kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

র হ স্য উ প ন্যা স

অপ্রকাশিত উপন্যাস : বুরগনেফ

শেখ আবদুল হাকিম

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪৬ মিনিটে



অপ্রকাশিত উপন্যাস : বুরগনেফ

অঙ্কন : মানব

‘বুরগনেফ’ উপন্যাসটি লেখক গত বছর ঈদ সংখ্যায় প্রকাশের জন্য তাঁর মৃত্যুর আগে আমাদের দিয়েছিলেন। করোনার কারণে তখন প্রকাশ করতে না পারায় এবার প্রকাশিত হলো

হোটেলের পেটচুক্তি টেবিল

সেটা ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাস, আমি তখন ন্যুরেমবার্গে। আমার মূল উদ্দেশ্য ছিল মিউনিখে যাওয়ার পথে ওখানে দুটো দিন কাটানো, ছোট্ট শহরের আনাচকানাচে উঁকি দেওয়ার জন্য সেটা যথেষ্ট লম্বা একটা সময়, সুযোগ করে নিয়ে হাঁটতে চলে যাব বাভারিয়ান এথেন্সে, ওখানে গর্ব করবার মতো প্রাচীন এবং জার্মান রেনেসাঁর সময়ে সৃষ্ট বৈচিত্র্যে ভরপুর নানা ধরনের শিল্পকর্মের সংগ্রহ আছে। আমার প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া, যে কারণে সময়টা আমি সেভাবে উপভোগ করতে পারিনি, বরং অপ্রাপ্তিজনিত হতাশায় ভুগেছি, মিউনিখ আমাকে বাস্তবে যতই না কেন নিজস্ব খ্যাতি আর জৌলুস দেখাতে পারুক।

বিজ্ঞাপন

তবে ন্যুরেমবার্গে দুদিন কাটাবার পর, দূরে দূরে ছড়ানো ওখানকার অ্যান্টিকতুল্য নির্জন আর অব্যস্ত জায়গাগুলোর জীবনধারা আমাকে অসম্ভব কৌতূহলী আর আগ্রহী করে তুলল। ওখানে যেসব জাদুময় আকর্ষণের সংস্পর্শে এলাম, সেগুলো আমার প্রত্যাশায় ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দেয়নি। আর তাই ওখানে আমি তত দিন থেকে গেলাম, যত দিন না ওখানকার সমস্ত খুঁটিনাটি বিবরণ আমার অন্তরে গেঁথে নিতে পারলাম এবং গোটা এলাকার মানচিত্র বসিয়ে নিতে পারলাম মগজে। বলাই বাহুল্য যে ওখানে আমার সঙ্গে বেশ কিছু মানুষের পরিচয় হলো, এবং না বললেও চলে যে তাঁরা সবাই হয় শিল্পী, না হয় শিল্প সম্পর্কে অভিজ্ঞ এবং জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি, সমাজ যাঁদের সমীহ করে।

এখানে আমি একটা গল্প বলতে বসেছি, যেটা এগোবে বড় বেশি বেদনা-জাগানো পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে। তাই আমাকে লক্ষ রাখতে হবে আমার ব্যক্তিগত আর্কিওলজিক্যাল শখ যেন তাতে বিঘ্ন সৃষ্টি না করে। মূলত সে কারণেই ন্যুরেমবার্গে যা কিছু দেখেছি তার কোনো বিশদ বর্ণনা এখানে আমি দিচ্ছি না, যদিও ন্যুরেমবার্গের সবটুকু দেখবার সৌভাগ্য এখনো আমার হয়নি। প্রিয় পাঠককে আমি শুধু এটুকু বলব যে পুরনো জার্মান জীবনধারা ইউরোপের সর্বগ্রাসী প্রবণতাকে অনেকটাই ঠেকিয়ে দিয়ে নিজস্ব ঐতিহ্য ও শিল্পস্বাতন্ত্র্য ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে। বাড়িগুলো সব পনেরো কি ষোলো শতাব্দীর কিংবা ওই সব প্রাচীন মডেলের আদলে নির্মিত। তবে দ্রুতগতির অর্থনীতির ছাপ পড়বে না, তা তো হয় না; কৌতূহলও এমন অনেক কাজ করিয়ে নেয়, যেগুলো জনজীবনকে প্রভাবিত করে। তবে তার পরও দেখা যাচ্ছে নির্জন নিরিবিলি জায়গার জীবনধারায় কোনো পরিবর্তন আসেনি, যেখানে সদ্য মাথা তোলা মেট্রোপলিটন ব্যস্ততা বা ঝুটঝামেলা একদমই অনুপস্থিত। ওই জায়গাগুলোতে শহরের সব সুবিধা বিদ্যমান; কিন্তু মনে হবে আপনি একটা শান্তিময় স্বর্গীয় গ্রামে আছেন, কোথাও কোনো শব্দ নেই, রাস্তায় রাস্তায় হর্ন বাজছে না, অপরাধীকে ধাওয়া করছে না পুলিশ, খুনি নেই, তাই কেউ খুনও হচ্ছে না।

কেন এবং কিভাবে এই আশ্চর্য গল্পের সঙ্গে আমি জড়িত হলাম সেটা জানতে হলে আমাকে একটু পেছন দিকে যেতে হবে। আভাসে হলেও সব কথা যদি না বলি, গল্পটা আপনার কাছে বেখাপ্পা লাগতে পারে।

বেইরিশার হফের একটা হোটেলে বসেছি, আমার টেবিলে আমি একাই; তবে খানিক পর দু-তিনজন সঙ্গী জুটল। এখানের একটা সুবিধা হলো নির্দিষ্ট পয়সার বিনিময়ে যতটুকু পারা যায় খাওয়াদাওয়া করতে পারবেন আপনি। খেতে বসে আড্ডা মারা চলছে, খদ্দের হবে গোটা ত্রিশেক। একজন বাদে বাকি সবাই স্থানীয় লোকজন, যাদের নিয়ে কোনো মন্তব্য করবার প্রয়োজন নেই—তারা সবাই শান্ত এবং পরের ব্যাপারে নাক গলাতে একদমই পছন্দ করে না, সাধারণ সব মানুষ। যেসব হোটেলে পেটচুক্তিতে খাওয়ানো হয়, সেগুলোর পরিবেশ সব সময় প্রায় এ রকমই দেখা যায়। আর তাই প্রচলিত একটা কথার সঙ্গে আমি মোটেও একমত নই, আর তা হলো, এসব হোটেল একেকটা হাস্যরসের ভাণ্ডার, অন্তত এমন একজন লোকের সঙ্গে দেখা হবে ওখানে, যাকে আপনার ভালো লাগতে বাধ্য। আমার অভিজ্ঞতা বলে এর ঠিক বিপরীতটাই বরং সত্যি। আমি খেয়াল করেছি, স্থানীয় সাধারণ মানুষ ভুলেও একবার সরাসরি আপনার দিকে তাকাবে না। তাদের জীবনে জটিলতা খুব কম, সময় কাটায় খুব সহজ একটা ভঙ্গিতে। তাই বাইরের কোনো লোককে দেখলে তারা অস্বস্তি বোধ করে। এখন আমাকে বলুন, তারা যদি কথাই না বলতে চায়, আমি জানব কিভাবে তাদেরকে আমার ভালো লাগবে কি লাগবে না?

তবে কথাটা সত্যি হলেও হতে পারে, প্রায় সবাই যখন এত জোর দিয়ে বলছে। হয়তো ভাগ্য নেহাত মন্দ বিধায় সে রকম পরিবেশে নিজেকে আমার আবিষ্কার করা হয়নি এখনো। যা হোক, আমার বিশ্বাস নিয়ে আমি থাকি, যেটা বহু বছরের পুরনো। যাকে ভালো লাগতে বাধ্য, এমন কোনো লোকের সঙ্গে একদিন হয়তো আমার দেখা হবে। অপেক্ষায় থাকতে আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে এখন পর্যন্ত কে জানে কী মতলবে অনুপস্থিত রয়েছে সেই ব্যক্তি। স্পেন, ফ্রান্স আর জার্মানিতে আমার যে অভিজ্ঞতা, এ ধরনের একজন ডাইনার বাচাল হয়, গলা চড়িয়ে কথা বলে চারপাশের লোকজন, যাতে তার কথা শুনতে পায়, সাধারণ জ্ঞান খুব কম থাকে এবং তার শিল্পবোধ ভোঁতা।

গেস্ট যদি ইংলিশ হয়, তার নীরবতা আপনার শিরদাঁড়ায় ঠাণ্ডা শিহরণ বইয়ে দেবে কিংবা মুখটাকে এমন হাঁড়ি বানিয়ে রাখবে যে কারো সাহসই হবে না তার সঙ্গে কথা বলে। তার পাশের লোকের কাছে ওই লোক স্রেফ একটুকরা বরফ। ইংলিশরা যদি দুজন হয়, নিজেদের মধ্যে তারা কী নিয়ে আলাপ করছে আপনি শত চেষ্টা করলেও বুঝতে পারবেন না—অনেক সময় বোঝা যায় তারা কথা বলছে; কিন্তু তাদের ঠোঁট প্রায় নড়ছেই না।

আর বিদেশিদের কথা কী বলব। যেখানেই যাক তারা, কথা বলতে হবে চড়া গলায়, একই প্রশ্ন বারবার না করে থাকতে পারবে না, কিছু বলবার না থাকলেও মুখ চালাতে হবে, তাদের প্রায় প্রতিটি কথা কিছু না কিছু বোকার মতো এবং খুব বেশি সাধারণ। তাদের কোনটা যে আমাকে সবচেয়ে বেশি হতাশ করে আমি সত্যি জানি না।

পেটচুক্তির কোনো হোটেলে আমি মিশুক নই, কথাও বলি খুব কম। চারপাশে স্থানীয় লোকজন যে যার টেবিলে বসে খাচ্ছে, স্বজন বা বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে; কিন্তু কেউ তারা আমার দিকে তাকাচ্ছে না। ওরা আমার দিকে না তাকাক, আমি কিন্তু ইচ্ছা করলে ওদের সঙ্গে যখন খুশি ভাব বিনিময় করতে পারি, তবে নিজের লাগাম টেনে রেখেছি। ফলে খদ্দেরদের সামনে নিজেকে আমি একটা নাক উঁচু হিসেবে উপস্থাপন করছি, দেমাকে যার মাটিতে পা পড়ে না। ইউরোপের সব শহরেই এটা দেখা যায়। যা হোক, আপনি আবার ভেবে বসবেন না যে আমি মানুষের সঙ্গে গল্প করতে ভালোবাসি না। বাসি, তবে সে আলাপটা হতে হবে শিল্প সম্পর্কে কিংবা জীবনের ব্যাখ্যা নিয়ে, এমনকি দর্শন আর রাজনীতিও আমার প্রিয় বিষয়। শুধু ধর্ম নিয়ে কথা বলতে বা মাথা ঘামাতে আমার খানিকটা অ্যালার্জি আছে। চল্লিশ কি পঞ্চাশজন লোক এক জায়গায় বসে কথা বলছে, তাদের একসঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর আলোচনা করতে ডেকে আনা হয়নি, ওই জেলায় তারা নিজেদের গরজে এসেছে, একই হোটেলে ঢোকার বিষয়টাও স্রেফ কাকতালীয়, এবার বলুন তাদের আলাপ থেকে ভালো কিছু বা চিন্তার খোরাক আছে এমন কিছু কিভাবে আপনি আশা করবেন? চল্লিশটা যন্ত্র একটা যন্ত্র হিসেবে পেট ভরাচ্ছে, তাদের সম্পর্কে এ কথা বলা যাবে না, তারা খাচ্ছে চল্লিশজন হিসেবে। তাদের কোনো কমিউনিটি নেই, শুধু বলা যেতে পারে তারা একই জায়গায় চলে এসেছে। না, পেটচুক্তির টেবিল মোটেও আনন্দময় কোনো ঠিকানা নয়; এবং এখানে ইন্টারেস্টিং মানুষেরা জড়োও হয় না।

এই হলো আমার ব্যাপক অভিজ্ঞতা।

কিন্তু তারপর দেখলাম, ন্যুরেমবার্গের এই হোটেলে এবং এটার পেটচুক্তির একটা টেবিলে সত্যি একটা ব্যতিক্রম কিছু ঘটতে দেখা যাচ্ছে, যা সহজেই চোখে পড়ছে। এখানে একটা টেবিলে এমন একজন গেস্ট বসে আছেন, নানা দিক থেকে, ব্যক্তিগত এবং প্রাসঙ্গিক অর্থে, সারা জীবনে যত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার, তাদের মধ্য থেকে তাঁকে খুব সহজেই আলাদা করা যাবে এবং চিরকাল আমি তাঁকে মনে রাখতে পারব।

শুরু থেকেই অস্বাভাবিক মাত্রায় আমার দৃষ্টি কেড়ে নিতে পেরেছেন ভদ্রলোক। এখনো তিনি আমার অভ্যস্ত স্বভাব থেকে আমাকে মুক্ত করতে পারেননি, অর্থাৎ আমি আগের মতোই মুখ হাঁড়ি করে নিজের জায়গায় বসে আছি। আরেকটা সত্যি কথা বলতে হয়, তিনি আমার মনে প্রচুর কৌতূহল জাগাতে পেরেছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই; তা সত্ত্বেও পাশাপাশি এই ভদ্রলোককে দেখে অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে আমার মনে, সেটাকে বিতৃষ্ণা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। কিন্তু কেন? আমি জানি না।

আমি বলতে গেলে তাঁর ওপর থেকে চোখই সরাতে পারছি না; অথচ তাঁর বসবার সময় মাথা নত করে সম্মান জানানোর জন্য টেবিল থেকে একবার উঠে দাঁড়ানো বাদে বন্ধুত্বপূর্ণ আর কোনো আচরণ আমার মধ্যে দেখা যায়নি। এই ভদ্রলোক এক তরুণ রাশিয়ান, নাম বুরগনেফ, যেটা আমি সঙ্গে সঙ্গেই জেনেছি; বরং সুদর্শনই বলতে হবে এবং চোখ দুটো সত্যি খুব টানে, চেহারা আর ভাবভঙ্গি দেখে বোঝা যায় স্থায়ী বিষণ্নতার শিকার, বিশেষ করে তাঁর হাসিতে কী একটা দুঃখ খুব ভালোভাবে লেপ্টে থাকে, যেন অমায়িক ভাবটা বেরিয়ে আসছে শোকবহুল মেঘের ভেতর থেকে। তাঁর প্রতি সহানুভূতি বোধ করবার আরো কারণ দেখতে পাচ্ছি : তাঁর ডান হাতের আস্তিনটা পুরো খালি, সেটাকে কোটের ব্রেস্ট-বাটনের সঙ্গে লুপ বানিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। এই ব্যাপারটা দর্শক হিসেবে আমাকে কষ্ট দিলেও তাঁর মধ্যে এ ব্যাপারে কোনো উদ্বেগ বা আড়ষ্ট ভাব আছে বলে মনে হলো না। তাঁর চোখ দুটো আকারে বেশ বড় আর দৃষ্টি খুব নরম। তাঁর দাড়ি বা জুলফি নেই, আছে শুধু সরু গোঁফ।

চেহারায় বিষণ্নতা, চোখে বেদনা, হাসিতে শোক, তার ওপর ডান হাত না থাকা—এ সবই দৃষ্টি আর মনোযোগ কাড়ে, অন্তর উথলে ওঠে সহানুভূতিতে। তবে আমার জন্য ব্যাপারটা একটু অন্য রকম, আমার সহানুভূতি হচ্ছে না, তা নয়, হচ্ছে; কিন্তু তার সঙ্গে মিশে আছে একটা ভয় আর বিতৃষ্ণা—তাঁর ওই অমায়িক হাসিতে নির্দিষ্ট কোনো মিথ্যা বা ভুয়া কী যেন একটা আছে, ওই বড় চোখ দুটোর দৃষ্টিতে যেন চাতুর্য আর অপকৌশলের ছায়া খেলা করে। তাঁকে বাইরে থেকে দেখে মনে হবে শান্তশিষ্ট একজন ভদ্রলোক, খুবই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, নড়াচড়ায় আভিজাত্যেরও কোনো অভাব নেই, তবে সব মিলিয়ে দুর্ভেদ্য একটা দুর্গ। তাঁর মধ্যে আরো যেন লুকিয়ে আছে স্বতঃস্ফূর্ত বৈরী একটা ভাব।

আমরা আলাপ শুরু করলাম, আসলে প্রথম চালটা আমিই দিলাম। কিছুক্ষণ আলাপ করতেই আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল যে বয়সে তরুণ হওয়া সত্ত্বেও খুবই উঁচুদরের সংস্কৃতির সংস্পর্শে মানুষ হয়েছেন তিনি, মাথায় রাখেন ধারালো বুদ্ধি এবং বোঝা গেল তাঁকে দেখে অসহায় মনে হওয়াটা ছিল আমার বোকামি। তাঁর রুটি আর আপেল একজন চাকর কেটে দিচ্ছে, তিনি যেন একটা শিশু, স্বভাবতই করুণা হওয়ার কথা।

প্রথম দিন ডিনারে বসে বেশির ভাগ সময় মাথাটা খাটালাম তাঁর হারানো হাত কিভাবে হারাল সেই গবেষণায়। তাঁকে দেখে অবশ্যই সামরিক বাহিনীর কেউ বলে মনে হয় না, চেহারা আর ছাত্রসুলভ কুঁজো ভাব সেটা একরকম পরিষ্কারই জানিয়ে দিচ্ছে। হাতটা যে তিনি অনেক আগে, ছেলেবেলায় হারিয়েছেন, তা-ও নয়। নিজের বাঁ হাত দিয়ে সব কাজ করতে এখনো তিনি ভালোভাবে অভ্যস্ত হতে পারেননি, আড়ষ্টতা রয়েই গেছে। প্রমাণ করে, অপর হাতটা তিনি হারিয়েছেন খুব বেশিদিন হয়নি। আচ্ছা, তাঁর বিষণ্নতার সঙ্গে কি এই হাত খোয়ানোর কোনো সম্পর্ক আছে?

এখানে একটা বিষয় চলে আসছে আমার ভবঘুরে কল্পনাশক্তিকে নিয়ে। চুপচাপ ডিনার খাওয়ার সময় ওটার দ্বারা অসংখ্য রোমান্স বোনার কাজ চলল। প্রিয় পাঠককে আমার ভেতর অদ্ভুত যে একটা পিকিউলিয়ারিটি আছে, সেটা সম্পর্কে জানানো দরকার। কারণ আমার এই গল্পে যে বিস্ময়কর জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে তার কৃতিত্ব ওই ভবঘুরে কল্পনাশক্তির। একটা মন যদি কম সক্রিয় হয়, তাহলে দেখা যাবে স্বাভাবিক ও নগণ্য ঘটনা নিয়ে জাল বোনার চেষ্টা হচ্ছে না সেখানে, অর্থাৎ তিলকে না করা হচ্ছে তাল আবার সন্দেহ আর ভয়কে না দেওয়া হচ্ছে প্রশ্রয়। আমি বলতে গেলে একেবারে সেই ছোটবেলা থেকেই গঠনমূলক কল্পনাশক্তির শিকার, যে কারণে আমার দ্বারা অনেক ভুলভাল হয়েছে আর তার পরিণতিতে গায়ে আঁচড়ও কম লাগেনি। কারণ নিজেকে দিয়ে কোনো প্ল্যান তৈরি করানোর পরিবর্তে, চোখের সামনে পড়ে থাকা এভিডেন্সকে পাত্তা না দিয়ে, আমি কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছি যত বেশি পারা যায় নিজের আইডিয়ার ওপর নির্ভর করে উপসংহারে পৌঁছানোর এবং তাতে হয়েছে এই যে সহজ ঘটনা বা আচরণ, যেগুলোর মোটিভ বা লক্ষ্য ছিল সাধারণ, ব্যাখ্যাও ছিল সহজ; কিন্তু আমার কাছে হয়ে ওঠে গুরুতর—অপরাধতুল্য। নিজেকে অনেকবার কঠিন তিরস্কার করতে হয়েছে, আমি একটা গর্দভ বলে গাল দিয়েছি। আমার এই উর্বর মস্তিষ্কের ফসল নিয়ে তৈরি দীর্ঘ ইতিহাস মাঝেমধ্যে আমার মনে পড়ে যায়, আমি তখন দেখতে পাই আমাকে ভুলভাল বিশ্লেষণের কারণে কত বন্ধু চিরকালের জন্য আমার কাছ থেকে দূরে সরে গেছে, নিজেদের মনঃকষ্ট সইতে না পেরে বা তীব্র অভিমানে। কাজেই যখনই আমি ‘গঠনমূলক কল্পনাশক্তি’র কথা বলব, পাঠককে বুঝে নিতে হবে আসলে কী জিনিসের আভাস দিচ্ছি আমি। ওই শক্তি ইতিমধ্যেই বুরগনেফকে নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে। সেই কাজে ক্ষীণ যে বিতৃষ্ণার কথা আগে বলেছিলাম, সেটাও নিশ্চয় তদন্ত করে দেখবার জন্য তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। অল্প একটা বিতৃষ্ণার সেই অনুভূতি পরদিন অবশ্য আরো কিছুটা কমে গেল; কিন্তু যতই কমুক, এখনো সেটা যথেষ্ট শক্তিশালী, বুঝলাম সেদিন তাঁর সঙ্গে আমাকে কথা বলতে বাধা দিচ্ছে দেখে।

তৃতীয় দিন, পেটচুক্তির টেবিলের আলোচনা আরেক দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে, এ রকম প্রায়ই যায়, পরবর্তী আলোচ্য বিষয় হতে চলেছে সেন্ট সেবাল্ড’স চার্চ। খানিক পর দেখা গেল তরুণ এক ফরাসি ওই চার্চের স্থাপত্যরীতি নিয়ে কঠিন ভাষায় অনর্গল সমালোচনা করছেন এবং যেন সেটা মেনে নিতে না পেরে বাধ্য হয়ে আলোচনায় যোগ দিলেন বুরগনেফ এবং তারপর দেখা গেল এই সাবজেক্টে তিনি কত গভীর জ্ঞান রাখেন, তাঁর কাছে বিস্ময়কর কত কত তথ্যই না আছে, আমরা সবাই একরকম নিঃশ্বাস ফেলতে ভুলে গেলাম, তাঁর বক্তব্য মুগ্ধ হয়ে শুনছি। ফরাসি তরুণ একেবারে চুপসে গেলেন; কিন্তু তাঁর যখন আবার মুখ খোলার পালা এলো, প্রতিবাদ করে কিছু বলবার না থাকায় আবার আগের মারমুখো অবস্থানে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয় বুঝতে পেরে শুধু বললেন, বুরগনেফ যেসব রেফারেন্স দিলেন, সেগুলোর অস্তিত্ব সম্পর্কে তাঁর সন্দেহ আছে। তারপর যোগ করলেন, ‘যোগ্য সব কর্তৃপক্ষই আমার বক্তব্যের সঙ্গে একমত। ’ এই পর্যায়ে বুরগনেফ আলোচনায় আমাকে অংশ নিতে অনুরোধ জানালেন। আমরা আগেই তাঁর বাচনভঙ্গি শুনে মুগ্ধ হয়েছি, জেনেছি তাঁর জ্ঞানের গভীরতা এবং পাণ্ডিত্যের বহর। কাজেই আমরা জানি তাঁর মান কত উন্নত এবং এ রকম একজন মানুষের কাছ থেকে সিদ্ধান্ত চাওয়ার অনুরোধ এলে কে না গর্বে এবং আনন্দে আপ্লুত হবে। কিন্তু জানি না কেন আমি সে রকম গর্ব বা আনন্দ অনুভব করলাম না। তবে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা  করলাম, এত মানুষ থাকতে অনুরোধটা তিনি আমাকেই কেন করলেন। এর উত্তর খুব সহজ বলে মনে হলো। আলোচনা যখন চলছে, আমি তখন ওই চার্চের আর্কিটেকচার খুব মন দিয়ে পরীক্ষা করছিলাম, সেটা দেখেই তাঁর বুঝে নিতে অসুবিধা হয়নি যে শিল্প, খাদ্য, পানীয় এবং অন্য আরো অনেক বিষয়ে আমি একজন বোদ্ধা হব—যাকে বলে আ ম্যান অব দ্য ওয়ার্ল্ড।

উপস্থিত সবার দৃষ্টি আমার দিকে ঘুরে গেল। আমি যেহেতু লাজুক মানুষ, স্বভাবতই গালে লাল আভা ফুটল এবং এতক্ষণে আমি যেহেতু একজন নগণ্য মানুষ, নিজেকে নিয়ে গর্বিত বোধ করলাম এবং ভাসলাম আনন্দেও। এটাও খুব সহজে ঘটতে পারত যে ওই রকম একটা অনুরোধ জানানো হয়েছে লাজুক ও অজ্ঞ এক লোককে, সে ক্ষেত্রে সত্যি আমার খুব রাগ হতো; কিন্তু তাঁর আবেদনের টার্গেট ছিল সম্প্রতি তদন্ত করে পাওয়া আমার অর্জিত জ্ঞান আর দক্ষতা। এটা এক ধরনের বিজয়। কারণ নিজেকে আমার একজন গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষ ব্যক্তি বলে মনে হচ্ছে।

বিজয়ের সেই আনন্দ মাটি হয়ে গেল ওই ব্যক্তিকে নিয়ে আমার অনুভূতির কারণে, ঘটনা যেহেতু তাঁকে নিয়েই। ফরাসি তরুণকে চুপ করিয়ে দেওয়া গেছে এবং এটা তো পরিষ্কারই যে উপস্থিত সবার রায় আমাদের পক্ষে। এই পর্যায় থেকে আলোচনা যা হলো সবই আমার আর বুরগনেফের মধ্যে এবং তিনি তাঁর প্রতি আমার উদ্ভট বৈরী মনোভাবের পুরোটাই মুছে দিতে পারলেন—যেটা এখন আমি উপলব্ধি করছি, নিছকই আমার সন্দেহপ্রবণ মনের কল্পনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। কারণ তাঁর মধ্যে এই মুহূর্তে আমি না দেখতে পাচ্ছি চাতুর্য, না দেখতে পাচ্ছি অস্বচ্ছ বা মিথ্যা কিছু এবং তার ফলে আমার ভেতর বৈরিতার ছিটেফোঁটাও থাকল না, পরিবর্তে উথলে উঠল সহানুভূতি ও সমর্থন। ডিনার শেষ হওয়ার আরো অনেক পরে, ডাইনিং হল ইতিমধ্যে খালি হয়ে গেছে, ওখানে বসে নিজেদের চুরুটে মাঝেমধ্যে টান দিচ্ছি দুজন; রাজনীতি, সাহিত্য, শিল্পকলা ইত্যাদি বিষয়ে ইঙ্গিত দেওয়ার ধাঁচে কথা বলছি, দুজন বন্ধুর মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে যেটা খুব ভালো কাজ দেয়। চরম উত্তেজনায় ভরপুর মহাকাণ্ডই বলতে হবে ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারির ঘটনাকে। ওই বিপ্লব, প্রথমে সবার মনে খুব আশা জাগিয়েছিল; কিন্তু তারপর এমন প্রচণ্ডতার সঙ্গে মুখ থুবড়ে পড়ল যে গোটা সমাজে অস্থিরতার সীমা-পরিসীমা থাকল না। নির্বাচনপদ্ধতি ঢেলে নতুন করে সাজানোর দাবিতে ফ্রান্সের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে গলা ফাটাচ্ছে, তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে; নিন্দা করছে সমাজের ওপরমহলে ছড়িয়ে পড়া নানা ধরনের অরুচিকর সব কেলেঙ্কারির। ফ্রেঞ্চ ডাচেস প্রাসলিন হত্যাকাণ্ড, মিস্টার টেস্টির অসম্মান, যেটার সমাপ্তি ঘটল আত্মহননে, লোকে বলাবলি করতে লাগল, এসব হলো আসন্ন ধ্বংসকাণ্ডের আলামত। গুরুত্বপূর্ণ কিছু শহরে অনুষ্ঠিত রাজনৈতিক ডিনারগুলো সাধারণ মানুষের মনে আগুন ধরানোর জ্বালানি হিসেবে কাজ করল, দূরদৃষ্টি আছে এমন সব মানুষ জেনে ফেললেন এই সব ডিনার আসলে ঘণ্টাধ্বনি হিসেবে ভূমিকা রাখছে, অর্থাৎ যেকোনো মুহূর্তে দোরগোড়ায় বিপদ চলে আসবে। ফ্রান্সের কাছে ঘৃণার পাত্র হয়ে উঠলেন লুইস ফিলিপ, গোটা ইউরোপেও তাঁকে অপছন্দের মানুষ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গেজো ও দুশ্যাটেল, ওই সময়ের দুজন মন্ত্রী, যদিও পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের পৃষ্ঠপোষকতা ও সমর্থন পাচ্ছেন এবং সেগুলোর ওপর তাঁরা অন্ধের মতো নির্ভরও করেন, পরিস্থিতির কারণে হয়ে উঠলেন বাকি সবার কাছে অজনপ্রিয়, এমনকি বলা হতে লাগল ইউরোপীয় ভক্তরাও বোকার মতো অযৌক্তিক সমর্থন দিচ্ছে তাঁদের। স্প্যানিশ বিয়েগুলো আর কিছু করতে পারুক বা না পারুক, ইংল্যান্ডের সঙ্গে যুদ্ধ ঠিকই বাধিয়ে দিল। টিয়ার ও ওডিলন ব্যারট, এ দুই নেতার দূরদৃষ্টির কারণে রিপাবলিকান পার্টির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে ভালোই শক্তি সঞ্চয় করল বিরোধী দল; ওই সময় রিপাবলিকান দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন লেডলু রলিন, ম্যারাস্ট, ফ্লকন আর লুই ব্ল্যাংক।

বুরগনেফ রিপাবলিকান পার্টির যাকে বলে একেবারে অন্ধ সমর্থক। সেটা আমিও; তবে দুজন একই দলের সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও আমার সঙ্গে তাঁর পার্থক্য আছে, দুজনের রং এক নয়। বুরগনেফ লাল শাখায়। আমার দুর্দান্ত প্রবণতা হলো শিল্প-সংস্কৃতির মধ্যে থাকা, সাহিত্যচর্চা করা এবং স্বপ্ন দেখি এমন একটা রিপাবলিকের, যেটাকে শাসন বা নিয়ন্ত্রণ করবে বুদ্ধিমত্তা এবং অবশ্যই এ রকম একটা রিপাবলিক পরিচালিত হবে শিল্পবোধ আর সাহিত্যরসের সংমিশ্রণে তৈরি নির্যাস থেকে পাওয়া দিকনির্দেশনায়, এসব যেহেতু মানুষের মগজ থেকে পাওয়া সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। আপনি কি হাসছেন, পাঠক? এখন আমিও হাসছি; কিন্তু ওই সময় ব্যাপারটা ছিল অত্যন্ত জরুরি একটা লক্ষ্য। এ বিষয়ে আর কিছু বলবার প্রয়োজন নেই। আমি আমার নতুন বন্ধুর সঙ্গে যে মতবিনিময় করেছি তার সারমর্ম পরিবেশন করতে গিয়ে অনেক কথা বলেছি; সংক্ষেপে সেটা ছিল এ রকম : আমরা অনেক বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছি আবার অনেক বিষয়ে পরস্পরকে সমর্থনও করেছি এবং তা থেকে একটা সত্য বেরিয়ে এসেছে—সব মিলিয়ে আমাদের সমাজটা সত্যি খুব বিস্ময়কর এবং মুগ্ধ করবার মতো।

