kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

♦ ভ্র ম ণ
♦ আক্রা নগরীর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস

বিত্তশালীর উদ্যানশোভিত ভিলা

মঈনুস সুলতান

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ২৭ মিনিটে



বিত্তশালীর উদ্যানশোভিত ভিলা

ইউনিভার্সিটি অব ঘানার দালানকোঠা। ছবি : লেখক

ঘানা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ড্রাইভ করতে করতে ফ্রেড বিলেতি কেতায় চাঁদিতে ঘড়ি লাগানো দালানটির কাছে একটু থেমে তারপর ঢুকে পড়েন সংলগ্ন বোটানিক্যাল গার্ডেনের পিচঢালা সড়কে। রাস্তাটির এক পাশে লতানো উদ্ভিদকে বাঁকিয়ে টোপিয়ারি পদ্ধতিতে তৈরি দীর্ঘ সবুজ ফেন্স। প্যাসেঞ্জারস সিটে বসে ভাবি, আক্রা নগরীতে ফ্রেড তার হাই স্কুল সুইটহার্টের তালাশ পেয়েছেন, দিস ইজ হাইলি ইন্টারেস্টিং!

ঘানার রাজধানী আক্রায় এসে বছর কয়েক পর ফের যোগাযোগ হলো ফ্রেডের সঙ্গে। ২০০৯ সালের দিকে আমরা কাবুল শহরে মাস কয়েক পাশাপাশি কামরায় বাস করেছিলাম।

বিজ্ঞাপন

আমি হাইয়ার এডুকেশন প্রজেক্টের তরফে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ অ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করছিলাম। আমার সিনিয়র সহকর্মী ড. ফ্রেড শ্যাংম্যানের দায়িত্ব ছিল কারিকুলাম উন্নয়নের সহায়তা দেওয়া। বছর চারেক আগে তাঁর স্ত্রী তাঁকে ডিভোর্স দিয়েছেন। একাকিত্ব প্রকট হয়ে উঠলে ফ্রেড ফেসবুক বিচরে তাঁর হাই স্কুল জীবনের সুইটহার্ট ট্রুডিকে লোকেট করেছেন আক্রায়। সত্তরের দশকের প্রথম দিকে ফ্রেড ও ট্রুডির পরিবার কূটনৈতিক পেশার কারণে বছর দুয়েক বাস করেছিল আক্রায়। এখানকার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে সতীর্থ থাকা অবস্থায় তাঁরা পরস্পরকে ভালোবাসেন এবং বছর দেড়েক ডেট করেন। বর্তমানে বিধবা ট্রুডি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রিন্সিপাল হিসেবে আক্রায় কর্মরত। ফ্রেডের তালাশ পেয়ে তিনি তাঁকে লিভ টুগেদার করতে ইনভাইট করেছেন।

আক্রায় ল্যান্ড করে ফ্রেডের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ হলে তিনি তাঁর আক্রাবাসের প্রেক্ষাপট হিসেবে আমাকে এসব ব্যক্তিগত তথ্য দেন। শুনে আমি ট্রুডিকে চাক্ষুষ করার বাসনা ব্যক্ত করি। তাঁর সঙ্গে সন্ধ্যায় আমার দেখা করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফ্রেড আমাকে নিয়ে আসেন ইউনিভার্সিটি অব ঘানার ক্যাম্পাসে। তিনি জানতে চান, ‘হাউ ডু ইউ লাইক ড্রাইভিং থ্রু দিস ফেমাস ওয়েস্ট আফ্রিকান এডুকেশনাল ইনস্টিটিউট?’ আমি গাছপালার ফাঁকে অনুষদগুলোর দালানকোঠা দেখতে দেখতে অনুরোধ করি, ‘ফ্রেড, আমাকে একটু ব্যাকগ্রাউন্ড দিলে ভালো হয়। ’

কথা বলতে ফ্রেড পছন্দ করেন। তাঁর টুকটাক মন্তব্য থেকে জানতে পারি, বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপিত হয় ১৯৪৮ সালে। এক জামানায় ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের সঙ্গে একাডেমিকভাবে যুক্ত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ওয়েস্ট আফ্রিকার প্রতিটি ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে কৃষ্ণাঙ্গ আমলা ও এলিটদের উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠানো হতো। বর্তমানে এখানকার ছাত্রসংখ্যা ৪০ হাজারের মতো। আফ্রিকার নানা দেশের ছাত্ররাও এখানে পড়াশোনা করছে।

ফ্রেড আরো জানান যে তিনি আজকাল আর কনসালট্যান্সি করছেন না, তবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডজাংক্ট ফ্যাকাল্টি হিসেবে একটি কোর্স পড়াচ্ছেন। তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, ‘কনসালট্যান্সির ধান্দায় নানা দেশে ক্রমাগত ঘুরে বেড়ানোর পরিণতিতে আই লস্ট ওয়ান ইমপর্ট্যান্ট উওম্যান ইন মাই লাইফ, স্ত্রী মেরি এ কারণে আমাকে ছেড়ে গেছে। আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু লুজ মাই হাই স্কুল সুইটহার্ট ট্রুডি। ’

গাড়ি পার্ক করে আমাকে নিয়ে ফ্রেড অতঃপর হেঁটে চলে আসেন বোটানিক্যাল গার্ডেনের অজস্র বোল্ডারে পূর্ণ একটি পরিসরে। তার ভেতর দিয়ে কেটে কেটে বয়ে যাচ্ছে অত্যন্ত সংকীর্ণ একটি ছড়া নদী। ওখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে পাই, খানিক দূরে বাঁশঝাড়ের তলায় সিমেন্টের বেঞ্চে বসে গল্পগুজব করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ-তরুণীরা।

 

আমরা পাথরের পরিসর ছেড়ে চুপচাপ বনানীর ভেতর দিয়ে আগ বাড়ি। ফ্রেড জানতে চান, ‘হাউ ডু ইউ লাইক দিস প্লেস?’ আমি নিসর্গের মৌন শুশ্রূষায় উদ্দীপ্ত হয়ে জবাব দিই, ‘দিস ইজ ওয়ান অব দ্য বেস্ট অ্যাটমসফেরিক স্পেস আই এভার সিন অ্যানিহয়ার ইন ওয়েস্ট আফ্রিকা। ’ ফ্রেড আমার সঙ্গে একমত হয়ে মন্তব্য করেন, ‘৫০ হেক্টরের এই বোটানিক্যাল গার্ডেন...হাউ ডু আই ডেসক্রাইব ইট...আই মাস্ট সে...দ্য বেস্ট আউটডোর পিকনিক স্পট ইন দিস মেগা মেট্রোপলিটন। ’

