kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

উ প ন্যা স

লকডাউনে কাল

আন্দালিব রাশদী

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯৩ মিনিটে



লকডাউনে কাল

অঙ্কন : মাহবুবুল হক

এক.

সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সের ফরমান মানা হলে অনেক কিছুই হওয়ার নয়। এর একটি কৌতুককর ভিডিও ক্লিপ আমার চোখে পড়েছে। স্বামী ও স্ত্রী তাঁদের প্রায় এক বছর বয়সী সন্তান নিয়ে বার্থ রেজিস্ট্রেশন অফিসে গেলেন, ছেলের জন্ম সনদ নেবেন। কর্মকর্তা চশমা তুলে শিশুটিকে দেখে দেয়ালে বড় হরফে লেখা একটি বিজ্ঞপ্তির দিকে দুজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।

বিজ্ঞাপন

তাতে লেখা—এখানে অবৈধ সন্তানের রেজিস্ট্রেশন করা হয় না।

স্ত্রী ধমকের স্বরে কর্মকর্তাকে বললেন, আমাদের এটা দেখাচ্ছেন কেন? আমরা বিবাহিত, সঙ্গে কাবিননামাও নিয়ে এসেছি।

কর্মকর্তা বললেন, স্বামী-স্ত্রী না হলেও তাদের সন্তানের বার্থ রেজিস্ট্রেশন আমরা করে থাকি, এটা সমস্যা নয়।

স্বামী বললেন, তাহলে আমাদের আটকাচ্ছেন কেন?

আপনাদের সন্তান আইনসিদ্ধ নয়। সরকারি নির্দেশ মান্য করে সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স মানলে সন্তান হওয়ার সুযোগ নেই। যদি কারো হয়ে থাকে, ওটা নিশ্চিত সে সন্তানের জন্ম হয়েছে বেআইনি সহবাসে।

অসম্ভব! একেবারেই অসম্ভব। সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সের ব্যাপারটা যদি মাথায় থাকে আর সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের হুকুমনামা যদি প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষ সত্যি মানে তাহলে লকডাউনের কালে বাচ্চাকাচ্চা হওয়ার সুযোগ কোথায়? রুমকির কাছ থেকে ছয় ফুট দূরে থেকে আমার পক্ষে বাচ্চার বাবা হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ছয় ফুট কেন, ছয় ইঞ্চি দূরে থেকেও অসম্ভব। এটা কি টিভি নাকি যে উনিশ কি পনেরো ফুট দূর থেকে রিমোটটা ওদিকে একবার মুখ করে বাটন টিপে দেব আর অমনি অন্ধকার স্ক্রিন হঠাৎ আলোকিত হয়ে উঠবে, দেখা যাবে সিএনএন, আলজাজিরা, এইচবিও কিংবা দিদি নাম্বার ওয়ান এবং বাংলাদেশের দেড় ডজন চ্যানেল।

তা ছাড়া বিভিন্ন ধরনের তিক্ততায় আমাদের সম্পর্ক যেখানে গিয়ে ঠেকেছে, শরীর এমনিতেই সাড়া দিতে চায় না, তারপর আবার সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স!

আমি বরং সরকারের বাধ্যতামূলক আদেশকে স্বাগত জানিয়েছি। সম্পর্ক খারাপ—এ সত্য স্বীকার করার পর একজন টঙ্গী এবং একজন ওয়ারীতে থাকলে সমস্যা কম, কিন্তু দুজনকে যদি একই রুমে এক বিছানায় থাকতে হয়, ব্যাপারটা দুজনের জন্যই যন্ত্রণার। এমনিতেই পরস্পরের দিকে পিঠ দেখিয়ে আমরা ঘুমাই। সরকারের আদেশ আমাদের এই শয়নশৈলীর বৈধতা দিয়েছে। এখন শুধু পিঠ দেখানোই নয়, দু্জন খাটের প্রান্তদেশে চলে এসেছি। আমাদের কথা বলারও দরকার হয় না। আমরা কিংবা আমি যে খাট ছেড়ে কোনো রুমে চলে যাব, তারও উপায় নেই।

উপায় একেবারে নেই, তা নয়। আমাকেই তাহলে এবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে।

দেড় হাজার স্কয়ার ফিট মেঝের ওপর যদি তিন রুমের অ্যাপার্টমেন্ট হয়, তাতে যদি দুটি বাথরুম, কিচেন, ডাইনি-ড্রয়িং স্পেসও থাকে তাহলে সহজেই অনুমান করা যায়, একেকটা রুমে ডাবল খাট ফেলার পর ওয়ার্ডরোব ঢোকালে পা চালানোই মুশকিল। মাস্টার বেডে আবার বারো ইঞ্চি প্রশস্ত পাঁচ তাকের বইয়ের আলমারি ঢোকানো হয়েছে। রুমকি বই পড়ে। ইংরেজি-বাংলা দুই ভাষার বই-ই।

আমি জীবনে কখনো বাংলা কোনো উপন্যাসই পুরোটা শেষ করিনি, এমনকি আমার আইএ ক্লাসে পাঠ্য ‘শ্রীকান্ত’ প্রথম পর্বটাও না। নোট বই ছিল বলে একটি প্রশ্নের উত্তর পুরোটাই মুখস্থ করেছি। প্রশ্নটি হচ্ছে : বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলিয়া দেয়—এই উক্তি দ্বারা লেখক কী বুঝাইয়াছেন?

কী বুঝাইয়াছেন, তিনিই ভালো জানেন। তবে আমি বুঝেছি, ছোট-বড় বলে আলাদা করে কোনো লাভ নেই, বছরখানেকের মধ্যে সব প্রেমই দূরে ঠেলে দেয়।

বিয়ের পর রুমকি যখন আমাকে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ পড়তে দিল, বেশ কষ্ট করে চার-পাঁচ পাতা পড়ে মনে হলো, অন্যের বানিয়ে বানিয়ে লেখা শব্দ-বাক্য এসব পড়ে আমার জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করতে পারি না। তাতে আমার কোনো লাভ নেই। তার চেয়ে দু-এক ঘণ্টা বেশি ঘুমাব। ঘুমাতে ইচ্ছা না করলে শাওয়ার ছেড়ে তার নিচে দাঁড়িয়ে থাকব। তা ছাড়া আমাকে গপ্প-উপন্যাস পড়তেই হবে, এমন কোনো শর্ত আমার বিয়ের কাবিনে লেখা ছিল না। প্রায় এক সপ্তাহ পর যখন রুমকি জানল আমি পাঁচ পৃৃষ্ঠা পর্যন্ত এসেছি—আমার হাত থেকে নিয়ে তার শেলফে ঢুকিয়ে দিল। বলল, অনেক হয়েছে, বইটা আর কদিন তোমার কাছে থাকলে লেখক নিশ্চয় পাঠক ধরে রাখতে না পারার গ্লানিতে ভুগবেন। বিভূতিবাবুর ভাগ্য ভালো, বহু আগেই বিদায় নিয়েছেন।

আমি বলি, তুমি আমাকে মরা মানুষের লেখা বই পড়তে দিয়েছ? সে জন্যই তো এগোতে পারছিলাম না।

রুমকি বলল, কী বললে! মরা মানুষ? মরা মানুষ কি লিখতে পারে? যে কারো কবরের ভেতর দশ রিম কাগজ আর এক কুড়ি কলম ঢুকিয়ে দিয়ে এসো, দেখো এক লাইন কেউ লিখতে পারে কি না।

আমার জবাব নেই।

রুমকি দ্রুত একটি উপসংহার টেনে দেয়, যতক্ষণ লেখকের একজনও পাঠক থাকে, লেখক ততক্ষণ মরেন না। বিভূতিভূষণ মরেননি, এমনকি আমার কাছে হোমারও মরেননি।

দীর্ঘ জীবন লাভের একি ফর্মুলা! যৌবন জাগানো দশমুলারিস্ট নামের হারবাল মেডিসিন ব্যবসায়ীরাও তো এই অমরত্বতত্ত্ব জানে না।

বাহ! দারুণ তো। আমি পড়ি না বলে আমার কাছে মৃতরা তো অবশ্যই, এমনকি সব জীবিত লেখকও মৃত! পুষ্পিতা সমাদ্দারও কি মৃত? পুষ্পিতা আমার ক্লাসমেট অশোক সমাদ্দারের স্ত্রী। বইটই লিখে পুরস্কারটুরস্কারও পেয়েছে। অশোক আমাকে দুটি দিয়েছিল, বলেছে পড়ে দেখিস।

আমি বললাম, তুই পড়িসনি, আমার পড়ার কী দরকার?

দরকার আছে। বইয়ের ভেতর থেকে দু-একটা ডায়ালগ যদি পুষ্পিতাকে শুনিয়ে দিতে পারিস ভীষণ খুশি হবে, লেখক হিসেবে তার, ওটাকে কী যেন বলে—কনফিডেন্স, তা অনেক বেড়ে যাবে। হীরার আংটি পাওয়ার চেয়ে বেশি খুশি হবে, সবচেয়ে বড় কথা, তার মনে তোর জন্য একটা সফট কর্নার তৈরি হবে। একজন নারীর অন্তরে বিনা পয়সায় ঠাঁই করে নেওয়ার মতো সুযোগ আর কোথায় পাবি?

আমি জিজ্ঞেস করি, তুই পড়েছিস?

অশোক টিঅ্যান্ডটির ইঞ্জিনিয়ার, গায়ের রংটাও ফরসা, তেলে ভাজা গোলগোল্লার মতো চেহারা। বলল, আরে ধ্যাৎ, আমার এসব পড়ার সময় আছে নাকি? তা ছাড়া এসব হাই থটের বই পড়ে জীবনটাকে স্লো করে ফেলতে চাই না।

তাহলে আমার জীবনটাকে স্লো করতে যাব কোন দুঃখে?

সময় অশোকেরও নেই, আমারও নেই। বই দুটি আমাদের আরেক বন্ধু ওয়ালিকে দিয়ে বললাম, তোর বউকে দিস। বই পেলে এত খুশি হবে, হীরার আংটি দিয়েও তা সম্ভব নয়।

ওয়ালি বলল, তাহলে আংটিটাও দে, টেস্ট করে দেখি কোনটা নেয়? বিয়ে তো এখনো করিসনি, বউ চিনবি কেমন করে? আমার বউ বকুল দুটিই নেবে। আংটি আঙুলে ঢুকিয়ে বইয়ের পাতা একটা একটা করে ছিঁড়ে কাগজের নৌকা বানিয়ে পানি ভরা বাথটাবে ভাসিয়ে দেবে।

কয়েক দিন পর অশোক জিজ্ঞেস করল, পুষ্পিতার বই কেমন লাগল?

বললাম, ওয়ালির বউ বকুল বলতে পারবে।

অশোক বলল, ভালো করেছিস, পুষ্পিতা ফ্যান ক্লাবের আরো দুজন মেম্বার বাড়ল। একটা বই যত বেশি হাতে ঘুরবে, পুষ্পিতার নাম তত বেশি মানুষ জানবে। ব্যাপারটা মুদ্রার সার্কুলেশনের মতো যত বেশি হস্তান্তর হবে, মুদ্রার গুরুত্বও তত বাড়বে। বুঝলি না, এ জন্যই ডলার এত জনপ্রিয়।

অশোক চান্স পেয়ে মুদ্রাতত্ত্বও খানিকটা বুঝিয়ে দিল এবং বলল, দোস্ত ডলারের দিন শেষ, চায়নিজ ইউয়ান ডলারের ড্যাশ মেরে দেবে।

ড্যাশ মেরে দেবে মানে?

ওই ড্যাশের জায়গাটাতে পাছাটা বসিয়ে দে। শালা, আহাম্মক। পড়াশোনা না করলে যা হয়। এটা হচ্ছে সিম্বলিক ল্যাঙ্গুয়েজ।

এবার অশোক ভাষাতত্ত্বও বুঝিয়ে ছাড়ল।

রুমকি কম কথা বলে, রাগ হলে মাথা ঝিমঝিম করে, মাসে তিন-চার দিন মেজাজ এমনিতেই খটমটে থাকে, সবুজ রঙের কোনো কাপড় দুচোখে দেখতে পারে না। যেখানে ছোট বোন রুমকির সঙ্গেই এক বিছানায় থাকতে ইচ্ছা করত না, সেখানে পুরুষমানুষের সঙ্গে ঘুমাতে হবে, এটা তো ভাবতেই পারত না। এসব কথা রুমকি বিয়ের আগে ও বিয়ের পরে আমাকে শুনিয়েছে।

বাসায় যদিও সপ্তাহে এক দিনই ছুটির কারণে দিন-রাত থাকে, সেদিন রুমকি কিছুক্ষণ পর পর বলে, কী অসহ্য? আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমি চেষ্টা করি ছুটির শুক্রবারটা বাইরে বাইরে কাটাতে, তাতে রুমকির মুখোমুখি হওয়াটা এড়িয়ে যাওয়া যায়। যদি স্ত্রীকে এড়াতেই হয় তাহলে বিয়ে করা কেন?

রুমকির দিকটাও উপেক্ষা করার মতো নয়। তার নাকি কখনোই কোনো ড্রিম প্রিন্স—স্বপ্নের রাজকুমার ছিল না, যে টগবগ করে ঘোড়া হাঁকিয়ে চলে আসবে, তাকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে, রাখবে রাজপ্রাসাদের শাহি বেডরুমে, সোনার পালঙ্কে ঘুমাবে একসঙ্গে।

ঠিক প্রেম নয়, আমাদের বিয়ের আগে কথাটথা বলার এই পর্বটি মাত্র চুয়াল্লিশ দিনের। তখনো সম্পর্কের ধরনটা আপনি সম্বোধননির্ভর ছিল। রুমকি বলল, শুনুন, আমি কিন্তু বই পড়ে দিন কাটাই, বাধা দিলে কিন্তু শুনব না।

আমি বললাম, পড়ুন, সেটা ভালো, লিখতে যাবেন না কিন্তু।

কেন?

লেখকদের সম্পর্কে আমার ধারণা কিন্তু খারাপ।

রুমকি বলল, বাঁচালেন। মেজো মামা দেখা হলেই বলেন, বুড়ি, তুই এত পড়িস, লিখিস না কেন? ভালোই হয়েছে, এখন থেকে আপনাকে দেখিয়ে বলে দেব, তিনি পছন্দ করেন না তাই।

বুড়ি?

হা, মেজো মামা বলেন, একসময় তো বুড়ি হবিই, আগে থেকে বুড়ি বলে ডাকাডাকি করলে তখন আর কারো মুখে বুড়ি শুনলে মেজাজ খারাপ হবে না।

টেলিফোন আলাপেই বিয়ের ঠিক আগের দিন আমরা একই সঙ্গে আপনি থেকে তুমিতে নেমে আসি। আমি বললাম, রুমকি, আপনি, মানে তুমি কি...?

বলো, কী বলতে চাচ্ছিলে?

এটাই, মানে তুমি বলতে চাচ্ছিলাম।

ও আচ্ছা, আমিও তো তা-ই বললাম।

তুমি কি এখন বই পড়ছিলে?

কেন?

চেক করছিলাম, তুমি না বললে বই পড়ে দিন কাটাও।

ও আচ্ছা, পড়ছিলাম, হাউ টু হ্যান্ডল ইওর হাজব্যান্ড?

এ বিষয়েও বই আছে নাকি? ইংরেজি কেন, আমার মা তো বাংলাও পড়তে পারত না, তার পরও বাবাকে বেশ ভালোই হ্যান্ডল করেছে।

ঢাকা শহরে আমার তেমন দূরসম্পর্কেরও কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই যে রুমকির গায়েহলুদ দিতে যাবে, শুধু ছবি তোলার জন্য তাদেরই বিল্ডিংয়ের ছাদে রুমকির একটা নামমাত্র গায়েহলুদের অনুষ্ঠান হয়েছে।

ভেতরের কথা হচ্ছে, গায়েহলুদটা হয় আমাদের প্রকৃত কাগজে-কলমে বিয়ের এক দিন পর, আর লোক-জানানো একটি অনুষ্ঠান আরো দুই দিন পর সন্ধ্যাবেলা ধানমণ্ডির পুরনো ২৭ নম্বর রোডের একটি রেস্তোরাঁয়। একাংশে আনুমানিক এক শ লোকের উপস্থিতিতে অতিথিদের চার ভাগের এক ভাগ আমার পক্ষের আর সবাই রুমকিদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও বন্ধুজন।

বউভাতজাতীয় কিছু হয়নি। একটাই অনুষ্ঠান, নাম রিসেপশন। কথা ছিল, খরচ ফিফটি-ফিফটি শেয়ার করব। কিন্তু রুমকি বলল, তা কেন, তোমার গেস্ট পঁচিশ পার্সেন্ট ক্রস না করলে তুমি দেবে ওয়ান-ফোর্থ। বাকিটা আমাদের, মানে আমারই। বাবা বেঁচে থাকলে পুরো দায়িত্বটাই নিজের কাঁধে নিয়ে নিত। মা হয়তো কিছু শেয়ার করবে। ভাগে দুটি করে অ্যাপার্টমেন্ট পেলেও ভাইদের একজন আসবে গেস্ট হয়ে, হাতে থাকবে বড়জোর একটা ফ্লাস্ক কিংবা ফ্লাওয়ার ভাস, ছোট ভাইয়া কোথায় কী অবস্থায় আছে আমাদের জানা নেই, কোনো খোঁজও নেই। তার ভাগের দুটি অ্যাপার্টমেন্ট বেঁচে টাকা হুন্ডি করে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়ে সেকেন্ড হোম করেছে। যাওয়ার আগে অনেক দিন ধরে তার বিয়ের সম্মতির প্রতীক্ষায় থাকা প্রেমিকাটি ডাম্প করে তাকে না বলেই ঢাকা ছেড়েছে।

আমি তালাকের কথা ভেবেছি, তবে যদি রুমকির বিকল্প কাউকে তখন পেতাম প্রথম বছরের শেষ দিকেই কাজটা সেরে নিতে পারতাম। যেসব হাস্যকর কারণে ডিভোর্স হতে পারে তার কিছু আমার জানা আছে, আমাদেরটা তো জেনুইন।

স্বামী কথা একটু বেশি বলে—বলা যায় বকবক করে, সে কারণে স্ত্রী তালাকের মামলা করেছে। আদালত বুঝতে পেরেছেন, এমন বকবকে স্বামীর জন্য এই নারীর জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, সে জন্য তালাক মঞ্জুর করেছেন। আমাদের বেলায় ব্যাপারটা ভিন্ন রকমের। গত দেড় বছরে আমাদের দুজনের কথোপকথন যোগ করলেও বইয়ের ছাপা হরফে আড়াই পৃষ্ঠার বেশি হবে না। কোনটা বেশি দুর্বিষহ—বকবক করা স্বামীর স্ত্রীর যন্ত্রণা, না নির্বাক স্ত্রীর স্বামীর যন্ত্রণা? আমি কথা বলতে চাইতাম, কিন্তু রুমকি বলে দিয়েছে বাজে কথা সে সহ্য করতে পারে না।

তিয়াত্তর বছর বয়স্ক মিসেস গেইল নোরা ম্যাককরমিক তাঁর সমবয়সী স্বামী জোনাথান ম্যাককরমিককে তালাক দিয়েছেন। কারণ জোনাথান আমেরিকান ‘জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে’ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন। আমি কাকে ভোট দিই—এ নিয়ে বিতর্ক নেই, কারণ আমি ভোট দিই না। আমি চাই না কোনো সরকার বলুক আমার ম্যান্ডেট নিয়ে তাদের আমলা ও মন্ত্রী-এমপিরা লুটপাট করছে। আমার সায় নেই।

স্বামীর মোজা থেকে বাজে গন্ধ এবং স্ত্রীর বগলতলা থেকে চুপচুপে ভেজা ঘামের গন্ধের কারণে একাধিক তালাক মঞ্জুর হয়েছে, এ সমস্যা আমাদের কারোরই নেই। স্ত্রীর অজ্ঞাতে বাসায় স্পাই ক্যামেরা ফিট করা হয়, কিন্তু স্ত্রী লুকানো ক্যামেরাটা পেয়ে যায়। যে স্বামী স্ত্রীকে বিশ্বাস করে না তার সঙ্গে থাকার মানে হয় না। সুতরাং ডিভোর্স চাই। সামান্থা উইডকম্ব নামের এই স্ত্রী কোর্টকে বলে, এই বাড়িতে স্বামীর বিশ্বাস ভাঙার মতো কিছুই সে করেনি, যা কিছু করেছে তার বয়ফ্রেন্ডের ক্যারাভানে। তালাক মঞ্জুর হয়।

নিরানব্বই বছর বয়স্ক এক ইতালিয়ান বুড়ো তাঁর সাতাত্তর বছরের দাম্পত্য সম্পর্ক ছিন্ন করার আবেদন জানান। বাড়ি ঝাড়পোঁছ করার সময় হঠাৎ বেরিয়ে আসা একটি প্যাকেট খুলে বুড়ো ১৯৪০-এর দশকে তাঁর স্ত্রীকে লেখা (তাঁদের বিয়ের আগে) কয়েকটি প্রেমপত্র আবিষ্কার করেন। স্ত্রীর পূর্বতন প্রেমিক দীর্ঘদিন আগে প্রয়াত হলেও বুড়ো মনে করেন, তিনি সত্তর বছর ধরে প্রতারিত হয়েছেন। স্ত্রী ক্ষমা প্রার্থনা করলেও তিনি তাঁর অবস্থানে অনড় থেকে তালাকের মামলা করেন, তালাক মঞ্জুর হয়।

২০১৪ সালে এক ভারতীয় পুরুষ স্ত্রীর যৌন তাড়নার সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্ত্রী তাঁকে বিকৃত যৌনাচারে বাধ্য করতেন বলে কোর্টকে জানান। স্ত্রীর পক্ষে তাঁর যৌন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। শেষ পর্যন্ত সম্পর্কটি তালাকের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।

স্বামী চা খাওয়ার সময় চুকচুক শব্দ করেন, রেস্তোরাঁয় খাওয়ার সময় তাঁর কাঁটাচামচ-ছুরি বেশি টুংটাং শব্দ করে, সেনা সদস্যদের মতো ঠকঠক শব্দ করে হাঁটেন, শব্দ করে বায়ু নিঃসরণ করেন। এর সবই ‘ডিজগাস্টিং’। সুতরাং ডিভোর্স চান।

স্বামী ডিভোর্স চান, কারণ স্ত্রী অত্যন্ত কড়া পারফিউম ব্যবহার করেন। এতে তাঁর মাথা ঝিমঝিম করে। কড়া লাল লিপস্টিক ব্যবহার করেন, এতে আতঙ্কিত বোধ করেন। সুতরাং ডিভোর্স চান।

এসব সমস্যার কোনো কোনোটা আমার আছে চুমুক দিয়ে শব্দ করে ডাল খাই, ছুরি ও ফর্কের দক্ষ ব্যবহার করতে পারি না, কমবেশি নাক ডাকে, লাল লিপস্টিক আমারও পছন্দ নয় (অবশ্য রুমকি আদৌ কোনো লিপস্টিক ব্যবহার করে কি না আমার সন্দেহ আছে) শোয়ার আগে দাঁত ব্রাশ করতে ভুলে যাই, প্রেমজাতীয় একটি সম্পর্ক আমারও ছিল, নাইমা নিজে থেকে বলেকয়েই সরে গেছে। রুমকির বিরুদ্ধে আমার সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। প্রথম দিকে তাকে দেখলে আমার শরীরে জাগরণ আসত, এখন শীতল হয়ে যায়। এ জন্য রুমকি একা নয়, আমিও দায়ী। রসায়নের ছাত্র না হলেও আমি বুঝি, আমাদের শরীরের রসায়ন আমাদের তেমন সমর্থন করে না।

এককথায়, রুমকির ভাষায়, আমাদের ঠিক মিলছে না, মিলবে না।

কারণ আমার ইনটেলেকচুয়াল ডেপথ কম।

 

দুই.

