kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

গ ল্প

গল্পের মতো

ফারুক মঈনউদ্দীন

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৮ মিনিটে



গল্পের মতো

অঙ্কন: শেখ আনোয়ার আমজাদ হোসেন

ইনবক্সে এত মেসেজ আসে, সব মুছে ফেলাও ঝামেলার কাজ। ‘সুপ্রভাত,’ ‘হাই, কেমন আছেন’ ধরনের মেসেজই বেশি। সানিয়া নামের মেয়েটা মেসেজ পাঠিয়েই যায়, কখনো ইংরেজি হরফে লেখে ‘কেমন আছেন?’ রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোন খুললেই অনেকের সঙ্গে দরজা খুলে ঢুকে পড়ে ‘গুড মর্নিং’ কিংবা ‘সুপ্রভাত’ লেখা ফুলের ছবি কিংবা পাখির কুজন। সকালবেলায় এসব বার্তার জবাব সব সময় দেওয়া হয় না।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু কোনো পাল্টা জবাব না পেলেও প্রভাতী শুভেচ্ছা আসতেই থাকে।

একদিন লিখে, আপনি খুবই সুন্দর লিখেন।

এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো, আমি এমন কোনো লেখক নই। গল্প লেখার চেষ্টা করি, ছাপতে পাঠালে পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকরা দীর্ঘদিন ফেলে রাখেন, ফোন করলে বলেন, এখনো পড়ার সুযোগ পাইনি, পড়ে আপনাকে জানাব। কিন্তু সে জানা আর হয় না।

তবে হ্যাঁ, পত্রিকায় না ছাপলে কি, ফেসবুকে আমার অনেক পাঠক-পাঠিকা। আমার লেখা পড়ে তাদের কেউ কেউ লাভ সাইন দেয়, লাইক সাইনই বেশি। বেশির ভাগই দেখি আপলোড করার মিনিটের মধ্যেই লাইক পাঠায়, বুঝতে পারি, না পড়েই পাঠিয়েছে। সানিয়া অবশ্য তেমন নয়, সঙ্গে সঙ্গেই কিছু লেখে না ও। দীর্ঘ সময় পর দু-এক বাক্যে এমন কথা লেখে যা ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বিশ্বাস করতে পারি না।

ও লেখে, আপনার লেখাগুলো ভীষণ পছন্দ করি। ও ইংরেজি হরফে এস দিয়ে লেখে বলে পছন্দ শব্দের উচ্চারণটা হয়ে যায় ‘পসন্দ’।

আমি ‘লাইক’ ইমো পাঠাই। যে লেখাটা লিখছিলাম সেটা এগোয় না, লিখছি বটে, না লিখলেও এমন কোনো তাড়া নেই। তবু আবার লিখতে শুরু করলেই ইনবক্সে একটা আকাশি নীল প্রফাইল বুদ্বুদের মতো ভেসে ওঠে। লেখাটা মিনিমাইজ করে ইনবক্সে ঢুকি। ও লিখেছে, আপনার প্রতিটা লেখা চোখের সামনে ছবি হয়ে যায়। এমন অসম বয়সী ফেসবুক ভক্তের এ রকম মেসেজ এটাই প্রথম নয়।

একদিন সে লেখে, ছোটবেলায় বই পড়তে গিয়ে খেতে ভুলে যেতাম, আপনার লেখাগুলো পড়ে ঠিক তেমনই মনে হয়।

মেয়েটার কথা পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও কিছুটা বিব্রত হই। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে, আমার লেখাগুলো বোধ হয় এ রকমই। তবু এই মেসেজের জবাবে লাভ সাইন পাঠাই। ও আবার লেখে, আমার সত্যিই এমন মনে হয় আপনার লেখা পড়তে গেলে।

এবার আমাকে লিখতেই হয়, একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না?

