্রাণী সতর্ক হয়ে যায়। চোখ-কানরে সজাগ করে তোলে। খাবারদাবার রেখে জান বাঁচাতে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে নিরাপদ জায়গায় পালায়। তেমনি কি আড়াই মণি মাছের ভয়ে শিং-শোল-টাকিরা সব গাঢাকা দিছে। এলাকা ছেড়ে ভাগছে? টোপ গেলার মতো তাদের কেউ আর এখন এ এলাকায় নেই।

এখন সে বড়টাই যদি কোনো টোপ গেলে? কোনো বড়শিতে গাঁথে, তাহলে তো একটাতেই কেল্লা ফতে। একটাই এক শ হয়ে উঠবে। বাজারে নিয়ে কেটেকুটে ভাগা দিয়ে বেচা যাবে। দেলু সে আশায় আরো একবার তার বড়শির সারি সায়ের করে। এমাথা থেকে ওমাথায় সতর্ক চোখ বোলাতে যায়। কিন্তু না, তার কোনো আলামত নেই। কোনো বড়শি মুখে কোনো মাছ কিছুই নেই। থাকবে কী করে, এতটুকু বড়শি কি এত বড় মাছরে সামাল দিতে পারবে? সে তো উপড়ে ফেলবে, ছুটে নিয়ে পালাবে।

কিন্তু কামকাইজ ছাড়া, পানিতে বন্দি হইয়া, গত তিন দিন বাড়িতে বসা। আয়-রোজগারের পথে আগল পড়া। তারপর আইজ যদি মাছও না জোটে, দুটো পয়সা কামাইয়ের পথ না খোলে তা অইলে তো সামনের দিনগুলা না খাইয়া মরতে অইবে। দেলু তাই মাছের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। বারবার বড়শির সারি পানে ফেরে। এমাথা থেকে ওমাথা সায়ের করে বেড়ায়।

শেষবার ওমাথায় পৌঁছে দ্যাখে, চান্দের মাথা বরাবর হাজির হওয়া সারা। এখন তাই তার বাহারি রূপ, খোলতাই চেহারা। ফলে তার জোছনার বিপুল দাপট। দেলু এদিক-ওদিক তাকায়ে দ্যাখে দিগন্তজুড়ে জোছনার রুপালি ধারা ছাড়া আর কিছুই যেন চোখে পড়ে না।

ছোটবেলাতেই জোছনার সঙ্গে দেলুর জানা-পরিচয়। তার পর থেকে প্রতি মাসের পূর্ণিমা তিথিতে চাঁদের আলোয় ঘরবাড়ি সয়লাব হতে তার দ্যাখা, উঠানে তার লুটোপুটি খেলা, বারান্দার পুব পাশে তার কদম ফেলা অনেক চোখে পড়েছে। কিন্তু তার আজকের এই ভয়াবহ রূপ, চরাচররে কবজায় পোরা দাপট, দেলুর কখনো চোখে পড়েনি। সে কান খাড়া করে—অ্যাঁ একি! কোথাও কোনো জনপ্রাণীরও সাড়াশব্দ নাই। এমন নীরব-নির্জন রাতে তো সামান্য শব্দ, এতটুকু মাছের এতটুকু ঘাই বিকট হয়ে ওঠে। দূর থেকে কানে আসে, কিন্তু এত বড় বিশাল বিলের কোথাও তো তাদের ঘাই, জলরে চাটি মারার আওয়াজ কিংবা ঝোপের মধ্যে শয্যা পাতা জলচর কোনো পাখির পাশ ফেরা, ডানা ঝাপটানোর কোনো আওয়াজই তো নেই। এমনকি খোলা জায়গা পেয়ে বাতাসের মাঝেমধ্যে গা মোচড়ানো, হুড়মুড়ি শব্দ তোলা—তার কিছুই তো শোনা যাচ্ছে না।

দেলুর জানা আছে, যে রাতে জোছনা তার পুরা দাপট নিয়ে হাজির হয়। সব কিছুরে নিজের করতলে নেওয়া। সে রাতে আর কারো কিছু করার থাকে না। বরং সবার থির হয়ে থাকতে হয়। আইজ তাহলে সেই দিন। সবাইরে—জনপ্রাণী, গাছপালারে জোছনায় পাওয়া রাইত। তাই এ সব কিছু যেন তার রুপালি রূপের মোহে পইড়া আছে। জল-স্থলের কেউ আর নড়তে পারছে না। ফলে মাছদেরও কোনো চলাচল নেই। তাদের দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ। দেলু তাই ফিরে যাওয়ার মনস্থ করে। তার নৌকার গলুই বাড়িমুখো করতে যায়।