বিয়ের পর তিনটা বছর আমাদের ভালো যায়নি। প্রথম বছর আমরা দুজনই বুুঝি, আমাদের ভুল হয়ে গেছে। রুমকি রাখঢাক না করে বলেছে, যার ইনটেলেকচুয়াল কোনো ডেপথ নেই তাকে বিয়ে করা আর মিরপুর চিড়িয়াখানার একটা শিংভাঙা মহিষকে বিয়ে করা একই কথা।

মিরপুর চিড়িয়াখানায় শিংভাঙা কোনো মহিষ আছে কি না, তা-ও আমি জানি না।

তিন বছর কোনোভাবে কাটলেও পরের দুটি মাস আমাদের দুজনের জন্যই ছিল ভয়ংকর। রুমকি বলল, তোমার লজ্জা করে না, শ্বশুরবাড়িতে থাকো?

অবশ্যই করার কথা। সে জন্যই তো আমি আমার দেড় রুমের ভাড়া বাসা ছেড়ে আসতে চাইনি। বলেছি, চলো আপাতত এখানেই উঠি, তারপর দেখেশুনে দুই রুমের একটা বাসা নেব। ঘরজামাই থেকে আমার বাবাকেও যথেষ্ট লাঞ্ছিত হতে দেখেছি। আমি এর মধ্যে নেই। কেউ কিছু না বললেও আমার মনে হবে, নিশ্চয়ই আমাকে কিছু একটা বলছে। মনে করে দেখো, আমার কথা শুনে তুমি কী বলেছিলে।

কী বলেছিলাম?

বলেছিলে, অ্যাপার্টমেন্টটা তো তোমার শ্বশুরের নয় যে তোমার ঘরজামাই ঘরজামাই লাগবে। বাবা দিলেও এটা আমার নামেই পাকাপাকি রেজিস্ট্রি করা। স্ত্রীর অ্যাপার্টমেন্টে থাকলে ঘরজামাই বলা হয়, এমন কোথাও দেখিনি।

তাহলে কী বলা হয়?

এটাও কোনো বইয়ে পাইনি।

বেশ, আমি মেনে নিলাম রুমকির অ্যাপার্টমেন্টে উঠলে আমি ঘরজামাই হিসেবে পরিচিত হব না এবং তাতে আমার মধ্যে ঘরজামাইয়ের হীনম্মন্য ভাব আসার কোনো কারণ নেই। কত জামাই শ্বশুরবাড়িতে একবার ঢুকে পড়তে পারলে শালা-শালিদের জমিজমাও নিজের নামে করিয়ে নেয়। তারা এবং তাদের স্ত্রীরা কেমন বোধ করে?

 

তুমিই একটা পিকআপ ভ্যান নিয়ে আমার যা যা ছিল সব এনে তুললে তোমাদের অ্যাপার্টমেন্টে। জায়গা ছিল না বলে আমার প্রায় সব জিনিস রাখলে তোমাদের নামে বরাদ্দ গ্যারেজের জায়গাটিতে। তোমাদের গাড়ি ছিল না, গ্যারেজ ছিল। শুধু আমার একটি ছোট্ট টেবিল আর রিভলভিং চেয়ারটা সিমকি তার রুমে ঢুকিয়েছে। তোমার ভাবি তোমার মাকে পছন্দ করতেন না বলে তিনি রয়ে গেলেন তোমার সঙ্গে—মানে আমাদের সঙ্গে। চুমকির অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া দিয়েছে। তোমার মা ও সিমকির যৌথভাবে একটি অ্যাপার্টমেন্ট, সেখান থেকেও ভাড়া আসে। ব্যবস্থা এমনভাবেই করা হয়েছে, যেন তোমার মায়ের মৃত্যুর পর কেউ মায়ের সম্পত্তির ভাগ না চায়—এটা পেয়ে যাবে সিমকি।

ভাগটা তোমার বাবা বেঁচে থাকতেই করেছেন। ছেলেরা তাঁর কোনো কাজে লাগুক বা না-ই লাগুক, ফারায়েজ মেনে মেয়েদের দ্বিগুণ দিয়েছেন ছেলেদের। জায়গাটা নিয়ে তোমার বাবার ডেভেলপারের সঙ্গে দর-কষাকষি করার সময় আটটি অ্যাপার্টমেন্ট পাবেন ভেবেছিলেন, পেয়েছেন সাতটি, সে জন্য স্ত্রী সাইনিং মানি—নগদ টাকার একটা অংশ দিয়ে দিয়েছেন তোমার মাকে।

চাকরি পেয়ে আমি বিয়ে করার জন্য প্রায় মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম। বছর দুয়েক আগে তার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার মামাতো ভাইকে বিয়ে করে আমার কাঙ্ক্ষিত মেয়েটি, নুরুন নাম, সৌদি আরব চলে যায়। আমার সঙ্গে যোগাযোগ একেবারে ছিন্ন করেনি, মক্কা থেকে মদিনার পথে একটি অতিকায় রেহেলের পাদানির কাছে  থাকা একটি সাদা জিপের পাশে দাঁড়ানো আংশিক কালো হিজাব এবং কালো গগলস পরা একটি ছবি পাঠিয়েছে আমার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে। ছবির নিচে লেখা : ভাইজান, পবিত্র জায়গায় আছি, দোয়া করিবেন। তাড়াতাড়ি বিবাহ করিয়া ফেলুন, দেরিতে শরীরের জোশ কমিয়া যাইবে, তখন পস্তাইবেন।

নুরুন কয়েক দিনের মধ্যেই তার হিজাব পরা ছবির সঙ্গে তুলনা করলে যথেষ্ট খোলামেলা যথেষ্ট সুশ্রী  সোনিয়া নামের একটি তরুণীর ছবি পাঠায় এবং  লেখে : ভাইজান, আপনার কথা আমার স্বামী ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম সাহেবের সঙ্গে আলাপ হইয়াছে। আমার ননদ এই বছর বিএ ক্লাসে ভর্তি হইয়াছে। ছবি দেখিয়া পছন্দ হইলে বলিবেন, দেখাইবার বন্দোবস্ত করিব। সোনিয়ার গানের গলা ভালো, হারমোনিয়াম বাজাইয়া গান গাইতে পারে। জানিয়া থাকিবেন, আমার স্বামী আমার মামাতো ভাই, সোনিয়া মামাতো বোন। আমার সাত মাস চলিতেছে। দোয়া করিবেন, যেন সুস্থ সন্তান লাভ করিতে পারি।

নুরুনের মামাতো বোনকে সামনাসামনি দেখার পরিকল্পনা যখন করতে যাচ্ছি, আমার মুহসীন হলের রুমমেট আবদুল হান্নান শরিফ তার ঠিকাদারি ব্যবসার প্রয়োজনে তিনটি পিকআপ ভ্যান সাপ্লাইয়ের জন্য কোটেশন নিতে এলো। বলতে বাধ্য হলাম, সরকারি কোনো অফিস হলে আমরা প্রাইস কোট করব না। কারণ সাপ্লাইয়ের কাজটা পেলেও গাড়ি ডেলিভারি দেওয়ার পর মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হবে, ঘাটে ঘাটে ঘুষ দিতে হবে, কম্পানির নিষেধ আছে, এসবে আমরা জড়াব না।

হান্নান শরিফ বলল, ঘুষটুষ ধরেই প্রাইস কোট কর। কাজটা পাব নিশ্চিত।

গাড়ির মূল আলোচনা থেকে সরে গিয়ে বলল, গাড়ি যেমন চালু রাখতে হয়, শরীরটাকেও তেমনি দৌড়ের ওপর রাখতে হয়।

আসলে এত সব কথা আমি বলিনি; এমনিই বিড়বিড় করেছি। যা আমি স্পষ্ট করে তাকে বলেছি তা হচ্ছে, বেশ আমি বেরিয়ে যাচ্ছি।

আরো আগে বেরিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। ডিভোর্স আমিই দিচ্ছি, কাগজটা নিয়ে তবে যেয়ো। তুমি আমাকে ডিভোর্স করেছ—এই অহংকার করার সুযোগ রুমকি তোমাকে দেবে না।

বললাম, তুমি দাও আর আমি দিই, তোমার সঙ্গে থাকার প্রশ্নই আসে না। এত ইনটেলেকচুয়াল ডেপথ যার, তার জন্য দরকার গভীর সমুদ্রের জাহাজ। মরা গাঙের ডিঙি দিয়ে তার কী কাজ?

ঘাড় না ঘুরিয়ে ঝাঁজালো স্বরে বলল, বাহ! ভারি চমৎকার উপমা ব্যবহার করতে শুরু করেছ। তলে তলে কবিতাও লিখছ নাকি? কী বললে, শুকনা গাঙ আর গভীর সমুদ্র। আরো কত কিছু যে শুনতে হবে! ভালোয় ভালোয় ডিভোর্সটা হয়ে গেলে বাঁচি।

দেঁতো হাসি দিয়ে আমিও বললাম, না হওয়ার কোনো পাঁয়তারা করছ নাকি? হতেই হবে। আজ হলে আজই। এখনই চলো।

হাতে যা ছিল তা-ই ছুড়ে মারল। খুব মূল্যবান কিছু নয়, পুরনো নোকিয়া। দেয়ালে লেগে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল কয়েকটা অংশ। ব্যাটারি বেরিয়ে এলো। সিমকি তার বোনকেই বলল, দিলি তো ফোনটার বারোটা বাজিয়ে। আমাকে দিয়ে দিলেই তো পারতি।

রুমকির একটা স্মার্টফোনও আছে।

আমি বেরিয়েই যাচ্ছিলাম। সিমকি আটকাল, বলল, ফর গডস সেইক, দুলাভাই তুমি যাবে না। আমি মায়ের রুমে চলে যাচ্ছি, তুমি এ রুমে থাকবে। তাহলে রুমকির সঙ্গে থাকা হবে না। আমি তোমাকে মিস করতে চাই না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই রুমকির অফিসের গাড়ি এসে পড়ে, কাঁধে চামড়ার ব্যাগ ঝুলিয়ে এক হাতে খাবারের হটপট, অন্য হাতে শাওমি স্মার্টফোন নিয়ে বেরিয়ে যায়। সিমকি বলল, রুমকির রুমের চাবি দাও, তোমার জিনিসপত্র এখানে শিফট করি।

কিচেন, একটা বাথরুম আর রুমকির মায়ের রুমটা ছাড়া সব লক করা থাকে। রুমকিরটাই মাস্টার বেড, একটা চাবি আমার কাছেও থাকে। আমি রুম খুলে দিয়ে বেরিয়ে যাই। সিমকির দক্ষতা সম্পর্কে আমার সামান্য সন্দেহও নেই, অফিস থেকে ফিরে যখন এই রুমটাতে ঢুকব, দেখব এমনভাবে রুমটা গোছানো থাকবে যে এটাকেই আমার রুম মনে হবে। আমার অফিস দশ মিনিটের হাঁটা দূরত্বের মধ্যে। রুমকির অফিস গাড়িতেই চল্লিশ মিনিট ফেরার সময় জ্যামে আটকা পড়লে আড়াই ঘণ্টাও লেগে যায়। আমি খাবার নিই না, অফিসের ক্যাফেটেরিয়ায় ভর্তুকি দামে পঁচিশ টাকায় ভরপেট খাওয়া যায়।

আমার চাকরিটা যে তেমন সুবিধার কিছু নয়, রুমকিকে বলেও বোঝাতে পারিনি। তবে বছরখানেকের মধ্যেই বুঝে গেছে, হাজব্যান্ড কী করে বলাটা তার জন্য সম্মানের নয়। পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর হলেও হতো, চোটপাট দেখিয়ে ঘাটতিটা পূরণ করে দিত। কিন্তু গাড়ির শোরুমের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ—এটা বললে তার বন্ধু-বান্ধবীরাই বলতে শুরু করবে, শোরুমে গাড়িই থাকে কটা, সেখানে আবার সিনিয়র আর জুনিয়র এক্সিকিউটিভ!

সব গাড়িই ইন্ডিয়ান। খুব ভালো করে বড় অক্ষরে সাইনবোর্ডে লেখা আছে, ভারতীয় গাড়ির আমদানিকারক। তবু কেউ কেউ এসে জিজ্ঞেস করে, জাপানি গাড়ি নেই? নেই কেন? গাড়ি আসে কোন পথে—বেনাপোল নাকি? আরে ধ্যাৎ, এসব তো জাপানি খেলনা গাড়ির চেয়ে খারাপ। এর মধ্যেও ভালোই বিক্রি হয়। কম বাজেটের ক্রেতাদের কোনো বিকল্প নেই। বেতন তেমন বলার মতো নয়। তবে গাড়ি আমদানিকারকের বেঁধে দেওয়া বটম প্রাইসের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে পারলে কিছু বাড়তি টাকা হাতে আসে; বাড়তি কত আসবে তা কম্পানির একটি সমীকরণ আছে, তাতেই নির্ধারিত হয়।

রুমকি সুইডেনভিত্তিক টেলিফোন কম্পানিতে। অ্যাকাউন্টসে। বেতন ভালো। যাদের চাকরি দুই বছর পুরো হয়েছে, পর্যায়ক্রমে সবাইকে সুইডেনে একটি শিক্ষা সফর করিয়ে আনে। রুমকির পালা এসে গেছে ২৭ এপ্রিল থেকে এগারো দিন। পাশের দেশ নরওয়েও দেখিয়ে দেবে। অসলোতে এক রাত আর ট্রন্ডহেইমে এক রাত থাকবে। টেলিফোন কম্পানিতে আসার আগে ঢাকার কাতার এয়ারলাইনসের ফ্রন্ট ডেস্কে প্রায় নয় মাস কাজ করেছে। একবার রাজধানী এবং এয়ারলাইনসের সদর দপ্তর দোহাতে তিন দিনের একটা সফরও করে এসেছে। আমি তখন পর্যন্ত উড়োজাহাজেই চড়িনি—ডমেস্টিকেও না।

 

 

তিন.

হান্নান শরিফ বলল, নুরুনের খবর কিরে?

আমি বললাম, নুরুন কিছুদূর এগিয়ে কেটে পড়ল, এখন বাচ্চাকে দিয়ে আমাকে মামা ডাকাবে। এরপর তো আর কারো দেখা পেলাম না।

হান্নান শরিফ বলল, ব্যবসা-বাণিজ্যের গুল্লি মার। আজকেই তোকে জুটিয়ে দেব।

আমিও বললাম, চাপাবাজি আর কত করবি?

আমার জুনিয়র এক্সিকিউটিভকে দায়িত্ব দিয়ে তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি। কাকে যেন ফোন করে বলে, জাস্ট এক ঘণ্টার ছুটি নিয়ে নেমে আয়, তোর অফিসের আশপাশের কোনো একটা কফিশপে, খাবারের পয়সা আমি দেব।

চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাই, কাতার এয়ারওয়েজের অফিসটার খুবই কাছে কফিশপও পেয়ে যাই। আমরা বসার মিনিট তিনেকের মধ্যে মেয়েটিও নেমে আসে।

হান্নান শরিফ অফিস ইউনিফর্ম পরা মেয়েটিকে সামনে নিয়ে বলে দেয়, এর নাম রুমকি। আমার সম্বন্ধী মোবারক ভাইয়ের বড় মেয়ে। ঢাকা শহরে নিজের ফ্ল্যাট আছে, দামি অফিসে চাকরি আছে, দেখতে যথেষ্ট সুন্দর। তুই আর কী চাস?

আমি বিব্রত বোধ করি, বিজনেস কার্ডটা এগিয়ে দিই, বলি—তেমন কিছু করি না, একটা ছোট চাকরি, যদি কখনো সস্তায় গাড়ি নিতে চান, দয়া করে স্মরণ করবেন।

রুমকি বলে, আমার চাকরিটাও ছোট। ফ্রন্ট ডেস্কে কাজ করি। গাড়ি কেনার পয়সা জীবনেও হবে না। তবে আর দেড় মাস আছি। তারপর একটু বেটার জবে যোগ দেব। টেলিফোন কম্পানিতে সিলেক্ট হয়ে আছি।

হান্নান শরিফ বলল, কাজ শেষ। তোরা আলাপটালাপ করে পারলে এগিয়ে যা, না পারলেও সমস্যা নেই। তোর জন্য যেমন আরো পাত্রী আছে, রুমকির জন্যও আরো পাত্র আছে।

আমার পাত্রী আছে, তোকে কে বলল? তাহলে তো কবেই বিয়ে করে ফেলতাম। রুমকি বলল, বাহ বিয়ে করার অনেক শখ দেখছি।

তারপর শরিফকে বলল, আমার সম্পর্কে সব বলেছেন তো?

শরিফ বলল, কোনো কথা বাকি রাখিনি, আফটার অল আমার তো বহুদিনের রুমমেট।

আমিও তার মতো বললাম, জি বলেছে।

একটা বার্গার আর একটা করে কাপুচিনো শেষ করতে করতে পঞ্চাশ মিনিট পেরিয়ে গেল। রুমকি বলল, হোপ টু মিট ইউ এগেইন। আমাকে এখনই উঠতে হবে। এক ঘণ্টার ছুটি মানে এক ঘণ্টারই। ষাট মিনিটের মধ্যেই আমার চেয়ারে বসতে হবে।

রুমকি চলে যাওয়ার পর হান্নান শরিফ জিজ্ঞেস করল, কেমন লাগল?

বললাম, ভালোই।

এটুকুই?