ও লেখে, আমার যেমন মনে হয় শুধু সেটাই বললাম।

এই কথাটা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়, ভেতরে ভেতরে করিও। এক ধরনের মোহ আর সুখ আমার ভেতর বুজকুড়ি কাটতে থাকে।

তারপর লেখে, সবার লেখা পড়ে ভালো লাগে না। আপনার লেখা দেখলেই পড়ি। কিংবা বলতে পারেন, না পড়া পর্যন্ত মাথার ভেতর একটা খচখচ ভাব থাকে। কী যেন করা হয়নি, এ রকম একটা ভাব।

আমি ঠাট্টাচ্ছলে লিখি, তাই নাকি! কি রকম ভাব?

— জানি বিশ্বাস করেননি। করার কথাও নয়। আপনার তো এ রকম অনেক পাঠিকা আছে।

আমি খোঁচা দিয়ে লিখি, ও, তার মানে আমার কোনো পাঠক নেই, কেবলই পাঠিকা!

ওর মেসেজ বক্সে কয়েকটা স্যাড ইমো আমার ল্যাপটপের পুরো স্ক্রিন জুড়ে একটা বিষণ্ন আবহ ছড়িয়ে দেয়।

ওকে চাঙ্গা করার জন্য একটা রবীন্দ্রসংগীতের ইউটিউব লিংক পাঠাই, ‘যদি তারে নাই চিনি গো, সে কি আমায় নেবে চিনে। ’

সারা দিন পার করে দিয়ে বিকেলে লিখল, খুবই স্লো টাইপ, মনোযোগ দিয়ে শুনতে হয়, ভালো। তবে এই গানটাই অন্য কারো কণ্ঠে শুনে দেখতে হবে, আমি একই গান কয়েকজনের কণ্ঠে শুনি।

আমি একটা স্যাড ইমো দিয়ে লিখি, তোমার বুঝি ঝুম মাচালে টাইপ গান ভালো লাগে।

— আসলে এ ধরনের গান সব সময় শুনতে ভালো লাগে না, শুনতে যে অপছন্দ করি তা না, তবে এগুলো হইচইয়ের মধ্যে নয়, একা একা নিশুতি রাতে খুব লো ভলিউমে শুনতে হয়। তবে আজকাল আর গান শুনি না। ডিপ্রেশনে ভুগছি, গান শুনলে দেখি আরো খারাপ লাগে।

ডিপ্রেশনের কথাটা আমাকে চমকে দেয়। মাস কয়েক আগে প্রথম যেদিন ওর সঙ্গে দেখা হয়, ডিপ্রেশনের কোনো ইঙ্গিত বা চিহ্ন পাইনি ওর চেহারায় বা আচরণে। হতে পারে, ডিপ্রেশনে ছিল বলেই সেটা কাটানোর জন্য আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। সাধারণত ডিপ্রেশনে ভুগলে বেশির ভাগ মানুষেরই কোনো কিছু করতে ইচ্ছে করে না, কোনো জায়গায় যেতে ইচ্ছে করে না। আবার কারো হয়তো নতুন কিছু করতে ইচ্ছে করে, ভাবে, এতে ডিপ্রেশনের ভারী মেঘ কেটে যাবে।

ব্যাপারটা ঘটেছিল স্রেফ ঠাট্টার উসিলায়। কোনো একটা লেখা ভালো লাগা প্রসঙ্গে ইনবক্সে মজা করে লিখেছিলাম, সত্যিই যদি আমার লেখা ভালো লাগে তো একদিন চলে আসো, কফি খেতে খেতে গল্প করা যাবে।