সেদিন বিকেলে নিজের কামরায় ফিরে আসবার পর চুরুট খাচ্ছি, গ্লাসে খানিকটা হুইস্কি নিয়ে মাঝেমধ্যে দু-একটা চুমুকও দিচ্ছি আর ভাবছি। বিষয়টা নিয়ে যত ভাবছি, ততই হাসি পাচ্ছে আমার। আমি আসলে না হেসে পারছি না। বুরগনেফ সম্পর্কে আমার উদ্ভট বৈরী ভাব সত্যিকার অর্থে এতটাই উদ্ভট যে যাকে শোনাব সে-ই হেসে গড়াগড়ি খাবে। তাঁর প্রতিটি মন্তব্য থেকে বেরিয়ে এসেছে তিনি শিল্প-সাহিত্যের একজন বোদ্ধা, রাজনীতির গভীর তাৎপর্য সম্পর্কে সচেতন, অত্যন্ত পরিশীলিত মানসিকতার অধিকারী, তা ছাড়া খুব দৃঢ়চেতাও বটেন, সবচেয়ে বড় কথা তাঁর আছে অসম্ভব উদার ও স্পর্শকাতর একটা মন। বুরগনেফের প্রতি আমার বৈরী মনোভাবের অন্যতম কারণ ছিল, আমার মনে হতো তাঁর হাসির মধ্যে ভুয়া বা মিথ্যা কী যেন একটা আছে। ভুয়া, মিথ্যা, কৃত্রিম—তিনি খারাপ মানুষ হলে তাঁর হাসিতে তো এগুলোর একটাও থাকবার কথা নয়, কারণ তা থাকলে লোকজন জেনে ফেলবে তিনি মানুষ হিসেবে ভালো না। যাঁর মাথায় এটুকু বুদ্ধি নেই তিনি কিভাবে আমার শত্রু হওয়ার উপযুক্ত হবেন, আপনিই বলুন? পরে যখন খুঁটিয়ে দেখতে গেছি, আমি তাঁর হাসি ও কথাবার্তায় শুধু সহৃদয়তা আর আন্তরিকতা ছাড়া আর কিছু দেখতে পাইনি। না, নির্দিষ্ট পরিমাণ গাম্ভীর্য যে একেবারে চোখে পড়েনি তা নয়, তবে সেটার অন্তর্নিহিত কারণ হতে পারে নাছোড় গর্ব।

সেদিনই সন্ধ্যায় আমার গঠনমূলক কল্পনাশক্তি খুঁটিনাটি নানা তথ্যে সমৃদ্ধ হলো এবং আমি বুঝতে পারলাম খুব তাড়াতাড়ি সাহস আর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজে হাত দেওয়া হবে। প্রাচীন দুর্গ নিয়ে এর আগে অনেক কথা বলেছি আমি, রাত বেশ একটু গাঢ় হওয়ার পর ওদিক থেকেই হেঁটে ফিরছিলাম। ফিরছি আলবার্ট ডুরেরের বাড়ি থেকে। কাজেই আমাকে পুরনো খিলানের নিচ দিয়ে আসতে হবে। ওখান দিয়ে যখন আসছি, এক লোক আমাকে পাশ কাটাল। পরস্পরের দিকে আমরা তাকালাম, সরু একটা জায়গায় মানুষ যেভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একজন আরেকজনের দিকে তাকায়, সেভাবে; তাকাতেই আমার অন্য রকম একটা অনুভূতি হলো। অন্য রকম অনুভূতি মানে—না, না, আমি ঠিক বোঝাতে পারছি না। আমার কোনো অনুভূতি হয়নি, অর্থাৎ আমি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাইনি বা দেখালেও সেটা এখানে মুখ্য বিষয় নয়। কিছু একটা অনুভব করেছে ওই লোক, বুঝতে পেরেছি তার চোখের সচকিত প্রতিক্রিয়া দেখে। তার প্রতিক্রিয়া ছিল—ওই লোকের দৃষ্টি যেন আমাকে চিনে ফেলেছে। না, মানছি, এটা অতি সামান্য একটা ঘটনা, হয়তো একেবারেই নগণ্য। তবে দেখতে আমার কোনো ভুল হয়নি। এবং শুধু তার দৃষ্টি এর সঙ্গে জড়িত, আর কিছু না। চোখ বাদে তার শারীরিক ভাষা কিছু বলেনি, তার হাঁটার ছন্দে পতন ঘটেনি, সে আমার দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়নি বা মুখে কিছু বলেওনি। স্রেফ আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেছে।

তবে আমি ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়েছি। সে তার মাথা সোজা রেখে নিজের পথে হেঁটে গেছে। ওই লোকের মুখ নির্ঘাত আমার পরিচিত; কিন্তু সেটাকে আমি ধোঁয়াশাবহুল এবং বিভ্রান্ত কিছু স্মৃতির মাঝখানে ভেসে থাকতে দেখলাম।

ইতিমধ্যে আমার হাঁটার গতি কমে গেছে, স্মৃতির পাতায় তন্নতন্ন করে ব্যর্থ তল্লাশি চালাচ্ছি, খুঁজে বের করতে চাইছি এই লোককে কবে কোন জায়গায় দেখেছি আমি। আমার মন ছুটে গেল ইউরোপের বিভিন্ন কনসার্ট হলে, থিয়েটারে, দোকানপাটে, খেলার মাঠে, রেলগাড়ির কম্পার্টমেন্টে, বাসে, স্টিমারে। কিন্তু একদম কিছু মনে পড়ছে না। ওই চোখ আগেও আমাকে দেখেছে, ওই দৃষ্টি একবার যার চোখের ওপর পড়বে, সেটা তার পক্ষে ভোলা অসম্ভব। আমিও ভুলিনি। ভুলিনি, অথচ মনে পড়ছে না কোথায় সেটা ঘটেছিল।

আমি যে এসব শুধু ভাবছি, তা নয়; দেরিতে হলেও ওই লোকের পিছু নিয়ে হনহন করে হাঁটাও ধরেছি একসময়। লোকটা যে খুব জোরে হাঁটছিল, তা নয়। তাই মনে আশা ছিল ঠিক ধরে ফেলব আমি তাকে, বিশেষ করে যখন জানি কোন দিকে গেছে সে। কিন্তু পরিস্থিতি যখন বিরুদ্ধে চলে যায়, শত চেষ্টা করলেও মনের আশা পূরণ হয় না। রাস্তায় আলো কম, সেটা ঠিক; তার পরও লম্বা রাস্তাজুড়ে বেশ কজন লোককে আমি দেখতে পেলাম, তাদের হাঁটার ধরন দেখে পরিষ্কার বুঝতে পারলাম এদের মধ্যে ওই লোক নেই। তাহলে গেল কোথায় সে? কোথায় আর যাবে, ডানে-বাঁয়ে কোনো গলিতে ঢুকে আমার দৃষ্টিপথের বাইরে চলে গেছে, তারপর আরেকটা বাঁক নিয়েছে, আমি ওই গলির ভেতর তাকানোর আগেই।

আধমাইলের বেশি হেঁটে আমি হাল ছেড়ে দিলাম, ফিরে যাচ্ছি নিজের পথে। লোকটাকে আমি খুঁজে পাইনি নিজের দোষে; কিন্তু আমার মনকে আমি সেটা একদম মানাতে পারছি না। মন বলছে, লোকটা জানত আমি তার পিছু নেব। তাই ইচ্ছা করে কোথাও লুকিয়ে পড়েছে, চায়নি আমি তাকে খুঁজে পাই।

একটা প্রতিজ্ঞা নিলাম, ওই লোককে আবার আমি দেখব, মানে আমি তাকে খুঁজে বের করব। আর একবার যদি তার দেখা পাই, ছাড়াছাড়ি নেই, তাকে আমি জিজ্ঞেস করব কে সে, এর আগে তার সঙ্গে আমার কোথায় দেখা হয়েছিল, কেন দেখা হয়েছিল।

প্রতিধ্বনি উঠল—খুন খুন

 

পরদিন সকালে ন্যুরেমবার্গ শোকে আকুল হলো, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল আতঙ্ক, সবাই বলাবলি করছে, এখানকার শান্তিময় পরিবেশ আগে কখনো এভাবে নষ্ট হতে দেখা যায়নি। এত সুন্দর আর এত কম বয়সী কোনো সুন্দরী মেয়ে এই প্রায় স্বর্গীয় শহরে কিভাবে খুন হতে পারে? এ রকম আদর্শ একটা জায়গায় কারো প্রাণ হরণের মতো অক্ষমনীয় অপরাধ কে করবে? ওর লাশটা পাওয়া গেছে ভোরের আলো ফোটার পর, পুরনো খিলানের ঠিক নিচে, প্রাচীন দুর্গের দিকে যাওয়ার পথে। মৃত্যুর কারণ নিয়েও কারো মনে কোনো সংশয় নেই। ওর হৃৎপিণ্ডে ছুরি গাঁথা হয়েছে। জখমের আর কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না; কিছু ছিনিয়ে নেওয়ার বা ডাকাতি করবার চেষ্টা করা হয়নি।

তবে একটা হত্যাকাণ্ডের পেছনে যদি কোনো রোমান্টিক কারণ থাকে কিংবা যদি থাকে নানা নাটকীয় বাঁক আর ঘটনার ঘনঘটা, আমাদের সবার মনোযোগ কেড়ে নেবে সেটা, আমরা সহানুভূতি জানাব, কী ঘটল জানার জন্য ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষায় থাকব। আরো এক ধরনের হত্যাকাণ্ড মনোযোগ কেড়ে নেয়, যদি কোনো প্রতিবেশী খুন হয়ে যায়। টাইমসে যেসব মার্ডার সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা হয়, সাধারণ মানুষের তাতে কোনো আগ্রহ নেই, আগ্রহ নেই যারা আইলিনটনে বা অক্সফোর্ড স্ট্রিটে থাকে। ওয়েস্টমিনস্টারে কে খুন হলো না হলো, তাতে তাদের কী? তবে ওখানকার খুন ওদিকের মানুষের মধ্যে খুব সাড়া ফেলে। সবাই আসলে যার যার নিজের এলাকা নিয়ে সচেতন থাকতে চায়।

শহরে খুন হওয়াও একটা বিড়ম্বনা কিন্তু। বিড়ম্বনা কার জন্য জানেন? যার তেমন কোনো আগ্রহ নেই তার জন্য। কারণ হলো, কারো আগ্রহ থাক বা না থাক, কোথাও কেউ খুন হয়ে গেলে সেটাকে নিয়ে দু-পাঁচটা মহল্লাজুড়ে যে গবেষণা শুরু হয়, সেটার সঙ্গে দুনিয়ার অন্য কিছুর তুলনা চলে না।

গ্রামগুলোতে এবং ন্যুরেমবার্গের মতো ছোট শহরেও সমাজের সম্মিলিত আবেগ ও অনুভূতি প্রায় ওই একই রকম। শহর হয়ে ওঠে একটা রাস্তা। আতঙ্ক ছড়ায় দাবাগ্নির মতো, দরদ ফুলেফেঁপে ওঠে স্রোতের মতো। ঘটনার প্রতি প্রত্যেকে ব্যক্তিগত আগ্রহ অনুভব করে, যেন খুনের ঘটনাটা তার নিজের দরজায় ঘটেছে।

হের লেফেলডেট, দুর্ভাগা মেয়েটার বাবা, সবার শ্রদ্ধাভাজন একজন শহুরে মধ্যবিত্ত, প্রায় সবাই তাঁকে চেনে। তাঁর মূল্যবান কাপড়ের দোকান শহরের সেরা দোকানগুলোর একটা। শুধু যে টাকা-পয়সা আছে তা নয়, অত্যন্ত ধার্মিক মানুষ তিনি, ধর্মীয় সমস্ত বিধি-বিধান কঠোরভাবে মেনে চলেন; শহরের ভেতর বা বাইরে এমন কেউ নেই যে বলতে পারবে হের লেফেলডেটের চরিত্রে কখনো কোনো কালিমা লেগেছে বা তাঁর অমুক স্বভাব বা অভ্যাসটা নিন্দা করবার যোগ্য। এই একই কথা বলতে হবে তাঁর স্ত্রী সম্পর্কেও, তিনিও অত্যন্ত ধার্মিক এবং সমাজের সব বিধি-বিধান নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলেন এবং মেয়েটাও ছিল ঠিক তাঁদেরই মতো। কিন্তু এত ভালো হওয়ায় লাভ কী হলো? ভালো থাকবার কষ্ট তো কম না। এত কষ্ট করে এই যদি হয় ফল, তাহলে ভালো থাকবার দরকারটা কী, বলুন? এই প্রশ্ন অবশ্য কেউ উচ্চারণ করে না বা করছেও না, তবে সবার মনেই ফণা তুলছে।

লেইকেন, মেয়েটার নাম, সবার প্রিয়পাত্রী ছিল। দ্রুত এই খবর রটে গেল—ভালো একটা মেয়ে খুন হয়ে গেছে, মা-বাবার চোখের একটা অমূল্য মণিকে খুনির ধারালো ছুরি হত্যা করেছে। মানুষের রাগ হওয়া স্বাভাবিক। দলে দলে ছুটে এলো তারা, কেউ আস্তিন গুটিয়ে, কেউ অস্ত্র নিয়ে, কেউ চোখের পানি ফেলতে ফেলতে, কেউ পাগলপারা হয়ে। তারপর ছড়িয়ে পড়ল, মেয়েটা ছিল সুন্দরী অপরূপা। মানুষের রাগে যেন এবার ঘি পড়ল। ক্ষোভে, ঘৃণায়, অজ্ঞাত খুনির প্রতি আক্রোশে ফেটে পড়ল সবাই। লেইকেন, আমাদের প্রিয় লেইকেন, নেই। তাকে আর হাসতে দেখা যাবে না। তাকে আর তুষারের বল বানিয়ে ছুড়তে দেখা যাবে না। লেইকেনের বন্ধুবান্ধব কেঁদে সারা হলো, নানা স্মৃতি স্মরণ করে প্রলাপ বকছে সারাক্ষণ। তাদের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে আগন্তুকরাও কাঁদতে লাগল, প্রলাপ বকবার সময় একই গল্প স্মরণ করছে, যেন তারাও তাকে চিনত, তার বন্ধু ছিল, ভালোবাসত তাকে। এ আর কিছু নয়, একজনের ক্ষতিতে আরেকজনের সহানুভূতি। দুঃখী মানুষের সঙ্গে থাকা, একাত্ম বোধ করা। তবে এত রকমের হৈচৈ আর চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যে একটা কণ্ঠস্বরও পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে না, কে কী বলছে বোঝার কোনো উপায় নেই, যদি না বক্তার মুখের কাছে আপনি কান পেতে থাকেন। এমন একটা কথাও শোনা গেল না, যেটাকে সূত্র বলা যায়, যে সূত্র ধরে খুনিকে ধাওয়া দেওয়া যাবে বা তাকে ধরবার চেষ্টা করা যাবে।

তারপর একসময় জানা গেল, ওই রাতে শহরের বেশ কটা রাস্তায় কান্না আর চিৎকারের শব্দ শোনা গেছে, যদিও সেগুলোকে প্রথমে মাতালে মাতালে মারামারি বা বিড়ালদের ঝগড়া বলে ধারণা করা হয়েছিল। এখন দৃঢ়তার সঙ্গে বলা হচ্ছে, ওগুলো ছিল দুর্ভাগা মেয়েটার চাপা আর্তচিৎকার, বাঁচবার শেষ চেষ্টা হিসেবে খুনির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইছিল এবং হয়তো খুনির সঙ্গে মরণপণ ধস্তাধস্তি করার সময় পাড়া-প্রতিবেশীদের সাহায্যও চাইছিল। তবে একটা কথা, এসব চিৎকার-চেঁচামেচির একটাও কিন্তু পুরনো খিলান বা সেটার কাছাকাছি কোথাও থেকে আসেনি। এটা থেকে এই সত্য বেরিয়ে আসে যে লেইকেনকে অন্য কোথাও খুন করা হয়েছে এবং পরে তার লাশ বয়ে নিয়ে এসে ফেলে রাখা হয়েছে পুরনো খিলানের কাছে, ভোরের আলো ফোটার পর যেখানে ওর মৃতদেহ দেখতে পাওয়া গেছে। সন্তুষ্ট হওয়া যায় এমন একটা উপসংহারে পৌঁছানো যাচ্ছে না, সব কেমন অস্পষ্ট, ঝাপসা আর বুনো লাগছে। নির্দিষ্ট একটা দিকনির্দেশনা দিতে গিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে সংশ্লিষ্ট সবাই। অনেক লোকই বলছে খুনটা করা হয়েছে প্রতিশোধ হিসেবে, লোভ বা লালসা চরিতার্থ করার জন্য নয়। যতটুকু জানা গেল লেইকেন নিজের সঙ্গে টাকা-পয়সা রাখত না, তার মানে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য ওকে খুন করা হয়নি। ওর সঙ্গে গয়না ছিল সামান্যই, তবে যা ছিল তার সবই খুব দামি, সেগুলো খুনি নিয়ে যায়নি।

প্রতিশোধ? এর চেয়ে হাস্যকর কিছু হতে পারে না, সবাই একবাক্যে বলছে কথাটা। লেইকেন ছিল মাটির মানুষ, কারো পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর মতো মন-মানসিকতা কখনো ছিল না ওর। যেহেতু কোনো গ্রহণযোগ্য মোটিভ পাওয়া যাচ্ছে না, রাগে ফুঁসতে থাকা ভিড়ের মধ্যে সম্ভবত একা আমিই কাউকে খুনি বলে খুব জোরালো সন্দেহ করতে পারছি। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর যেইমাত্র আমার কানে এসে পৌঁছেছে, আমি সঙ্গে সঙ্গে থিয়েটারে পরিবেশনের যোগ্য করে এই অপরাধকে সাজিয়ে ফেলেছি এবং যেন দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পেয়েছি খুনি লোকটাকে : গাঢ় দাড়ি নিয়ে সেই আগন্তুক, খিলানের নিচে যে লোক আমাকে পাশ কাটিয়েছিল, যে লোকের দৃষ্টি আমাকে দেখে বিহ্বল বা সচকিত হয়ে পড়েছিল! কয়েক মুহূর্ত আমি দম আটকে রাখলাম, আর তার পরই প্রতিবাদের একটা ঢেউ জাগল আমার মনে, উন্মোচন করল আমার সন্দেহের ভিত যথেষ্ট মজবুত নয়। নিজেকে প্রশ্ন করলাম, কিসের ওপর ভিত্তি করে এই লোককে খুনি হিসেবে সন্দেহ করছি আমি? নির্দিষ্ট একটা স্পটে সন্ধের খানিক পর এক লোককে দেখেছি, একই দিন রাত আরো গভীর হতে লেইকেনকে খুন করার অপরাধ সংঘটিত হয়েছে ওখানে, আমার মনে হয়েছে লোকটা চিনতে পেরেছে আমাকে এবং চেয়েছে আমি যেন তাকে চিনতে না পারি। বোঝাই যাচ্ছে এখানে ওই লোককে সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই, আমি শুধু শুধু কল্পনার লাগাম ছেড়ে দিচ্ছি। ওখানে আমার উপস্থিতি, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে, আমাকে অভিযুক্ত করার জন্য যথেষ্ট নয়; একইভাবে ওখানে তার উপস্থিতি তাকে অভিযুক্ত করার জন্য যথেষ্ট নয়। ওখানে আমার সঙ্গে তার যেমন দেখা হয়েছে, একই সঙ্গে ওখানে তার সঙ্গে দেখা হয়েছে আমারও। সে আমাকে চেনে, আমার এই সন্দেহ যদি সত্যি হয়ও, যদি সত্যি হয় আমাকে চিনতে প্রস্তুত কিংবা রাজি ছিল না সে, তাহলেও কিন্তু আমি তাকে লেইকেনের খুনি বলে সন্দেহ করতে পারি না। তার হয়তো মন ভালো ছিল না, সে হয়তো কারো ওপর খুব রেগে ছিল। তাই স্বল্প পরিচিত আমাকে দেখে ভাব দেখিয়েছে আমাকে চেনে না। মানুষের মাথায় কত রকম চিন্তা থাকে, তার মেজাজও সব সময় এক রকম থাকে না। সে হয়তো নিজের সঙ্গে কোনো ব্যাপারে বোঝাপড়া করার জন্য কোথাও একা বসতে যাচ্ছিল; এ রকম অবস্থায় আমি হলেও এই একই আচরণ করতাম। তা ছাড়া লোকটা খুব শান্ত ও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছিল এবং তাকে দেখে নিখাদ একজন ভদ্রলোক বলেই মনে হয়েছে আমার। এ রকম আরো আপত্তি আর প্রতিবাদ আমার ওপর চাপ দিচ্ছে, চুপ করে থাকতে বাধ্য করছে আমাকে। কিন্তু মুশকিল হলো এত চাপ সত্ত্বেও সন্দেহটা আমি দমিয়ে রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলাম, সেটা বরং প্রতিমুহূর্তে আরো বাড়ছে। কথাটা কাউকে বলতে লজ্জা পাচ্ছি, যাকে বলব তার কাছে উদ্ভট বলে মনে হবে এই ভয়ে।

দুপুর বারোটার দিকে গুজবে নতুন একটা দিক যোগ হলো। এই পর্যায়ে এসে খুব সতর্কতার সঙ্গে অতিরঞ্জিত অংশটুকু বাদ দিয়ে, উদ্ভট আন্দাজ পরিহার করে গল্পটা এই রকম দাঁড়িয়েছে : লেফেলডেট পরিবার রাত দশটা বাজার পনেরো মিনিট আগে খাওয়াদাওয়া শেষ করে বিছানায় উঠেছিল, এটাই তাদের অভ্যাস। লেইকেনকে তারা ওর কামরায় ঢুকতে দেখেছে এবং মনে কোনো রকম দ্বিধা, অশান্তি বা সন্দেহ ছাড়াই নিজেরাও নিজেদের ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়েছে। তাদের শান্তিময় রাত পার হয়ে ভোর হয়েছে, তারপর ঘুম ভেঙেছে, বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো তাদের জানানো হয়েছে, পুরনো খিলানের নিচে যে রক্তাক্ত লাশটা পড়ে আছে, সেটা তাদের একমাত্র সন্তান লেইকেনের।

প্রথমে তারা এই খবর বিশ্বাস করেনি। কোনো কারণ ছাড়া, কোনো আভাস ছাড়া এভাবে একটা পরিবার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে না, তখন হয়তো এটাই ভেবেছে তারা এবং তখনো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেছে যে তাদের মেয়ে ওর নিজের ঘরে শুয়ে আছে, অঘোরে এবং নিরাপদে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু পাঁচ-সাত সেকেন্ড পর পর খবরটা বারবার আসতে লাগল এবং যারা খবর নিয়ে আসছে, তারা সবাই বলছে নিজেদের চোখে লাশ দেখে এসেছে। অগত্যা পরিবারের লোকজন লেইকেনের ঘরের দিকে ছুটল, ভাবছে এখানে নিশ্চয়ই কোনো ভুল-বোঝাবুঝির ব্যাপার আছে। সেখানে গিয়ে তারা দেখল বিছানার চাদরে কোনো ভাঁজ পড়েনি, অর্থাৎ লেইকেন ওই বিছানায় শোয়নি, তারপর দেখল ঘরের জানালা খোলা, যে জানালা থেকে নিচের বাগান মাত্র কয়েক ফুট নিচে, কাজেই কী ঘটেছে বুঝতে বাকি থাকল না তাদের। হতভম্ব মা-বাবা পরস্পরের রক্তশূন্য সাদা মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেন, সত্য উপলব্ধি করার পর সেখানে শোক আর বিষাদ জমতে শুরু করেছে, তারপর ধীর পায়ে লেইকেনের কামরা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের ঘরে ঢুকলেন। বিছানার পাশে হাঁটু গাড়লেন বাবা, ফোঁপাচ্ছেন, প্রার্থনা করছেন। মা বোকা হয়ে গেছেন, তাঁর শূন্য দৃষ্টিতে বুদ্ধি বলে কিছু নেই, ঠোঁট দুটো একটু একটু নড়ছে বা কাঁপছে। কিছুক্ষণ পর শোকের প্লাবন, ইন্দ্রিয়গুলো যেটার অর্গল খুলে দিয়েছে, ওভারটাইম খাটতে থাকা হার্টের মাধ্যমে বিস্ফোরিত হলো। কান্নাকাটি আর আহাজারির প্রথম ঢেউটা সরে যাওয়ার পর তাঁদের বাড়িতে যারা এসেছে তাদের দু-চারটে প্রশ্ন করলেন তাঁরা এবং তাঁদের যেসব প্রশ্ন করা হলো সেগুলোর জবাবে অস্পষ্ট দু-একটা কথা বললেন, যেগুলোর অর্থ বের করা খুব কষ্টকর। তবে শেষ পর্যন্ত সব মিলিয়ে এটুকু বোঝা গেল—তাঁদের দৃষ্টিতে লেইকেনের এই স্বেচ্ছায় ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো ব্যাখ্যা তাঁদের জানা নেই এবং এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী মোটিভ থাকতে পারে সে সম্পর্কে তাঁরা কোনো সূত্র দিতে পারবেন না। বিশদ বিবরণ যখন জানাজানি হয়ে গেল, স্বভাবতই লোকজন আলোচনা করতে লাগল, রাতের বেলা নিজ বাড়িতে লেইকেনের অনুপস্থিতির জন্য দায়ী গোপন কোনো সাক্ষাৎ। কিন্তু সেই গোপন সাক্ষাৎ কার সঙ্গে? ওর কোনো প্রেমিক ছিল, এমন সাক্ষ্য দিতে কেউ এগিয়ে এলো না। ওর বাবাকে জেরা করা হলো, তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে জানালেন, না, তাঁর মেয়ে কারো সঙ্গে গোপনে প্রেম করত না, করলে তাঁরা অবশ্যই জানতে পারতেন। ভদ্রলোক আরো বললেন, লেইকেন ওর মা-বাবাকেই শুধু ভালোবাসত, আর কাউকে নয়। ‘হায়, আমার সোনার মেয়ে!’ বলে আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেললেন তিনি।

ওর মা, প্রশ্ন করা হলে, ওই একই গল্প শোনালেন—তবে তাতে অন্য একটা বিষয় যোগ করলেন। কী সেটা? না, মানে, প্রায় সতেরো মাস আগে মায়ের মনে সন্দেহ জেগেছিল, ক্ষীণ হলেও ফ্রাঞ্জ কেরকেলের প্রতি লেইকেনের দুর্বলতা জন্মেছে। ফ্রাঞ্জ কেরকেল কে? অতি সাধারণ একটা ছেলে, তাঁদের দোকানে কাজ করে। যা-ই হোক, মা যখন গুরুগম্ভীর একটা ভাব নিয়ে এ বিষয়ে মেয়েকে প্রশ্ন করলেন এবং বললেন তিনি চান কেরকেল আর লেইকেন যেন যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে চলে, তখন তাঁর মেয়ে লেইকেন গলা ছেড়ে হেসে উঠেছিল, বলেছিল আইডিয়াটা উদ্ভট আর হাস্যকর লাগছে ওর। তবে সেই থেকে মায়ের চোখে সন্দেহ করার মতো আর কিছু ধরা পড়েনি। তিনি দেখেছেন তার পর থেকে লেইকেন ওই ছেলের সঙ্গে নির্লিপ্ত আচরণ করছে, দেখে তিনি স্বস্তি বোধ করেছেন। তবে মেয়ে একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলছে দেখে গত সপ্তাহে ওকে তিনি তিরস্কার করেছেন।

‘আমি লেইকেনকে বলেছিলাম ফ্রাঞ্জ একটা ভালো ছেলে, যদিও তোমার জন্য যথেষ্ট ভালো নয় এবং তুমি অবশ্যই ওই ছেলের সঙ্গে অকারণে রূঢ় আচরণ করবে না। ’

‘উত্তরে কী বলেছিল লেইকেন?’

‘মা, তুমি আমাকে এমন লেকচার শুনিয়েছিলে, আমি তো রীতিমতো ভয় পেয়ে গেছি, আর তাই ফ্রাঞ্জের সঙ্গে এমন ব্যবহার করছি, সে যাতে আমাকে নিয়ে মাথা না ঘামায়। ’

এই গল্প এখন প্রতিটি রাস্তায় পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, এক ভিড় থেকে আরেক ভিড়ে। একসময় সেটা আমার কানেও এলো। অ্যাডেলগ্রাসে গেলাম আমি, ঢুকলাম এক টোব্যাকোনিস্টের দোকানে, আমার সিগার-কেসটা ভরব। যেকোনো টোব্যাকোনিস্টের দোকানে যান, নির্ঘাত দেখতে পাবেন লোকজন জড়ো হয়ে গল্পগুজব করছে। এখানেও তার ব্যতিক্রম দেখলাম না। ভাবলাম ভালোই হলো, এখান থেকে হয়তো নতুন কোনো তথ্য বা নিদেনপক্ষে এক-আধটা তাজা গুজব শুনতে পাব। এই সময়কার আলোচ্য বিষয় তো একটাই, লেইকেন হত্যাকাণ্ড। এখানেও সেটা নিয়েই কথা বলছে লোকজন। হের ফিশার, টোব্যাকোনিস্ট, আঁটসাঁট বন্ধ জোড়া ঠোঁটে আটকানো চীনামাটির তৈরি পাইপ ঝুলছে, ক্রেতাদের একজন কী বলছেন মন দিয়ে শুনছেন। বক্তাকেও চিনি আমি, একজন বাভারিয়ান প্রিস্ট, গাট্টাগোট্টা কাঠামো। কাউন্টারের পেছনে বসে রয়েছেন, এক কোণে, দ্রুত হাতে কিছু একটা বুনছেন, হের ফিশারের স্ত্রী।

‘কী খবর বলেন, মহোদয়। নতুন কিছু কি জানা গেল? নাকি সবাই সেই পুরনো গুজবগুলোই চিবিয়ে চিবিয়ে ছিবড়ে বানাচ্ছে?’

‘আছে, তাজা খবর আছে,’ বললাম আমি, লক্ষ করলাম সঙ্গে সঙ্গে ছোট্ট মহিলার বুননের কাজ থেমে গেল। তারপর কেরকেল সম্পর্কে যতটুকু শুনেছি বললাম তাঁদের।

‘ওয়াও!’ বিস্ময় প্রকাশ করলেন মহিলা। ‘আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। সে-ই নাটের গুরু!’

‘কে?’ আমরা সবাই একযোগে জানতে চাইলাম।

‘কে? কে মানে? কেরকেল, অবশ্যই। মেয়েটা যদি বদলে গিয়ে থাকে এবং ছেলেটার সঙ্গে নির্লিপ্ত আচরণ করে থাকে, তার কারণ ওই মেয়ে ওই ছেলেকে ভালোবাসত এবং মেয়েটাকে তার পাওয়া হবে না বুুঝতে পেরে রাগে আর দুঃখে বেচারিকে খুন করে ফেলেছে। ’

‘কিভাবে তুমি এ রকম একটা কথা বলতে পারছ, বউ!’ তিরস্কারের সুরে বললেন ফিশার, প্রিস্টকে দেখা গেল এদিক-ওদিক মাথা নাড়ছেন।

‘তোমরা যে যা-ই বলো, আমি নিজের বিশ্বাসের কথা বলেছি। এ ব্যাপারে আমি পজিটিভ। ’

‘যদি মেয়েটা ভালোবাসত তাকে। ’

‘বাসত, সে ওই ছেলেকে ভালোবাসত। এ ধরনের বিষয়ের গভীরে কী আছে জানতে হলে একজন নারীর ওপর আস্থা রাখা উচিত তোমাদের। ’

‘আচ্ছা, ধরা যাক ছেলেটাকে ভালোবাসত সে,’ ফিশার বললেন, ‘আমি স্বীকার করছি এ রকম কিছু ঘটলেও ঘটতে পারে; কিন্তু তা যদি সত্যি হয়, তাহলে ওই ছেলে মেয়েটার ক্ষতি করবে বললে সেটা অসম্ভব বা মিথ্যা হয়ে যায় নাকি? যাকে ভালোবাসবে, তার ক্ষতি করবে? না, না, না! এ রকম হতে পারে না!’