কিন্তু একি! যত সে লগি ঠেলে, সর্বশক্তি দিয়ে খোঁচায়, তাতে কোনো কাজ হয় না। নৌকা এক পা-ও আগায় না। তবে মনে হয় যেন চলছে, তরতর করে আগাচ্ছে, কিন্তু নাও যেখানে ছিল সেখানেই থির। অ্যাই তো টগরের ঝোপ, কচুরিপানার ঝাড় তখন থেকেই তার পাশে, তারে আর ছাড়ায়ে যাওয়া হয় না। অ্যাঁ! তা অইলে কি মোরেও জোছনাই পাইছে! তার চাইর বাহু দিয়া আটকাইয়া ধরছে! দেলু লগি রেখে ধপ করে নৌকার চরাটে, কাঠে গড়া পাটাতনে বসে পড়ে।

 

দুই.

রেবু খোলা বারান্দা, মূল ঘরের সঙ্গে লাগোয়া বোনাস ভাগে উঠে উঠান পানে তাকায়। দেলুরে দেখার চেষ্টায় পা দেয়। কিন্তু তারে ঘিরে বেশ লোকজন, তারা রেবুর চোখের অবাধ গতির পথে আগল হয়ে থাকে। সরাসরি দেখায় বাগড়া দেয়। রেবু তাই পায়ের দুই বুড়ো আঙুলের ওপর নিজেরে সোপর্দ করে তাদের ওপর বল-ভরসা দিয়ে খাড়ায়। তারপর আবার গলারে উঁচায় নেয়, জিরাফের মতো বানানোর চেষ্টা চালায়। তখন কারো মাথার এপাশ, কারো ওপাশ এমনকি দু-একজনের ওপর দিয়ে চোখ গলাতে সক্ষম হয়। লোকজনের ফাঁকফোকর দিয়ে নজর পাঠাতে পারে। তখন শুধু দেলুর একটা পাশ, ডান দিকটা চোখের আগায় হাজির হয়। তাতেই বোঝে—দেলু হোগলাপাতার পাটিতে টান টান হওয়া। তারে চিত কইরা শোয়ায়ে রাখা। পুরা দেহ নিথর। কোনো নড়নচড়ন নাই, কিন্তু এতটুকু দেখায় রেবুর হাউস মেটে না। বরং পুরাটুকু দেখার তৃষ্ণায় ঘিয়ের ফোঁটা পড়ে, তা দাউদাউ করে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। মন চায় দেলুরে ঘিরে রাখা ভিড়টারে দুই হাতে ঠেলে ফাঁক করে, তারপর কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ায়ে সরাসরি সবটুকু আপাদমস্তকে চোখের তৃষ্ণা মিটায়ে দেখে নেয়। কিংবা নাটক-সিনেমায় দেখা রাজা-বাদশাহর মতো হুকুম করে—হঠ যাও, তফাত সরো। সঙ্গে সঙ্গে সবাই দুই দিকে সরে যায়, দেলুর দেহটা তখন আপাদমস্তকে চোখের সামনে এসে হাজির হয়। বারান্দাতে দাঁড়ায়েই সে সবটুকু দেখে নেয়।

কিন্তু রেবুর এসব কিছু করার মুরোদ কোথায়। সে তো কোনো রাজা-বাদশাহ নয়; বরং গ্রামের সামান্য ষোড়শী মাত্র। তাই মেয়েদের জন্য বরাদ্দ ঘরের সঙ্গে একই ছাউনিতলে তার বোনাস ভাগ—বারান্দায় দাঁড়ায়ে ঘাড়রে একবার ডাইনে একবার বাঁয়ে কাতায়ে দেলুর দেহের পুরাটুকু দেখার প্রয়াস চালায়ে যায়। কেননা সে আগে কখনো জোছনায় পাওয়া, তার কবজায় পোরা কাউরে দ্যাখে নাই। বারান্দায় জড়ো হওয়া আর সব গ্রাম-সম্পর্কীয় চাচি-ফুফু, লম্বা ঘোমটায় মুখ ঢাকা দু-চারজন ভাবি, তাদের কথাবার্তা রেবুর কানে যায়। তাতে বোঝে তারাও কেউ কখনো জোছনায় পাওয়া মানুষ দ্যাখে নাই। তাদেরও তাই দেলুরে দেখার, তার আপাদমস্তকে চোখ বোলানোর আগ্রহ প্রবল, কিন্তু উঠানে তারে ঘিরে ধরা সব পুরুষ। তাদের জটলায় ঘেরা তার দেহ।