হ্যাঁ, পছন্দ হয়েছে।

তাহলে যা বলিনি সেটা শুনে রাখ। মেয়েটা আমেরিকা থেকে চার সপ্তাহের জন্য আসা একটা বদমাশের পাল্লায় পড়েছিল, হুট করে কাবিনও করে ফেলে। দু-এক রাত হয়তো একত্রে থেকেছেও। দেশ ছাড়ার আগে ছোকরা ইংরেজিতে লেখা ম্যারেজ সার্টিফিকেট তুলল, রুমকির পাসপোর্টের ফটোকপি নিল। তিন থেকে চার মাসের মধ্যে টিকিট পাঠিয়ে দেবে। তার পাঠানো কাগজপত্র দেখালেই ভিসা হয়ে যাবে। এয়ারপোর্টে তাকে সি অফ করতে গেছে রুমকি। ফ্লাই করার ছয়-সাত ঘণ্টা পর কোনো এক এয়ারপোর্ট থেকে ভিডিও কলে কথাও বলেছে, মুনতাসির মুর্তজা বলেছে ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্ট।

মুনতাসির বিয়ের দুই দিন আগে যা বলেছে তার সারমর্ম হচ্ছে : তার বাবা গোলাম মুর্তজার বন্ধু নিউ ইয়র্কবাসী আবু হোরায়রা বছর দশেক আগে তাকে আমেরিকা যেতে সাহায্য করেন। পড়াশোনা করে, কাজকর্ম শিখে সে এখন দাঁড়িয়ে গেছে। তিনি এখন চাপ সৃষ্টি করছেন তাঁর মেয়েকে বিয়ে করতে। মেয়েটি দেখতে ভালো, তার দিক থেকে কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু লিজা নামের মেয়েটি তার সঙ্গে দেখা করে, বাবার মুখ রক্ষা করতে তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়। কিন্তু এটাও বলে দেয় যে সে আসলে লেসবিয়ান—সমকামী নারী। পুরুষের প্রতি এতটুকুও আগ্রহ নেই। এখনো বিয়ে না করলেও নাইজেরিয়ান-আমেরিকান নারী ফাতিমা পাওয়ার আবাচা তার হাজব্যান্ড হবে। ফাতিমা নাইজেরিয়ার বড় বংশের মেয়ে। এখনই তার বাবাকে এবং নিউ ইয়র্কের রক্ষণশীল বাঙালি মুসলমানদের শকটা দিতে চাচ্ছে না। এ অবস্থায় লিজা তার সাহায্য চাচ্ছে।

মুনতাসির বলল, কী আর করা! বাঙালি মুসলমান মেয়ের সুখী লেসবিয়ান জীবন কামনা করে তাকে বিদায় করলাম এবং তার বাবা আবু হোরায়রাকে বলে দিলাম, বিশেষ কারণে বাংলাদেশে ফিরতে হচ্ছে। ফিরে এসে দেখা করব। আমার ধারণা, তত দিনে তাঁর মেয়ের ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যাবে, তিনিও আর আমাকে চাপাচাপি করবেন না।

রুমকি বলল, বলে দিলেই পারতেন, বাবার জানা দরকার তাঁর মেয়ে আসলে কী।

মুনতাসির বলল, লিজা তার নারী হাজব্যান্ড সম্পর্কে খুব গর্ব করে বলেছে একসময়কার নাইজেরিয়ান প্রেসিডেন্ট সানি আবাচার সেবান মরিয়ম আবাচার মেয়ে ফাতিমা পাওয়ার আবাচা। এটাও বলল, সানি আবাচার স্ত্রীর নামও মরিয়ম আবাচা।

রুমকি বলল, ধ্যাৎ, এটা আবার জীবন নাকি? ডিজগাস্টিং।

মুনতাসির বলল, তবু একটা ভালো দিক আছে, মেয়েটা মুসলমান, আবু হোরায়রার শকটা এ কারণে কম হবে। সানি আবাচার পতনের পর তার লুটেরা আত্মীয়-স্বজন দেশ ছেড়েছিল, ফাতিমার মা-বাবাও তাদের মধ্যে ছিল। রুমকি তার কথা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছে এবং বিশ্বাস করেছে।

কিন্তু সেই যে এয়ারপোর্ট থেকে ভিডিও কল, তারপর মুনতাসির আর যোগাযোগ করেনি। দুটি ফোন নম্বর ছিল, রুমকি একটাতেও ঢুকতে পারেনি, দুটিই বন্ধ।

মুনতাসিরকে প্রতারকও ভাবতে পারেনি, কারণ তার কাছ থেকে টাকা-পয়সা কিছুই নেয়নি, বরং যাওয়ার সময় এয়ারপোর্টে তার হাতে গুঁজে দিয়েছে আরো তিন শ ডলার। অনেক বড় টাকার কাবিন করেছে।

কাবিনে স্থায়ী ঠিকানা লিখেছে—চরগিরিশ, কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ। আর বর্তমান ঠিকানা—সেভেন্টি নাইনথ এভিনিউ, কুইনস, নিউ ইয়র্ক।

মাসখানেক পর হান্নান শরিফ জানতে পারে, ভীষণ ডিপ্রেশন চলছে রুমকির। তারিখ ধরে টার্কিশ এয়ারলাইনসের প্যাসেঞ্জার লিস্ট চেক করে।

মুনতাসির মুর্তজা নামের কোনো যাত্রীই সেদিন ছিল না। কাতারের রিজারভেশন অফিসার সার্চ দিয়ে দেখলেন, এই নামের কোনো যাত্রী গত এক বছরে ঢাকা এয়ারপোর্ট দিয়ে আসেওনি, যায়ওনি।

এর মধ্যে কানে এলো, আমেরিকান নাগরিকদের যাঁরা ঢাকায় অবতরণ করেন এবং ঢাকা থেকে প্রস্থান করেন তাঁদের রেকর্ড আমেরিকান দূতাবাস সংরক্ষণ করে। সুতরাং হান্নান শরিফকে মুনতাসির মুর্তজার খোঁজ নিতেই হয়। একই উত্তর—এমন কারো নাম এখনো তাদের রেকর্ডসে নেই।

তাহলে কি তার অন্য কোনো নাম? একটি বিজনেস কার্ড ছাড়া তার হাতে আর কিছুই ছিল না, দূতাবাস পাসপোর্টের নম্বর কিংবা ফটোকপি চেয়েছিল। রুমকির হাতে কিছুই নেই। টার্কিশ এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজে আমেরিকা যাওয়া, কিংবা আমেরিকান নাগরিক মুনতাসির মুর্তজার বাংলাদেশে আসা দুটিই যখন মিথ্যা হয়ে গেল, তার পরও রুমকি দ্বিধান্বিত ছিল—প্রতারক হলে তো তার কাছ থেকে টাকা-পয়সা অনেক কিছুই নিতে পারত, কিন্তু দিয়েছে।

আরো প্রায় ছয় মাস পর চাপদাড়িওয়ালা একজন বাংলাদেশি আমেরিকানের খবর ছাপা হয়, তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের লাল নোটিশ জারি হয়েছে। তার নাম শুকুর মাহমুদ। ফাতিমা পাওয়ার আবাচা নামের নাইজেরিয়ান-আমেরিকান নারীর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত আবার একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান নারী লিজা হোরায়রাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। ছবির মানুষটির দাড়ি কামিয়ে দিলে যে চেহারাটি ফুটে উঠবে, রুমকির একবার মনে হয় তার নামই মুনতাসির মুর্তজা। একবার ভাবে, তা কী করে হয়।

 

আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ ও কফিপানের পর আরো সাত-আট দিন কেটে যায়।

ফোনটা আসে রুমকির কাছ থেকেই, সোজা প্রশ্ন করে বসে, আমাকে পছন্দ করতে কেউই আপনাকে বাধ্য করেনি, তাহলে একটা কলও তো দিতে পারতেন।

আমতা আমতা করে বলি, আমি ফোন করব করব করছিলাম, কিন্তু আপনি আবার এটাকে হ্যাংলাপনা মনে করেন কি না সেই ভয়ে স্ক্রিনে আপনার নামটা তুলেও কল বাটনে টিপ দিইনি।

বেশ, বুঝিয়ে দিলেন আপনি হ্যাংলা নন। এখন কফি খেতে আপনি আমাকে ডাকবেন, নাকি আমি আপনাকে ডাকব? আমাদের একজন সিনিয়র কলিগ মারা গেছেন, তাঁর সম্মানে দুই ঘণ্টা আগে ছুটি হচ্ছে। আপনি যদি বেরোতে পারেন, বলুন কোথায় এসে হাজির হব।

আমি বললাম, যদি আসতে তেমন সমস্যা না হয় তাহলে গুলশান ১-এ, গ্লোরিয়া জিনস। আমি পনেরো মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাব, অফিসের বাইক নিয়ে বেরোচ্ছি।

রুমকি বলল, তাহলে আমাকে রিকশা খোঁজার কষ্ট কেন দেবেন। বাইক নিয়ে আমার অফিসের নিচে চলে আসুন, আপনার সঙ্গেই যাব।

আমি দ্বিধান্বিতভাবে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’-এর মাঝামাছি কিছু একটা বলি।

রুমকি বলল, আমি পনেরো মিনিট পর নিচে নামছি। অপেক্ষা করব। আপনার চেহারাটা পুরোপুরি মনে নেই, বাইকের রংটা বলুন।

আমারও যে তার চেহারা খুব মনে আছে, এমন নয়। চিকন ফ্রেমের চশমা ছিল সেদিন, আজও নিশ্চয়ই থাকবে। সেদিন মেরুন জামা ছিল, আজ মেরুন থাকার কোনো কারণ নেই। আমি বাইক থেকে নামিনি, এক পা মাটিতে নামিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলাম। ঠিক পেছন থেকেই তার কণ্ঠ শুনি—পা কি দুই দিকে ছড়িয়ে বসতে হবে।

আমি বললাম, তার আগে হেড গিয়ারটা মাথায় চাপিয়ে নিন। আমি পেশাদার পাঠাও রাইডারদের মতো বাড়তি একটা হেড গিয়ার নিয়ে এসেছি। তাতে জরিমানা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে আর দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হওয়ার আশঙ্কাও কমবে।

আমরা গুলশান না গিয়ে আরো খানিকটা দূরে ম্যাঙ্গো বার নামের একটি ক্যাফেতে বসি, এখানে খদ্দের কম। আমি আগেই জানিয়ে দিই, আমাকে সাড়ে ছটার মধ্যে শোরুমে পৌঁছতে হবে, তার আগে আপনাকে আপনার বাড়ির গেটে কিংবা কাছাকাছি কোথাও নামিয়ে দেব।

খুবই পানসে ধরনের কফিতে চুমুক দিয়ে রুমকি বলল, আপনি কি আমার সম্পর্কে সব শুনেছেন? আমি শরিফ মামাকে বলেছি, কোনো কিছু যেন না লুকানো হয়। তাতে যদি আপনি রাজি না হন আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে না।

হ্যাঁ, শরিফ আমার অনেক দিনের রুমমেট। সে-ই পরামর্শ দিয়েছে, দু-এক দিনের মধ্যে তুই মেয়েটিকে নিয়ে সিটি করপোরেশন থেকে মুনতাসির সাহেবের নামে একটি তালাক নোটিশ জারি করাবি। নোটিশ আসলে প্রাপকের কাছে যাবে না, কাগজে-কলমে জারি হয়েছে দেখানো হবে। তারপর নব্বই দিন অপেক্ষা করতে হবে। তারপর যেকোনো দিন বিয়ে হতে পারে। তালাক না হলে যেকোনো সময়ই ওই শালা আবির্ভূত হয়ে তোর বিরুদ্ধে তার স্ত্রী অপহরণের মামলা দিয়ে সার্চ ওয়ারেন্ট বের করাতে পারে। আর তখন যদি রুমকি বলে, তুই অপহরণকারী—অন্তত সাত বছর শিকের ভেতর জীবন কাটাতে হবে।

আমিও শরিফের সঙ্গে একমত, নয়তো হঠাৎ দেখা যাবে কোনো এক পাতালপুরী থেকে হঠাৎ উঠে এসে মুনতাসির সাহেব আমার বিরুদ্ধে তাঁর স্ত্রী অপহরণের মামলা ঠুকে আমাকে নাস্তানাবুদ করতে থাকবেন। আমি পুলিশকে ভীষণ ভয় পাই। তারা যে কাউকে দিয়ে যেকোনো ধরনের স্বীকারোক্তি আদায় করাতে পারবে। এমনকি আমার বাবারও জন্মের আগে যে গান্ধী আততায়ীর হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন, তারা আমার ওপর এমনই অত্যাচার চালাবে যে আমি বলতে বাধ্য হব, আমিই খুব কাছ থেকে প্রার্থনাসভায় যাওয়ার সময় যাকে বলে পয়েন্ট ব্ল্যাংক গুলি করেছিলাম। আমি স্পষ্ট দেখেছি, গান্ধীর সঙ্গে দুটি মেয়ে ছিল—এদের একজন মানুবেন, একজন আভাবেন। দুজনকেই আমি ভালো করে চিনি।

রুমকি বলল, আপনি এসব কী বলছেন? মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে গুলি করেছেন নাথুরাম গডসে, এটা সবাই জানে।

তা জানুক তাতে সমস্যা নেই, কিন্তু পুলিশ যদি কাউকে রিমান্ডে নিয়ে কিছু স্বীকার করাতে চায় তাহলে তার স্বীকার না করে উপায় নেই। ভাগ্যিস, আপনি মুনতাসির সাহেবের নিরুদ্দেশ হওয়ার ঘটনা নিয়ে কোনো মামলা করেননি। করলে হয়তো বাইক থেকে নামিয়ে আপনাকে পাঠিয়ে দিত বাড়িতে আর আমাকে মেরে হাড়গোড় ভেঙে স্বীকার করাত যে আমিই মুনতাসির মুর্তজাকে অপহরণ করেছি। উদ্দেশ্য—তাকে হত্যা করে আপনাকে বিয়ে করা।

রুমকি বলল, আপনি এসব কী আবোলতাবোল বকতে শুরু করেছেন?

আমি বললাম—দেখুন, পুলিশ সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণাই নেই। আমার বড় দুলাভাই টানা তিন দিন বাড়ি না ফেরায় বড় আপা আমাকে নিয়েই থানায় গেলেন। ডায়েরি করাবেন। একজন পুলিশ টুথপিক দিয়ে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বললেন, সত্যি কথা বলেন, খুন করার পর আপনার হাজব্যান্ডের ডেডবডিটা কোথায় লুকিয়েছেন? বড় আপা খেপে গিয়ে বললেন, কী সব বাজে কথা বলছেন?

তিনি বললেন, ঠিক আছে আমাকে বলার দরকার নেই, যখন রিমান্ডে নেবে ফরফর করে বলে দেবেন, বেডরুমে খাটের ঠিক নিচে গর্ত করে সাহেবকে ঢুকিয়ে এক নম্বর সিমেন্ট দিয়ে প্লাস্টার করে দিয়েছেন।

ক্ষিপ্ত হয়ে আপা ডায়েরি না করেই ফিরে আসেন। পরদিন দুলাভাইও ফিরে আসেন। নরসিংদীর বাবুরহাটে গিয়ে পাইকারি কাপড় কেনাকাটার সময় বুকে ব্যথা ওঠে, তারপর অজ্ঞান হয়ে যান। ওখানকার একজন কম্পাউন্ডার চিকিৎসা করেন নিজের বাড়িতে রেখে। সুস্থ বোধ করার পর ফিরে আসেন।

রুমকি বলল, সিটি করপোরেশনে কি আমাকে যেতে হবে?

আমার কোনো ধারণা নেই, হান্নান শরিফকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারি।

তখনই ফোনে তার সঙ্গে কথা হলো।

হান্নান বলল, পরদিনই। আমি বাইকে চাপিয়ে রুমকিকে নিয়ে আসব, আর সে আসবে তার পিতৃভূমি জিঞ্জিরা থেকে।

হান্নান শরিফ করপোরেশনে তার পরিচিত একজন লোকের সঙ্গে কিছু লেনদেন করার পর তিনি আশাব্যঞ্জক কিছু কথা শোনালেন। বললেন, ব্যাক ডেট দিয়ে নোটিশ জারি দেখিয়ে দেবেন, তাতে এক মাস সময় সাশ্রয় হবে। আরো কিছু টাকা দেওয়ার পর বললেন, একদম চিন্তা করবেন না, ঠিক ষাট দিনের মাথায় আমি পাকা কাগজ বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসব।

সিদ্ধান্ত হলো, পাকা কাগজ সই হওয়া মাত্র আমরা দুজন তা নিয়ে সোজা চলে যাব হান্নান শরিফের বাড়ি জিঞ্জিরায়, সেদিনই কাজি ডেকে বিয়ের মূল কাজটা সেরে ফেলব। আমাকে পাত্রী দেখানো থেকে শুরু করে বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের বালাম বইসহ কাজি ডেকে আনা, সবই সে দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করল।

আমরা স্বামী-স্ত্রী হয়ে গেলাম। রুমকির সঙ্গে এক-দুইবার শরিফকে মামাও ডাকলাম।

 

আমি এখানে, মানে সিমকির রুমে স্থানান্তরিত হই ২০২০-এর ১৫ মার্চ রাতে। সিমকি পেস্ট-টুথব্রাশ, জিলেট শেভিং ফোম ও রেজর, ওল্ড স্পাইস আফটারশেভ লোশন, স্যান্ডেল, প্যান্টের বেল্ট, প্যারাসিটামল ট্যাবলেট—সবই এনেছে, যাতে আমাকে রুমকির ঘরের দরজায় ঢুকতে টোকা দিতে না হয়। তবু বলল, অ্যাটাচড বাথরুম নেই, তোমার কষ্ট হবে।

পরদিন শুক্রবার রুমকির সারা দিন বাসায় থাকার কথা, তার সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়া এড়াতে নাশতার আগেই বেরিয়ে যাই। বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাস সদরঘাট যাচ্ছে, আমি উঠে পড়ি। লঞ্চঘাটের কাছাকাছি একটি রেস্তোরাঁয় ঢুকে তন্দুর রুটি এবং খাসির পায়ার নেহারিতে একটি জবরদস্ত নাশতা করি। টার্মিনালের ভেতর ঢুকে দূরগামী লঞ্চ দেখি। একবার ভাবি লঞ্চে উঠে পড়ি, কিন্তু শনিবার যে আমাকে অফিস করতে হয়।

মুহসীন হলে আমার একদা রুমমেট এবং আমাদের বিয়ের প্রধান কারিগর আবদুল হান্নান শরিফকে প্রায় চার মাস পর ফোন দিই, বুড়িগঙ্গার ওপারে জিঞ্জিরায় তার বাড়ি ও কসমেটিকসের কারখানা। কারখানাটা বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে—পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সব ব্র্যান্ডের প্রসাধনদ্রব্য এখানে তৈরি হয়। শুধু বিদেশি খালি কৌটা পেলেই তার চলে। ফোন ধরতেই বললাম, সদরঘাটে আছি, নদী পেরিয়ে তোর বাড়িতে আসছি।

হান্নান বলল, ফিরে আয়, স্কয়ার হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারের সামনে হাঁটাহাঁটি করছি, নার্গিসের জোড়া বাচ্চা হবে। বুঝলি দোস্ত, দেখাইয়া দিলাম দুইটাই মর্দ। তোর মতো আঙুল চুষলে আঙুল ক্ষয় হবে, বাচ্চা হবে না।

সুতরাং জিঞ্জিরা যাওয়া হলো না। এখানে আধাঘণ্টা, ওখানে পৌনে এক, এমন করতে করতে ‘সাবলেট চাই’-এর অন্তত দশটি বিজ্ঞাপন থেকে তিনটি সরেজমিনে দেখে রাত সাড়ে দশটায় বাড়ি ফিরি। আমার কোনোটাই পছন্দ হয়নি।

হান্নান শরিফ আমাদের শীতলাবস্থার কথা জানে।

আমরা যখন বিয়ের প্রায় কাছাকাছি এসে পৌঁছেছি, রুমকি বলল, আপনাকে প্রমিজ করতে হবে, কোনো কারণে আমার সঙ্গে মতবিরোধ হলেও মুনতাসির প্রসঙ্গ তুলতে পারবেন না।

আমি রাজি হই। বলি, তা কেন হবে? আমি তো জেনেশুনেই রাজি হয়েছি।

রুমকি বলল, ঝগড়ার সময় মেজাজ ঠিক থাকে না তো, তাই বললাম।

আমি সে প্রসঙ্গ তুলিনি সত্য, কিন্তু বহুবার মনে হয়েছে। মুনতাসির মুর্তজা যা-ই করে থাকুক সে ভাগ্যবান যে শুরুতেই রুমকিকে ছাড়তে পেরেছে।

চার.

সিমকি বলল, রুমকি ফোনে কোনো এক উকিলের সঙ্গে কথা বলেছে। তাতে তার ডিভোর্স কেসটা শক্ত করার জন্য তোমার বিরুদ্ধে কয়েকটা পয়েন্ট দাঁড় করাচ্ছে।

১. শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছ।

২. যৌতুকের জন্য মারধর করেছ।

৩. স্ত্রীর ভরণ-পোষণ দিচ্ছ না।

৪. স্ত্রীর শারীরিক চাহিদা মেটানোর যে হক, তা আদায় করছ না।

৫. সন্তানের আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও তাকে গর্ভবতী বানাতে পারোনি।

 

এগুলো তো ওকালতির পয়েন্ট। রুমকির মূল পয়েন্ট হচ্ছে, আমার ইনটেলেকচুয়াল ডেপথ কম, খুবই কম। তার সঙ্গে কমপেটিবল নয়। তবে তালাকের কারণ হিসেবে বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা বাংলাদেশে এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং দুষ্ট উকিলের পাল্লায় পড়লে প্রতিপক্ষকে হেস্তনেস্ত করে ছাড়বে কত ফুট গভীরতাকে আমার বিজ্ঞ প্রতিপক্ষ স্ট্যান্ডার্ড গভীরতা মনে করেন। সাড়ে পাঁচ ফুট নারী ও সাড়ে চার ফুট নারীর ক্ষেত্রে গভীরতা কি এক? চৌত্রিশ ইঞ্চি কোমর আর ষাট ইঞ্চি কোমরের পুরুষের বেলায় কি একই স্ট্যান্ডার্ড? কিংবা প্রতিপক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবী বলবেন কি, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের বেলায় একই মাপ কার্যকর হবে কি না? কিংবা ম্যাট্রিক পদ্ধতিতে গভীরতা মাপার ইউনিট কী?