পামগাছের দীর্ঘ সারি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে রীতিমতো সরণি। হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে, মুখচোরা হরিণগুলো পদশব্দে লুকাচ্ছে ঝোপঝাড়ের আড়ালে। কেন জানি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফ্রেড বলেন, ‘দিস বোটানিক্যালস ওয়াজ আওয়ার ফেভারিট ডেটিং স্পট। আমাদের দিনযাপনে দুর্যোগ তীব্র হলে মোটরবাইকের পেছনে ট্রুডিকে বসিয়ে এখানে চলে আসতাম। ’ জানতে চাই, ‘আপনারা তো তখন ছিলেন টিনএজার, দুর্যোগ বলতে ঠিক কী বোঝাচ্ছেন ফ্রেড?’ কোনো দ্বিধা না করে তিনি জবাব দেন, ‘আমাদের দুজনের হেরিটেজ হচ্ছে ইটালিয়ান। আমি ইটালিয়ান-আমেরিকান, তবে ট্রুডিরা হচ্ছে ফ্লরেন্স শহরের বনেদি ইটালিয়ান। সম্পূর্ণ আলাদা দুটি পরিবার, বাস করছে আক্রায়; কিন্তু আমাদের বেশ কতগুলো সমস্যা ছিল একই রকমের। আমার মা ও ট্রুডির মা দুজনের ছিল অত্যধিক অ্যালকোহলের এডিকশন। দুজনেই ভুগতেন নানা রকমের ডিপ্রেশনে, তখন আমাদের ওপর শাসনের চোটপাটটা তীব্র হতো। অসহনীয় হয়ে উঠলে আমি ট্রুডিকে নিয়ে চলে আসতাম এখানে। ’

হেঁটে হেঁটে চলে আসি শান্ত-সুনসান একটি লেকের পারে। একটু দাঁড়াই। পারে বাঁধা একটি নৌকা হ্রদটিকে রীতিমতো ভিউ কার্ডের ভিজ্যুয়াল ব্যঞ্জনা দিয়েছে। ওপারে বাতাসে ওড়ে বড় বড় লালচে হলুদ রঙের ঝরা পাতা। এখানে হাওয়ার তোড় বেশ প্রবল, মনে হয়, সমুদ্রের তুখোড় তরঙ্গে সার্ফ করার মতো পাতাগুলো তোলপাড় হয়ে উড়ছে। এই দৃশ্যপটের দিকে তাকিয়ে অনেক বছর পর কৈশোরে পড়া উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতার একটি ছত্র মনে পড়ে, ‘নেচার নেভার ডিড বিট্রে দ্য হার্ট দ্যাট লাভড হার। ’ অন্যমনস্ক স্বরে ফ্রেড বলেন, ‘তোমার মতো বার্ড ওয়াচিং করতে ট্রুডি ভালোবাসে। হর্নবিল তার প্রিয় পাখি, এখানে গ্রে হর্নবিল ও পাইপিং হর্নবিল—এই দুই প্রজাতির পাখি নীড় বেঁধে বাস করছে। ...বাট, টু ব্যাড, আই ডোন্ট সি অ্যানি হর্নবিল টুডে। ’ আমি ওপারের একটি গাছের নিচু ডালে বসে থাকা বর্ণাঢ্য পাখিগুলোর দিকে ইশারা দিই। বাওয়াবাওয়ি করছে দুটি আফ্রিকান গ্রে প্যারট। চুপচাপ বসে বসে ঝিমাচ্ছে তিনটি সেনেগালি টিয়া। গাছতলায় ঘাসের বীজ খুঁটছে বেশ কতগুলো রোজ রিংগড প্যারাকিট। অনেক দিন পর আমি নিসর্গ-নিবিড় পরিসরে রোজ রিংগড প্যারাকিট বা রংচঙে মুনিয়া পাখি দেখলাম। ‘দে জাস্ট মেড মাই ডে, ফ্রেড,’ বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করি। ওয়েস্ট আফ্রিকান অর্কিডের গুচ্ছে গুচ্ছে সুশোভিত গাছপালার ওপর দিয়ে তৈরি ক্যানোপি ওয়াকের তলা দিয়ে আমরা পার্কিং লটে ফিরি। হাঁটতে হাঁটতে ফ্রেড বলেন, ‘ডেটিংয়ের সময় আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে সমস্যা হতো প্রচুর; কিন্তু বোটানিক্যাল গার্ডেনের নিসর্গনন্দিত পরিসরে আসলেই আপনাআপনি ছুটে যেত সমস্যার জট। ’

বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে বেরিয়ে আমরা এসে পড়ি ট্রাসাকো ভ্যালি নামে নগরীর একটি অভিজাত আবাসিক এলাকায়। এখানকার চকমিলান দালান-দুমেলা, সবুজাভ ঘাসে ছাওয়া লনগুলোতে উদ্যানচর্চার পরিশীলিত উদ্যোগ ইত্যাদি দেখে এলাকাটি যে আপস্কেইল নেইবারহুড, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না। কিছু ভিলার আঙিনায় ভিন্ন ভিন্ন দেশ ও জাতিসংঘের পতাকা দেখতে পেয়ে বুঝতে পারি, এই আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে রাষ্ট্রদূত প্রমুখের বাসভবনাদি। ট্রুডি যে ভিলায় বাস করছেন, তার গেটে একাধিক বন্দুকধারী দারোয়ান।

গাড়ি থেকে নেমে আমরা আঙিনার বড় বড় গাছের ছায়ায় ভিলাটির দিকে এগোই। ফ্রেডের কাছে জেনেছি, তাঁর হাই স্কুল সুইটহার্ট ট্রুডির প্রয়াত হাজব্যান্ড ছিলেন অত্যন্ত বিত্তবান একজন ইটালিয়ান শিল্পপতি। আক্রায় নানা কলকারখানায় তাঁর পুঁজি খাটছে। তিনি ভালোবাসতেন আফ্রিকান নিসর্গ, তাই প্রচুর গাছপালা সংগ্রহ করে আক্রায় গড়ে তুলেছিলেন বিলাসবহুল বসতবাড়ি। এখানে এসে বাড়িখানির আকার-আয়তন দেখে আমার চমকে যাওয়ার দশা হয়!