তাদের দেখা শেষ হলে মরা মানুষ যেমন মেয়েদের দেখায়, তেমনি পুরুষদের সরায়ে দিয়ে ঘোমটাঅলিদের ডাকে—‘আহো আহো, শ্যাষ দ্যাহা দেইখা যাও’, তেমন কইরা কি দেলুরে দেখতে মেয়েদের ডাকবে? তখন তারা বারান্দা থেকে দল বেঁধে নেমে গিয়ে দেলুরে আপাদমস্তক দেখতে পাইবে? জড়ো হওয়া চাচি-ফুফুরা হয়তো সে আশায় থাকে। নিজেগো মইদ্যে তা নিয়া ফিসফিসায়।

কিন্তু দেলু তো মরে নাই। তার তো ষোলো আনা জ্যাতা। তা অইলে আর মেয়েগো দ্যাখানোর আয়োজন করবে ক্যান? তাগো উঠানে ডাকবে কোন কারণে? কিন্তু রেবুর যে পুরাপুরি দেখার ইচ্ছা জলে ভরা পুকুরের মতো থইথই করা, আনাচকানাচ উপচানো। তাইতো এত দূর পথ, ঘণ্টাখানেকের নৌযাত্রা পাড়ি দিয়ে তার আসা। কেননা জোছনায় পাওয়া কাউরে দ্যাখার চান্স নিত্য মেলে না, জীবনে দু-একবার হয়তো বা। রেবু তারে হেলায় হারাতে রাজি না। তাই এপাশ-ওপাশ থেকে ইতিউতি করে চোখ পাচারের প্রয়াস চালায়ে যায়।

দ্যাখে, ছোয়াদ ভাই আসছে। পুরুষদের জটলা থেকে বার হয়ে ঘরের বারান্দা পানে তার কদম। তারে বললে একটা হিল্লে, দেলুরে পুরাপুরি দেখার চান্স মিলতে পারে বলে রেবু আশাবাদী হয়ে ওঠে। কেননা সে-ই তো দেলু উদ্ধার অভিযানের এক ও অদ্বিতীয় নায়ক। রেবু তারে আপাদমস্তক চেনে। তাগো বাড়ি থাইকা দুইডা বাড়ি পর তার আবাস। আর মাছদের সঙ্গে সংগ্রাম, যুদ্ধ-জিহাদই তার জীবন। তাই তাদের কবজায় পুরে হাট-বাজারের ডালায় না তুললে তার সংসার অচল। চাল-ডাল, তেল-মরিচের জোগানে ঘাটতি। ফলে বছরের বারো মাস, তিন শ পঁয়ষট্টি দিনই তার মাছদের সঙ্গে দহরম-মহরম করতে হয়।

দীর্ঘ বিশ-বাইশ বছর ধরে এভাবে মাছদের সঙ্গে ঘর করায়, একেক মৌসুমে একেক হাতিয়ার—জাল-বড়শি, ভ্যাসাল-চাঁইয়ে তাদের কবজা করে হাতে পোরায়, তাদের ভাব-চরিত্র, মতিগতি তার নখদর্পণে। হাতের তেলোয় আঁকা। তাই কাল রাতে জগত্জুড়ে জোছনার প্রবল দাপট, বিপুল বিক্রমে দুনিয়ার ওপর ঝাঁপাইয়া পড়া দেখে তার মনে হয় আইজ আর মাছেরা উজাইবে না। রাইতে যে দিন মনে কইরা বিলের খাদ থাইকা গা তুলবে না। বরং যাদের অতলে ঝিম মাইরা বইসা থাকবে। তাই রাইতের শুরুর ভাগে বিলে পা দেওয়া থেকে বিরত থাকে। মাছ কবজায় পোরার কর্মসূচি স্থগিত রাখে।

