kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

গ ল্প

আম্মা

আনিসুল হক

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



আম্মা

অঙ্কন : নাজমুল আলম মাসুম

সাজ্জাদের আজ হঠাৎ করেই আম্মাকে খুব মনে পড়ছে। কোনো কারণ নেই। তার আম্মা মারা গেছেন সেই কবে! বারো কি তেরো বছর আগে! পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার সাজ্জাদ দীর্ঘদিন কাজ করেছে তাদের কম্পিউটার বিভাগে। তার সহকর্মীদের সঙ্গে সে গল্প করত প্রাণখুলে।

বিজ্ঞাপন

বস হিসেবেও সে দিলখোলা। সবাই তাই তাকে পছন্দ করে। গপ্পু এবং অক্ষতিকর বসকে সহকর্মীরা পছন্দ করবেই। সাজ্জাদকেও অফিসের লোকজন খুব পছন্দ করে। জিকে প্রজেক্ট এরিয়া থেকে যেদিন সে বদলি হয়ে ঢাকা আসছিল, সেদিন বিদায় অনুষ্ঠানে সবাই একসময় হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিল। সাজ্জাদের সহকর্মীদের অনেকেই, এমনকি জুনিয়র স্টাফদেরও কেউ কেউ সাজ্জাদের এই গল্পটা জানে যে ছোটবেলায় সাজ্জাদ প্রতিজ্ঞা করেছিল, বড় হয়ে সে আম্মাকে খুন করবে। তাদের তিন বোন ও দুই ভাইয়ের সংসারে সাজ্জাদ ছিল চার নম্বর। তার আব্বা পড়াতেন রংপুরের প্রাইমারি স্কুলে। বহুদিন তাঁর পোস্টিং ছিল ধাপ লালকুঠি প্রাইমারি স্কুলে। মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারি করে দিয়েছিলেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের চাকরিটা তখন মোটামুটি কাঙ্ক্ষিত ও নিরাপদ একটা চাকরি হয়ে উঠেছিল। তার আব্বা মকবুল হোসেন বিএসসি পাস ছিলেন। ফলে প্রাইভেট টিউটর হিসেবে সুনাম ছিল তাঁর। পাঁচ ভাই-বোনের সংসারে গ্রাম থেকে চাচাতো ভাই, মামাতো ভাইয়েরা এসে যুক্ত হয়েছিল। সত্তরের দশকে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ছিল খুব খারাপ। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের আসল ধকলটা গেছে রংপুরের ওপর দিয়ে। সেই সময় সাজ্জাদরা এক বেলা ভাত খেত। রাতের বেলা দুটি রুটি, সঙ্গে আখের গুড়।

কিন্তু আম্মাকে অপছন্দ করার কারণ কী ছিল সাজ্জাদের? একটা হলো, তার আম্মা খুব মারতেন। হাতপাখার ডাঁটি দিয়ে, স্যান্ডেল দিয়ে, কখনো বা বিছানা ঝাড়ার ঝাঁটা দিয়ে ভীষণ পেটাতেন আম্মা। সব ছেলেমেয়েই মার খেয়েছে, কিন্তু সাজ্জাদ মনে রেখেছে নিজের মারটা। আম্মা কেন মারবেন?

তখন একদিন ভীষণ মার খেয়ে একটা জঙ্গলের মধ্যে থাকা জামগাছের নিচে বসে কাঁদতে কাঁদতে সাজ্জাদ ঘোষণা করল, বড় হয়া মুই আম্মাক খুন করমো।

আম্মা ছিলেন চৌধুরী বংশের মেয়ে। জমিদারের সন্তান। তাঁর আব্বা, সাজ্জাদের নানা, এই উপমহাদেশের শেষ জমিদারদের একজন। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক দেশ থেকে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করলে তাঁদের প্রকৃত ক্ষমতার অবসান ঘটে, তার পরও প্রজারা তাঁদের সম্মান দেখাত। তাঁদের ডিমলার জমিদারবাড়ির সামনে দিয়ে কোনো প্রজা ছাতা মাথায় করে যেত না, ছাতা খুলে গুটিয়ে নিয়ে তারপর সাজ্জাদদের নানাবাড়িটা পার হতো। অনেকে জুতা খুলে হাতে নিত। অনেকেই সাইকেলে চড়ে যাওয়ার সময় জমিদারবাড়ির সামনে সাইকেল থেকে নামত।