‘নিজের যুক্তি সাজিয়ে আমাকে কিছু বোঝাতে এসো না তুমি,’ গলায় প্রচুর ঝাঁজ ঢেলে বললেন তাঁর বউ, নিজের বিশ্বাস থেকে একচুল নড়তে রাজি নন। ‘ওই মেয়ে প্রেমে পড়েছিল। ছেলেটার সঙ্গে দেখা করতে গভীর রাতে বাড়ি ছেড়েছিল এবং নির্জন রাতে ওকে একা পেয়ে প্রতিশোধ গ্রহণ করেছে ছেলেটা—প্রেমিকাকে খুন করে। এটা প্রেমিকার ওপর প্রতিশোধ বলে ভাবছ কেন তোমরা? এটা তো আসলে লেইকেনের মা-বাবার ওপর প্রতিশোধ। কারণ তাঁরা বাধা হয়ে দাঁড়ানোতেই তো লেইকেনকে বিয়ে করতে পারছিল না সে। ওই ছেলেই ভিলেন, এটা আমি লিখে দিচ্ছি। এ ব্যাপারে আমি এতটাই নিশ্চিত, আমি যেন নিজের চোখে ঘটনাটা ঘটতে দেখেছি—নিজের হাতে লেইকেনকে খুন করছে ওই ছেলে। ’

 

এবং দুপুর বারোটার দিকে আমি যেমনটা বলেছি, রাস্তার মোড়ে মোড়ে নতুন একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ল, যেটা প্রমাণ করল ছোটখাটো মহিলার খোঁড়া যুক্তিগুলো একদম ফেলনা ছিল না। কেরকেলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, তার কামরা থেকে রক্তের দাগ লাগা একটা ওয়েস্টকোটও উদ্ধার করা হয়েছে! সাড়ে বারোটার মধ্যে, মাত্র আধঘণ্টা পর, গুজব শোনা গেল কেরকেল নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। এটাই, বলাই বাহুল্য, সাধারণ মানুষ চাইছিল। মানুষ যা ভেবেছে তা-ই সত্যি হয়েছে, শহরজুড়ে সে কী উত্তেজনা আর উল্লাস! কেরকেলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছে, তার ঘর থেকে রক্তমাখা ওয়েস্টকোট উদ্ধার করা হয়েছে—একসঙ্গে কত নিরেট আর নিখাদ প্রমাণ!

এটা হঠাৎ করে ঘটেনি, সন্দেহটা কেরকেলের ওপর ধীরে ধীরে বেড়েছে।

প্রথম যখন ফ্রাউ ফিশার নিজের ধারণা হিসেবে বললেন যে ওই কেরকেলই খুন করেছে মেয়েটাকে, সেটা দাবাগ্নির মতো গোটা শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল। তারপর লোকজন হঠাৎ করে খেয়াল করল যে সেদিন কেরকেল তার কাজে যায়নি, মানে লেফেলডেটদের দোকানে ডিউটি করতে যায়নি। এটা তো সাধারণ কোনো অনুপস্থিতি নয়, খুবই অবাক করা ব্যাপার। মানুষের বুঝতে আর কিছু বাকি থাকে? সবার সন্দেহের তীর তার ওপরই বিদ্ধ হতে লাগল। কী থেকে কী ঘটল তারও বিবরণ একটু একটু করে বেরিয়ে আসছে। কজন লোক যখন তার খোঁজে গেল, কী দেখল তারা? বা কী শুনল? ফ্রাঞ্জ কেরকেলের মা তাদের প্রথমে বাড়ির ভেতর ঢুকতে পর্যন্ত দিতে চাইলেন না, অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য ভাষায় ঘোষণা করলেন, ভান করলেন প্রচণ্ড আবেগে ও উদ্বেগে কাহিল হয়ে পড়েছেন—মনিবের মেয়ে খুন হয়েছে শুনে তাঁর ছেলে শোকে এত বেশি কাতর হয়ে পড়েছে যে কারো সঙ্গে কথা বলার অবস্থায় নেই। লোকজন ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলো। এরপর পুলিশের আর কিছু করার থাকে? সিদ্ধান্ত হলো কেরকেলকে গ্রেপ্তার করতে হবে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে এবার পুলিশ হাজির হলো কেরকেলের বাড়িতে। তার মা ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক কথাই বললেন, কিন্তু তাঁর কথা কানে না তুলে পুলিশ বাড়ির ভেতর ঢুকে তল্লাশি চালাতে লাগল। খুব বেশিক্ষণ লাগেনি, একটা রক্তমাখা ওয়েস্টকোট দেখতে পেল তারা।

কেরকেলদের বাড়িতে থাকা চাকরানি মেয়েটার জবানবন্দিতেও অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পক্ষে জোরালো প্রমাণ পাওয়া গেল। তার বক্তব্য ছিল এ রকম : আলোচ্য রাতে দাঁতে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হওয়ায় তার ঘুম ভেঙে যায়, ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে এগারোটা বাজে। সময় সম্পর্কে নিশ্চিত সে, কারণ তার ঘুম ভাঙার আধঘণ্টা পর দেয়ালঘড়িতে বারোটার ঘণ্টা পড়বার আওয়াজ শুনেছে। বাড়ির অন্য সব কামরা থেকে গলার আওয়াজ ভেসে আসছে শুনে খুব অবাক হয়ে যায় মেয়েটা। কারণ যে সময় বাড়ির কর্ত্রী আর তাঁর ছেলের অনেক আগেই বিছানায় উঠে পড়ার কথা, সে সময় ওঁদের কথা বলতে শোনা যাবে কেন? তবে কথা বলাবলি হচ্ছিল খুব নিচু স্বরে, তাই তার শঙ্কা আর উদ্বেগ কমে আসে, ধারণা করে কোনো কারণে বাড়ির কর্ত্রী এখনো বিছানায় না উঠে জেগে আছেন। দাঁতে ব্যথা নিয়ে চুপ করে শুয়ে ছিল সে, শুনতে পেল খুব অল্প শব্দ করে একটা দরজা খোলা হলো, তারপর বাগান থেকে কারো পায়ের আওয়াজ ভেসে আসতে শুনল। এটাও তাকে খুব অবাক করল। অনেক ভেবেও তার মাথায় ঢুকল না এত রাতে তার তরুণ মনিব কী কারণে বাড়ির বাইবে বেরোবে। কারণটা বুঝতে না পারলেও একটা আতঙ্ক ভর করল তার ওপর। এতই ভয় পেল, দাঁতের ব্যথাটা যেন জাদু দেখিয়ে ভালো হয়ে গেল, যেটা এখন পর্যন্ত আর ফিরে আসেনি। যা-ই হোক, নিজের বিছানায় চুপচাপ আরো কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার পর আবার বাগান থেকে ভেসে আসা পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল, তারপর দরজা খোলার শব্দটা শুনল আবার, সেটা ফের বন্ধও হলো, সব শেষে আবার শোনা গেল নিচু স্বরে আলাপ। এবং এই প্রথম সে তার কর্ত্রীর গলা স্পষ্ট শুনতে পেল, ‘তোমাকে একজন পুরুষ মানুষ হিসেবে দেখতে চাই আমি, ফ্রাঞ্জ। শুভরাত্রি—নাক ডেকে ঘুমাও। ’ মায়ের এই কথার উত্তরে সে তার তরুণ মনিবকে বলতে শুনেছে, ‘আমার কপালে আর ঘুম আছে বলে মনে হয় না। ’ তারপর পরিবেশ একদম নীরব হয়ে যায়। পরদিন সকালে তার কর্ত্রীকে খুব ‘বিদঘুটে’ লেগেছে তার। তার তরুণ মনিব অনেক ভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, তবে কিছুক্ষণ পর ফিরে আসে এবং তার ঘরে ভয় জাগানোর মতো দৃশ্য বা ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে; সে দেখেনি, শব্দ শুনে বুঝতে পেরেছে, তবে জানে না কী নিয়ে মা আর ছেলের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল। আরেকটু বেলা হতে এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে খুনের ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারে সে, তবে ভুলেও তার এ কথা মনে হয়নি যে ওই ঘটনার সঙ্গে তার তরুণ মনিবের কোনো রকমের সংশ্লিষ্টতা আছে বা থাকতে পারে, তবে এটা ঠিক যে লেফেলডেটদের জন্য সে খুব দুঃখ পাবে।

চাকরানি মেয়েটা যেসব ঘটনার বিবরণ দিচ্ছে, বিশেষ করে গভীর রাতে বাড়ি থেকে ফ্রাঞ্জ কেরকেলের বেরিয়ে যাওয়া এবং সকালে তরুণ মনিবের ঘরে ভয় জাগানোর মতো যে ঘটনা ঘটেছে, এগুলোর একটাই অর্থ দাঁড়ায়। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেল ওই মেয়ের কাছ থেকে, পুলিশ তাকে রক্তমাখা ওয়েস্টকোট দেখাতে সেটা চিনতে পারল সে, বলল, ‘হ্যাঁ, আমার তরুণ মনিবকে কাল রাতে এটা আমি পরে থাকতে দেখেছি। ’

 

অভিযুক্ত তরুণ

আমি যখন প্রথম শুনলাম কেরকেলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যিনি খবরটা আমাকে জানালেন আমি তাঁকে প্রথমেই প্রবল আগ্রহের সঙ্গে প্রশ্ন করলাম, ‘ছেলেটা কেমন দেখতে বলতে পারবেন আমাকে?’

তিনি উত্তর দিলেন, কেরকেল অনেক ফরসা, তার চোখ নীল, চুল খড়ের মতো হলুদ; আমি সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম কেরকেল নির্দোষ, তার হাতে লেইকেন খুন হয়নি।

সেদিন পুরোটা বিকেল এবং পরের দিন গোটা শহরে একটা বিষয় নিয়েই এমন কথা শোনা গেল এবং সেটা নিয়ে কারো আগ্রহই কারো চেয়ে কম নয়। কেরকেলকে পরীক্ষা এবং জেরা করা হয়েছে। প্রশ্নের উত্তরে কোনো রকম ইতস্তত না করে স্বীকার গেছে সে, একটা সময় লেইকেনের সঙ্গে তার গোপন প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তারা দুজনেই জানত, এটা বৈধ নয়, এটা করা উচিত নয়; কিন্তু লেইকেনের মা-বাবার ভয়ে ব্যাপারটা তারা প্রকাশ করতে চায়নি।

আর তাই সুন্দরী লেইকেন, প্রতারণার প্রতি মেয়েলি ঝোঁকের বশে, প্রেমিক কেরকেলের সঙ্গে নির্লিপ্ত, ক্ষেত্রবিশেষে লোক-দেখানো বৈরী আচরণ করতে লাগল এবং এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে তথা কেরকেলকে খুশি করার জন্য, প্রতি সপ্তাহে এক কি দুবার গভীর রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসত, তারপর সুস্বাদু খানিকটা সময় কাটাত নিজের প্রেমিক এবং তার মায়ের সঙ্গে। কেরকেল তার মাকে নিয়ে শহরের বাইরে একটা কটেজে বসবাস করে। লেফেলডেটের দোকান পুরনো খিলানের কাছ থেকে খুব বেশি গজ দূরে নয়। এখন, ন্যুরেমবার্গে যেহেতু রাত দশটার পর সাধারণত কেউ ঘরের বাইরে থাকে না, ক্যাফে আর বিয়ারহাউসে অল্প কিছু লোক বাদে, তা ছাড়া তারা সবাই যেহেতু শহরের ভেতরে আড্ডা দিত, শহরের বাইরে নয়, কাজেই এটা ধরে নেওয়া চলে যে নিজের বাপের বাড়ি থেকে প্রেমিকের বাড়িতে দ্রুত হেঁটে আসা-যাওয়ার পথে লেইকেনকে তেমন বড় কোনো ঝুঁকি নিতে হতো না। এবং এভাবে যাওয়া-আসার পথে কখনো ওর সঙ্গে কারো দেখাও হয়নি।

মর্মান্তিক ঘটনার দিন আশা করা হয়েছিল কটেজে আসবে লেইকেন। প্রথমে আশায় আশায় অপেক্ষায় ছিল মা আর ছেলে, পরে মেয়েটার আসতে দেরি হচ্ছে দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল তারা। ঘড়িতে তখন সোয়া এগারোটা বাজে—লেইকেন সাধারণত যে সময়ে এসে অভ্যস্ত তার চেয়ে এক ঘণ্টা বেশি পার হয়ে গেছে। মা আর ছেলে দুজনেই খানিক পর পর দরজা খুলে বাইরে তাকিয়েছে; কিন্তু লেইকেনকে দেখতে পায়নি। একবার তারা রাস্তায় নেমে কয়েক গজ হেঁটেছেও, এই আশায় যে যদি দেখতে পায় সে আসছে। কিন্তু না, লেইকেনকে তারা আসতে দেখেনি। এরপর সাড়ে এগারোটা বাজল। কটেজে ফিরে এলো তারা, দেরি হওয়ার কী কী কারণ থাকতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করল। পৌনে বারোটা বাজল। হতে পারে লেইকেন বাড়ি থেকে বেরোবার সময় মা কিংবা বাবার চোখে ধরা পড়ে গেছে, হতে পারে লেইকেন অসুস্থ হয়ে পড়েছে—জ্বরটর তো অনেক সময় নোটিশ না দিয়েও চলে আসে। তবে এসব মায়ের আন্দাজ, কেরকেলের কাছে তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। মা আরো বললেন, ওদের বাড়িতে হয়তো অতিথি এসেছেন, তাঁরা যাই যাই করেও যাচ্ছেন না, লেইকেন যখন দেখল রাত অনেক বেশি হয়ে গেছে আজ আর বাড়ি থেকে বেরোবে না, কাল রাতে যাওয়া যাবে। ফ্রাঞ্জ সব সময় লেইকেনের অনুভূতি অনুবাদ করে নিজের অনুভূতি দিয়ে। তাই মনে মনে জানে স্বেচ্ছায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করবার মেয়ে লেইকেন অন্তত নয়। এরপর ঘড়িতে ঢং ঢং করে বারোটার ঘণ্টা বাজল। ফ্রাঞ্জ কেরকেল আবার একবার রাস্তায় বেরোল, হাঁটতে হাঁটতে এবার প্রায় পুরনো খিলানের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। হতাশ ও মনমরা হয়ে বাড়ি ফিরল সে, মনটা কু গাইছে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বীকার করল আজ রাতে লেইকেনের সঙ্গে দেখা করবার আর কোনো আশা নেই। আর ওই রাতটা? দুঃখে কাতর একটা হৃদয়ের জন্য ওই রাতটা ছিল অনন্তকালের মতো অসীম! একা ও নিঃসঙ্গ ছেলেটা নির্জন ঘরে চোখের পানি ফেলেছে, জানে না ভোরবেলা তাকে শুনতে হবে ‘আর কখনো ওকে তুমি দেখতে পাবে না। ’

খুব ভোরে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল কেরকেল, উদ্বেগ আর উত্তেজনার ইতি ঘটাতে চাইছে। পুরনো খিলানের নিচে পৌঁছতে হয়নি ওকে, তার আগেই মাথায় বাজ ফেলে দিয়ে আঘাত করল খবরটা। সেই মুহূর্ত থেকে আর কিছু মনে নেই ওর। তবে ওর মা ছেলের কষ্ট এবং হতবিহ্বল আচরণ সম্পর্কে সবাইকে জানিয়েছেন। বাড়িতে ফিরে নিজের ঘরে ঢুকেছে কেরকেল, ছেলের পিছু নিয়ে মাও ঢুকেছেন সেখানে, মাকে দেখে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে ঝুলে পড়েছিল কেরকেল, ফোঁপাচ্ছিল, থেমে থেমে মাকে জানিয়েছে তার জীবনে কী রকম একটা অভিশাপ নেমে এসেছে। এই দুঃসংবাদে আঁতকে উঠেছেন মা, দিশাহারা বোধ করেছেন; কিন্তু তার পরই ছেলের কথা ভেবে নিজেকে বাধ্য করেছেন শান্ত থাকতে। নিজের সাধ্যমতো কেরকেলকে সান্ত্বনা দিয়েছেন তিনি; কিন্তু সময় যত এগিয়েছে ততই বুনো হয়ে উঠেছে তাঁর ছেলে, সীমাহীন হতাশায় আর আক্ষেপে গলা কাটা গরুর মতো গড়াগড়ি খেয়েছে ঘরের মেঝেতে। ছেলেকে কিভাবে সুস্থ রাখবেন, কিভাবে ওর প্রাণ রক্ষা করবেন—এসব ভাবতে গিয়ে থরথর করে কেঁপেছেন মা। তারপর যখন ছেলের খোঁজে লোকজন চলে এলো বাড়িতে, তিনি তাদের সহজ সত্যি কথাটাই বললেন—তাঁর ছেলে প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছে, এই মুহূর্তে কিছু চিন্তা করতে পারছে না সে।

তারপর কেরকেলের মাথায় বিদ্যুচ্চমকের মতো কথাটা খেলল, তবে তখনো সেটা তত স্পষ্ট হয়নি—খুুনি হিসেবে অনেককেই সন্দেহ করা হবে, তাদের মধ্যে সেও থাকতে পারে। কথাটা মাথায় ঢুকতে না ঢুকতে শান্ত হয়েছে কেরকেল, মাথা আর মন থেকে সব কষ্ট ঝেড়ে ফেলেছে, তারপর শান্তভাবে একের পর এক প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেছে। ওকে দেখে মনে হয়েছে যতবার কিংবা যতভাবেই তার বিচারের ব্যবস্থা করা হোক না কেন, সে শক্তভাবে তৈরি হয়ে আছে। সেই মুহূর্ত থেকে কেউ ওকে একবারও ফোঁপাতে দেখেনি বা চোখের পানি মুছতে দেখেনি। সারা রাতে যা যা ঘটেছে সব বলে গেছে শান্ত ও দৃঢ় স্বরে : বলার ভঙ্গিটা ছিল সরাসরি, সহজ ভাষায়, আবেগবর্জিত ঢঙে, মুখের কোথাও সাদাটে ভাব ছাড়া আর কিছু ছিল না, চোখ ছিল অনুজ্জ্বল, ওগুলোর সব আলো যেন ভেতর থেকে টেনে নেওয়া হয়েছে। এ সবই উপস্থিত দর্শকদের মনে বিরাট প্রভাব ফেলেছে। সব শেষে কেরকেল যখন আর নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারল না, কৃত্রিম শান্ত ভাব হঠাৎ করে যখন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, নিজের অজান্তে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলেছে, দর্শকদের চোখও আর শুকনো থাকেনি। ওই সময় কেরকেলকে বলতে শোনা গেছে, অসহ্য একটা কষ্ট ওর হৃৎপিণ্ডকে পুড়িয়ে খেয়ে ফেলছে।

গল্পটা যে শুধু সত্যি বলে বিশ্বাসযোগ্য তা নয়, বরং বাড়ির চাকরানি মেয়েটার বক্তব্যের সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলিয়েও নেওয়া যায়, যে বক্তব্যকে প্রথমে মনে করা হয়েছিল কেরকেলের অপরাধ প্রমাণ করার জন্য খুব কাজে লাগবে। গল্পটা বানোয়াট হলে সময়ের হিসাব এ রকম খাপে খাপে মিলে যেত না। আর ওই ওয়েস্টকোট, কেরকেলের বিরুদ্ধে সব গুজবে যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছিল? জানা গেল প্রকৃত ঘটনার ওপর রং চড়িয়ে অনেক বড় করে দেখানো হয়েছে ওটাকে। ঠিক, ওটা একটা ওয়েস্টকোটই। তবে ওটার রং ধূসর। জনপ্রিয় অভিযোগে বলা হয়েছে রক্তমাখা; কিন্তু তা সত্যি নয়। রক্তের ছোট্ট একটু দাগ লেগে আছে তাতে, এ কথা সত্যি, তবে তার খুব সহজ একটা ব্যাখ্যাও আছে। তিন দিন আগে ছুরি দিয়ে রুটি কাটতে গিয়ে কেরকেল তার বাঁ হাতের একটা আঙুল কেটে ফেলেছিল এবং বাড়ির চাকরানিও নিজে থেকে সেটা সত্যি বলে স্বীকার করল। কারণ ঘটনাটা ঘটার সময় সেখানে উপস্থিত ছিল সে।

আঙুল কাটার এই গল্প শুনে বাইরে অপেক্ষায় থাকা লোকজন সন্দেহ ভরা চেহারা নিয়ে মাথা নাড়তে লাগল, অর্থাৎ গল্পটা তারা সত্যি বলে মানতে পারছে না। এত সহজে রক্তলাগা ওয়েস্টকোটকে কোনো কাজের জিনিস নয় বলে বাতিল করা যাবে না। তাদের কল্পনায় সেটা খুব শক্তভাবে গেঁথে গেছে। সত্যি কথা বলি, আমার বিশ্বাস, ওদের যদি ওয়েস্টকোটটা দেখানো হয়, নগণ্য ওই রক্তের দাগকে ওদের দৃষ্টিতে খুনের অকাট্য প্রমাণ বলে মনে হবে। ওই কোট আমি দেখেছি, কিন্তু আমার রিপোর্ট লুকাতে চেষ্টা করা অবিশ্বাসের সঙ্গে শোনা হয়েছে, যদিও সাহস করে কেউ খোলাখুলি প্রতিবাদ করেনি। এবং কেরকেলকে যখন সব সন্দেহ থেকে মুক্ত বলে ঘোষণার সঙ্গে ছেড়ে দেওয়া হলো, চারদিক থেকে বহু মানুষের অসন্তোষ ভরা চাপা গুঞ্জন শোনা গেছে। ব্যাপারটা তারা মেনে নিতে পারেনি।

ইতিমধ্যে লেইকেনকে কবর দেওয়ার আয়োজন শুরু হয়েছে। সেটাকে কোনোভাবেই পারিবারিক বলা যাবে না; সাধারণ মানুষের বিপুল আবেগ সেটাকে শোকবহুল সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত করল। তাদের ভাবাবেগের কারণে প্রতিদিন প্যারিস থেকে আমাদের কাছে আসা অনেক গুরুত্বপূর্ণ খবরের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে গেল, অনেক ক্ষেত্রে একেবারে থাকলই না।

প্যারিসের রাস্তায় রক্ত গড়িয়েছে—পিস্তল থেকে গুলি করার পরিণতিতে; হতে পারে সেটা ইচ্ছাকৃত কিংবা হয়তো দুর্ঘনটাবশত। একটা হোটেলে ছিল মিনিস্টার অব ফরেন অ্যাফেয়ার্সের অফিস, সেটার সামনের রাস্তায় তখন মিছিল হচ্ছিল, সেই মিছিল হয়ে উঠল জঙ্গি আর দাঙ্গাবহুল। প্যারিস জেগে উঠেছে, রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড খাড়া করা হয়েছে। পথেঘাটে ট্রুপস দেখা যাচ্ছে, হাতে বাগিয়ে ধরা অস্ত্র। এসব দুশ্চিন্তায় কাহিল করার মতো খবর।

ইউরোপজুড়ে জাতিতে জাতিতে বা দেশে দেশে এত মিল-মহব্বত এবং এত দ্রুত তারা একযোগে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, সাড়া দিতে পারে একের ডাকে অনেকে, তার চাক্ষুষ প্রমাণ দেখতে পেলাম আমরা সবাই। প্যারিসের ঘটনা দেখতে না দেখতে ছড়িয়ে পড়ল বাকি সব শহরে, সে শহর যত দূরেই হোক না কেন, সেখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি যতই নিরাপদ এবং নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকুক না কেন। লেফেলডেট পরিবারের ট্র্যাজেডি ন্যুরেমবার্গকে যে তীব্র চাপের মধ্যে ফেলেছিল, সেটার চেয়ে সহস্র গুণ বড় চাপ হয়ে দেখা দেওয়ার কথা ফেব্রুয়ারি বিপ্লব; কিন্তু তা সত্ত্বেও দেখা গেল শহরের লোকজন লেইকেনকে ভুলতে রাজি হচ্ছে না, তাদের বেশির ভাগ সময় ওই ঘটনার পেছনে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। এ কথা সত্যি যে ওই সময়কার বিরাট আন্দোলন থেকে সব সময় দূরত্ব বজায় রেখে চুপচাপ ছিল ন্যুরেমবার্গ, বিশাল ঢেউটাকে অনুসরণ করছিল ধীরে ধীরে, অনেক পেছন থেকে; এও সত্যি যে কিছু রাজনীতিক খুব বেশি আগ্রহ দেখিয়ে কিছু চরিত্রের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন এবং আশায় আশায় ছিলেন লুইস ফিলিপ ও গেজো সারভাইভ করতে পারবেন, যদিও অন্য কোনো সময়ে বৈশ্বিক আগ্রহ তৈরি হলেও হতে পারত; কিন্তু গোটা ন্যুরেমবার্গে লেইকেনের মৃত্যু এমন দুর্জ্ঞেয় রহস্য তৈরি করেছিল যে সেটা ওই রকম একটা বিপ্লবকে পর্যন্ত ঠেলে মানুষের মাথার পেছন দিকে সরিয়ে দিয়েছিল। অনুর্বর পরিত্যক্ত প্রান্তরে যদি সগর্জন ঝড় ওঠে আর তখন যদি দরজায় শোনা যায় কোনো মানবসন্তানের যন্ত্রণাকাতর কান্না, সঙ্গে সঙ্গে বজ্রপাতের শব্দ আর বাতাসের হুংকার তাৎপর্য হারিয়ে ফেলে, হয়ে ওঠে তুচ্ছ। তখন অস্পষ্ট ওই কান্না বাদে আর কিছু কানে ঢোকে না, ওই ঝড়ের আসলে কোনো অস্তিত্বই থাকে না শ্রোতার কাছে। ওই রকম একটা কান্না সমুদ্রের গর্জন, গাঙচিলের চিৎকার, মেঘেদের কামান দাগাকেও গুরুত্বহীন করে তোলে। সে রকম একটা কান্না আমরা ন্যুরেমবার্গে শুনতে পাচ্ছিলাম। কান্নাটা ভেসে আসছিল লেইকেনের বাড়ি থেকে, কখনো একটানা, কখনো থেমে থেমে; কখনো আহাজারির সঙ্গে, কখনো ফোঁপানোর সঙ্গে, আবার কখনো নিস্তেজ ক্লান্ত স্বরে। ১৮৪৮ সালের ওই    মহাহাঙ্গামার মধ্যে ঠিক এ রকম ঘটনাই ঘটেছিল। একটা দেশ থরথর করে কাঁপছিল; কিন্তু এখানে, আমাদের দরজায়, এক বাচ্চা মেয়ে খুন হয়ে গেছে এবং তাতে দুটো হৃদয় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। চারদিকে আগের মতোই ছড়িয়ে পড়ছে নানা গুজব। কিছু সময় পর পরই শোনা যাচ্ছে খুনি এই ধরা পড়ল বলে; কিন্তু দুর্ভেদ্য অন্ধকার থেকে কেউ আমরা তাকে টেনে বের করে আনতে পারছি না। বুরগনেফের একটা মন্তব্য আমাকে বেশ বড় একটা ধাক্কা দিল। আমাদের মেজবান, জাম বাইয়েরশেন হফ, একদিন হাসিখুশি চেহারা নিয়ে ঘোষণার সুরে জানালেন, তিনি নিজের কানে একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে বলতে শুনেছেন পুলিশ সম্ভবত খুনির ঠিকানা জেনে ফেলেছে।

‘কথাটা শুনে আমি দুঃখ পেলাম,’ বললেন বুরগনেফ।

অতিথিরা সবাই মুখে খাবার তোলা বন্ধ করে দিল, বন্ধ করে দিল মুখের ভেতর থাকা খাবার চিবানো, সবাই আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি তাঁর দিকে।

‘এ থেকে প্রমাণিত হলো,’ বুরগনেফ আবার বললেন, ‘এমনকি পুলিশও এর কোনো সমাধান নেই ভেবে হাল ছেড়ে দিয়েছে। আমি সব সময় খেয়াল করেছি পুলিশ যখনই বলেছে তারা অপরাধীর সন্ধান পেয়েছে, তারপর দেখা গেছে তাকে তারা ধরতে পারেনি কিংবা আমাদের সামনে হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা যখন সত্যি সত্যি কারো খবর পায়, তখন বুদ্ধিমানের মতো সবাই চুপ করে থাকে, বিষয়টা নিয়ে কোনো টুঁ শব্দ করে না। পুলিশ তখন এটা বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করে যে তারা বিভ্রান্তির শিকার হয়ে পড়েছে, কেসটার কোনো কিনারা করতে পারছে না—তাদের শিকার যাতে নিশ্চিন্ত মনে বিপজ্জনক সিকিউরিটির ভেতরে পা ফেলে। ’

 

একটা আবিষ্কার

 

এত দিনে আমাদের নজরে ধরা পড়ল এমন একটা বিষয়, যেটার ওপর বুরগনেফ অস্বাভাবিক গভীর আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এটা আমাদের কাছে একদম নতুন। তাঁর এই আগ্রহ বিশেষভাবে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। কারণ এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে এর আগে আমরা তাঁকে সে রকম কৌতূহল প্রকাশ করতে দেখিনি, এমনকি গোটা শহরে যখন এটা ছাড়া আর কোনো আলোচ্য বিষয় ছিল না, তখনো আমরা তাঁকে নীরব থাকতে দেখেছি, ভালো বা মন্দ কোনো মতামতই আমরা তাঁর কাছ থেকে পাইনি। তিনি নির্লিপ্ত ছিলেন, তা বলছি না; কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা এবং এর দ্বারা ছড়ানো আতঙ্ক আমাদের চিন্তার জগতে যে রকম অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল, তাঁর চিন্তার জগত্টাকে সেভাবে প্রভাবিত করেনি।

বিস্ময়ের ওপর বিস্ময়, ওদিকে হের লেফেলডেট এক কাণ্ড করে বসেছেন। কেরকেলকে তিনি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবই দিয়ে বসেছেন, তুমি বাবা আমাদের পালক ছেলে হও, আমাদের ব্যবসার হও যৌথ অংশীদার এবং এখন থেকে তুমি আমাদের বাড়িতেই থাকো। একমাত্র সন্তান লেইকেনকে হারিয়ে বুড়ো-বুড়ি দুজনেই অসহায় হয়ে পড়েছেন, গোটা বাড়ি তাঁদের কাছে ফাঁকা আর নিরানন্দ লাগছে।

কিন্তু সব কিছু কী আর সব সময় মনের মতো হয়। ফ্রাঞ্জ কেরকেল বিনয় এবং দৃঢ়তার সঙ্গে হের লেফেলডেটের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। বলল, ও আহত বা অপমান বোধ করছে না, তবে ওই পুলিশি জেরা আর পরীক্ষা ওকে খুব কষ্ট দিয়েছে। তবে আরো বলেছে, এ রকম কেসে সেও এ ধরনের পরীক্ষার পক্ষে মত দিত, এমনকি নিজের ভাইকেও পরীক্ষা করবার প্রশ্ন উঠলে তাতে মত দিতে দ্বিধা করত না, পরিস্থিতি যদি এই একই ধরনের সন্দেহজনক আর জরুরি হতো। এটা তো সহজ বিচার পদ্ধতি যে সব সন্দেহভাজনকে পরীক্ষা করা হবে; যাদের সন্দেহ করা হবে, তাদেরও উচিত নিজেদের নাম নিষ্কলুষ করবার স্বার্থে স্বেচ্ছায় পরীক্ষায় অংশ নিতে চাওয়া।