কিন্তু তাহলে তার সংসার চলবে কিভাবে? তেল-নুন, চাল-ডালের জোগান আসবে কোত্থেকে? তাই সে জোছনার বিদায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, সদ্য ভোরের দিকে ধরখালী বিলে গিয়ে হাজির হয়। তার চৌহদ্দির মধ্যে পা দিতেই দেখে তার আগেই কে যেন হাজির। ওই তো তার নাওয়ের আগা, গলুইয়ের কোনা টগরের ঝোপের আড়াল থাইকা উঁকি দেওয়া। কেডা? তারে ডিফিট দিয়ে তার আগে কে আইলো? তা দেখার কৌতূহলের পাল্লায় পইড়া ছোয়াদ ভাই আগায়, টগবরার ঝোপের ওপারে গিয়ে দ্যাখে—আরে এ দেহি কুমুদখালীর দেলু। কিন্তুক মাছ মারতে আইয়া শুইয়া রইছে ক্যান? ঘুমাইয়া পড়ল কোন আশে?

ছোয়াদ ভাই আরো কাছে গিয়ে দেলুর নাওয়ের লগে নিজের নাও খাড়া করে। পাশাপাশি নেয়। তখন দেলু হাতের নাগালে চলে আসে। ঠেলা দিয়ে ডাকে—অ্যাঁই দেলু, দেলু...।

কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ নেই। সঙ্গে সঙ্গে ছোয়াদ ভাইয়ের গালে হাত পড়ে—অ্যাঁ! পোলাডার কী অইলো? কোনো দুর্ঘটনা? কিন্তু নাকের কাছে হাত দিয়ে দ্যাখে না, তা না। শ্বাস আছে। তারা যথারীতি বাইরাইতে আবার ডুকতে ব্যস্ত। তা ছাড়া গা-গতরও শীতল না, জ্যাতা মানুষের নাহান গরম। তা অইলে মনে হয় জোছনা তাণ্ডব চালাইছে। রাইতে এত খোলা জায়গায় একলারে পাইয়া জাপটাইয়া ধরছে, শেষে কবজায় পুরছে। তাই তার খপ্পরে পইড়া হুঁশ হারাইয়া বেহুঁশের ঘরে বসত নিছে। ছোয়াদ ভাই তখন দেলুর মুখে পানির ছিটা দেয়। গা ধইরা ঠেলাঠেলিতে যায়, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। বেহুঁশই দেলুর দেহঘড়ি জুইড়া বসত নিয়া থাকে। ছোয়াদ ভাই ভাবনায় পড়ে—তা অইলে রাইতের জম্মের জোছনা দেলুরে জম্মের মতো কইরা পাইছে। বেহুঁশের গহিন গাঙ্গের তলে নিয়া গ্যাছে। বাড়িতে নিয়া ঝাড়ফুঁক দিয়া আছর না ছাড়াইলে হুঁশের আর দ্যাহা মিলবে না।

ছোয়াদ ভাইয়ের তখন মাছ কবজার সব আয়োজন ছিকা লয়। মুলতবি হয়ে পড়ে। বরং দেলুরে নিয়ে তার বাড়িমুখো হতে হয়। আর পথে পথে খবর ছড়ায়—দ্যাইখা যাও, দেলুরে জোছনায় ধরছে। হগোল হুঁশ হারাইয়া ফ্যালাইছে।

সকালে ঘুম ভাঙার পর রেবুর কানে খবর যায়। বাড়িতে তা নিয়ে আলোচনা হয়। কেননা মানুষরে তো আর নিত্য জোছনায় পায় না। বছরে দু-একজনরে হয়তো ধরে। আবার দ্যাখা যায় দশ-বারো বছরেও তার কোনো খবর নাই। তাই জোছনায় পাওয়া মানুষ দেখতে কেমন, তাগো চেহারা-সুরতে মোলায়েম আলোর কি রকম আছর পড়ে তা দেখার জন্য রেবুর মনরে উতালায় ধরে। ছুইটা যাইতে চায়। কিন্তু এখন বর্ষাকালের রাজত্ব, জগৎ জুইড়া আষাঢ় মাস গ্যাঁট হইয়া বসা। চারদিকে তাই পানির পরম দৌরাত্ম্য। বাড়িঘর সব তার হাতের বেড়ে ঘিরে ধরা। ফলে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যাওয়ার একক ভরসা নৌকা, বিল-বাঁওড়বাসীর পা, বাড়ি থেকে কোথাও দুকদম ফেলার হাতিয়ার। রেবু তাই তার একটায় চড়াও হয়। লগে ছোট ভাই নজুরে ডাইকা লয়।