আম্মা সেই পরিবার থেকে আসা মেয়ে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষককে তিনি কেন বিয়ে করেছেন, তা অবশ্য সাজ্জাদ জানে না। মকবুল হোসেন বিএসসির সংসার আম্মা চালাতেন বুদ্ধি দিয়ে। মাছ ধোয়া পানি ফেলা হতো লাউয়ের গাছের গোড়ায়। লাউয়ের খোসা কুচি করে কেটে ভাজি করা হতো। কোনো কিছুই ফেলা হতো না সেই সংসারে। ঢেঁকিশাকের অভাব ছিল না তখনকার রংপুরে। আশপাশে প্রচুর জমি পতিত থাকত, সেসব জুড়ে জন্ম নিত ঢেঁকিশাক। খুরাশাক নামের একটা শাক ছিল, কাঁটাগাছের পাতা। খালি পায়ে হাঁটত সাজ্জাদরা ছোটবেলায়; পাড়ার সব জলজংলা বাগান চষে বেড়াত। কাঁটাগাছে পা ফেলা মাত্রই কাঁটা বিঁধত পায়ে। বাড়িতে ফিরলে বোনেরা সুই দিয়ে সেই কাঁটা বের করে দিত, কিন্তু সেই কাঁটাগাছের পাতাও তারা খেত শাক হিসেবে। মাটিতে এক ধরনের বড় কচুর মতো জন্মাত, নাম ছিল মেটে আলু। সেটা তুলে এনেও খেয়েছে তারা। জঙ্গলের আতাগাছের আশপাশে গেলে তারা পেত আতাফুলের গন্ধ, সেই গন্ধ ছিল সবরিকলার সৌরভের মতো (রংপুরে সবরিকলাকে বলা হতো মালভোগ কলা)। কতবার সাজ্জাদ আর তার ভাই সাইফুল জঙ্গল থেকে আতা পেড়ে এনে চালের বস্তার মধ্যে রেখে পাকিয়ে খেয়েছে। কাঁঠালের তরকারি ছিল তাদের কাছে খাসির মাংস। আম্মা হাঁস-মুরগি পালতেন, গরু পালতেন, উঠানে আর এর আশপাশে শাক-সবজির চাষ করতেন। কাজেই সেই চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের সময়ও মাঝেমধ্যেই ডিম, মুরগির মাংস এবং (নিয়মিত) দুধ ছিল সাজ্জাদদের খাদ্য।

তা সত্ত্বেও অনটনের সংসারে বিয়ে হওয়াটা আম্মা মেনে নিতে পারেননি। প্রায়ই তিনি এ কথা বলতেন কাজ করতে করতে। সাজ্জাদ আর সাইফুল মিলে একটা মুরগি জবাই করল, সাজ্জাদ ধরল, সাইফুল আল্লাহু আকবার বলে গলায় ছুরি চালাল; আম্মা সেই মুরগির চামড়া ছিলছেন বঁটিতে বসে। চামড়া থেকে পালক ছাড়িয়ে নিয়ে সেটা আবার ভাজনির লোহার ডাঁটায় ফুঁড়ে চুলার আগুনে পোড়ানো হতো। চামড়া আর বেগুন ছিল একটা উপাদেয় তরকারি। আম্মা হয়তো মুরগির গিলা বের করছেন; আর প্যাঁচাল পাড়ছেন: আমার বাপে তো কাম পায় নাই, মাস্টারের সঙ্গে বিয়া দিছে। কী? না, বলে বিএসসি পাস। শিক্ষিত ছেলে। শিক্ষিত ছেলে ধুয়া আমি পানি খাব। এই সংসারে কয়জন খানেওয়ালা! এতগুলা মুখ আমি ভরি কী দিয়া। এই মুরগি এখন ১৬ টুকরা করা লাগবে।