তবে প্রস্তাবের বাকি অংশ, মনিবের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও ওর পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। কারণ নিজের বর্তমান অবস্থা থেকে সরে যাওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছে না সে।

মজার হোক, অদ্ভুত হোক, এই বিষয়টাও বুরগনেফকে দারুণ কৌতূহলী করে তুলল। তাঁর   হাবভাব দেখে মনে হলো শোকে পাথর, অনুনয়ে কাতর মা-বাবার মনের ভেতর পুরোপুরি ঢুকে পড়েছেন তিনি, ঢুকে পড়েছেন কিছু গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানানো প্রেমিকের অন্তরেও। ওদের সবার ভূমিকা এবং আচরণের প্রশংসা করলেন, সূক্ষ্মভাবে ও সুকৌশলে ব্যাখ্যাও করলেন কেন কে কী করছেন বা করছে, সেগুলো সত্যি খুব ভালো লাগল আমার, কখনো বা মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না। এসব থেকে বোঝা যায় তাঁর নৈতিকতাবোধ খুবই উঁচু মানের, সব দিক থেকে আদর্শ একজন মানুষ তিনি। তবে একই সঙ্গে, এই একই গল্পের অন্যান্য অংশ নিয়ে তাঁর আগ্রহ খুব কম দেখলাম আমরা, অথচ মানুষের মনে সেগুলোর আবেদন অত্যন্ত জোরালো এবং অনেক বেশি সরাসরি। কোথায় যেন কী একটা মেলানো যাচ্ছে না, আমাদের অনেকের মধ্যে এ রকম একটা অনুভূতি হচ্ছে।

এটা কী গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে না যে তিনটি আলাদা আলাদা সাক্ষাৎকারে, প্রতিবার এই আলোচ্য বিষয়গুলো কৌশলে উত্থাপন করেছি, এমন ভঙ্গিতে যেন মনে হবে কথার পিঠে কথা উঠেছে; তার পরও আমি স্পষ্ট কোনো উপসংহারে পৌঁছতে ব্যর্থ হলাম? ভয়ে বা সংকোচে আমি তাঁকে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে    পারিনি : ‘ক্রিমিনাল কাহিনি নিয়ে মানুষের মনে প্রচুর আগ্রহ, আপনিও কি সে রকম আগ্রহ বোধ করেন?’ এ ধরনের সরাসরি প্রশ্নের উত্তর সরাসরি দিতে হয়, সে জন্যই আমার ভদ্রতায় বাধল।

বিশেষ বিষয়ে তাঁর নির্লিপ্ত ভাব বা অনাগ্রহ, অসংখ্য বিষয়ে তাঁর প্রকাশভঙ্গি আমার দৃষ্টিতে যেভাবে ধরা পড়েছে, সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত আমি এই উপসংহারে পৌঁছলাম যে মানুষ হিসেবে তিনি খুব নরম, তাঁর মনটা কোমল। তাই যেকোনো কুিসত কিংবা বিকৃত অথবা ভয় পাওয়ার মতো কিছু দেখলে কুঁকড়ে যান তিনি, সহ্য করতে না পারার কারণে আরেক দিকে চোখ ফিরিয়ে নেন, ভাব দেখান তাঁর কোনো আগ্রহ নেই। যে জিনিস দেখলে বা যে জিনিসের কথা ভাবলে ভয় লাগে বা রুচিতে বাধে, সেটা থেকে সযত্নে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন ভদ্রলোক।

এই উপলব্ধিতে সন্তুষ্ট হয়ে আমি যখন শান্ত আর স্থির হতে চাইছি, এ রকম সময়ে হঠাৎ একটা দুর্ঘটনা রগরগে আলো ফেলল আগে লক্ষ করা কিছু খুঁটিনাটি জিনিসের ওপর এবং তার ফলে কষ্টদায়ক ও ব্যাখ্যাবিহীন বৈরী ভাবটা আবার মাথাচাড়া দিল আমার মনে, যে ভাবটা তাঁকে প্রথম দিকে দেখে জেগেছিল আমার মধ্যে। নতুন একটা সন্দেহে ভরাট হয়ে উঠল আমার মগজ। আমি সত্যি খুব বিপদে পড়ে গেলাম। কী নিয়ে আমি সন্দেহ করছি তাঁকে? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর আমি দিতে পারব না। অথচ বুঝতে পারছি তাঁকে আমার চোখে চোখে রাখতে হবে। কিন্তু কেন চোখে চোখে রাখতে হবে জিজ্ঞেস করলে আমি কোনো উত্তর দিতে পারব না।

কিভাবে সেটা বাস্তবে রূপ পেল শুনুন। আমরা দুজনেই মিউনিখে যাচ্ছি। একটু ভুল হলো। যাচ্ছিলাম আসলে আমি একা; কিন্তু বুরগনেফ বললেন তিনিও যাবেন। কেন, হঠাৎ তাঁকে আমার সঙ্গে মিউনিখে যেতে হবে কেন? তাঁর ব্যাখ্যাটা এ রকম—ন্যুরেমবার্গে যত দিন রয়েছেন তিনি, তত দিন আমার উষ্ণ সঙ্গ উপভোগ করতে পেরেছেন; এখন ন্যুরেমবার্গে বেড়ানো কমিয়ে দিয়ে আমার সঙ্গে যদি মিউনিখে যেতে পারেন, তাহলে আমার সঙ্গ থেকে তাঁকে বঞ্চিত হতে হয় না। আমি তাঁর এই যুক্তি ভালো করে শুনতে বা বুঝতে না পারবার ভান করে জানতে চাইলাম, আপনি বোধ হয় মিউনিখের শিল্পকর্ম দেখতে আগ্রহ বোধ করছেন? উত্তরে তিনি স্পষ্ট করে বললেন, ‘না, শুধু ওখানকার শিল্পকর্ম দেখতে নয়, আমি যাচ্ছি দুটো কারণে—এক. আপনাকে সঙ্গ দেওয়া হবে এবং দুই. ফ্রান্সে এখন যা ঘটছে তার সূচনা হয়েছে যেসব কাগজপত্র আর দলিল-দস্তাবেজ থেকে, সেগুলোর ওপর ভালো করে একবার চোখ বোলাতে। ’

কাল সকালে রওনা হব, রাতে তাঁর কামরায় বসে আছি আমি, বরাবরের মতো ধূমপান করছি আর গল্প করছি, ওদিকে আইভান, বরগনেফের চাকর, দুটো বড় স্যুটকেসে তাঁর জিনিসপত্র তুলছে।

আইভান এমন একজন চাকর বা ক্রীতদাস, অনুমতি ছাড়া বুরগনেফকে ছেড়ে তার অন্য কোথাও যাওয়ার অনুমতি নেই এবং সে তার নিজের ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষার একটা শব্দও উচ্চারণ করে না, মানে পারে না। তার ভেতর রসকষ তেমন আছে বলে মনে হয় না, চেহারা-সুরত দেখে মনে হবে আগে হয়তো কসাই ছিল, হাবভাব খানিকটা বোকা বোকা, তবে মনিব তার খুব প্রশংসা করেন, বিশ্বস্ত এবং কাজের লোক হওয়ায়। বুরগনেফ খুব নরম আচরণ করেন তার সঙ্গে, তবে তারই মধ্যে তিনি যেন হালকা ভঙ্গিতে তাকে মনে করিয়ে দেন কে তার বস, অনেকটা যেন পোষা চিতাকে ভালোবাসার মতো, মাঝেমধ্যে চোখ গরম করে তাকায়—দৃষ্টিগ্রাহ্য কোনো কারণ ছাড়াই। আইভানকে নিয়ে দু-একবার কৌতুকও করেছেন বুরগনেফ, বিশেষ করে তার চেহারা আর শারীরিক আকৃতি নিয়ে; আমি খানিকটা অবিশ্বাস নিয়ে শুনেছি সেসব, যেহেতু আমি একজন ফেরনালজিস্ট—মানুষের খুলি দেখে চরিত্র বিশ্লেষণ করি।

‘ওর দিকে তাকান,’ বললেন তিনি, ‘লক্ষ করুন নিচু ভ্রু, কেমন ক্ষয়ে বা কমে আসছে, চ্যাপ্টা মুখ, মুখের আদলেই লেখা আছে বদমেজাজি, মাথার ভিতটা কেমন চওড়া, আর ঘাড়টা তাগড়া ষাঁড়ের সঙ্গে বদলে নেওয়া যাবে। ’

হাসি না পেলেও একটু হাসতে হয়েছে আমাকে। ‘ঠিক কী বলতে চাইছেন বলুন তো?’

হাসলেন তিনিও। ‘এসব দেখে কী মনে হচ্ছে, সেটা বলুন। ’

‘আমার পর্যবেক্ষণ আপনার সঙ্গে না-ও মিলতে পারে,’ আমি হয়তো এ রকম কিছু বলেছি তাঁকে। ‘একজন লোকের চেহারা অনেক ক্ষেত্রে তার চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে না। ’

‘তাই কী? কি জানি, অবশ্যই আপনি ভালো জানেন। তবু আমার খুব জানতে ইচ্ছা করছে আইভানকে দেখে ঠিক কী মনে হয় আপনার?’

হাসতে হাসতেই আমি তাঁকে হয়তো বলেছি, ‘কিছু মতামত একান্ত প্রয়োজন না হলে প্রকাশ করতে নেই, হের বুরগনেফ। ’

‘ঠিক আছে, বুঝেছি আমি। তবে আমাকে আমার অনুভূতির কথা বলতে দিন। ’ হাসিমুখেই আবার শুরু করলেন তিনি। ‘ওর যে চেহারা আর আকৃতি, আইভানকে মানুষ একটা প্যান্থারের মতোই ধ্বংসকাণ্ড ঘটাতে ওস্তাদ, একটা বুলডগের মতোই হার না মানার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, খেপা একটা ষাঁড়ের মতোই নিষ্ঠুর বলবে না?’

‘আপনি বলতে চাইছেন আসলে তা সে নয়। ’

‘আমাদের আইভান? ওর মতো শান্ত আর ভদ্র প্রাণী এই দেশে দ্বিতীয়টা আছে কি না সন্দেহ, ব্রাদার। ওর মন যেকোনো মেয়ের চেয়েও নরম, বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন! ওই পেশিবহুল ফ্রেমের ভেতর কী রয়েছে জানেন? হরিণের মায়াভরা হৃৎপিণ্ড। ’

‘আর কী গুণ ওর?’ আমি হয়তো জিজ্ঞেস করেছি।

‘বিশ্বাস করুন, আইভানের গুণের কথা বলে শেষ করা যাবে না। মাত্র দু-একটা কথা বলছি, একেকটার দাম শতকোটি টাকারও বেশি। ওর সবচেয়ে বড় গুণ, অসম্ভব বিশ্বস্ত। আরেকটা বড় গুণ, আমার খুব ন্যাওটা। আমি বিশ্বাস করি, আমাকে রক্ষা করতে গিয়ে প্রয়োজন হলে নিজের প্রাণ পর্যন্ত বাজি রাখবে আইভান। কিন্তু নিজের জন্য অত বড় বিপদের ঝুঁকি কক্ষনো নেবে না। ’

‘এ রকম বিশ্বস্ততা আর আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত সেই লোকের কাছ থেকেই সাধারণত পাওয়া যায়, যার কৃতজ্ঞ হবার কারণ আছে। আইভানের বেলায়ও কি সেটা সত্যি? কোনো কারণে আপনার প্রতি চিরঋণী হয়ে আছে সে?’

‘একদম ঠিক ধরেছেন,’ বুরগনেফের মুখে অকুণ্ঠ প্রশংসা ঝরল। ‘নিজ পেশায় আপনি সত্যি একজন ওস্তাদ। ওর জন্য মিলিটারিতে যাওয়া বাধ্যতামূলক ছিল; কিন্তু আমি নানা কৌশলে ওর যাওয়াটা বাতিল করিয়েছি। সামরিক জীবনটা অনেক বেশি দুর্ঘটনাবহুল, ওর ধাতে সইত না। তার চেয়ে আমার কাছে থেকে যদি কিছু দেখাতে পারে তো দেখাক, না দেখাতে পারলে দরকার নেই। ’

‘মানে? কী দেখাবে? দেখাবার কিছু আছে নাকি?’

‘কী বলেন, আছে না! আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি তো দেখতেই পাচ্ছেন। আমার জন্য কোনো বিপদ চলে এলে ওই তো প্রথমে সামলাবে। তখন দেখব সত্যি সত্যি কতটুকু কী করার ক্ষমতা রাখে। ’

বুরগনেফের মধ্যে আমি পরস্পরবিরোধিতা খুঁজে পেলাম, একবার বলছেন আইভানের ভেতর আক্রোশ বা মারমুখো ভাব নেই, সে খুব নরম; আবার বলছেন তিনি বিপদে পড়লে দেখতে চান আইভান নিজের জীবন বাজি রেখে কিভাবে রক্ষা করে তাঁকে। তিনি যেহেতু একজন ফেরনালজিস্ট নন, তাই তাঁর মনে হতেই পারে যে আইভানের ভেতর হিংস্র ভাব নেই; কিন্তু আমি বলব, একজন ফেরনালজিস্ট হিসেবে, তাঁর কথা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। আইভানের প্রতিটি আচরণ তার মনিবের মতামতকেই সত্য প্রমাণ করে, এটা স্বীকার না করে উপায় নেই আমার। লোকটা একদম চুপচাপ, প্রতিটি কাজ বিনয় ও সাবধানতার সঙ্গে করে, যাতে তার কোনো ভুল হয়ে না যায়। সরাসরি কারো চোখের দিকে খুব কমই তাকায় সে, যেন বোঝে ওভাবে তাকানোটা রূঢ় হয়ে যাবে। কিন্তু আমার কথা হলো, তার শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে অগ্রাহ্য করা চলে কি? কিংবা নীরবে তার ওপর যে অত্যাচার চালানো হচ্ছে, সেটার প্রভাবকে এক পাশে সরিয়ে রাখা উচিত হবে কি? আমরা কেউ জানি না তাকে দিয়ে ঠিক কী ধরনের গোপন কাজ করিয়ে নেন বুরগনেফ, আমি শুধু সন্দেহ করি এমন কিছু কাজ নির্ঘাত তাকে দিয়ে করানো হয়, যা লোকজনকে জানানো চলে না। আপনার যদি দানবিক একটা শরীর থাকে আর আপনাকে দিয়ে যদি কেউ আপনার অপছন্দের কাজ করিয়ে নেয়, তার প্রতিক্রিয়া হবে না? সে নিরীহ, এর পক্ষে যে প্রমাণই আমার সামনে নিয়ে আসা হোক না কেন, আমার অবিশ্বাস থেকে বেশিদিন মুক্ত থাকতে পারবে না সে। নারীরা যখন পিস্তল দেখে চেঁচাতে শুরু করে, আপনি তাদের আশ্বস্ত করবার জন্য যতই বলেন না কেন যে তাতে গুলি নেই, কোনো লাভ হবে না। ‘আমি জানি না,’ উত্তরে বলবে তারা, ‘যা-ই হোক না কেন, এটা আমার ভালো লাগছে না। ’ আইভানকে নিয়ে আমার প্রবণতাও অনেকটা এ রকম। হতে পারে সে অক্ষতিকর, আমার জানা নেই; আমার শুধু জানা আছে—তার চেহারা আর আকৃতি আমার পছন্দ নয়।

তো সেই রাতে কামরার চারদিকে কোনো শব্দ না করে হাঁটাচলা করছিল আইভান, সারাক্ষণ কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত, সব শেষে এক জোড়া স্যুটকেসে বুরগনেফের জিনিসপত্র ভরতে বসল। বুরগনেফকে পুরনো দিনের গল্পে পেয়েছে, বকবক শুরু করবার পর তাঁকে আর থামানো যাচ্ছে না। তাঁর কথা শুনতে শুনতে আমার মনে হলো, আমার বয়সী এমন কোনো লোকের সঙ্গে এর আগে আমি পরিচিত হইনি, যাদের সমাজ এতটা নিখুঁত আর আনন্দময় ছিল। বুরগনেফকে রীতিমতো ঈর্ষা করবার মতো ভাগ্যবান মনে হচ্ছে।

ব্যাপারটা এমন নয় যে পরিষ্কার বোঝা যায় সব পয়েন্টে তিনি আমার চেয়ে সেরা। কাজেই নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখবার জন্য এসব কথা তিনি বানিয়ে বানিয়ে বলছেন, তা হতে পারে না। তবে আমি স্বীকার করি অনেক দিক থেকেই আমার চেয়ে অনেক বেশি জ্ঞানী তিনি, তাঁর ক্ষমতাও আমার চেয়ে অনেক বেশি, আর সে জন্যই যখন আমরা কোনো বিষয়ে একমত হতে পারি না, আমি তখন ব্যাকুল হয়ে চাই তিনি আমার দৃষ্টিভঙ্গি অনুমোদন করবেন, আমি যেখানে নিজেকে দুর্বল বলে জানি তিনি সেখানে আমার ভুল ধরিয়ে দেবেন।

আমি যখন মনে মনে আন্তরিক প্রশংসায় গলে যাওয়ার অবস্থায় পৌঁছে গেছি, তখনই ধাক্কাটা লাগল। আইভান, কামরার এক দিক থেকে অন্য দিকে যাওয়ার সময়, একটা স্যুটকেসের স্ট্র্যাপের সঙ্গে পা বাধিয়ে আছাড় খেল। কাঠের ছোট একটা বাক্স, গ্লাভবক্স বলা হয়, ওই সময় তার হাতে ছিল, মেঝেতে পড়ে ছিটকে গেল সেটা, বাক্সের ভেতরে থাকা জিনিসগুলো ছুটে গিয়ে থামল বুরগনেফের পায়ের ঠিক সামনে। জিনিসগুলো দেখতে পাচ্ছি আমি, কয়েক জোড়া গ্লাভস, একটা রুজ-পট, ত্রিপত্রগুল্ম এবং একপ্রস্থ কালো দাড়ি!

কিন্তু কল্পনাশক্তির কী ধরনের অস্থিরতার কারণে ওই নকল দাড়িকে বুরগনেফের পায়ের কাছে পড়ে থাকতে দেখে এক ধরনের ভয়ের শিহরণ আমাকে রোমাঞ্চিত করে তুলল? ওগুলো দেখে ফেলে কী লাভ হলো আমার? কী এর তাৎপর্য? আমি কি খুব বড় কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছি? আমার গঠনমূলক কল্পনাশক্তি কি কিছু প্রসব করতে চলেছে?

আমাকে একটু স্থির হতে দিন।

একটা বিদ্যুচ্চমকের চোখ-ধাঁধানো আলোতে আমি দেখতে পাচ্ছি পুরনো সেই খিলান—আমাকে পাশ কাটাচ্ছে সচকিত চোখ নিয়ে এক আগন্তুক—সেই অচেনা লোক এখন আর আমার কাছে অচেনা কেউ নন, আমি তাঁকে বুরগনেফ বলে পরিষ্কার চিনতে পারছি—এবং তাঁর পায়ের সামনে খুন হওয়া মেয়েটা!

এসব কী দেখছি আমি, নিজেকে প্রশ্ন করলাম। একটা দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে এগুলো কেনই বা দেখবার সুযোগ করে দেওয়া হলো আমাকে? দুর্ঘটনা? সত্যি দুর্ঘটনা, নাকি ওটা কৃত্রিম ছিল, বানানো, এক ধরনের প্রতিশোধ? খানিক আগে আমিই তো মনে মনে প্রশ্ন তুলেছি :

...নীরবে তার ওপর যে অত্যাচার চালানো হচ্ছে সেটার প্রভাবকে এক পাশে সরিয়ে রাখা উচিত হবে কি?

...আপনার যদি দানবিক একটা শরীর থাকে, আর আপনাকে দিয়ে যদি কেউ আপনার অপছন্দের কাজ করিয়ে নেয়, তার প্রতিক্রিয়া হবে না?

ভাগ্য ভালো বলতে হবে যে বুরগনেফের মনোযোগ আমার দিক থেকে সরে গেছে। রাগে দিশাহারা দেখাল তাঁকে, ছোট ছোট বাক্যে আইভানকে কিছু বলছেন, বলাই বাহুল্য যে সেসব রুশ ভাষায়, কাজেই আমার বোধগম্য নয়। আমার দিকে তাকালেন না, মনে হলো ইচ্ছা করেই, তারপর ঝুঁকলেন, রুজ-পটটা তুললেন, আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলেন, ঠোঁটে সেই পরিচিত বিষণ্ন হাসির প্রলেপ। হাসলেও তাঁর মুখ টকটকে লাল হয়ে আছে, তবে সেটা এইমাত্র রাগ করবার কারণে বা হঠাৎ নিচের দিকে ঝোঁকার কারণে হতে পারে। ‘আমি দেখতে পাচ্ছি মানুষকে বোকা বানানোর এসব জিনিস দেখে আপনি খুব অবাক হয়েছেন,’ কথাটা তিনি এমন সুরে বললেন, স্বর যদিও নিচু, তবে পুরোপুরি শান্ত। ‘আপনার নিশ্চয়ই ধারণা ছিল না সাধারণ পরিবেশেও নিজের দেবে যাওয়া গালকে আমি যথাসাধ্য সুন্দর দেখানোর চেষ্টা করি। ’

এরপর তিনি শান্তভাবে আইভানের হাতে ধরিয়ে দিলেন পটটা। আইভান সেটা বাক্সে ভরে রাখল, আরো ভরল দাড়ি, গ্লাভস আর বাকি সব জিনিস। কী যেন একটা প্রশ্ন করল সে, শুনতে লাগল চাপা গর্জনের মতো, না-সূচক জবাব দিলেন বুরগনেফ।

আবার স্যুটকেস গোছানোর কাজে হাত দিল আইভান।

বুরগনেফ নিজের বিষয়ে ফিরে গেলেন, নতুন করে আগুন দিলেন নিভে যাওয়া চুরুটে, ভাবটা যেন কিছুই ঘটেনি।

তাঁর মন্তব্যের উত্তরে স্পষ্ট করে কিছু বলিনি আমি, ভাঙাচোরা শব্দ দিয়ে দায় সেরেছি। কারণ নিজের চিন্তাশক্তির ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকছিল না। এক আন্দাজ থেকে আরেক আন্দাজে ছুটছিল মন।   আমার মনে আছে আগন্তুকের গায়ের রং ছিল সাধারণ, একটু লালচে; তা কি ওই রুজের কারণে? এ কথা সত্যি যে সেদিন খিলানের নিচে যে লোককে আমি পাশ কাটিয়েছি, আমার কল্পনা বলছে তাঁর ডান হাতে একটা ছড়ি ছিল; তা যদি সত্যি হয়, ওই লোকের সঙ্গে বুরগনেফের মিল থাকবার যে সন্দেহের কথা ভাবছি, তা পুরোপুরি মিথ্যা হয়ে যায়। তবে এই পয়েন্টটা নিয়ে আমার মনে দ্বিধা আছে। কী জানি, আমি বোধ হয় কোনো ছড়ি দেখিনি।

‘শরীর ভালো লাগছে না, আজকের মতো বিদায় নিই,’ বলে চলে আসছি, তিনি আশা প্রকাশ করলেন সকালে আমি ভালো হয়ে যাব—যদি না হই, ব্যাখ্যা করলেন তিনি, কাল আমরা মিউনিখের উদ্দেশে বের হব না, পরশু বেরোব।

নিজের ঘরে ফিরে দরজায় খিল দিলাম, বিছানার কিনারায় বসে প্রবল উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছি।

 

চাঞ্চল্য

গরম হওয়া মাথায় প্রচুর পানি ঢাললাম। কাপড় খুলে বিছানায় উঠলাম, সিদ্ধান্ত নিলাম পুলিশকে সব কথা জানাতে হবে। ভাবছি কাল সকালেই তাহলে পুলিশের কাছে যাই। গোছানোর চেষ্টা করছি, আমার সন্দেহের কথা পুলিশকে জানাতে গিয়ে কিভাবে কী বলব।

খানিক পর সংবিৎ ফিরে পেয়ে ভাবছি : পুলিশকে আমি কী বলব? খুব বেশি বলবার কিছু আছে কি আমার? আমি বলতে পারি, যে রাতে লেইকেন খুন হলো সেদিন সন্ধের খানিক পর, সরকারি রাস্তায় আমি এক লোককে পাশ কাটিয়েছি, যাকে আমি চিনতে পারিনি; কিন্তু তাকে দেখে আমি এ কথা না ভেবে পারিনি যে সে আমাকে চিনতে পেরেছে। এই লোকই, নিজেকে আমি বুঝিয়েছি, লেইকেনের খুনি, যদিও আমার এই অভিযোগের পক্ষে আমি শক্তিশালী কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারছি না। নকল দাড়ি বা রুজ এই শহরে অনেক লোকই ব্যবহার করে, তারা সবাই কি তাহলে লেইকেনের সম্ভাব্য খুনি? আমার ভবঘুরে কল্পনাশক্তি কী ভাবল বা কী সিদ্ধান্ত নিল, এ ক্ষেত্রে তার এক কানাকড়ি দাম নেই। একজন আগন্তুককে আমি দেখেছি, কিন্তু তাকে আমি চিনতে পারিনি; তার সঙ্গে বুরগনেফের কোনো মিল না থাকা সত্ত্বেও বলছি ওই আগন্তুক বুরগনেফ ছিলেন, এটা তো ধোপে টিকবে না। আমি এটাকে এমনকি এভিডেন্স হিসেবেও চালাতে পারব না।

এখন আমি নিজের আরো একটা ভুল বুঝতে পারছি। ভুলটা হলো, ওই আগন্তুকের চোখ যখনই আমাকে চিনতে পেরেছে, তখনই তার পিছু নেওয়া উচিত ছিল আমার, অন্তত তাকে আমার বলা উচিত ছিল, ‘কী ভাই, চিনতে পেরেও চলে যাচ্ছেন যে?’

তা না করে আমি তার পিছু নিতে দেরি করে ফেলেছি।

যা হোক, বোকামি যা হওয়ার হয়ে গেছে।

বুরগনেফের কাছে নকল দাড়ি আর রুজ আছে; কিন্তু আমি এ রকম কোনো দাবি করতে পারছি না যে ওগুলো তিনি লুকিয়ে রাখবার চেষ্টা করেছেন এবং ওগুলো তাঁর কাছে থাকবার ব্যাখ্যা দেওয়ার সময় তাঁকে বিভ্রান্ত হতে বা ইতস্তত করতে দেখা যায়নি। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন ওগুলো মানুষকে বোকা বানানোর জিনিস, কোনো রকম রাখঢাক না করেই। তা ছাড়া এখন আমি পরিষ্কার মনে করতে পারছি ওই আগন্তুকের ডান হাতে একটা ছড়ি ছিল; এবং বুরগনেফ যেহেতু তাঁর ডান হাত হারিয়েছেন, ছড়ির কথা আমার মনে পড়ে যাওয়ায় তিনি পুরোপুরি সন্দেহমুক্ত হয়ে গেলেন।

আমার গঠনমূলক কল্পনা আমাকে কম ভোগায়নি এবং ওগুলো থেকে আমি কম শিক্ষা পাইনি; কিন্তু সেসব শিক্ষা যদি কাজে লাগাতে পারতাম, তাহলে আজ কি আমি বুরগনেফকে লেইকেনের খুনি বলে সন্দেহ করতে পারতাম, বলুন?

কত বড় বোকা আমি, বুঝতে পেরে এখন খুব লজ্জা পাচ্ছি।

পরদিন সকালে বুকে হালকা একটা ভাব নিয়ে ঘুম থেকে জাগলাম, সাবধান হতে পারায় সন্দেহের বশে ভুলভাল কিছু করে বসিনি বলে মনটা ভালো। সন্দেহ জিনিসটা এখন আমার কাছে উদ্ভটই লাগছে।

বোকামির কারণে যদি বন্ধুত্বের কোনো ক্ষতি করে থাকি, সেটা তো আমারই মেরামত করা উচিত, তাই না? কিছু মেরামত করবার আগে মনটা পরিষ্কার করা দরকার। পরীক্ষা করে দেখলাম, না, বুরগনেফের প্রতি এখন আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই আমার মনে। কাজেই তাড়াতাড়ি কাপড়চোপড় পরে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়ে পড়লাম, মুখে আন্তরিক হাসি নিয়ে। আমাকে দেখে তিনিও হাসলেন, যেন জানেন কেন আমি এসেছি। হালকা কিছু কথা হলো, ভালো বন্ধুদের মধ্যে যেমনটা হয়, তারপর আমরা মিউনিখের উদ্দেশে রওনা হলাম।

মার্চের সকাল, বাতাস কনকনে ঠাণ্ডা, আমাদের বেশ দ্রুত হাঁটতে বাধ্য করছে, সেই সঙ্গে আমরা যে যার চিন্তা-ভাবনাও পরস্পরের সঙ্গে শেয়ার করতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছি। প্রাদেশিক সরকারের কাজকাম নিয়ে কথা বলছেন বুরগনেফ; তাঁর বক্তব্যে বরাবরের মতো যুক্তি থাকছে, থাকছে অন্তর্দৃষ্টি, গভীরতা আর স্বচ্ছতা। তাঁর শরীর-স্বাস্থ্য সব সময় ভালো, কথা বলেন দৃঢ় ও শান্ত ভঙ্গিতে এবং নড়াচড়া থেকে এটা পরিষ্কার বোঝা যায় যে তিনি প্রচণ্ড শক্তিশালী। হুটহাট করে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা তাঁর স্বভাব নয়। সব দিক উদার একটা দৃষ্টি দিয়ে বিচার করতে অভ্যস্ত। তাঁকে বরং মানুষের প্রশংসা করতেই বেশি শোনা যায়। সব মিলিয়ে তাঁকে এখন আমার আদর্শ একজন মানুষ বলে মনে হচ্ছে, তাঁর প্রতি সন্দেহ জাগার আগে যেমন হতো। ফলে কাল রাতের কথা স্মরণ করে আত্মধিক্কারে জর্জরিত করলাম নিজেকে আমি, আমার মরে যেতে ইচ্ছা করল। ছিঃ, দেবতুল্য একজন মানুষ সম্পর্কে কী যাচ্ছেতাই ভেবেছি আমি! ভাবছি এত কিছুর পর এখন আমার ঠিক কী করা উচিত। আমি কি সব কথা স্বীকার করে তাঁর কাছে ক্ষমা চাইব? কিন্তু তারপর ভাবলাম, আমার স্বীকার করাটাও তাঁর কাছে অপমানজনক বলে মনে হতে পারে—হবেই। আর আমার নিজের সম্মান তো পুরোটাই যাবে। নিজেকে এতটা ছোট করতে মন চাইছে না।

মিউনিখে আসবার দুদিন পর বুঝতে পারলাম একটা প্রতিক্রিয়া আমার ভেতর ধীরে ধীরে আসন গাড়ছে। নিজের সন্দেহ নিয়ে আমি লজ্জিত, ঠিক আছে; তার পরও আমি আমার মন থেকে সেই ঘটনাটা মুছে ফেলতে পারছি না, যেটা ওই সন্দেহগুলোকে জাগিয়ে তুলেছিল। ওই নকল দাড়ির ছবি আমার চিন্তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। ছদ্মবেশ গ্রহণের সাজ-সরঞ্জাম সব সময় সঙ্গে রাখেন বুরগনেফ, এটা ভাবতে গেলে আমার ভেতর অস্বস্তি জাগে, সেটা যতই মৃদু হোক। এই বিষয়টার নিজস্ব একটা তাৎপর্য আছে, খুব সামান্য হলেও। তার সঙ্গে যদি যোগ করি নিবেদিতপ্রাণ আইভানের—বুরগনেফ তার যতই প্রশংসা করুন না কেন—খুলির আকৃতি, তাহলে তার চরিত্রের কসাইতুল্য হিংস্র ভাবকেও আমি অগ্রাহ্য করতে পারি না, মনে করি সেটারও একটা আলাদা তাৎপর্য আছে বা অন্তত থাকতে পারে। এসব চিন্তা স্বস্তিকর নয় মোটেও।

এক সকালে এক জায়গায় যাওয়ার কথা বলবার জন্য আমি বুরগনেফের ঘরে গেছি, সেটা একই ফ্লোরে হলেও আমার কামরা থেকে বেশ খানিকটা দূরে। আমার ইচ্ছা, গ্লিপটথেকের ভাস্কর্য দেখতে যাব। তাঁর ঘরের সামনে পৌঁছে অবাক হয়ে গেলাম। দরজা বন্ধ, সেখানে একা দাঁড়িয়ে রয়েছে আইভান। তাকে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখামাত্র আমার কেমন যেন সন্দেহ হলো, ভাবলাম এর মধ্যে কিছু একটা গোপন ব্যাপার আছে, হয়তো সেটা কোনো অপরাধও হতে পারে। আমাকে দেখে এমন দৃষ্টিতে তাকাল সে, যেন একটা ডালকুত্তা, নির্দেশ পাওয়ামাত্র লাফ দিয়ে ধরবে আমাকে, তারপর ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে।

‘কী ব্যাপার, হে, আইভান? এখানে তুমি এভাবে দাঁড়িয়ে আছ কী মনে করে?’