বাগানখানা বিরাট, এতে কেয়ারি করা উদ্যানের কোনো নিদর্শন নেই, বরং গাছপালা ও ঝোপঝাড়ে পরিচয় মেলে নিষ্ঠাবান একজন মানুষের, যিনি চিন্তা-ভাবনা করে সংগ্রহ করেছেন হরেক প্রজাতির তরুবর। হাঁটতে হাঁটতে একটি বুদ্ধমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে আমি বিগ্রহটির অনিন্দ্যসুন্দর উপস্থিতি অবলোকন করি। একটু তাজ্জবও হই! আফ্রিকার এ আতরাফে কপিলাবস্তুর রাজকুমারকে অত্যন্ত সুখী হালতে গালে হাত দিয়ে পাথরের পাটাতনে বসে থাকতে দেখব, তা প্রত্যাশা করিনি। ফ্রেডের টুকটাক কথাবার্তা থেকে জানতে পারি, নিঃসন্তান ট্রুডি বৌদ্ধ ধর্ম আর ইয়োগা নিয়ে দিন কাটান। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে বছর তিনেক লেখাপড়া বাদ দিয়ে ট্রুডি নাকি হিপি হয়ে নানা দেশে ব্যাকপ্যাক পিঠে ভ্রমণ করেছিলেন। তখন ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন মন্দিরে ঘুরে বেড়ানোর সময় তিনি বৌদ্ধ ধর্মে আকৃষ্ট হন। তাঁর বেজায় বিত্তবান স্বামী উপহার হিসেবে এ মূর্তিটি শ্রীলঙ্কা থেকে আনিয়ে দেন।

চলে আসি পানাপুকুরের মতো একটি জলাশয়ে। পারে পড়ে থাকা একটি গাছের গুঁড়িতে বসে গোটা বারো পাখি যেন আচামনের উদ্যোগ নিচ্ছে। তাদের পালকের আশ্চর্য বর্ণাঢ্যতা আমার মনে সংক্রমিত হয় দ্রুত। চারপাশে বাসরের লাজরক্তিম কনেটির মতো নামছে লালচে গোলাপি গোধূলি। একটি কাঁচকলার ঝাড়ে প্লানটিন ইটার নামে দুটি পাখি পাকা কলার ভাগ নিয়ে বাধিয়েছে দারুণ কোন্দল। ফ্রেডের সেলফোনে ট্রুডির মেসেজ আসে। তিনি গ্রিনহাউসে বসে পর্যবেক্ষণ করতে যাচ্ছেন একটি মাংসাশী উদ্ভিদের পতঙ্গ ভক্ষণ। আমরা দ্রুত চলে আসি গ্রিনহাউসের পরিসরে। সেলফোন দিয়ে পুরো দৃশ্যটি ভিডিও করতে করতে চোখ তুলে হাসিমুখে কাঁধ ঝাঁকিয়ে আমাদের উপস্থিতিকে আমলে আনেন ট্রুডি। আমি অর্কিড, ফার্ন ও ছোট নানা উদ্ভিদে জমজমাট গ্রিনহাউসে চুপচাপ দাঁড়াই।

ট্রুডির ফোন ক্যামেরার সামনে টবে ছোট্ট একটি কাঁটাওয়ালা উদ্ভিদ। এ তরুবরটির নাম ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ। এ ধরনের ছোট্ট তরু যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ও সাউথ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের বনানীতে সচরাচর দেখতে পাওয়া যায়। পতঙ্গভুক এ উদ্ভিদটিকে আক্রায় প্রত্যাশা করিনি। জানতে পারি, ট্রুডির প্রয়াত স্বামী এর চারা আমেরিকা থেকে আমদানি করে গ্রিনহাউসে লাগিয়েছিলেন। মুমূর্ষু হালতে তরুটি বেঁচে আছে বছর দুয়েক ধরে। কিছুদিন আগে ট্রুডির সেবাযত্নে তা সতেজ হয়ে ওঠে।

আমরা ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপের পাতায় বসা একটি পতঙ্গ দেখতে পাই। অতি ধীরে পত্রের দুই দিকের দুটি ভাঁজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কপাটের মতো। পতঙ্গটি যে আটকা পড়েছে, এ ব্যাপারে সে সচেতন হয়ে ওঠে অন্তিম মুহূর্তে, বাট ইট ওয়াজ টু লেট...। বন্ধ হয়ে যায় পাতার কপাট। ভেতরে পতঙ্গটির ছটফটানোর ছায়া খানিক দূরে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট দেখতে পাই।

পুরো দৃশ্যটি আইফোনে ভিডিও করে ট্রুডি বেরিয়ে আসেন গ্রিনহাউস থেকে। আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। ফ্রেড আগেই আমার কথা ট্রুডিকে বিস্তারিত বলে রেখেছেন, তিনি উষ্ণভাবে বলেন, ‘সো ইউ আর দ্য সুলতান, হু ওয়ার্কড উইথ মাই হাই স্কুল সুইটহার্ট ফ্রেড। ’ তিনি বৌদ্ধ শিষ্টাচার অনুযায়ী দুই হাত জোড় করে বুকের কাছে নিয়ে এসে আমাকে প্রণাম করেন। ট্রুডিকে দেখামাত্রই মনে হয়...শি ইজ ওয়ান্ডারফুল, তার চোখ দুটি যেন ভালোবাসার আবেশে মদির হয়ে আছে। প্রণামের জবাবে আমিও মাথা ঝুঁকিয়ে তাকে বাও করি। তিনি কবজি বাড়িয়ে দেন, আমি তাতে ঠোঁট ছোঁয়াই এবং ফের তাঁকে অবলোকন করি।

মনে হয়, ইয়োগার জাদুবলে তিনি শরীর থেকে বেশ দূরে রাখতে পেরেছেন বয়সজনিত জরা। ট্রুডি আমার কাঁধে হাত ছুঁইয়ে ভিলার দিকে যাওয়ার ইশারা করে বলেন, ‘আই অ্যাম ডিপলি স্যরি সুলতান, তুমি এসেই একটি পতঙ্গের মৃত্যু অবলোকন করলে। বাট ইউ নো দিস ইজ হোয়াট লাইফ ইজ অল অ্যাবাউট। পতঙ্গ ভক্ষণ করেই ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ বেঁচে থাকে। একটি পোকার মৃত্যুর সঙ্গে একটি তরুর বেঁচে থাকা কী রকম নির্ভরশীল। আমার হাজব্যান্ড বেঁচে থাকলে সে খুব খুশি হতো, তার শখের ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ আফ্রিকান সয়েলে  এবার অ্যাডজাস্ট করতে শুরু করেছে। ’ আমি ভিলার দিকে হেঁটে যেতে যেতে তাঁর স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করি। তিনি দাঁড়িয়ে পড়ে বলেন, ‘লেট মি টেল ইউ সুলতান সামথিং ভেরি ফ্র্যাংকলি, বেচারা হঠাৎ করে মারা গেল, বাট হি গেভ মি আ পেয়ার অব উইংস, ঠিক বুঝতে পারছি না, এই পাখা দুটি দিয়ে উড়ে উড়ে এখন কোথায় যাব। ’