এই অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়েও সাজ্জাদরা দেখেছে, আম্মার জমিদারের মেয়ের বংশমর্যাদা একটুও কমত না। তিনি তাঁর সামনে কোনো কাজের লোককে চেয়ার তো দূরের কথা, বিছানাতেও বসতে দিতেন না। আরো একটা নিয়ম ছিল তাঁর। ছেঁড়া কাপড় সেলাই করে পরতে দিতেন না কাউকে। তিনি বলতেন, এটা গরিবের হক। কাপড় ছিঁড়ে গেছে মানে এটা দান করতে হবে। সেলাই করে পরতে পারবা না।

কিন্তু একদিন শার্ট ছিঁড়ে ফেলেছিল সাজ্জাদ, আম্মার চোখের সামনে। লাউয়ের জাংলার কাছে গেছে সাজ্জাদ, তখন সে ক্লাস এইটে হয়তো পড়ে; একটা বাঁশের কঞ্চিতে অনেক শাখা-প্রশাখা, কখন শার্টের পাশে বাঁশের কঞ্চির কাটা মাথা লেগেছে; সাজ্জাদ টের পাননি। আম্মা টের পেয়েছেন, টিউবওয়েলের পার থেকে তিনি চিৎকার করছেন; এই সাজ্জাদ, চুপ করি খাড়ায়া থাক, শার্ট ছিঁড়িবু। না নড়িস। সাজ্জাদ ঠিকই নড়ল, অমনি শার্ট গেল ছিঁড়ে আর আম্মা ছুটে এসে একটা বাঁশের বাতা তুলে পেটাতে লাগলেন সাজ্জাদকে।

কোনো মানে হয়? কেন সে এই মার খাচ্ছে? শার্ট ছিঁড়ে গেছে। রিফু করলেই তো হবে। না, আম্মা শার্ট রিফু করতে দেবেন না। তার বদলে খাও মাইর। তখনই সাজ্জাদ মনে মনে ঠিক করল, বড় হয়ে সে আম্মাকে খুন করবে।

আরেকটা কাজ আম্মা করতেন। পিটিয়ে পিটিয়ে ছেলেমেয়েদের মানুষ করবেন বলে পণ করলেন। ছেলেদের বৃত্তি পরীক্ষায় বৃত্তি পেতে হবে। পড়। পড়বি না কেন? নিজেই পড়াতে বসতেন। একটার পর একটা বাচ্চা বিয়োতে হয়েছে তাঁকে, আজ আটান্ন বছর বয়সে ঢাকার বনানীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোয়ার্টারে শুক্রবার বিকেলবেলা টেলিভিশনে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে দেখতে হঠাৎ করেই সাজ্জাদের মনে হতে লাগল, পাঁচ ভাই-বোন। বড়টা যখন প্রথম ক্লাস ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষায় বসবে, ছোটটা তো তখন হয় গর্ভে, না হলে মাত্র জন্ম নিয়ে ওয়া ওয়া বলে কাঁদছে। ওই অবস্থায় ওই সংসার সামলে আম্মা ছেলেমেয়েদের পড়াতে বসার সময়টা করতেন কী করে? তিনি নিজে ছেলেমেয়েদের শেখাতেন ইংলিশ টেন্স। তিন দিন হইতে বৃষ্টি পড়িতেছে। ইট হ্যাজ বিন রেইনিং ফর থ্রি ডেইজ। ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মারা গেল। দ্য পেশেন্ট হ্যাড ডায়েড বিফোর দ্য ডক্টর কেইম। আব্বা বাইরের ছেলেমেয়েদের পড়াতেন। নিজের ছেলেমেয়েদের দিকে তাঁর খেয়াল ছিল কম। আম্মাই ওগো সাইফুলের বাপ, ছেলেটাকে একটু ঐকিক নিয়ম শিখাও না ক্যান বলে তাদের আব্বাকে ঠেলতেন। নিজেও বলতেন, শোন, ঐকিক নিয়মে তিনজনে যে কাজ এক দিনে করে, একজনে সেই কাজ করবে তিন দিনে। এইখানে গুণ হবে। আর তিনজনে যত সের চাল খাবে, একজনে খাবে তার তিন ভাগের এক ভাগ। এইখানে ভাগ হবে। আম্মা আব্বার দায়িত্ব নিজেই পালন করতেন।