কোনো জবাব নেই। আমি জানি রুশ ছাড়া আর কোনো ভাষা সম্পর্কে লোকটা সম্পূর্ণ অজ্ঞ, এদিকে আমি আবার রুশ ভাষা কিছুই বুঝি না; অগত্যা ইঙ্গিতে জানবার চেষ্টা করলাম, কী করছ তুমি? এখানে?

আমার ইঙ্গিত বুঝতে না পেরে আইভান মাথা নাড়ল।

আমি আবার ইঙ্গিতে জানতে চাইলাম, তোমার মনিব কোথায়?

আবার মাথা নাড়ল সে। এটাই তার একমাত্র শারীরিক ভাষা, মাথা নাড়া।

ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, তুমি সরে দাঁড়াও, আমি ভেতরে ঢুকব।

ফের মাথা নাড়ল, ইঙ্গিতে বোঝাতে চাইল, আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেবে না। কারণ অনুমতি নেই।

আমি জানতে চাইলাম বন্ধ কামরায় তোমার মনিব কী করছেন?

আইভান ইঙ্গিতে বোঝাল, তার মনিব ব্যস্ত এবং তাঁকে বিরক্ত করা যাবে না।

এরপর আমি তাকে ইশারায় বোঝাতে চেষ্টা করলাম, আমি জরুরি কোনো কাজে আসিনি। কাজেই এখন বিদায় নিচ্ছি।

আমি ফিরে আসবার এক ঘণ্টা পর আইভানকে দেখলাম আবার হোটেলের লেটার বক্সে বেগুনি রঙের তিনটে খাম ফেলল। ওই সময় এ রকম অতি সাধারণ একটা ঘটনা নিয়ে আর কিছু ভাবিনি আমি, ঘরে ফিরে নিজের চিঠি লেখায় মন দিলাম। আমার চিঠিগুলোর মধ্যে একটা আমার উকিলকে লেখা, চিঠির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ একটা রসিদ পাঠাচ্ছি তাঁকে। চিঠিটা মাত্র অর্ধেক লেখা হয়েছে, এই সময় ডিনারের ঘণ্টা পড়ল; আমি টেবিল ছেড়ে উঠলাম না, খেতে যাওয়ার আগে চিঠি লিখবার কাজ শেষ করতে চাইছি। কারণ বিকেলে হয়তো বুরগনেফের সঙ্গে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার পরিস্থিতি দেখা দেবে।

ডিনারে বসে যথারীতি গল্প করছি আমরা। বুরগনেফ আমাকে জানালেন, আইভান তাঁকে জানিয়েছে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম। আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারিনি বলে নিয়মমাফিক দুঃখ প্রকাশও করলেন। তাঁকে আশ্বস্ত করে বললাম, সে জন্য দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই, আমরা অন্য কোনো একদিন ভাস্কর্য দেখতে গ্লিপটথেক যাব, তাঁর ব্যক্তিগত সময় নষ্ট না করে। তিনি আমাকে জানালেন আজ বিকেলে শয়ানথেলার, অর্থাৎ স্বয়ং ভাস্করকে দেখতে যাবেন তিনি এবং আমিও যদি তাঁকে দেখতে যেতে চাই তাহলে অন্য কোনো দিন আমাকে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি চাইবেন তাঁর কাছে। প্রস্তাবটা সঙ্গে সঙ্গে লুফে নিলাম, হয়তো সেটাই তিনি ধারণা করেছিলেন।

ডিনার শেষ হলো, ইংলিশ গার্ডেনে বেরিয়ে এসে হাঁটাহাঁটি করছি, কফি আর চুরুট খাচ্ছি। তারপর যখন নিজের ঘরে ফিরলাম, কী ঝামেলা তৈরি করেছি দেখে বিচলিত হয়ে পড়লাম। ডিনারে যাওয়ার আগে চিঠিগুলো তাড়াহুড়া করে শেষ করতে গিয়ে উকিলের কাছে লেখা চিঠির খাম বন্ধ করেছি, ডাকবাক্সে ফেলে দিয়ে এসেছি, কিন্তু ভুল করে খামের ভেতর রসিদটা ভরিনি, অথচ চিঠিটা লেখাই হয়েছে এই রসিদ সম্পর্কে। ভাগ্য ভালো বলতে হবে যে এখনো খুব বেশি দেরি হয়ে যায়নি।

হোটেলের অফিসে নেমে নিজের ভুলের বর্ণনা দিলাম হেড ওয়েটারকে। তিনি আমার চিঠির খোঁজে লেটারবক্সের তালা খুললেন। বাক্সে মাত্র সাত কি আটটা খাম ছিল, আমারটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে খুঁজে পাওয়া গেল। এটা খুব স্বাভাবিক যে ওগুলোর সঙ্গে থাকা তিনটি বেগুনি রঙের খামও আমার নজরে পড়ল, যেগুলো সকালের দিকে লেটারবক্সে আইভানকে ফেলতে দেখেছিলাম। কিন্তু ওগুলো আমি ‘দেখেছি’ ঠিকই, তবে সেভাবে ‘খেয়াল’ করিনি, যেহেতু বোকার মতো নিজের করা ভুলটা নিয়ে ওই মুহূর্তে অনেক বিব্রত ও উদ্বিগ্ন ছিলাম।

আবার যখন নিজের ঘরে ফিরে এসেছি, হঠাৎ ব্যাপারটা ধরতে পেরে চমকে উঠলাম। বিশ্বাস করুন, আমার জায়গায় আপনি হলেও ঠিক এভাবে চমকে বা আঁতকে উঠতেন। আমরা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে সবাই জানি যে চোখ একবার কিছু দেখে সবটুকু খেয়াল করতে পারে না, তবে মন বা অবচেতন মন অনেক খুঁটিনাটি বিষয় দেখতে পায় বা টুকে রাখে, পরে আপনার ব্যস্ততা যখন কমে আসে বা আপনার মন হালকা থাকে তখন বিস্তারিত সব অবচেতন থেকে উঠে এসে আপনার কাছে ধরা দেয়। ওগুলো আপনার ভেতর জমাই থাকে, আপনাকে দেখতে দেয় পরে, এর মধ্যে আর কিছু নেই। সেই মুহূর্তে আমার বেলাও ঠিক তা-ই ঘটল। হঠাৎ করেই, যেন এই প্রথমবার, বুরগনেফের চিঠির খামের ওপর লেখা ঠিকানাগুলো দেখতে পেলাম। সুন্দর হস্তাক্ষরে, দ্বিধাবিহীন সাবলীল ভঙ্গিতে লেখা হয়েছে চিঠির গন্তব্য, প্রতিটি অক্ষর এত স্পষ্ট, যেন ছাপা হরফ এবং প্রতিটি অক্ষরের নির্দিষ্ট একটা টান বা বাঁক লক্ষ করার মতো, যেন কোনো পেইন্টারের কাজ। এই দৃশ্য যে রোমাঞ্চ তৈরি করছে সেটা বোধগম্য হবে আপনি যখন স্মরণ করবেন বুরগনেফ কোনো এক অতীতে তাঁর ডান হাত খুইয়েছেন, কিংবা খোয়ানোর ভান করেছেন এবং তিনি তাঁর বাঁ হাতকে মোটেও দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারেন না, যেটা আমার চোখে আগেই ধরা পড়েছে। কোনো লোক যদি সম্প্রতি নিজের বাঁ হাত দিয়ে লেখালেখির কাজ শুরু করে থাকে, তার সেই লেখা ওই খামের লেখার মতো এত সুন্দর ও সাবলীল হওয়া অসম্ভব। তাহলে বিকল্পটা কী? ওই ফাঁকা আস্তিন একদম ভুয়া! সঙ্গে সঙ্গে লোমহর্ষক সন্দেহটা আবার ফিরে এলো আমার মনে, এবার দশ গুণ হিংস্রতা নিয়ে এবং শতভাগ নিশ্চয়তা আর অখণ্ডনীয় যুক্তিসহ।

 দুই হাত দিয়ে কপাল টিপছি, চেষ্টা করছি নিজেকে শান্ত করার, চাইছি ঘাম না ঝরিয়ে এভিডেন্সের ওজন বুঝতে। কিন্তু চিন্তার সঙ্গে চিন্তার সংঘর্ষ সহজে থামাতে পারছি না। ব্যাখ্যাটা যাই হোক, এটা তো পরিষ্কার, যেকোনো কারণেই হোক বুরগনেফ প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন এবং এখন আমি জানি, নিজের চেহারা বা আকার-আকৃতি গোপন করার জন্য আরো অনেক পদ্ধতি ব্যবহার করেন তিনি। এটাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা বলে মনে করি। তাঁর গায়ে সন্দেহের ছাপ পড়ে গেছে। এটা তাঁকে সৎ মানুষের দল থেকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দিচ্ছে।

এখানেও এর পরও একটা কিন্তু আছে। এটা কি বুরগনেফকে লেইকেন লেফেলডেটের খুনি হিসেবে চিহ্নিত করছে? আমার দৃষ্টিতে নিঃসন্দেহে করছে; তবে আমি সচেতন যে অন্য কারো কাছে এটা পরিষ্কার করা অত্যন্ত কঠিন হবে।

 

প্রথম প্রেম

 

সত্যি বলছি, পরিস্থিতির কারণে বুরগনেফের প্রতি আমার প্রতিটি সন্দেহ আবারও এতটাই হাস্যকর হয়ে উঠল, ইচ্ছা হলো সব চিরকালের জন্য ভুলে যাই। কী ঘটেছে শুনলে আপনিও আমার মতো বিহ্বল হবেন। দুর্ঘটনাবশত বা কাকতালীয়ভাবে যেটা আবিষ্কার করেছিলাম, বুরগনেফ নিজে সেটাকে নেহাত মামুলি ও তাৎপর্যহীন বলে প্রমাণ করেছেন এবং তা তিনি করেছেন সহজ-সরল কথাচ্ছলে, মুখে তিক্ত খানিকটা হাসি নিয়ে, তুচ্ছজ্ঞানে এবং সেটা এত দিন গোপন রাখা হলেও তাতে প্রতারণার নামগন্ধও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

আমার ভেতরটা তখন বিতৃষ্ণা আর ঘৃণায় ভরে আছে। তাঁর উপস্থিতিতে কিভাবে নিজেকে ঠিক রাখব, ভেবে কূল পাচ্ছিলাম না। যত যা-ই বলি, বুরগনেফ আমার দেখা জীবিত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী, তাঁর শিক্ষার ইতিহাস সম্পর্কে না জানলেও উপলব্ধি করি যে তিনি আমাদের যুগের একজন আদর্শ পণ্ডিত হওয়ার যোগ্য, তাঁর মতো শিল্প ও সংস্কৃতির সমঝদার মানুষও দ্বিতীয়টি দেখিনি। যার সম্পর্কে আমার এত উঁচু ধারণা, আপনিই বলুন তাঁর সামনে কিভাবে মুখ খুলি বা অবিশ্বাস্য সব অভিযোগ তুলি? কী অসম্ভব ভদ্র তিনি, কত পরিশীলিত আচরণ তাঁর! শুনুন তাহলে। আমি তাঁর ওখানে যাইনি। নিজেকে অতটা সাহসী ভাবতেই পারছিলাম না। যাব না, ভালো কথা; কিন্তু তাঁকে আমি আটকাব কিভাবে? সারাক্ষণ ভয় হচ্ছিল, আমি যাচ্ছি না দেখে তিনি নিজেই না চলে আসেন। ঘটলও ঠিক তা-ই। সন্ধের দিকে যখন সাহসে বুক বেঁধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি, দেখলাম তিনি আমার ঘরে ঢুকছেন। বললেন শয়ানথেলারের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকারটা কেমন হয়েছে। প্রখ্যাত ভাস্কর মহোদয় সকৌতুকে বলেছেন, আমার সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগতভাবে দেখা করতে পারলে ভারি খুশি হবেন। বুরগনেফ ব্যাখ্যা করলেন শয়ানথেলার মানুষ হিসেবে কেমন, তাঁর শিল্পচিন্তা সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত ধারণা দিলেন আমাকে। বললেন দুনিয়ার আরো বহু বিষয়ে তাঁর প্রবল আগ্রহের কথা। বুরগনেফকে এত উত্তেজিত, এত বেশি আপ্লুত, উদার ও অকুণ্ঠ প্রশংসায় মুখর দেখতে পেয়ে বিব্রত বোধ করছি। নিজেকে আমার খুব ছোট লাগছে, ভাবছি এত বড় গুণী একজন মানুষের সম্মান আর মর্যাদা ভুল করে ধুলায় মিশিয়ে দিতে যাচ্ছি না তো? তাঁর বিরুদ্ধে আমার নিজের সন্দেহগুলো নড়বড়ে লাগতে লাগল। নিজেকে বারবার বলতে লাগলাম, মুখ খোলার আগে আরো অকাট্য প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে আমাকে। তারপর তাঁর গল্প শুনতে শুনতে আমার ভেতর তাঁর সম্পর্কে নতুন একটা আগ্রহ জন্মাল এবং তিনি যখন কথাচ্ছলে এই বাস্তবতা প্রকাশ করলেন যে তিনি তাঁর ডান হাত হারাননি, সেই মুহূর্তে তাঁর বিরুদ্ধে আমার সব সন্দেহ স্রেফ কর্পূরের মতো উবে গেল।

নিজের কথা বলতে গিয়ে তিনি আমাকে জানালেন, ‘আপনি শুনলে অবাক হবেন, মানুষ যেটাকে আশা বলে, আমার ভেতর সেটার কোনো অস্তিত্ব নেই। সংসারী জীবনের আনন্দ আর দুঃখ-বেদনা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত আমি, বলতে পারেন ওসব আমার জন্য নিষিদ্ধ। ’

‘এসব কী বলছেন আপনি!’

‘ঠিকই বলছি। যেহেতু ওই জগত্টাই আমার নেই, তাই বেঁচে থাকার জন্য আমাকে নির্ভর করতে হয় নিজের আত্মার ওপর, ওটাকে বিমূর্ত সব জিনিসের দিকে আকর্ষণ করার চেষ্টায় থাকি; আর চেষ্টা করি সাধারণ মানুষের ভালো-মন্দের দিকে খেয়াল রাখতে। ব্যস, আর কিছু নয়। আমার জীবন লারেলাপ্পা মার্কা কোনো দিন ছিল না, হবেও না। ’

‘কিন্তু বঞ্চিত হচ্ছেন কেন, যদি না এটা আত্মপীড়ন হয়?’

‘নারীর ভালোবাসা অসম্ভব একটা জিনিস। আপনার চেহারায় অবিশ্বাস ফুটছে, দেখতে পাচ্ছি। এ ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতে চাইছি না, কিংবা ইঙ্গিতে সারতে চাইছি না,’ বললেন বুরগনেফ, ফাঁকা আস্তিনটা ধরলেন এবং ওটা তাঁকে ধরতে দেখামাত্র একটা লোমহর্ষক শিহরণ বয়ে গেল আমার শরীরে।

‘আপনি হাতটা হারিয়েছেন,’ শুধু এটুকুই বলতে পারলাম, আমার গলা একটু একটু কাঁপছে, কারণ অনুভব করছি এখানে একটা বিকট সংকট দেখা দিতে যাচ্ছে, একটা ঢোক গিলে আবার শুরু করলাম, ‘যদিও আপনার জন্য বিষয়টা খুবই দুঃখজনক, তবে এর কারণে আপনার তো মেয়েদের মনোযোগ আর সহানুভূতি পাওয়ার কথা এবং তার সঙ্গে বোধ হয় প্রচুর প্রেম-ভালোবাসাও। ’

আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন তিনি, কথা বলছেন না।

‘মেয়েরা কিন্তু ভারি রোমান্টিক,’ আবার বললাম। ‘আর ওদের কল্পনাশক্তিকে খুব সহজেই স্পর্শ করা যায়। ’

‘হ্যাঁ,’ তিক্ত কণ্ঠে বললেন তিনি, মুখে লেগে থাকা মৃদু হাসিটাও তেতো। ‘কিন্তু মুশকিল হলো আমার হাত হারাইনি। ’

স্থির হয়ে গেলাম, তাঁর দিকে শুধু তাকিয়ে আছি। তাঁর কথার সুরে তিক্ততা থাকলেও কথা বলার সময় একদম শান্ত থাকছেন তিনি। এ রকম রোমাঞ্চকার কিছু শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না, এখন শোনার পর তিনি কী ব্যাখ্যা দেন তা জানার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।

‘হাতটা যদি যুদ্ধ করতে গিয়ে হারাতাম কিংবা কোনো দুর্ঘটনার কারণে, তাহলে হয়তো মেয়েদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারতাম, তারা আমার প্রতি সদয় হলেও হতে পারত। কিন্তু যেমনটা বললাম, আমার হাত আমার শরীরের পাশে ঝুলে আছে, শুকনো, হাড্ডিসার, কুঁচকানো খুরমার মতো চামড়ায় মোড়া, কারো সামনে বের করার যোগ্য নয়। ’

আটকে রাখা দম ছাড়লাম। তিনি আবার নিজের মতো করে শুরু করলেন, আমার চোখের দিকে লক্ষই করছেন না।

‘তবে আমার জীবনটা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে এই কারণে নয়। নারীর প্রেম আশা করা যেতেই পারে, আমার আঙ্গিক বিকৃতি আরো অনেক গুরুতর হলেও। কারণটা আরো অনেক গভীরে লুকিয়ে আছে। সেটা সুপ্ত হয়ে আছে আমার ইতিহাসে। আমার আর সেক্সের মাঝখানে রয়েছে একটা গ্রানাইট পাথরের দুর্ভেদ্য দেয়াল। ’

কী বলব ভেবে পেলাম না। একের পর এক বিস্ময়ের ধাক্কায় নিজেকে অবশ লাগছে। তারপর অনেকটা নিজের অজান্তেই একটা প্রশ্ন করে বসলাম, বলা উচিত ভালো করে চিন্তা না করেই মুখ খুললাম। ‘এই যে একটা দেয়ালের কথা বলছেন আপনি, সেটা আপনার নিজের তৈরি নয়তো? কথাটা এই জন্য বলছি, আমি যতটুকু বুঝি, এ ধরনের দেয়াল মানুষ নিজেই তোলে, অনেক সময় কোনো ধরনের অপরাধবোধের কারণে, আবার কখনো বা নিজেকে শাস্তি দেওয়ার প্রয়োজন আছে মনে করে। অবশ্য আপনার সমস্যা সম্পর্কে আপনিই সবার চেয়ে ভালো জানবেন। ’

‘হ্যাঁ, অবশ্যই সবার চেয়ে ভালো জানি। ’

‘সেটা কি এতটাই ব্যক্তিগত যে কাউকে বলা চলে না?’

উত্তর না দিয়ে চোখ বুজলেন বুরগনেফ, তারপর নিজের কপালের দুই পাশ চেপে ধরলেন।

আমি বললাম, ‘বুঝতে পারছি, কথা বলতে আপনার সমস্যা হচ্ছে। তার চেয়ে বরং প্রশ্ন করি, আপনি দু-এক কথায় জবাব দিন। আপনি আহত হয়েছেন, মানে আপনাকে কেউ কি আঘাত করেছে, কোনো অপদার্থ নারী? যে কারণে নিজের জীবন থেকে গোটা সেক্সটাকেই আপনি বাতিল করে দিয়েছেন? যেহেতু প্রথম নারী ভুয়া ছিল, সেই হতাশায় আপনি সত্যিকার ভালো কোনো নারী খুঁজে নিতে রাজি নন?’

‘ওরা সবাই ভুয়া,’ বুরগনেফের গলায় প্রচণ্ড গর্জন, চাপা বলে আশপাশ থেকে লোকজন ছুটে এলো না। ‘না, তা বোধ হয় নয়। বংশধারার সূত্রে হিংস্র, এই অর্থে ভুয়া, এ রকম সবাই হয়তো নয়। তবে অনেকেই এ রকম, বিশ্বাস করুন। তবে বাকিরা, প্রায় সবাই, জন্মসূত্রে এত দুর্বল যে সত্য ধারণ করার ক্ষমতাই তারা রাখে না। আরে! ওদের ভালো গুণের ক্যাটালগ জানা আছে আমার, ব্রাদার। ওরা প্রায় সময়ই করুণা বিলি করে বেড়ায়, আত্মপ্রেমী, মজা পাওয়ার জন্য উদারতা দেখায়; ওরা এই এক রকম সেই এক রকম এবং ভয়ানক নির্দয়, অনুতপ্ত হতে জানে না, যতই দাও ওদের চাহিদার শেষ নেই। ওদের মধ্যে আপনি ধারাবাহিকতা খুঁজে পাবেন না, এমনকি মন্দ কাজও চালিয়ে যেতে অক্ষম, এতই দুর্বল। মেয়েদের মনে শুধু ছাপ পড়ে, তাগাদা না দিয়ে ওদের দিয়ে আপনি কিছুই করাতে পারবেন না। মাত্র একটা বিষয়ে লেগে থাকতে পারে ওরা, হিসাবে যদি মেলে, আর সেটা হলো অহংকার। অহংকার দেখিয়ে স্বর্গসুখ পায় ওরা। গড! কী ভোগান্তিই না ভুগিয়েছে আমাকে এই মেয়ে জাতটা!’

সব শেষে গভীর, নিচু একটা বিস্ময়বোধক শব্দ, আধো গোঙানি, আধো অভিশাপ এবং এভাবেই শেষ হলো তাঁর খ্যাপামি ভরা ভাষণ। কয়েক মিনিট চুপ করে থাকলেন, তাকিয়ে আছেন মেঝেতে, তারপর আচমকা চোখ ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন, বললেন, ‘আপনি কখনো হাইডেলবার্গে গেছেন?’

‘যাইনি। ’

‘আমার ধারণা ছিল আপনার দেশের সব লোক জীবনে একবার হলেও হাইডেলবার্গে বেড়িয়েছেন। আপনি যখন যাননি, কাজেই আপনি আমার গল্প অবশ্যই শোনেননি। আমার যুবা বয়সটা কিভাবে কেটেছে বলব আপনাকে? আপনার কি শোনার ইচ্ছা আছে?’

‘আপনি যদি শোনাতে চান, কৃতজ্ঞ বোধ করব। খুব আগ্রহ নিয়ে শুনব, কথা দিচ্ছি। ’

‘রসালো কেলেঙ্কারির গন্ধ পাচ্ছেন, তাইতো?’

একটা ধাক্কা খেলাম। ‘না...মানে?’

‘ঠিক আছে, কী বলেছি ভুলে যান। শুনুন, বলি। দেখতে দেখতে আমার বয়স হলো সাতাশ। সাতাশ বছরের তরুণ, যার ভেতর ভালোবাসার অস্পষ্ট কোনো মোহ বা আকাঙ্ক্ষার ক্ষীণ নড়াচড়া পর্যন্ত নেই। অনেক মেয়েকে আমার পছন্দ হয়েছে, তাদের সবার সঙ্গে ওঠাবসা করেছি, হেঁটেছি এবং ঘুরে বেড়িয়েছি; কিন্তু সেসব ছিল নির্জলা হৃদয়ের কারবার, আপনাদের শেকসপিরিয়ান ফ্রেইজ ব্যবহার করে বলতে হয়, আমার কাঁধে কিউপিড টোকা মারেনি। ’

আমি গোগ্রাসে তাঁর কথা গিলছি।

‘আমার গল্পের জন্য এত সব বিশদ বিবরণ গুরুত্বপূর্ণ নয়। আপনি হয়তো লক্ষ করেছেন দৃঢ়চেতা প্রকৃতির মানুষ নিজেদের শক্তি জমিয়ে রাখে, নিজেদের অনুভূতি তারা ভুলেও কখনো এখানে-সেখানে বিলি করে বেড়ায় না, সেটা ফষ্টিনষ্টিতেই হোক বা তুচ্ছ প্রেম-ভালোবাসায়। তাদের ভেতর একটা ভেলোসিটি আর মোমেন্টাম থাকে, শারীরিক আকাঙ্ক্ষা যখন একবার মাথাচাড়া দেয়, তাদের সব অনুভূতি তখন প্রবল থেকে প্রবলতর হতে থাকে। সাড়া দিতে দেরি করে ঠিকই, কিন্তু একবার যখন সাড়া দেয় তখন গোটা অস্তিত্ব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমার বেলায় ব্যাপারটা সে রকম ছিল। প্রথম দিকের জটিল রোমান্টিক জটিলতা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য নিজের গোটা জীবন বিকিয়ে দিতে হয়েছে আমাকে। তখন যেমন ছিলাম, এখন আর তেমন নই। আমার অতীত আর বর্তমানের মধ্যে বিরাট একটা ব্যবধান আছে; সেটা অন্ধকার, ঝোড়ো ও গূঢ়। দূর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বুকভরা আশা নিয়ে এক যুবক; শক্তিতে বলীয়ান, উচ্চাকাঙ্ক্ষায় অনুপ্রাণিত এবং স্বচ্ছ আনন্দ আর সুখে অবশ, বেঁচে থাকার জন্য বিরাট সক্ষমতা নিয়ে অপেক্ষমাণ; আর এদিকে? এদিকে ক্ষয় ধরা পুরুষত্ব, আশার কোনো আলো নেই, আছে শুধু কষ্টভোগ আর ঝড়ঝাপ্টা। ’

তিনি বিরতি নিচ্ছেন। তাঁকে দেখে ভাবলাম মনের কানাচে ভিড় করে আসা স্মৃতিগুলো থেকে কিছু সাজেশন যাচাই-বাছাই করতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি, তবে একটু পরই আবার নিজের বক্তব্য শুরু করলেন, শান্ত গলায়, হাসি হাসি মুখ করে।

‘হাইডেলবার্গে কয়েক সপ্তাহ ছিলাম। আমার ঘনিষ্ঠ সঙ্গীদের একজন ছিলেন কেসনার, পেশায় আর্কিটেক্ট এবং হঠাৎ করে একদিন তিনি আমাকে তাঁর শ্যালিকার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। সুকুমারীর নাম অটলি, তাঁর কথা বারবার আমাকে শুনিয়েছেন তিনি, প্রচুর উৎসাহ আর আদরের সুরে।

‘গেলাম আমরা এবং খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের অ্যাপায়ন করা হলো। দেখলাম, কেসনারের প্রশংসা পাওয়ার সব যোগ্যতাই আছে অটলির মধ্যে। তিনি সুন্দর, তবে এত বেশি নয় যে চোখ ধাঁধিয়ে যাবে; বুদ্ধিমতী, তবে প্রকাশ্যে ততটা চোখে পড়ে না; তাঁর নরম গাঢ় চোখের দৃষ্টিতে উদারতা দেখতে পেলাম, দেখতে পেলাম লজ্জাটে ভাব, সঙ্গে আছে ভাবাবেগ, যেটা বলতে গেলে সব জার্মান মেয়েরই ভূষণ, তবে ওদের প্রায় সবার মধ্যে পাগলামির নামান্তর খরুচে যে ভাবটা দেখা যায় সেটা নেই। তাঁকে আরো বেশি পছন্দ করলাম এই কারণে যে তাঁর সান্নিধ্যে নিজেকে আমার বেশ সুখী আর সহজ লাগছিল, যেটা তরুণ মেয়েদের সঙ্গে আমার সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিরল একটা ঘটনা। আমি, সত্যি কথা বলতে কি, ওদের সঙ্গ উপভোগ করি না। ’

‘তবে এই ভদ্রমহিলার বেলায়...’