আমি বললাম, আসল পয়েন্ট তো বাদ পড়ে গেছে—তার স্বামীর চরিত্র খারাপ, অন্য নারীতে আসক্ত। উদাহরণ হিসেবে সিমকির নাম উল্লেখ করতে পারত।

সিমকি বলল, তাহলে আর মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। কোনো কারণে কথাটা রাশেদের কানে গেলে ২৭ এপ্রিলের অনুষ্ঠানটা ভেস্তে যাবে।

সিমকির বিয়ে ২৭ এপ্রিল, রাশেদের সঙ্গে। ২৩ এপ্রিল কানাডার কুইবেক থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছবে, ২৫ তারিখ ঈদ করবে, ২৭ তারিখ বিয়ে করবে, ৩০ তারিখে আবার চলে যাবে। রাশেদ কানাডার নাগরিকত্ব পেয়েছে মাত্র ছয় মাস আগে। আমার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে, নিজে থেকেই বলেছে, দিনের বেলা কিছু পড়াশোনা করি, ফ্রেঞ্চ ভাষাটা ভালো করে শিখেছি বলে ওখানকার সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ডিপার্টমেন্ট ইন্টারপ্রেটার হিসেবে ডাকে, সন্ধ্যা ছটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত ক্যাব চালাই। সিমকিকে নিয়ে আসার পর টাইমটা আবার অ্যাডজাস্ট করে নেব। ফ্রেঞ্চটা সিমকিও কমবেশি শিখে নেবে। টরন্টো, অটোয়া ওদিকটাতে ইংলিশ চলে, কিন্তু বাঙালি বেশি, আমি বাঙালিদের কাছ থেকে সব সময়ই দূরে থাকতে চাই।

রাশেদ কথা বলতে পছন্দ করে। প্রথম আলাপের দিনই বলে দিল এই যে আমাদের প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, ১৯৬৮ সালে তার বাবা গিয়েরে ট্রুডোর সঙ্গে বাংলাদেশে গিয়েছিল। স্যরি, তখন তো আর বাংলাদেশ ছিল না, ছিল ইস্ট পাকিস্তান। ওই যে কমলাপুর রেলস্টেশনে বাবার সঙ্গে শিশু জাস্টিনের একটা ছবি আছে—আপনার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেব। তারপর কথার বাঁক ঘুরিয়ে বলল, বাংলাদেশ ছেড়ে এসে ভুল করেছি না ঠিক করেছি বলতে পারবেন? আমার ধারণা ঠিকই করেছি, আমাদের বাংলাদেশি নেতারা ভণ্ড, বাংলাদেশের মন্ত্রীরা ভণ্ড,  তাই না বড় ভাই?

আমি এ ধরনের প্রশ্নের জবাব দিতে চাই না। কারণ মন্ত্রীরা কখনোই আমার আগ্রহের বিষয় নন এবং আমার আগ্রহ মহাবিত্তবান মানুষদের নিয়ে, যারা তাদের প্রয়োজনে সরাইলের কুকুর, সমাজের এলিট ও মন্ত্রী পোষে। কখন কে কাজে লাগে বলা তো যায় না।

রাশেদ বলল, বড় ভাই, কিছু বললেন না যে? আপনি কোন পার্টি করেন?

আমি কোনো পার্টিটার্টি করি না। এসব কাজের জন্য যে সময় দরকার তা আমার নেই।

রাশেদ বলল, আপনি বললেন আর আমি বিশ্বাস করলাম! বাংলাদেশে সবাই কমবেশি রাজনীতি করে। এমনকি বিদেশ এলেও সঙ্গে রাজনীতিটা নিয়ে আসে, আমাদের টরন্টোতেও আওয়ামী লীগ আর বিএনপি আছে। ভেতরে গ্রুপিংও আছে।

তাই নাকি! ভালোই তো।

ভালো মানে? আমাদের আক্কাস ভাই এখানে এসে ইভাঙ্কা নামের একটা সুন্দরী মেয়েকে ফুঁসলিয়ে বিয়ে করে ফেলে। বাংলাদেশে রাজনীতির খেজুরে গপ্পো শোনাতে শোনাতে মেয়েটিকে পাগল করে ছাড়ল। যখন ইভাঙ্কা বলেছে, লিভ ইওর দেশি শিট অর লিভ মি।

আমরা টকিং টার্মে নেই, তবু রুমকি বলে উঠল—এত কথা কার সঙ্গে? আমি ফোন কেটে দিই।

এক ঘণ্টা পর রাশেদ আবার ফোন করে ফোন কেটে দেওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করে। বলি তখনই লোড শেডিং হয়। কারেন্ট না থাকলে ইন্টারনেট-হোয়াটসঅ্যাপ-ভাইবার সব বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

আপনার শালি সিমকি সম্পর্কে আপনার মুখে একটু শুনতে চাই। আমার ক্লাসমেট হাফসা আপনার শালির মামি আমাকে সতর্ক করেছে—বিয়ের আগে কথা বলতে যেয়ো না, তাতে ঝামেলা বাড়বে। ব্যাপারটা কী বলবেন?

আমার কোনো ধারণাই নেই। একটু ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলব। বলে আমি ফোনটা আবার কেটে দিই।

চুমকির শাশুড়ি মৃত্যুশয্যায়। শেষ দেখার জন্য চুমকি, তার স্বামী রইস আহমেদ, তিন বছর বয়সী ছেলে ভিঞ্চি সাত দিনের জন্য মিলান থেকে ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমে সোজা চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার মুন্সীগঞ্জ নামের গ্রামে। কয়েক দিনের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। ২২ মার্চ রাতে আবার তারা ফিরে যাবে, ২০ তারিখ সন্ধ্যায় রুমকি কিংবা সিমকিদের বাড়িতেই এসে হাজির, এখানে দুই রাত, পরের রাত তো উড়োজাহাজেই। যে রুমে আমার আশ্রয় হয়েছিল, সেই রুমটিই ছেড়ে দিতে হলো।

তাহলে আমার রাতের আশ্রয় হবে কোথায়? একটাতে রুমকি, একটাতে চুমকি ও রইস আহমেদ এবং তাদের ভিঞ্চি। একটাতে আমার শাশুড়ি, তাঁর একটি বড় সময় শুয়েই কাটে, সঙ্গে থাকে সিমকি।

তাহলে আমি কোথায়?

আমি ফিসফিস করে সিমকিকে বলি, আমি কোনো এক বন্ধুর বাসায় চলে যাচ্ছি, চিন্তা কোরো না, আমি যোগাযোগ রাখব।

ভয়ংকর দুঃসাহসী একটি কথা বলে বসল সিমকি। বলল—বেশ, তুমি রুমকির সঙ্গে ঘুমাবে না, এই তো। আমি মাকে রুমকির রুমে পাঠিয়ে দিচ্ছি, তুমি আমার সঙ্গে ঘুমাবে।

আমি হেসে উঠি এবং বলি, পাগলামির একটা সীমা থাকা চাই। কী রকম লঙ্কাকাণ্ড ঘটবে ভেবে দেখো।

সিমকি তখনই ঢুকল রুমকির রুমে, কী বলল আমি শুনিনি। কিন্তু দু-তিন মিনিটের মধ্যেই রুমকি বেরিয়ে এসে আমার হাত ধরে প্রায় হেঁচকা টানে তার ঘরে নিয়ে বলল, কী নাটক শুরু করলে? চুমকির বরের সামনে এই বাহাদুরিটা না দেখালে হয় না?

কোথাও না কোথাও সবারই থাকার জায়গা মিলে যায়। ভিক্ষুকও তো থাকে, বেশি মালকড়ি থাকলে হোটেলেও থাকা যায়। এসব ফালতু সেন্টিমেন্টাল শো অফ করা রাখো।

আমারও কিছু বলার ছিল, কিন্তু নিজের কণ্ঠকে শাসন করলাম, একদম চুপ। এই নারীর সঙ্গে আমার জীবনের শেষ ঘণ্টা বেজে গেছে, যেকোনো দিন আনুষ্ঠানিকভাবে সংসার ভেঙে যাবে।

পরের পাঁচ মিনিটের মধ্যে টুথপেস্ট, ব্রাশ, রেজর, শেভিং ফোম, স্যান্ডেল—সব এনে রুমকির রুমে আগে যেখানে যেটা যেভাবে ছিল রেখে আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে গুড নাইট বলে সিমকি বেরিয়ে গেল।

রুমকি বলল, অসুবিধা নেই, আমি আগেই সুইচ অফ করে দেব।

আমি বললাম, আলো থাকলে আমার সমস্যা হবে না, যখন তোমার কাজ শেষ হবে তখনই অফ কোরো।

কাজ মানে উপন্যাস পড়া। ইংরেজি বাংলা দুই-ই। এসব আজেবাজে বানোয়াট জিনিস মানুষ কেন যে পড়ে! একনজরে দেখলাম তার বইটার নাম ‘লাভ স্টোরি’। ঠিকই আছে, এমনই হয়, নিজের জীবনে প্রেম না থাকলে লাভ স্টোরিই পড়তে হয়। একসময় দেয়ালমুখো হয়ে শুয়ে পড়লাম।

দরজায় ঠুকঠুক শব্দে আমার লেগে আসা চোখ খুলে যায়। রাতের বেলা বেডরুমের দরজা আমার খোলার কথা নয়। রুমকিই খুলল। আমি শুধু ফিসফিসে কথা শুনলাম। তোর বর কি ঘুমাচ্ছে, রুমকি, তুই ছোট বোন, তোকে বলা ঠিক হচ্ছে না, কিন্তু না বলে উপায়ও নেই। তোর দুলাভাইয়ের ওটা মাথায় উঠে গেছে। কনডম লাগবে। এখন আমি ঝুঁকি নিতে পারি না। কনডম আমাদের বড় স্যুটকেসে আছে। চাবি খুঁজে বের করে স্যুটকেসের ভেতর থেকে তুলে আনতে আনতে তার শরীর আবার ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। দিস তো একটা, কাজে লাগাই।

আমরা গত দশ মাসে শারীরিক কোনো সম্পর্ক স্থাপন করিনি, ফলে কনডমের দরকারও হয়নি।

কিন্তু রুমকি বলল, স্যরি, চুমকি আপু, আমাদের এগুলো শেষ হয়ে গেছে। কিনি কিনি করেও কেনা হয়নি। শিগগিরই কিনব।

চুমকি খুব কাতর হয়ে বলল, দেখ না রুমকি, কোনো রকমে একটা বের করে দিতে পারিস কি না। তাহলে তোর দুলাভাইয়ের খুব উপকার হবে।

রুমকি বলল, দুলাভাইয়ের মাথায় উঠেছে, না তোমার?

তারপর রুমকি ড্রয়ার টানাটানি করে সে যে সত্যিই খুঁজছে এটা প্রমাণ করল এবং শেষ পর্যন্ত বলল, স্যরি আপু।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চুমকি চলে যেতেই রুমকি দরজা ভেতর থেকে লক করল। আলো নিভল না, আমি উল্টো দিকে প্রায় দেয়াল ঘেঁষে সম্ভবত ঘুমিয়েই পড়লাম। রুমকি সম্ভবত অন্য কোনো বই নিয়ে পাতা ওল্টাতে শুরু করেছে। তার ভালো গুণ—নিঃশব্দে কাজ করে যেতে পারে। আমি বইয়ের পাতা ওল্টাতে গেলেও ইঁদুর ছোটাছুটির মতো খসখসে শব্দ হয়। চা খেতে গেলে চুকচুক শব্দ এড়াতে পারি না। তবে ঘুমের মধ্যে সম্ভবত নাক ডাকে না, ডাকলে এ নিয়ে অনেক লেকচার শুনতে হতো। স্বামীর নাক ডাকা গর্জন যদি স্ত্রীর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় এবং স্ত্রী বারবার অনুরোধের পরও স্বামী নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে আদালত স্ত্রীর আবেদনে তালাকের পক্ষে রায় দিতে পারেন, মুম্বাই হাইকোর্টের রুলিং আছে।

আমার ও রুমকির শেষ স্বাভাবিক শোয়ার দিনটি তিক্ততার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। যে প্রসঙ্গটি ঝগড়ার সময় তুলব না বলে প্রতিশ্রুত ছিলাম, অকস্মাৎ নাম উল্লেখ না করে বলে ফেলি, সহিহ হোক কি ভুয়া হোক সেই বিশিষ্ট আমেরিকানই শুরুতে বুঝতে পেরেছিল এ সংসার করার নয়, সুতরাং কেটে পড়েছে।

রুমকি কড়া চোখে আমার দিকে তাকিয়েছে, কিন্তু কিছু বলেনি। প্রতিশ্রুতি ভেঙে অন্যায় করেছি, এটা আমি বেশ বুঝতে পেরেছি।

খুব সকালে একই সঙ্গে কলিং বেল বাজছে আবার দরজায় করাঘাতের শব্দও হচ্ছে। রুমকি চোখ কচলাতে কচলাতে ওঠে, আমি উঠতে চাই কিন্তু রুমকি ধমক দেয়, তোমার ওঠার কী দরকার। তবু উঠি, ব্লাডারে চাপ অনুভব করছি। আমি ব্লাডার খালি করে বেডরুমের দরজা কিছুটা খুলে দেখি, শুধু রুমকি নয়, কি হোলে চোখ দিয়ে কিছু একটা দেখছে চুমকি, পাশে আছে সিমকিও।

রুমকি বলল, পুলিশ বেশ কয়েকজন।

ঘুম থেকে জেগে উঠেছেন চাকলাদার রইস আহমেদও। তিনি বললেন, সাবধান! খুলবে না। এরা প্রাতর্ভ্রমণকালীন ডাকাত। এরা পুলিশের বেশেও আসতে পারে। এরা জানে, প্রাতর্ভ্রমণকারীরা বেরিয়ে যাওয়ার পর যেকোনো বাসাবাড়ি-অ্যাপার্টমেন্টে যে কজন গর্দভ ঘুমায় সব কটাই এক ধরনের কুম্ভকর্ণ। কানের পাশে ডম্বরু বাজালেও শোনে না। এই সুযোগে ঘর ‘ছাফা’ করে দেয়।

কোন বাদ্যযন্ত্রটা যে ডম্বরু আমার কোনো ধারণা নেই, চাকলাদার রইস আহমেদ জানেন কি না আমার সন্দেহ আছে।

আবার বেল বাজে, আবার ধাক্কা। এবার সঙ্গে মাইক্রোফোনের শব্দ—আমরা এই অ্যাপার্টমেন্ট এবং পুরো বিল্ডিং ঘিরে ফেলেছি। ভেতরে খুনের মামলার আসামি আছে। এখনই দুই হাত ওপরের দিকে তুলে দরজা খুলে আত্মসমর্পণ করুন। চাকলাদার রইস আহমেদ পুলিশের সঙ্গে রসিকতা করতে গিয়ে ভয়ংকর এক ধমক খেলেন। তিনি বললেন, আগেই যদি দুই হাত ওপরে তুলে ফেলি তাহলে দরজা খুলব কেমন করে?

পুলিশ চেঁচিয়ে উঠল, শাট আপ। এক থেকে দশ পর্যন্ত গুনছি, এর মধ্যে যদি দরজা ভেতর থেকে কেউ না খোলে তাহলে ভেঙে ফেলছি।

সিমকি বলল, এক্ষণ খুলে দিচ্ছি, দরজাটা ভাঙলে মেরামত করাতে দশ হাজার টাকা লাগবে। তা ছাড়া মেরামত হওয়ার আগে পর্যন্ত দরজা দিয়ে কেউ ঢুকে পড়তে পারে, এই টেনশনে ঘুম হবে না।

সিমকি চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলতেই পিস্তল তাক করা একজন এবং রাইফেল তাক করা তিনজন ঘাবড়ে গেল। পিস্তলধারী চেঁচিয়ে তার বাহিনীকে সতর্ক করে দিল, সাবধান এই মেয়ের শরীরে বোমা বাঁধা থাকতে পারে। শি মে বি আ সুইসাইড বোম্বার। পেছন থেকে পিস্তল হাতে দুজন নারী পুলিশ এগিয়ে এসে সিমকির দুই হাত ধরে ফেলল, তৃতীয় একজন এসে ভয়ে ভয়ে তার শরীরে হাত রেখে বোমা খুঁজল। প্রথমে যথেষ্ট সাহস নিয়ে টেলিভিশন ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে একজন ভেতরে ঢুকে পড়লেন। অকুতোভয় এই ক্যামেরম্যান বললেন, বোমা থাকে থাকুক, আগে দু-একটা শট নিয়ে নিই। তাঁর সাহস দেখে পুলিশও সাহসী হয়ে দ্রুত ভেতরে ঢুকে তিন বেডরুম ও কিচেনের সামনে পজিশন নিল। আমাদের সবার হাত ওপরে।

পুলিশ জিজ্ঞেস করল, খুনি কোথায়?

চাকলাদার রইস আহমেদ বললেন, দুই হাত ওপরের দিকে থাকলে আমার ভোকাল কর্ডের ওপর ভীষণ চাপ পড়ে, প্রশ্নের জবাব দিতে পারি না।

তাকে আবারও শাট আপ শুনতে হলো।

প্রথম সুযোগে পুলিশ তল্লাশির নামে সব কটা রুম তছনছ করে ফেলতে চেষ্টা করল, কিন্তু থেমে গেল রুমকির কথা শুনে। আপনারা তল্লাশি করতে গিয়ে এখানে-ওখানে গুলির খোসা কিংবা ইয়াবা ঢুকিয়ে দিয়ে পরে বলবেন এসব পাওয়া গেছে—এটা হতে পারে না। আমাকে সব ভিডিও করতে দিতে হবে, তারপর যা ইচ্ছা করুন। আমি ব্যাপারটা কায়সার ভাইকে জানাব এবং ভিডিওটা দেখাব।

কিসের কায়সার ভাই, একজন পুলিশ গর্জে ওঠে।

কেন, নিজেদের অ্যাডিশনাল আইজি শামসুর রহমান খানকে চেনেন না?

সেটা তো বলবেন, কায়সার ভাই বললে কেমন করে বুঝব। তা তিনি কেমন ভাই? তালতো ভাই না তো?

রুমকি হঠাৎ দুই হাত নামিয়ে ঝাঁজালো গলায় বলে উঠল, তালতো ভাই মানে? কায়সার ভাই আমার আম্মার বড় বোনের মেজো ছেলে। তাহলে আপনার এই কথাটাও তাকে বলতে হবে।

রুমকিকে বলল, ম্যাডাম রাগ করবেন না। আমাদের কাছে নিশ্চিত খবর আছে, কুষ্টিয়ার চুয়াডাঙ্গা হয়ে আন্তর্জাতিক মানের একজন খুনি গত রাতে এই ফ্ল্যাটে ঢুকেছে।

রুমকিকে সরিয়ে চুমকি এক হাত উঁচুতে রেখে এক হাত নামিয়ে বলল, একদম ঠিক বলেছেন পুলিশ ভাই, গত রাতেই সোয়া আটটায় চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থেকে ভাড়া করা মাইক্রোবাসে এসেছেন। ওই যে তিনি, দেখতে পাচ্ছেন। তিনিই সেই লোক।

রইস আহমেদ পুলিশকে বললেন, হাত নামাই স্যার। আমিই এসেছি। পিস্তলধারী পুলিশ সদস্য তখনই তাঁর বুকপকেট থেকে দুটি ছবি বের করলেন, একটি ক্লিন শেভেন, একটি শ্মশ্রুমণ্ডিত। ছবি হাতে নিয়ে বারবার তাঁর দিকে তাকালেন। পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে ছবি আবার পকেটে ঢুকিয়ে রাখলেন। বললেনও, মিলছে না তো।

এবার রইস আহমেদকে প্রশ্ন করলেন, আপনি কি ফাতিমা পাওয়ার আবাচা নামের কাউকে চিনতেন? কিংবা চেনেন?

না।

অমনি চুমকি বলে উঠল, ঠিক বলেনি স্যার, অবশ্যই চেনে স্যার। ওর খালাতো বোন ফাতিমা বড্ড বজ্জাত মহিলা।

রইস আহমেদ বললেন, নামটা আগে শোনো। আমার খালাতো বোনের নাম ফাতেমা বেগম আর পুলিশ স্যার বলছেন ফাতিমা তুজ জোহরা।

পুলিশ থ।

বললেন, আমি ফাতিমা তুজ জোহরা বলিনি, বলেছি ফাতিমা পাওয়ার আবাচা।

যা-ই বলেন আমার খালাতো বোন ফাতেমা ছাড়া অন্য কোনো ফাতেমাকে চিনি না। তবে নবিকন্যা বিবি ফাতিমার নাম জানি।

ফাতিমা পাওয়ার আবাচা তাঁর নিউ ইয়র্ক অ্যাপার্টমেন্টে খুন হয়েছেন।

রইস আহমেদকে কথা বলতেই হবে, তিনি বললেন, বলেন কী? নিউ ইয়র্কের মতো জায়গায় ব্যাপারটা দুঃখজনক।

পুলিশ অফিসার বললেন, অবশ্যই দুঃখজনক।

রইস আহমেদ বললেন, এনওয়াইপিডি শালারা কি ঘাস কাটে?