সাজ্জাদের ভাই-বোনেরা বৃত্তি পেতে শুরু করল। ক্লাসে ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড হতে লাগল এবং সাজ্জাদ নিজে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে গেল। সেটা যে সময়ের কথা, তখন বুয়েট বললে লোকে শুনত কুয়েত। সাজ্জাদের আম্মার ছেলেপুলেরা বড় হতে লাগল, বোনগুলো তিনজনই হয়েছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। অধ্যাপক। ভাইদের মধ্যে সাজ্জাদ হয়েছে ইঞ্জিনিয়ার। সাইফুল হয়েছে কৃষিবিদ। সাইফুল চলে গেছে আমেরিকা, সান ফ্রান্সিসকোতে থাকে।

আব্বা মারা গেলেন মাত্র ছাপ্পান্ন বছর বয়সে। সাইফুল তখন জয়দেবপুর কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে। সাজ্জাদ বুয়েটে ভর্তি হয়েছে। ক্লাস শুরুর জন্য অপেক্ষা করছে।

ছোট বোন তখন মাত্র এসএসসি দেবে। আম্মা যথারীতি সংসারের হাল ধরলেন। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক মারা যাওয়ার পর আব্বার নামে পেনশন ইত্যাদি কমই বরাদ্দ হলো। কিন্তু আম্মা মাথা নোয়ানোর মেয়ে নন। তিনি নিজেই ছেলেমেয়েদের পড়াতে শুরু করলেন। তাঁদের বাড়িতে প্রাইমারি বৃত্তির কোচিং শুরু করলেন তিনি। কুড়িজন ছাত্র-ছাত্রী আসত বাড়িতে, বিকেলে। আম্মার আয় আব্বার সমান হয়ে গেল।

সাজ্জাদ ইঞ্জিনিয়ার হলো। সাইফুল আমেরিকায় পিএইচডি শেষ করে আর দেশে ফিরল না। আম্মাও বয়স্ক হতে লাগলেন। এর মধ্যে শুরু হলো তাঁর বাতের ব্যথা। তিনি নড়তেচড়তে পারেন না। সাজ্জাদ বিয়ে করল তার কলিগের ছোট বোনকে। ইডেনে পড়ে সে। ঢাকার মেয়ে। সেই রকম স্মার্ট। তিথি আবার বিশেষ রকমের নারী অধিকার সচেতন। আম্মা মাঝেমধ্যে ঢাকায় আসতেন। বোনদের বাসায় উঠতেন। সাজ্জাদদের বাসায় এলে এক রাতের বেশি থাকতেন না। তিথির সঙ্গে ভীষণ খাতির ছিল সাজ্জাদের আম্মার। অনেক রকম গল্প করতেন আম্মা। গল্পের বিষয়ের মধ্যে তাঁদের কোন মেয়ের সংসারের কী হাল, সেটা থেকে শুরু করে সান ফ্রান্সিসকোতে সাইফুলের বউ শাম্মী আর দুই ছেলে আসওয়াদ, আজজোয়াদকে নিয়ে নানা ধরনের প্রসঙ্গ থাকত। তা সত্ত্বেও আম্মা কোনো দিনও সাজ্জাদদের বাড়িতে এক রাতের বেশি দুই রাত থাকেননি।