আমাকে থামিয়ে দিয়ে বুরগনেফ বললেন, ‘আপনি দেখতে পাচ্ছি লাফ দিয়ে এই উপসংহারে পৌঁছে গেছেন যে আমরা পরস্পরের প্রেমে পড়ে গেলাম। আপনি উপসংহারে পৌঁছাচ্ছেন ঝোঁকের মাথায়, তাই বিয়োগান্ত নাটকটা উপভোগ করতে পারছেন না। তাঁর সঙ্গে আমার বারবার দেখা হতে লাগল, তাঁকে ধীরে ধীরে পছন্দ করতে শুরু করলাম, তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা আর সমীহ জন্মাল। তাৎপর্য বহন করে এমন হাসি, চোখ মটকানো, কে কার কেমন বন্ধু তার আভাস   বিনিময়, নিজেদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মিল থাকলে সেটা কৌশলে উল্লেখ করা—সবই আমার অনুভূতিকে আরো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার তাগিদ দিল এবং মনের ভেতর থেকে আমাকে আশ্বস্ত করা হলো, না, আমি ওই নারীর প্রেমে পড়িনি। এ কথা সত্যি যে তাঁর সঙ্গ পেলে আমার ভেতর ভালো লাগার একটা অনুভূতি জাগে এবং তাঁকে ছেড়ে চলে আসার পরও আমার বেশির ভাগ চিন্তা দখল করে রাখেন তিনি। এও সত্যি কথা যে প্রায়ই তাঁকে আমার স্ত্রী হিসেবে কল্পনা করেছি। আমার এই সব কল্পনা আর ধ্যানে তাঁকে আমি অত্যন্ত হিসাবি একজন গৃহিণী হিসেবে ভূমিকা রাখতে দেখেছি, আমাদের সংসারটা যাতে সুখের হয়। কিন্তু এও কম সত্যি নয় যে কয়েক সপ্তাহ তাঁর সাময়িক অনুপস্থিতিতে কোনো রকম অস্বস্তিতে ভুগিনি, তাঁর অভাবে নিজেকে বঞ্চিত বলে মনে হয়নি, মনে হয়নি আমার জীবনটা ফাঁকা হয়ে গেছে। আমি জানি, অতএব, যা কিছু অনুভব করেছি সেগুলো প্রেম থেকে আসেনি।

‘এসব গেল আমার অনুভূতির কথা। কিন্তু তাঁর অনুভূতির বেলায় কী ঘটেছে? ওগুলোকে মনে হলো একদম আমারই মতো। এটা ঠিক যে তিনি আমাকে পছন্দ করেন, এও সত্যি যে আমার সঙ্গে সময় কাটাতে তাঁর খুব ভালো লাগে। আমাকে তিনি ইঙ্গিতে বলতে চেষ্টা করলেন আমার প্রতি তাঁর আগুনের মতো গনগনে প্রেম আছে, যা বিশ্বাস করিনি, বিশ্বাস করতে পারিনি। এই নারীর মধ্যে প্রশান্তির একটা ভাব আছে, সম্ভবত সেটাই আমার অনুভূতিকে নীরব রেখেছিল। কারণ প্রেম এমন একটা শিখা, যেটা বোধ হয় শুধু শিখার সংস্পর্শেই জ্বালা সম্ভব। অবশ্যই এটা গর্বিত, গম্ভীর প্রকৃতির মানুষের বেলায় বেশি সত্যি, যে প্রকৃতি ঠাণ্ডা মেরে যায় নিজের চেয়ে বেশি তাপমাত্রার কারো সঙ্গে সংযুক্ত না হলে।

‘যে অনুপস্থিতির কথা তখন বলছিলাম, একসময় সেটা শেষ হলো, অর্থাৎ কয়েক সপ্তাহ পর ফিরে এলেন অটলি। তাঁর হাবভাব আর আচরণে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখে এতটুকু খুশি বা বেজার হইনি; বার কয়েক দেখা-সাক্ষাতের পর ওই পরিবর্তনগুলো আরো পরিষ্কার ধরতে পারলাম। যদিও আগের মতোই শান্ত, তবে তাঁর ব্যবহারে কোমল ভাব চলে এসেছে, যেটা নতুন। তারপর দেখলাম হালকা হাসিঠাট্টা করার সময় অকারণে লজ্জা পাচ্ছেন, আর তাঁর লজ্জা পাওয়াটা দেখতে সত্যি অসম্ভব ভালো, উপভোগ্য একটা জিনিসই বটে; আমি এমনকি তাঁর ওই হাসির মধ্যে দারুণ আভিজাত্যও দেখতে পাই। তারপর আরো খেয়াল করলাম, আমার গলা শুনলে তিনি কাঁপতে থাকেন, আমার চোখের সামনে তাঁকে রাঙা হয়ে উঠতে দেখি। ’

আমি নিঃশ্বাসের সঙ্গে বললাম, ‘ও মাই গড!’ তবে এত নিচু সে আওয়াজ, বুরগনেফের শুনতে পাওয়ার কথা নয়।

তিনি বলে যাচ্ছেন : ‘এসব চিহ্ন দেখতে পেতে আমার ভুল হয়নি। এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল যে তিনি আমাকে ভালোবাসেন এবং এটাও কম পরিষ্কার ছিল না যে আমি এটা আবিষ্কার করার পর আমার ভেতর যে আগুন তৈরি হলো, তার দরুন নিজেও দ্রুত তাঁর প্রেমে পড়ে যাচ্ছি। অলস মস্তিষ্কের চিন্তা টেনে এনে আপনাকে আমার গল্প থেকে দূরে সরিয়ে রাখব না। আরেকটা চুরুট নিন। ’ দাঁড়ালেন তিনি, ঘরের মেঝেতে নীরবে পায়চারি শুরু করলেন।

 

 

অ্যাগালমা

 

‘এ রকম একটা গুরুতর মুহূর্তে প্যারিস থেকে এক ভদ্রমহিলা চলে এলেন, যার কারণে আমার জীবনে সবচেয়ে বড় দুঃখটা নেমে এলো। ভবিষ্যৎ দেখতে পান বা নিয়তির ওপর বিশ্বাসী কোনো ব্যক্তি হয়তো ওই মুহূর্তে এই নারীর চেহারা বিশ্লেষণ করে বলতে পারতেন সেখানে পূর্বপরিকল্পিত সর্বনাশের ছকটা কিভাবে কাটা আছে। আর কয়েক সপ্তাহ পর হলে তাঁর আগমন হতো সম্পূর্ণ নিরাপদ ও অক্ষতিকর; প্রেমের সর্বগ্রাসী শক্তি তখন এমনভাবে মুড়ে রাখত যে বাইরের কোনো প্রভাব আমাকে স্পর্শ করতে পারত না। কিন্তু হায়! সেটা হওয়ার নয়। যা হোক, আমার নিয়তি আরেক দিকে মোড় নিল। যে নারী এলেন তাঁর ছায়া আমার বাকি অস্তিত্ব কালো রঙে মুড়ে ফেলল। সেই নারী হলেন অ্যাগালমা লিবেনস্ট্রেইন।

‘কোনো কোনো মানুষের মধ্যে এমন কিছু থাকে, যাকে দেখামাত্র মন কু গায় কিংবা তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে থাকার একটা জরুরি তাগিদ অনুভব করে, অথবা তাঁকে ঠিক মেনে নিতে বা সহ্য করতে ইচ্ছা করে না। আমরা সম্ভবত তাঁর মধ্যে এমন কিছু দেখতে পাই, যেটা আমাদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিন্তু অ্যাগালমাকে দেখে বিন্দুবিসর্গ কিছুই বুঝতে পারিনি। এখানেই প্রশ্ন জেগেছে আমার মনে, আমাদের বিচার-বিশ্লেষণ প্রায় সময় ব্যর্থ হয় কেন? কেন এই নারীকে দেখে কিছুই টের পেলাম না? তিনি সুন্দরী, অপরূপা হলেও না হয় বুঝতাম যে আমার জন্য তিনি অশনিসংকেত হয়ে উঠতে পারেন। আমি দেখেছি তাঁর সোনালি চুল আশ্চর্য রকম সুন্দর। আমি যখন সোনালি বলছি, হালকা সুরে বলছি না। লালচে বা খড়ের রং বলছি না, বলছি পালিশ করা সোনার কথা, একদম হলুদ আর সেই রকম চকচকে। তাঁর ভ্রুর কাছে ওগুলোর খুদে ঢেউয়ে আলোর যে প্রতিফলন তৈরি হয়, সেটা হুবহু একটা ছোট্ট মুকুট, শুধু রাজকন্যাদের মাথায় শোভা পায়। এটাই ছিল তাঁর একমাত্র সৌন্দর্য এবং সত্যি মুগ্ধ করার মতো। বাকি তাঁর যা কিছু ছিল, ওগুলোর আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য ছিল না। তাঁর কাঠামো লম্বা আর পুষ্ট; তবে লাবণ্যমাখা নয়, যদিও তাঁর উপস্থিতি আপনি অগ্রাহ্য করতে পারবেন না। আমি অবশ্য প্রথমে তাঁর বিনুনি করা চুল ছাড়া আর কিছু লক্ষ করিনি। ’

আবার উঠলেন তিনি, ক্লান্ত পায়ে হেঁটে বেডরুমে ঢুকলেন, ওখান থেকে ছোট্ট একটা গয়নার বাক্স নিয়ে ফিরলেন। বাক্সটা টেবিলের ওপর রাখলেন, ঢাকনি খুললেন, তাতে কী আছে দেখার জন্য সেটার ভেতরে ইঙ্গিতে তাকাতে বললেন আমাকে। তাকালাম, দেখলাম দারুণ উজ্জ্বলতা নিয়ে সোনালি এক কি দুই গাছি চুল পড়ে রয়েছে গাঢ় নীল মখমলের ওপর।

‘জিনিসটা দেখুন একবার,’ বললেন বুরগনেফ। ‘মনে হচ্ছে না এ রকম চুল শুধু একটা পরির মাথা থেকে কাটা যেতে পারে?’

‘সত্যি, অসম্ভব সুন্দর লাগছে দেখতে। ’

‘লুক্রেজিয়া বরজিয়ার কথা মনে করুন, ইটালিয়ান রাজনীতিক সিজার বরজিয়ার কুখ্যাত বোন : যিনি তাঁর ভাইয়ের মতোই ছিলেন বেইমানি করতে ভারি দক্ষ,’ তিক্ত গলায় বললেন বুরগনেফ। ‘দুজনের মধ্যে মিলটা কোথায় বলুন তো, লুক্রেজিয়া আর অ্যাগালমার মধ্যে? ওদের সোনালি চুলে। এ রকম চুল লুক্রেজিয়ার মাথায়ও মুকুট পরিয়ে রেখেছিল, তবে তাঁর চুল সামান্য ম্লান, তাঁর চরিত্রের মতোই। ’

আবার নিজের চেয়ারে বসলেন তিনি, তাকিয়ে আছেন বাক্সের গায়ে ঝুলে থাকা তালার দিকে, মুখ খুললেন আবার :

‘তিনি ছিলেন অটলির বান্ধবী—প্রিয় বান্ধবী, পরস্পরকে বলতেন তাঁরা—এর মানে তাঁরা দুজন একে অপরকে যখন তখন প্রচুর চুমো খেতেন এবং একে অপরের সঙ্গে নিজেদের সব গোপন কথা শেয়ার করতেন, মানে স্ত্রীলিঙ্গের মিথ্যুক স্বভাব যতটুকু অনুমোদন করত বা ইঙ্গিত করত। অ্যাগালমা সম্পর্কে আমার তখনকার চিন্তা-ভাবনা এবং এখনকার জ্ঞান আলাদা, দুটিকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করি। তাই আমার ওপর তাঁর ঠিক কী রকম প্রভাব পড়েছিল সেটার বিশ্বস্ত বর্ণনা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়, স্রেফ পারব না। এটুকু বলাই যথেষ্ট হবে, সত্যি কথা বলতে কি, আমার স্পষ্ট মনে পড়ে আমি তাঁর ভক্ত হয়ে পড়িনি এবং সে কথা অটলিকে বলেছিও। অটলি শুনলেন, তারপর আমার অসাড় অনুভূতির নমুনা দেখে বিস্মিত হয়ে আমাকে আশ্বস্ত করলেন, মানুষ কিন্তু অ্যাগালমাকে দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারে না (কেন মুগ্ধ হয়, এর কারণ কখনো তিনি খুঁজে পাননি)। তাঁর কথার উত্তরে আমার উত্তর ছিল আন্তরিক—হয়তো সত্যিটা হলো এই যে যারা অ্যাগালমাকে দেখে মুগ্ধ হয় তারা সবাই একটু কম পরিশীলিত; কিন্তু রুচি আছে এমন মানুষজন তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে থাকবে।

‘আমার এই অভিমত কিংবা সেটার কিছু অংশ, অ্যাগালমার কানে উঠল।

‘আমার জীবনে যে দুঃখ নেমে এসেছিল, এটাই হয়তো তার বড় একটা কারণ ছিল। যদি তাঁর অহংকারে এত বড় আঘাত না দিতাম, তিনি হয়তো আমাকে আমার মতো থাকতে দিতেন। জানি না, বলতে পারব না। আমি শুধু বুঝি যে বহু লোকের ওপর অ্যাগালমা বিরাট প্রভাব ফেলার চেষ্টা করে সফল হয়েছিলেন এবং সব ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আমাকেও তিনি তাঁর এক অন্ধভক্তে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর সম্পর্কে বলতে হলে প্রভাব শব্দটার বিকল্প কিছু নেই। আমাদের মন যেটাকে আকর্ষণীয় বলে চিনতে পারে, সাধারণত সেটাকেই আমরা প্রভাব বলি; কিন্তু এ কথা অ্যাগালমার ক্ষেত্রে সত্যি নয়। এই এড়াতে না পারা প্রভাবের ভিত্তি ছিল তাঁর রহস্যময় ব্যক্তিগত ক্ষমতা—সেটা এমন এক রহস্য যে না চমকে পারা যাবে না, বাকি সব অশুভ চমকের মতোই। পুরুষদের ওপর তাঁর প্রভাবের একটা উৎসর ব্যাখ্যা দিতে পারব: তাঁর কৌশল ছিল তাদের তৎক্ষণাৎ, অর্থাৎ খপ করে ধরে ফেলা এবং একই সঙ্গে দূরে সরিয়ে রাখা। দক্ষতার সঙ্গে তাদের অহংকারকে উসকে দিতেন, তাদের নিজের সম্পর্কে আগ্রহী করে তুলতেন, তাদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে এমন সব কথা বলতেন, যাতে তারা তাঁর সুনজরে থাকার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে, অথচ নিজেকে সরিয়ে রাখতেন তাদের নাগালের বাইরে—কখনো অজুহাত দেখাতেন সময়ের অভাব, কখনো শহরে অনুপস্থিত, কখনো পুরনো বন্ধুদের নিয়ে ব্যস্ততা ইত্যাদি। এসবে প্রকাশ পেত নিজেকে নিয়ে তিনি খুব গর্বিত, আর ওদিকে লোকগুলো তাঁর প্রতি আরো বেশি আকৃষ্ট হতো, তাদের মুগ্ধতা আরো অনেক বেড়ে যেত। যেসব পুরুষকে বড়শিতে গাঁথতে চাইতেন, তাঁর প্রথম কাজ ছিল তাদের দুর্বলতাগুলো জানা। তারপর শুরু করতেন তাদের ওই দুর্বল পয়েন্ট নিয়ে হাসি-মসকরা আর পুরুষরা সেসব উপভোগ করত। তাদের তিনি অন্য সব মেয়ের দুর্বলতা বলে দিতেন, তারা যাতে ওদের জালে ধরা না দেয়।

‘আমাকেও তিনি এই পদ্ধতিতে প্রভাবিত করতে চেয়েছেন। এখানে আমি তার একটা উদাহরণ দিতে পারি। একদিন, আমরা তখন একটা পিকনিকে রয়েছি, তাঁর উত্থাপিত একটা প্রসঙ্গে কথা বলছিলাম আমি, বিষয় ছিল মেয়েদের বুদ্ধিসুদ্ধি পুরুষের তুলনায় নিকৃষ্ট। আমি যেভাবে কথা বলতে অভ্যস্ত, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় নিয়ে এবং গুরুত্ব দিয়ে বক্তব্য দিতে বাধ্য করা হচ্ছিল আমাকে। এ সময় হঠাৎ আমার দিকে ফিরলেন তিনি এবং চাপা স্বরে বললেন, ‘আপনি যা কিছু বলবেন আমার তাতে সমর্থন আছে, আপনাকে পুরো কৃতিত্ব দেব : আপনার কাছে শুধু প্রার্থনা, আপনি দয়া করে এত বেশি সিরিয়াসলি এবং এত দৃঢ় ভঙ্গিতে কথা বলবেন না। ’

‘কেন? তাতে সমস্যা কী?’ বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলাম।

‘আশ্চর্য একটা অর্থবহ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন তিনি, কিন্তু কিছু না বলে চুপ করে থাকলেন।

‘আমি কি জানতে পারি, কেন এভাবে কথা বলব না?’ আবার প্রশ্ন করলাম।

‘কারণ তা যদি বলেন আপনি, কেউ হয়তো ঈর্ষা বোধ করতে পারে। ’ কথাটা বলার সময় তাঁর চোখে হাসিমাখা অবাধ্যতা প্রকাশ পেল।

‘আমি কি জানতে পারি, আমার প্রতি ঈর্ষা বোধ করার অধিকার কার আছে?’

‘ওহ! সেটা আপনি খুব ভালো করেই জানেন। ’

‘কথাটা সত্যি; আমি জানতাম, তিনিও জানতেন আমি জানি। এ কথা বলতে লজ্জা পাচ্ছি, আমি এত বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম যে তখন দ্ব্যর্থবোধক শব্দে মনের ভাব প্রকাশ করতে চেষ্টা করেছিলাম, এখন বুঝতে পারি সেটা ছিল আমার দিক থেকে বিশ্বাস ভঙ্গ; কিন্তু তখন ভান করেছিলাম, সেটা অটলির কাছে একটা মুখরোচক ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা পরস্পরকে নিয়ে কী ভাবি বা নিজেদের নিয়ে আমাদের অনুভূতি কী রকম, এসব নিয়ে আমরা কখনো কথা বলিনি। মনে করতাম, একটা সম্মানের বাঁধনে বাঁধা পড়ে আছি, কৌশলে কিছু স্বীকার বা অস্বীকার করার নেই।

‘তাঁর সুর আর দৃষ্টি আমাকে খানিকটা অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। ভাব দেখালাম, আমার ওপর মনোযোগ থাকা নিয়ে কারো কোনো দাবি আছে কি না তা আমার জানা নেই এবং আমি যে স্বাধীন আর নিঃসঙ্গ একজন পুরুষ, সেটা প্রমাণ করার জন্য বারবার তাঁর মনোযোগ টেনে আনলাম নিজের দিকে। এক কি দুইবার উড়ন্ত দৃষ্টির সাহায্যে দেখতে পেলাম, সঙ্গীরা কেউ কেউ আমার আচরণ ভালোভাবে নিচ্ছে না এবং অটলিকেও মনে হলো অন্যান্য সময়ের চেয়ে একটু বেশি চুপচাপ, তাঁর বেলায় যেটা একদম মানায় না। তবে তাঁর অমায়িক আচরণে, যদিও শান্ত, কোনো পরিবর্তন দেখলাম না। সাধারণত তাঁর সঙ্গে যত কথা বলি, সেদিন তার চেয়ে অনেক কম বললাম, আংশিক কারণ অনেক বেশি সময় ধরে অ্যাগালমার সঙ্গে বকবক করেছি, আরেকটা কারণ বুঝতে পারছিলাম, অ্যাগালমার চোখ দুটি সারাক্ষণ আমাদের দুজনের মাঝখানে ছোটাছুটি করছে। তবে আমাদের আলোচনার মধ্যে ‘মেজাজ’ নামের কোনো ছায়া বা ‘গাম্ভীর্য’ নামের কোনো ভারী পরদা বাগড়া দেয়নি।

‘আমাদের ফেরার পথে, জানি না কী এক শয়তান ভর করল আমার ঘাড়ে, আমাকে প্রশ্নটা করার প্ররোচনা দিল অ্যাগালমা—তিনি তাঁর আগের কোনো পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে সিরিয়াসলি ও দৃঢ় ভঙ্গিতে কথা বলতেন কি না?

‘হ্যাঁ, তখন আমি ওভাবে কথা বলতাম। ’

‘আর এখন?’

‘এখন আমার সন্দেহ আছে। হতে পারে আমাকে ভুল ধারণা দেওয়া হয়েছে। ব্যাপারটা আমার কোনো উদ্বেগ নয়, যেভাবেই দেখি না কেন; তবে আমাকে সেভাবেই বোঝানো হয়েছে। আরেকটা কথা কী জানেন, আমি স্বীকার করি নিজের কান দিয়ে যা শুনি সেটা নিজের চোখ নিশ্চিত করে না। ’

‘এই আলোচনা দুটি আলাদা ক্ষেত্রে অস্বস্তিকর। এসব থেকে বোঝা যায়, লোকজন আমার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে যার যেভাবে খুশি আলাপ করছে। এটা তারা ভালো করছে না, কারণ আমি যতক্ষণ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করছি ততক্ষণ বিষয়টা নিয়ে কথা বলার মানে আমার প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন, তাই নিন্দাযোগ্য। এটা থেকে আরো একটা জিনিস বোঝা যায়, তা হলো, ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে, আমার প্রতি অটলির অনুভূতি নিয়ে সন্দেহ করছে অ্যাগালমা। এটা আমার দ্রুত ক্ষয়ে আসা গর্বকে সচকিত করে তুলল! এবার নিজেও সন্দেহে ভুগতে লাগলাম। এ ক্ষেত্রে কল্পনাশক্তির লাগাম ঢিলে করে দিতেই কিছু আকৃতি দেখে নিজের সন্দেহ সম্পর্কে নিশ্চিত হলাম। অটলির ধরন-ধারণ অবশ্যই আগের চেয়ে কম নরম লাগছে। না, শুধু কম নরম না, অনেক ক্ষেত্রে একদম অন্য রকম লাগছে গত কয়েকটা দিন। তাঁর এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী কি মঞ্চে নতুন আসা ওই ছোকরা, যাকে তার কাজিন বলা হচ্ছে?

‘কাহিনি যখন ভাঁজ খুলতে শুরু করে, অনেক কিছু বলার থাকে; কিন্তু শ্রোতা হিসেবে সেটা আপনার ওপর অত্যাচার হয়ে দাঁড়াতে পারে, তাই আমার মনে থাকলেই যে সব ঘটনার বিশদ বিবরণ দিতে হবে, তা ঠিক নয়। আমি বরং তাড়াতাড়ি বিপর্যয় বা সর্বনাশ প্রসঙ্গে চলে যাই। আমাকে নিয়ে অটলির অনুভূতি ঠিক কী, তা নিয়ে আমার সন্দেহ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধু বাড়তেই লাগল। প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেলাম, আমাদের সম্পর্কটাকে বন্ধুত্বের চেয়ে বড় কিছু বলে মনে করেন না তিনি। এই সন্দেহের সঙ্গে যোগ হলো আরেকটা বিশ্বাস, আমি বোধ হয় অ্যালাগমার প্রতি অনেক বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছি। তারপর দেখলাম তিনি আমার সঙ্গে কথা বলার সময় নিজের গলার আওয়াজ বদলেছেন। তিনি অনেক দৃঢ়ভঙ্গিতে কথা বলেন আমার সঙ্গে। কয়েক দিন থেকে তাঁর আলোচনার সব বিষয়ই গুরুগম্ভীর। সময় তো বসে নেই, বয়ে চলেছে। দেখতে দেখতে কয়েকটা সপ্তাহ কেটে গেল। অটলি মঞ্চ থেকে নেমে গেছেন, এখন তিনি দর্শকের সারিতে বসা একজন দর্শক বা সঙ্গী মাত্র। তারপর একদিন জানতে পারলাম যে অটলির সঙ্গে তাঁর কাজিনের এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে।

‘আপনি এটা জেনে নিশ্চয়ই অবাক হবেন না, যে অ্যালাগমা এর আগে আমার ওপর বিরাট প্রভাব ফেলেছিলেন, তিনি এখন আমার প্রতি আরো দ্বিগুণ কোমলতা আর সদয়তার সঙ্গে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। আমি পাগলের মতো তাঁর প্রেমে পড়ে গেলাম। এর আগে পর্যন্ত এই অনুভূতি আর আবেগের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেনি। অটলির সঙ্গে যখন কথা বলতাম, সময় পাওয়ায় এখন দেখতে পাচ্ছি, বলিষ্ঠ একটা কণ্ঠস্বর থেকে বেরোতে না পারা আওয়াজ ছিল সেসব, সেখানে মনের ভাব বা অনুভূতি প্রকাশ পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না; সেই একই কণ্ঠস্বর এখন যখন আমার প্রকৃতির গভীর প্রদেশ থেকে উঠে এলো, দেখলাম নিজেকে অকুণ্ঠচিত্তে প্রকাশ করতে পারছি, ফলে আনন্দে আমার নাচতে ইচ্ছা করছে। ওই ফ্রেইজ, পাগলের মতো প্রেমে পড়া, অতিরঞ্জিত কিছু নয়; একমাত্র পাগলামিই মস্তিষ্কের এই জ্বর সম্পর্কে জানে, জানে হৃদয়ের হট্টগোল ওরফে চরম উত্তেজনা মেশানো বিভ্রান্তি সম্পর্কে। তার মানে এই নয় যে কার্যকারণকে হটিয়ে দেওয়া হয়েছে; বরং উল্টোটা সত্যি, কার্যকারণ এখানে খুব শক্তি নিয়ে সক্রিয়, তবে সক্রিয় শিখার সেই বৈশিষ্ট্য নিয়ে যেটা ম্যানিয়াকদের চোখে আলো জ্বালে।

‘যদিও, অবশ্যই তাঁর প্রতি আমার তীব্র আকর্ষণ সবার চোখে পরিষ্কার ধরা পড়ছিল; তবু ব্যাপারটা সময়ের আগে জানাজানি হয়ে যাওয়ায় ভয় পাচ্ছিলাম—তাঁকে না আমার হারাতে হয়। আবার দেরি হয়ে যাচ্ছে ভেবেও ভয় লাগছিল, তাঁকে একান্তভাবে কাছে না পাওয়ার কষ্ট আমাকে যদি অসুস্থ করে তোলে!

‘এরই মধ্যে আমার এক প্রতিদ্বন্দ্বীর আবির্ভাব ঘটল। আশ্চর্য মেধাবী এক পোল, নাম করিনস্কি, যিনি সম্প্রতি আমাদের বন্ধুমহলে যোগ দিয়েছেন এবং স্বীকার না করে উপায় নেই তিনি আমাকে ঠেলে ছায়ার ভেতর সরিয়ে দিচ্ছেন নিজের আভিজাত্য, ব্যক্তিগত আকর্ষণ, উন্নত রুচি আর রোমান্টিক ইতিহাসের সহায়তা নিয়ে। ওই লোক, পরিষ্কার বুঝতে পারতাম, আমাকে খুব ঈর্ষা করছেন। বন্ধুমহলে আমি একটু কোণঠাসা হলেও তাতে তেমন কিছু আসে যায় না, কারণ অ্যাগালমা আমাকে গ্রহণ করেছেন। আর তাই তখন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ বলে মনে করছি নিজেকে। গত কয়েক সপ্তাহের কাঁপুনি আর জ্বর কমে আসছিল, তার জায়গা দখল করে নিচ্ছিল আশায় ভরপুর আনন্দের সুগভীর জোয়ার। ওই সময় আনন্দে মারা যেতে পারতাম! এমনকি মারা যেতে পারতাম তার কয়েক দিন পরও, যখন জানতে পারলাম সুস্বাদু একটা ঈর্ষার রহস্য খুব সহজ কিছু নয়। আপনাকে এবার জানানো দরকার যে আমার আনন্দময় সময়টা হলো ক্ষণস্থায়ী। ঈর্ষা যদি সে রকম তীব্র হয়, তার শক্তি কিন্তু অপরের সর্বনাশ ডেকে আনবে। সেটা প্রথমে আমার ধারণশক্তি বা গ্রহণক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করতে লাগল। অ্যাগালমার মধ্যে কোমল ভাব থাকল না। তাঁকে আদর করতে পারি; কিন্তু তাঁর তরফ থেকে এতটুকু প্রতিদান পাই না। ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার সব পরিকল্পনার কথা শুনতে রাজি তিনি, যতক্ষণ আসবাবপত্র কেনাকাটা আর সমাজে তাঁর পজিশন সম্পর্কে বলা হয়—তার মানে, যতক্ষণ তাঁর অহংকার মূল্য পায়। তারপর বুকভরা দুঃখ নিয়ে খেয়াল করলাম তাঁর চিন্তা-ভাবনাকে নরম সাংসারিক বিষয় কিংবা শিল্প-সংস্কৃতির দিকে ধরে রাখা যায় না। এসব আমাকে ক্রমেই জটিল হতে থাকা পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে লাগল। আমি তাঁর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠলাম। উন্মত্ত মোহ নিয়ে রাশি রাশি সহানুভূতি রয়েছে আমার ভেতর, ঠিক সেটা তাঁর ভেতরও দেখতে না পেয়ে আমার গোটা দুনিয়া মাথার ওপর ভেঙে পড়ার উপক্রম করল, তাঁকে আমি স্রেফ একটা মার্বেল হিসেবে পাচ্ছি।

‘এটা শুনে নিশ্চয়ই আপনি বিস্মিত হবেন না যে তাঁর এই নির্লিপ্ত ভাব সহ্য করতে না পেরে তাঁকে অত্যন্ত বিরক্তির সঙ্গে তিরস্কার করেছি। যারা প্রেমে পড়ে, এটা তাদের যেন একটা অপরিতাজ্য বোকামি— তারা বোধ হয় ভাবে তিরস্কারের দ্বারা একটা হৃদয়কে স্নেহপ্রবণ করা সম্ভব! আমার বকা খেয়ে প্রথম তিনি ধৈর্যহারা হয়ে বললেন, আমার অভিযোগ সত্যি নয়; আরো বললেন, তাঁর প্রকৃতি যদি আমার চেয়ে কম উদার হয় সেটার জন্য তাঁকে দায়ী করা চলে না এবং যে মানুষকে তিনি বিয়ে করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি যদি এখন তাঁকে নির্লিপ্ত বলে অভিযোগ করেন, এটা তাঁর জন্য অপমানজনক। পরে আমার তিরস্কারকে তিনি আরো বেশি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে কড়া ভাষায় সমালোচনা করলেন। একদিন আমাকে ডেকে জানালেন, আমি যা বলেছি তা-ই যদি বোঝাতেও চেয়ে থাকি এবং আমি যদি আমাদের এনগেজমেন্টও ভেঙে দিতে চাই, তাহলে বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগে সেটাই আমার করা উচিত। তাঁর এ রকম মনোভাব আমাকে দিন কয়েক চুপ করিয়ে রাখল। কিন্তু সেসব আমার ক্ষতে এতটুকু মলম লাগাতে পারল না।

‘তারপর শুরু হলো নতুন অত্যাচার। কারো আর চোখে পড়তে বাকি থাকল না যে অ্যালাগমাকে খুব খাতির-যত্ন করছেন করিনস্কি। সবাই এও দেখল যে তাঁর মনোযোগ সানন্দে গ্রহণ করছেন অ্যালাগমা। এদিক-সেদিক চোখ বুলিয়ে ভালো করেই বুঝতে   পারলাম লোকজন এটাকে একটা কেলেঙ্কারি হিসেবে চারদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং বলা বাহুল্য যে তারা খুব মজা পাচ্ছে। বুঝতেই পারছেন, আমার ব্যথা আর কষ্ট আরো বাড়তে লাগল। আমার তিরস্কার নবায়ন করায় লাভ তো কিছু হলোই না, অ্যাগালমা বরং আরো ঠাণ্ডা মেরে গেল আমার কাছে। আমার যে আদর পাওনা, যে ভালোবাসার অভাবে মারা যেতে বসেছি, সেসব করিনস্কি অঢেল পরিমাণে পাচ্ছে।

‘ওসব দিনের চাপ আর উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা আর ভয় আমার জন্য খুব বেশি হয়ে যাচ্ছিল। অসুস্থ হয়ে পড়লাম এবং একটানা সাত সপ্তাহ বিছানা থেকে নামতে পর্যন্ত পারলাম না। তারপর যখন সুস্থ হলাম, আমার হাতে একটা নোট ধরিয়ে দেওয়া হলো। ওটা অ্যালাগমার তরফ থেকে পাঠানো হয়েছে। ’

এই পর্যায়ে বুরগনেফ আমার হাতে একটা দোমড়ানো-মোচড়ানো চিঠি গুঁজে দিলেন এবং ইঙ্গিতে বললেন সেটা খুলে আমার পড়া উচিত। চিঠিটা হুবহু এ রকম :

 ‘আপনি আমাকে প্রায়ই যে কথাটা বলেন সেটা নিয়ে অনেক চিন্তা-ভাবনা করেছি আমি—এটা আমাদের দুজনের জন্যই ভালো হবে যদি দুর্ভাগ্যজনক এনগেজমেন্ট বাতিল করা হয়। আমার প্রতি আপনার সত্যিকার ভালোবাসা ছিল এটা আমি বিশ্বাস করি এবং আপনাকেও আমি জানাতে চাই যে একসময় আমিও আপনাকে খুব ভালোবাসতাম; তবে না, ও রকম উন্মত্ত ভালোবাসা বোধ হয় নয়, যেমনটা আপনার প্রকৃতি আমার কাছ থেকে পেতে চেয়েছিল কিংবা পাওয়ার দাবি করেছিল। আমি আপনার জন্য প্রার্থনা করি, একদিন আপনার চাহিদা অনুসারে ও রকম ভালোবাসা ঠিকই কোনো মেয়ের কাছ থেকে পেয়ে যাবেন। আপনাকে পাওয়ার জন্য আমি ভান করতে পারতাম ও রকম ভালোবাসা আপনাকে আমি দিতে পারব, আমাকে আপনি যদি খানিক সময় বরাদ্দ করেন। কিন্তু সেটা হবে মিথ্যা আশ্বাস, অভিনয়, নোংরামি। তার চেয়ে সত্যিটা অকপটে স্বীকার করাই ভালো, ও রকম ভালোবাসা আমার ভেতর নেই। সম্পর্ক যখন থাকছে না, আমরা যখন সারা জীবন পরস্পরের সঙ্গে জীবন না কাটানোর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছি তখন আমার তরফ থেকে কিছু সত্য কথা আপনাকে বলাই যেতে পারে, আশা করি আপনি দুঃখ পাবেন না বা অপমান বোধ করবেন না। আপনি প্রচণ্ড ঈর্ষাকাতর মানুষ। আমাকে আপনি যে ভাষায় তিরস্কার করেছেন, এ থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় আপনি অসম্ভব রাগী, সম্ভবত হিংস্রও বটেন; বউ পুরনো হয়ে গেলে তার গায়ে আপনি হাতও তুলবেন বলে সন্দেহ করি। আপনাকে নিয়ে আমি যখন স্বপ্ন দেখছিলাম, ওই সময়টা আমার জন্য ছিল স্বর্গসুখে ভরা। কিন্তু আপনাকে চিনতে পারার পর ওই স্বর্গসুখ খুন হয়ে গেছে। তাই বিয়ে করে দুজনের জীবনকে নরকে পরিণত করার ঝুঁকি আমি নিতে চাইছি না। সেদিন রাতে আপনি আমাকে যা বলেছেন তা থেকে আমি বুঝেছি আপনি চাইছেন এনগেজমেন্টটা বাতিল করা হোক। আমার তরফ থেকেও এই একই কথা। আসুন, পরস্পরকে নরম চোখে দেখি আমরা, দুজন দুজনকে ক্ষমা করি এবং আবার দেখা করি ভালো বন্ধু হিসেবে।

 

—অ্যাগালমা লিবেনস্ট্রেইন। ’

 

পড়া শেষ হতে চিঠিটা তাঁকে আমি ফেরত দিলাম, তখন তিনি বললেন :

‘আপনি নিশ্চয় লক্ষ করেছেন যে এই চিঠি যেদিন লেখা হয়েছে সেদিনই আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। আমি যে অসহায় অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছি সেটা তিনি জানতেন কি না আমার কোনো ধারণা নেই। সে যা-ই হোক...তবে কাউকে দিয়ে আমার কোনো খবর তিনি নেননি। পরে শুনেছি, তিনি প্যারিসে চলে গেছেন; করিনস্কিও গেছেন—না, তাঁর সঙ্গে নয়, পিছু নিয়ে। এরই মধ্যে সুস্থ হওয়ার পর আবার আমি সমাজে আসা-যাওয়া শুরু করেছি, ওখানে আড্ডা দেওয়ার সময়ই একদিন কানে এলো তাঁরা দুজন বিয়ে করেছেন! আপনার তো অনেক পড়াশোনা আর অভিজ্ঞতা; তাহলে এবার আমাকে বলুন, এর আগে কখনো এ রকম হৃদয়বিদারক কাহিনি শুনেছেন আপনি?’