কিসের এনওয়াইপিডি?

এটাই জানেন না? নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট।

পুলিশ অফিসার বললেন, ও আচ্ছা। ইন্টারপোল তার নামে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে। আমরা তাকে চেজ করতে করতেই এ বাসা পর্যন্ত এসেছি। আমাদের ইনফরমার জানিয়েছে, গত রাতে সেই খুনি এ বাসায় ঢুকেছে। আপনার সঙ্গে খুনির চেহারা ঠিক মিলছে না, তবু ফরমালিটিজ হিসেবে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ তো করতেই হবে।

অবশ্যই করুন। তবে পিও যদি নিউ ইয়র্ক হয়ে থাকে তাহলে আমাকে সেখানে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করাটাই আপনাদের জন্য ভালো হবে।

পিও মানে? আপনি এসব কোথায় শিখলেন?

জি স্যার, প্লেস অব অকারেন্স। আমিও একসময় পুলিশের এএসআই ছিলাম। স্যারদের চাহিদা মেটাতে না পেরে এক সপ্তাহের ছুটিতে এসে আর ফিরে যাইনি। চেষ্টা করে দেশই ছেড়ে যাই।

পুলিশ অফিসার জিজ্ঞেস করেন, আপনি কোন সালে নিউ ইয়র্ক ছিলেন?

বললাম তো, আমাকে যদি গ্রেপ্তার করে ওখানে নিয়ে যান, এটাই হবে আমার প্রথম সফর। যাওয়ার চেষ্টায় আছি, আটলান্টিক পাড়ি তো দিতে হবে। যেভাবেই হোক আপনারা যদি নিউ ইয়র্ক পাঠাতে পারেন তাহলে পাসপোর্টে একটা আমেরিকান ভিসা তো লাগবে—এতে ভিসা পাওয়ার পথটা খুলে যাবে। দেখুন এ উপকারটা করতে পারেন কি না।

পুলিশ অফিসার বললেন, আমার শেষ প্রশ্ন। আপনি কি কখনো কোনো খুন করেছেন? আমি হেসে উঠি, অপরাধী যদি এত সহজে খুন করার কথা বলে দেয় তাহলে আপনাদের কী দরকার? আমি খুন কখনো করিনি, সাহস হয়নি তাই। তবে খুন করার কথা ভেবেছি।

জি, ওই যে দেখতে পাচ্ছেন চুমকি, আমার স্ত্রী, তাকে খুন করার কথা অনেকবার ভেবেছি।

পুলিশ অফিসার বললেন, কী বলছেন এসব?

ঠিকই বলেছি, এমন দু-একবার আপনিও ভেবেছেন। না ভেবে থাকলে বুঝব আপনি বিয়েই করেননি, আর করে থাকলেও...

পুলিশ অফিসার তাকে বাকিটা বলতে দিলেন না। দিলে সম্ভবত তাঁকে শুনতে হতো, আপনি একটা নপুংসক!

পুলিশ অফিসার বললেন, রইস আহমেদ যে ছবির মানুষটি নন, এটা প্রমাণ করতে দু-একবার তাঁকে থানায় হাজির হতে হবে। তাঁর ছবি তুলে ফরেনসিক অ্যানালিস্টের কাছে পাঠানো হবে। সব দেখেশুনে স্পেশালিস্ট যদি মেনে নেন আপনারা দুজন একই ব্যক্তি নন, তাহলে ছাড়া পেয়ে গেলেন। নতুবা আপনাকে অনেক ভুগতে হবে। কাজেই সহযোগিতা করবেন। আচ্ছা, তাহলে আমরা আসি।

রুমকি এবার এগিয়ে এসে বলল, তাহলে কায়সার ভাইকে কী বলব?

কী আর বলবেন। এটাই না হয় বলে দেবেন যে সুযোগ থাকার পরও পকেটে গুলির খোসা বা ইয়াবা ঢুকিয়ে দিয়ে আপনাদের গ্রেপ্তার করেনি।

ততক্ষণে ভিঞ্চি ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে বলল, হু আর দে?

কেউই তার প্রশ্নের জবাব দিল না।

রইস আহমেদ ফাজলামি করার ইচ্ছাটা দমিয়ে রাখতে না পেরে হঠাৎ বললেন, ওহ মাই গড, আপনারা কি ভালো হয়ে গেছেন নাকি? ঘুষের টাকা-পয়সা চাইলেন না?

পুলিশ অফিসার গম্ভীরভাবে বললেন, থ্যাংক ইউ।

পুলিশ বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে রুমকিদের দরজায় আবার কড়া নাড়া। প্রতিবেশী সুরাইয়া বানু বেল বাজাতেই দরজা খুলল, তিনি সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, পুলিশকে কত টাকা দিয়ে মানিয়ে নিতে পেরেছেন। আমাদের একটা সমস্যা আছে, পুলিশ দু-এক দিনের মধ্যেই আসছে। কত দেব তাই ভাবছি।

সুন্দরী সুরাইয়াকে দেখে রইস আহমেদ চুপচাপ মুখ বন্ধ করে থাকতে পারলেন না। বললেন, সেটা নির্ভর করে অপরাধের গুরুত্বের ওপর। আমাদেরটা আফটার অল মার্ডার কেস।

মানে খুনের মামলা।

জি, খুনের মামলা। একজন বিখ্যাত ফোসিনিস্ট সেলিব্রিটিকে খুন করা হয়েছে।

সুরাইয়া বললেন, একি! একি বলছেন আপনি? আসামি কে?

রইস আহমেদ বললেন, এখনো জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না কে খুনটা করেছে, তবে আমিই প্রাইম সাসপেক্ট। আই অ্যাম আন্ডার পুলিশ ওয়াচ।

একজন সন্দেহভাজন খুনির সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে নিজেও মামলায় ফেঁসে যেতে পারেন—এই আশঙ্কা থেকেই তিনি আর কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস না করে দ্রুত নিজের ফ্ল্যাটের দরজায় তালা মারলেন।

পুলিশ চলে যাওয়ার পর উঁকি আরো কয়েকজন দিয়েছে, কিন্তু কেউই ভেতরে আসেনি।

পুলিশের উপস্থিতির কারণে এবাড়ির সকালবেলার বুয়া সম্ভবত ভেতরে ঢুকতে পারেনি অথবা পুলিশের হাঙ্গামা থেকে নিজেই দূরে থাকতে চেয়েছে। অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে কোনো ঝামেলা হলে যখন পুলিশ আসে কাজের অগ্রগতি প্রমাণ করতে, সবার আগে গ্রেপ্তার করা হয় বুয়া এবং তারপর নাইটগার্ডকে। এমনকি বাড়ির বড় সাহেবের ছেলে যদি শ্বাসরোধ করে তার স্ত্রীকে মেরে ফেলে প্রথমেই ধরে নেওয়া হয় বুয়ার সঙ্গে নিশ্চয়ই সাহেবের ছেলের একটা অবৈধ সম্পর্ক ছিল। এমনকি সাহেবের নাতনিও যদি সিসা পার্টির টাকা জোগাতে সোনার হার কিংবা একটা আইফোন চুরি করে বেচে দেয়, এই দায়ও শুরুতে বুয়ারই। বাড়ির এক-দুজন যারা সুযোগ পেলে বুয়ার গায়ে হাতটাত দিত তারাও বুয়াকে না চেনার ভান করে।

সুতরাং সকালের নাশতা আনতে সিমকি যখন বেরোচ্ছিল, আমিই বললাম, তুমি থাকো, আমি নিয়ে আসছি। ভিঞ্চি কী খাবে জিজ্ঞেস করো।

জবাব ভিঞ্চির মা চুমকিই দিল, বলল—সবাই যা খাবে, সে-ও তা-ই খাবে, নাথিং স্পেশাল। চলো, আমিও তোমার সঙ্গে যাব। তখন রইস আহমেদ বললেন, তাহলে বাসায় খেয়ে কী দরকার—চলো, আশপাশের কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে খেয়ে আসি; আর মায়ের জন্য নিয়ে আসব। এ অবস্থায় আমি কিছু খাব না বলে রুমকির এড়িয়ে যাওয়ারই কথা, কিন্তু সম্ভবত রইস আহমেদের কাছে আন্তরিক ও সামাজিক সাজার জন্য বলল, তাহলে তো ভালোই হয়।

প্রায় দশ মিনিট হেঁটে আমরা খুশবু নামের রেস্তোরাঁয় পৌঁছলাম। পরোটা, নানরুটি, মুগের ডাল, সবজি, হালুয়া, ডিম ভাজা এবং রইস আহমেদের প্রিয় খাসির পায়া সবাই ভাগাভাগি করে নিয়ে ভালো নাশতা হলো। ভিঞ্চি খেল হালুয়া আর ডিম।

এক পর্যায়ে আমার প্লেট প্রায় খালি দেখে রুমকি নিজের প্লেটের পরোটার অর্ধেক এবং ডিম ভাজা যখন তুলে দিল, চুমকি বলল, হাজব্যান্ডের জন্য দরদ কত।

রইস আহমেদ তাঁর স্ত্রীকে বললেন, ভালো কাজ ছোটদের কাছ থেকে শিখতে লজ্জার কিছু নেই। রুমকির কাছে শেখো।

ঠিক তখনই আমার আর রুমকির মধ্যে চোখাচুখি হয়। সম্ভবত আমরা দুজন এটাই বলেছি, ফার্স্ট ক্লাস, নাটকটা অবশ্যই ফার্স্ট ক্লাস। নাশতার ভাগ পাওয়া দূরে থাক, গত দেড় বছরে আমাদের একসঙ্গে নাশতা খাওয়া হয়নি। এর জন্য আমার বুদ্ধিবৃত্তিক অগভীরতাই দায়ী।

রেস্তোরাঁর বিল আমার দেওয়ার ইচ্ছা ছিল না, তবু হাজার টাকার একটা নোট কাউন্টারে রাখলাম। চাকলাদার রইস আহমেদ বললেন, ভুলে যেয়ো না আমি বয়সে সবার বড়। কামাইও তোমাদের চেয়ে বেশি হওয়ারই কথা।

সুতরাং আমার হাজার টাকার নোট প্রত্যাহার করে নিলাম। আমাদের শাশুড়ির জন্যও খাবার নেওয়া হলো।

ফেরার পথে আবারও বিস্মিত করে রুমকি বলল, কী ব্যাপার, আজ নাশতার সময় এক হাতে রুটি নিয়ে আরেক হাতে কান চুলকালে না যে। চায়ের সময়ও চুকচুক করলে না—ভালো হয়ে গেলে নাকি?

চুমকিকে চার্মড করতে চাচ্ছ?

আমি শুধু বললাম, মানে?

মানে বোঝানো যাবে না। চুমকির চোখের প্রতারণার ভাষা বুঝতে না পেরে বলল, আমাদের সোহেল ভাই তো প্রায় পাগলই হয়ে যায়। তার চেয়ে পনেরো বছরের বড় রইস ভাইকে নাচতে নাচতে বিয়ে করে ফেলল। বিয়ের আগের দিন পাগলপ্রায় সোহেল ভাইকে বলল, তুমি আমাকে ভালোবাসো বলেই বিয়ে করতে হবে নাকি? আমি তো জাদুকর জুয়েল আইচকে ভালোবাসি, তাই বলে তাঁকে বিয়ে করার কথা বলব নাকি? যাও, গোসলটোসল করে গাঁজায় একটা ভালো দম দিয়ে ঘুম দাও। ঘুম থেকে উঠলেই দেখবে পৃথিবীটা অন্য রকম। সিমকির বয়সী কাউকে টার্গেট করো, সাকসেসফুল হওয়ার সম্ভাবনা সিক্সটি পার্সেন্ট। বুঝলে, সিমকির বয়স তখন বারো কিংবা তেরো বছর।

আমরা যখন বাসায় ঢুকতে যাচ্ছি, ক্যামেরা নিয়ে হাজির কমবয়সী এক সাংবাদিক বললেন, আজ ভোরে আপনাদের যেভাবে হেনস্তা করা হয়েছে, তার বিবরণ দিন। আমরা এর বিরুদ্ধে মানববন্ধন করব।

আমরা সবাই নিশ্চুপ।

ছেলেটিকে ভালোভাবে দেখে রইস আহমেদ বলে উঠলেন, ওই ব্যাটা, ফাইজলামি করস? তুই ওদের সঙ্গে ছিলি না?

সাংবাদিক বললেন, ছিলাম বলেই তো দেখতে পেয়েছি। না হলে এসব গাঁজাখুরি অভিযোগ নিয়ে নিরীহ-নিরপরাধ মানুষকে কেউ হেনস্তা করে? আরেকটা কথা শুনুন, আপনি যত নিরপরাধ হোন না কেন, সাংবাদিককে তুই-তোকারি করার কোনো অধিকার আপনার নেই।

রইস আহমেদ তীক্ষ ধমকের সুরে বলে উঠলেন, তোর অধিকারের মায়রে বাপ! এক্ষণ যাবি, নাকি ক্যামেরা গুঁড়া করমু?

আমরা সবাই গেটের ভেতরে চলে যাই।

যেটুকু খোলা স্পেস আছে, পুরোটাই ড্রয়িংরুম। আলাদা কোনো ডাইনিং স্পেস বা রুম নেই। রুমকি বাদে সবাই সেখানেই বসল। সিমকি মাকে খাবার দিয়ে এসে এখানেই বসল। রুমকি বেডরুম ঘুরে এসে বলল, অফিস থেকে ফোনে জানিয়েছে, গাড়ি আসবে না। খুব জরুরি কিছু কাজের জন্য অফিস খোলা থাকবে। শিগগিরই ঢাকায়ও লকডাউন ঘোষণা করা হবে।

পাঁচ.

সকালে নাশতার সময় রইস আহমেদ বললেন, সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমার তো চাকরি নিয়ে টানাটানি লেগে যাবে। করোনাভাইরাসের কারণে টার্কিশ এয়ারওয়েজ আসা বা ঢাকা থেকে যাওয়া সব ফ্লাইট বাতিল করে দিয়েছে।

রুমকি বলল, মানে? আমাদের টিকিট তো টার্কিশ এয়ারের।

তিনি বললেন, মেসেজ তো আগেই দিয়েছে, কিন্তু ওয়াই-ফাই জোনে না থাকায় দেখিনি, একটু আগে সিমকির কাছ থেকে তোমাদের বাড়ির পাসওয়ার্ড নিয়ে লগ ইন করতেই এক ডজন মেসেজ এলো। করোনাভাইরাসকে প্যান্ডেমিক ডিক্লেয়ার করেছে। সার্সও তো প্যান্ডেমিক, তখন তো এমন পাইকারি হারে ফ্লাইট ক্যানসেল হয়নি। এয়ারপোর্টে এটা-ওটা পরীক্ষা করা হয়েছে। চুমকি বলল, তোমার কিপ্টেমি ছাড়ো, অন্য যে এয়ারলাইনসের টিকিট পাও সেটাই কিনে ফেলো।

নাশতার টেবিলে বসেই তিনি ফোন করলেন, কাকে করলেন তিনিই জানেন। কিন্তু এটা শুনলাম বারবার বলছেন, সর্বনাশ সর্বনাশ, তাহলে কেমন করে যাব।

চুমকি বলল, মানে?

কোনো এয়ারলাইনসই অপারেশনে নেই। টোটাল লকডাউন শুরু হয়ে যাচ্ছে। এয়ারপোর্টও বন্ধ।

এবাড়িতে টেলিভিশন আছে, কিন্তু কেউ এমনকি হিন্দি সিরিয়ালও দেখে না। রুমকি একটু অবসর পেলে বই নিয়ে বসে, সিমকির হাতের মোবাইলে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার চলছেই, আমার শাশুড়ি বসে থাকলে তাঁর ভার্টিগো হয়, এখন টিভির সামনেই আসেন না। পৃথিবী, দেশ, সমাজ—এসব নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই।

আমি ভাবছি সাবলেটই ভালো, কিছু বাড়তি টাকা দিলে দুই বেলা খাবার দেবে, দুপুরে অফিসের খাবার ছয় দিন তো আছেই, শুক্রবার দুপুরে বাইরে কোথাও মেরে দেব। না খেলেও সমস্যা নেই। রাতে ভাত একটু বেশি খাবার টানব।

রুমকি রিমোট কন্ট্রোল খুঁজে বের করে টিভি সার্ফ করতে শুরু করল। করোনা নিয়েই সিএনএন, বিবিসি, আলজাজিরা—সবার কথা। বাংলাদেশের চ্যানেল বলছে, ২৬ মার্চ থেকে সব অফিস-আদালত বন্ধ। দেশে কমপ্লিট লকডাউন। বাসা থেকেও কেউ বের হতে পারবে না। বাসা থেকে বেরোনো ঠেকাতে আনসার-পুলিশ, র‌্যাব-সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

রইস আহমেদ বললেন, সমস্যার শুরুটা উহান থেকে।

চুমকি বলে, পৃথিবীটা কোন দিকে যাচ্ছে? আমি তো কখনো উহানের নাম শুনিনি। কিয়ামত এসে গেছে নাকি?

রাতের বেলা চুমকি বলল, ওই দেখো, টিভিতে চীনের বাংলাদেশিরা ফেরার জন্য কান্নাকাটি করছে, সরকার ব্যবস্থা করতে দেরি করছে বলে অভিশাপ দিচ্ছে। আরো খবর দিল চুমকি—ইতালি আর আমেরিকার অবস্থা খারাপ। ও বাবা, এটা কি প্লেগ নাকি? ব্ল্যাক ডেথ?

সিমকি একটু পড়াশোনা করে বলল, শ্বাসকষ্টে মারা যাচ্ছে। সিম্পটম হচ্ছে—জ্বর, গলা ব্যথা, কাশি।

চুমকি বলল, ও মাই গড, আমার তো গলা ব্যথা, গত রাতে একটু জ্বরও ছিল। প্যারাসিটামল খেয়ে সামলেছি। করোনার নাকি কোনো ওষুধ নেই? আমি মরে গেলে ভিঞ্চির কী হবে?

রইস আহমেদ বললেন, চিন্তা কোরো না, তুমি মরে গেলে ভিঞ্চির কিন্ডারগার্টেনের অ্যাটেনডেন্ট ফ্রান্সেসকাকে বিয়ে করব, মেয়েটা ভিঞ্চির খুব টেক কেয়ার করে।

হঠাৎ চুমকি খেপে গেল, গ্লাস ভর্তি পানি ছুড়ে মারল ভিঞ্চির বাবার ওপর।

বলল, ও মাই গড! তোমার চোখের তারা কাকে দেখলে নেচে ওঠে আমি কি সেটা জানি না? তুমি ফ্রান্সেসকাকে মোটেও বিয়ে করবে না, করবে ওই প্রস্টিটিউটটাকে, বিয়াত্রিচে। ভিঞ্চির সেকেন্ড শিফটের বুয়া। অ্যাটেনডেন্ট আবার কী? বুয়া বলতে পারো না। তোমার রুচি কখনো বুয়ার ওপর উঠেছে? সব পুরুষমানুষের চরিত্র আমার জানা আছে।

রইস আহমেদ বললেন, সব পুরুষমানুষের? আহ্হা, এত কিছু জানতে তোমার নিশ্চয়ই অনেক সময় ব্যয় করতে হয়েছে, আর পরিশ্রমও হয়েছে অনেক। তোমার কিছুদিন রেস্ট করা দরকার।

চুমকি এবার একটা পেপারওয়েট হাতে নিয়ে বলল, আর একটা কথা যদি বলো, তোমার খবর আছে।

চুমকির মাথার কয়েকটা স্ক্রু ঢিলা আছে, এটা আমি রুমকির মুখেও শুনেছি। কাজেই পেপারওয়েটটা সত্যি সত্যিই বিশালদেহী রইস আহমেদের দিকে ছুড়ে দিতে পারে। তার শরীরটা বড়, তাই পাথরটা মিস হওয়ার কথা নয়, কোথাও না কোথাও লাগবেই।

রইস আহমেদ আমাকেই বললেন, বুঝলে ভায়রা, সংসার মানেই চব্বিশ ঘণ্টা গোলার মুখোমুখি হয়ে থাকা, কখন কোন কারণে ট্রিগারে তাদের চাপ পড়ে কেউ জানে না। তোমাদের কয় বছর হলো—আড়াই, না তিন? অবশ্য রুমকির এতটা জঙ্গি হওয়ার কারণ নেই। বইপত্র পড়া মানুষের সুকুমারবৃত্তি বেশি বিকশিত হয়।

রুমকি পেপারওয়েটটা নামিয়ে রাখে।

বলে, ভিঞ্চির বাবা সুকুমারবৃত্তির মতো কঠিন শব্দ উচ্চারণ করতে পারে, কত মেধাবী! কিন্তু এক শ বার শুনেও লেহাঙ্গা শব্দটা মনে রাখতে পারে না, বলে, লাফাঙ্গা। কী মিষ্টি করে বলে, চুমকি এবারের ঈদে তো তোমার জন্য লাফাঙ্গা কিনতে হবে।

তারপর হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বলে, যেভাবেই হোক ৩০ মার্চের মধ্যে আমাকে মিলান পৌঁছতে হবে। ৩১ তারিখ আমার ভিঞ্চির স্কুলে টোয়েন্টি টোয়েন্টির প্রথম প্যারেন্টস ডে।

রইস আহমেদ বললেন, আমাকে ২৭ তারিখ অফিসে থাকতেই হবে, একটা ভল্টের চাবি আমার কাছে। এই চাবি রাখার জন্য মাসে এক শ ইউরো বেশি বেতন দেয়। আমার যদি চাকরিই না থাকে ভিসা এক্সটেনশন হবে না। তোমাদের মিলান থাকা হবে না, ভিঞ্চির স্কুলের প্যারেন্টস ডেও না।

 

ছয়.