প্রিয় লেখকের ফ্যানরা কত কাণ্ডই তো করে। জানতাম, এ রকম অনেকেই লেখার প্রশংসা করে, লেখা ভালো লাগে বলে দেখা করতে চায়। মজা করে লেখা সেই কথার খেই ধরে একদিন ঠিকই ও আমার অফিসে এসে হাজির হয়েছিল। আমি বেশ বিব্রত, ভাবিনি সত্যি সত্যিই চলে আসবে। একটা আলোর আভা ছড়িয়ে টেবিলের সামনের চেয়ারে এসে বসে ও। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ওপাশ থেকে একটা মাদক ঘ্রাণ আমাকে বিবশ করে ফেলে। সেটা ওর শরীরে ছড়ানো পারফিউমের ঘ্রাণ ছিল না। রূপকথার গল্পে পরিরা নেমে এলে যে রকম সুঘ্রাণে চারপাশ ভরে যায় বলে ছোটবেলায় পড়েছি, সেই ঘ্রাণ কেমন হয় জানি না, কিন্তু এটা সে রকম বলেও মনে হয় না। একটা খুব পরিচিত অথচ অচেনা মেয়েলি শরীরের ঘ্রাণ টের পাই। সেই ঘ্রাণ এতই জোরালো ও স্পষ্ট যে দিনদুপুরের অফিসপাড়া না হলে অশরীরী কিছুর উপস্থিতি বলেই মনে করতাম। ও বলে, আপনি ভেবেছিলেন আপনার সঙ্গে মজা করছিলাম, তাই না? ভাবেননি সত্যিই চলে আসতে পারি?

অন্যের ভাবনা ধরে ফেলায় ওর বাড়তি কোনো ক্ষমতা আছে বলে মনে হয় না, আমার অপ্রস্তুত চেহারা দেখে এ রকম ভাবাই স্বাভাবিক। তবু আমতা আমতা করে বলি, না, ঠিক সে রকম নয়, তবে মজা করছ বলে মনে হলেও ভেতরে ভেতরে কিছুটা প্রত্যাশাও যে ছিল না, তা-ও নয়।

সেদিন খুব বেশি সময় ছিল না সানিয়া। কফি খেতে খেতে নানা বিষয় নিয়ে কথা বলছিল। নিজের অফিসের কথাই ছিল বেশি। বলে, ভাগ্যিস মাঝে মাঝে অফিসের কাজে বের হতে হয়, তা না হলে এই সময়ে আসতেই পারতাম না।

সেদিনের পর থেকে ওর সাহস কিছুটা বেড়ে যায় বলে মনে হয়। মেসেঞ্জারে লেখে, অফিসে আসতে ভালো লাগে না, মনে হয় যেন কোনো কাজে এসেছি আপনার কাছে।

— আমার অফিসই তো তোমার জন্য নিরাপদ জায়গা।

— তবু, আমার মনে হয় আপনার অফিসের লোকজন আড়চোখে তাকায়। ওরা ভাবে, আপনার সঙ্গে অভিসারে এসেছি।

আমি ওকে আশ্বস্ত করে লিখি, না অতটুকু হয়তো ভাবে না। তুমি তো আমার অনেক ছোট, তবে সুন্দরী মেয়ে দেখলে আড়চোখে তাকানোটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।

বেশ কিছুদিন বিরতির পর ও লেখে — মেসেজ লিখতে লিখতে আমার আঙুল ব্যথা হয়ে যায়। সরাসরি কথা বলার আমেজটা মেসেজে আসে না। ডিপ্রেশনে ভুগছি বলে আমার একটু ডাইভারশন দরকার। খুব বুঝদার কারো সঙ্গে কিছু সময় কাটালে হয়তো কিছুক্ষণ ভালো কাটবে।

এই মেসেজ পাওয়ার পর আমি নতুন একটা গল্পের গন্ধ পেয়ে উৎসাহী হয়ে উঠি। ডিপ্রেশনের কথা আগেও বলেছিল, ওর জীবনকাহিনির মধ্যে একটা গল্পের বীজ লুকিয়ে থাকতে পারে ভেবে জিজ্ঞেস করি, ডিপ্রেশনে ভুগছ কেন?