শেষে দেলুগো বাড়ি পৌঁছে, নৌকা থেকে কূলে তাকায়ে তাজ্জব—ওমা! এ দেহি পুরা বাড়ি সয়লাব। লোকজনে ভরপুর। তাই উঠানের লোকজনরে পাশ কাটাইয়া মাইয়ামানুষগো লাইগা বরাদ্দ বারান্দায়, ঘরের লগের বোনাস অংশে গিয়া খাড়ায়।

তাতে পা দেয়। তারপর উত্সুক চোখরে উঠান পানে বিছায়, জোছনায় পাওয়া দেলু ভাইরে দ্যাখার চেষ্টা চালায়। কিন্তু পুরাপুরি দেখতে না পাইরা ছটফটায়। শেষে ছোয়াদ ভাই কাছে বারান্দার বগলতলায় এলে তারে পাকড়ায়—মুই কাছে গিয়া একটু দেখমু।

ছোয়াদ ভাই রেবুগো প্রতিবেশী, দুই বাড়ি ওপারে তার বসতভিটা। তাই নিজেগো মইদ্যে আচ্ছামতো জানাশোনা, ময়দার তালের নাহান ঘন মাখামাখি। তার পরও সে রেবুরে কাছে নিয়া গিয়া দ্যাখাইতে রাজি হয় না—এহানে খাড়াইয়্যা দ্যাখ। হুজুররে খবর দিছি। এহনই হ্যায় আইয়া পড়বে।

হুজুর মানে সরদারবাড়ির সদর দরজায় আসন গাড়া মসজিদ, এলাকার একমাত্র পাকা দরদালান, ইট-সিমেন্ট-বালুর হাতে গড়া আল্লাহর ঘর, চার গেরামের লোকজনের সাপ্তাহিক, শুক্কুরবারের তীর্থস্থল, তার ইমাম-মুয়াজ্জিন-মুতাঅল্লি সব। তারে রেবু ভালো কইরা চেনে। ছোটবেলায় ছেপাড়া আমপাড়া নিয়া তার দরবারে, মসজিদের বারান্দায় সাতসকালে হাজিরা দেবার স্মৃতিগুলা এহনো মইরা ভূত হয় নাই। বরং জাগরূক হইয়া আছে।

সরদারবাড়ি থেকে লগির দু-চার খোঁচায় হুজুরের আসতে আর বেশি দেরি হয় না। মুখজুড়ে একঝোপ সাদা-কালো দাড়িতে সমৃদ্ধ চ্যাপ্টাচোপ্টা দেহের জাঁদরেল পুরুষি অবয়ব তার। নৌকা থেকে মাটিতে, দেলুগো বাড়িতে পা দিতেই যেন উঠানের লোকজনের চমক ভাঙে। তারা সব পিছার বাড়ি খাওয়া শুকনা পাতার মতো এক ঝটকায় দুই দিকে সরে গিয়া উঠানের পাশে খাড়া ঘরের ছাউনিতলে আশ্রয় নেয়। তাদের এই ত্বরিত কর্মতৎপরতা, মুহূর্তে সরে যাওয়ার কারণ বুঝতে রেবুর অসুবিধা হয় না। কেননা তাদের বেশির ভাগই হুজুরের একসময়কার শিষ্য, ছোটবেলায় আমপাড়া ছেপাড়া নিয়া তার কাছে দৌড়াদৌড়ি করা যুবা পোলাপাইন। তবে তারা সরে যেতেই উঠান প্রায় ফাঁকা হয়ে যাওয়ায় দেলু ভাই তার আগাগোড়া দেহাবয়ব নিয়া রেবুর চোখের সামনে হাজির হয়।

