kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

গ ল্প

দুটি গল্প

নাসরীন জাহান

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



দুটি গল্প

অঙ্কন : মাহবুবুল হক

যখন গ্রামে মাকড়সা এলো

একটা গ্রাম ছিল, সর্বগ্রাসী আলোতে দিনরাত টলমল করত। এত সুখে মানুষ যখন অস্থির আর বধির বধির অনুভবে ডুবে যেতে শুরু করল, হঠাৎ তুমুল ঝড়। রৌদ্রের লাল আঁচে যখন গ্রামটার রং অনেক রকম হচ্ছিল, তুফানের তোড়ে একটা অর্ধমৃত মেয়ে একেবারে টিনের চালের ওপরে এসে পড়ল।

স্তব্ধ হয়ে গেল সব।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘনিঃশ্বাসের ছায়ায় বাঁশঝাড়ের বকগুলো ছটফট করে অনেক দূরের পথে উড়াল দিয়ে চলে গেল। এই গ্রামে এর আগে মানুষ মৃত্যু কী তা জানত না। সবাই মিলে মেয়েটাকে নামিয়ে ঘোরের মধ্যে প্রশ্ন করল, কী নাম তোমার? অস্ফুট ঠোঁট নড়ে উঠল—জুলেখা।

 

যখন জুলেখা আছিল, নিজ গায়ে ভরন্ত রূপসী,

অমাবস্যায় ইউসুফ আসিত বায়ু তারা শশী,

তাহাদের প্রেম আছিল পরানে পরান,

ঈর্ষায় পুড়ত রাজা ক্রোধ খানখান

 

তখন সারা বছর প্রচুর ফুল ফোটা শিমুলগাছের ফুল পড়তে পড়তে ন্যাড়া হয়ে গেল। গাছের নগ্ন দেহ কিছু পুরুষকে এমন আলুথালু করে দিল, তারা জুলেখার যৌবনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দিনের বেলায় যে গ্রামে পূর্ণিমার ঝালর ধেয়ে বেড়াত, ক্রমে ক্রমে অদ্ভুত আঁধার ছেয়ে যেতে থাকলে সেই গ্রামের মানুষ শিখে যেতে শুরু করল জীবনের সহজাত হিংস্রতার জাগতিকতা। তারা গাছের ফল, বৃষ্টির পানি—এসব জাগতিকতার মধ্যে থেকে বুঝতেই পারত না গ্রামের উন্নতি কাকে বলে। তাদের উন্নতি হতো শিমুল তুলার মাধ্যমে। এই সুতা ব্যবসায় তারা ধান ভেঙে ভাত খাওয়ার সুখ থেকে রান্নাবান্না করে খাওয়ার মজা একেক করে বাজারে পণ্যের বদলে পণ্য বাদ দিয়ে মুদ্রার বদলে পণ্য এই করে নিজের ঘরের মেরামত একটু একটু করে সব শিখতে শুরু করল। এসব তারা আগে কোনো দিন অনুভব করতে পারত না।

মেয়েটাকে সবাই মিলে যখন মাটি খুঁড়ে কবর দিচ্ছিল, মেয়েটা বলে যেতে থাকে, ইউসুফ তোমাদের ছাড়বে না। এসব বিড়বিড় করে জুলেখার প্রচ্ছায়া প্রগাঢ় হয়,

আমার কী সুন্দর?

তিল,

আমার জায়গা কই?

পরানে,

আমারে কই লইয়া যাবা?

একলগে থাকুম,

তুমি কাঁপতাছ ক্যান?

মোহে।

কিন্তু জুলেখাকে উপভোগে জলে ছাড়িল রাজা, ইউসুফ একটুও হায় নয় ভাবিয়া নিল যা যা তাহাই রচিত হইলো, তাহাই জানিল গ্রামের সর্বে, বাকি কী ঘটিবে রইয়া গেল কালের গর্ভে, সবাই যখন প্রচণ্ড ক্লান্ত, তখন ঝাঁক ঝাঁক মাকড়সা এসে গ্রামটাকে পুরোপুরি ছেয়ে ফেলে। এরপর প্রথমে ধর্ষণক্লান্ত পুরুষদের তারা খাওয়া শুরু করে। অবশ্য তার আগে ভয়াবহ ধর্ষণে তাদের লিঙ্গগুলো একেবারে থেঁতলে দেয়। এরপর সব গ্রামবাসীকে ভয়াবহ আক্রমণে ক্ষুধার্ত মাকড়সাগুলো এমনভাবে খেতে শুরু করল, অন্ধক্রোধ এমনই ছিল উজান দেহে যত উঠতে চাইল, পুরো গ্রাম কবর হয়ে গেল।