ভিলার গালিচা পাতা পার্লার চেয়ে দেখার মতো প্রশস্ত। ভিনটেজ ফানির্চারের সাজসজ্জা দেখে মনে হয়, আফ্রিকার কলোনিয়াল আমলের কোনো চলচ্চিত্র শুটিংয়ের সেটে দাঁড়িয়ে আছি। ফ্রেড ট্রুডিকে উষ্ণ হাগে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে আমাকে নিয়ে ঢোকেন ফ্যামিলি রুমে। এই কামরার সাজসজ্জা আটপৌরে, তাই স্বস্তি বোধ করি। ট্রুডির চোখেমুখে কী রকম যেন স্বপ্নের মেঘমালায় ভেসে বেড়ানোর আবেশ ফোটে। তিনি খুব উষ্ণ অন্তরঙ্গতায় বলেন, ‘আই লার্ন আ হৌল লট আবাউট ইউ ফ্রম ফ্রেড। তুমি তো আর্ট ট্রাভেলার, তোমার লেখার জন্য কিছু উপকরণ আজ সন্ধ্যায় এ ভিলায় পেয়ে যাবে। ’ প্রতিক্রিয়ায় আমি তাকে বলি, ‘ফ্রেডের মতো আমিও যে দেশে যাই, একটু খোঁজখবর নিই, শিল্পকলার অঙ্গনে কী ঘটছে, ‘আর্ট ট্রাভেলার’ নামে আমি একটি বইও লিখতে চেয়েছিলাম, কাজ খানিকটা এগোনোর পর নানা ঝামেলায় তা থেমে আছে। ’

ফ্রেড কথাবার্তায় যোগ দিয়ে ট্রুডিকে বলেন, ‘সুইটহার্ট, আমি কিচেনে ডিনারের ব্যাপার ম্যানেজ করছি। তুমি সুলতানকে তোমার স্টুডিওটা একটু দেখাও। আই অ্যাম শিওর হি ইজ গোয়িং টু লাভ ইয়োর ওয়াক্স পেইন্টিং। ’ ওয়াক্স পেইন্টিং বা তপ্ত মোমে বর্ণের পিগমেন্ট মিশিয়ে চিত্র তৈরির প্রকরণ সম্পর্কে আমার আগ্রহ প্রচুর, তবে এ ধরনের কাজ আমি দেখেছি খুব কম। তাই উদ্দীপ্ত হয়ে বলি, ‘ট্রুডি, খুব ভালো লাগবে, ইট উড বি আ রিয়াল প্লেজার টু অবজার্ভ সাম অব ইয়োর ওয়াক্স পেইন্টিং। ’ তিনি আন্তরিকতায় আমার কবজি ছুঁয়ে বলেন, ‘দেন লেটস গো, ওপরতলায় যেতে হবে, থার্ড ফ্লোরে আমার স্টুডিও। ’ আমরা সিঁড়ির দিকে রওনা হই, পেছন থেকে ফ্রেড বলে ওঠেন, ‘ট্রুডি...হানিবান, সুলতান লাভস ব্যাকগ্রাউন্ড, তাকে ওয়াক্স পেইন্টিংয়ের একটু ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দিলে...হি ইজ গোয়িং টু লাভ ইউ ফরএভার। ’ ‘অলরাইট ডিয়ার’ বলে ট্রুডি আমাকে নিয়ে সিঁড়িতে পা রাখেন।

দোতলার অনেকটা জুড়ে আছে এল শেপের একটি অভারসাইজ করিডর। ওখানে ঘানার অন্তর্গত আসান্তে রাজ্যের রাজাধিরাজ ওটুমফুও নানা টুটুর লাইফ সাইজ ফটোগ্রাফ দেখে অবাক হই! রাজাটি স্বর্ণের সনাতনী জেওরাত পরে সিরিয়াস মুখে তাকিয়ে আছেন তাঁর দরবারে হাজেরান প্রজাকুলের দিকে। করিডরের সর্বত্র সিস্টেমেটিক্যালি সাজানো—মুখোশ, যুদ্ধের হাতিয়ারপত্র, শস্য কোটার গাইন-ছিয়া, মূর্তির আকৃতিতে তৈরি কুরছি-কেদারা প্রভৃতি। এসব মহার্ঘ বস্তুরাজি যেন স্পেসটিকে জাদুঘরের অনুকৃতি করে তুলেছে। আমি রাজচিত্রটি নিরিখ করে অবলোকন করি।

ট্রুডি দাঁড়িয়ে পড়ে বলেন, ‘রাজাটির সঙ্গে আমার প্রয়াত স্বামীর গড়ে উঠেছিল এক ধরনের সখ্য। হিজ হাইনেস নানা টুটু পছন্দ করেন ইটালিয়ান ওয়াইন। আমার স্বামী তাঁকে পালা-পর্বে পাঠাতেন এক কেস প্রসেকো বা অন্য কোনো ধরনের পানীয়। বিনিময়ে রাজ অনুচররা তাঁকে বিচিত্র দ্রব্যাদি সংগ্রহ করতে সাহায্য করে। বাগানের কিছু বিরল প্রজাতির গাছের চারাও এসেছে রাজপ্রাসাদের প্রাঙ্গণ থেকে। ’ ট্রুডির সঙ্গে তিনতলার দিকে যেতে যেতে আমি ভাবি, তাঁর মরহুম স্বামীপ্রবরটি তো দেখি আফ্রিকার আর্টিস্টিক আত্মাকে শোকেসে পুরে দিব্যি নিজস্ব বাসভবনে গৃহবন্দি করে রেখেছেন।