তত দিনে মেসেঞ্জার নয়, কথা হয় ফোনে। ফোন মানে হোয়াটসঅ্যাপ। ফোনে কিছুতেই কথা বলতে চায় না ও, বলে ওটা সেফ নয়।

ও বলে, কারণ তো একটা নয়, ফোনে এত কথা কি আর বোঝানো যায়?

আমি আগ্রহ হারাই না, বলি, শুনতে চাই, যদি গল্প লেখার কোনো সাবজেক্ট পাওয়া যায়।

ও একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলে, গল্প লেখার মতোই হবে, চাইলে উপন্যাসও লিখতে পারবেন।

আমি বলি, তাহলে তো শুনতেই হয়। সব শুনব, তারপর মাথার মধ্যে সব কিছু নাড়াচাড়া করতে করতে একটা গল্পের চেহারা পাবে ওটা।

— একদিন সময় বের করে বলব সব।

মেয়েরা যেমন নিজেদের ছবি তোলাতে বা জ্যোতিষীর কাছে হাত দেখাতে ভালোবাসে, তেমনি পছন্দ করে নিজেকে গল্পের নায়িকা হিসেবে দেখতে।

বলি, ঠিক আছে, কোথায় বলবে? আমার অফিসে আসতে তো তোমার আপত্তি আছে।

একটু ভেবে নিয়ে ও বলে, একদিন অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে আজিজ মার্কেটে নেমে পড়তে পারি। সেটাই ভালো জায়গা। সেদিন একটু তাড়াতাড়ি বের হব অফিস থেকে, আপনিও। কেমন হবে?

একটা গল্পের প্লট পাওয়ার আশায় আমি রাজি হয়ে যাই। বহুদিন ধরে নতুন লেখার মতো কিছু মাথায় আসছে না।

নির্দিষ্ট দিনে অফিস ছুটির সময়ের খানিক আগেই পৌঁছে যাই আমি। ভালো জায়গাই বাছাই করেছে সানিয়া, ও না আসা পর্যন্ত বইয়ের দোকানে ঘুরে সময় কাটানো যাবে। আমাকে কোন স্টলে পাওয়া যাবে জানিয়ে মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছি, যাতে ওর খুঁজতে না হয়।

সাজিয়ে রাখা বইয়ের নাম পড়তে পড়তে দু-একটা টেনে নিয়ে পাতা উল্টে দেখে আবার জায়গামতো রেখে দিচ্ছিলাম। একসময় যখন আর মনে থাকে না যে কারো অপেক্ষায় আছি, তখন খুব পরিচিত একটা মেয়েলি শরীরের ঘ্রাণ পাই। হাতের বইটা শেলফে তুলে রেখে ঘাড় ফেরানোর আগেই কানের কাছে মৃদু কণ্ঠ শুনতে পাই, ‘অনেকক্ষণ?’ নৈকট্যের কারণে ঘ্রাণটা আজ গাঢ় হয়ে আসে। ওর দিকে তাকিয়ে হেসে বলি, নাহ, পনের বিশ মিনিট হবে। আমার পাশে দাঁড়িয়ে দু-একটা বই আলগোছে দেখে নিয়ে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করলে আমি ওর পিছু নিয়ে বের হয়ে আসি।

বাইরে এসে বলি, দোতলায় কয়েকটা রেস্টুরেন্ট আছে ওখানে বসতে পারি। ও সম্মতি দিলে অপরিসর সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে আসি আমরা। পেছনের দোকানগুলোর সামনে দিয়ে হেঁটে কোনটাতে বসব ঠিক করতে পারছিলাম না। কিন্তু ওগুলোর চেহারা দেখে সানিয়া বলে, মা গো, না না, এ রকম ঘিঞ্জি জায়গায় বসে কথা বলা যাবে না।

অগত্যা ফের নিচে নেমে এসে বোকার মতো হেসে বলি, তাহলে?