প্রশ্নটা বুরগনেফ এত রাগ আর তীব্র ক্ষোভের সঙ্গে করলেন, আমি একদম হকচকিয়ে গেলাম। আমি তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিইনি; কারণ সত্যিটা হলো, আমি আসলে অ্যাগালমার দোষ দেওয়ার মতো খুব একটা কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না, এমনকি বুরগনেফের মুখে গল্পটা শোনার সময়ও বুঝতে পারছিলাম ওই নারীর মুখ থেকে এই একই গল্প শোনার সুযোগ হলে দেখতে পেতাম এটার সঙ্গে খুব কমই মিলছে সেটা। এ কথা হয়তো সত্যি যে অ্যাগালমা বুরগনেফের জন্য ঠাণ্ডা ছিলেন এবং সেটা খুব হতাশ করেছিল তাঁকে; কিন্তু সেটাকে তো ক্রাইম বলা যাবে না। আমি এও বুঝি যে অ্যাগালমার কাছ থেকে অন্যায় দাবি আদায় করতে গিয়ে যে তিরস্কার তিনি করেছেন, সেটা তাঁকে অবশ্যই অযৌক্তিক, উদ্ভট আর অত্যাচারী মানুষ হিসেবে চিত্রিত করেছিল। আমার এসব পরিষ্কার বুঝতে পারার কারণ হলো গল্পটা বলার সময় বুরগনেফ এক পর্যায়ে তাঁর চরিত্রের কিছু গোপন দিক আমার কাছে প্রকাশ করেছেন, যেগুলো ভয়ংকর ও ঘৃণ্য। অশুভ বা ক্ষতিকর কিছুর প্রতি তাঁর আকর্ষণ, তাঁর দম্ভ আর অহমিকা এবং প্রায় সব মানুষ সম্পর্কে তাঁর নিচু ধারণা আমাকে বারবার বিচলিত করেছে। তাঁর চরিত্রের এই অপ্রীতিকর দিকগুলো—যে চরিত্রের অন্যান্য দিক অনেক ভালো, অনেক পরিশীলিত—তাঁর গল্প বলার শেষ দিকে গভীরতা পাচ্ছিল, যখন তিনি আমার উত্তরের জন্য অপেক্ষায় না থেকে নিজের কথা আবার বলছিলেন।

‘এই যে আমার ওপর সীমাহীন অন্যায় আর অবিচার করা হলো, এখন স্বভাবতই আপনি জানতে চাইবেন আমি তাহলে কী ধরনের সীমাহীন প্রতিশোধ নেওয়ার কথা ভাবব। ’

এ রকম কোনো আইডিয়া আমার মাথায় খেলেনি। আগেই বলেছি, আমি কোথাও কোনো অন্যায় বা অবিচার হয়েছে বলে জানতে পারিনি। তা ছাড়া এ ধরনের কেসে প্রতিশোধ গ্রহণের চিন্তাটা মানুষকে চমকে দেওয়ার মতো।

‘বিষয়টা নিয়ে দীর্ঘ সময় নিজের সঙ্গে তর্ক করেছি,’ আবার বললেন বুরগনেফ। ‘আমি চাইলেই আধুনিক সমাজ প্রতিশোধ নিতে দেবে না আমাকে। এ ছাড়া অ্যাগালমা আমার সঙ্গে যে অন্যায় করেছেন তার শাস্তি কী হতে পারে, তা কি কেউ আমাকে জানাতে পারবে? পারবে না। কেউ কেউ এমনও বলতে পারে যে তাঁকে আমার ক্ষমা করা উচিত, যেহেতু না বুঝে বা ঝোঁকের মাথায় একটা ভুল করে ফেলেছে। আমিও ভেবে দেখেছি, তাঁকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার আসলে আমি রাখি না। তিনি যদি আমার স্ত্রী হতেন, তাহলে নিশ্চয়ই একটা কিছু করার ছিল আমার। আমার প্রতি তুমি ঠাণ্ডা? আমিও তোমার কাছে বরফ বা মার্বেল হব। আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে তুমি অন্য পুরুষের সঙ্গে ঢলাঢলি করেছ? আমিও তোমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে অন্য মেয়ের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করব। আমার ডাকে তুমি সাড়া দাও না? আমিও তোমার ডাকে সাড়া দেব না। কিন্তু তিনি যেহেতু আমার স্ত্রী নন, তাই এখানে টিট ফর ট্যাট চলবে না। তাহলে? আমার কি তাহলে উচিত অ্যাগালমাকে খুন করা? খুন করার একটা মজা কি জানেন তো? কুল্লে খালাস, সমস্যার শিকড় উপড়ে ফেলা। যারা পেশাদার খুনি তারা হয়তো এর আরো অনেক মজার দিক সম্পর্কে জানে; কিন্তু আমি তাদের মতো এই কাজে অভ্যস্ত কেউ নই। তবে এটা ঠিক, অ্যাগালমাকে খুন করতে পারলে আমার মনে প্রচুর শান্তি আসত, আমি সত্যি ভালো থাকতাম। শুধু খুন নয়, আমি প্রথমেই চেষ্টা করতাম তাঁর হৃৎপিণ্ডটা থামিয়ে দিতে। কারণ ওটাই আমার সঙ্গে শত্রুতা করেছে। ’

তাঁকে দেখে আমার মনে হলো, টগবগ করে ফুটতে থাকা ক্রোধ আর লাগামছেঁড়া আবেগ নিয়ে কাজ করছেন তিনি। ফলে তাঁকে আমার শুধু ঘৃণা করতেই মন চাইছে এবং সেই ঘৃণার সঙ্গে মিশে আছে উৎকট ও লোমহর্ষক একটা সন্দেহ। এ রকম হিংস্র মানসিকতা নিয়ে ভয়ংকর কী-না-কী ঘটিয়ে বসেন।

‘কী করব, সে প্ল্যান আমার বাছাই করা হয়ে গেছে। তাঁর হার্টের নাগাল পাওয়ার একটাই উপায় আছে, আঘাত করতে হবে তাঁর প্রাণপ্রিয় স্বামীকে। এবার আপনি চুপ করে থাকতে পারবেন না, অন্তত এই প্রশ্নের উত্তর আপনাকে দিতেই হবে। করিনস্কিকে খুন করে এই যে আমি অ্যাগালমার ওপর প্রতিশোধটা নিতে যাচ্ছি, এটাকে আপনি কী বলবেন? যেমন কুকুর তেমন মুগুর শ্রেণির প্রতিশোধ হবে কি সেটা? নাকি আপনি বলবেন ঢিলটি মারলে পাটকেলটি খেতে হবে টাইপের?’

প্রশ্নের উত্তর দিতে বলেছেন বটে; কিন্তু তিনি না থামলে আমি উত্তর দেব কিভাবে? তিনি সারাক্ষণ বকবক করে যাচ্ছেন।

‘বললে বিশ্বাস করবেন তখন আমার সময় কিভাবে কাটছিল? প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা পিস্তল প্র্যাকটিস করছিলাম, যত দিন না শুধু একটা হাত থাকা সত্ত্বেও আমার লক্ষ্যভেদ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছাল। কিন্তু এটা যথেষ্ট নয়। একটা টার্গেটে গুলি করা একদম সহজ কাজ। একজন মানুষকে গুলি করা, বিশেষ করে তার হাতের পিস্তল যদি আপনার দিকে তাক করা থাকে তাহলে সেটা সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। আমি প্রায়ই ‘ক্র্যাক শট’ সম্পর্কে শুনেছি, যেগুলো লোককে লাগেনি, সেটা আমাকে একটা শিক্ষা দিয়েছে। ওখানে থাকার সময়ই আমি বুঝলাম, আমার চোখ আর হাতকে অভিজ্ঞ করে তুলতে হবে পরিচিত জিনিসের সঙ্গে কাজ করানোয় অভ্যস্ত করিয়ে—সত্যিকার জিনিসগুলোর সঙ্গে। সেটা না করানোর ফলেই কাউকে গুলি করার সময় শ্যুটার ভয় পেয়ে যায়, ফলে টার্গেট মিস করার পরিস্থিতি তৈরি হয়। আমার ভেতর ভয় বলে কিছু ছিল না। আমার জীবনে এমন কোনো মুহূর্ত নেই যখন আমি ভয় পেয়েছি এবং করিনস্কির হাতে গুলি খেয়ে আমার প্রাণ হারানোর আশঙ্কা আছে কি না জিজ্ঞেস করলে আমি বলব, প্রশ্নই ওঠে না। অচেনা বস্তু সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, তাই চেষ্টা করতে হবে আমি যাতে ওগুলোর সঙ্গে নিজেকে অভ্যস্ত করিয়ে নিতে পারি। প্রথমেই আসে টার্গেটের কথা। টার্গেট যেহেতু করিনস্কি, তাই তাঁর আকার-আকৃতির সঙ্গে মেলে এ রকম একটা ডামি সংগ্রহ করে নিলাম, তিনি যে রকম কাপড়চোপড় পরেন ওই ডামিকেও তাই পরালাম, ওটার হাতে ধরিয়ে দিলাম একটা পিস্তল, তারপর ওটাকে লক্ষ্য করে প্র্যাকটিস করতে লাগলাম। আমি বলছি, কাজেই আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে যে দিন কয়েক পর দেখা গেল ঝট করে ওই কাঠের করিনস্কির দিকে একবার তাকিয়েই গুলি করি আমি এবং প্রতিবার ওটার গলায় বুলেট লাগাতে পারি, ভালো করে লক্ষ্যস্থির না করেই।

‘এভাবে প্রস্তুতি নিলাম, তারপর রওনা হলাম, গন্তব্য প্যারিস। কিন্তু আমার প্রতি আপনার সহানুভূতি বা করুণা হবে যখন জানবেন আমার ক্ষুধার্ত হৃদয় চিরকালের জন্য বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল, প্রতিশোধ গ্রহণের কথা প্রায় ভুলে যেতে বসেছে। অ্যাগালমা স্কারলেট ফিভারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। করিনস্কি প্যারিস ছেড়ে চলে গেছেন এবং তাঁর পিছু নেওয়ার তেমন জোরালো তাগিদ অনুভব করলাম না, বরং মনে হলো করিনস্কিকে খুন করে এখন আর কী লাভ, অ্যাগালমাকে তো আর আঘাত দিতে পারব না। যার ওপর প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলাম সে-ই যখন দুনিয়ার বুকে বেঁচে নেই (তাঁর ওপর রাগে তখন আমি দাঁতে দাঁত চেপেছি), তাহলে আর হাতে রক্ত লাগাতে যাই কেন। সেই থেকে আমার অস্তিত্ব শূন্য হয়ে গেছে এবং এমনকি এখনো আমার ভাবাবেগের জগতে সেই শূন্যতা তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। আমি নিজের ভেতর একটা মরা হৃৎপিণ্ড বহন করি। ’

 

দ্বিতীয় শিকার

 

বুরগনেফ তাঁর গল্প আরো অনেক বড় করে বলেছেন, পাঠকের বিরক্তির উদ্রেক করতে পারে ভেবে আমি সেটাকে বেশ কিছুটা ছোট করে পরিবেশন করেছি। এটা যেহেতু একা শুধু বুরগনেফের গল্প নয়, আমারও গল্প, তাই তাঁর গল্প আমার মতো করে সাজাতে হয়েছে, পাঠক যাতে আমি যেটা যেভাবে বোঝাতে চাই সেটা সেভাবে বুঝতে পারে।

বুরগনেফের চরিত্রে ঘৃণা জাগার মতো এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, আগে সেগুলো আমার চোখে ধরা পড়েনি বলে সত্যি আমি দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।

যা হোক, তাঁকে নিয়ে আমার পুরনো সন্দেহটা আবার ফিরে এলো এবং দুই দিন পর তাঁর সঙ্গে যে আলাপ হলো, তাতে আমার ওই সন্দেহ আরো দৃঢ় ভিত্তি পেল।

আমরা ভাস্কর শয়ানথেলারকে দেখতে গেলাম; তিনি শয়াননেকের ছোট্ট একটা দুর্গে বসবাস করেন, মিউনিখ থেকে কয়েক মাইল দূরে। পৌঁছার পর শুনলাম শিল্পী আশপাশেই কোথাও হাঁটতে বেরিয়েছেন, তবে আমাদের ডেকে ভেতরে বসতে অনুরোধ করা হলো। জানলাম, অল্প কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। এই ফাঁকে বুরগনেফ আমাকে দুর্গটা ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন। খানিকটা আধুনিক গথিক ধাঁচে তৈরি সেটা। বোঝা যায় শিল্পীর তারুণ্যে ভরা স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা হয়েছে। আমাদের সার্ভে শেষ হলো, বেশিক্ষণ লাগেনি, ফিরে এসে আবার বসলাম, এবার একটা জানালার সামনে। বুরগনেফ বললেন, ‘এটা আমার মনে সত্যি ভারি কৌতূহল জাগায় যে পাথর-লোহা-কাঠ-সুরকি দিয়ে নকল করা এই মধ্যযুগীয় কারাগারের ভেতর নিজেকে বন্দি করে রাখা, এটা কেন? এখানকার প্রতিটি খুঁটিনাটি জিনিস শুধু মরা অতীতের কথা বলছে। আপনি প্যারিসের কথা ভাবুন, এই মুহূর্তে কী ঘটছে ওখানে, আপনি অবশ্যই সেটারও নকল দেখতে পাবেন ইউরোপজুড়ে। মান্ধাতার আমলের এই গথিক দুর্গকে সময় বাতিল করে দিয়েছে, কালের বিচারে এটা এখন বেমানান আর নিষ্প্রাণ, এই সহজ কথাটা কেন আমরা বুঝতে চাই না বলতে পারেন! এই গথিক দুর্গ কবে তৈরি হয়েছিল আপনি বলতে পারবেন? সেই যুগে, একজন পোপকে যখন রিফর্ম করতে দেখা যেত!’

 

‘হ্যাঁ, কিন্তু রিফর্মিং পোপ নিজেও কি কালের বিচারে বেমানান ছিলেন না?’

‘একজন ক্যাথলিক হিসেবে,’ এখানে আমি তাঁকে হাসতে দেখলাম, বোঝাতে চাইছেন তাঁর অর্থোডক্সি খুব বেশি বাধ্যতামূলক নয়, ‘আমি সেটা মানতে পারি না; যেমন একজন প্রটেস্ট্যান্ট হিসেবে আপনাকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে একজন পোপ যদি থাকতেই হয়, বর্তমান যুগে তাকে একজন রিফর্মার হতেই হবে, নয়তো তাঁকে তাঁর ঐহিক বা পার্থিব ক্ষমতা দেওয়া হোক। এমন নয় যে পিয়ো ন্যানোকে আমি একজন অগ্রদূতের চেয়ে বেশি কিছু মনে করি, তিনি হয়তো মাটি দুই ফাঁক করতে পারেন এবং পথ দেখাতে পারেন; কিন্তু তিনি এই সময়কার ইউরোপকে পচা কাদা আর গভীর হতাশা থেকে তুলে আনতে পারবেন বলে মনে করি না; এমনকি চার্চের প্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে নতুন ও টেকসই একটা রিপাবলিক গড়ে তোলাও তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। আমাদের আসলে একজন হিলডেব্র্যান্ড দরকার, উনিশ শতকে যিনি হবেন এগারো শতকের গ্রেগরির মতো। ’

‘এ রকম একটা সম্ভাবনার ওপর আপনি আস্থা রাখেন? আপনার ধারণা রোমান পোপ আবার কখনো ইউরোপের নিয়তি নির্ধারণ করতে পারবেন?’

‘আস্থা রাখি, এ কথা বলা আমার জন্য খুব কঠিন; তবু আমি এ রকম একটা পথ খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখি, যদি কোনো সঠিক মানুষ উঠে আসতে পারেন। তবে আমার ভয় এই যে সে রকম কেউ উঠবেন না; কিংবা যদি তেমন কেউ ওঠেনও, গোপন মন্ত্রণাসভা গলা টিপে মারবে তাঁকে। আমি অবশ্য একটা বিকল্প দেখতে পাই, পোপকে নেতা বানিয়ে হয় ইউরোপকে আবার একটা ক্রুসেডে যোগ দিতে হবে কিংবা তাকে তুলে ধরতে হবে লাল ঝাণ্ডা। এখানে আর কোনো ইস্যু নেই। ’

‘হেভেন যেন দুটির হাত থেকেই বাঁচায় আমাদের! আমার চাওয়া হলো চার্চের পচা বিধি-বিধান থেকে পোপ যেন আমাদের রক্ষা করেন। সৎ মানুষের বাড়াবাড়ি থেকেও সুরক্ষা পেতে হবে আমাদের, ভুলবেন না। লাল পতাকাকে জাতীয় ব্যানার হিসেবে মেনে নিতে হবে, ফ্যানাটিকদের এই দাবি পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়, জানি, মানি। কিন্তু প্রাদেশিক সরকার সেটাকে কিভাবে ঠেকাল দেখেছেন তো?’

‘হ্যাঁ। এটা দেখে আমার ভালো লেগেছে। কারণ এর মধ্যে নতুন বিপ্লবের বীজ সুপ্ত থাকতে পারে। সরকার এভাবে প্রতিহত করার চেষ্টা করতে গিয়ে নিজের দুর্বলতাই প্রকাশ করে ফেলেছে। ’

‘দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে? বরং বলুন শক্তি প্রদর্শন করেছে। চোখে আঙুল দিয়ে ওদের দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা কিভাবে বজায় রাখতে হয়। পরিষ্কার মেসেজ গেছে, এখানে কোনো রকম অ্যানার্কিজম চলবে না।

‘না, মোটেও না। সরকার ভয় পেয়েছে, তাদের আচরণ সেটাই প্রমাণ করে, আরো প্রকাশ পেয়েছে ফরাসিদের অহমিকা। ওই তিনরঙা ফরাসি পতাকা—অবশ্যই হিউম্যানিটির ব্যানার নয়। এই তিনরঙা পতাকা ফ্রান্সের বিজয়ের কথা বলতে চায় এবং ফরাসিরা যেহেতু অহংকারী জাতি, তাদের পতাকা তাদের আরো অহংকারী হতে উৎসাহিত করে। তারা ভুলে যায় ওই পতাকা একটা বিপ্লবের, যে বিপ্লব ব্যর্থ হয়েছে। এই পতাকা এমন এক সাম্রাজ্যের, যে সাম্রাজ্য মানবিকতার প্রতি চিরকাল নির্দয়। অন্যদিকে লাল হলো আনকোরা; শক্তিরও প্রতিনিধিত্ব করে, আবার জনগণের মতের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল। ওটা যদি সঙ্গে আতঙ্ক বয়ে বেড়ায়, তাহলে তো আরো ভালো। অত্যাচারী আর ভীরুদের ঠকঠক করে কাঁপিয়ে দেওয়া যাবে। ’

‘আমার ধারণা ছিল না আপনি এ রকম রক্তপিপাসু,’ বললাম আমি, তাঁর হিংস্র ভাব দেখে হাসছি।

‘এটা আপনার সম্পূর্ণ ভুল ধারণা, আমি একদমই রক্তপিপাসু নই; আমি শুধু যৌক্তিক ও সংগতিপূর্ণ হতে চাইছি। দুনিয়ায় কুতর্কের একটা প্লাবন দেখা দিয়েছে, যেটা আমাকে অসুস্থ করে। লোকজন রোবজপিয়ার আর সেন্ট জাস্টকে নিয়ে কথা বলে, এমন দুজন ধার্মিক ও সৎ মানুষ আর জন্মাবে কি না সন্দেহ—আরো কথা বলে ডমিনিক আর টাকেমাডাকে নিয়ে, দুজনেই নিজেদের বিশ্বাসে অটল থাকেন—তাঁরা যেন নির্দয় আর রক্তপিপাসু, যেখানে আসল সত্যিটা হলো তাঁরা দ্বিধা ও সন্দেহমুক্ত। ’

‘ব্যাপারটা কী এ রকম যে আপনি প্যারাডক্স ভালোবাসেন বলে এই বাঘগুলোর পক্ষ নিচ্ছেন?’

‘বাঘ, আবার—এই পশুগুলোর আপনি নিন্দা করেন কিভাবে!’

কথাটা তিনি এত বেশি গুরুত্বের সঙ্গে বললেন, মনে হলো অভিনয়ের ছলে বিষয়টা নিয়ে কৌতুক করছেন। হাসির সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি; কিন্তু তিনি নিজের কথা বলে যাচ্ছেন, গম্ভীর স্তরে :

‘আপনি ভাবছেন আমি ঠাট্টা করছি। কিন্তু আমাকে এই প্রশ্নটা করতে দিন, বাঘকে কেন আপনি নিজের চেয়ে বেশি রক্তপিপাসু বলে ভাবছেন? বাঘ তার খাবারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, আপনার খাবার আপনি কসাইয়ের দোকান থেকে কেনেন। খাদ্য হিসেবে পশু ছাড়া বাঁচবে না সে, তার জন্য এটা একটা আদিম ও মুখ্য প্রয়োজন এবং সে তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের নির্দেশমতো এই কাজটা করে। আপনি শাক-সবজি আর তরিতরকারি খেয়ে বেঁচে থাকতে পারেন; এর পরও আপনি মাঠের পশু আর বাতাসের পাখি জবাই করে খান (কিংবা জবাই হওয়ার পর দোকান থেকে কিনে এনে খান) এবং নিজেকে অন্যায় আর অসততার বিরোধী বলে বিবেচনা করেন। বাঘ শুধু তার খাদ্য আর শত্রুকে খুন করে; কিন্তু আপনি শুধু এই দুটিকেই খুন করেন না, আপনি একটা পশুকে খাওয়ানোর মতো ঝোল তৈরি করার জন্য আরেকটা পশুকেও খুন করেন! একজন খ্রিস্টানের চেয়ে অনেক কম রক্তপিপাসু একটা বাঘ!’

‘এই ভাষণকে কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ করতে চাওয়া হয়েছে আমার জানা নেই; তবে বাঘের নৈতিকতাবোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলে জিজ্ঞেস করছি : আপনি সত্যি সহানুভূতিশীল কি না জানতে চাইব না—ওদের সমর্থন করেন? রোবজপিয়ার, ডমিনিক আর সেন্ট জাস্টকে? তাঁদের মতো বাকি ফ্যানাটিকদের, যারা শেষ পর্যন্ত রক্তের সাগরে সাঁতার কাটবে?’

‘যার শেষ পর্যন্ত যাওয়ার সংকল্প আছে, তারই তো শুধু জেতার সম্ভাবনা। ’

‘এটা শয়তানের কাজের ধারা। ’

‘কিন্তু ধারাটা কাজ করে, একটা সত্য বটে। বোকামি ভরা দুনিয়াটা ভয় পেয়ে কেন এত কুঁকড়ে যায়, যেখানে রক্তপিপাসা আর নির্দয়তা হামেশা বিচারবুদ্ধির একটা শক্তি আর সংগতি হিসেবে পরিগণিত। এ কথা ঠিক নয় যে ফ্যানাটিকরা রক্তপিপাসু, তবে তারা নিজেদের আদর্শকে বিজয়ী করার জন্য শক্তি প্রয়োগ করে। তাদের সামনে যে ধরনের প্রতিবন্ধকতাই থাকুক না কেন, সেগুলো অবশ্যই উপড়ে ফেলতে হবে; কোনো বাধা সরাতে যদি রক্তের একটা প্রপাত দরকার হয়, অন্য কিছুতে কাজ না হয়, তাহলে প্রপাতই ঝরুক। ’

‘তার সঙ্গে ঝরে যাক বাকি সব সেন্টিমেন্টও— করুণা, দয়া, ক্ষমা, সেবা, ভালোবাসা?’

‘তা কেন? এই সেন্টিমেন্টগুলো আবশ্যকতায় একটা বিষণ্নতা এনে দিতে পারে, বড় কোনো প্রাপ্তির জন্য ওগুলোকে যদি আপাতত বলি দিতে হয় তো দেওয়া গেল। ’

‘এটা আপনার অরুচিকর মতবাদ! এটা সফিজম, কুতর্ক ছাড়া কিছু নয়, যেটা অসংখ্য পরিবারকে ধ্বংস করেছে, তছনছ করেছে বহু শহর, দুনিয়ার নৈতিক অগ্রযাত্রাকে পঙ্গু বানিয়ে রেখেছে। এটা সমাজে অবিচার আর জুলুমবাজির চর্চা জনপ্রিয় করে তুলেছিল। যারা সমর্থন করেছে তাদের মন হয়ে গেছে পাষাণ, যারা প্রতিহত করতে চেয়েছে তারা হয়েছে খুন। ’

‘আপনি ভুল বকছেন। মানুষের অসংগতিই প্রগতির জন্য মূল বাধা। গোয়ার্তুমির চেয়ে দুর্বলতা বেশি নির্দয়। যুক্তির চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক সেন্টিমেন্ট। ’

শয়ানথেলার সময়মতোই ফিরলেন, তা না হলে কী ঘটত বলা যায় না, কারণ আমার রাগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। ভাস্কর মহোদয় অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করলেন আমাদের, তাঁর সঙ্গে কথা বলে আনন্দ পাওয়ায় বুরগনেফ আমার ভেতর যে বিষ ঢেলেছেন তার প্রভাব অনেকটাই কমে গেল। পরদিন আমি মিউনিখ ছেড়ে টাইরোলের উদ্দেশে রওনা হলাম। বুরগনেফের সঙ্গে আমার বিচ্ছিন্ন হওয়াটা বন্ধুত্বের মাপে বেশ কয়েক ডিগ্রি কম উষ্ণ হলো এক সপ্তাহ আগের তুলনায়। তাঁকে আবার দেখতে পাওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নেই, কাজেই আমি তাঁকে কোনো ঠিকানা দিলাম না এবং ঘটনাচক্রে তিনি যদি কোনো দিন ইংল্যান্ডে বেড়াতে যান তাহলে আমার বাড়িতে পায়ের ধুলো দিয়ে আসার কথা বলে আমন্ত্রণও জানালাম না। মিউনিখ থেকে সরতে সরতে ম্যালেপস্টে চলে এসেছি, আমার অস্থির মন তাঁর সঙ্গে আমার সময় আর সান্নিধ্যের খুঁটিনাটি নতুন করে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছে। দেখা গেল তাঁর উপস্থিতি থেকে আমি যত দূরে সরে আসছি ততই অপ্রীতিকর হিসেবে উঠে আসছে তাঁর প্রতি আমার সেই পুরনো সন্দেহ, যেটা তাঁকে লেইকেন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে। কিভাবে খুনটা করা হয়েছে, কী ছিল প্রকৃত মোটিভ, এসব সত্যি চরম রহস্য। তাঁকে আমি লেফেলডেট নামটা কখনো উচ্চারণ করতে শুনিনি। তাঁকে আমি একবারও বলতে শুনিনি যে এর আগে ন্যুরেমবার্গে এসেছিলেন তিনি। হাইডেলবার্গে একটা ট্র্যাজেডি ঘটেছিল, নাকি হাইডেলবার্গ স্রেফ একটা মুখোশ? এখন আমার মনে পড়ছে যে প্রথমে তিনি জেনে নিয়েছিলেন আমি কখনো হাইডেলবার্গে যাইনি, তারপর নিজের গল্পের পটভূমি হিসেবে ওই জায়গাকে বাছাই করেছেন।

এ ধরনের চিন্তা আমাকে খুব ভোগাচ্ছে। কল্পনা করুন এ রকম আরেকটা আতঙ্ক তাহলে কিভাবে আমি সহ্য করব। সালজবার্গে পা রাখতে না রাখতে কথাটা শুনতে হলো আমাকে। সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে আর ভাবনায় আঁতকে উঠলাম আমি। গ্রসহেসলেহে একটা হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। মিউনিখকে ঘিরে রেখেছে গ্রসহেসলেহ, ভারি সুন্দর একটা জায়গা, ছুটি পেলে ওখানে মানুষ বেড়াতে যায়।

আবার খুন হলো কেউ একজন। কেন? কিভাবে?