তিনতলার রুফটপ গার্ডেনের ছোট ছোট বৃক্ষলতায় ড্রিপ পদ্ধতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঝরছে পানি। তারাভরা আকাশের নিচে মৃদু আলোয় ইগলুর মতো গোলমোল একটি পাথরের তাঁবু দেখতে পেয়ে কৌতূহলী হয়ে উঠি। ট্রুডি কপাট খুলে ভেতরটা দেখিয়ে বলেন, ‘দিস ইজ মাই হিমালয়ান সল্ট কেভ। এখানে আমি ভোরবেলা ইয়োগা প্র্যাকটিস করি। এই কেভের ভেতর দিকের দেয়ালগুলো হিমাচল পাহাড়ের জমানো লবণ দিয়ে তৈরি। এখানকার প্রতিটি বাতিও নুনের প্রস্তরীভূত চাকলায় নির্মিত। মাই হাজব্যান্ড হ্যাড ইমপোর্টেড অল দিজ সল্ট স্ল্যাভস ফ্রম নেপাল জাস্ট টু এন্টারটেইন মি ফর মাই বার্থডে। ’ মনে হয় ইয়োগা তার দেহকে তীব্র শাসনে রেখেছে। এই বয়সেও তার শরীরের ছন্দোময় ফিগারের রহস্য এবার আমার কাছে পরিষ্কার হয়।

ছাদের এক পাশজুড়ে তাঁর আঁকাজোখার স্টুডিও। হলকক্ষটি মনে হয় ট্রুডির সঙ্গে বিবাহিত হওয়ার পর তাঁর স্বামী ভিলার উপরিভাগে যোগ করেছেন। স্টুডিওর কাচের জানালাগুলো ফ্লোর থেকে ছাদ অবধি বিস্তৃত। দেয়ালেও অনেক চিত্র একসঙ্গে ঝোলানোর বিস্তর স্পেস। তাতে নিরিবিলি কাজের পরিবেশের চেয়ে চিত্রশালার দেখনদারি আবহ ফুটেছে প্রবলভাবে। মনে হয়, ট্রুডি স্টুডিওতে অতিথি-অভ্যাগতদের আপ্যায়ন করে থাকেন। আমরা আয়েশ করে সোফায় বসি। লাগোয়া মিনিয়েচার বারের কেবিনেট খুলে ট্রুডি জানতে চান, ‘আমি চিত্র দেখার সময় এক পেয়ালা ক্যাম্পারি পান করে থাকি। তুমি কি একটু ক্যাম্পারি চেখে দেখবে? আমার কেবিনেটে ভারমুথ বা কনিয়াকও আছে। ’

আমি মেজবানের অফার করা ক্যাম্পারিতেই সন্তুষ্ট হই। তিনি পানপাত্রে সিপ নিয়ে সাইডটেবিলে এক তাড়া সিডি নাড়াচাড়া করতে করতে বলেন, ‘ফ্রেডের কাছে শুনলাম, ইউ এনজয় ইউরোপিয়ান ক্লাসিক্যাল মিউজিক হোয়াইল ওয়াচিং পেইন্টিংস। তোমার পছন্দমতো একটি সিডি চুজ করো। আমরা মিউজিক শুনতে শুনতে ওয়াক্স পেইন্টিংগুলো দেখব। দ্য মিউজিক ইজ গোয়িং টু পুট আস ইনটু রাইট মাইন্ড সেট ফর এনজয়িং ফাইন আর্ট। ’ সিডির তাড়া হাতে নিতেই চোখে পড়ে ইতালির ধ্রুপদি কম্পোজার রসিনির (১৭৯২-১৮৬৮) ‘ডুয়েটো ইন ডি মেজর ফর চেলো অ্যান্ড বাস’ নামে একটি সংগীতের ডিস্ক। রসিনি সম্পর্কে আমার খানিকটা ধারণা আছে, আন্দাজ করি, সন্ধ্যার সময় চেলো ও বাসের যৌথ বাদন চমৎকার জমবে, তাই সিডিটি ট্রুডির হাতে তুলে দিই। তিনি উদ্দীপ্ত হয়ে হাসিমুখে বলেন, ‘আই লাইক রসিনি। ’ তিনি সিডিটি প্লেয়ারে চড়িয়ে দিয়ে জানতে চান,    ‘পারহাপস ইউ টেল মি...রসিনি তুমি পছন্দ করলে কেন?’ আমি জবাব দিই, ‘এ কম্পোজিশনটি আমি ও ফ্রেড আমাদের কাবুলে বসবাসের সময় একত্রে বার কয়েক শুনেছি। এর মেলোডি অত্যন্ত সিম্পল এবং রিদমও ক্লিয়ার। আমি আজকের সন্ধ্যায় জটিল কিছু শুনতে চাচ্ছি না। ’ রেকর্ডে বেজে ওঠা চেলো ও বাসের যৌথ সেরেনাদ একটু শুনে নিয়ে ট্রুডি বলেন, ‘আই টোটালি অ্যাগ্রি উইথ ইউ...রসিনির সংগীতের মেজাজে আছে অনাবিল আনন্দ, অ্যাপ্রোপ্রিয়েট চয়েস ফর দ্য ইভিনিং, রসিনি নিজেই বলেছেন, ‘ডিলাইট মাস্ট বি দ্য বেসিস অ্যান্ড এইম অব আর্ট। ’

সংগীত একটু জমে উঠতেই ট্রুডি দেয়ালে ঝোলানো তপ্ত মোমে রং মিশিয়ে আঁকা চিত্রগুলোর দিকে ইশারা দিয়ে তা অবলোকন করার জন্য আমাকে ইনভাইট করেন। আমি উঠে দাঁড়াই, দেয়ালে মোমচিত্রগুলো ছড়াচ্ছে প্রভাতি আলোয় উদ্ভাসিত মৃদু অঙ্গের মোলায়েম আভা। ট্রুডি প্রথমে শিল্পকলার এই প্রকরণটির প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কিছু তথ্য দেন। জানতে পারি, আঙ্গিকটি ওয়াক্স পেইন্টিং নামে পরিচিত বটে, তবে এই চিত্রধারার পোশাকি নাম হচ্ছে এনকোয়াস্টিক পেইন্টিং। এনকোয়াস্টিক শব্দটা এসেছে গ্রিক এনকোয়াস্টিকস থেকে, যার সাদামাটা অর্থ হচ্ছে উত্তপ্ত করা। সচরাচর মোমকে তপ্ত করে তা কাঠ কিংবা ক্যানভাসে ছড়িয়ে দিয়ে তৈরি করা হয় চিত্রের ধূসরিম বেইস। এ ধারার চিত্রকলার সবচেয়ে পুরনো নিদর্শন পাওয়া গেছে মিসরের পিরামিডে। আদিকালের ওয়াক্স পেইন্টাররা মমি কেসের ওপর প্রয়াত ফারাওয়ের পোর্ট্রেট আঁকতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। ওয়াক্স পেইন্টিংয়ের অঙ্কন প্রক্রিয়ার প্রথম লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি’ গ্রন্থে। রোমান স্কলার প্লিনি দ্য এলডার প্রথম শতাব্দীতে পুস্তকটি রচনা করেছিলেন।