ও বলে, চলেন হাঁটতে হাঁটতে ইউনিভার্সিটিতে চলে যাই। ওখানে গায়ের ওপর হুমড়ি খাওয়া লোকজন নেই, মন খুলে কথা বলা যাবে।

বুঝতে পারি, ও যে কথাগুলো বলতে চায়, সেসব হয়তো রেস্তোরাঁর লোকজনের মধ্যে বসে বলার মতো নয়। এখানে উটকো লোকজন গা ঘেঁষে বসে কান পেতে থাকবে না। শাহবাগের ফুটপাত ধরে যেতে যেতে বলি, তোমার উনি তোমাকে এখানে দেখতে পেলে সমস্যা হবে না তো?

ও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, সমস্যা তো হবেই, তবে ওর অফিস উত্তরায়, আমার মতো বাইরে ওর কাজ পড়ে না। তাই দেখে ফেলার আশঙ্কা হাজারে এক।

শাহবাগের মোড় ঘোরার পর মেট্রো রেলের বিশাল কাঠামোর নিচে সংকীর্ণ রাস্তায় গাড়ি আর রিকশার মিছিলের উল্টোদিকে হাঁটতে গিয়ে ও কিছুটা পিছিয়ে পড়ে। যে কেউ দেখে মনে করবে একাই হেঁটে যাচ্ছে যেন। ওর উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে আমি ওর পাশাপাশি হওয়ার চেষ্টা করি না। অবশ্য উভয়মুখী চলমান মানুষের ভিড়ে সয়লাব পথটা গল্প করতে করতে পাশাপাশি হেঁটে যাওয়ার মতোও নয়। ইউনিভার্সিটির গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢোকার পর একটা মুক্ত হাওয়ার স্বস্তি মেলে। সানিয়া পাশে এসে দাঁড়ালে ওকে বলি, ঠিক জায়গাই বাছাই করেছ।

ক্লান্ত হেসে বলে, সব সময় ঠিক বাছাই করতে পারলে আজ আপনার সঙ্গে এখানে আসতে হতো না।

ওর কথায় বিষণ্নতার সুর। আমরা পায়ে পায়ে হেঁটে লাইব্রেরির বারান্দায় গিয়ে বসি। আসার পথে মসজিদের উল্টোদিকে একটা ঝালমুড়িওয়ালাকে দেখেছিলাম। উঠে গিয়ে দুই ঠোঙা ঝালমুড়ি নিয়ে আসি আমি। একটা ওর হাতে দিয়ে মজা করে বলি, রেস্টুরেন্টের তেলেভাজার চেয়ে এটা অনেক নিরাপদ।

ওর বিষণ্নতা কাটানোর জন্য আমার ঠাট্টাটা যেন শূন্যে মিলিয়ে যায়। ঠোঙাটা হাতে ধরে রেখে সামনের দিকে ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ও। আমি ওকে একটু নিজের মতো থাকতে দিই। খানিক পর আমার দিকে না তাকিয়ে যেন নিজের সঙ্গে কথা বলছে এমনভাবে ও বলে, আমার জীবন নিয়ে আপনি গল্প লিখেই খালাস, সমাধান তো আর দিতে পারবেন না।

আমি একই রকম তরল গলায় বলি, সব কিছু না শুনলে কী সমাধান দেব। আপাতত ঝালমুড়িটা খাও, অফিস থেকে এসেছ, খিদে পাওয়ার কথা।

এ কথায় বাধ্য মেয়ের মতো হাতের তেলোতে অল্প মুড়ি ঢেলে নিয়ে খায় ও। আমি তাড়া দিই না, জানি নিজে থেকেই বলবে। একসময় সত্যিই বলতে শুরু করে ও, বিষয়টা আপনার কাছে হয়তো নতুন কিছু মনে হবে না, কিন্তু আমার কাছে নতুন আর অনেক ভারী, বয়ে নেওয়া যায় না এমন। বিষয়টা পারিবারিক, ঘরের মানুষের সঙ্গে ঝামেলা চলছে।