রাজাকে মারিয়া ইউসুফ দারুণ ছদ্মবেশে, উড়িতে থাকিল গেরাম-শহর, শেষে একটা গেরামে আইসা জুলেখার ঘেরান, ইউসুফ অগ্নিবর্ণ ক্রোধে টান টান।

শুধু একটা মাটির ঘরে একজন বুড়ি ছিল, সুখে বিভোর গ্রামবাসী কোনো দিন যার খোঁজ নেয়নি। একমাত্র সেই একা একা শিশু থেকে যুবতি, যুবতি থেকে বৃদ্ধ হচ্ছিল।

সে শিমুল সুতার চরকা কাটত। চারপাশের জমকালো ঝড়ের ক্রোধ, অশরীরী নেমে আসতে থাকা আলো বা অন্ধকার সব স্পর্শ করত তাকে। লড়াকু সে নারী সেসবকে প্রতিনিয়ত প্রতিহত করত, আর গ্রামকে বাঁচাতে সুতা বুনে চলত।

শ্মশানশূন্য গ্রামে মাকড়সারা যখন চলে যাচ্ছিল তাদের মধ্য থেকে একজন মানুষ হয়ে বৃদ্ধার দরজার সামনে দাঁড়াল। বৃদ্ধার খোলস খসে পড়ল, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে যুবক বললা—জুলেখা, আমি এসেছি।

 

একটা করুণ সময় আর আকাশের গল্প

দুপুরের খাই খাই রোদ্দুর যখন প্রায় নিঃসঙ্গ রাস্তা, এই পুরো শহরের ওপর দিয়ে তীব্র তেজের আগুন ঢেলে প্রবাহিত হচ্ছিল, তখন অভিজাত দুই তলার ডুপ্লেক্স এসি রুমে কড়া রুটিন মেনে চলা বাবা লাঞ্চ শেষে স্যানিটাইজার দিয়ে দুই হাতের কচলাকচলি মিলন ঘটাতে ঘটাতে ডাকলেন, মিহি...।

বাবাকে ভয় পায় মিহি। এই এলাকায় এই রাস্তা বাদে পাশের আরো পাঁচটা এলাকায় লকডাউন ঘোষণা দিয়েছে। এই গিজগিজে দরিদ্র মানুষের দেশে কিভাবে মানুষ দূরত্ব মেইনটেনের নিয়ম মানে? এই এলাকায়ও জলরঙের ঝাঁক ঝাঁক দস্যু করোনার ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে? ফিসফিস টেনশনে মিহিকে বুকে জড়িয়ে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকেন—বলেন, এক রাতেই এই এলাকার পাঁচ রাস্তায় লকডাউন; দারোয়ান বলেছে, একেক বাড়িতে একাধিক ধরা পড়েছে। এ দেশের আঁচলে আগুন লেগে গেছে, রক্ষা করুন।

ভালোভাবে হাত ধুয়েছ? বাবার কড়া কণ্ঠে শব্দের স্রোত ধেয়ে মা এগিয়ে আসে, কী মনে হয় তোমার? অ্যাদ্দিনেও আমরা চূড়ান্ত সচেতন থাকার নিয়মগুলো জানি না?