আমি এইমাত্র জানতে পারা তথ্যগুলো নোটবুকে টুকে নিতে একটু সময় নিই। চোখ তুলে দেখি, ট্রুডি জাদুঘরের আর্টগাইডের মতো চিত্রিত দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তো নোটবুক গুটিয়ে আমিও ক্যানভাসে তপ্ত মোমে বর্ণের বিচিত্র বিন্যাস দেখতে শুরু করি। ছবিগুলোতে ইমপ্রেশনিস্ট ধারার আবছা স্বপ্নময় ইমেজের সঙ্গে সার্থকভাবে ঘটেছে অনুভূতির মিশেল। বেশ কতগুলো চিত্রপটে প্রকৃতি এসেছে হরেক নকশায় প্রতীকের আধো রহস্যময় টোপর পরে। আমি চিত্রগুলো গাঢ়ভাবে অবলোকন করতে করতে মন্তব্য করি, ‘ট্রুডি, এ ছবিগুলোতে দিঘির পারে ঝিম ধরে বসে থাকা শ্বেতশুভ্র সারসের মতো কেমন যেন ধ্যানমগ্নতা নানা বর্ণের বিচ্ছুরণে থেকে থেকে মূর্ত হয়ে উঠছে। ’ তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনে গাঢ় স্বরে বলেন, ‘ক্যান ইউ পুট ইওর কমেন্ট ইন রাইটিং?’

আমি চিন্তা-ভাবনা করে ই-মেইলে আমার মতামত জানানোর প্রতিশ্রুতি দিই এবং জানতে চাই, ‘দিনের কোন সময় আপনি আঁকেন? আঁকাজোখার প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটু বললে ভালো হয়। ’ তিনি চিত্রময় দেয়াল থেকে চোখ সরান না, তবে গাঢ় স্বরে কথা বলে যান, ‘খুব ভোরে হিমালয়ান সল্ট কেভে বসে আমি বিপাসনা মেডিটেশনে বিভোর হই। অপেক্ষা করতে থাকি, কখন প্রভাতি রশ্মি নুনের আবছা মতো দেয়াল দিয়ে প্রতিসরিত হয়, কোনো কোনো দিন প্রতিসরণের নকশা থেকে আসে প্রেরণা। তখন সল্ট কেভ থেকে বেরিয়ে এসে আঁকাজোখায় হাত দিই। ’ আমি ফের চিত্রে মনোযোগ দিই, কিছু ছবিতে আবছাভাবে এসেছে ফ্রেডের দেহভঙ্গি। তার চারপাশে ছড়ানো বর্ণে যেন মিশে আছে স্মৃতি, সংকট ও প্রত্যাশা। রেখাচিত্রের কিছু নকশায় আশাভঙ্গের ব্যাপারটাও সংগোপন থাকেনি। কী ভেবে আমি জানতে চাই, ‘সো ইউ ফাউন্ড ইওর হাই স্কুল সুইটহার্ট আফটার মেনি মেনি ইয়ারস। হাউ ইজ ইট গোয়িং উইথ হিম নাউ। ’

লাজরক্তিম তরুণীর মতো গণ্ডদেশে ব্লাশের লালিমা ছড়িয়ে তিনি জবাব দেন, ‘লুক, হি ইজ ট্রুলি ওয়ান্ডারফুল। তাকে যে প্রতিদিন প্রতি রাতে খুব কাছে পাচ্ছি এই বয়সে, এটাই বা কম কী। ’  আমি তাঁদের যৌথ দিনযাপনের শুভ কামনা করি। ট্রুডি কপাল কুঁচকে দ্বিধা জড়ানো স্বরে বলেই ফেলেন, ‘বাট...ইউ নো...হি ইজ নট দ্য সেম বয় আই ডেটেড লং লং টাইম এগো। ফ্রেড এত বদলে গেছে যে তার আচার-আচরণ বুঝতে পারা কখনো কখনো কঠিন হয়ে ওঠে। ’ শুনে আমি সহানুভূতি জানাই, বলি, ‘আই অ্যাম স্যরি দ্যাট ফ্রেড ইজ গিভিং ইউ সাম ট্রাবল। ’ চোখ তুলে দেখি, ট্রুডি সিরিয়াসলি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন, তিনি জানতে চান, ‘তুমি তো কাবুলে ফ্রেডের পাশের কামরায় বাস করতে, তার অনিদ্রা ও স্লিপওয়াকের ব্যাপারটা তোমার চোখে পড়েছে কি?’ কিছু গোপন না করে আমি জবাব দিই, ‘কাবুলে যখন স্ট্রেস তীব্র হতো, তখন ফ্রেড ক্রমাগত অনিদ্রায় ভুগতেন, তারপর নিট জ্যাক ডানিয়েল পান করে একটু ঘুমালে মাঝরাতে হল্লা-চিৎকার করে, অদৃশ্য কার সঙ্গে যেন ঝগড়াঝাঁটি করতে করতে তিনতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে যেতেন আঙিনায়। দারোয়ানরা ধরে-করে তাঁকে ফিরিয়ে আনত বেডরুমে। ’ শুনে ট্রুডি বিষণ্ন স্বরে বলেন, ‘দিস স্লিপওয়াক প্রবলেম কনটিনিউজ স্টিল টুডে, প্রায় প্রতি রাতে...তার সাবেক স্ত্রী সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি করতে করতে হেঁটে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চায়। ’ আমি পরামর্শ দিই, ‘হাউ অ্যাবাউট টেকিং হিম টু আ সাইকিয়াট্রিস্ট?’ ট্রুডি খিন্ন স্বরে বলেন, ‘চেষ্টা তো করছি সুলতান, কিন্তু আক্রায় ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট পাওয়ার কোনো উপায় নেই, ইতালি বা আমেরিকায়ও সে যেতে রাজি হচ্ছে না। ’ প্রতিক্রিয়ায় আমি মৌন থাকি এবং ফের চিত্র পর্যবেক্ষণে মনোযোগ দিই।