তখন দ্যাখে—দেলু ভাইর গা-গতর একেবারে উদলা। কেবল কোমরের কাছে গোটানো ছোট ছোট খোপের নীল লুঙ্গিটা। বাকি শরীরের কোথাও কোনো আবরণ নাই। গেঞ্জি-কোর্তা কিছু একটা ছিল হয়তো বা। টানাহেঁচড়ায় ছিঁড়েফেঁড়ে গেছে, ভিজে যাওয়ায় কেউ খুলে দিছে। তবে তার কিছু না থাকায় ভালো হইছে, দেলু ভাইর একেবারে পুরোপুরি, তার খাঁটি ও নির্ভেজাল দেহাবয়বটা রেবুর একনজরের আগাতেই হাজিরা দিতে পারছে।

কিন্তু কই! জোছনায় ধরার, তার কবলে পড়ার নমুনা কোথায়? সেসবের কোনো কিছুই তো চোখে পড়ে না। রেবু তাই তার চোখরে আরো বড় বানায়, নজররে কড়া করে তোলে। তার পরও কোথাও কোনো আলামত তার চোখে পড়ে না। বরং দ্যাখে—একটা সবল দেহ, তার থামের মতো সুদৃঢ় দুটো পাও। এ ছাড়া আর কিছুই যেন তার নজরে ধরা দেয় না।

দেলুরে শোয়ায়ে রাখা উত্তর-জমিনে। শিথান উত্তরে আর পা দক্ষিণে। আর রেবু উঠানের পশ্চিম সাইডে। সেদিক পানেই একটু কাত করা দেলুর ঘাড়। ফলে তার চেহারা, মুখাবয়ব দেখতে রেবুর আর কোনো অসুবিধা হয় না।

কিন্তু কই! তাতেও তো জোছনায় পাওয়ার কোনো আলামত, এতটুকু নমুনা চোখে পড়ে না। বরং এক ঝাঁকা কালো চুলের নিচে ঘন-শ্যামলার দক্ষ হাতে গড়া চেহারা। তার ওপর খাড়া নাকই তো কেবল চোখে ভাসে। সবার আগে এসে নজরে হাজির হয়। তবে মুখজুড়ে কেমন এক কোমল পরশ, মায়াবী আভা যেন হেঁটে বেড়ায়, তার হালকা প্রলেপ যেন লুটোপুটি খেলে। রেবুর তাতে মায়া মায়া লাগে। একটু ছুঁয়ে হাত বুলায় দিতে মন চায়।

দেলু ভাইরে আগেও দু-চারবার রেবুর দেখা। তাগো বাড়িতে বাপজানের লগে কান্দি-কোলা, চাষবাস নিয়া আলাপে গেলে রেবুর নজরে পড়া। আড়চোখের আওতায় আসা। কিন্তু কই! তখন তো এমন মনে হয় নাই। মায়াবী লাগে নাই তার চেহারা। তা অইলে কি এইডাই, মায়াবী প্রলেপই জোছনায় ধরার আলামত, তার হাতের কবজায় পোরার নমুনা?

আরো নমুনার খোঁজে দেলু চোখমুখ থেকে নিচে নামে। হাতের ওপর নজর পড়ে—ওহো! কী বলিষ্ঠ তা, নিশ্চয়ই তাতে অজস্র বলের বাহার। ও হাত যদি একবার ধরে, তার দুবাহুতে জড়ায়ে নেয়, তারপর সামান্য একটু চাপ দেয়, তাহলেই রেবু একেবারে ভেঙেচুরে যাবে। হাড়হাড্ডিও হয়তো মড়মড় করে উঠবে।

রেবু আর ভাবতে পারে না। তার আগেই তার শরীরে একটা শিরশির ভাব এসে হাজির হয়। হেঁটে হেঁটে আগায়। পুরো শরীরে ঘুরে বেড়ায়। না, এমনটা তো আগে কখনো হয়নি। মনপ্রাণ-শরীরজুড়ে এমন কোনো কিছুর আনাগোনা ঘটেনি। তাহলে এর নাম কী? কী বলে এরে? পিরিত?

তা বুঝে ওঠার আগেই রেবু দ্যাখে হুজুরের পড়া-পানির ছিটায় দেলু ভাইর হুঁশ ফেরা সারা। চোখ মেলে তাকানো শুরু। তারপর তার শরীর নড়ে ওঠে। শেষে একেবারে উঠে বসে।



সাতদিনের সেরা