এবং আম্মা আস্তে আস্তে বুড়ো হয়ে যেতে লাগলেন। বাতের ব্যথায় কাতর হয়ে রংপুরে ছাত্র পড়ানোর ইতি দিলেন বটে, কিন্তু সঞ্চয়ের টাকা সমানভাবে পাঁচ ছেলেমেয়ের মধ্যে ভাগ করে দিতে ভুললেন না। নিজে সন্তানদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিতেন না; তবে ছেলেমেয়েরা যদি পাড়ার কোনো দুস্থকে সাহায্য করত, তিনি খুব খুশি হতেন। একসময় আম্মা বিছানায় পড়ে গেলেন। তবু্ তিনি রংপুর থেকে ঢাকায় দুই মেয়ে, এক ছেলের বাসা বা দিনাজপুরে আরেক মেয়ের বাসায় উঠবেন না। সান ফ্রান্সিসকো থেকে সাইফুল মাকে দেখতে চাইলে একবার আমেরিকাও ঘুরে এলেন তিনি। এসে তিথিকে বললেন, আমেরিকা আমাদের মতো বুড়াদের জন্য নয়। ওইখানে সাইফুল, ওর বউ শাম্মী কাজে চলে যায়। আসওয়াদ, আজজোয়াদ স্কুলে যায়। সারা দিন বাড়িতে বন্দি হয়া থাকা যায়?

তিনি বললেন, আর আমি আমেরিকা যাইতেছি না।

চিকিৎসার জন্য একবার আম্মা ঢাকা এসেছিলেন। সাজ্জাদদের বাড়িতে ছিলেন। সেই সময়ের এক রাতের কথা। সাজ্জাদ তার মায়ের কাছে গিয়ে বসল। তার মনে হলো, কোথায় আমার সেই দাপুটে আম্মা। এ যে একজন শিশু। অসহায়। সে আম্মার হাত ধরল। আম্মার পা টিপে দিতে লাগল। তারপর কাঁদতে শুরু করল।

 

কান্দিস ক্যান সাজ্জাদ?

আম্মা, আপনার কোন জায়গায় কষ্ট আপনি বলেন।

আমার কোনো কষ্ট নাই, বাবা। আমার পাঁচ ছেলেমেয়ে মানুষ হইছে। আমার আর কী কষ্ট!

আপনি রংপুরের বাসায় একা একা থাকেন কেন? এখানে থাকেন।

বাবা রে, তাই হয়! হাঁস-মুরগিগুলান আছে। দুইটা গরু আছে। বাগানের শাক-সবজি আছে। কাজের লোকগুলান তো খুব ফাঁকিবাজ। সোগ দ্যাখাশুনা করা নাগে। বাড়িত মানুষ না থাকলে বাড়ি জঙ্গল হয়া যায়।

ওই বাড়ির কথা আপনি ভুলে যান। আপনি আমার সঙ্গে থাকেন।

তুই কাজে যাস। তোর বউ চাকরি করে। তোর ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায়। আমি সারা দিন কার কাছে থাকব?

সারা দিন না হয় একাই থাকলেন, সন্ধ্যার পর তো আমরা আসব।

না বাবা। মাঝেমধ্যে আসি। তাই সম্পর্ক ভালো থাকে। আমি যদি এইখানে থাকি, তোর বউয়ের সাথতই মোর লাগি যাইবে।

না না। তিথি আপনাকে খুব মানে। খুব ভালোবাসে।

সেই জন্যই তো আমি তোর বাড়িতে থাকব না। তিথি আমাক ভালোবাসে আমি জানি। আমিও তিথিক ভালোবাসি আমি জানি। তিথিও জানে। একসাথে থাকা শুরু করলেই দুই দিন পর দেখবু লাগি যাইবে। দুইটা বাসন এক জায়গায় থুইলে ঠোকাঠুকি লাগবেই।