পরে জানতে পারলাম ন্যুরেমবার্গ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এটার অনেক মিল দেখা যাচ্ছে। দুটি ক্ষেত্রেই হত্যার শিকার বয়সে তরুণ ও সুন্দর। দুটি ক্ষেত্রেই মেয়ে দুটিকে রাস্তায় নিথর পড়ে থাকতে দেখা গেছে, হৃৎপিণ্ডে ছুরি গাঁথা, হিংস্রতার আর কোনো চিহ্ন ছাড়াই। দুটি ক্ষেত্রেই তারা কাউকে ভালোবাসত এবং অজ্ঞাত খুনির মোটিভ একটা বিরাট রহস্য।

একের পর এক নানা খবর কানে আসতে থাকায় আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না, তাড়াহুড়া করে ফের ফিরে এলাম মিউনিখে। মিউনিখে? হ্যাঁ, যত বেশি গতি তোলা সম্ভব তুললাম এবং বলতে গেলে ঝড়ের বেগে পৌঁছেও গেলাম। আমার মনে এখন আর সন্দেহের ছায়ামাত্র অবশিষ্ট নেই। খুনিকে আমি চিনি, কে খুনগুলো করেছে আমি জানি; এখন তাঁকে ধাওয়া করব, ধরব, তারপর তাঁর বিচারের ব্যবস্থা করব। এটাই আমার কাজ। এটাই আমার পণ।

না, এ রকম ভাববেন না যে এটা আমার গঠনমূলক কল্পনাশক্তির কারসাজি, বরাবরের মতো এবারও আমাকে বিপথে চালাচ্ছে। আমার কাছে পজিটিভ প্রুফের মতো কিছু আছে। যখনই কানে ঢুকেছে নতুন খুনটা গ্রসহেসলেহতে সংঘটিত হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে আমার মন ফিরে গেছে স্মরণীয় একটা ভ্রমণকাহিনিতে, ওখানে বুরগনেফ আর দুজন বাভারিয়ান সঙ্গীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলাম আমি। ওখানকার একটা হোটেলে বসে আমরা যখন ডিনার খেতে বসেছি, হঠাৎ সেখানে হাজির হলো হোটেল মালিকের ভাগ্নি। মেয়েটা আশ্চর্য সুন্দর, স্বভাবতই চার তরুণের উপস্থিতি ভালো লেগেছিল ওর, তাই উৎসাহ নিয়ে গল্প করতে আমাদের কাছে চলে এসেছে। বাভারিয়ানদের একজন আমাদের জানাল, এই মেয়ে একদিন সম্ভবত গোটা দেশের অন্যতম সেরা ধনীদের একজন হতে যাচ্ছে, কারণ যে কৃষক ছেলের সঙ্গে ওর বিয়ের কথা পাকা হয়েছে, হঠাৎ করে সেই কৃষক, দ্রুত কয়েকটা স্বাভাবিক মৃত্যুর কারণে একমাত্র উত্তরাধিকারে পরিণত হয়েছে বিশাল এক ওয়াইন তৈরির কারখানার।

ওই মুহূর্তে আমাদের জন্য ওই মেয়ে, সোফিয়া, ওয়াইন নিয়ে আসছিল। তখন আমি লক্ষ করলাম বুরগনেফ ধীরে ধীরে তাঁর চোখ ঘুরিয়ে সোফিয়ার দিকে এমন এক দৃষ্টিতে তাকালেন, যেটাকে তখন খুব রহস্যময় বলে মনে হয়েছিল আমার।

একজন মানুষের দৃষ্টির মধ্যে কী থাকে, আপনি জিজ্ঞেস করছেন? হয়তো সে রকম কিছু থাকে না; আবার হয়তো সব কিছুই থাকে। আমার সন্দেহমুক্ত, অনালোকিত চিন্তাধারায় বুরগনেফের ওই দৃষ্টি স্রেফ বিষাদমাখা আধো কৌতূহলী বলে মনে হয়েছিল, আগ্রহ জাগায় এ রকম একটা আলোচনায় চলে আসা এক মেয়েকে হেঁটে আসতে দেখে তাঁর মনে কী চিন্তা খেলা করছিল তা আমার জানার কথা নয়। তবে আমার যেহেতু জানা ছিল তাঁর চরিত্র কেমন, তাঁর নিজের বলা গল্প থেকে আমি আরো জেনেছি কেমন সব হিংস্র অনুভূতি ধারণ করেন তিনি, তাই তাঁর ওই দৃষ্টির কথা মনে পড়ে যেতে সেটার ভয়ানক একটা অর্থ ছিল বলে আমার এখন মনে হচ্ছে।

বুরগনেফের ওই দৃষ্টি তাঁর শিকারকে নির্বাচিত করছিল।

 

নিজের চেহারার ওপর যতই না কেন নিয়ন্ত্রণ থাকুক বুরগনেফের, আমাকে আবার মিউনিখ হোটেলের পেটচুক্তি টেবিলে দেখে সেখানে যে অস্বস্তি আর বিস্ময়ের ভাব ফুটল, সেটাকে তিনি লুকিয়ে রাখতে পারলেন না। আমি তাঁর সঙ্গে হাত মেলালাম, যতটা সম্ভব বন্ধুত্বের মুখোশ পরে আছি এবং তাঁর প্রশ্নের উত্তরে হঠাৎ করে আমার ফিরে আসার কারণটা ব্যাখ্যা করছি—সালজবার্গে থাকার সময় অপ্রত্যাশিত ইন্টেলিজেন্স পেয়ে মিউনিখে ছুটে আসতে হয়েছে আবার।

‘আশা করি সিরিয়াস কিছু না?’

‘উঁ, না, ভয় পাচ্ছি খুব সিরিয়াস কিছুই হতে যাচ্ছে,’ বললাম আমি। ‘তবে দেখা যাক। এরই মধ্যে আমার টাইরোল ভ্রমণ নির্ঘাত বাতিল করে দিতে হবে। ’

‘আপনি তাহলে এখানে থেকে যাচ্ছেন?’

‘আসলে আমার ঠিক জানা নেই কোথায় আমাকে থাকতে হবে বা কখন কোথায় আমাকে যেতে হবে। ’

আমি কখন কী আচরণ করব তার ঠিক নেই, তাই তাঁকে এভাবে প্রস্তুত করে রাখলাম। আমার প্ল্যান ও রোজকার সূচি সম্পর্কে অন্ধকারে রাখলাম তাঁকে, কারণ এখন আমার সবচেয়ে বড় কাজ হলো যেকোনো মূল্যে তাঁর পিছু নেওয়া এবং তাঁকে বিচারের আওতায় আনা।

কিন্তু কিভাবে? আমার কাছে এমন এভিডেন্স নেই, যেগুলো আর কাউকে সন্তুষ্ট করতে পারবে, আমার নিজের কাছে ওগুলো যতই বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হোক না কেন। গ্রসহেসলেহ থেকেও গ্রহণযোগ্য কোনো এভিডেন্স আসবে বলে মনে হচ্ছে না। বিকেলের দিকে জঙ্গলের ভেতর, সরু একটা গলিতে, পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল সোফিয়াকে, যেন ঘুমিয়ে আছে। কোথাও ধস্তাধস্তির কোনো চিহ্ন নেই; কোনো সন্ধান নেই খুনির। সোফিয়ার প্রেমিক ছিল অগসবার্গে, সোফিয়া নেই শুনে কাঁদতে কাঁদতে গ্রসহেসলেহে ফিরেছে; কিন্তু এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ওপর কোনো আলো ফেলতে পারেনি বেচারা, সম্ভাব্য মোটিভ সম্পর্কেও কিছু বলতে পারেনি। তবে এভিডেন্সের এই যে চরম খরা কিংবা সন্দেহের যে ভিত্তি আমি দেখতে পাচ্ছি, তাতে আমার কেস আরো শক্তিশালী হচ্ছে। এটা মোটিভবিহীন নয়, এখানে মোটিভ হলো তীব্র নারীবিদ্বেষ; এক কিংবা দুজন নারী তাঁকে ঠকিয়েছে, এই অজুহাতে তিনি দুনিয়ার সব নারীকে ঘৃণা করছেন, তাদের পরম শত্রু বলে মনে করছেন। এটা তাঁর একটা মানসিক রোগে পরিণত হয়েছে। প্রকাশ্য কোনো মোটিভ নেই এবং জ্ঞাত কোনো মোটিভের অনুপস্থিতিই আমাকে আশ্বস্ত করছে যে আমি বুরগনেফের ভেতর মোটিভটা দেখতে পেয়েছি।

 

 

 

সব শেষে

 

দুই দিন পার হলো, নতুন কিছু ঘটল না। আমার নজর রাখা মনে হচ্ছে বৃথা সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছু নয়। কিছু বুঝতে না দিয়ে তাঁকে জেরা করার জেদ চাপল আমার মধ্যে, ভান করতে হবে আমার কোনো খারাপ মতলব নেই, স্রেফ সাম্প্রতিক দুঃসংবাদ নিয়ে অস্থিরতায় ভুগছি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি খুন দুটি বুরগনেফ করেছেন, জেরা করলে হয়তো জানতে পারব আমার বিশ্বাস শতভাগ সত্যি। ভাগ্য ভালো থাকলে নতুন কোনো এভিডেন্সও দু-একটা পেয়ে যেতে পারি, কে বলতে পারে!

বুরগনেফের ঘরে বসে আছি। বসেছি বরাবর যেখানে বসি। দুজনের হাতেই চুরুট, ওগুলো থেকে নীলচে ধোঁয়া উঠছে। আমরা জনগণের স্বার্থ নিয়ে আলাপ করছি। তারপর একসময় আমি ধীরেসুস্থে প্রসঙ্গ বদলে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের কথা তুললাম।

‘এটা আশ্চর্য না?’

‘কী বলছেন? কোনটা আশ্চর্য?’

‘এই যে—ক্রাইম দুটি। ’

‘ক্রাইম দুটি মানে?’

‘কেন, দেশের দুই জায়গায় দুটি খুন হয়নি? আপনি যেন কিছু জানেন না?’ নার্ভাস হাসি দিলাম।

‘জানব না কেন। তা আশ্চর্য বলছেন কেন? কী আশ্চর্য?’

‘যেখানে ঘটল, ঘটার সময় দুই জায়গাতেই ছিলাম আমরা দুজন। এটা আশ্চর্য না?’

‘তাহলে বোধ হয় আমরাই ক্রিমিনাল,’ জবাব দিলেন বুরগনেফ, হাসছেন।

ঝুঁকি নিয়ে, সাহস করে, এ রকম একটা স্বীকারোক্তি দিতে পারলেন শুনে আমার শরীরে মৃদু শিহরণ বয়ে গেল। কথা বলার সময় হাসছেন তিনি; কিন্তু তাঁর কথার সুর কঠিন, প্রায় ধাতব এবং তাতে অবাধ্যতা প্রকাশ পেল, যেটা আমাকে রাগিয়ে দিল।

‘হতে পারে আমরাই,’ জবাব দিলাম আমি, শান্ত গলায়। আমার দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন বুরগনেফ; তবে তৈরি ছিলাম আমি এবং আমার চেহারা দেখে কিছুই তিনি বুঝতে পারলেন না। আমি যোগ করলাম, ব্যাখ্যা হিসেবে, ‘ক্রাইমটা দেখে মনে হচ্ছে সংক্রামক, সংক্রমণটা আমরা হয়তো ন্যুরেমবার্গ থেকে নিয়ে এসেছি। ’

‘আপনি নকল বা অনুকরণ করার হাইপোথিসিসে বিশ্বাস করেন?’

‘কী বিশ্বাস করব জানি না। আপনি কি বিশ্বাস করেন এখানে মাত্র একজন খুনি কাজ করছে? কী চরম অযৌক্তিক একটা আইডিয়া। আমরা তাকে অবশ্যই একজন ম্যানিয়াক বলে গণ্য করব, তা সে যেই হোক। ’

‘নট নেসেসারিলি। দুটি ঘটনায়ই, আমি বিশেষভাবে লক্ষ করেছি, প্রচুর অপ্রয়োজনীয় ও কৃত্রিম কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে—শুধু যে শিকার বাছাই করার ক্ষেত্রে, তা নয়, প্ল্যানটা কার্যকর করার ক্ষেত্রেও। ম্যানিয়াকরা প্রায়ই অসম্ভব ধূর্ত হয়; তার পরও তারা ম্যানিয়াকই এবং নিজেদের ভুলে ফেঁসে যায়। ’

‘খুনি যদি একজন ম্যানিয়াক না হয়,’ আমি বললাম, তাঁকে নার্ভাস করার জন্য, ‘তাহলে করুণা করতে হয় এমন একজন বোকা আর অহংকারী কেউ হবে—হতে পারে সংগতি রক্ষায় সক্ষম আপনার বন্ধুদের কেউ, যাদের আপনি রক্তপিপাসু বলতে রাজি নন। ’

‘সংগতি রক্ষায় সক্ষম, ঠিক আছে; কিন্তু করুণা করতে হবে কেন?’

‘কেন? কারণ যার মনে বিষ ঢুকেছে, যে রোগাক্রান্ত কল্পনাশক্তির অধিকারী, যে নিজের মনের মতো কিছু না পেলেই ভেবে বসে যার কারণে পাওয়া হলো না তাকে দুনিয়ার বুক থেকে সরিয়ে দিতে হবে, যে আইফিজিয়েন টাওয়ারে গুলি করতে পারে, যে গর্দভ আগুন দিতে পারে ওর্ক মিনিস্টারে, তাকে বা তাদের আপনি করুণা করবেন না তো কী করবেন? মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আসুন আমরা ধরে নিই যে এই ক্রিমিনাল একটা পাগল,’ আমি কথা বলছি একই সঙ্গে গলায় উষ্ণতা নিয়ে, আবার নিন্দার সুরেও।

‘তার মোটিভ যদি হয়ে থাকে অহংকার,’ বুরগনেফ বললেন, ‘সন্দেহ নেই সেটা হবে ভয়ংকর; কিন্তু এটার আবার প্রতিশোধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই তো?’

‘প্রতিশোধ?’ আমি বিস্মিত। ‘কী! নিরীহ মেয়েদের ওপর?’

‘আপনি ধরে নিচ্ছেন তারা নিরীহ। ’

‘গুড গড! আপনি অন্য রকম কিছু জানেন নাকি?’

‘আমি না। কিন্তু আমরা এখানে যেহেতু জল্পনাকল্পনা করছি, কী চমকপ্রদ প্রতিক্রিয়া হয় দেখার ইচ্ছা থেকে এ রকম একটা জল্পনার আশ্রয় নিতেই পারি আমি। ’

‘আপনি আপনার জল্পনাকে যুক্তিসিদ্ধ করবেন কিভাবে?’

‘খুব সহজেই তা করতে পারি। আমাদের একটা মোটিভ ধরে নিতে হবে; আসুন ধরি সেটা হলো প্রতিশোধ এবং আসুন দেখি এটা থেকে কোনো সূত্র বেরোয় কি না। ’

‘না, তা বেরোবে না। ভিকটিম দুজন পরস্পরের সঙ্গে কোনোভাবে সংযুক্ত ছিলেন না—না সরাসরি, না তৃতীয় কারো দ্বারা, আর তাই তাঁদের পক্ষে কমন কোনো ভুল বা এমন কোনো কমন বৈরী কাজ করা সম্ভব ছিল না যেটা কারো মনে প্রতিশোধ জাগানোর মতো আগুন বা খোরাক তৈরি করতে পারে। ’

‘তা হয়তো সত্যি; কিন্তু আবার এও সত্যি যে প্রতিশোধ নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কেউ বিকল্প ভিকটিম হিসেবে দেখতে বা বেছে নিতে পারে তাদের। ’

‘সেটা কী রকম?’

‘এটা মানুষের প্রকৃতির মধ্যে আছে, অস্বীকার করে লাভ নেই। আপনি লক্ষ করেছেন অসন্তুষ্ট, হতাশ, রাগী বাচ্চারা নিরীহ নার্সকে আঘাত করে, নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করার জন্য খেলনা ভেঙে ফেলে? আপনি কখনো দেখেছেন স্কুলের এক ছাত্র, বয়সে বড় কোনো ছাত্রের হাতে মার খেয়ে, কাছাকাছি থাকা নিজের চেয়ে বয়সে ছোট কোনো ছাত্রকে মারতে শুরু করে? আপনি কখনো দেখেছেন একজন স্কুলমাস্টার কোনো ছাত্রের বাবার আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে নির্দোষ ক্লাসে তাণ্ডব চালান? আপনি কখনো দেখেছেন পুলিশ কিংবা আর্মির একজন সিপাই শাস্তি পান এই কারণে যে তাদের অফিসারকে আরো বড় কোনো অফিসার তিরস্কার করেছেন? এগুলো হলো বিকল্প ভিকটিমের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণের পরিচিত নমুনা। আত্মা যখন ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে পড়ে, নিজেকে শান্তি দেওয়ার জন্য ওই ক্রোধ তখন তাকে বের করার উপায় খুঁজতে হয়—নিজের ব্যথা তাকে কমাতে হবে অন্যকে ব্যথা পেতে দেখে। এভাবেই আমরা গঠিত হয়েছি। সবচেয়ে বেশি যেটা দরকার আমাদের, সহানুভূতি। আমরা যখন আনন্দের মধ্যে থাকি তখন অন্যের মধ্যে হতাশা আর দুঃখ দেখতে চাই না; যখন হতাশায় ভুগি তখন অন্যের মধ্যে আনন্দ দেখলে ঈর্ষা জাগে, ঈর্ষা আমাদের ব্যথাটাকে আরো কষ্টদায়ক করে তোলে। এটাই হলো হিউম্যান নেচার। ’

‘এবং’ রাগ চেপে রাখতে না পেরে বলে বসলাম আমি, ‘আপনার ধারণা, এই দুই সুখী মেয়েকে দেখে, যারা কনে হিসেবে আনন্দ আর উল্লাসে সময় কাটাচ্ছিল, নরকের কীট এক পশুর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল, সে ভাবল ওদের আমার বিকল্প ভিকটিম বানাব, যেহেতু আমি আমার কনেকে হারিয়েছি। ’

আমি অনেক বাড়াবাড়ি করে ফেললাম, ক্রস করে ফেললাম লাইন। তাঁর চোখ আমার চোখে যেন গেঁথে যেতে চাইল। আমার মনে হলো, আমি যে তাঁকে সন্দেহ করি, সেটা পুরোপুরি বুঝতে পারলেন তিনি। মাঝে মাঝে কারো দৃষ্টি এমন কথা বলে, মুখের ভাষা দিয়ে তা কখনো প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বুরগনেফের চোখে দেখলাম তিনি আমার মনোভাব আবিষ্কার করতে পেরেছেন। সম্পূর্ণ শান্ত ভাব ধরে রেখেছেন তিনি, তবে যখন মুখ খুললেন তখন তাতে একটা ধাতব সুর ভাজল, অনেকটা তলোয়ারে-তলোয়ারে ঘষা খাওয়ার মতো, বললেন :

‘আমার ধারণা এ রকম, তা আমি বলিনি; তবে আমরা যেহেতু জল্পনার বিশাল ক্ষেত্রে রয়েছি—যেভাবেই দেখা হোক হাতে কোনো এভিডেন্স নেই, অপরাধী বা তার মোটিভ সম্পর্কেও সূত্র পাচ্ছি না—কাজেই হিউম্যান নেচারের স্বাভাবিক নিয়ম থেকে আমি এই উপসংহারে পৌঁছাতে চেষ্টা করেছি—অহংকার মোটিভ হওয়া সম্ভব; যেটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে কিংবা আপনার দৃষ্টিকোণ থেকে হতে পারে উদ্ভট।

‘আপনি যেমন বলছেন, এভিডেন্সের চরম অভাব রয়েছে এবং জল্পনা কোনো লক্ষ্য ছাড়াই ভেসে বেড়াচ্ছে এক জিনিস থেকে আরেক জিনিসে। শেষ পর্যন্ত তাহলে দাঁড়াচ্ছে, সবচেয়ে যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা হলো সংক্রামক অনুকরণ। ’

এটা বললাম এর আগে গায়ে আগুন লাগানোর জন্য বলা কথাটাকে হালকা করার জন্য। কিন্তু তাঁকে বোকা বানানো গেল না; যদিও অন্তত কয়েক মুহূর্ত তাঁকে দেখে আমার মনে হচ্ছিল তিনি যেন দ্বিধায় ভুগছেন—উত্তরে বললেন :

‘সেটাও আমি মেনে নিতে পারিনি। পুরোটাই একটা রহস্য এবং এখানে আমি কিছু সময় থাকব এই আশায় যে রহস্যের জট খুলবে। ততক্ষণ, জল্পনার বিষয় হিসেবে, একটা জিনিস দেখাই আপনাকে, যেটায় আপনার মেধা খাটালে আপনি উপকৃত হতে পারবেন। ’

টেবিল ছাড়লেন বুরগনেফ, বেডরুমে গিয়ে ঢুকলেন। দেরাজের তালা খোলার আওয়াজ পেলাম, জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করছেন। চুপচাপ বসে নিজেকে গালমন্দ করছি মুখ সামলে কথা না বলায়, যদিও যা হওয়ার হয়ে গেছে, এখন আর মুখের কথা ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না। তার আসলে কোনো প্রয়োজনও কিন্তু নেই। এতে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই যে তিনিই খুনি এবং তাঁর মোটিভও সঠিক আন্দাজ করতে পারা গেছে। আরেকটা কথা, নিজেকে গালমন্দ করার মধ্যে কিন্তু আনন্দের একটা ভাবও মিশে আছে, তার কারণ হলো কথাটা বলে ফেলে আমি একটা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম, সেটা থেকে খুব কৌশলে নিজেকে সরিয়ে আনতে সফল হয়েছি।

বুরগনেফ ফিরে এলেন। তিনি যখন বসছেন, খেয়াল করলাম তাঁর গায়ের লম্বা আঁটসাঁট কোটের নিচের অংশটা খোলা। তিনি সব সময় অলংকৃত কর্ড দিয়ে তৈরি বিনুনির মালাসহ কোট পরেন, হাঁটু পর্যন্ত লম্বা—এখন আমি জানি, অকেজো ডান হাতটা লুকানোর জন্য (তাঁর ভাষ্য মতে হাড্ডিসার, কুঁচকানো খুরমার মতো চামড়ায় মোড়া), যেটা তাঁর শরীরের পাশে সেঁটে থাকে। শেষ প্রান্তের দুটি খুদে খিল এই মুহূর্তে খোলা দেখতে পাচ্ছি।

বুরগনেফের হাতে খুবই সরু তার দিয়ে বানানো বা বোনা খুদে চেইন দেখতে পাচ্ছি। ওটা আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন তিনি, বললেন :

‘এবার জল্পনার আশ্রয় নিয়ে বলুন, জিনিসটা কী?’

‘এটা যদি কোনো মন্তব্য ছাড়া আমার হাতে আসত, আমি তাহলে বলতে পারতাম জিনিসটা ভারি সুন্দর, ছোট্ট একটা লোহার কাজ। ’

‘ওটা লোহার কাজই,’ বললেন তিনি।

আমাকে কি ধোঁকা দেওয়া হয়েছে? কোটের তৃতীয় বন্ধনী বা খিলও খোলা দেখতে পাচ্ছি! মাত্র একমুহূর্ত আগে মাত্র দুটি খোলা দেখেছিলাম।

‘আমাকে ঠিক কী জল্পনা করতে হবে?’ জানতে চাইলাম আমি।

‘লোহাটা কোত্থেকে এসেছে? জিনিসটা কোনো খনি থেকে আসেনি। ’

হাতের চেইনটা আবার দেখলাম, খুব খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছি। চোখ তুলেছি প্রতিপক্ষের অবস্থা চাক্ষুষ করার জন্য—ভাগ্য ভালো যে চেহারায় বিস্ময় নিয়ে, যেহেতু আমার চোখে যেটা ধরা পড়ল সেটা দেখলে ঠাণ্ডা প্রকৃতির একজন লোককেও চমকে দেবে—আমি দেখলাম, চতুর্থ খিলও খুলে গেছে!

‘আপনাকে বিস্মিত দেখাচ্ছে,’ বললেন বুরগনেফ, ‘এবং আপনি আরো বেশি অবাক হবেন আমি যখন আপনাকে বলব আপনার হাতের ওই লোহা একসময় একটা মানুষের নিজস্ব প্রবাহের ভেতর ভেসে বেড়াত। ওটা তৈরি করা হয়েছে মানুষের রক্ত দিয়ে। ’

‘মানুষের রক্ত!’ বিড়বিড় করলাম, নিজের অজান্তে।

এরপর আমার প্রতিপক্ষ রক্তের ফিজিওলজিক্যাল বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে দীর্ঘ লেকচার দিতে শুরু করলেন— কিভাবে ওটা বহন করা হয়েছে, কেমন করে স্রোতের সঙ্গে নিঃশেষে মিশে গেছে, লোহার সঙ্গে আরো অনেক কিছু ছিল, ছিল মাটিও; কেমিস্টরা কৌতূহলবশত এই লোহাকে কিভাবে আলাদা করে বের করে এনে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছেন এবং প্রতিবার বের করে আনা লোহা থেকে এই চেইন কিভাবে তৈরি করা হয়েছে। তাঁর প্রতিটি শব্দ আমি শুনতে পেয়েছি; কিন্তু আমার চিন্তা শুধু একটা বিষয়কে ঘিরে ঘোরাফেরা করছে, সেই চরম মূহূর্তটা কখন আসবে। কাউকে বলে দিতে হয় না, আমার মতো বিপদে পড়া মানুষ এমনিতেই বুঝতে পারত ওই কোটের তলায় একটা ছোরা লুকানো আছে এবং সেটাকে এখন থেকে যেকোনো মুহূর্তে আমি ঝিক করে উঠতে দেখব। আর তার পরই শুরু হবে নাচ, জীবন কেড়ে নেওয়ার আর জীবন রক্ষা করার নাচ—আমরা দুজন নাচব, আমি আর বুরগনেফ। এটা বাস্তব, এটা ঘটবে, আমি জানি।

আমার নিরাপত্তা নির্ভর করছে উপস্থিত বুদ্ধির ওপর। চরম সংকটের মুহূর্তে অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে মন সার্ভে চালায় কী কী সম্ভাবনার পথ খোলা আছে, আপনার অস্ত্র কী, জরুরি অবস্থায় কী জিনিস আপনি কাজে লাগাতে পারবেন—চোখের মাধ্যমে মন জানল আমার নাগালের মধ্যে কোনো অস্ত্র নেই, আরো জানল আমি সতর্কসংকেত উচ্চারণ করার আগেই বাঘ আমার গলা লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমাকে বলা হলো, বাঁচার একমাত্র উপায় তাঁর ওপর থেকে নিজের চোখ না সরানো এবং পরবর্তী খিল খুলে যাচ্ছে দেখতে পেলেই তাঁকে লক্ষ্য করে লাফ দিতে হবে—তিনি তাঁর হাতটা ব্যবহার করতে পারার আগেই।

অবশেষে আইডিয়াটা আমার মাথায় খেলেছে, সেটাও কম বড় প্রাপ্তি নয়; এই আইডিয়া বুনো পশুর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, ওখানেও আপনার নিরাপত্তা নির্ভর করবে—ওটা হামলা চালানোর ঠিক আগের মুহূর্তে আপনি আক্রমণ করবেন। তার মানে নিজেকে বাঁচানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ঝুঁকি নেওয়া। সরাসরি তাঁর মুখের ওপর চোখ রেখে আমি ধীরে ধীরে বললাম :

‘আর আমার রক্ত দিয়ে ঠিক এই রকম আরেকটা চেইন তৈরি করতে ভালো লাগবে আপনার,’ কথা বলার সময় চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছি। বুরগনেফ বসেই থাকলেন, তবে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি হকচকিয়ে গেছেন।

‘কী বলতে চান আপনি?’ জিজ্ঞেস করলেন তিনি।

‘বলতে চাই,’ বললাম আমি, কঠিন সুরে, ‘আপনার কোট আপনি খুলে ফেলেছেন; আমার উপস্থিতিতে যদি আরেকটা খিল খোলেন, আমি আপনাকে মেঝেতে ফেলে দেব। ’

‘আপনি একটা গর্দভ,’ অবাক হয়ে বললেন তিনি।

আমি দরজার দিকে এগোলাম, তাঁর ওপর দৃষ্টি স্থির রেখে; নিজের জায়গায় মূর্তির মতো বসে আছেন তিনি, কটমট করে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে।

‘গর্দভ আমি না, গর্দভ আপনি,’ বললাম আমি। ‘—এবং এখন যদি নড়াচড়া করেন, তার পরিণতি ভালো হবে না। ’

ঠিক সেই মুহূর্তে, কোন ইন্দ্রিয়ের দ্বারা বলতে পারব না, যেন মনে হলো আমার মাথার পেছনে এক জোড়া চোখ আছে, আমি সচেতন হয়ে উঠলাম কেউ একজন আমার পেছনে হাজির হচ্ছে, অথচ সাহস করে নিজের পাশে আমি একবার তাকাতে পারছি না। আচমকা অন্ধকারের বিশাল দুটি ভাঁজ মনে হলো বাহুবন্ধনের কায়দায় গ্রাস করল আমাকে। একটা জোরালো সেন্ট ঢুকল নাকে। আমার কানে কী যেন বাজছে, বুকের ভেতর বেদম লাফাচ্ছে হার্ট। অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে আরো, আরো, আরো; বিরাট সব ঢেউয়ের মতো। ঢেউগুলো দ্রুত থেকে আরো দ্রুত গড়াচ্ছে। কানের ঝিনঝিন আওয়াজটা গর্জন হয়ে উঠছে। বুকে এখন আর হাতুড়ির বাড়ি পড়ছে না, ড্রাম বাজছে। অন্ধকারে চিকন আলোর রেখা ছোটাছুটি করছে। আমার সামনে কার যেন আকৃতি আসা-যাওয়া করল। ঢেউ এলো তীব্র স্রোতের ধরন নিয়ে। আর আমি অন্ধকার গভীর সাগরের আরো নিচে তলিয়ে যেতে থাকলাম। তারপর আর কোনো শব্দ নেই। চেতনা আছে কি নেই কে বলবে।

কতক্ষণ আমার জ্ঞান ছিল না, আমি জানি না। তবে সেটা বেশ অনেকক্ষণই হবে। জ্ঞান ফিরে আসতেই চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠলাম আবার, নিজেকে দেখতে পাচ্ছি একটা বিছানায় শুয়ে আছি, আমাকে ঘিরে রেখেছেন উদ্বিগ্ন চেহারা নিয়ে কিছু মানুষ, তাঁদের চোখে অনুসন্ধানী দৃষ্টি, চারদিকে জমে ওঠা ভিড় থেকে ফিসফিস করে কথা বলছেন তাঁরা। ‘ইনি বাঁচবেন,’ আমি চোখ খুলতেই বললেন কেউ একজন, আমি তাঁকে আমাদের হোটেল মালিক বলে চিনতে পারলাম।

খুব অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছি আমি। আর একমুহূর্ত দেরি হলে এই গল্প বলার জন্য কেউ থাকত না। যে ছোরা এরই মধ্যে প্রতিশোধপরায়ণ বুরগনেফের দুজন ভিকটিমকে পরপারে পাঠিয়ে দিয়েছে, সেটা আমার বুকেও ঢুকতে যাচ্ছিল। আমার নেহাতই কপাল ভালো যে ভয়ংকর আইভান যখন তার মোটা দুটি বাহু দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল, তারপর নাকে চেপে ধরেছিল ক্লোরোফর্মে ভেজানো রুমাল, ঠিক সেই মুহূর্তে হোটেলের একজন বয় ঘরের ভেতর ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছিল। তারপর দরজা খুলে যখন ভেতরের দৃশ্য দেখতে পেল, তখন বাকি সব বয়কে ডেকে নেয় সে। সবাই ছুটে চলে আসে, তারা ঘিরে ফেলায় বুরগনেফ চেষ্টা করেও পালাতে পারেননি। এরই মধ্যে পুলিশে খবর দেওয়া হয়, তারা এসে গ্রেপ্তার করে বুরগনেফকে। তবে আইভান কিভাবে যেন পালিয়ে গেছে। পুলিশ তাকে আর খুঁজে পাবে বলে মনে হয় না। তবে তুলনায় সেটা খুব বড় কোনো বিষয় নয়। মাথার ওপর মনিব না থাকায় নিজের পশুত্ব প্রকাশ করে সমাজের খুব একটা ক্ষতি করতে পারবে না সে, তা করতে গেলে পরের বার ঠিকই ধরা পড়বে। অপরাধীর সহযোগী হিসেবে তারও শাস্তি হওয়ার কথা, তবে তার আগে তাকে ধরতে পারতে হবে। আসল ক্রিমিনাল ধরা পড়েছে, তাতেই আমি খুশি। এখন শুধু অপেক্ষা কবে তাঁর বিচার হবে। বুরগনেফের মাথাটা যখন স্ক্যাফোল্ডের ওপর খসে পড়বে তখন আমি বুঝব যে আমার কাজ শেষ হয়েছে।

[বিদেশি গল্প অবলম্বনে]



সাতদিনের সেরা