সিমকি রুমকিকে বলল, ভালোই হয়েছে, আমি নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ নই যে প্লেন ভাড়া দিয়ে আমার বিয়েতে আসবে। আটকা যখন পড়েছই বিয়েটায় অ্যাটেন্ড করে যাও, আর একুশ দিন।

পারিবারিক প্রস্তাবে রাশেদের সঙ্গে সিমকির বিয়ের যোগাযোগটা রাখছে সিমকিদের ছোট মামি হাফসা। রাশেদ হাফসার ক্লাসমেট, নিষেধাজ্ঞা হাফসারই। সিমকি রাশেদের সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছিল। হাফসা বলেছে, প্রশ্নই আসে না। তাহলে সিমকির দাম কমে যাবে। বিয়ের পর কথা বলবে, তার আগে দুই পক্ষের যত কথা সব হাফসাই বলবে।

রইস আহমেদ বললেন, বিয়ে কি কাজি সাহেবকে করবে, না পাত্রকে?

চুমকি বলল, কেন? কাজিকে কেন বিয়ে করবে? পাত্র কি ঘাস কাটবে?

এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। ওসব দেশে ঘাস অনেক বড় হয়। দুনিয়ার কোনো খোঁজখবর না রাখলে হবে কেমন করে? দেখো, ফেডারেল এভিয়েশন অথরিটি কী বলছে—জুনের আগে উত্তর আমেরিকার কোনো এয়ারপোর্ট থেকে ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট চালুর সম্ভাবনা নেই।

একজন এভিয়েশন জার্নালিস্টের ভিডিও করা খবরটি তাকে দেখায়। হঠাৎ সিমকি মলিন হয়ে যায়।

চুমকি বলে, মন খারাপ করিস না। হেঁটে কিংবা রিকশায় কিংবা টেম্পোতে তো আর কুইবেক থেকে আসতে পারবে না। প্লেনে চড়তে হবে। রইস আহমেদ একটা বিকল্প পথ দেখান। বিয়ের দিনই ভিডিও কনফারেন্স করে কাজিকে নিয়ে বিয়ের কাজটা সেরে ফেলতে পারো। তারপর যখন আকাশে প্লেন উড়বে, জামাই চলে আসবে।

একটু বেহায়ার মতো শোনালেও সিমকি বলল,  তা-ই হবে, আমি ছোট মামিকে বলছি।

চুমকি বলল, এখনই বলিস না। আগে রাশেদকে একটা ভিডিও পাঠাতে বল, যেখানে দেখা যাবে সে হাঁটাচলা করছে।

হাঁটাচলা করছে মানে? হাঁটাচলা না করলে কুইবেকে থাকছে কেমন করে?

রুমকি বলল, কুইবেকে প্রতিবন্ধী মানুষ থাকা নিষিদ্ধ নাকি?

প্রতিবন্ধী! রাশেদ কি প্রতিবন্ধী নাকি?

সিমকির প্রশ্নে তার বড় আপু বলল, আমি কি তাই বলেছি নাকি? আমাদের রইস চাকলাদার সাহেবের বোনের মেয়ে, মানে আমার ননদের মেয়ে তানিয়া বিয়ের আগে তার বরের তিনটা ভিডিও পেয়েছিল, বিছানায় শুয়ে একটা বাজে ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাচ্ছে, একটাতে সোফায় বসে বেসুরো গলায় ইংরেজি গান গাচ্ছে, আরেকটাতে সম্ভবত অফিস রুমে কম্পিউটারে কাজ করছে। মাত্র কয় মাস আগে ক্রিসমাসের ছুটিতে ভিডিও কনফারেন্স করে বিয়ে হলো। কাজি-মাওলানা সবই ছিল। রাজীব থাকত নিউজিল্যান্ড। একটা সত্যি কথা বলেছিল, রেসিডেন্সি তখনো না পাওয়ায় একবার নিউজিল্যান্ড থেকে বেরোলে সহজে আবার ঢুকতে পারবে না। অকল্যান্ড ইউনিভার্সিতে এক টার্মের টিউশন ফি জমা দিয়ে তানিয়ায় জন্য স্টুডেন্ট পাস বের করে। তাতেই ভিসা হয়। ঢাকা থেকে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসে কুয়ালালামপুর, সেখান থেকে এয়ার নিউজিল্যান্ডে অকল্যান্ড। এমনই টেক্সট চালাচালি হয়েছে, তৌকির নামের পাত্রটির শেষ টেক্সট মেসেজে বলা হয়েছে : সুইটি, তোমার জন্য এক সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে, জাস্ট কাম আউট অব এয়ারপোর্ট।

এর আগে তারা যেসব টেক্সট চালাচালি করেছে তাতে তৌকির বলেছে, আমার কিন্তু কিছু লিমিটেশন আছে।

তানিয়া লিখেছে, আমারও আছে, তাতে কী? কোনো মানুষই পারফেক্ট হয় না।

তৌকির বলল, ঠিক বলেছ, কিন্তু এটা তোমার মনে থাকবে তো?

অবশ্যই। পারফেকশন খোঁজা একটি মানসিক রোগ।

তৌকির বলল, আমি শুধু সাদা কাগজে লাল রঙে বাংলায় তানিয়া লিখে তোমার জন্য অপেক্ষা করব। সেদিন এয়ারপোর্টে এটাই হবে একমাত্র লাল রঙের বাংলা হরফের নাম।

তানিয়া বলল, আই অ্যাম ডায়িং টু সি ইউ।

তানিয়া ইমিগ্রেশন পয়েন্ট গ্রিন চ্যানেল দিয়ে পেরিয়ে এয়ারপোর্ট এক্সিট ধরে বেরোতেই লাল হরফের লেখা তার নামটি দেখতে পেল হুইলচেয়ারে বসা এক তরুণের হাতে।

রইস আহমেদ স্ত্রীকে বললেন, বর্ণনা সংক্ষিপ্ত করো, উপন্যাসের মতো হয়ে যাচ্ছে।

চুমকি বলল, বেশি কথা বোলো না, চান্স পেলে তুমি বকবক কম করো?

রইস আহমেদ চুপ হয়ে যান।

চুমকি বলল, কী আর করা, পোলিওতে দুই পা ছোটবেলাই শুকিয়ে গিয়েছিল। তানিয়া ভালোই আছে আর আমাদের জানিয়েছে, বিল গেটসের সঙ্গে তৌকিরের ছবি আছে। ছেলেটি খুব মেধাবী, টাকাও ভালো কামাই করে আর তানিয়ার ব্যাপারে খুব কেয়ারিং।

এপ্রিলের ২১ তারিখ সিমকিদের ছোট মামা এরফান হাতে গ্লাভস, মুখে সার্জিক্যাল মাস্ক পরে নভোচারীর মতো চলে এলো। বলল, ফোনে বললে পারতাম, কিন্তু বিশ্বাস করানোটা কষ্টকর হতো।

চুমকি জিজ্ঞেস করল, ছোট মামা কোনটা বিশ্বাস করতে বলছ?

কানাডার বদমাশটার সঙ্গে সিমকির বিয়ে হবে না। হতে পারে না।

কেন? একসঙ্গে চুমকি ও সিমকি জিজ্ঞেস করে।

কারণ পাত্র সুবিধার নয়।

চুমকি বলল, ছোট মামা পাত্র কি প্রতিবন্ধী? মানে হাঁটতে পারে না? এরফানুল বারীর জবাব শোনার আগেই চুমকি বলল, ও মাই গড, তানিয়ার এই আপদ আমাদের ফ্যামিলিতে এসে যাচ্ছিল! থ্যাংক ইউ ছোট মামা, তুমি সিমকিকে বাঁচিয়েছ।

রইস আহমেদ জিজ্ঞেস করলেন, মামা তারও কি পোলিও হয়েছিল নাকি?

আরে ধ্যাৎ, কিসের পোলিও! আরো ভয়ংকর।

তিনি আরো কিছু বলতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই চুমকি বলল, ছোট মামা তুমি আমাদের বাঁচালে। থাকগে, চিন্তা করার দরকার নেই, সিমকি তো বিদেশি পাত্র চাচ্ছে, ব্যবস্থা করে ফেলব, চিন্তা করিস না।

এরফানুল বারী বললেন, আরে ওসব না। চরিত্র, চরিত্র। চরিত্র ভীষণ খারাপ। সে হচ্ছে হাফসার বয়ফ্রেন্ড। আমি হাফসাকে বিয়ে করতে চাইনি, মোবারক দুলাভাই বললেন, এমন টোলপড়া মিষ্টি হাসির মেয়ে লাখেও একটা পাবি না। রাজি হয়ে যা। দুলাভাই আরো বললেন, তুই না করলে তোর আপাকে রাজি করাতে চেষ্টা কর, আমি বিয়ে করব।

মোবারক সাহেব আমার শ্বশুর, চুমকি রুমকি সিমকিদের বাবা। শালার সঙ্গে এটুকু রসিকতা দুলাভাইরা করেই থাকেন।

ছোট মামা বললেন, আমি বিশ্বাস করতে চাইনি, কিন্তু বিশ্বাস না করে কোনো উপায় নেই।

সে হচ্ছে হাফসার বয়ফ্রেন্ড। সিমকির বিয়ের নাম করে প্রতিদিন তার সঙ্গে দেড়-দুই ঘণ্টা কথা বলে, অ্যাদ্দিন পাত্তা দিইনি, কাল কিছুক্ষণ কান পেতে যা শুনলাম, কান গরম হয়ে যাওয়ার কথা। হাফসা তার সঙ্গে থ্রি এক্স স্টাইলে কথা বলছে, পুরোটাই পর্নো। মানে পর্নোগ্রাফি।

সিমকি বলল, তুমি এসব কী বলছ ছোট মামা?

হাফসা যা বলেছে তার এক শ ভাগের এক ভাগও বলিনি। বলেছে সিমকিকে টাচ করার আগে হাফসার সঙ্গে তাকে থাকতে হবে, সব সুযোগ সে তৈরি করে দেবে।

এই বিষয়ে প্রথম মুখ খুলল রুমকি। বলল, তুমি যে এসব জেনেছ, ছোট মামি কি তা জানে?

জানবে তিন-চার দিন পর। আমি এখন মুখে যা বলব সব অস্বীকার করবে, এমনকি আমাকে বলতে পারে, মানসিক ডাক্তার দেখাও। এটা তোমার অবসেশন। আমি আজই সিক্রেট ভয়েস রেকর্ডার আমার অ্যানড্রয়েড ফোনে ডাউনলোড করছি। ফোনটা সাইলেন্ট মোডে দিয়ে বেডরুমে কোথাও লুকিয়ে রাখব। আমি টিভি দেখার নাম করে চলে আসব। এভাবে তিন দিনের কথা রেকর্ড করে নিজে শুনে সিমকিকে এবং তোমাদের শুনিয়ে তারপর হাফসাকে বলব। যদি শুভ্র আর রুদ্র না থাকত আজই হতো হাফসার সঙ্গে আমার শেষ দিন।

রুমকি বলল, ছোট মামা, তুমি আসলেই মেন্টাল কেস নয় তো?

চার দিন পর ডকুমেন্টসহ আসছি।

ছোট মামা সিমকিকে জিজ্ঞেস করল, হোয়াট ইজ ইওর ডিসিশন?

সিমকি বলল, বিয়ে তো আমি ঠিক করিনি, তোমরা ঠিক করেছ, বিয়ের তারিখও তোমাদের ঠিক করা। আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন?

 

সাত.

ছোট মামা বেরোনোর আধাঘণ্টার মধ্যে র‌্যাব রুমকিদের গোটা বাড়ি ঘিরে ফেলে। মাইক্রোফোনে জোর গলায় বলল, এই ভবনে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এই বাড়ি সম্পূর্ণ লকডাউন করা হয়েছে। কেউ বের হতে চেষ্টা করলে গ্রেপ্তার করা হবে। হ্যান্ডমাইকে আরো ঘোষণা করা হলো, এটি একটি প্রাণঘাতী ছোঁয়াচে রোগ। করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর নাম মোদাব্বের হোসেন, বয়স সত্তরের ওপরে, তিনি এই বিল্ডিংয়ের চারতলার ডান পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন। এই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা ছাড়া অন্য কেউ যদি তাঁর সংস্পর্শে এসে থাকেন তিনিও বিপজ্জনক ভাইরাস বহন করে থাকতে পারেন। অবিলম্বে তাঁকে শনাক্ত করুন এবং আমাদের কাছে হস্তান্তর করুন।

মোদাব্বের হোসেন দূরের কেউ নন, সিমকিদের দুই ভাইয়ের একজন রাতুলের শ্বশুর, ডায়ানার বাবা। রাতুলই সবার বড়।

নভোচারীর মতো পোশাক পরা লোকজন মোদাব্বের হোসেনকে চারতলা থেকে নামিয়ে অ্যাম্বুল্যান্সে তোলার সময় তিনি চিৎকার করছিলেন, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে, আল্লাহ আমাকে বাঁচাও।

ডায়ানা ভাবির সঙ্গে তাঁর শাশুড়ির খারাপ সম্পর্ক থাকলেও ডায়ানার বাবা আসার পর তিনি তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। আবার মায়ের সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমিয়েছে সিমকি। রুমকি এবার চড়াও হলো মা ও বোনের ওপর, তোমরা কোয়ারেন্টিনে চলে যাও। চৌদ্দ দিনের আইসোলেশনের পর যদি সুস্থ থাকো তবেই কথাবার্তা হবে, নতুবা এ-ই শেষ। আল বিদা।

তারপর চুমকির সামনে করোনাভাইরাস কত ভয়ংকর রোগ, শ্বাসকষ্টে কেমন দুঃসহ মৃত্যু ঘটে তার একটি বর্ণনা দিল। ভয়ংকর এক ধমক দিল আমাকে, সাবধান, রুম থেকে বের হবে না, তুমি অনেক অশান্তি আমাকে দিয়েছ, দয়া করে এইবার মা আর সিমকির কাছ থেকে করোনাভাইরাস এনে আমাকে দিয়ো না।

চুমকি তার স্বামীকে বলল, যেভাবেই হোক ভিঞ্চিকে বাঁচাতে হবে, একটা ট্যাক্সি ক্যাব ডাকো, আমরা আবার চুয়াডাঙ্গা চলে যাব। সব নষ্টের মূল হচ্ছে আমার মা। কী দরকার ছিল ওই ঘাটের মড়াটাকে দেখতে যাওয়ার?

রইস আহমেদ বললেন, লকডাউন মানে বোঝো? প্লেন যেমন বন্ধ, ট্যাক্সি ক্যাবও। তা ছাড়া কাল দেখোনি টিভিতে—রাস্তায় বের হলে পুলিশ কান ধরে উঠবস করাচ্ছে।

হঠাৎ আমাদেরটা ভয়ংকর ভূতুড়ে একটি ফ্ল্যাট হয়ে উঠল। টোকা দিলে শুধু চুমকি আর ভিঞ্চির জন্য আমাদের রুমের দরজা খোলা হয়, দুজন আমাদের বাথরুম শেয়ার করে।

চুমকি যখনই ঢোকে তখনই একটা না একটা মৃত্যুসংবাদ দেয়। ইতালির মিলানে মারা গেছে রইসের বড় মামা বেদার উদ্দিন আহমেদ, নিউ ইয়র্কে রুমকির বান্ধবীর বড় বোন নিশি আপু ও তার খালাশাশুড়ি ইডেন কলেজের কেমিস্ট্রির রিটায়ার্ড প্রফেসর মেরিনা আবদুল্লাহ।

আমার শাশুড়ি মিসেস মোবারক আলী রুমকির আরোপিত দুই সপ্তাহের কোয়ারেন্টিন কাটিয়ে শখানেক টাকা হাতে নিয়ে রিকশায় অলিগলি দিয়ে তাঁর বড় বোনকে দেখতে রায়েরবাজার সনাতনগড় এলেন। এই বোন তাঁকে কোলেও নিয়েছেন। তিনি জানেন লকডাউনের কালে বাসা থেকে বের হতে নেই, কথাবার্তা ফোনে সেরে নিলেই হয়। তাঁর দিক থেকে সমস্যা নেই। তিনি কথা ভালোই শোনেন। মাঝখানে একটা সময় যে কথা অন্য কেউ শুনত না তিনি তা-ও শুনতেন। এর নাম অডিটরি হ্যালুসিনেশন। মোবারক সাহেব প্রায়ই তাঁকে একথা-সেকথা জিজ্ঞেস করতেন। একদিন জিজ্ঞেস করলেন, রানু, তোমার ম্যারেজ ডে কোনটা—২৫ মার্চ, না ১৬ ডিসেম্বর?

তিনি জবাব দিতেন, দুটার একটাও না। আপনি ইতিহাস পড়াতেন বলে শুধু ঐতিহাসিক তারিখগুলোই মনে রেখেছেন।

মোবারক সাহেব আবার বলতেন, তাহলে কি ১৪ আগস্ট?

সে তো পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। তখন আমরা ছিলাম পূর্ব পাকিস্তান। এটাও কিন্তু ঐতিহাসিক তারিখ।

মোবারক সাহেব বললেন, তাহলে তোমার ম্যারেজ ডে কোনটা?

রানু (আমি যে কজন রানু ডাকনামের নারীকে চিনি তাদের পুরো নাম আনোয়ারা খাতুন, আনোয়ারা খানম কিংবা আনোয়ারা বেগম), মানে মিসেস মোবারক রুমকির মায়ের আসল নাম মরিয়ম বেগম। তিনি অনেকক্ষণ ধরে নিজের বিয়ের তারিখটা মনে করতে চেষ্টা করলেন। পারলেন না। কিন্তু স্বামীকে একটা জবাব তো দিতে হবে। একটু চুপ থেকে বললেন, আপনার আর আমার ম্যারেজ ডে একই। আপনারটা মনে করুন, ওটাই আমার।

আরেক দিন মোবারক সাহেব খুব কাছে এসে কানে কানে বললেন—রানু, বাচ্চারা কি সব ঘুমিয়ে পড়েছে? তিনি বললেন, সিমকিটা ভীষণ জ্বালাচ্ছে। কখন ঘুমাবে কে জানে। তিনি বললেন, এই বাচ্চাগুলোর কারণেই তোমাকে কখনো প্রাণভরে দেখতে পারিনি। আজ আমার কী যে ইচ্ছা করছিল।

প্রথম দিককার একটি দুষ্টুমি তার মনে হলো। তখন বলতেন, বরফের টুকরা দিয়ে দুই মিনিট ঘষে নাও, ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।

অথচ আশ্চর্য, মোবারক সাহেব নেই কত বছর হয়ে গেল।

কেউ কেউ বলেছিল রানুর দিন শেষ। এটা সিজোফ্রেনিয়া, চিকিৎসা নেই। এখন মোবারক ভাইয়ের গলা শোনেন আর দুই দিন পর সারাক্ষণ শিয়াল-কুকুরের ডাক শুনবেন। ব্যাধিটা দুরারোগ্য।

কিন্তু রানু সেরে উঠেছেন। আজগুবি শব্দ কানে আর ঢোকে না।

কিন্তু তাঁর বোনের কানে কোনো শব্দই ঢোকে না, কাজেই ফোনের দোহাই দিয়ে লাভ কী?

যে বোন তাঁকে কোলে নিয়ে লালন-পালন করেছেন কোন ছাতার ভাইরাসের কারণে বোনকে অস্বীকার করবেন?

তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে দোতলা পর্যন্ত উঠলেন। লিফট নেই, থাকলেও লিফট টেপাটিপি তিনি ভালো বোঝেনও না। নিজেদের বিল্ডিং ৬ টিপতে গিয়ে ৯ টিপেছেন। ওপরে উঠে থ। এ কোথায় এলেন! তাঁর ঘরের দরজার ওপরের দিকে মক্কা শরিফের ছবি। এখানে ওপরটা খালি, ছবিটা কে খুলল?