আমি বিষয়টাকে হালকা রাখার জন্য বলি, সেটা সবার ক্ষেত্রেই ঘটে, নতুন কিছু নয়। আবার ঠিক হয়ে যাবে।

ও বলে, ও আমার সঙ্গে আর কন্টিনিউ করবে না বলছে। আর আমি আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি সংসারটা টিকিয়ে রাখতে। এভাবে যুদ্ধ করতে করতে আমি টায়ার্ড। আমার পাশে কেউ নেই।

এবার ওর কণ্ঠের আর্দ্রতা আমাকে ছুঁয়ে যায়, মজা করার ইচ্ছেটা আমার ভেতর থেকে মরে যায়। বলি, কিন্তু কেন? সমস্যাটা কোথায়?

— ওর কাছে আমার সব কিছুই নেগেটিভ। বিয়ের পর আট বছর ধরে নিজেকে ওর যোগ্য করে তোলার চেষ্টা করে গিয়েছি। যখনই ওর ব্যবসার টাকার দরকার আমার চাকরির সব রোজগার ওর হাতে তুলে দিয়েছি, কেবল চেয়েছি আমার বাচ্চাগুলো যাতে একটা আস্ত পরিবার পায়।

— সব মেয়ে এটাই চায়। বাচ্চা স্বামী সংসার—এসব। বুঝতে পারি, আমার কথাগুলো রেডিওর শিক্ষামূলক নাটকের ডায়ালগের মতো শোনায়।

— অবস্থা সবচেয়ে মারাত্মক হয়ে দাঁড়ায় আমার সেকেন্ড বেবিটার জন্মের আগে। ও অস্বীকার করে বসে, এটা ওর বাচ্চা নয়। একটা মেয়ের জন্য এ রকম কথা যে কী রকম লজ্জার সেটা আপনি পুরুষ হয়ে বুঝতে পারবেন না। হাজবেন্ড যখন বলছে, এ কথা মিথ্যে হতে পারে না। একবার ভাবি সুইসাইড করি। কিন্তু আমার মেয়েটার মুখ মনে পড়লে দুর্বল হয়ে পড়তাম।

ওর কাহিনি যে এদিকে মোড় নিতে পারে ভাবতে পারিনি। একটা অন্য রকম গল্পের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আমি কোনো কথা বলি না। নিজেকে কেমন যেন অপরাধী মনে হতে থাকে। কেবল বলি, তারপর?

— ছেলে হওয়ার পর একটু বড় হতেই দেখা গেল একেবারে বাবার কার্বন কপি। তখন ওর আর কিছু বলার থাকে না।

আমি কেবল বলি, কী সাংঘাতিক!

— এভাবে হেনস্তা করতে না পেরে প্রেশার দিতে শুরু করল টাকার জন্য। রোজগারের সব টাকাই ওকে দিয়ে দিতে হতো। ভেতরে ভেতরে খুব কষ্ট পেতাম, টাকার জন্য নয়, একটা মানুষ কিভাবে বদলে গিয়ে এ রকম আচরণ করতে পারে সেটা ভেবে। তার পরও সব কিছু মানিয়ে নিয়ে চলতে চেয়েছি যাতে সংসারটা টেকে, সংসার ভাঙলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় বাচ্চাদের। মা হয়ে ওদের কষ্ট মেনে নিতে পারব না।

— বদলে যাওয়ার কথা বলছ। তার মানে তোমাদেরটা পছন্দের বিয়ে ছিল?

— পছন্দের যে অর্থে বলছেন, ঠিক সে অর্থে নয়, বাবা-মায়ের কাছে আমারই পছন্দের পাত্র ছিল সে। তবে সেটা প্রেমের পছন্দ বলা যাবে না।

— সেটা আবার কি রকম?