সাজ্জাদ মৃদুস্বরে বলতে লাগল, আম্মা, আমার আবার ছোট হয়া যাইতে ইচ্ছা করতেছে। ছোটবেলা আমরা পাঁচ ভাই-বোন একসঙ্গে জড়াজড়ি করি থাকিতাম। আপনে আসতেন। গল্প শুনাইতেন। একটাই রূপকথার গল্প আছিল আপনার। রাজপুত্র পাথর হয়া গেইছে। তার মাও কান্দে। ছেলে ক্যান আসে না। আমি সেই গল্প শুনপার পারতাম না। কান্দিয়া বুক ভাসাইতাম। ঈদে আমরা সবাই রংপুর যাইতাম। আব্বা কত খুশি হইত! আপনে আমার প্রিয় কচুশাক গড়াই মাছ মিশায়া ভর্তা করতেন। সেই দিনগুলা আর তো ফেরে না। আম্মা, আপনে এত কষ্ট করিয়া ছেলেমেয়েদের মানুষ করলেন, কেউ তো আপনার কাছে থাকে না। বুড়া হয়া গেছেন। হাঁটতে পারেন না। তা-ও রংপুরে একলা একলা কেমন করিয়া থাকেন।

এইটাই জগতের নিয়ম, বাবা। প্রথম প্রথম কষ্ট হয়। তারপর সহ্য হয়া যায়।

আম্মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন।

সাজ্জাদের দুই মেয়ে আমেরিকায় পড়ে। সাজ্জাদের বাড়ি ফাঁকা। মেয়েরা রোজ হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কল করে। তার পরও সাজ্জাদের বুকটা খাঁ খাঁ করে।

তখন হঠাৎই এক নির্জন বিকেলে টেস্ট খেলা দেখতে দেখতে সাজ্জাদ উদাস হয়ে যায়। ছোটবেলায় সে ভাবত, আম্মাকে খুন করবে। বড় হয়ে সে দেখল, আম্মা দিন দিন ছোট হয়ে যাচ্ছেন। আকারে। সাইজে। তাঁর সেই জমিদারি দাপট আর নাই। তিনি এখন কাজের লোকদের ডেকে ডেকে বলেন, একটা টুল নিয়া আমার মাথার কাছে বস। মাথাত একনা ত্যাল বসি দে। তখন মনে হতো, আম্মাকে কোলে করে নিয়ে সাজ্জাদ ঘুরতে পারবে। পাড়াময় ঘুরে বেড়াতে পারবে আম্মাকে নিয়ে।

আম্মা রংপুর থেকে নড়লেনই না। একদিন খবর এলো, আম্মা মারা গেছেন। সবাই ছুটল রংপুরে। সাইফুল আমেরিকা থেকে আসতে পারল না। তার ছুটি নাই। পরে অবশ্য একবার এসেছিল।

আম্মাকে রংপুরের মুন্সিপাড়া কবরস্থানে আব্বার কবরের ওপরেই মাটি দেওয়া হয়েছে। আব্বা-আম্মার কবরটা পাকা করে দিয়েছে সাজ্জাদ। কারণ আব্বার নামে জমিটা কেনা ছিল। এখন তো আর কবর পাকা করার নিয়ম নাই।

টিভিতে খেলা দেখতে দেখতে একটু তন্দ্রামতো এসে গেছে। নিউজিল্যান্ড ব্যাট করছে। বোরিং ব্যাপার। হঠাৎই সাজ্জাদের মনে হলো, আম্মা রংপুরের বাসায় একা আছেন, তাঁর বাতের ব্যথা, তাঁকে ঢাকায় আনতে হবে। সে সোফা থেকে উঠে বসল। পাশের শোবার ঘরে তিথি বিছানায় পিঠে বালিশ দিয়ে আধাশোয়া হয়ে আরেকটা টিভিতে নেটফ্লিক্স দেখছে। তিথিকে সাজ্জাদ বলল, আমি সৈয়দপুর যাচ্ছি।

ক্যানো? হঠাৎ?