তবু তিনি কলিং বেল টিপলেন।

কি হোল দিয়ে কেউ একজন উঁকি দিয়ে থাকবে। ঝাঁজালো গলায় ভেতর থেকে বলল, বদমাশ দারোয়ানগুলোই চুরির সঙ্গে জড়িত থাকে—এটা কি ভিক্ষুক না বুয়া না চোর, কেমন করে জানব?

তিনিই বললেন, আমি কোথায়? এটা কয় তলা? তোরা কোথায়।

উল্টো দিকের অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খুলে এক ভদ্রমহিলা বের হতে তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কয় তলা? আমার ফ্ল্যাট কোনটা?

সেই ভদ্রমহিলা তেজগাঁও কলেজের বোটানির লেকচারার, বললেন—খালাম্মা, আমি আপনাকে চিনি। আপনি বেশি ওপরে চলে এসেছেন। আমি পৌঁছে দিচ্ছি, আসুন।

বোনের বাসায় কলিং বেল টিপলেন। ভেতরে কোনো শব্দ হয়েছে বলে তাঁর মনে হয়নি। আরো কয়েকবার টিপে এবার দরজায় কয়েকবার আঘাত করলেন।

তাঁর বোনের ছোট মেয়েটা পিংকি একটুখানি দরজা খুলে তাঁকে জিজ্ঞেস করে, কী চাই?

তিনি বললেন, কী চাই মানে? আন্ধা নাকি? চোখে দেখিস না—আমি তোর রানু খালা।

জি রানু খালা, আই অ্যাম স্যরি, আপনাকে ঘরে ঢুকতে দিতে পারছি না। নিষেধ আছে। আপনার মাস্ক কোথায়? আমার খুব ভালো জানা আছে, বুড়ো আত্মীয়-স্বজন পৃথিবীতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। রানু খালা আপনার কোনো ধারণা নেই, হাউ ড্রেডফুল দিস ভাইরাস ইজ। সিভিলাইজেশন ধ্বংস করে ফেলবে।

রানু এবার কাতর হয়ে বললেন, কী বলিস এসব? তোর মাকে একনজর দেখে চলে যাব।

পিংকি বলল, নো ওয়ে। নিষেধ মানে নিষেধ। আপনি ক্যারিয়ার হিসেবে যে ভাইরাস নিয়ে এসেছেন তা সবার আগে আমাদের মাকে সংক্রমণ করবে। তাঁর কিডনির অবস্থা খারাপ। তার মানে আপনি আপনার ভাইরাস ছড়িয়ে আপনার বড় বোনের মৃত্যুটা নিশ্চিত করতে চাচ্ছেন। তাঁর কী অপরাধ?

তিনি আবার বললেন, কী বলছিস এসব? আমি তো তোর কথার আগামাথা কিছু বুঝছি না।

পিংকি বলল, আমি বোঝাতে চাচ্ছি আমার মায়ের অপরাধ একটাই—তিনি আপনাকে কোলে নিয়েছেন। সুতরাং আপনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চায়নিজ ভাইরাস দিয়ে এর প্রতিশোধ নেবেন। এ জন্যই বলা হয়, উপকারীকে বাঘে খায়।

মিসেস মোবারক ওরফে পিংকিদের রানু খালা কাতর হয়ে বললেন, আমার কথা শোন, এখন আমার প্রস্রাবের চাপ বেশি, শুধু বাথরুমে যাব আর আসব।

পিংকি বলল, গ্রাউন্ড ফ্লোরে গার্ডদের একটা টয়লেট আছে, ওটাতে যান। তারপর রিকশা করে আপনার ভাইরাস সঙ্গে নিয়ে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে চলে যান।

তার পরই দরজা বন্ধ করার শব্দ।

তিনি চোখ মুছতে মুছতে নিচে নেমে এলেন। বাথরুমে যেতে চাইলেন। দারোয়ান বলল, ভেতরে লোক আছে। তিনি অনেকক্ষণ হেঁটে তারপর একটা রিকশা পেলেন। বাসায় ঠিকমতোই এলেন। বাথরুম থেকে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে এসে বললেন, বড়বুর ছোট মেয়েটা পাগল হয়ে গেছে। আল্লাহ, তুমি পিংকিকে হেফাজত করো। আল্লাহ মেয়েটা ভালো, আমি কিছু মনে করিনি। আমি কিচ্ছু মনে করিনি।

তিনি যে অপমানিত হয়ে ফিরে এসেছেন এ কথাটা বলতে পারছিলেন না, কিন্তু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন।

রুমকি বলল—মা, আমি যা জিজ্ঞেস করব সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলে জবাব দেবে, প্যাঁচ দিয়ে কোনো কথা বলবে না। এখন বলো, পিংকি তোমাকে ঘরে ঢুকতে দিয়েছে না দেয়নি?

তিনি কথা ঘুরিয়ে বলতে শুরু করলেন, আমার মনে হয় পিংকির মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে। আহা রে, মেয়েটা কত মিষ্টি করে খালা খালা করত!

এবার তির্যকভাবে রুমকি বলল—মা, তোমার জন্য আর কোনো প্রশ্ন নেই। পিংকি ঠিক কাজটি করেছে। সে সচেতন নাগরিক, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করছে। শোনো মা, তুমি এককথায় জবাব দাও, তোমাকে যে তোমার বোনের বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, এতে তুমি অপমানিত হয়েছ, নাকি হওনি?

তিনি বললেন, ছেলে-মেয়ে, ভাগে-ভাগ্নি, ভাস্তে-ভাস্তি—এরা তো ভুল করতেই পারে, তাই বলে আমি তাদের ছেড়ে দেব নাকি?

হঠাৎ হাজির হয়ে আধেক শুনে আধেক না শুনে রুমকি বলল, তোমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়ে পিংকির নিজের হাতে ভালো করে স্যনিটাইজার মাখানো উচিত ছিল।

উপসংহার টেনে দিল রুমকি, বেশ মা, তোমার যদি কাউকে দেখতে ইচ্ছা করে যেতে পারো, কিন্তু এ বাসায় আর ঢুকতে পারবে না। তোমার জন্য এ দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ।

সে রাতে মিসেস মোবারক পানি ছাড়া কিছু খাননি, শুধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছেন।

লকডাউনের কালে একদিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কলিং বেল বাজার পর দরজা খুলে অবাক হতে হয়—রাহুলের স্ত্রী প্রায় তিন বছর পর এই অ্যাপার্টমেন্টের দরজায়। দরজা খুলতেই সে চেঁচিয়ে ওঠে, রাহুলের মা কোথায়?

সে ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং চিৎকার করে মিসেস মোবারককে বলে, হারামজাদি, তোর চরিত্র খারাপ, এই জন্য তোর ছেলে একটা বদমাশ হয়েছে। টেলিভিশন খুলে তোর ছেলে আর নতুন বউমাকে দেখ, দুটোকেই গরম ডিম ঢোকাচ্ছে। বুঝলি, পেছন দিয়ে। তারপর দ্রুত সে বেরিয়ে যায়।

স্বল্প ব্যবহৃত টিভির সুইচ অন করে সিমকি!

স্ক্রলে দেখাচ্ছে, ডাক্তার দম্পতির করোনা বাণিজ্য।

রাহুলকে নিয়ে এমনই বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো যে তার মা মিসেস মোবারক বললেন, আল্লাহ আমার চোখ অন্ধ করে দাও, আমি মরার আগে এসব আর দেখতে চাই না।

পুলিশ যখন হাতকড়া পরিয়ে তাকে একঝাঁক টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে হাজির করল, সে চিৎকার করে রাজনীতিবিদদের মতো বলতে শুরু করল, ষড়যন্ত্র, সবই ষড়যন্ত্র। জনপ্রিয় সরকারের সব সাফল্য ম্লান করে দেওয়ার জন্য একটি বিরোধী চক্র আমার ওপর কালিমা লেপন করতে ষড়যন্ত্রের জাল পেতেছে।

পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর আরেকটি দলের হাতে গ্রেপ্তার ডাক্তার রূপসা বললেন, আমি নিজে থেকে কিছু করিনি। ডাক্তার রাহুলের নির্দেশে কাজ করেছি। করোনা শনাক্ত করার জন্য সুস্থ-অসুস্থ মানুষের নাক থেকে যে সোয়াব সংগ্রহ করা হতো সে তালিকার কোনোটার পাশে কভিড-১৯ পজিটিভ, কোনোটার পাশে কভিড-১৯ নেগেটিভ ডাক্তার রাহুলই লিখে দিতেন, আমি সেই তালিকা ধরে নাম মুদ্রিত সার্টিফিকেট তাঁর নির্দেশমতো পজিটিভ বা নেগেটিভ লিখে সই করতাম। আমি এর বেশি কিছু জানি না।

রাহুলকে ডাক্তার বলায় আমরাও অবাক হই,  ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিএসসি থার্ড ক্লাস মোবাশ্বের আলী রাহুল ডাক্তার হলো কেমন করে?

রিপোর্টারও এক পর্যায়ে বললেন, ঘনিষ্ঠ সূত্র থেকে জানা গেছে, সরকারের একজন সিনিয়র সচিবের আত্মীয়কে বিয়ে করে মোবাশ্বের আলী রাহুল তাকে প্যাট্রন হিসেবে ব্যবহার করে অবিশ্বাস্য সব জালিয়াতি করে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত কতসংখ্যক মানুষ কভিড সার্টিফিকেট প্রতারণার শিকার হয়েছে, তা বলা সম্ভব হচ্ছে না, তবে তা দুই লাখের কম নয় বলে অনুমান করা হয়েছে।

টিভি স্ক্রিনে ভাগাভাগি করে একবার রাহুলকে, একবার ডাক্তার রূপসাকে দেখাচ্ছে।

রাহুল বুলগেরিয়া থেকে ডাক্তারি পাস করেছে, কিন্তু সে বুলগেরিয়ায় কখনো গেছে কি না সন্দেহ আছে।

ততক্ষণ ডাক্তার রূপসা মুক্তই ছিল। পুলিশের কোনো এক আকস্মিক সিদ্ধান্তে দুজন মহিলা পুলিশ যখন তাকে হাতকড়া পরায় সে চেঁচিয়ে ওঠে, আরে আরে কী করছ? আমাকে কেন?

কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই উত্ফুল্ল জনতা করতালি দিয়ে তার হাতকড়ার অনুমোদন দিল। তারপর দুজনকেই যখন প্রিজন ভ্যানের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, রূপসা তার সিইও মোবাশ্বের আলী রাহুলকে লাথি মারতে চেষ্টা করল, পা বড়জোর স্পর্শ করে থাকতে পারে, লাথিটি জমেনি। রূপসা চেঁচিয়ে তাকে বলল, আমার টাকা পাই পাই করে বুঝিয়ে দিবি, না হলে তোর খবর আছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের ক্লিনিকে তালা ঝুলল। সাংবাদিকরা ছুটলেন সদ্যোধৃত আসামিদের বাড়িতে।

ইংরেজির অধ্যাপক সৈয়দ মুহাম্মদ ফাইয়াজ বললেন, রূপসা আমার দুটি সন্তানের জননী। সুতরাং তাঁর সম্পর্কে আমার পক্ষে খারাপ কিছু বলা সম্ভব নয়। আমি তাঁকে ডিভোর্স করিনি, তিনিও আমাকে করেননি; তবে এটা সত্য, আমাদের মধ্যে সমঝোতার ঘাটতি ছিল। হয়তো তা আমারই দোষ।

আপনার স্ত্রী মোবাশ্বের আলী রাহুলকে বিয়ে করেছেন, আপনার কি তা জানা আছে?

অনেক কথাই আমার কানে এসেছে। একজন বড় সরকারি কর্তার সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ভিডিও কেউ আমাকে পাঠিয়েছেন। একজন কিডনি স্পেশালিস্টের স্ত্রীও আমাকে ফোন করে বলেছেন, আপনার স্ত্রীর কারণে আমার সংসারটা ভেঙে যাচ্ছে। আমাদের সবার বয়সই আঠারো বছরের চেয়ে বেশি, ব্যক্তিগত বিবেচনাশক্তি প্রয়োগ করার অধিকার সবারই আছে। ডাক্তার রূপসাও হয়তো তা-ই করেছেন। তবে তাঁর অনৈতিক কোনো কাজের সঙ্গে আমি এবং আমাদের দুই সন্তান জড়িত নই।

সাংবাদিকের পরের প্রশ্ন, আপনি কি ডাক্তার রূপসার মুক্তির জন্য উকিল নিয়োগ করবেন?

আমি অবশ্যই তা করতে চাই। কিন্তু যে মানের উকিল নিয়োগ আমার সামর্থ্যের মধ্যে তার চেয়ে বড় মানের উকিলদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল, হয়তো তাঁরা নিজে থেকেই এগিয়ে আসবেন।

আপনার সন্তানদের প্রতিক্রিয়া কী?

তারা ঘটনাটি এখনো জানে না, আর জানলেও প্রতিক্রিয়া জানানোর মতো বয়সে তারা পৌঁছেনি।

আপনি কি ফের বিয়ের কথা ভাবছেন?

দেখুন, এই মুহূর্তে এটি অবান্তর প্রশ্ন।

এবার ডাক্তার রূপসাকে প্রশ্ন করা হলো, এটা কি সত্য, আপনার স্বামী প্রকৃতপক্ষে ডাক্তার নন? তাঁর সার্টিফিকেট নেই।

আমি জানি তাঁর এমবিবিএস সার্টিফিকেট, বিএমডিসি সার্টিফিকেট এবং ইনফেকশাস ডিজিজের কোর্স করার সার্টিফিকেট আছে, কিন্তু সেগুলো ভুয়া কি না, আমি জানি না। তবে তাঁর সঙ্গে কথা বলে আমার কখনো মনে হয়নি তিনি ডাক্তার নন। ইনফেকশাস ডিজিজ নিয়ে তিনি অনেক জানেন, এ নিয়ে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বক্তব্য দিয়েছেন, স্বাস্থ্যসচিব ও স্বাস্থ্যের ডিজির সঙ্গে টক শো করেছেন।

আপনাদের নিজেদের বিরোধের কারণ কী?

বললাম তো, আমাকে ঠকাচ্ছিলেন। আমাকে সপ্তাহে পাঁচ দিন এক বেলা কাজের বদলে এক লাখ টাকা বেতন আর করোনা স্ক্রিনিং ব্যবসার লাভের ত্রিশ পার্সেন্ট দেওয়ার কথা। গত কয়েক মাসে আমি তাঁর কাছ থেকে মোট কুড়ি হাজার টাকার বেশি পাইনি।

কিন্তু আপনি তো এটা মেনেই নিচ্ছিলেন, আজ হঠাৎ কী হলো? রূপসা বললেন, আমার আরো এক ঘণ্টা পর আসার কথা ছিল, কিন্তু আগে এসে দেখি রাহুল আমাদের বেশ্যা টাইপের একটা ফিল্ড এজেন্টের ব্লাউজ খুলে ফেলেছেন। তাই মাথায় রক্ত উঠে গেল।

আপনারা কবে বিয়ে করেছেন?

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে, যখন উহানে প্রথম করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। ব্যাপারটা কাকতালীয় বলতে পারেন।

ওদিকে রাহুলের অবস্থা দেখে মনে হয়েছে বেদম মার খেয়েছেন। তবে পুলিশের নয়। পুলিশ সাধারণত শরীরের দৃশ্যমান অংশে নির্যাতন চালায় না।

সাংবাদিক বললেন, আপনার স্ত্রী ডাক্তার রূপসা বলেছেন, আপনি একজন প্রতারক।

হাতকড়া বাঁধা হাত, মাস্ক থুতনি বেয়ে গলায় নেমেছে, ঘুষির আঘাতে একটা চোখ কালচে, রাহুল বলল, রূপসা আমার স্ত্রী নন। তিনি যদি দাবি করে থাকেন, তাঁকে প্রমাণ দেখাতে বলুন। আমি চ্যালেঞ্জ করতে পারি, বিয়ের সনদ কাবিন দেখানোর সাধ্য তাঁর নেই। যদি দেখানও, তা হবে ভুয়া কাবিন। তা ছাড়া তিনি এই সংস্থাটির চেয়ারম্যান, আমি মানবিক কারণে মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকায় সিইওর কাজ করতে রাজি হয়েছি, অথচ এখানে সিস্টেম অ্যানালিস্টের বেতন ধরা আছে নব্বই হাজার টাকা। পরক্ষণেই বিয়ের প্রশ্ন নিয়ে রূপসাকে স্ক্রিনে আনা হলে তিনি বলেন, যদি কাবিনের কাজি, কাবিনের সই ভুয়া হয়ে থাকে তাহলে বুঝতে হবে, তাঁর এমবিবিএস নিয়ে আমার যে সন্দেহ, সেটাও মিথ্যা নয়।

আপনি কি তাঁকে তালাক দেওয়ার কথা ভাবছেন?

না, কখনোই ভাবিনি। এত দিন ভাবার কোনো কারণ ছিল না।

ততক্ষণে পুলিশের একটি দল এবং কয়েকটি টেলিভিশনের প্রতিনিধি আমাদের ভবনে হাজির। রাহুলের অ্যাপার্টমেন্ট সার্চ করবে, লুবনাকে জিজ্ঞাসাবাদও করবে। রাহুলের স্ত্রীর সঙ্গে তার শাশুড়ি না ননদের সম্পর্ক খারাপ থাকতে পারে, কিন্তু রুমকির স্বামী চাকলাদার রইস আহমেদ মনে করলেন, এই দুঃসময়ে লুবনার পাশে দাঁড়ানো উচিত। তিনি রুমকির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ওপরে চলে গেলেন এবং আক্ষরিক অর্থে লুবনার পাশে দাঁড়ালেন।

পুলিশ পুরো অ্যাপার্টমেন্ট সার্চ করে নেওয়ার মতো একটুকরা কাগজ পেল না, তবে তার বহুদিনের পুরনো একটি ল্যাপটপ নিয়ে গেল। যে ল্যাপটপ সে ব্যবহার করে, সেটি কাঁধে ঝুলিয়ে সঙ্গে নিয়েই বেরোয়।

লুবনা খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলল, তার স্বামীর সঙ্গে তার অত্যন্ত চমৎকার সম্পর্ক। বেশ্যা প্রকৃতির মেয়েরা শুধু তার স্বামী কেন, যেকোনো মুনিঋষিকেও সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত করতে পারে। ডাক্তার রূপসাকে তার স্বামী বিয়ে করেছেন, এটা সে বিশ্বাস করে না।

ওপরতলার অ্যাপার্টমেন্টের ঘটনা আমরা টেলিভিশনে নিচতলায় লাইভ দেখছি। লুবনা বলল, আমার স্বামী কখনোই ডাক্তার ছিলেন না, তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর পড়াশোনা আছে। আমি মনে করি, রাহুল ডাক্তার রূপসার সাজানো ষড়যন্ত্রের শিকার।

টিভি সাংবাদিক লাইভ বিবরণ দিচ্ছিলেন : এই দম্পতি দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ এবং জালিয়াতি ও ধোঁকাবাজির কাজ করে আসছিলেন। তাঁরা নামে মাত্র একটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করে একটি কথিত বিদেশি এনজিওর একজন সিইও (রাহুল) এবং একজন চেয়ারম্যান (রূপসা) হিসেবে নিজেদের পরিচিত করিয়ে আসছিলেন। জানা গেছে, টাকা-পয়সার ভাগাভাগি নিয়ে গোলযোগ থেকেই ডা. রূপসা স্বামীকে ঠকবাজ, লম্পট ইত্যাদি গালাগাল দিতে থাকলে তাঁদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। ডাক্তার রূপসা মূলত রাহুলকে শিক্ষা দেওয়ার জন্যই তাঁদের সম্মিলিত প্রতারণার বিষয়টি ফাঁস করে দেন। কভিড টেস্টের জন্য রোগী ও সন্দেহভাজন রোগীদের সামনে গিয়ে চিৎকার করে বলেন, এখানে আসলে কোনো টেস্ট করানো হয় না, মিথ্যা রিপোর্ট দেওয়া হয় আর মোবাশ্বের আলী রাহুল একা সব টাকা আত্মসাৎ করেন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য চিৎকার শুরু হয়ে যায়। সেখানে উপস্থিত রোগী জোগানোর দালালরা দ্রুত পালিয়ে যায়। উৎসাহী কয়েকজন দোতলায় উঠে রাহুলকে ভেতরে রেখে তালা লাগিয়ে দেয়। পাশের কম্পিউটার রুমে দুজন নারী এবং একজন পুরুষ অপারেটরও রুমবন্দি হয়ে পড়েন। ভাঙচুর শুরু হয়। উৎসাহী লুটেরাদের দুজন ধরাধরি করে একটি মাইক্রোওয়েভ ওভেন নামিয়ে ফেলে। দুজনকে একটি ফ্রিজ টানতে দেখা যায়।

পুলিশ ও সাংবাদিক একসঙ্গেই আছে, তাদের ধাওয়া করছে, ছবি তুলছে।

সম্ভবত ততক্ষণে ডাক্তার রূপসার সংবিৎ ফেরে। রূপসা বলেন, আমি এই ক্লিনিকের কেউ নই। আমি সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার।

সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেন, আপনি ডাক্তার, কিন্তু মাস্ক পরেননি কেন?