— সে আরেক গল্প। বললাম না যে আমার জীবনটা গল্পের মতো?

সায় দেওয়ার জন্য বললাম, তা-ই তো মনে হচ্ছে।

— ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করে বের হওয়ার পর থেকে বাবা-মা উঠে-পড়ে লাগলেন বিয়ের জন্য। বয়স হয়ে যাচ্ছে বলে যাকে পায় তার সঙ্গেই বিয়ে দিয়ে দেয় যেন। ছেলে পছন্দ হওয়ার মতো না হলেও প্রেশার দিতে থাকে।

— এ রকম অবস্থায় নিজের পছন্দ থাকাই তো ভালো।

— সেটাই হয় শেষ পর্যন্ত। বাসা থেকে বলল, নিজের পছন্দের কেউ থাকলে তাকে যেন ওদের কাছে হাজির করি, তা না হলে ওদের যাকে পছন্দ তার সঙ্গেই বিয়ে দেবে। আসলে আমার তেমন কেউ ছিল না যার কথা ওদের বলতে পারি। এমন সময় একজনের সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হয়। একসময় ফোন নম্বর এক্সচেঞ্জ হয়, আলাপ দীর্ঘ হয়, দু-একবার দেখাও করি আমরা। এদিকে বাসা থেকে এক বয়স্ক লোকের সঙ্গে আমার বিয়ে প্রায় ঠিক করে ফেলে। তখন নতুন পরিচিত ছেলেটার কথা মাথায় ঘুরছিল আমার, চুপচাপ, ভদ্র স্বভাবের, ছোট ফ্যামিলি। ওর কথাই বাসায় গিয়ে বললাম। প্রথমে কিছুতেই রাজি হয় না কেউ। কিন্তু আমারও জেদ চেপে যায়, কারণ ওরা যার সঙ্গে বিয়ে ঠিক করেছিল, তাকে আমার একফোটা পছন্দ হয়নি। তত দিনে এই চাকরিটা পেয়ে গিয়েছিলাম বলে আত্মবিশ্বাসও বেড়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আমার জেদেরই জয় হয়।

আমি এতক্ষণ চুপ করে শুনছিলাম, খোলা জায়গা বলেই বোধ হয় এত কাছে থেকেও বিবশ করে দেওয়া ঘ্রাণটা আর তেমন তীব্র হয়ে আসে না। দিনের আলোর মতো ওর কথাও যেন ফুরিয়ে যায়। একটানা এতগুলো কথা বলে ও কিছুটা ক্লান্তও বুঝি। কাছের একটা ঝুপসি গাছের ভেতর তীব্র কলরবে পাখিরা খুঁজে নিচ্ছিল রাতের আশ্রয়। স্তিমিত দিনের মতো মৃদু স্বরে ও বলে, বিয়ের পর ওর সন্দেহ বাতিকটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমার কাছে। আমি চাকরি করি বলে সন্দেহের কারণটাও বেশি। অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলে সন্দেহ করত, অফিস টাইমের পর কোনো কাজে কলিগদের কেউ ফোন দিলেও সন্দেহ। বুঝতে পারি আমার বেতনের টাকাটার ওপর লোভ না থাকলে চাকরিটাও করতে দিত না ও। আমার ফোনের কললিস্ট, মেসেজ, মেসেঞ্জার, ফ্রেন্ড লিস্ট সব কিছুই চেক করে দেখত ও, অপমান লাগলেও দেখতে দিতাম, আমার তো গোপন করার মতো কিছু নেই, তাই ভয় ছিল না। এখন এসব গা সওয়া হয়ে গেছে। সংসারটা টিকিয়ে রাখার জন্য সব অপমান, লাঞ্ছনা সহ্য করে আসছি, কিন্তু হেরে যাচ্ছি বোধ হয়। এখন মিউচুয়াল ডিভোর্সের কথা ভাবছে।