সারা বাড়িতে পোলাউয়ের গন্ধ থইথই করছে। বাবার প্রিয় খাবার। পার্মানেন্ট বাবুর্চি এই বাড়িরই নিচতলার একটা রুমে থাকে। পাশের রুমে ছোট ভাই চড়া স্বরে ইংলিশ ব্যান্ডের গান শুনছে। এ ব্যাপারে বাবা নির্বিকার। বাবার আত্মা যেন ও।

আম্মু বাবাকে দারুণ ভয় পান। একেক সময় মনে হয়, আম্মু যেন এই বাড়ির দাসী। সারাক্ষণ আব্বুর চোটপাটে বড় হতে হতে মিহির শুধু মনে হতো, আমি নিজ পায়ে দাঁড়ালে আম্মুকে নিজের কাছে নিয়ে চলে যাব।

কিন্তু এর মধ্যেও গোপনে, নিজের মতো যে পরম ছায়া দিয়ে আম্মু বড় করেছেন, মিহি অনুভব করে, আম্মুর এমন ছায়াচ্ছন্ন ছায়া না পেলে সে রীতিমতো বিগড়ানো একটা মেয়ে হয়ে বড় হতো। মিহি ধীরে বাবার চোখ এড়িয়ে জানালার গ্লাস একচিলতে সরিয়ে, কালও দেখেছে, রাস্তার কুকুরগুলো নেতিয়ে আছে। বাবার ভয়ে কিছু করতে পারেনি। আজও কুকুরগুলো যেন বা মৃত্যুর আগে হালকা নড়াচড়া করছে। পাশের বস্তির কিছু ক্ষুধার্ত মানুষ টলতে টলতে কাতর চোখে ওদের দরজার সামনে। ওরা যেন কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে।

বিড়বিড় করত মিহি, আমাদের আগে-পরে কিছু নেই। যা ছিল, নিজেরই শরীর আঁচড়ে মূর্তমান করে তোলার ইচ্ছা, যেখানে এক আত্মার নির্যাস ঢেলে আমরা রংহীন হয়েছি। একবার আম্মু বাথরুমে জোর আঘাত পান। চিকিৎসায় জানা যায় শোল্ডার ভেঙে গেছে। এর পরও বাবার গজগজ।

মূর্খ মহিলা, নইলে কমোডের ওপর কেউ হুমড়ি খায়?

মিহি পাশে ছিল। আর চিকিৎসাটা নিয়ে যদিও কঠিন, তারপর ও যদ্দুর পারে, নৈর্ব্যক্তিকভাবে জানাতে চেষ্টা করে,

ডাক্তার সাহেব, মা খুব কষ্ট পাচ্ছেন, এ দেশে এর ভালো চিকিৎসা নেই?

ডাক্তার বলেছিলেন, জোড়া লেগেছে, কিন্তু এরপর বাইরে চিকিৎসা করালে ভালো হয়।

আর বাইরে চিকিৎসা!

 মাস পেরোলে অন্যদিকে এসির মধ্যে জানালা খুলেছ? ভাইরাসের বাতাস যদি ঢোকে? এভাবে ভাইরাস ঢোকে না, নিয়ম মেনে চলা এই মানুষকে কে বোঝায়, মা ভেতর ভেতর বিরক্ত। বাবার কণ্ঠ যত চূড়ান্তে তত তীব্রতায় বাবাকে হতবিহ্বল করে রান্নাঘরের দিকে ছোটে মিহি, কিচ্ছুকে আর পরোয়া করে না সে আজ। মিহি পাতিলের ঢাকনা খোলে, ওই দুর্বল মানুষের চোখের জন্য, মৃত্যুর আগে নিঃশ্বাস নিতে থাকা কুকুরগুলোর জন্য।

 

দুই.

এ বাড়ির বাতাস বদলে গেছে। করোনার গ্রাস গত বছর ছোট ভাই পাভেলকে ছিনিয়ে নিয়েছে। যখন রুদ্ধ বাড়ির মধ্যেও করোনা তাকে গ্রাস করেছিল, তখন বাবা প্রভাব খাটিয়েও সহজে ভালো কোনো খালি ক্লিনিক খুঁজে পাচ্ছিলেন না। যখন ভর্তি করা হলো, ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে এলো তার শরীর। বাবার যেন জীবনের ওপর থেকে সব মায়া চলে গেল। সারা দিন ধর্ম নিয়ে থাকেন। খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ নেই। বাড়িতে একটা নেগেটিভ জোরালো প্রাণ ছিল, তা মরে গিয়ে ধীরে ধীরে স্বাধীন বাতাস ঢুকতে শুরু করলেও এই বাড়ির মানুষগুলো, বিশেষ করে আম্মু, যেন জীবনের জন্য আব্বুকে ভয় না পেয়ে কিভাবে চলতে হয়, ভুলে যাওয়া এক মানুষ...কী করবেন, বুঝে না পেয়ে বিমূঢ় হয়ে থাকা শুরু করলেন।