রূপসা তখনই খেয়াল করে মুখে হাত দেন, মাস্ক কোথায়? শাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করা দামি একটা মাস্ক পরেই তো এসেছেন। সম্ভবত হাতাহাতির সময় ছিঁড়ে পড়ে গেছে।

এই প্রশ্নের জবাব না পেয়ে আবার জিজ্ঞেস করেন, গালে এসব কিসের আঁচড়?

এটাও তাঁর চোখে পড়েনি।

বললেন, আয়না দিন তো, দেখি।

বিদেশে যাওয়ার জন্য পিসিআর টেস্ট করাতে এসেছেন এমন একজন নারী তাঁর ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে ছোট গোলাকৃতির একটি আয়না তাঁর হাতে দিলে রূপসা আঁতকে ওঠেন। বলেন, ও মাই গড, বদমাশটা আমার এই অবস্থা করেছে? আমি তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করব।

আপনার স্বামীর সঙ্গে অপরাধমূলক প্রতারণার সঙ্গে আপনিও জড়িত।

আমি আমার হাজব্যান্ডের নির্দেশ মেনে কাজ করেছি। হাজব্যান্ডের আদেশ মানার কথা ধর্মে বলা আছে।

ভাই-বোনের মধ্যে সবচেয়ে স্বার্থপর হিসেবে সবার অপ্রিয়ভাজন হয়ে উঠেছিল রাতুল। নওশের আলী রাতুলের চেহারাটা বাবা মোবারক আলীর মতোই ফরসা, মাথাটার বেশির ভাগই চুলশূন্য। মোবারক আলীকে স্কুলের ছেলেরা বলত স্টেডিয়াম স্যার। রাতুলের টাক আরো বড়, সেকালের পল্টন ময়দানের মতো।

রাহুল যখন জেলে, মিসেস মোবারক আলী ছোট ছেলে রাতুলকে স্বপ্নে দেখল। রাতুল, চুমকি আর রুমকি মাঝখানে। শরিয়ত অনুযায়ী অ্যাপার্টমেন্ট বণ্টনের চাপটা মূলত রাতুলেরই। অবশ্য চাপ না দিলেও তেমন হেরফের হতো এমন নয়। ডেভেলপারের কাছ থেকে পাওয়া সাতটি অ্যাপার্টমেন্টের চারটি রাহুল আর রাতুলের; চুমকি, রুমকি ও সিমকির একটি করে তিনটি।

মোবারক আলী বন্দোবস্ত এভাবেই করেছেন—রানু শুরুতে যেটাতে থাকছিলেন সেটা সিমকির নামে, মায়ের মৃত্যুর পর সে এর পূর্ণ অধিকার পাবে। পরে এটা ভাড়া দিয়ে রুমকির অ্যাপার্টমেন্টে ওঠেন। মোবারক আলী নিজের জন্য পেনশনের টাকায় সন্তুষ্ট। অ্যাপার্টমেন্ট তো আর কবরে নেওয়া যাবে না।

মিসেস মোবারকের স্বপ্নের রাতুলের ভীষণ শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, অক্সিজেন মাস্ক কাজ করছে না, কারণ সিলিন্ডার খালি হয়ে গেছে। অক্সিজেনভর্তি সিলিন্ডার পাওয়ার আর আশা নেই।

তিনি জায়নামাজ বিছিয়ে ছেলের জন্য নামাজ পড়লেন, দোয়া করলেন।

রাতুল এক বিকেলে মা ফাতিমা বালিকা এতিমখানা গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান সুপারিনটেনডেন্ট এবং আরো কয়েকজন সম্মানিত মানুষকে তিনতলায় তার দুই অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে এবং তাঁদের হাতে চাবি বুঝিয়ে দিল। মালিকানা হস্তান্তর দলিলে আগেই সই করেছে। দুই অ্যাপার্টমেন্টের মালিক মা ফাতিমা বালিকা এতিমখানা। এখন থেকে ভাড়াটা সরাসরি তাদের কাছে যাবে। হস্তান্তর করে রাতুল নিঃস্ব হয়, তার একুশ দিনের মধ্যে দেশের ক্ষমতাধর একজন নেতাকে গুলি করলে তিনি লুটিয়ে পড়েন। পুলিশের ভাষ্য, তাদের ফাঁকি দিয়ে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী রাতুল এমিরেটস এয়ারের উড়োজাহাজে সেদিনই মধ্যরাতের কিছু আগে দেশ ত্যাগ করে। নেতার মৃত্যু হয়। রাতুলসহ তিন আসামির অনুপস্থিতিতে বিচারে রাতুলের মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য দুজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।

রাতুলের খোঁজে নিয়মিত পুলিশ আসত এবং তাদের বলে যায়, ইউ আর আন্ডার ওয়াচ।

তৃতীয়বার সর্বশেষ ফোন আসে প্যালেস্টাইন থেকে। প্রথমবার সিরিয়া থেকে, শুধু একটি বাক্যই মিসেস মোবারক শুনেছেন, মা, এটা ধর্মযুদ্ধ—বাঁচলে লাভ, মরলে আরো বেশি লাভ। আর এবার করোনা-চেতনা সৃষ্টি হওয়ার সময় আরবি-ইংরেজি মেশানো একটি বার্তা তিনি শোনেন, যার অনুবাদ হয়তো এমন : আল্লাহর রহমতে আপনার পুত্রের মনোবাসনা পূর্ণ হয়েছে। তিনি গাজা রণাঙ্গনে একে-৪৭ রাইফেল হাতে নিয়ে লড়াই করতে করতে আল্লাহর রাহে জীবন কোরবান দিয়েছেন। আপনি অতিশয় ভাগ্যবতী জননী। আপনি আপনার দুধের দাবি থেকে এই জিহাদি যোদ্ধাকে অব্যাহতি দিন। তিনিও কথা দিয়েছেন, আল্লাহ যদি তাঁর জন্য বেহেশত মঞ্জুর করেন আপনার জন্য বেহেশত কবুল না হওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানে প্রবেশ করবেন না।

মিসেস মোবারক আলী এই সংবাদে তেমন বিচলিত হননি। বরং বলেছেন, দেশে থাকলে ফাঁসিতে ঝুলত, বিদেশে থাকায় গুলিতে মরেছে। বেঁচে থাকলে দেশে-বিদেশে যেখানেই থাকুক আমার রাতুল বার্ধক্যের কারণেই মারা যেত। সবচেয়ে ভালো মৃত্যুটাই তার হয়েছে, আমি কাঁদব কোন দুঃখে। কিন্তু অক্সিজেনশূন্য সিলিন্ডার এবং রাতুলের শ্বাসকষ্ট তাকে কিছুটা কাঁদিয়েছে। মেয়েরা তাঁর কান্নাকাটি পছন্দ করে না। সুতরাং খুব বেশি কান্না এলে বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন।

সেদিন সম্ভবত খুব বেশি কান্না পেয়েছিল। বাথরুমের দরজা বন্ধ করার ঘণ্টা দেড়েক পরও বেরিয়ে না আসায় সিমকি ডাকাডাকি করে। কোনো সাড়া না পাওয়ায় আমাকে ফোন করে। আমি অফিসের বাইক নিয়ে আধাঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসি। দরজা ভাঙতেই হয়। তিনি দরজার উল্টো দিকে মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন। রুমকি আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করি। রুমকির কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, যেন এটা যে হবে সে জানতই।

কেয়ারটেকার কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করল।

চুমকি, ভিঞ্চি ও তাদের পরিবারপ্রধান চাকলাদার রইস আহমেদ মিলান ফিরে যাওয়ার জন্য একটি বিশেষ ফ্লাইট পেয়ে গেলেন। ভাড়া দ্বিগুণেরও বেশি। রাত এগারোটা পঞ্চাশে ফ্লাইট। একটি অ্যাম্বুল্যান্স তাঁদের এয়ারপোর্ট নিয়ে যাবে।

বিকেলের দিকে একটি অনলাইন সংবাদ রুমকির চোখে পড়ল : প্রতারক রাহুলের সন্তান ডাক্তার রূপসার গর্ভে। গর্ভাবস্থার বিবরণ দিয়ে রূপসার উকিল জামিনের আবেদন জানান। বিচারক জামিন দেননি, প্রত্যাখ্যানও করেননি। শুনানির পরবর্তী তারিখ ঠিক এক সপ্তাহ পর। তার মানে, ভালো করে শুনানি করতে পারলে জামিন হয়ে যাবে।

রুমকির অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়াটে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, লকডাউনে তার ব্যবসায় লালবাতি জ্বলছে। ঢাকা শহরে টেকা সম্ভব নয়—দুই মাসের নোটিশ দিয়ে ভাড়া বাড়ি ছাড়ার সামর্থ্যও নেই। এটাই তার শেষ মাস।

সিমকি রুমকিকে বলল, মায়ের কারণে তোমরা এত দিন আমাকে সহ্য করেছ। আমি বরং আমার নিজের অ্যাপার্টমেন্টেই উঠি।

রুমকি এমনভাবে বলল, যার মানে দাঁড়ায়, তুই এত দিন উঠিসনি কেন? তবু যোগ করল, খাওয়াদাওয়া এখানেই করিস।

মিলান থেকে রুমকির কাছে চুমকির ফোন আসে—শোন, একটুও ভাবিস না, সিমকিকে বল, একটা ভালো বাঙালি পাত্র পেয়েছি। সমস্যা একটাই—নোয়াখাইল্যা, বাড়ি চাটখিল।

রুমকি বলে, এটা কোনো সমস্যা নয়, নোয়াখালীতে অনেক ভালো মানুষ আছে।

রুমকি বলল, ফ্র্যাতেল্লি রোসেত্তির মিলান ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। জানিস তো এটা কী? ইতালির খুব পুরনো জুতার কারখানা। ভাগ্যিস আম্মা নেই, শুনলেই তো বলত, আহ্হা আমার সিমকির কপালে শেষ পর্যন্ত একটা মুচি জুটল!

আমাকে ফোন করলেন চাকলাদার রইস আহমেদ। বললেন, ভায়রা ভাই, করোনাভাইরাস ইতালির পাছা মেরে দিয়েছে আর কি। কাজের দক্ষ লোক সব যার যার দেশে চলে গেছে। এখন হাহাকার চলছে। তাহলে একটা ভালো খবর দিই শোনো, আমার চাকরিটা যাই যাই করেও যায়নি। আমার ইন্ডিয়ান শিফট ইনচার্জ বড় বেতনের চাকরিতে যোগ দেওয়ায় আর আমার সিনিয়র একজন মাত্র মালয়েশিয়ান স্টাফ দেশে চলে যাওয়ায় মাসে আরো দুই শ ইউরো বাড়িয়ে আমাকেই শিফট ইনচার্জ করেছে। আরেকটা খারাপ খবর আছে, ভিঞ্চির সেকেন্ড শিফটের অ্যাটেনডেন্ট বিয়াত্রিচে, যে মেয়েটা চুমকির দুচোখের বিষ, করোনায় মারা গেছে। আমি খুবই শকড। ভিঞ্চিকে স্কুল থেকে আনার ইন্সপিরেশনটাই শেষ হয়ে গেল।

এটা সত্যি, রাশেদের সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারটাও তাকে ঝুলিয়ে রেখেছিল। মাস ফুরানোর চার দিন আগেই ভাড়াটে চলে গেল। দুই দিন ধরে ঘর ঝাড়পোঁছ করে রুমকিও চলে গেল। স্থানান্তরে সুবিধার কারণ দুটি অ্যাপার্টমেন্টই একই ফ্লোরে—লেভেল সিক্স। এক মাসের মধ্যে রুমকিদের ইতালি ফিরে যাওয়া, মিসেস মোবারক আলীর মৃত্যু এবং সিমকির নিজের অ্যাপার্টমেন্টে উঠে যাওয়া, রুমকির অ্যাপার্টমেন্টে রয়ে গেলাম শুধু আমিই। অবশ্য রুমকি শুরুতেই বলেছিল, এটাকে ঘরজামাই বলা যায় না। শ্বশুরের তো নয়, মালিকানা রুমকিরই। অস্বস্তি বোধ করার কারণ নেই।

তবু আমি স্বাধীনতা চাই, চলে যাওয়ার কথাই বলি।

সিমকি বলল, মুনতাসির মোস্তফাকে নিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে ১০ তারিখে এসবি অফিসে ডেকেছে। তুমি কি চাও আমি একা এসব ঝামেলার মোকাবেলা করি।

আমাকে মিনমিন করে বলতেই হলো—তা কেন, তুমি চাইলে আমিও সঙ্গে যাব।

দুটি খবর এলো বিকেলের দিকে : সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সচিব করোনার শ্বাসকষ্ট নিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। তিনি রইস আহমেদের পরিচিত। দ্বিতীয় খবরটি হচ্ছে, কাল থেকে সব সিট-ইন রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যাবে। কাল থেকে হাট-বাজার সব বন্ধ। প্রয়োজনে মানুষের ঘর থেকে বেরোনো রুখতে কারফিউ জারি করা হবে।

সেই সন্ধ্যায়ই টেলিভিশনে দেখানো হলো, অপ্রয়োজনে রাস্তায় বেরোনো অন্তত কুড়িজনকে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে কান ধরে উঠবস করানো হচ্ছে। সিমকি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখেছে, এদের মধ্যে কেউ তার পরিচিত কি না। সম্ভবত কাউকে পায়নি।

এ বাসায় থাকতে আসলেই অসুবিধা হচ্ছে। রুমকি অ্যাপার্টমেন্টের মালিক, কাজেই তার বিরক্তি প্রকাশ করার অধিকার রয়েছে। রুমকিকে বলল, তোর অ্যাপার্টমেন্টটা কি না বেচলে চলত না?

রুমকি বলল, এখন হলে বেচতাম না, কিন্তু তখন না বেঁচে কোনো উপায়ই ছিল না। রইস কি একলা নাকি, শেয়ারবাজারে তো আমিও নেমেছিলাম। এই টাকা থেকে কুড়ি লাখ টাকায় কুষ্টিয়া শহরে ছয় কাঠা জায়গা কিনেছিলাম। বাকিটা শেয়ারবাজারই খেয়ে নিয়েছে। তার পরও বলি, রুমকির এই অ্যাপার্টমেন্ট কি দেড় কোটি টাকায় বেচা যাবে? এক কোটি চাইলে কাস্টমার সরে যেতে থাকবে। আর তিন ভাগের এক ভাগ দিয়ে কেনা জমি দেড় কোটি টাকায় ছেড়ে দেওয়ার জন্য কুষ্টিয়ার চেম্বারের ট্রেজারার রইসকে খুব অনুরোধ করেছেন। রইস বলেছেন, দুই কোটির কমে ছাড়বেন না। আরো দু-এক বছর এ অবস্থায় কেটে যাক, দুই কোটির এক পয়সা নিচে হলেও দেবে না। এটা তাদের সুপারমার্কেট তৈরি করার জন্য লাগবে। রইস বলছেন, মিলানের পাট চুটিয়ে দরকার হলে নিজেরাই সুপারমার্কেট করব। সিমকি খোঁচাটা না দিয়ে পারল না—থাক, আশ্বস্ত করলি, তখন নিশ্চয় ঢাকায় এলে র‌্যাডিসন হোটেলে উঠবি।

রইস আহমেদ বললেন, রাখো তোমার র‌্যাডিসন। করোনায় পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষ শেষ হয়ে যাবে, তাতে গণিতের হিসাবেই রুমকি কিংবা চুমকি দুজনের একজন নেই।

অসুবিধা শুধু আমাদের হচ্ছিল তা নয়, চুমকিদেরও। এ মাসেই আকস্মিভাবে রুমকিদের ফ্লোরে বাকি তিন অ্যাপার্টমেন্টের একটি খালি হয়ে গেল। রুমকি বলল, মিলান যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। রইস আহমেদ বিনা পয়সায় থাকার জন্য তাদের আলমডাঙ্গায় পাঠিয়ে দেবে। সেটা ঠেকাতেই বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা বলে রুমকি বাসাটা ভাড়া নিয়ে সেদিনই ঝাড়পোঁছ করে দখল নিল, গ্যারেজে থাকা আমার খাট ও চেয়ার-টেবিল, এবাড়ির বাড়তি তোশক পাশের ফ্ল্যাটে চলে গেল। তবে খাবারের আয়োজনটা এখানেই চলতে থাকে।

সিমকির বিয়ে নিয়ে আলোচনা হঠাৎ থেমে গেছে। আমাকে ডিভোর্স করার নোটিশের ড্রাফট চূড়ান্ত হয়ে আছে। অনেক দিন ধরেই, করোনাভাইরাসের প্রকোপ বাড়ার আগে থেকেই আমি ও রুমকি বিছানায়ও সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স রক্ষা করে চলেছি। এখন তো আরো স্ট্রিক্ট হতে হচ্ছে। আমি দেয়ালের দিকে মুখ করেই ঘুমাই, সকালে ঘুম ভাঙলে দেখি চোখের সামনে দেয়াল। রুমকি দেখে চোখের সামনে জানালা।

আমার জ্বরটা হঠাৎ করেই এলো, বাড়লও খুব দ্রুত। মাঝরাত কি তার পরে আমি কাঁপতে শুরু করলাম। আমার লেপ দরকার। কিন্তু এত রাতে কাকে বলি? রুমকির সঙ্গে এক বিছানায় থাকলেও আমাদের টকিং টার্ম নেই-ই বলা যায়। আমি দেয়ালের দিক থেকে চাদরসহ তোশকটা টেনে নিজেকে এর ভেতর সেঁধিয়ে দিই। কিন্তু তাতে আমাকে বিছানার প্রায় মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে আসতে হয়, তারপর ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমের মধ্যে আমার হাত রুমকির ওপর পড়েছে না রুমকির হাত আমার ওপর—বলতে পারব না, কিন্তু ঘুমটা যখন ভাঙে বুঝতে পারি, আমরা দুজন দুজনকে আঁকড়ে ধরে আছি। তারপর কেমন করে ব্যাপারটা ঘটে গেল।

রুমকি বলল, শরীর এত গরম কেন? করোনাভাইরাস ঢুকেছে? আমাকে আবার ইনফেকটেড করছ না তো?

নীলাভ ডিমলাইটের সুইচ অন করে রুমকি দুটি প্যারাসিটামল বের করে আনে। পানিসহ ট্যাবলেট এগিয়ে দেয়। বলে, আগে টেম্পারেচার কন্ট্রোলে আসুক।

সকালে যখন ঘুম ভাঙে, অনেক অনেক দিন পর আবিষ্কার করি আমরা মুখোমুখি শুয়ে আছি।

আট.

চৌদ্দ দিন পর সিমকি এবং তার মা আইসোলেশন থেকে মুক্ত হয়। ডায়ানার বাবা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরতে পারেননি। সরকারের পিপিই পরা লোকজন তাঁকে খিলগাঁওয়ের কোনো একটি কবরস্থানে সমাহিত করেছে।

সিমকি কোয়ারেন্টিনমুক্ত হওয়ার তিন কি চার দিন পর ছোট মামি হাফসা মাস্ক ও গ্লাভস পরে বাসায় এসে সবাইকে শুনিয়েই বলে, আল্লাহর রহমতের শেষ নেই। যদি এই ভাইরাসটার কারণে লকডাউন না থাকত, সিমকি তোর অনেক ভোগান্তি হতো। ভাগ্যিস এয়ারপোর্ট বন্ধ। বুঝলি, রাশেদের কথায় আমার খুব সন্দেহ হচ্ছিল, এ জন্য কদিন ধরে পটিয়ে পটিয়ে বের করলাম তার একটা বউ আছে, নাম পেনিলোপ ক্রুজ। আমি মুখের ওপর বলে দিয়েছি, থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ, নো ফারদার টক। সিমকিকে তোমার মতো বদমাশের কাছে বিয়ে দেব না।

সে রাতেই ছোট মামা ফোন করে বললেন, অ্যাকচুয়ালি হাফসা নিজেই প্রতারিত বোধ করে অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করেছে। যাক বাবা, তবু ভালো। আমি বউ আর ভাগ্নি দুই-ই হারাতাম।

 

নয়.

২৫ মে ঈদুল ফিতরের সকালে রুমকি বলল, দিলে তো আমাকে ফাঁসিয়ে। আমি এখন কোনটা সামলাব— প্রেগন্যান্সি, না ডিভোর্স?

টোয়েন্টি টোয়েন্টির করোনাভাইরাস সংক্রমণকালের লকডাউনে শেষ পর্যন্ত আমি ও রুমকি সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স বজায় রাখতে পারিনি। এর মধ্যে কোরবানির ঈদও এসে গেছে, আগস্টের প্রথম দিন। একেকবার বমি হলেই রুমকি বলছে, তোমার জন্যই আমার এই অবস্থা, আমি তোমাকে ছাড়ব না।

এই কোয়ারেন্টিনে আমরা একটি বাবুর জন্মের অপেক্ষায় ছিলাম, আমাদের প্রথম বাবু। বাবুটার কারণে আমাদের অনিবার্য তালাক অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে গেছে।



সাতদিনের সেরা