আম্মাকে নিয়ে আসব। আম্মা একা একা রংপুরে থাকতে থাকতে একা একা মরে পড়ে থাকবে। এটা হয় না।

তিথি টিভি বন্ধ করল। বিছানা ছেড়ে উঠল। সে সাজ্জাদকে জড়িয়ে ধরে বলল, সাজ্জাদ, তুমি বোধ হয় স্বপ্ন দেখছিলে। আসো। এই বিছানায় শোও। ঘুমাও।

সাজ্জাদের ঘুম ভাঙল সন্ধ্যার পরে।

বড় মেয়ে ফোন করেছে, ভিডিও কল। তিথি ফোন নিয়ে এসে আস্তে আস্তে সাজ্জাদকে ডাকল। বুবলি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়। বলবে?

সাজ্জাদ বলল, বলব। সে বুবলিকে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে দেখে বলতে লাগল, আম্মুজি, তোমার ছুটি কবে। তাড়াতাড়ি দেশে আসো। তোমাদের আমি খুব মিস করছি।

তোমার কী হয়েছে, বাবা? বুবলি বলল।

সাজ্জাদ বলল, তোমাদের দাদিকে জিগ্যেস করেছিলাম, আম্মা, এতগুলা ছেলেমেয়ে মানুষ করলেন, কেউ আপনার কাছে থাকে না, সবাই আপনাকে ছেড়ে চলে গেল। আপনার কেমন লাগে? তোমাদের দাদি বলেছিলেন, প্রথম প্রথম খারাপ লাগে। তারপর সয়ে যায়। তোমরা দুই বোন আমাদের ছেড়ে আমেরিকা থাকো, এটা আমার সহ্য হচ্ছে না, মা।

বুবলি বলল, তুমিও আমেরিকা চলে আসো। বড় চাচা তো তোমাদের জন্য অ্যাপ্লাই করেই রেখেছে। তোমাদের ভিসা হয়ে যাবে।

 

না রে, মা। তোদের দাদি রংপুর ছাড়েন নাই। আমিও ঢাকা ছাড়ব না।

সেই সপ্তাহে রংপুরে একটা ট্যুর নিল সাজ্জাদ। তিস্তা প্রজেক্ট দেখতে যাবে সে। তিথি সঙ্গে যাবে না। তার অফিস থেকে ছুটি মিলবে না।

সৈয়দপুর এয়ারপোর্টে তাকে রিসিভ করতে আসা অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারকে সে বলল, আমি রাতে থাকব রংপুরে। গাড়ি রংপুরের দিকে নেন। ড্রাইভারকে সে বলল, রংপুর মুন্সিপাড়া গোরস্তানে চলো। আমার আব্বা-আম্মার কবর জিয়ারত করব।

লালকুঠি ধাপের পাশ দিয়ে গাড়ি যাওয়ার সময় একবার মনে হলো, তাদের বাসাটা একবার দেখে আসে, কিন্তু ওই বাড়ির সামনে যেতেই বুকটা ভেঙে এলো সাজ্জাদের। সেই পরিচিত টিনে ছাওয়া বাংলো টাইপের বাসা। এখন অনেকটাই বিবর্ণ হয়ে গেছে। ভাড়াটিয়ারা থাকে। একটা সময় এই বাসায়ই থাকত তারা, সবাই মিলে।

এই বাসায় আম্মা নাই। এই বাসায় সে ঢুকতে পারবে না।

ঈদের সময় সে যখন রংপুর আসত, আম্মা বারান্দায় বের হয়ে এসে গেট খুলতে খুলতে বলতেন, সাজ্জাদ আসছিস।

রংপুর মুন্সিপাড়া গোরস্তানে কবরের কাছে গিয়ে আম্মার সেই সংলাপটাই মনে পড়ল তার, সাজ্জাদ আসছিস...আব্বা-আম্মার কবরের দেয়ালে শ্যাওলা ধরে গেছে। সেদিকটায় তাকিয়ে সাজ্জাদ বলল, ইঞ্জিনিয়ার সাহেব, এই দেয়ালটায় রং করতে কত টাকা লাগবে, একটা এস্টিমেট করবেন তো...



সাতদিনের সেরা