বেশ বড়সড় ক্যানভাসে ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপের চিত্রটি আমার নজর কাড়ে। ছবিটির দিকে ভিন্ন অ্যাঙ্গল থেকে তাকালে তার প্রেক্ষাপটের ঝোপঝাড় ও লতাগুল্মে যেন ফুটে ওঠে ওয়েস্ট আফ্রিকার মানচিত্রের অনুকৃতি।      মাংসাশী তরুটির ঘাতকপত্রে জোড়া হয়ে বসেছে ব্লোআপ করা দুটি পতঙ্গ, পত্রটির দুই পাশের শুঁড়ওয়ালা কপাট ক্রমে বন্ধ হয়ে আসছে। কৌতূহলী হয়ে আমি পতঙ্গ দুটি কাছ থেকে অবলোকন করার চেষ্টা করি। মৃদু হেসে ট্রুডি বাড়িয়ে দেন একটি ম্যাগনিফায়িং গ্লাস। ভারী আতশি কাচের ভেতর দিয়ে এবার আমি পতঙ্গ দুটির মুখে ফ্রেড ও ট্রুডির আদল দেখতে পাই।

ওয়াক্স পেইন্টিংয়ে পার্সি মিনিয়েচার শৈলীর দক্ষ প্রয়োগের তারিফ করে ট্রুডির দিকে তাকাই। তিনি অপ্রস্তুতভাবে হেসে বলেন, ‘দিস সামস আপ বোথ অব আওয়ার লাইভস ইন আফ্রিকা। ফ্রেড ও আমি কৈশোরে বেড়ে উঠি আফ্রিকার এ অঞ্চলের নানা শহরে। প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে পেশাদারি কাজে আমরা বারবার ফিরে এসেছি আফ্রিকায়। আফ্রিকাকে আমরা যে খুব করে ভালোবাসি, তা-ও নয়। এখানে ম্যালেরিয়া, ইবোলা থেকে শুরু করে হামেশা লেগে আছে গৃহযুদ্ধ, ছড়াচ্ছে ক্রাইম—নেগেটিভ কিছুর অভাব নেই কোনো। কিন্তু আফ্রিকা ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার কোনো উপায় আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। কখনোসখনো মনে হয়, ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপের মতো আফ্রিকা আমাদের হজম করে নিচ্ছে জীবিতাবস্থায়। ’

বর্ণ ও সংগীতের তরতাজা স্মৃতি নিয়ে বেরিয়ে আসি ট্রুডির স্টুডিও থেকে। ছাদের অন্ধকারাচ্ছন্ন তরু থেকে ছড়াচ্ছে উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের তীব্র সৌরভ। সিঁড়িঘরের দিকে যাওয়ার সময় চোখের কোণ দিয়ে দেখি, চৌবাচ্চায় প্রতিফলিত হচ্ছে ছায়াপথের খানিকটা। ফ্রেডকে পাওয়া যায় নিচের তলার ডাইনিং পার্লারে। বিরাট আকারের কামরাটি ব্যাংকোয়েট হল বললে অত্যুক্তি কিছু হয় না। অনায়াসে এখানে জনা পনেরো ডিগনিটারিকে ভোজে ডেকে জিয়াফত খাওয়ানো যায়। আমি অবাক হয়ে তাকাচ্ছি, ট্রুডি অপ্রস্তুত হয়ে বলেন, ‘আসান্তে রয়াল ফ্যামিলির ছেলেপিলেরা আক্রায় এলে আমার লেট হাজব্যান্ড এই কামরায় তাদের এন্টারটেইন করত। একবার হিজ হাইনেস স্বয়ং মহারাজ এখানে চা পান করতে এসেছিলেন। ’

আমি সাইডটেবিলে রাখা অস্ট্রিচ পাখির আণ্ডা দিয়ে তৈরি কাপ ও ডিশের দিকে কপট তারিফের দৃষ্টিতে তাকাই। অতঃপর আমার দৃষ্টি আটকে যায়, একটি ভিনটেজ গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের কারুকাজ করা কেসে। ফ্রেড ঠাট্টা করে বলেন, ‘দিস ক্লক ইজ ওয়ান হান্ড্রেড অ্যান্ড সেভেনটিন ইয়ারস ওল্ড। এতে দিন, মাস, বছর ও চন্দ্রকলার হিসাব-কিতাব করার ব্যবস্থা আছে, বুঝলে। জাস্ট ইমাজিন সুলতান, দিস ড্যাম ক্লক ইজ কিপ টিকিং ফর অভার হান্ড্রেড ইয়ারস, অল ইট ইজ ডুয়িং ইজ টিকিং...টিকটক টিকটক...। ’ আমি চোখেমুখে কৃত্রিম আতঙ্ক ফুটিয়ে তুলে বলি, ‘ট্রুডি, আমাকে কি অস্ট্রিচের আণ্ডা দিয়ে তৈরি বাসনবর্তনে ডিনার খেতে হবে?’ তিনি হেসে জবাব দেন, ‘ওহ হেল নো, ফ্রেড ইজ গোয়িং টু সার্ভ আস অ্যান ইন্টিমেট ফ্যামিলি ডিনার ইন আ ডিফরেন্ট ভেরি স্মল ডাইনিংরুম। ’ এই বেঢপ সাইজের কামরায় খেতে হবে না জানতে পেরে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার অনুভূতি হয়। তখন খেয়াল করি, ফ্রেড রীতিমতো রেস্তোরাঁর শেফ বা বাবুর্চির ধবধবে সাদা অ্যাপ্রন পরে আছেন। তাতে টমেটো সসের লালচে দাগ দেখে আন্দাজ করি, আমি যখন ট্রুডির সঙ্গে স্টুডিওতে চিত্রাদি দেখছিলাম, তখন ফ্রেড বাবুর্চিখানায় নিজ হাতে রান্নাবান্না সেরেছেন।

সম্পূর্ণ কাচের গ্রিনহাউসের মতো দেয়ালওয়ালা ছোট্ট চার চেয়ারের ডাইনিংরুমটি দীর্ঘ এক করিডর দিয়ে মূল ভবনের সঙ্গে যুক্ত। সাইডটেবিলে সাজানো খাবার ফ্রেড নিজেই হাতে তুলে সার্ভ করেন। ট্রুডি শেফরা পরে এ ধরনের একটি ক্যাপ ফ্রেডের মাথায় পরিয়ে দিলে তিনি তাঁর কোমর জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে কষে চুমু খান। স্টার্টার হিসেবে পরিবেশিত হয় গরমাগরম ব্রুসকেটা। মাৎসারেলা চিজের প্রলেপের ওপর অলিভ অয়েল মাখানো টেমেটো ও রসুনের টুকরা ছড়ানো টোস্ট করা রুটির ব্রুসকেটা ক্ষুধার মুখে চিবাতে ভালোই লাগে। আমি খেতে খেতে কাচের স্বচ্ছ দেয়াল অতিক্রম করে দেখতে পাই আলোয় ঝলমলে সবুজাভ এক উপবন। দ্বিতীয় কোর্স হিসেবে পরিবেশিত হয় বেগুনের চাকতিতে চিজের গুঁড়া ছড়ানো এগপ্লান্ট পামারাজান।