এটুকু বলে চুপ করে যায় ও, বোধ হয় কান্না চাপার জন্য। এ সময় আচমকা চারদিক যেন নিস্তব্ধ হয়ে যায়, পাখিদের তীব্র কলরব থেমে গেছে। পাশের মসজিদ থেকে আজানের শব্দে সেই নীরবতায় চিড় ধরে। মাথায় ওড়না তুলে দিতে দিতে বলে, হায় আল্লা, সন্ধ্যা হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি।

আমি কিছু একটা বলার জন্যই বলি, তোমার কাহিনি তো শুনলাম, এখন কী করবে ভেবেছ?

ও উঠতে উঠতে বলে, কিছুই না। আর পারছি না, যা হওয়ার তা-ই হবে। কেবল বাচ্চাগুলোর কথা ভাবি, ওদের ভবিষ্যৎ কী হবে কে জানে।

আমি বলি, মিউচুয়াল ডিভোর্সের কথা বললে, সেটা যদি ঠেকাতে না পার, দেখবে খোরপোষ, দেনমোহর এসব থেকে যেন তোমাকে বঞ্চিত করতে না পারে। আইন-কানুন জানি না আমি, কোনো উকিলের সঙ্গে কথা বলতে পারো। আমিও খোঁজ নিয়ে জানাব তোমাকে।

হাঁটতে হাঁটতে বলে, আপনাকে কথাগুলো বলতে পেরে কিছুটা হালকা লাগছে। তারপর আমার জবাবের অপেক্ষা না করে একটা রিকশা ডেকে জিগাতলার ভাড়া দরদাম করতে থাকে। আমি বলি, আমার সঙ্গে তো গাড়ি আছে, তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিতে পারি। ও বলে, না থাক, আমি এভাবেই তো যাই রোজ। এখন মারাত্মক জ্যাম হবে, গাড়ি নিয়ে ঝামেলায় পড়বেন, রিকশাওয়ালারা ঠিকই ফাঁকফোকর বের করে নিতে পারে।

বলার মতো কিছু খুঁজে না পেয়ে নিষ্ক্রিয় মানুষের মতো দাঁড়িয়ে থাকি আমি। ও রিকশায় উঠে বসে বলে, যাই, বেঁচে থাকলে আবার কখনো দেখা হবে।

আমি বলি, যা কিছু হোক, জানাবে আমাকে। সংকোচ করবে না।

ও কিছু বলার আগেই রিকশা চলতে শুরু করে। অন্ধকারের সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নেমে আসছিল সন্ধ্যা। আমি ড্রাইভারকে ফোন করে গাড়ি কোথায় আছে জানতে চেয়ে শাহবাগের দিকে মন্থর গতিতে হাঁটতে থাকি। ওর কাহিনিটাকে নতুন কিছু বলে মনে হয় না। আমার জানাশোনার মধ্যেই অনেকের জীবনেই এ রকম ঘটেছে। আমার অফিসেও আছে দুজন, আজকাল এটা একেবারেই সাদামাটা ঘটনা। এ রকম বিষয় নিয়ে অগুনতি গল্পও লেখা হয়ে গেছে, নতুন করে লেখার মতো কিছু নেই আর। এদিকে বেচারি ভাবছে এটা নিয়ে উপন্যাসও লেখা যায়, যেন আমি লিখলেই মিটে যাবে। মানুষ যে রকম ভাবে, যেকোনো সমস্যার কথা খবরের কাগজে লিখলেই বুঝি দ্রুত সমাধান হবে। ও যে আশা করে বসে থাকবে অন্তত একটা গল্প লিখব ওর জীবন নিয়ে, তার কী হবে ভাবতে ভাবতে শাহবাগের ভিড়াক্রান্ত মোড়ে পৌঁছে আচমকা নিজেকে খুব বিপন্ন মনে হয় আমার।



সাতদিনের সেরা