মিহি একদিন টেনে, জোর করে মাকে সাজিয়ে-গুজিয়ে যখন বাইরে বেরোয়, সতেজ কুকুরগুলো প্রচণ্ড কৃতজ্ঞতা নিয়ে মিহির গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। যথারীতি মিহি তাদের খাবারগুলো দিয়ে গাড়িতে উঠে বসে।

পাভেল মারা যাওয়ার পর বাবার চূড়ান্ত বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে আমি আর আম্মুও কাঁদতে ভুলে গিয়েছিলাম। মনে হতো,

তিনিও বোধ হয় আর টিকবেন না, বাড়ির মধ্যে অশরীরী ছায়া নেমে এসেছিল।

আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?

চলো না আম্মু, কোথাও, কোনো খোলা জায়গায় গিয়ে একটু বসি?

এই শহরে আকাশ আছে মিহি?

কেন থাকবে না? আকাশ অত সহজে কোথায় যাবে?

কী যে একটা মহামারি এসেছিল, আমরা আকাশ-বাতাস সব ভুলে গেছি—ড্রাইভার, বসিলা চলেন।

এর আগেও বন্ধুদের নিয়ে ঢাকা থেকে এত কাছের একটা সুন্দর গ্রাম বসিলার সরষেক্ষেতে আমরা উদ্দামে মেতেছিলাম। এই মহামারি বাদ দাও, এর আগে তুমি কবে শেষ আকাশ দেখেছিলে, আম্মু?

গাড়ির এসি বন্ধ করিয়ে জানালার পাল্লা খুলে দেন আম্মু। ধীরে ধীরে গাড়ি শহরতলির দিকে টার্ন নেয় এবং ঝিরিঝিরি বাতাসে ওরা আচ্ছন্ন হয়ে যেতে থাকে। আম্মু বলেন, আকাশ? অনার্সে ভর্তি হওয়ার পরে, বিয়ের আগে, এরপর তো আর পড়াশোনা হলো না, সংসার-সন্তান-স্বামী করে করে আকাশ ভুলেই গেছি কবে!

মিহির ভেতরটা হু হু করে ওঠে। মা ছোট শিশুর মতো ব্যাকুল হয়ে চারপাশ দেখেন আর বলেন, এ তো আমাদের মফস্বল মনে হচ্ছে, কী সুন্দর টিনের বাড়ি, নানা রকম রঙের গেট!

মিহিরা রেস্টুরেন্টে নামে, বিহ্বল আম্মুর সামনে টিনের ছোট ছোট প্লেটে পিচ্চি একটা ছেলে গরম গরম পিঁয়াজু-বেগুনি দেয়। দুধের সর তোলা মা চুমুক দিয়ে যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেন—মিহি, এসবের খোঁজ তুই কিভাবে জানিস?

দারুণ প্রশান্তি নিয়ে ফের গাড়িতে উঠি। ঝাঁক বেঁধে সন্ধ্যা নামছে। কোকিল ডাকছে ফেব্রুয়ারি পেরোনো চরাচরজুড়ে।

পাখিরা সার বেঁধে ঘরে ফিরছে। যখন সূর্য একেবারে রক্তজবার মতো হয়ে গেছে, আম্মুকে নিয়ে একটা ঘাসের মতো জায়গায় মিহি বসে। ঝিল্লিমুখর সন্ধ্যা।

খড় পুড়ছে, ধু ধু গ্রাম ধেয়ে বুনো ঘ্রাণ উড়ে উড়ে আসছে, আম্মু টানা শব্দহীন। এরপর সূর্যের কড়া আভার দিকে তাকিয়ে আম্মু হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন, পাভেল! পাভেল! আমি তোকে জন্ম দিয়েছিলাম। মিহি আম্মুকে প্রাণ উজাড় করে কাঁদতে দেয়।



সাতদিনের সেরা