তা খেতে খেতে খেয়াল করি, ফ্রেড রসিনির একটি সিম্ফনি প্লেয়ারে বাজাচ্ছেন। সংগীতটি আমার খুব প্রিয়, কাবুলে বসবাসের দিনগুলোতে অনেকবার এ মিউজিক ফ্রেডের আইপডে শুনেছি। খুশি হয়ে আমি ফ্রেডকে কৃতজ্ঞতা জানাই, বলি, এ গান শুনলে শুধুই মনে হয়, তারুণ্যের তাবৎ নির্যাস নিংড়ে নিংড়ে উপভোগ করার জন্যই সৃষ্টি হয়েছে আমাদের জীবন। মনোযোগ দিয়ে ফ্রেড আমার মন্তব্য শুনে পাল্টি দেন, ‘ইয়েস, ইউ আর রাইট, কিন্তু খেয়াল করে দেখো—এক যুগ হতে চলল আমাদের তিনজনের দেহ থেকে স্রেফ বেখবর হয়ে গেছে তারুণ্য, এর পরও এ গানের আবেদন কিন্তু কমেনি। ’ ট্রুডি হারিয়ে যাওয়া তারুণ্য নিয়ে বিশেষ একটা উদ্বিগ্ন হন না, তিনি পানপাত্রে আরেক দফা মনতিচিয়ানো ঢেলে দেন। অতঃপর চুমুক দিয়ে জানান, ‘ট্র্যাজেডি হচ্ছে, এই সংগীতগুলো রসিনি কম্পোজ করেছিলেন প্রথম যৌবনে, তাঁর জীবনের শেষ চল্লিশ বছরে তিনি উল্লেখযোগ্য কিছু কম্পোজ করেননি। ’

একটি তথ্য মনে পড়ে, কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থও নাকি তাঁর জীবনের শেষ ত্রিশ বছর প্রথম জীবনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য কোনো কবিতা রচনা করেননি। এ তথ্যটি আমি কোথায় যেন পড়েছি, কিন্তু রেফারেন্স মনে পড়ে না। ভাবি, স্রেফ স্মৃতির ওপর ভরসা করে কিছু শেয়ার করা সঠিক নয়। ফ্রেড ট্রুডির মন্তব্যে প্রতিক্রিয়া জানান, ‘রসিনি যশস্বী হয়ে যাওয়ার পর তো শেষ চল্লিশ বছর প্যারিসে তিনি স্রেফ ফুর্তিফার্তা করে কাটিয়েছেন। ’ ট্রুডি কিছু না বলে উঠে ডিনারের মেইন কোর্স শ্রিম্প আলফ্রেডো সার্ভ করেন। এ ডিশটি ফ্রেডের কল্যাণে কাবুলে আমার প্রিয় হয়ে উঠেছিল। দিন কে দিন নানরুটি ও কাবাব খেয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলে চোরাপথে ইরানের বন্দর আব্বাস থেকে কাবুলে আমদানি করা গাবদাগোবদা চিংড়ি মাছ কিনে নিয়ে আসতাম। ফ্রেড পাস্তার সঙ্গে তা মিশিয়ে টমেটো সস দিয়ে শ্রিম্প আলফ্রেডো রান্না করতেন। তাতে সহনীয় হয়ে উঠত আমাদের জিন্দেগি ও বন্দেগি।

একটু তারিয়ে তারিয়ে আক্রার গলদা চিংড়ি চিবাচ্ছিলাম। ট্রুডি ইশারায় কাচের দেয়াল ভেদ করে বাইরে তাকাতে অনুরোধ করেন। দেখি, কৃত্রিম উপবন থেকে আলোয় বেরিয়ে এসেছে একটি ছানাসহ হরিণী। মা হরিণী যত্নে শিশুটিকে দুধ খাওয়ায়। আমরা ধুন ধরে তাকিয়ে থাকি। ট্রুডির চোখে আমার চোখ পড়ে, স্পষ্ট বুঝতে পারি, তিনি এ দৃশ্যপটকে কিভাবে মোমচিত্রে নিয়ে আসা যায়—তা ভাবছেন। আমার ভাবনাস্রোতও ধাবিত হয় অলিখিত পাণ্ডুলিপির দিকে। কেন জানি ওয়ার্ডসওয়ার্থের একটি ছত্র, ‘ফিল ইওর পেপার উইথ দ্য ব্রিদিংস অব ইওর হার্ট’, বা ‘পাণ্ডুলিপিটি ভরিয়ে তোলো তোমার হৃদয় নিংড়ানো নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস দিয়ে’, মেঘের মতো ভেসে আসে মনে। ভাবি, মা ও শিশু হরিণের এ ইমেজটি সত্যিকারের আবেগ দিয়ে বর্ণনা করার অবকাশ পাব কি?

ডিনার প্রায় শেষ হয়েই আসে। আমরা কেউই ডেজার্ট বা আফটার ডিনার ডাইজেস্টিভ ড্রিংকস নিতে চাই না। আমি চমৎকার একটি ইটালিয়ান ডিনার সার্ভ করার জন্য ধন্যবাদ জানাই। গাড়ি বারান্দার দিকে আসার পথে ট্রুডি বলেন, ‘জীবনের বেশির ভাগ সময় আমি কাটিয়েছি ইতালির বাইরে। কিন্তু খাবার, এই একটা ব্যাপারে আমি কম্প্রোমাইজ করতে পারি না। আই লাভ মাই ইটালিয়ান ফুড। ’ আমারও ঘটনা হরেদরে একই রকমের, যে দেশেই যাই না কেন, মাঝেমধ্যে বারিক চালের ভাতের সঙ্গে এক বাটি মুগ ডাল, চাকতি করে ভাজা বেগুন ও এক টুকরা কাগজিলেবু স্মৃতিতে প্রবল হয়ে ওঠে। ট্রুডি গুডনাইট বলে বিদায় চুম্বনের জন্য গণ্ডদেশ বাড়িয়ে দেন। ফ্রেডকে আলিঙ্গন করে আঁমি তাদের শোফার চালিত ল্যান্ডরোভারে উঠি। রাত বেশ হয়েছে, এত রাতে যে আমাকে আক্রার ট্যাক্সি চড়তে হচ্ছে না—এ জন্য আমার জীবনের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রককে শোকরগুজার জানাই।



সাতদিনের সেরা